ট্রাম্পের উপসাগরীয় যুদ্ধ

আলেকজান্ডার জেভিন

 


১৯৯১ থেকে ২০২৬-এর মধ্যে মার্কিন কূটনৈতিক সৌজন্য ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের যে অবনতি ঘটেছে, এবং ইজরায়েলের ভূমিকার যে পরিবর্তন— একসময় বিব্রতকর আনুষঙ্গিক শক্তি থেকে এখন উদ্যোগী ও সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী— তা আর আলাদা করে ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না। এই ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তগুলির প্রধান শিক্ষা হল এদের অপ্রত্যাশিত দীর্ঘস্থায়িত্ব। ট্রাম্প হয়তো এই পর্যায়টাকে বন্ধ করতে পারেন, অথবা নতুন করে উত্তেজনা বাড়াতে পারেন; কিন্তু ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েলের যে ইরান যুদ্ধ তিনি শুরু করেছেন, তা তাড়াতাড়ি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না

 

ট্রাম্প প্রশাসনকে কখনও কখনও এমন মনে হয়— তার প্রথম ও দ্বিতীয় অবতারের মধ্যে পার্থক্য এতটাই প্রকট— যেন তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই The Eighteenth Brumaire-এর শুরুতে থাকা সেই বিখ্যাত উক্তিটিকে উল্টে দিতে চাইছে— “বিশ্ব-ইতিহাসের সব বড় ঘটনা ও ব্যক্তিত্ব যেন দু’বার আবির্ভূত হয়… প্রথমবার ট্র্যাজেডি হিসেবে, দ্বিতীয়বার প্রহসন হিসেবে।”[1] তখন ছিল ভাতিজা, লুই নেপোলিয়ন, যিনি তাঁর বিখ্যাত কাকার ভূমিকাই পুনরাবৃত্তি করছিলেন। আজ, ট্রাম্প নিজেই নিজের ভূমিকাকে পুনরায় অভিনয় করেছেন— একটি দ্বিতীয় অঙ্কে, যা নিষ্ঠুরতা ও ধ্বংসযজ্ঞে পরিপূর্ণ; এখানে পুনরাবৃত্তি ও পরিবর্তন আরও দ্রুত ও আত্ম-প্রতিফলিত, যা অভিনেতা এবং যুগ— উভয়ের সঙ্গেই মানানসই।

অনেকে ‘নব্য-বোনাপার্টবাদ’-এর ধারণাকে ব্যবহার করে ট্রাম্পবাদের প্রাথমিক সামাজিক-রাজনৈতিক জোটকে বিশ্লেষণ করেছেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমরা যেন দ্বিতীয় নেপোলিয়নের জীবনের আরও পরবর্তী এক পর্যায়ের পুনরাভিনয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি— গল্পের শুরুতে যে গণভোটনির্ভর দুঃসাহসী পদক্ষেপ ছিল তা নয়, বরং যেন ছিল সেই জুয়াড়ির ভুল বাজি, যার ভাগ্য ফুরিয়ে গেছে এবং যে একটি ঝুঁকিপূর্ণ বিদেশি অভিযানে জড়িয়ে পড়েছে।[2] ট্রাম্প সেডান-এর মুখোমুখি হচ্ছেন না। কিন্তু ইরানে মার্কিন-ইজরায়েলি হানাদারির আট সপ্তাহ পার হওয়ার পর, পরিস্থিতি মোটেই পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে না।

 

এক.

যদি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ তাঁর প্রথমটির তীব্র বিপরীত হয়, তবে সবচেয়ে স্পষ্ট পার্থক্যটি দেখা যাচ্ছে পররাষ্ট্রনীতিতে। এখানে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ যেন এক ধরনের অন্তর্মুখী মোড় নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল— অন্তহীন যুদ্ধ ও বিদেশি দখলদারিত্ব থেকে সরে আসা, এমনকি ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে ঠকাচ্ছে বলে মনে করা মিত্রদের থেকেও দূরে সরে যাওয়া। ট্রাম্পের ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারে যে জনপ্রিয় অভ্যুত্থানের আবহ তৈরি হয়েছিল, তার বড় অংশই এসেছিল জেব বুশ ও অন্যান্য মূলধারার রিপাবলিকানদের সঙ্গে তাঁর তীক্ষ্ণ বাক্যযুদ্ধ থেকে; ইরাক যুদ্ধে তাঁদের ভূমিকার জন্য তিনি নির্মমভাবে তাঁদের আক্রমণ করেছিলেন। প্রথম মেয়াদে নতুন কোনও যুদ্ধ শুরু করেননি— এই দাবির পক্ষে ট্রাম্পের কিছুটা ভিত্তি ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু করার আগেই তিনি তিনটি মহাদেশ জুড়ে— ক্যারিবিয়ান, সাব-সাহারান আফ্রিকা এবং আরব উপদ্বীপে— আক্রমণ চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

ট্রাম্পের মধ্যে যতই নতুনত্ব থাকুক না কেন, তাঁর কর্মকাণ্ডের পেছনে থাকা আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতাকে উপেক্ষা করা ভুল হবে; বরং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা না থাকলে বোঝাই কঠিন হত, কীভাবে ‘আর কোনও বোকা যুদ্ধ’ না করার প্রতিশ্রুতি— যা তাঁর বহির্দেশে ভাবমূর্তির অন্যতম ভিত্তি ছিল— দেওয়া একজন ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে সমস্ত নব্য-রক্ষণশীল যুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে বড়টিতেই জড়িয়ে পড়লেন।

এটা বুঝতে হলে আমাদের ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের মধ্যে পরিবর্তিত ত্রিমুখী সম্পর্কের দিকে নজর দিতে হবে, পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্যবাদী কাঠামো ও প্রকল্পগুলিকেও বিবেচনায় আনতে হবে। তেহরানে আঘাত হানার ক্ষেত্রে ট্রাম্প ভুল হিসাব করে থাকতে পারেন, কিন্তু তাঁর প্রশাসন যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গতভাবেই দাবি করতে পারে যে তারা এমন কিছু লক্ষ্য অনুসরণ করছে, যেগুলিকে পশ্চিমি সরকারগুলি দীর্ঘদিন ধরেই সমর্থন করে আসছে।

 

দুই.

১৯৭৯ সাল থেকে ইসলামিক রিপাবলিকটি ওয়াশিংটনের নজরে রয়েছে, যখন প্রো-আমেরিকান শাহ ইরানি বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হন। কিছু দিক থেকে দেখলে, এই যুদ্ধটি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের তখন থেকে ইরানকে ক্রমাগতভাবে দানবায়িত করে আসার সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ারই যৌক্তিক পরিণতি।[3] প্রথমদিকে ইজরায়েল খোমেইনি-অনুগামীদের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেছিল; তারা ইরান ও তুরস্কের মতো বহির্বৃত্তের রাষ্ট্রগুলিকে সম্ভাব্য মিত্র হিসেবে দেখত, যাতে অন্তর্বৃত্তের উগ্র আরব-জাতীয়তাবাদী প্রজাতন্ত্রগুলির মোকাবিলা করা যায়— এবং ১৯৮০-র দশকে ইরানি সেনাবাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ করেছিল, যাতে তারা ‘নিকট শত্রু’ ইরাকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে সাদ্দাম হুসেনের সেনাবাহিনী পরাস্ত হওয়ার পরই ইজরায়েল ততদিনে শক্তিশালী ও স্থিতিশীল হয়ে ওঠা ইসলামিক রিপাবলিকটির দিকে দৃষ্টি ঘোরায় এবং ওয়াশিংটনকে তেহরানের পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন রুখতে বা অন্য কথায়, অঞ্চলে ইজরায়েলের একচেটিয়া পারমাণবিক অবস্থান বজায় রাখতে চাপ দিতে শুরু করে।

ইজরায়েলের অনেক বৃহত্তর পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের মুখে ইরানের নিজের প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনের— জাতীয় আত্মরক্ষার— পূর্ণ অধিকার রয়েছে।[4] কিন্তু এই ক্ষেত্রে ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। তারা একদিকে ‘জায়নবাদী সত্তা’কে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার মতো অবাস্তব হুঙ্কার দিয়ে গেছে— যা বাস্তবে তারা কখনওই করতে সক্ষম নয়। অন্যদিকে, বাস্তবে ন্যূনতম ও নীরব অবস্থান গ্রহণ করে গেছে— যেমন পারমাণবিক অস্ত্র প্রসার রোধ চুক্তি (NPT) ও মার্কিন নেতৃত্বাধীন পরিদর্শন ব্যবস্থার প্রতি সম্মান প্রদর্শন। এসবের মাধ্যমে তারা নিজেরাই নিজেদের সেই সার্বভৌমত্বকে খর্ব করার সুযোগ করে দিয়েছে, যাকে আয়াতোল্লারা ও রিপাবলিকান গার্ডরা পবিত্র বলে দাবি করে। তেহরান যদি পিয়ংইয়ং-এর পথ অনুসরণ করত, তাহলে হয়তো তাদের আজ এই পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হত না।

