মধুলিকা সামন্ত
মারজেনের গল্প, কোনও পাতায় বা ফিল্মে পাঠক বা দর্শককে আটকে যেতে দেয় না। তরতর করে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। অথচ গল্প কিন্তু— “তারপর তারা সুখে জীবন কাটাতে লাগল”— বলে শেষ হয় না। পার্সেপলিস কমিকে গল্প বলার চলন, খানিকটা একরৈখিক হলেও, ফিল্ম সেরকম নয়। এক নতুন ধরনের গল্প বলার ধরন দেখি Chicken with Plums-এ। আর তাঁর করা ইলাস্ট্রেশন? বহু জায়গায় সে কাব্যের মর্যাদা পেয়েছে
অনেক অনেক কাল আগে, মানে সত্যিই অনেক কাল না অল্পকাল— কে জানে! না হলেও প্রায় ২৫০০ বছর আগের কথা। উত্তর-পশ্চিম ইরানের ফার্স প্রদেশের এক শহর ছিল— যাকে সেই সময়ের গ্রিকরা নাম দিয়েছিল পার্সেপলিস। অর্থাৎ কি না, পার্সদের শহর, বা পারসদের শহর। এই নামেই নাকি শেষপর্যন্ত দেশটার নাম দাঁড়ায় পারস্য। শহরটা আদতে এমন কিছু বড় নয়, বেশি কিছু তার বাহুল্যও নেই। কিন্তু সেই সময়ের আকিমেনীয় সম্রাট দারায়ুস কেন জানি এই শহরকেই পারসিকদের আনুষ্ঠানিক রাজধানী বানালেন। সেই থেকে এই শহর পারস্য কিংবা অধুনা ইরানের মানুষের আত্মপরিচয়ের অন্যতম চিহ্ন হয়ে উঠল।
এর পর যদিও জল অনেক অনেক সীমান্ত, অনেক অনেক বছর অতিক্রম করেছে। ওই বলছিলাম না, অনেক কাল না কি অল্পকাল! গত দুশো বছর ধরে, আমরা যাকে পারস্য বলি, তার পরিবর্তনও কম হয়নি। অষ্টাদশ শতক থেকে এই অঞ্চলে যারা রাজত্ব করছিল সেই রাজবংশের নাম ছিল কাজার। তারা এই দেশকে পারস্যই বলত। ১৯২৫ সালে এক ক্যুর মাধ্যমে এই বংশের পতন ঘটে। এর পেছনে আমেরিকা, ব্রিটেন অর্থাৎ সেই সময়ের মিত্রশক্তির বিশেষ ইন্ধন ছিল। ইন্ধন বললে আসলে কমই বলা হয়। তারাই প্রকৃতপক্ষে এই ঘটনার পেছনে ছিল। এর ফলে যিনি ইরানের নতুন শাসক হয়ে বসেন, তার নাম রেজা শাহ পাহলভি। ১৯৩৫ সালে এই রাজা বা শাহ, পারস্যের নতুন নামকরণ করেন, ইরান। ইরান সে দেশের নতুন নাম হলেও, দেশের মানুষের মনে পারস্যের প্রাচীন আলোর রেশ মুছে যায়নি। এর পর সামান্য সময়ের জন্য সে দেশে এক ধরনের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত মোসাদ্দেক নামে এক নেতা ১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রধানমন্ত্রিত্ব করেন। মোসাদ্দেক দেশের বহুমূল্য তেলের খনিগুলো জাতীয়করণ করেন। কিন্তু পশ্চিমি মিত্রশক্তি, যাদের তেল নিয়েই সব আগ্রহ অথবা কী করে সেগুলো সহজে হাতানো যায়— এই যাদের দিনরাত চিন্তা, তাদের পক্ষে মোসাদ্দেককে মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন হয়ে দাঁড়াল। সুতরাং ১৯৫৩ সালে রেজা শাহের ছেলে মহম্মদ রেজা শাহ মার্কিন মদতে আরেকটি ক্যু-র মাধ্যমে ফের ক্ষমতায় এলেন। তেল নিয়ে নানা টানাটানি, ব্যর্থ স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতির দুর্গতি, আর ব্যক্তিস্বাধীনতার অবলোপের মধ্যে দিয়ে এক টালমাটাল উত্তাল সময়ের শেষ হল ১৯৭৯ সালের ইসলামীয় এবং বামপন্থী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। বদলে গেল ইরান। দৃঢ় হয়ে চেপে বসল ইসলামীয় মৌলবাদের শাসন। বামপন্থীদের একে একে নিশ্চিহ্ন করা হল। ব্যক্তিস্বাধীনতা মুছে গেল দেশ থেকে। ‘নারী’ শব্দ যেন ভোগ্যপণ্যের সমার্থক হয়ে দাঁড়াল। যে ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য এত লড়াই, সেই ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন রাষ্ট্রের কাছে অবাঞ্ছিত হয়ে দেখা দিল। চিরকালই যেমনটা দেখা দেয়। এর ওপর ইরাকের সঙ্গে দীর্ঘ আটবছর ব্যাপী যুদ্ধ।
ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাস নিয়ে এত কথা কেন?
