হিমবাহ ফেটে মহাবিপর্যয়ের দায় কার?

চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য

 


সাংবাদিক, কবি প্রাবন্ধিক, লিটলম্যাগ কর্মী

 

 

 

শেষ পর্যন্ত সরকার সিদ্ধান্ত নিল, গঙ্গার উৎসের উপরে তপোবনে ৭ ফেব্রুয়ারি চামোলি হিমবাহ বিষ্ফোরণে নিখোঁজদেরও মৃত বলে ঘোষণা করা হবে। ফলে, সরকারি মতেই মৃতের সংখ্যা ২০০ ছাড়াল। মৃত্যু যেন জলভাত! কেবল সংখ্যার খেলা। ‘বিকাশ’-এর এক ধাক্কায় মৃত্যু ২০০-র বেশি। গত কয়েক বছর ধরেই গঙ্গার উপনদীগুলির ধারার দুপাশে এমন মৃত্যু ঘটেই চলেছে।

সেদিন মানুষের মৃত্যু ছাড়াও গ্রামের পর গ্রাম ভেসে গেছে। অলকানন্দার নিচু এলাকাও ভেসেছে। মূল গঙ্গার পথ আটকে জলধারা অন্য পথে ঘুরিয়ে হরিদ্বারকে বাঁচাতে হয়েছে। সেখানে তো দেবতারা থাকেন। সাধুসন্তরা থাকেন আর বাবা রামদেব থাকেন। অন্যত্র মানুষ থাকে, তারা মরলে ক্ষতি কী!

আরও যা যা ঘটেছে, তা ভয়াবহ! দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র শেষ হয়ে গিয়েছে। চামোলির রেনিতে অবস্থিত ৩২ মেগাওয়াট ঋষিগঙ্গা প্রকল্প সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে, আর ৫৩০ মেগাওয়াট তপোবন-বিষ্ণুগড় প্রকল্প ৯০ শতাংশ ধ্বংস হয়েছে। ভেসে গিয়েছে পাঁচটি সেতু। ধস নেমে ভাঙন ধরেছে ধৌলিগঙ্গার বাঁধে। শ্রীনগর ও ঋষিকেশ বাঁধ এলাকার মানুষের ভিটেমাটি ছেড়ে একবস্ত্রে পালাতে হয়েছে মৃত্যুর উদ্বেগ নিয়ে। কোনও ঘোষণা না হলেও অসরকারি অনুমান, সরকারি কোষাগারের ৩০,০০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের সম্পদ স্রেফ ভেসে গেছে। এই টাকা কোষাগারে এসেছিল জনসাধারণের কষ্টে অর্জিত উপার্জনের প্রদত্ত কর থেকে। ঘামের দাম গেল বন্যার জলে ভেসে।

সন্দেহ নেই, এক মহাবিপর্যয় ঘটে গেছে। কিন্তু এর দায় কার? কেন ঘটল এমন বিপর্যয়? এটা কি শুধুই প্রকৃতির খেলা? এর পিছনে কি নীতিনির্ধারকদের কোনও দায় নেই? নাকি, মানুষের অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রকৃতির প্রতিবাদ? মহাবিপর্যয়ের জন্য কর্পোরেট স্বার্থে লাগামছাড়া বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং এক উন্মাদ সরকারের হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পই বা কতটা দায়ী?

 