ইরানকে যে কোনও মূল্যে এই ক্ষমতা অর্জন থেকে বিরত রাখতে হবে— এই ধারণাটি পশ্চিমি রাষ্ট্রগুলির মধ্যে প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে, এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে রাশিয়া ও চিনও— যাদের নিজেদেরই বিশাল পারমাণবিক ভাণ্ডার রয়েছে— এটি সমর্থন করেছে। ইরানের পারমাণবিক আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র যে অর্থনৈতিক যুদ্ধের কৌশল— প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞা— পরিমার্জিত করেছে, তা শুধু দেশের অভ্যন্তরে দ্বিদলীয় ঐকমত্যের বিষয় নয়, বরং ওয়াশিংটনের প্রধান ইউরোপীয় মিত্রদেরও ঐক্যবদ্ধ করেছে। ২০০৬, ২০১১, ২০১৮ এবং ২০২৫ সালে ধাপে ধাপে কঠোরতর করা এই নিষেধাজ্ঞাগুলির সম্মিলিত প্রভাব ইরানি সমাজের ওপর ধ্বংসাত্মক হয়েছে, অথচ যাকে লক্ষ্য করে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়— সেই শাসনব্যবস্থার ওপর তা কখনওই গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করতে পারেনি।[5] অনেকে বলতেই পারেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই নিষেধাজ্ঞাগুলি যেন বহুপাক্ষিকতার এক আদর্শ উদাহরণ— যার এত অভাব আজকাল বলে অনেক উদারপন্থী ভাষ্যকার আক্ষেপ করেন— জাতিসংঘই বৈশ্বিক স্তরে এগুলি কার্যকর ও বৈধতা দেওয়ার প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। সম্ভবত এই কারণেই, যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েলের ইরানের ওপর এই স্পষ্ট অবৈধ এবং স্পষ্টতরভাবে অনৈতিক সামরিক আক্রমণ সত্ত্বেও, তাদের মিত্রদের প্রতিবাদের আওয়াজ খুবই ক্ষীণ শোনা গেছে। পদ্ধতির সমালোচনা করলেও, তারা শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যগুলিকেই সমর্থন করেছে— এবং ইউরোপ নীরবে অপারেশন এপিক ফিউরি-র জন্য এক বিশাল বিমানবাহী রণতরীর মতো কাজ করেছে: ইংল্যান্ডের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ও জার্মানির রামস্টাইন থেকে শুরু করে ইতালি, ক্রিট ও পর্তুগালের ঘাঁটি পর্যন্ত।

 

তিন.

এছাড়াও, ট্রাম্প হয়তো ‘আর কোনও বোকা বা অন্তহীন যুদ্ধ’ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তিনি হালকা, দ্রুত এবং ‘স্মার্ট’ যুদ্ধের সম্ভাবনাকে নাকচ করেছিলেন— বিশেষ করে যখন সেগুলোর নেতৃত্বে তিনি নিজেই থাকবেন। তাঁর প্রথম অভিযান ছিল ২০২৫ সালের জুনে ইজরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে বারো দিনের যুদ্ধ। এই অভিযানের জন্য তাঁর জেনারেলরা ওবামা-যুগের পরিকল্পনাগুলি ঝালিয়ে নেন— যেখানে বি-২ বোমারু বিমান ও সাবমেরিন ব্যবহার করে নাটাঞ্জ, ইসফাহান এবং ফোরডোর পারমাণবিক জ্বালানি-চক্র সংক্রান্ত স্থাপনাগুলিতে ৪ লক্ষ পাউন্ড বোমা নিক্ষেপ করা হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারির শুরুতে ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে আটক করার বিশেষ বাহিনীর অভিযান (‘একটি নিখুঁত দৃশ্যপট’) যেন ট্রাম্পের এই বিশ্বাসকে আরও জোরদার করেছিল যে, ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত যুদ্ধও একইভাবে সফল হতে পারে— বিশেষত যখন নতুন নিষেধাজ্ঞাজনিত অর্থনৈতিক সংকট এবং ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধে সারা দেশে প্রতিবাদ চলছিল। কিন্তু এই প্রতিবাদ দমনের পরেও ‘তাদের সাহায্য করতে হস্তক্ষেপ’ করার যে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল (‘সাহায্য আসছে’), তার মধ্যে যে গভীর নৈরাশ্যবাদ ও কৌশলগত স্বার্থ কাজ করছিল, তা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়নি। ২৮ ফেব্রুয়ারির জাতির উদ্দেশে ট্রাম্পের ভাষণে যে ‘মহান ইরানি জনগণ’-এর কথা বলা হয়েছিল, তাদের প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতা হস্তান্তরের উত্তরাধিকারী হিসেবে কখনও ভাবা হয়নি।[6] বরং তারা সর্বোচ্চ যা করতে পারত, তা হল একটি অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা-বদলের জন্য পটভূমি তৈরি করা— যেখানে খামেনেই এবং তার সামরিক ও গোয়েন্দাপ্রধানদের হত্যার পর, আরও অনুগত উপাদানগুলি ক্ষমতায় আসবে, যাদের নির্বাচন করবে মোসাদ ও সিআইএ, এবং যারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের ‘সহযোগিতায়’ কাজ করবে— ভেনেজুয়েলার মতোই। ট্রাম্প নিজেই টুইট করে লিখেছিলেন: ‘নিয়োগের ক্ষেত্রে আমাকে যুক্ত থাকতে হবে, যেমনটা ভেনেজুয়েলায় ডেলসির ক্ষেত্রে ছিলাম।’[7]

এই লক্ষ্য অর্জনের প্রধান উপায় হিসেবে ধরা হয়েছিল বিপুল আকাশশক্তিকে। এখানেও ট্রাম্প প্রমাণ করেছেন যে বিদেশে মার্কিন সামরিক শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে তিনি গভীরভাবে প্রোথিত প্রবণতার সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ— যা ‘আকাশ থেকে শাসন’ করার মতো এক ধরনের বোমাবর্ষণ-কেন্দ্রিক কল্পনার দ্বারা চালিত। পিট হেগসেথ, সেই পেশিবহুল প্রাক্তন ফক্স অ্যাঙ্কর, এই আকাঙ্ক্ষার প্রায় অবচেতন বা ‘ইড’-সুলভ রূপায়ণ। কার্যত যেন যুদ্ধসচিবের ভূমিকায় অভিনয় করার জন্যই তাঁকে নিয়োগ করা হয়েছে। তাঁর সংবাদমাধ্যমে উপস্থিতিগুলি অতিরঞ্জিত, প্রায় উন্মত্ততার সীমানায় পৌঁছে যাওয়া; তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ‘সারাদিন আকাশ থেকে মৃত্যু ও ধ্বংস নেমে আসবে’, এমনকি নাটকীয় ভঙ্গিতে দেখিয়েছেন, ইরানের নেতারা যেন ‘উপরে তাকিয়ে প্রতিটি মুহূর্তে শুধু মার্কিন ও ইজরায়েলি আকাশশক্তিকেই দেখতে পাচ্ছেন’। তাঁর হুমকিগুলোও ছন্দময় পুনরুক্তিতে ভরা— ‘খুঁজে বের করো, স্থির করো এবং শেষ করে দাও’, ‘ধ্বংস করো, মনোবল ভেঙে দাও, নিশ্চিহ্ন করো, পরাজিত করো’। একজন সাংবাদিকের কাছে, তিনি গর্ব করে বলেছিলেন, ‘এটা কোনও ন্যায্য লড়াই নয়; আমরা ওদের দুর্বল অবস্থায় আঘাত করছি— এবং এটা ঠিক এভাবেই হওয়া উচিত।’[8]

এই দম্ভ আসলে এমন এক কল্পনার প্রতিফলন, যেখানে শুধুমাত্র আকাশশক্তির জোরেই এক অসহায় শত্রুর উপর সম্পূর্ণ আধিপত্য কায়েম করা সম্ভব। এই ধারণা নতুন নয়; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই এটি যুক্তরাষ্ট্রের বহু সামরিক পরিকল্পনাকারী ও রাজনীতিবিদকে প্রলুব্ধ করে এসেছে। হেগসেথ সেই দীর্ঘ ধারার সর্বশেষ প্রতিনিধি। মেজর জেনারেল কার্টিস লে মে, ‘স্ট্র্যাটেজিক বোমাবর্ষণ’-এর প্রাথমিক প্রবক্তাদের একজন, টোকিওতে অগ্নিবোমা হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেখানে এক লক্ষ মানুষ নিহত হয়— ‘পুড়ে, সেদ্ধ হয়ে, দগ্ধ হয়ে মৃত্যু’। পরে তিনি গর্ব করে বলেছিলেন, তিনি ‘উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় প্রতিটি শহর পুড়িয়ে দিয়েছেন’, ‘অপারেশন স্ট্র্যাঙ্গল’ নামের এক অভিযানে, যা তাঁর নিজের হিসাব অনুযায়ী ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের মধ্যে ওই দুই দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের মৃত্যু ঘটায়। নিজের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার আগে জেনারেল ম্যাকআর্থার চেয়েছিলেন ‘মাঞ্চুরিয়ার সরু অংশ জুড়ে ত্রিশ থেকে ষাটটি পারমাণবিক বোমা ফেলতে’— যাতে চিনা কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ বলয় তৈরি করা যায়। ভিয়েতনামে আকাশশক্তির এই প্রবণতা আরও বিকৃত চেহারা নেয়; স্পষ্ট লক্ষ্যবস্তুর অভাব (যা শুরু থেকেই বিমানযুদ্ধের এক স্থায়ী ‘সমস্যা’) নতুন নতুন লক্ষ্য নির্ধারণের পরিধি বাড়াতে থাকে, ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা ক্রমশ বিস্তৃত হয়ে নির্ধারিত কোটা পূরণের জন্য আরও বেশি সংখ্যক বেসামরিক মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করে— এবং আরও ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চলতে থাকে।[9]