কারণ ইরানের মানুষ এত কিছু সত্ত্বেও তাদের পারসিক জীবনের অস্তিত্ব সম্ভবত বিস্মৃত হয়নি! এরপর একেবারে ঝাঁপ দিয়ে পড়ি কালের সমুদ্রে, আবারও।
সময়টা ২০০০। এই বছর প্যারিস থেকে একটি বই বের হল। বইয়ের লেখিকা একজন পারসিক বা বর্তমানকালের ইরানি। তাঁর নাম মারজেন সাত্রাপি (Marjene Satrapi. বাংলায় তাঁর নামটির হয়তো সঠিক transliteration হল না। তাঁর নামের শেষ অংশটা শুনলেই ভারতের বা ইরানের ইতিহাসপাঠকদের মনে একটি সংস্কৃত শব্দ আনাগোনা করবে। শব্দটি হল ‘ক্ষত্রপ’। অর্থাৎ প্রাদেশিক স্তরের একটি শাসন এককের অধিকারী। এই ধারণা সম্ভবত ভুল নয়, কারণ মারজেন নিজেই তাঁর লেখায় লিখেছেন যে তাঁরা ইরানের শেষ কাজার সম্রাটের বংশধর। বাস্তবিকই মারজেনের বংশ এক পুরনো অভিজাত পারসিক পরিবারের ধারক ও বাহক)। বইটি বের হওয়ার পরই সেটি বিপুলভাবে সমাদৃত হয়। বেশ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়, যার মধ্যে ইংরেজি অন্যতম। বইটিকে সকলে গ্রাফিক নভেল বলে চিহ্নিত করলেও, মারজেন একে কমিক বলতে পছন্দ করতেন, The Gurdian-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সে-কথা জানিয়েওছিলেন। আমাদেরও তেমনই মতামত।
এ এক অত্যাশ্চর্য গল্পের বই। বইটির প্রথম খণ্ডের ইংরেজিতে নাম হল Persepolis: The Story of a Childhood। পুরো বইটিই সাদা-কালো ছবিতে আঁকা। আর সবচেয়ে আশ্চর্য যা, তা হল এই ছবিগুলোয় এক ধরনের flatness মানে যাকে দ্বিমাত্রিকতা বলা চলে, সেটাই রয়েছে। অথচ, একটু পড়তে শুরু করলেই মানুষের মন, এর পাতাগুলির মধ্যে চরিত্রের মধ্যে হারিয়ে যায়। তার দ্বিমাত্রিকতা যে কোথায় লুকোয়, তা আর খেয়াল থাকে না। বরঞ্চ এই দ্বিমাত্রিকতার এক অদ্ভুত মজা পাঠককে ঘিরে ধরে। সাদা-কালোয়, সাদা-কালোর বাইরের এক দুনিয়া সামনে এসে দাঁড়ায়— যার অনেক রং, অনেক রস, অনেক নেশা।
এই বইয়ের মুখবন্ধে, মারজেন পারস্য আর পারসিকদের সেই সুদূরকালের গর্ভ থেকে এক দীর্ঘ যাত্রার কথা বলেছেন। রাজনীতির প্রবল প্রকোপে, বাইরের দুনিয়ার কাছে, প্রধানত পশ্চিমি মিডিয়ার দৌলতে যখন ইরানি বা এই পারস্যের মানুষরা কেবল সাদা-কালোয় আঁকা, ইসলামীয় সন্ত্রাসবাদী আর প্রতিবাদী উদারনীতিকের টানাপোড়েনে সীমাবদ্ধ, সেখানে, দারাউয়সের পুরনো পার্সেপলিস, পারস্যের অদ্ভুত রহস্যময় অতীতে ঘেরা এক পুরো নতুন আত্মপরিচয় নিয়ে ইরানের মানুষের মনে ভেসে বেড়ায়। সে পরিচয় দ্বিমাত্রিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। এখানেই এই ছবিগুলি সার্থক সৃষ্টি হয়ে বিশ্বের দরবারে নিজের দাবি নিয়ে হাজির হয়।