চার ধাম প্রকল্প

ইন্টারনেটে বিভিন্ন খবরের ওয়েবসাইট ঘাঁটলে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে, গত কয়েক বছর উত্তরাখণ্ডের ‘চার ধাম’ এলাকায় পর পর ধস নেমেছে। ধসে বহু মানুষ মারা গেছেন। ২০১৮-তে ধসে মৃত্যু হয়েছিল ৭ জন নির্মাণ শ্রমিকের। অক্টোবর ২০১৯, ধসে আরও ৯ জনের সঙ্গে মারা যান প্রকৃতিপ্রেমী শ্রীমতী উমা জোশী। উমা দেবী সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রের হিন্দুত্ববাদী ‘চার ধাম প্রকল্প’-র বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। মামলার কারণ হিন্দুত্ববাদ নয়, প্রকৃতি ধ্বংস করে পরিবেশ-বিরোধী বিকাশ। গত বছর ২৪ অগস্ট হৃষিকেশ থেকে শ্রীনগরগামী সড়কে তেহরি গাড়োয়ালের কৌডিয়ালায় ফের ধস নেমেছিল। প্রাণ হারান তিন জন। তার পর উত্তরকাশী-গঙ্গোত্রীর রাস্তায় ধসে আরও ১৩ জন মারা যান। প্রধানমন্ত্রীর রাজ্য আমদাবাদের ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরির প্রাক্তন এক পর্বত বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, “কীর্তিনগর, শ্রীনগর, চামোলি থেকে ভীমতলা এবং বিরহী থেকে মায়াপুরীর মতো পথে অনবরত ধস নামছে। এ ছাড়া বাঁধের জলাধার বানানোর ফলে এমন অবস্থা হয়েছে যে, ফারাসু গ্রামের কাছে বৃষ্টি হলেই রাস্তা ধসে যাচ্ছে।” (Glacier Char Dham Road Dhas)

মোদি সরকার ক্ষমতায় এসে থেকে কাশীর মন্দিরের চারদিকের দোকানপাট, বাড়িঘর ভেঙে, ছোট ছোট মন্দির গুঁড়িয়ে করিডর তৈরি করছেন। বারাণসীর বিখ্যাত গলিগুলির দুধ, মালাই, পানমসলার ব্যবসা চৌপাট হয়ে গেছে। পুরীতে জগন্নাথ মন্দিরের চারপাশে করিডর বানাতে বহু দোকানপাট, হোটেল, রেস্টুরেন্ট গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। অযোধ্যার কাহিনি আর নাই বা বললাম। তেমনই পর্যটকদের আকর্ষণের চার ধাম— কেদারনাথ, বদ্রিনাথ, গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রীতে যাতে শীত গ্রীষ্ম বারোমাস মানুষ যেতে পারে, যার থেকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ থেকে আরএসএসের সাধুসন্ত সমাজের নামধারী শত শত সংগঠনের ধাবাহিক আয়ের পথ চওড়া হয়, তার জন্য ১২,০০০ কোটি টাকার প্রকল্প শুরু করেন।

প্রকল্পের প্রাথমিক পর্বে স্থির হয়েছিল, ৭.৫ মিটার চওড়া রাস্তা তৈরি হবে, যাতে সবরকম মোটরচালিত গাড়ি সরাসরি ধামগুলির মুখ পর্যন্ত যেতে পারে। এখন মানুষ কষ্ট করে যায়। পয়সাওয়ালাদের যেতে হলে অনেক বেশি খরচ করে হেলিকপ্টারে যেতে হয়। তাই অজুহাত দেওয়া হয়েছিল, সেনাবাহিনির ভারি ভারি ট্যাঙ্ক, সাজোঁয়া গাড়িও এই পথেই যাবে। এর বিরোধিতা করতে গেলেই যে ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দেওয়া যাবে, তা বলাই বাহুল্য। এই নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হলে রাস্তার প্রস্থ কমে হয় ৫.৫ মিটার। রাস্তার দৈর্ঘ্য মোট ৯০০ কিমি। সেই সড়ক তৈরি হচ্ছে আর তার ফল ভুগছেন পাহাড়বাসী মানুষ।

উমা জোশী সেই প্রকল্পের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে গেলে আদালত রবি চোপরার নেতৃত্বে একটি হাই পাওয়ার কমিটি গঠন করে। কমিটিতে পাঁচজন ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ আর বাকি ২১ জন সরকারি বেতনভুক বা দলীয় স্তরের প্রতিনিধি। সেই কমিটি রিপোর্টে বলে, “পিথোরাগড় পর্যন্ত সড়কে পাহাড়ে নতুন কাটা ১৭৪ জায়গার ১০২টিই ধসপ্রবণ। এভাবে ডিনামাইট দিয়ে পাহাড় ফাটিয়ে রাস্তা বানাতে গিয়ে এতদঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক চরিত্রে বিস্তর অদলবদল ঘটে গিয়েছে। সেই সব দিকগুলি যথাযথ বিবেচনা না করে সড়ক নির্মাণের কারণে সামগ্রিক পার্বত্য পরিবেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।”