কৌশলবিদ ও সামরিক ইতিহাসবিদরা বারবারই বলেছেন, কেবল আকাশশক্তি দিয়ে কখনওই তার ওপর আরোপিত কৌশলগত লক্ষ্যগুলি অর্জন করা যায়নি। তবুও এই ধারণা টিকে রয়েছে— যুগোস্লাভিয়া থেকে লিবিয়া পর্যন্ত: মার্কিন হতাহতের ঝুঁকি ছাড়াই বিজয়। ইরানের ক্ষেত্রেও ‘টার্গেটিং’-এর এই পুরনো আসক্তিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নতুন চেহারা দেওয়া হয়েছে; কিন্তু এর অন্তর্নিহিত তাড়নাটি ভয়ঙ্করভাবে পরিচিত— প্রথম দশ দিনেই হাজার হাজার উড়ান পরিচালিত হয়ে ২০,০০০ অ-সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছে, যার মধ্যে ১৭,৩৫৩টি আবাসিক ভবন।[10]

 

চার.

যুদ্ধের লক্ষ্যগত দিক থেকে অপারেশন এপিক ফিউরি প্রায় শুরুতেই ভেস্তে যেতে শুরু করে, যখন ২৮ ফেব্রুয়ারি খামেনেইকে লক্ষ করে ইজরায়েলের ‘ডেক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ ইরানের অবশিষ্ট নেতৃত্বকে আলোচনার টেবিলে আনতে ব্যর্থ হয়— এবং, ট্রাম্পের নিজের কথাতেই ফাঁস হয়ে যায়, তারা যে ব্যক্তিকে ‘ইরানের ডেলসি’ হিসেবে বেছে নিয়েছিল, তাঁকেই ভুলবশত হত্যা করে ফেলে। তেহরানের কেন্দ্রে নিজের বাড়িতে এক ৮৬ বছরের বৃদ্ধ ও তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করার মধ্যে বিশেষ কোনও কৌশলগত সূক্ষ্মতা বা অভিনবত্ব নেই; এই কৌশল— যতই শকিং হোক— নতুনও নয়। ১৯৯৯ সালে ন্যাটো বেলগ্রেডে মিলোসেভিচের বাড়িতে বোমা ফেলেছিল, ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র শুরুতেই সাদ্দামকে লক্ষ করে হামলা চালায়, আর ইজরায়েল তো এই ধরনের ‘ডেক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’-কে প্রায় জাতীয় অভ্যাসে পরিণত করেছে। তবে রমজান মাসে সংঘটিত এই নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডটি— একজন ব্রিটিশ জেনারেল, যিনি ন্যাটোর প্রাক্তন উপ-সেনাপতি, এক সরাসরি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন— ‘পবিত্র সপ্তাহে সেন্ট পিটার্সের সিঁড়িতে পোপকে হত্যা করার মতোই অমার্জিত ও অমার্জনীয়’; তাঁর পূর্বাভাস ছিল, এর ফলে বহু শিয়া মুসলিমের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে।[11] ইরানও সেই অনুযায়ী পুরো অঞ্চলে মার্কিন ও ইজরায়েলি লক্ষ্যবস্তুর ওপর পাল্টা আঘাত হানে— এবং কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজের সামনে সতর্কতামূলক গুলি চালিয়ে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-পরিবহন কার্যত বন্ধ করে দেয়, ফলে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি আটকে পড়ে। সংরক্ষণাগার, শোধনাগার ও বন্দরগুলি বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারের দিকে ছুটে যায়।

এখানে জিওভান্নি আরিগি প্রায়ই যে কথাটি বলতেন, তা স্মরণ করা যেতে পারে— একটি ক্ষয়িষ্ণু হেজিমনের হাতে তার অবস্থানের জোরে সবসময়ই একাধিক বিকল্প থাকে; কিন্তু প্রতিটি বিকল্পেরই এমন কিছু নেতিবাচক দিক থাকে, যা শেষ পর্যন্ত তার পতনকেই ত্বরান্বিত করে। শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে ট্রাম্পের যুদ্ধের নেতিবাচক দিক ছিল হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়াকে উস্কে দেওয়া— একটি পদক্ষেপ, যা এর আগে ওয়াশিংটনের পরিকল্পনাকারীরা সাধারণত তেহরানের পক্ষে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করতেন, কারণ এতে অঞ্চলে তাদের অবস্থানই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত। কিন্তু এখন ঝুঁকিটা এসে পড়ল ট্রাম্পের কাঁধে— তিনি কি এই পরিস্থিতিতে অটল থাকবেন, যখন তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়ছে, সেই সঙ্গে উৎপাদন, পরিবহণ এবং আগামী বছরের ফসলের জন্য সার তৈরির খরচও বাড়ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির প্রবণতা গেঁথে দিতে পারে? নাকি তিনি এক প্রকার যুদ্ধবিরতির পথে এগোবেন— যার অর্থ হবে অন্তত ইরানের কিছু দাবির মেনে নেওয়া? সেই দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের অভিভাবকত্ব মেনে নেওয়া, যুদ্ধের স্থায়ী অবসান এবং লেবাননে ইজরায়েলি হামলা বন্ধ করা, পাশাপাশি ভবিষ্যতে ইরানের ওপর আর আক্রমণ না করার নিশ্চয়তা। ফলে এই পথটিও আসলে এক ধরনের পশ্চাদপসরণই হবে।

 

পাঁচ.

আইইএ সদস্য রাষ্ট্রগুলির কৌশলগত মজুত থেকে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়া— এবং রাশিয়ার জ্বালানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া— অস্থায়ীভাবে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের ‘চাপ’ সৃষ্টির ফলে যে পূর্ণমাত্রার অর্থনৈতিক অভিঘাত তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তাকে কিছুটা ঠেকিয়ে রেখেছে। কিন্তু আইইএ-র প্রধান স্পষ্ট করে বলেছেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও এর প্রভাব হবে বিপুল: ‘বিশ্বজুড়ে মন্দা ও জ্বালানি রেশনিং ডেকে আনা ১৯৭০-এর দশকের সেই দ্বৈত তেল-ঝটকার সময়ের চেয়েও বেশি পরিমাণ তেল বাজার থেকে হারিয়ে গেছে।’ আর এই যুদ্ধে যে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে, তা ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউরোপ যে পরিমাণ গ্যাস ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল, তার দ্বিগুণ। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, বন্ধ হয়ে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত তেল ও গ্যাসক্ষেত্রগুলিকে পুনরায় চালু করতে তত বেশি সময় লাগবে।[12]

পেট্রোলের সরবরাহের সঙ্গে সঙ্গেই পেট্রোডলারের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আরেকটি ঝুঁকিও বাড়ছে: ‘এআই বুদবুদ’ ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা, যা গত বছরে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় অংশের জন্য দায়ী। বাড়তে থাকা মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হার, তার সঙ্গে সেমিকন্ডাক্টরের ঘাটতি— এই সব মিলিয়ে নতুন ডেটা-সেন্টার বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, এবং প্রযুক্তি খাতের মূল্যায়নেও ধাক্কা লাগতে পারে।

এসবের ফলে ১৯৭০-এর দশক থেকে মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক প্রাধান্যকে টিকিয়ে রাখতে যে অসম চুক্তিটি বড় ভূমিকা নিয়েছে, তার ওপরও প্রভাব পড়ছে। নিক্সন যখন যুক্তরাষ্ট্রকে স্বর্ণমান থেকে সরিয়ে নেন, তখন তাঁর অর্থসচিব সৌদি আরবের সঙ্গে একটি চুক্তি করেন— যেখানে মার্কিন নিরাপত্তা-নিশ্চয়তার বিনিময়ে রাজতন্ত্রটির বিপুল তেল-আয় থেকে সঞ্চিত উদ্বৃত্ত অর্থ মার্কিন বন্ডে বিনিয়োগ করা হবে, এবং একই সঙ্গে ওপেক দেশগুলি তেলের দাম ডলারে নির্ধারণে সম্মত হবে। এর ফলে ব্রিটিশ, ফরাসি এবং সর্বোপরি মার্কিন অস্ত্র প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি বিপুলভাবে লাভবান হয়েছে: জিসিসি দেশগুলি সম্মিলিতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক সরঞ্জাম ক্রেতা।[13]

কিন্তু যখন আরব দেশগুলি তাদের তেল বাজারে পৌঁছতেই পারছে না, তখন এই চুক্তির ভবিষ্যৎ কী? ইরান একটি সম্ভাব্য উত্তর দিয়েছে— তারা বন্ধু জাহাজগুলিকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে, চিনা ইউয়ানে টোল ফি দিয়ে।

 

ছয়.