কমিক বললেই, হাস্যরসবহুল, মানুষের শরীরের বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কিছুটা অতিরঞ্জিত রূপের কৌতুকময় বা রোমহর্ষক অভিযানে ভরা গল্প অথবা দৈনন্দিন সংবাদপত্রের ছোটখাটো টুকরো হাসির সঙ্গে আমরা পরিচিত ছিলাম এককালে। এর মধ্যে টিনটিন, অ্যাসটেরিক্স, ব্যাটম্যান, স্পাইডানম্যান, মুজ মিলার, হাগার দ্য হরিবল, হেনরি, ডেনিস দ্য মেনাস থেকে আমাদের বাংলার বাঁটুল দি গ্রেট, নন্টে ফন্টে এমনকি শরদিন্দুর কাহিনি অবলম্বনে সদাশিবের কাণ্ডকারখানা মায় ফেলুদা— কে নেই! জাপানি মাঙ্গা কমিকস-কেও ভুললে চলবে না। এসবের মধ্যে একটা জিনিস বিশেষ লক্ষণীয়। এগুলির প্রত্যেকটিই সম্ভবকে অসম্ভবের দুনিয়া থেকে লুট করে এনে এক রঙিন শেষের সন্ধান দেয়। হয়তো বাস্তব জীবনে তেমন ঘটনা ঘটার বিশেষ অবকাশ থাকে না। তবুও শিশু বা কিশোরপাঠ্য বলে কমিককে দাগিয়ে দিতে আমাদের ইচ্ছা করে না। যা সার্থক সাহিত্যসৃষ্টি, তা তো সকলের। কিন্তু কমিক দুনিয়ার অসম্ভাব্যতা, হয়তো রূপকথাকে মনে করায়। তবে সব জীবনেই কি সম্ভাব্যতার বেড়াজাল কাটিয়ে রূপকথা লুকিয়ে থাকে না? এমন সব সাধারণ জীবনের গল্প নিয়ে যেসব ছবির বই, আজকাল তাকে গ্রাফিক নভেল বলি আমরা। তাই পার্সেপলিস-কে সবার গ্রাফিক নভেল বলার ইচ্ছা। কিন্তু সত্যিসত্যিই পার্সেপলিস, গ্রাফিক নভেল বলতে যা বুঝি, তার চেয়ে একেবারেই আলাদা। এর ইলাসট্রেশন, আলো আর অন্ধকার, আর তার মাঝের বহু কিছু নিয়ে আমাদের সামনে হাজির। ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজনীতি, মানুষ, তার দৈনন্দিন জীবন, বিভিন্ন চরিত্রের নানা মাত্রা আর ওঠাপড়া, সবকিছুর এক উজ্জ্বল চলচ্চিত্র পার্সেপলিস। অথচ তা আবার চলচ্চিত্র নয়ও। মারজেন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘কমিক’ আর চলচ্চিত্র— দুটোর কাজই দৃশ্য বস্তু নিয়ে, কিন্তু তার ভাষা আলাদা। চলচ্চিত্রে একটা মানুষ কোথায় যাচ্ছে, কেমনভাবে যাচ্ছে, তার সঙ্গে ধ্বনির সমন্বয়ে এক একটি ফ্রেম এমনভাবে আঁকা যে, সেখানে এই বিষয়গুলি নিয়ে দর্শকের পক্ষে অতিরিক্ত কল্পনা করা সম্ভব নয়। কমিকে কিন্তু একটা ফ্রেম থেকে অন্য ফ্রেমের মধ্যে অনেকটাই ব্যবধান— এখানে কল্পনার অন্য মাত্রা। চলচ্চিত্রে আবার ধ্বনির সমন্বয়ে, কল্পনার অন্য উড়ান।