গত সেপ্টেম্বরেও প্রকৃতিবিদ ও ভূবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছিলেন, এই প্রকল্প ‘হিমালয়ের ভঙ্গুর পার্বত্য অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রকে অস্থিতিশীল করবে।’ হাই পাওয়ার কমিটির অন্যতম সদস্য ভূতত্ত্ববিদ নবীন জুয়াল বলেছিলেন, “৬০ কিমি দীর্ঘ হৃষিকেশ থেকে চম্বা পর্যন্ত সড়কে আগে একটি বা দুটি ধসপ্রবণ এলাকা ছিল। এখন ধসপ্রবণ এলাকা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়েছে। রাস্তা চওড়া করতে গিয়ে কুঞ্জপুরী এলাকায় স্থায়ী ধসপ্রবণ এলাকা তৈরি হয়েছে। অলকানন্দা উপত্যকায় সাকনিধর এমনই আরেক নতুন স্থায়ী ধসপ্রবণ অঞ্চলে রূপান্তরিত হয়েছে। উপত্যকার যত উপরে ওঠা যায়, ততই বাড়ে ধসের পরিমাণ।”

এগুলি কিছুই সরকারের অজানা নয়। একটি মোমবাতির দুটি দিক জ্বালালে আলো নিশ্চয়ই বেশি হয়। বেশি আলো দেয় বলেই কি সেই পদ্ধতিকে বিকাশ বলা যায়? পাহাড়ের ভূ-প্রকৃতিগত বাস্তুতন্ত্রকে অস্বীকার করে এভাবেই সর্বনাশের পথে খুলে দিয়েছে বিকাশপুরুষের সরকার। না, এটা কোনও রাজনীতি ভাবনাপ্রসূত অভিযোগ নয়, এটাও সুপ্রিম কোর্ট গঠিত কমিটির নিরীক্ষণ। সরকার সব সরকারি নিয়মকেও জলাঞ্জলি দিয়েছে নিজেদের গোপন অভিপ্রায় পূরণে, তা সে যতই মানববিরোধী, দেশবিরোধী হোক না কেন।

সরকারি নিয়মে ১০০ কিমির বেশি দীর্ঘ কোনও রাস্তা তৈরির ক্ষেত্রে প্রকৃতি ও পরিবেশের উপর তার প্রভাবের আগাম পর্যালোচনা (এনভায়রনমেন্ট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট বা ইআইএ) করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু, রাস্তার দৈর্ঘ্য যদি ৫০, ৬০ বা ৭০ কিলোমিটার হয়, তাহলে সেই বাধ্যবাধকতা আর থাকে না। বাধ্যবাধকতা এড়াতে চালাকি করে সরকার গোটা প্রকল্পটি ৩৫টি টুকরো করেছে। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও রাস্তা তৈরির কাজ বন্ধ করা হয়নি।

সুপ্রিম কোর্ট নজর দিতেই পাহাড়ে রাস্তা তৈরির ক্ষেত্রে কী কী নিয়ম মানতে হবে, তার একটি সংশোধিত সার্কুলার প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রক। সেই সংশোধিত সার্কুলারটির কথা আদালতে একেবারে চেপে গিয়ে একটি মনগড়া রিপোর্ট সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া হয়। এই বিষয়ে হাই পাওয়ার কমিটির চেয়ারম্যান রবি চোপড়া সুপ্রিম কোর্টকে বলেছিলেন, “উত্তরাখণ্ড সরকারের এক অফিসার অসৎ পথে কাজ হাসিল করতে কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের রিপোর্ট সাজিয়ে (অলটার করে) পেশ করেছে।” কমিটির পাঁচজন বিশেষজ্ঞ সদস্যই “হিমালয়ের প্রকৃতি-পরিবেশে ভয়াবহ ক্ষতি”-র আশঙ্কা জানিয়েছিলেন। কিন্তু কমিটির বাকি ২১ জন, যাঁদের অধিকাংশই সরকার মনোনীত প্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞদের আপত্তিগুলি বাতিল করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, হিমালয়ে অমন ধস সর্বদা নামেই। নদী ঠিক নিজের রাস্তা করে নেয়। এটাকে এত গুরুত্ব দেওয়া অর্থহীন।

বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‘চালাকির দ্বারা মহৎ কাজ হয় না।’ ৭ ফেব্রুয়ারির ঘটনা তার প্রমাণ দিচ্ছে, সরকারের চালাকির ফল কী হয়েছে। মহৎ কাজের বাহানা মৃত্যু ও ধংসের কারণ হয়েছে।

 

গঙ্গায় বাঁধের কথা

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের ঢক্কানিনাদিত ‘চার ধাম প্রকল্পের’ এই হল নিট ফল! কিন্তু সেটাই সব নয়। এ হল মোমবাতির একটি দিক জ্বালানোর ফলাফল। আরেকটি দিক হল, গঙ্গার গতিপথে ছয়টি বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত। এই কাজ করতে গিয়ে মোদি সরকার হিমালয়ের ‘ইকো-সেন্সিটিভ জোন’ এলাকার গুরুতর এবং চিরস্থায়ী সর্বনাশের পথ খুলে দিয়েছে। হিমবাহ বিস্ফোরণ (গ্লেসিয়ার বার্স্ট)-এর প্রধান কারণ সেটাই।

স্মরণে থাকবে, ‘অবিরল নির্মল গঙ্গা’ আন্দোলনে টানা অনশন করে হরিদ্বারের মাতৃ ভবনের একের পর এক সাধু প্রাণ দিচ্ছিলেন। তাদেরই একজন ছিলেন ড. জি ডি আগরওয়াল ওরফে ‘স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দ’। তিন বছর আগেই, ২০১৮-র ফেব্রুয়ারিতেই, তিনি বলেছিলেন, “উত্তরাখণ্ডের গঙ্গার উৎসে ভয়াবহ বিপর্যয় হতে পারে। ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পত্তি নাশ হতে পারে।” সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ড. আগরওয়াল একজন প্রথিতযশা পরিবেশবিদই ছিলেন না, তিনি ছিলেন কানপুরের আইআইটি-র সিভিল ও এনভায়রনমেন্ট ডিপার্টমেন্টের প্রধান এবং ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের প্রথম মেম্বার-সেক্রেটারি।

Dr. G D Agarwal alias Gyan Swarup Sanand

২০১৮-র ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ‘ছোট ভাই’ সম্বোধন করে তিনি কয়েকটি প্রস্তাব রেখেছিলেন। তার মধ্যে “গঙ্গার অলকানন্দা বাহুকে ছেদ করতে উদ্যত বিষ্ণুগড়-পিপলকোটি প্রকল্প এবং মন্দাকিনী বাহু ছেদ করতে উদ্যত ফাটা-ব্যুং, সিঙ্গোলী-ভটবাড়ি প্রকল্পের” কাজ অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি ছিল। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, এগুলি তার কাছে জীবনযন্ত্রণা।

অতএব আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, গঙ্গা দশহরার দিন (২২ জুন, ২০১৮) পর্যন্ত উপরোক্ত অনুরোধগুলি পূর্ণ না হলে আমি আমরণ অনশন শুরু করব। আর, মা গঙ্গাকে পৃথিবীতে অবতরণ করানো মহারাজা ভগীরথের বংশের শক্তিমান প্রভু রামের কাছে মা গঙ্গার প্রতি অহিত করার কারণে এবং নিজের এক গঙ্গাভক্ত ভাইয়ের হত্যা করার অপরাধে তোমায় সমুচিত শাস্তি প্রার্থনা জানিয়ে প্রাণত্যাগ করব।