যুক্তরাষ্ট্র–ইজরায়েলের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল তেহরানের ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ চালিয়ে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলতে বাধ্য করা— যেখানে সামরিক ও সরকারি লক্ষ্যবস্তুর পাশাপাশি স্কুল, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাও ধ্বংস করা হয়। ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া ছিল পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে: কুয়েত, বাহরিন, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন ঘাঁটিগুলিতে আঘাত হানা। তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং সস্তা অথচ কার্যকর ড্রোন মার্কিন থাড ও প্যাট্রিয়ট বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে প্রায় নিঃশেষ করে দেয়— যেগুলির প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র শুধু ব্যয়বহুলই নয়, সংখ্যায়ও সীমিত। ডেক্যাপিটেশন হামলায় শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের এক ডজন সদস্য নিহত হওয়ার দুদিনের মধ্যেই ইরান কুয়েতে মার্কিন দূতাবাসে আঘাত হানে; ৩ মার্চ তারা রিয়াধে সিআইএ স্টেশন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরিনে অ্যামাজনের ডেটা সেন্টারগুলিকেও লক্ষ্য করে। পরের দিন, ওমান উপসাগরে মার্কিন বাহিনী ইরানি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করার পর, ইরান কাতারের আল উদেইদ মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়— যা অঞ্চলের বৃহত্তম ঘাঁটি, এবং যেখানে অবস্থানরত ১০,০০০ মার্কিন সেনাকে সরিয়ে নিতে হয়। ১৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র খার্গ দ্বীপে ইরানের সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আঘাত হানলে, ইরান বাগদাদের গ্রিন জোনের একটি আন্তর্জাতিক হোটেলে হামলা চালায়; ১৮ মার্চ ইজরায়েল সাউথ পার্স প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রে আঘাত করলে, পরদিন ইরান হাইফার একটি তেল শোধনাগারে হামলা করে। ২১ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র নাটাঞ্জে বাঙ্কার-ভেদী বোমা ফেলে; তার জবাবে একটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ডিমোনায় আঘাত হানে। ২২ মার্চ ট্রাম্প যখন হুমকি দেন যে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালী না খুললে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিতে হামলা করা হবে, তখন তেহরান জানায় যে তারা পাল্টা হিসেবে গোটা অঞ্চলের জ্বালানি ও লবণাক্ততা-মুক্তকরণ (ডেস্যালিনেশন) কেন্দ্রগুলিকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালাবে।

খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকে, সাসানীয় ইরানের মহান শাসক শাপুর রোমানদের একের পর এক কঠিন পরাজয়ের মুখে ফেলেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের শর্তে একটি শান্তিচুক্তি আদায় করেন। ২৬০ খ্রিস্টাব্দে এডেসার যুদ্ধে শাপুর রোমান সম্রাট ভ্যালেরিয়ানকে বন্দি করেন। ভ্যালেরিয়ান মুক্তির জন্য ধনসম্পদ দিতে চাইলে, একটি শিক্ষণীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী শাপুর নাকি গলিত সোনা ঢেলে তাঁকে হত্যা করেছিলেন। এ কথা আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই যে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনেই— যিনি সব দিক দিয়েই তাঁর পিতার তুলনায় আরও সঙ্কীর্ণমনা— শাপুর নন। তবুও বলা যায়, এই প্রাথমিক পর্যায়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে একপ্রকার অমীমাংসিত অবস্থায় আটকে রাখতে পেরেছে; মার্চের শেষদিকে ট্রাম্প যে কৌশলগত যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেন, তাতে ইরান কিছুটা সফলভাবেই জোর দিয়েছিল যে ইজরায়েলের লেবাননে হামলাও বন্ধ রাখতে হবে।

৮ এপ্রিল যে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়, সেটিকে অনেকেই পরবর্তী দফার সংঘর্ষের আগে এক বিরতি হিসেবেই দেখেছিলেন। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এই নতুন পর্ব শুরু হয় ১৩ এপ্রিল থেকেই, যখন তারা ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ ও প্রস্থানকারী জাহাজগুলিকে লক্ষ্য করে একটি নৌ অবরোধ আরোপ করে— অর্থাৎ সামরিক সমর্থনযুক্ত অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করে। তেহরান এটাকে একরকম যুদ্ধ বলেই বিবেচনা করে এবং যুদ্ধবিরতির সময় সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ আবারও চালু করে। পাশাপাশি, ইসলামাবাদে চলতে থাকা শান্তি-আলোচনা অব্যাহত রাখার শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের এই নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানায়।

 

সাত.

ইরানের আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলেও, যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েলের এলাকাভিত্তিক বোমাবর্ষণ ব্যাপক ধ্বংসসাধন করতে সক্ষম হয়েছে। ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির প্রাক্কালে প্রায় ৩,৫৪০ জন ইরানি নিহত হয়েছিলেন, যাঁদের মধ্যে ১,৬১৬ জন বেসামরিক নাগরিক, এবং তাঁদের মধ্যে ২৪৪ জন শিশু।[14] তেহরানে অবকাঠামোর বড় অংশই ক্ষতিগ্রস্ত, সঙ্গে ৩০০টি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র, ৭৬০টি স্কুল এবং ৪৬,০০০ আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা আঘাতপ্রাপ্ত হয়।[15] সারা দেশে সমস্ত ভারী শিল্প ও অস্ত্র উৎপাদন কারখানাগুলি ধ্বংস হয়ে যায়। অর্থনৈতিক সংকট— যা ইরানি শাসকদের ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের ফলে আরও তীব্র হয়েছিল, তার ফলে গিগ-শ্রমিকদের কাজ বন্ধ হয়ে যায়, এবং প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের কর্মচ্যুতি ঘটে বলে ধারণা।[16]

ট্রাম্পের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার জন্য দেশে সমালোচনার মুখোমুখি হলেও, ৮ এপ্রিল জাতির উদ্দেশে ভাষণে নেতানিয়াহু দাবি করেন যে ইরান আগের চেয়ে দুর্বল এবং ইজরায়েল আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে— যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অভূতপূর্ব অংশীদারিত্ব এবং পেন্টাগনের কাছে ইজরায়েলকে যুদ্ধক্ষেত্রের মিত্র হিসেবে নতুন করে মূল্যায়নের ফলেই— ‘আমাদের বীরত্ব, সাহস ও দক্ষতা’র কারণে। ইরানি ড্রোন হামলায় ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও, ইজরায়েলে এই যুদ্ধ এখনও অত্যন্ত জনপ্রিয়; মার্চের শেষ দিকে এর পক্ষে সমর্থন ছিল প্রায় ৭৮ শতাংশ। তবুও ব্যক্তিগতভাবে অ-জনপ্রিয় নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দেন যে এই যুদ্ধবিরতি কেবল ‘আমাদের সমস্ত লক্ষ্য’ অর্জনের পথে ‘একটি অন্তর্বর্তী স্টেশন’— ‘যে-কোনও প্রয়োজনীয় মুহূর্তে আমরা আবার যুদ্ধ শুরু করতে প্রস্তুত। আমাদের আঙুল ট্রিগারের ওপরেই রয়েছে।’[17]

তবে এই বোমাবর্ষণ অভিযান বিশ্ব-হেজিমনের ওপরও খরচ চাপিয়েছে। যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহেই মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একাধিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে— যদিও অনেক ঘাঁটি আগেই খালি করে নেওয়া হয়েছিল— মার্কিন ঘাঁটির উপস্থিতিই উপসাগরীয় দেশগুলিকে ইরানের প্রতিশোধমূলক আঘাতের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। উন্নত রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ায় সেগুলি পুনর্নির্মাণ করতে বিপুল অর্থ ও বহু বছর সময় লাগবে, ফলে ভবিষ্যৎ সময়ে তাদের তেলক্ষেত্র, বিদ্যুৎ গ্রিড ও লবণাক্ততা-মুক্তকরণ কেন্দ্রগুলির ওপর পাল্টা আঘাতের ঝুঁকি থেকেই যাবে— যেগুলির ওপর পানীয় জলের জন্য বহু মানুষ নির্ভরশীল। এবং এই সবই ইরানি অবকাঠামোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র–ইজরায়েলের হামলার ফলে আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দ্বিতীয়ত, বহু উন্নত ড্রোন ও মানবচালিত বিমান— একটি F-35, একটি E-3 সেন্ট্রি AWACS রাডার বিমান, একাধিক F-15 ও KC-135 জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাঙ্কার, এমনকি একটি A-10 ‘ওয়ারথগ’— আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে বা ভেঙে পড়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর প্রধান বিমানবাহী রণতরী, পারমাণবিক শক্তিচালিত USS Gerald Ford, যা শুরু থেকেই নিকাশি ব্যবস্থার ত্রুটিতে ভুগছিল, অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। সেটা সম্ভবত নিজের ক্রুদের কারণেই, যখন লন্ড্রি-কক্ষে লাগা আগুন ত্রিশ ঘণ্টা ধরে জ্বলেছিল। যদিও ট্রাম্প, তাঁর স্বভাবসিদ্ধ সরল ভঙ্গিতে, মিয়ামির এক ব্যবসায়িক ফোরামে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে এটি ইরানি ড্রোন হামলায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে।[18]

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট দ্রুত বা কম খরচে গোলাবারুদ উৎপাদন করতে হিমশিম খাচ্ছে, ফলে নিজেদের ও মিত্রদের পুনরায় সরবরাহ করতে গিয়ে পূর্ব এশিয়ায় থাকা মজুত থেকেও সরঞ্জাম সরিয়ে নিতে হচ্ছে। অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র চাইলে আরও বেশি ব্যয় করতে পারে: জিডিপির শতাংশ হিসেবে তার সামরিক ব্যয় আজ শীতল যুদ্ধের যে কোনও সময়ের তুলনায় কম। কিন্তু তার উৎপাদনক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। শিল্পের অবক্ষয়, স্বয়ংক্রিয়তার কারণে মধ্যম স্তরের প্রকৌশল দক্ষতার ক্ষয়, এবং শ্রমশক্তির বিভিন্ন স্তরের পরিষেবা খাতে সরে যাওয়া— এই সবই সামরিক-কেইনসীয় প্রণোদনার মাধ্যমে সহজে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে দিচ্ছে।

 

আট.