আমরা, অর্থাৎ যারা এই ফ্রাঙ্কোফোন দুনিয়ার লোক নই, তাদের কাছে পার্সেপলিস-এর খবর আসতে একটু সময় লেগে গিয়েছিল। ফরাসি প্রকাশক L’Association ২০০০ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে চার খণ্ডে পার্সেপলিস প্রকাশ করে ফেলেছিলেন। ইংরেজিতে ২০০৩ সালে Persepolis: The Story of a Childhood আর ২০০৪ সালে Persepolis: The Story of a Return দু-খণ্ডে প্রকাশ পায়। আমাদের তৃতীয় দুনিয়ার বেশিরভাগ লোকের কাছে পার্সেপলিস ২০০৭ সালে প্রথম ফিল্ম হয়ে প্রকাশ পায়। কিন্তু পার্সেপলিস ‘কমিক’ আর পার্সেপলিস ‘ফিল্ম’— এই দুটো এক জিনিস নয়। ঠিক যেমনটা মারজেন বলেছিলেন। সব ছবিও এক নয়। চলচ্চিত্রটি Vincent Paronnaud আর মারজেন সাত্রাপি— এই দুজনের নির্দেশনায় তৈরি। কমিকের যে মূল রস, গল্পের টানটান উত্তেজনা, গল্পের নায়কের কালো-সাদায় মোড়া যে বর্ণময় জীবন, হাসি আর কান্নার আলোছায়া— তা এখানেও বজায় আছে, কিন্তু তার সঙ্গে যোগ হয়েছে এক রূপকথার মাত্রা। এই গল্প সেই পার্সেপলিস-এর গল্প যার শুরু ১৯৭৯ সালের তেহরানে, দারায়ুসের দেশ পারস্যে। যার কেন্দ্রে মারজেন। ছবির গল্প শেষ হয়েছে সেখানে, যেখানে মারজেনের শৈশবের সমাপ্তি। মারজেন বলেছিলেন— কমিক লিখেছিলেন বলে যে ফিল্ম বানানো তাঁর পক্ষে সহজ হয়েছিল, এমন নয়। বরঞ্চ তাঁকে একদম অন্যভাবে ফিল্মের জন্য ভাবতে হয়েছিল। একই জিনিস বোঝাতে নতুন নানা ফ্রেম আঁকতে হয়েছিল। এর কিছু কিছু ফ্রেম তো এখন কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে।
মারজেনের পার্সেপলিস— যুদ্ধ, বিপ্লব, প্রতিবিপ্লব আক্রান্ত এক দেশে এক সাধারণ জীবনের গল্প। গল্পটি আত্মজীবনীমূলক। তেহরানে ইসলামীয় বিপ্লব-পরবর্তীকালে মারজেনের বেড়ে ওঠার গল্প। মারজেনের জীবনে তিনি যে ইরানের মানুষ, সেটাই সব চেয়ে সত্য। তাঁর ইরানি সত্তাকে মারজেন বারবার ফিরে ফিরে চেয়েছেন। বলেছেন— ইরান এখন সেই দেশ যেখানে একজন মেয়ে মানে একজন অর্ধেক মানুষ। যেন আমার একটা পা নেই!