‘যুদ্ধই রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য’, লিখেছিলেন র‍্যান্ডলফ বর্ন— একজন উদারপন্থী সমালোচক, যিনি ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশের বিরোধিতা করতে গিয়ে ক্রমে র‍্যাডিক্যাল হয়ে ওঠেন। ‘এবং যুদ্ধের সময়েই এই প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃতি সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায়।’[19] ট্রাম্পীয় যুদ্ধনায়কদের কল্পনা এবং পুনরায় অস্ত্রসজ্জার উদ্যোগকে পুনরুজ্জীবিত ও টিকিয়ে রাখতে যে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্র-পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ দরকার— এই দুইয়ের মধ্যে একটি স্পষ্ট ফাঁক দেখা যাচ্ছে; সেই সঙ্গে উৎপাদনের শক্তি ও সম্পর্কের ক্ষেত্রেও, যেগুলিকে শুল্কনীতি কোনওভাবেই বদলাতে পারেনি। আক্রমণের আগে স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও পেন্টাগনে ‘ডজ’ কর্তনের ঘটনাগুলিও একই প্রবণতার দিকেই ইঙ্গিত করে— যুদ্ধের মাঝখানে সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ-সহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের অপসারণের কথা না-ই বা বললাম। আধুনিক যুগের সূচনালগ্নে আর্থিক-সামরিক রাষ্ট্রগুলির আবির্ভাবের পর থেকে সাধারণত যুদ্ধ পরিচালিত ও জয় করা হয়েছে সৈনিক, শিল্পপতি ও আমলাদের দ্বারা— রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, স্ট্রিমিং উদ্যোক্তা, ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট বা বিটকয়েন চাষিদের দ্বারা নয়।

এই অবক্ষয়ের উপরিকাঠামোগত দিকগুলির একটি— যাকে বর্ন বলেছিলেন ‘গণতান্ত্রিক নীতির ধোঁয়াশার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অলিগার্কিক বৈশিষ্ট্য’— প্রকাশ পায় এই সংঘাতে প্রতিটি পর্যায়ে ইজরায়েলের অস্বাভাবিক প্রভাবশালী ভূমিকার মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী যুদ্ধের সিদ্ধান্ত কার্যত তেল আভিভের হাতে ছেড়ে দেওয়া,[20] এবং সেই যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে ইজরায়েলি কৌশল গ্রহণ করা— এ-সব শুধুই মার্কিন রাষ্ট্রের ‘অলিগার্কিক বৈশিষ্ট্য’-এর প্রমাণ নয়, মার্কিন কংগ্রেস, গণমাধ্যম ও উচ্চশিক্ষাক্ষেত্রে ইজরায়েল লবির বিপুল প্রভাবের একটি উদাহরণও বটে।[21] এগুলি একই সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রের বৌদ্ধিক সক্ষমতার অবক্ষয়েরও ইঙ্গিত দেয়: হোয়াইট হাউসের নীতির সমালোচক ইরান-বিশেষজ্ঞদের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।[22] অবশ্যই উইটকফ ও কুশনার পারমাণবিক বিজ্ঞানে অভিজ্ঞ নন; কিন্তু সেটাই মূল কথা— যাতে ইজরায়েলি অবস্থানই অবিকল অনুসরণ করা হয়।

 

নয়.

প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সূচনালগ্নে বদ্রিলার্দ যুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বকে বৈশ্বিক পুঁজির নতুন, নিয়ন্ত্রণমুক্ত প্রবাহের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। ‘যেমন সম্পদ আর তার বাহ্যিক চাকচিক্যে মাপা হয় না, বরং ফাটকা পুঁজির গোপন সঞ্চালনে নির্ধারিত হয়, তেমনি যুদ্ধও আর তার বাস্তব সংঘটনের মাধ্যমে নয়, বরং এক বিমূর্ত, ইলেকট্রনিক ও তথ্যভিত্তিক পরিসরে তার ফাটকাজাতীয় উন্মোচনের মাধ্যমে মাপা হয়— যে একই পরিসরে পুঁজিও চলাচল করে।’[23] চিত্র ও প্রতীকের এই মহান দার্শনিক আজ যদি ট্রাম্পের মতো এক সাম্রাজ্যবাদী ব্যক্তিত্বে যুদ্ধ ও পুঁজির গতির এই তীব্র ত্বরান্বয়ন দেখতেন, তাহলে তিনি কী বলতেন?

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েলের আক্রমণ যেন বাজারের ছন্দে পরিচালিত হয়েছে, টুইটের দ্বারা যার তাল ভেঙে ভেঙে এগিয়েছে। ঊর্ধ্বমুখী শেয়ারবাজারই ৪৭তম প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে বড় সমর্থক। এখন পরিচিত হয়ে ওঠা এক ধাঁচে, ট্রাম্প প্রায়ই যুদ্ধের আসন্ন সমাপ্তির পূর্বাভাস দিতেন, বা আলোচনার দ্রুত অগ্রগতির ইঙ্গিত করতেন— এমন মন্তব্য যা বাজার খোলার আগে বা ব্যবসায়িক সপ্তাহের শুরুতে ‘বাজারকে শান্ত’ করত— তারপর বাজার বন্ধ থাকাকালে ধ্বংসের হুমকি ও আল্টিমেটাম দিতেন, বা সেগুলো স্থগিত করতেন, কিংবা উল্টো করে আক্রমণ চালাতেন— যা পরিস্থিতি অনুযায়ী ঘটত। তিন সপ্তাহের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এই ওঠানামার ভেতর আরেকটি ধারা কাজ করছে: আত্মস্বার্থসিদ্ধি। ২৩ মার্চ, ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনার কথা ট্রাম্প ট্রুথ সোশাল-এ পোস্ট করার কয়েক মিনিট আগেই ৫৮০ মিলিয়ন ডলারের তেল ফিউচার্সে লেনদেন করা হয়েছিল— এবং এটা প্রথমবার নয়।[24] আজকের দিনে বাজার-নিয়ন্ত্রণ নিজেই যেন রাষ্ট্রনীতির মূল উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে, এবং সর্বাধিনায়কের ঘনিষ্ঠরা নিজেদের ‘ইনসাইডার ট্রেডার’ হিসেবে অবস্থান উপভোগ করছে।

আজকের ছবির কথায় আসা যাক। যুদ্ধাপরাধ এখন আর ‘দৃশ্যের সমাজ’-কে কয়েকটি ঝলমলে মুহূর্তের বেশি আটকে রাখতে পারে না। যুদ্ধের প্রথম দিনেই দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি স্কুলে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র (দুবার) আঘাত হানলে ১৫০ জন মেয়ে নিহত হয়। ট্রাম্প তা হালকাভাবে উড়িয়ে দেন— ‘এসব নিয়ে আমি বেঁচে থাকতে পারি।’ কয়েক দিনের মধ্যেই গণমাধ্যমের বড় অংশও সেসব নিয়ে বেঁচে থাকতে শিখে যায়। প্রথম ও দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধে ‘এমবেডেড রিপোর্টার’-দের মাধ্যমে জনসাধারণের জন্য ছবি ও খবর বাছাই করে পরিবেশন করা হত। বর্তমান যুদ্ধে বাস্তব চিত্রের বড় অংশই পশ্চিমি জনগণের চোখ থেকে আড়ালে রাখা হচ্ছে— কিন্তু প্রেসিডেন্টের জন্য তা সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে দু’মিনিটের ‘রিল’-এ, যা এক সহকারী বর্ণনা করেছেন ‘বিস্ফোরণের দৃশ্যের ক্লিপ’ হিসেবে।[25]

 

দশ.

ইরানিরা বর্তমানে তিনটি মার্কিন উপাদানকে নিজেদের পক্ষে কাজ করছে বলে মনে করছে: গোলাবারুদ, বাজার এবং মধ্যবর্তী নির্বাচন।[26] ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ— এবং ট্রাম্পকে নেতানিয়াহু এতে জড়িয়ে ফেলেছেন বলে যে বিস্তৃত ধারণা— তা যে নতুনভাবে জনমত গড়ে তুলছে, এমন বহু ইঙ্গিতই দেখা যাচ্ছে। সমীক্ষা বলছে, এই যুদ্ধটি বিংশ শতকে যুক্তরাষ্ট্র যে সব যুদ্ধ লড়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে কম সমর্থন পেয়েছে: মার্চের মাঝামাঝি এক সমীক্ষায় মাত্র ৪১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এর পক্ষে মত দিয়েছিলেন— স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে তা এক-চতুর্থাংশেরও কম, আর ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এক-দশমাংশেরও নিচে নেমে যায়। এর বিপরীতে, ২০০৩ সালে ইরাকে ‘সামরিক পদক্ষেপ’-এর পক্ষে অধিকাংশ আমেরিকানই সমর্থন জানিয়েছিলেন, এবং ‘শক অ্যান্ড অ’ অভিযানের প্রথম ছয় সপ্তাহে সেই সমর্থন বেড়ে ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল— যখন জর্জ ডব্লিউ বুশ বিমানবাহী রণতরী USS Abraham Lincoln-এর ডেকে ফ্লাইট স্যুট পরে ‘Mission Accomplished’ ব্যানারের নিচে উপস্থিত হয়েছিলেন।[27]

এই বিরূপ মনোভাব এখনও যুক্তরাষ্ট্রে একটি সুসংগঠিত যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়নি। এক ধরনের বৈপরীত্য এখানে কাজ করছে: দেশের ভেতরে সমর্থন তৈরির জন্য কোনও সুপরিকল্পিত প্রচারাভিযানের অভাব হয়তো সেই ধরনের প্রতিবাদ গড়ে ওঠার সময়কেই সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছে, যেমনটি ইরাক যুদ্ধের আগে দেখা গিয়েছিল। এই আপাত নিস্তব্ধতার আরেকটি কারণ হল ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে যে শান্তি আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার ওপর কঠোর দমন-পীড়ন— গাজাকে সমর্থন জানিয়ে সারা দেশের শত শত কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রছাত্রীদের নেতৃত্বে অবস্থান আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। তবুও, এই পরিস্থিতিতে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও, ট্রাম্পের সময়ে মানুষ রাস্তায় নেমেছে। মিনিয়াপোলিসে প্রতিবাদকারীরা কার্যত ‘অপারেশন আরবান সার্জ’-এর ইতি টেনে নিজেরাই শহর থেকে আইসিই-কে তাড়িয়ে দেন; আর মার্চের শেষদিকে দেশজুড়ে ‘নো কিংস’ বিক্ষোভে লক্ষ লক্ষ মানুষ অংশ নেন, যুদ্ধবিরোধী স্লোগান ও দাবিতে মুখর হয়ে ওঠেন— যদিও প্রগতিশীল এনজিও ও শ্রমিক সংগঠনগুলি যে কিছুটা অস্পষ্ট ব্যানারের অধীনে এই কর্মসূচিগুলি সংগঠিত করেছিল, তা হতাশাজনকই বলা যায়।

 

এগারো.

কিন্তু আমেরিকান জনমতে— বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট ও স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে— পরিবর্তনের লক্ষণ যতটা স্পষ্ট, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট নেতৃত্ব বা তথাকথিত ‘ব্লু-স্টেট’ গভর্নরদের ক্ষেত্রে তেমনটা দেখা যায় না। আজ এই দলীয় কাঠামোটিই এক মৌলিক দিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ এটি ক্রমশই শুধু নিজেদের সমর্থকভিত্তির কম রক্তাক্ত পররাষ্ট্রনীতির আকাঙ্ক্ষাকেই নয়, বরং ভোটদানে সক্ষম প্রাপ্তবয়স্কদের সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছাকেও আটকে দিচ্ছে। ফলে, ট্রাম্প এবং তাঁর যুদ্ধের অ-জনপ্রিয়তাকে ডেমোক্র্যাটরা কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট কারণ রয়েছে— এমনকি যদি ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারায়ও, যেমনটি এখন অনেকেই পূর্বাভাস দিচ্ছেন। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রতিটি নতুন মোড়ে, প্রতিটি বেআইনি দস্যুবৃত্তি ও দমনমূলক পদক্ষেপে, বর্তমান বা প্রাক্তন কোনও না কোনও ডেমোক্র্যাট রাজনীতিক বা কর্মী সেই পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছেন— যদিও সব সময় তা অর্জনের পদ্ধতিকে নয়।

এই সহযোগিতার চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বিরোধী দলের— অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটদের— ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধের প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে বিরোধিতার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতির মধ্যে দিয়ে। যুদ্ধ শুরুর আগের আট দিনে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’-এর পর মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় নৌবহর জড়ো করছিল এবং তা ব্যবহারের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছিল, তখন ডেমোক্র্যাটরা কিছুই করেনি। যুদ্ধক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাব (War Powers Resolution)-এ ভোটের জন্য চাপ নাকি পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্যরাই যুদ্ধ শুরুর পর পর্যন্ত পিছিয়ে দেন; আর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, প্রতিনিধি পরিষদে সেই প্রস্তাবটি ঠিক যতজন ডেমোক্র্যাট বিরোধিতা করেছিলেন (চারজন), তাতেই তা ব্যর্থ হয়। সেনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার-এর এক জ্যেষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতি সহকারীর মতে, অনেক এইপ্যাক-সমর্থিত ডেমোক্র্যাটের পছন্দসই ফলাফল ছিল ঠিক এটিই— ট্রাম্প একতরফাভাবে পদক্ষেপ নেবেন, ‘ইরানকে দুর্বল করবেন, আর মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়ার বোঝা নিজের কাঁধে নেবেন।’[28] এমনকি যাঁরা War Powers Resolution-এর পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, সেই শীর্ষ ডেমোক্র্যাটরা ‘আমেরিকান সৈন্যদের নিরাপদ রাখার’ জন্য ৫০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত বরাদ্দ বিলকে সমর্থন করার ব্যাপারে নিজেদের ‘খোলা মনোভাব’-এর ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন।[29] শুমার দুই দলের মধ্যেই ইরানবিরোধী কঠোর অবস্থানের অন্যতম প্রবক্তা; জনসমক্ষে তাঁর যুদ্ধ-সমালোচনা সীমাবদ্ধ থেকেছে ‘এই হামলাগুলির উদ্দেশ্য কী’— এই ধরনের ‘গুরুত্বপূর্ণ বিস্তারিত তথ্য’-এর দাবি তোলায়। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তিনি একটি ইহুদি গোষ্ঠীকে আশ্বস্ত করেছেন যে তাঁর কাজ হল ‘ইজরায়েলের যা যা সাহায্য দরকার, তার জন্য লড়াই করা।’[30]

 

বারো.

পরিস্থিতি আরও তীব্র হলে হয়তো গতিপথ বদলাতে পারে, কিন্তু এই লেখার সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েলের আক্রমণ ইরানকে একটি সামরিক শক্তি হিসেবে ধ্বংস করতে পারেনি; ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতেও ব্যর্থ হয়েছে; এমনকি হরমুজ প্রণালী খুলে দিয়ে আগের অবস্থায় ফিরিয়েও আনতে পারেনি। প্রস্তাবিত ইরানি কুর্দি বিদ্রোহ ভেস্তে যায়, যদিও এর জেরে এরবিলে আইআরজিসির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বৃষ্টি নেমেছিল।[31] ইসফাহানের দক্ষিণে বিশেষ বাহিনীর একটি ঘাঁটি স্থাপনের চেষ্টা— সম্ভবত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম চুরি করার উদ্দেশ্যে— শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়; এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী নিজেদের বিমানই ধ্বংস করতে বাধ্য হয়, যা ‘সংবাদ-নিষেধাজ্ঞা’-র আড়ালে বিশ্বস্ত আমেরিকান গণমাধ্যমের সহায়তায় গোপন রাখা হয়েছিল।[32]

ওমান উপসাগর অবরোধ করে ট্রাম্প আসলে তার জেনারেলদের পরামর্শই অনুসরণ করছেন— যুদ্ধের শুরুতেই তাঁরা এই ‘সংযত বিকল্প’ প্রস্তাব করেছিলেন, কারণ তাঁদের মতে ইরানি অর্থনীতিই শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে দুর্বল দিক। কিন্তু এর প্রভাব পড়তে বহু বছর সময় লাগবে; ততদিনে তেলের দাম বাড়বে, মুদ্রাস্ফীতি স্থায়ী রূপ নেবে— আর ইরান তুরস্ক, ককেশাস বা পাকিস্তানের মতো একাধিক স্থলপথে আমদানি ঘুরিয়ে নেবে। আরিগির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের হাতে এখনও অনেক বিকল্প রয়েছে: খার্গ দ্বীপ বা অন্য কৌশলগত এলাকা ও তেলকেন্দ্র দখলের চেষ্টা; আরও বোমাবর্ষণ বা শাসক-স্তরের হত্যাকাণ্ড; ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখল; কিংবা হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েমের চেষ্টা।[33] কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি আরও গভীর সমস্যায় জড়িয়ে পড়বেন: স্থলপথে শক্তিশালী সামরিক হস্তক্ষেপ মানেই মার্কিন হতাহত বাড়বে, যা MAGA সমর্থকদের মধ্যেই অসন্তোষ বাড়াবে; আর হরমুজ প্রণালী না খুলে ওমান উপসাগরের অবরোধ দীর্ঘায়িত করা মানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বাড়ানো। ইরানে শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ উস্কে দেওয়ার বদলে, এই যুদ্ধ বরং আগে মনোবলহীন হয়ে পড়া ধর্মীয় সমর্থকভিত্তিকেই নতুন করে উজ্জীবিত করেছে— যারা এখন তেহরান-সহ বড় শহরগুলিতে রাত্রিকালীন মোটরকেড, পতাকা ও সামরিক সঙ্গীতের মাধ্যমে রাস্তাগুলির দখল নিয়েছে।

 

তেরো.