পার্সেপলিস নিয়ে আজ এত কথা কেন?
গত ৪ জুন, ২০২৬, মাত্র ৫৬ বছর বয়েসে প্যারিসে মারজেন সাত্রাপি প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর পরিবার থেকে বলা হয়েছে— মারজেনের জীবনের প্রেম, তাঁর স্বামী মাত্তিয়াস রিপার প্রয়াণের দুঃখে, মারজেনের মৃত্যু হয়েছে। এই কথা বুঝে নিতে গিয়ে আমাদের থমকে দাঁড়াতে হয়! এ যেন রূপকথার গল্প। কিংবা মারজেনের পরিবারের আরেক সদস্যের জীবনের গল্পের মতো, যাঁকে নিয়ে মারজেন ‘কমিক’ লিখেছেন Chicken with Plums (মূল ফরাসি ভাষায় প্রকাশ ২০০৪ সালে)। পরে এটিকে তিনি ফিল্মেও রূপান্তরিত করেন। মারজেনের প্র-খুড়ামশায়— বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ নাসের আলি খানকে নিয়ে এই গল্প। নাসের আলি খানের স্ত্রী, তাঁর বাদ্যযন্ত্র “তার”-টিকে ভেঙে দিলে, নাসের মনের দুঃখে প্রাণত্যাগ করেন। অথচ গল্প নয়, ঘটনাটি সত্যিই ঘটে ১৯৫৮ সালে।
মারজেন দ্য গার্ডিয়ান-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, গল্প কেমন করে বলছ সেটাই একমাত্র বিবেচ্য নয়। কী ভাষায় বলছ, সেটাই গল্পকে অন্য মাত্রা দেয়। আজকাল ‘narrative’ নিয়ে বিষম হুল্লোড়ের কালে, এ একটা অন্যরকম অথচ চিরপুরাতন কথা। গল্পের বিষয়বস্তু সেই অনাদিকাল থেকেই গুটিকয়েক— নব রসে সিক্ত। কিন্তু তার ভাষা, তাকে দেখার চোখ, কালে কালে, ভিন্ন ভিন্ন কবির ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন রূপ পায়। যেমন মহাভারতে বলা হয়েছে—
आचख्युः कवयः केचित्संप्रत्याचक्षते परे।
आख्यास्यन्ति तथैवान्ये इतिहासमिमं भुवि॥
পূর্বের কবিরা এক রূপে একে দেখেছেন, এখন কবিরা আরেক রূপে এর বর্ণনা করছেন, ভবিষ্যতে আরেকরকম করে কবিরা বর্ণনা করবেন। মারজেন যেন সেইরকমই বলছেন। কেবল ভাষা আর দেখার চোখ বদলে যাবে।
মারজেনের এই সময়কালেরই আরেকটি উল্লেখযোগ্য কমিক Embroideries— ২০০৩ সালে মূল ফরাসিতে প্রকাশিত। এও এক আশ্চর্য বিষয়ের গল্প! এক বিকেলের ঘরোয়া চায়ের আসরে বসে কয়েকজন ইরানি মহিলার আড্ডা— এতে কী নেই! সমাজে গোপনীয় নিজেদের যৌনজীবন, নকল কুমারিত্ব, প্লাস্টিক সার্জারি, রক্ষিতা হওয়ার অভিজ্ঞতা! কোনওরকম অর্গল না রেখে, মারজেন তাঁর অবিস্মরণীয় কৌতুকের মধ্যে দিয়ে সেই সব অনন্য গল্প আমাদের শুনিয়েছেন। এই আড্ডার মেজাজ গল্পেগাথায় পরিচিত এবং সাধারণ পুরুষালি আড্ডার চেয়ে একেবারেই আলাদা!