এই সবকিছুর শেষ কোথায়? যুক্তরাষ্ট্রের আগের উপসাগরীয় যুদ্ধগুলির অপ্রত্যাশিত গতিপথগুলি এখানে মনে করা যেতে পারে। ১৯৯১ সালে জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ— সিআইএ-র প্রাক্তন প্রধান এবং পুরনো ক্ষমতাকেন্দ্রের এক অভিজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তি— এমন একটি যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন, যাকে আজও অনেক সাম্রাজ্যপন্থী ‘নিখুঁত যুদ্ধ’ বলে মনে করেন।[34] সাদ্দাম হুসেনের কুয়েত দখলের প্রচেষ্টার প্রতি প্রথমে নীরব সম্মতি জানিয়ে, ওয়াশিংটন পরে সেটিকেই আন্তর্জাতিক ক্ষোভের বিষয় হিসেবে তুলে ধরে; তারপর ছয় মাস ধরে একটি বৈশ্বিক মিত্রজোট গঠন করে, গর্বাচেভ ও শেভার্দনাদজে-সহ আরব নেতাদের প্রতিও সূক্ষ্ম কূটনৈতিক সৌজন্য দেখায়, একই সঙ্গে ইসরায়েলকে এই সংঘাতের বাইরে রাখে— যাতে ইরাকের সঙ্গে আরব ভ্রাতৃত্ববোধ উসকে না ওঠে; আরব উপদ্বীপ জুড়ে মার্কিন বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি আদায় করা হয়; এবং সাদ্দামের পিছু হটা পদাতিক বাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মের ‘স্মার্ট মিসাইল’-এর প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

কিন্তু এই নিখুঁত পরিকল্পনার শেষ পরিণতি কী? বুশ সাদ্দামকে উৎখাতের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি আরও সতর্ক নীতিতে ফিরে যান— সাদ্দামকে সামরিকভাবে দুর্বল করা হবে, কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে দেওয়া হবে। যদিও সিআইএ-র সমর্থনে এক ইরাকি শিয়া বিদ্রোহ শুরু হয়, যা বাগদাদ নির্মমভাবে দমন করে। ফলে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত ইরাকের বিরুদ্ধে এক দশকব্যাপী অর্থনৈতিক যুদ্ধের সূচনা হয়ে দাঁড়ায়— রাষ্ট্রপুঞ্জের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও শিশু অপুষ্টির মাধ্যমে, যার সঙ্গে ক্লিনটন ও ব্লেয়ারের আমলে অ্যাংলো-আমেরিকান বোমাবর্ষণও যুক্ত হয়।[35] এই সময়ে ওয়াশিংটনের নব্য-রক্ষণশীলরা ‘কাজটা শেষ করতে হবে’— এই দাবিকে ক্রমশ জোরালো করতে থাকে। এর পরিণতি হয় দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ: ২০০৩ সালে জুনিয়র বুশ ও ব্লেয়ারের নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণ। এর পরে আট বছর ধরে সামরিক দখলদারিত্ব চলে, যতদিন না ওবামা মনে করেন মার্কিন বাহিনীকে ‘দিগন্তের ওপারে’— বাহরাইন ও কাতারের ঘাঁটিতে— সরিয়ে নেওয়াই শ্রেয়। কিন্তু এরপরই আবার বোমাবর্ষণ শুরু হয়, যখন ইরাকের সুন্নি প্রতিরোধ শক্তি রূপান্তরিত হয়ে ISIS-এ পরিণত হয় এবং মসুলকে কেন্দ্র করে একটি খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে।

১৯৯১ থেকে ২০২৬-এর মধ্যে মার্কিন কূটনৈতিক সৌজন্য ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের যে অবনতি ঘটেছে, এবং ইজরায়েলের ভূমিকার যে পরিবর্তন— একসময় বিব্রতকর আনুষঙ্গিক শক্তি থেকে এখন উদ্যোগী ও সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী— তা আর আলাদা করে ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না।[36] এই ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তগুলির প্রধান শিক্ষা— আরিঘির ভাষায় ‘সিগন্যাল ক্রাইসিস’— হল এদের অপ্রত্যাশিত দীর্ঘস্থায়িত্ব। ট্রাম্প হয়তো এই পর্যায়টাকে বন্ধ করতে পারেন, অথবা নতুন করে উত্তেজনা বাড়াতে পারেন; কিন্তু ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েলের যে ইরান যুদ্ধ তিনি শুরু করেছেন, তা তাড়াতাড়ি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

 

_____

[1] মার্কসকে যে পংক্তিগুলি উদ্দীপিত করেছিল বলে মনে করা হয় তার একটি পাওয়া যায় হেগেলের লেকচারস অন দ্য ফিলোসফি অফ হিস্ট্রি-র ১৮৩৭ সংস্করণে: “মানুষের মতে যদি কোনও ক্যু-দে-তা পুনরাবৃত্ত হয়, তবে তা বৈধতা পেয়ে যায়। ফলে, নেপোলিয়ন দুবার হেরেছিলেন এবং বার্বনদের দুবার তাড়ানো হয়েছিল। এই পুনরাবৃতির মধ্যে দিয়ে শুরুতে যাকে নিছকই আকস্মিক এবং সম্ভব বলে মনে হয়েছিল, সেটাই বাস্তব এবং প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।”
[2] অষ্টাদশ ব্রুমেয়ার এবং পরে ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ-তে মার্কস সাম্রাজ্যবাদের ইঙ্গিত দিতে এটিকেই ব্যবহার করেছিলেন। যদিও তখনও ঔপনিবেশিক ধারণা আসেনি, সেটি পরে যুক্ত হয়, তবুও, তা অভিযাত্রী হিসেবে কিছু অর্থ অবশ্যই বহন করে: “এবং সম্রাটের ভূমিকায় অবতীর্ণ বোনাপার্টের সঙ্গে তাঁর নিজের ভাগ্যপরীক্ষার অভিযাত্রায় নামা ভূমিকাটি এতই ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত যে সাম্রাজ্যকে সংহত করতেই তিনি অবতীর্ণ হয়েছেন— এই মহান ধারণাটির সঙ্গে সঙ্গেই চলে আসে অন্য অমোঘ ধারণাটি— এটি আসলে তাঁর ঋণ পরিশোধের জন্য ফরাসি জনগণের মিশন।” Karl Marx, ‘The Eighteenth Brumaire of Louis Bonaparte’, in Karl Marx, Surveys from Exile, ed. David Fernbach, London and New York 2010 [1973], p. 185.
[3] “একের পর এক প্রশাসন এই বিশ্বাস দৃঢ় করে তুলেছে যে ইরানের বিরূপ কাজকর্মের কোনও তুলনা হয় না, গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন স্বার্থের জন্য সেগুলি গুরুতর হুমকিবিশেষ, এবং বলপ্রয়োগ ফলত ন্যায়সঙ্গত।” Robert Malley and Steven Wertheim, Of Course Trump Bombed Iran, New York Times, 5 March 2026.
[4] ১৯৮০-র দশকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের জন্য ইউরোপীয় প্রচারাভিযানের সময় জাতীয় প্রতিরক্ষা-কৌশল হিসেবে পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনের বৈধতা নিয়ে রেমন্ড উইলিয়ামস যা বলেছিলেন, তা এখনও প্রযোজ্য। যেমন তিনি বলেছিলেন: “আমরা যারা পারমাণবিক অস্ত্রের এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিরোধিতা করছি, তারাও, এক মুহূর্তের জন্যও, সরাসরি আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকার জন্য মানুষের স্বাভাবিক এবং সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করতে পারি না, এমনকি প্রশ্ন করতেও পারি না।” The Politics of Nuclear Disarmament. NLR I/124, November-December 1980, p. 32. এনপিটি-র ইতিহাস এবং রাজনীতি নিয়ে দেখুন: Susan Watkins, The Nuclear Non-Protestation Treaty, NLR 54, November-December 2008.
[5] শেষ সাত বছরে মার্কিন, রাষ্ট্রপুঞ্জ এবং ইইউ-এর নিষেধাজ্ঞার কারণে মুদ্রাসংকট, মুদ্রাস্ফীতির দ্রুত উল্লম্ফন, প্রকৃত মজুরিব্যবস্থা ধসে পড়া, অবকাঠামো ভেঙে পড়া এবং শিল্পীয় উৎপাদনের ক্রমাবনতির মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতি পুরো ভেঙে পড়ে। মধ্যবিত্তরা চূড়ান্ত সংকটে পড়ে এবং গরিবরা অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হয়। Ervand Abrahamian, Iran under Fire, NLR 157, January-February 2026, p. 46.
[6] ইরানের জনপ্রিয় অভ্যুত্থানের প্রতি ধ্বংসাত্মক অলঙ্কার এবং অবিশ্বাস্য তলবের যে মিশ্রণ ব্যবহার করে ট্রাম্প যুদ্ধে নেমেছিলেন তা জানার জন্য দেখুন: Trump’s Full Statement on Iran Attacks, PBS News, 28 February 2026.
[7] Ali Harb, Trump Says He Must Be “Involved” in Choosing Iran’s Next Supreme Leader, Al-Jazeera, 5 March 2026.
[8] David Smith, “A Very Dangerous Person”: Alarm as Pete Hegseth Revels in Carnage of Iran War, Guardian, 8 March 2026.
[9] দেখুন: Thomas Hippler, Governing from the Skies: A Global History of Aerial Bombing, London and New York 2017, p. 3; Marilyn Young, The Vietnam Wars 1945-1990, New York 1991, pp. 130, 140.
[10] Madhumita Murgia et al., The AI-Driven Kill Chain Transforming How the US Wages War, Financial Times, 11 March 2026. আরও দেখুন: Michael Sherry, The Rise of American Air Power: The Creation of Armageddon, New Haven 1987.
[11] “খামেনেই কেবল ইরান রাষ্ট্রের প্রধান ছিলেন না, তিনি বিশ্বের সমস্ত শিয়াদের কাছে এক ধর্মীয় প্রতীক। আমেরিকানদের এ নিয়ে ভাবা উচিত ছিল, এবং তারা যে তা করেনি তা প্রকৃতই উদ্বগের বিষয়। এটা যে ইরাকের দশগুণ কিছু হতে চলেছে এই ঘটনা তার প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত।” Gen. Richard Shirreff, Andrew Marr Tonight, LBC Radio, 4 March 2026.
[12] ফাতিহ্‌ বিরোল-এর উদ্ধৃতি দেখুন: Malcolm Moore, Iran War Is the Greatest Threat to Global Energy “In History”, Warns IEA, FT, 20 March 2026; আরও দেখুন: Malcolm Moore, Countries Must Not Hoard Fuel during Iran War, Warns IEA, FT, 5 April 2026. এর মধ্যে, যেটা হয়তো আরও একটি ঐতিহাসিকভাবে প্রথম ঘটনা, শান্তির সময়ে হোয়াইট হাউস ইরানি তেলের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে রেখেছিল, যুদ্ধের প্রথম মাসে তা তুলে নেয়। একটি হিসেব অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে ইরান প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি তেল রপ্তানি করেছে এবং সেই তেল বাবদ ব্যারেল-প্রতি দ্বিগুণ উপার্জন করেছে।
[13] ২০১৭ সালে সৌদি আরব একাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘ইতিহাসের সর্ববৃহৎ অস্ত্রচুক্তিতে স্বাক্ষর করে’ যার অর্থমূল্য ছিল ৩৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। টম স্টিভেনসন দেখিয়েছেন ওয়াশিংটন এবং লন্ডনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর মাধ্যমে জিসিসি রাষ্ট্রগুলিকে তাদের ওপর আরও নির্ভরশীল করে তোলা গেছে, যেহেতু ‘প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং যন্ত্রাংশ কেবলমাত্র উৎস দেশগুলিই সরবরাহ করবে।’ দেখুন: What Are We There For?, LRB, vol. 41, no. 9, May 2019. নিউ ইয়র্ক এবং লন্ডনের মাধ্যমে পেট্রোডলারের রিসাইক্লিং শুধু অস্ত্রব্যবসাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আর্থিক সম্পদ, রিয়াল এস্টেট, এয়ারলাইনস, লাক্সারি ব্যান্ড, এমনকি ফুটবল ক্লাব পর্যন্ত বিস্তৃত।
[14] Nayera Abdallah, How Many People Have Been Killed in the US-Israel War on Iran since the Conflict Began?, Independent, 7 April 2026.
[15] Leanne Abraham et al., How the US-Israeli Strikes on Iran Have Damaged Schools and Hospitals, NYT, 9 April 2026.
[16] Behrang Tajdin, Iran Sees Mass Redundancies from War with US and Israel, BBC News, 21 April 2026.
[17] যথাক্রমে দেখুন: Statement by PM Netanyahu, 8 April 2026, Israeli government website-এ উপলন্ধ; Mariav Zonszein, For Israel, War Is the Only Answer, NYT, 13 April 2026; Aaron Boxerman, Netanyahu Says War with Iran Is “Not Yet Over”, NYT, 12 April 2026. সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইরান ইজরায়েলে যে ৬৫০টি ক্ষেপণাস্ত্র মেরেছে তার মধ্যে ৬৬টি জনবসতিপূর্ণ এলাকায় আঘাত হেনেছে। ২৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, ৭০০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন, এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৫,৫০০ জনেরও বেশি। দেখুন: Emanuel Fabian, The War in Numbers: 650 Iranian Missiles Fired; 24 Killed in Israel, West Bank; 10,800 Israeli Strikes, Times of Israel, 10 April 2026.
[18] Donald Trump, Address to the FII Institute, Miami, 27 March 2026.
[19] Randolph Bourne, ‘The State’, in Untimely Papers, New York 1919, p. 193.
[20] রুবিওর কথা অনুযায়ী ইজরায়েলের ইরান যুদ্ধে অংশ নেওয়া ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আর কোনও উপায়ই ছিল না, কারণ সম্ভাব্য ইরানি প্রত্যুত্তর থেকে নিজেদের সুরক্ষা আগেভাগে নিশ্চিত করতে হত। পড়ুন: Chris Stein, US Strikes on Iran Triggered by Israel’s Plan to Launch Attack, Rubio Says, Guardian, 3 March 2026.
[21] Stephen Walt and John Mearsheimer, The Israel Lobby, New York, 2007.
[22] Ervand Abrahamian, Iran under fire, NLR 157, p. 54.
[23] Jean Baudrillard, The Gulf War Did Not Take Place, Bloomington ID 1991, p. 56.
[24] George Steer, Amelia Pollard and Malcolm Moore, Traders Placed $580 million in Oil Bets Ahead of Donald Trump’s Social Media Post on Iran Talks, FT, 23 March 2026.
[25] Katherine Doyle et al., Inside Trump’s Daily Video Montage Briefing on the Iran War, NBC News, 25 March 2026.
[26] ড্রপসাইট-এর জেরেমি স্কাহিলের সঙ্গে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ানের কথোপকথন: As Trump’s Narrative on Negotiations Flails, Iran Is Setting Its Own Terms for Ending the War, Dropsite, 27 April 2026.
[27] Carroll Doherty and Jocelyn Kiley, A Look Back at How Fear and False Beliefs Bolstered us Public Support for War in Iraq, Pew Research Center, 14 March 2023.
[28] Aída Chávez, Top Democrats Try to Stop Vote That Would Put Them on Record for Trump’s Iran War, Capital and Empire, 24 February 2026. ওয়ার পাওয়ার রেজোলিউশনটি ২১২-২১৯ ভোটে হেরে যায়; যদি ওই চারটি ভোট উল্টোদিকে পড়ত, তবে এটি ২১৬-২১৫ ভোটে জিতে যেত।
[29] Jennifer Scholtes and Katherine Tully-McManus, Lawmakers Anticipate Trump Will Seek Emergency Funding for “Open-Ended” Iran War, Politico, 3 March 2026.
[30] একটি রিপোর্ট থেকে একটি প্রহসনের কথা জানা গেছে। এলিজাবেথ ওয়ারেন, টিনা স্মিথ, ক্রিস মারফি-সহ সেনেট ডেমোক্র্যাটদের একটি সিগন্যাল চ্যাট-এর নাম হল ‘ফাইট ক্লাব’। কিন্তু তাঁরা নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ‘চাক চাক [শুমার]’-এর কোনও চেষ্টা করছেন না। পড়ুন: Siobhan Hughes, Growing Frustration with Chuck Schumer Spurs Talk of Replacing Him, WSJ, 20 March 2026.
[31] US-Israeli Plan for Kurdish Invasion of Iran Reportedly Collapsed Amid Leaks, Distrust, Times of Israel, 29 March 2026.
[32] ইরানের প্রেস টিভি-র ভাষ্য জানতে দেখুন: Step-by Step Inside the Failed US Raid on Isfahan, According to Iranian Media, Palestine Chronicle, 7 April 2026. আর মার্কিন বয়ান জানতে দেখুন: Greg Jaffe et al., A Harrowing Race against Time to Find a Downed US Airman in Iran, NYT, 5 April 2026.
[33] Trump Blockades the Blockaders in Iran, WSJ, 13 April 2026; Richard Haas, Niall Ferguson and Philip Zelikow, How to Stop Iran from Winning the War, Free Press, 9 April 2026.
[34] উদাহরণস্বরূপ, কুইন্সি ইনস্টিটিউটের আলোচনায় মোনিকা ডাফি টফট-এর কথা দেখুন: Grand Strategy Implications of Trump’s Iran Debacle, 23 April 2026.
[35] Tariq Ali, Throttling Iraq, NLR 5, September-October 2000.
[36] প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের তুলনায় দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগীদের থেকে বিনম্র সমর্থন আদায় করার ক্ষমতা যে কমছে, চামার্স জনসন সেটা দেখিয়েছিলেন এবং বিষয়টিকে হেজিমনির ক্ষয়িষ্ণুতার লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। The Sorrows of Empire: Militarism, Secrecy and the End of the Republic, London 2004, pp. 25, 307.

 

 

____

*নিবন্ধটি নিউ লেফট রিভিউ ১৫৮-র সম্পাদকীয় নিবন্ধ

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5395 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...