মারজেন যে কেবল দু-চারটে কমিক বই লিখেছেন তা নয়। ছোটদের জন্য অজস্র গল্প লিখেছেন। প্যারিসের বা তেহরানের বহু সংবাদপত্র বা পত্রিকায় তাঁর ইলাস্ট্রেশন প্রকাশিত হয়েছে। আর একেবারে শেষের দিকে এসে ফিল্ম বানিয়েছেন অনেকগুলি (মোট ছ-টি)!
১৯৬৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানে, ক্যাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ তীরের রাশ্ট শহরে মারজেনের জন্ম হয় পারস্যের এক প্রাচীন অভিজাত পরিবারে। মারজেনের বাবা-মা দুজনেই ছিলেন কম্যুনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী। ইরানের শাহের বিরুদ্ধে কম্যুনিস্ট আন্দোলনে এবং শাহ-বিরোধী বিপ্লবে মারজেনের বাবা-মা এবং পরিবাবের অনেকেই সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। এঁদের মধ্যে তাঁর কাকা আনুশ এব্রাহিমি শাহের শাসনকালে দীর্ঘ কারাবাস ভোগ করেন আর ইসলামীয় শাসনকালে ইসলামি বিপ্লবী পরিষদের হাতে নিহত হন। পার্সেপলিস-এর প্রথম খণ্ডটি ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত মারজেনের নিজেরই জীবনকথা— যখন ইসলামীয় শাসনতন্ত্রের নিষ্পেষণে প্রাচীন পারসিক জীবনযাত্রার টুকরো-টাকরা এদিক-ওদিকে ছিটকে পড়ছে।
মারজেন বিদুষী, মারজেন অত্যন্ত সংস্কৃত! তাঁর ছবি বা ইলাস্ট্রেশন-এ এক অত্যন্ত পরিশীলিত মনকে খুঁজে পাই যার হাস্যরস বুঝতে বুদ্ধি প্রয়োগের প্রয়োজন আছে। কিন্তু সে অনাবিল হাস্যরস— তার উৎসমুখে কোথাও পাথর চাপা নেই।
সেই রসের খানিক খানিক এখানেও ভাগ করে নেওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না! শাহের মন্ত্রী নিয়োগ বিষয়ে লিখতে গিয়ে মারজি (তাঁর ডাকনাম) ছবি এঁকেছেন—

কিংবা কম্যুনিস্টরা যখন দেশ ছেড়ে পালাতে শুরু করেন কিন্তু তবুও মনে বিশ্বাস, তাঁরা বিপ্লব সম্পন্ন করবেন! (চিত্র ২)

সমস্ত হাস্যরসের মধ্যেই আসলে একধরনের নিষ্ঠুরতা, কারুণ্য, দুঃখ লুকিয়ে থাকে। বলাই বাহুল্য ইসলামীয় মৌলবাদী শাসনের নিষ্পেষণে ১৯৭৯ থেকে তেহরানে তার অভাব হয়নি!
মারজেন কম্যুনিস্ট ছিলেন বলে মনে হয় না। তিনি নিজেকে অ্যানার্কিস্ট বলেই সব জায়গায় এঁকে গেছেন। তাই যেমন একধারে ইসলামীয় মৌলবাদীদের নিয়ে হাস্যরস উপহার দিয়েছেন, তেমনই কম্যুনিস্টরাও সেই অনাবিল কৌতুক থেকে রেহাই পাননি।

তিনি সাধারণ জীবন থেকে, ছেলেমানুষির মধ্যে থেকে কৌতুকের উপাদান খুঁজেছেন। এর মধ্যে কে নেই— মার্কস, বুকানিন থেকে শুরু করে শাহ, ইসলামীয় শাসন, ভগবান, আত্মীয়-পরিজন, বন্ধুবান্ধব এবং সবচেয়ে প্রথমে মারজেন নিজে। যে নিজেকে নিয়ে রসিকতা করতে পারে, তার মতন সুরসিক কমই হয়!

এর পরের ছবি—


মারজেনের গল্প, কোনও পাতায় বা ফিল্মে পাঠক বা দর্শককে আটকে যেতে দেয় না। তরতর করে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। অথচ গল্প কিন্তু— “তারপর তারা সুখে জীবন কাটাতে লাগল”— বলে শেষ হয় না। পার্সেপলিস কমিকে গল্প বলার চলন, খানিকটা একরৈখিক হলেও, ফিল্ম সেরকম নয়। এক নতুন ধরনের গল্প বলার ধরন দেখি Chicken with Plums-এ। আর তাঁর করা ইলাস্ট্রেশন? বহু জায়গায় সে কাব্যের মর্যাদা পেয়েছে।
তেহরানে ১৯৮৩ পর্যন্ত কাটানোর পরে, ১৪ বছর বয়সে ইসলামীয় শাসনমুক্ত খোলা হাওয়ায় বেড়ে ওঠার জন্য তাঁর বাবা-মা তাঁকে অস্ট্রিয়ায় পাঠিয়ে দেন। তিনি ভিয়েনায় প্রাক-স্নাতক স্তর পর্যন্ত পড়াশোনা করে দেশে ফেরেন। মারজেন ভিয়েনায় এক সহায়সম্বলহীন প্রবাসীর মতো রাস্তায়-রাস্তায়ও রাত কাটিয়েছেন। ভিয়েনাতেই মারজেন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সুস্থ হলে তেহরানে ফেরত আসেন। এরপর তেহরান থেকেই সর্বোচ্চ সম্মানের সঙ্গে ভিস্যুয়াল কমিউনিকেশনস বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু ইসলামীয় শাসনের কঠোরতা তাঁকে তেহরানে স্থায়ী হতে দেয়নি। নব্বইয়ের দশকে মারজেন প্যারিসে ফেরত আসেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত ফ্রান্সেই থেকে গেছেন— আর দেশে ফেরা হয়নি।
জীবনের ভয়ানক দুঃখের ঘটনাও মারজেনের কলমে অসাধারণ সৃষ্টিকর্ম হয়ে দেখা দিয়েছে। তাঁর জীবনের উল্লেখনীয় ফিল্মগুলির মধ্যে সর্বপ্রথমে রয়েছে পার্সেপলিস (২০০৭)। এই ফিল্ম কান ফেস্টিভ্যালে পুরস্কৃত হয় এবং অস্কারের জন্য বিবেচিত হয়। এর পরে তিনি আরও ৫টি ফিল্ম বানিছিলেন। তাঁর তৈরি সর্বশেষ ছবি— Dear Paris (২০২৪)।
মারিজেন পরিচালিত আরেকটি উল্লেখযোগ্য ছবি, মাদাম কুরির জীবনের ওপর নির্মিত Radioactive (২০১৯)। মাদাম কুরি মারজেনের ছোটবেলার আইডল। সেই নিয়ে কৌতুক করতেও তিনি পিছপা হননি।

Radioactive যেন এক কবিতার মতো ছবি। স্বল্প দৈর্ঘ্য তার। এই ছবিটি দেখলে মনে হয় মারজেনের যৌবনকালের ইসলামীয় শাসন আর পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা তাঁর মননে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ছবির কোনও কোনও জায়গায় যেন পার্সেপলিস-এর মারজেন, তাঁর মা, আর মারি কুরি— এক হয়ে মিলেমিশে গেছেন। কখনও কখনও এই ছবিটি রূপকথার রূপ নিয়েছে— দৃশ্যকল্পে কিংবা কথনে, ছবির ভাষায়। হয়তো এই ছবি তাঁর জীবনের এক অংশের অসুখকে নানাভাবে ওলটপালট করে দেখিয়েছে। শেষে পার্সেপলিস-এর রাজকন্যা, কুরুশ-দারায়ুসের দেশের মেয়ে, হাত জোড় করে শান্তি চেয়েছেন!
আজকে, ইরানের মানুষের জীবনের এক উত্তাল সময়ে বিদায়ী জানাই আপনাকে, মারজেন!
বিদায় মারজেন!