 

সানন্দজি ও মাতৃ সদনের সাধুদের অনুরোধ ছিল, গঙ্গাকে মূল উৎস থেকে অন্তত ১২৫ কিমি পর্যন্ত অবিরল ধারায় নির্মল জলরাশি নিয়ে প্রবাহিত হতে দাও। তাতে শুধু হিমালয়েরই নয়, দেশের মঙ্গল। সেই দাবিতে ২০০৯ ও ২০১৩ সালে সানন্দজি অনশন করেছিলেন। বারাণসীতে নিজেকে ‘গঙ্গাপুত্র’ দাবি করা নরেন্দ্র মোদি ২০১৪-তে ক্ষমতায় আসায় সানন্দজীর আশা ছিল, মোদি অন্তত গঙ্গাকে রক্ষা করবেন। গঙ্গয়া মন্ত্রক গঠন করে মোদি সরকার উমা ভারতীকে মন্ত্রী করেন, ‘নমামী গঙ্গে’ প্রকল্প নেন। বারাণসীতে গঙ্গা আরতির ধুম লেগে যায়। উমা ভারতী সাগর থেকে পদযাত্রা করেন গঙ্গার স্বাস্থ্যোদ্ধারে।

বহু মানুষ তখন মোদির এই প্রকল্পের সমর্থন করেছেন। কেউ ভাবতেও পারেনি যে, এই প্রকল্পের আসল উদ্দেশ্য গঙ্গার ‘আপস্ট্রিম’-এ, উৎসের কছে আরও নতুন নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গঠন। মোদি সরকার সেটাই করল। হিমালয়ের উপরের দিকে গঙ্গার উৎসের কাছে আরও ৬টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির ঘোষণা করল। সানন্দজি উমা ভারতীকে বললেন। অস্বীকার করা উচিত নয়, উমা ভারতী চেষ্টা করেছিলেন। মোদিকে বার বার বলেওছিলেন। এমনকি নীতিন গডকরির কাছেও দরবার করেছিলেন। কোনও লাভ হয়নি।

গুরুদাস আগরওয়াল ওরফে সানন্দজি তখন মোদিকে চিঠি লিখে অনুরোধ করেন, অন্তত গঙ্গোত্রী থেকে উত্তরকাশী পর্যন্ত যেন কোনও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও তার জন্য কোনও বাঁধ তৈরি না হয়। তিনি সেদিন যে আশঙ্কা থেকে ওই অনুরোধ রেখেছিলেন, বাস্তবে সেটাই ঘটেছে। তিনি বলেছিলেন, ‘কোনও ক্লাউড বার্স্ট (মেঘভাঙা বৃষ্টি) বা হিমবাহ ফাটার এর মতো ঘটনায় হঠাৎ প্লাবনে জল বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা দরকার।’

‘ঘোর অপরাধ’ করেছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দ। মোদি সমর্থকরা তাঁকে ‘উন্নয়নে বাধা দেওয়া পাকিস্তানের এজেন্ট’ আখ্যা দেয়। নানাভাবে তাঁকে গালাগাল করা শুরু হয়। তিতিবিরক্ত সানন্দজি, যিনি গঙ্গার বুকে বাঁধকে নিজের ‘জীবনযন্ত্রণা’ মনে করতেন, তিনি পূর্ব ঘোষণামতো ২০১৮-র ২২ জুন, দশহরা বা গঙ্গা অবতরণ দিবস থেকে হরিদ্বারে মাতৃ ভবনে আমরণ অনশন শুরু করেন। মোট ১১১ দিন তিনি অনশনে ছিলেন। শেষ দিকে মোদিকে শেষবারের মতো জানিয়ে তিনি জলগ্রহণও বন্ধ করেছিলেন। তাঁর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হলে পুলিশ দিয়ে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যায় সরকার, কিন্তু জলস্পর্শ করাতে পারেনি। হৃষিকেশে এইমস হাসপাতালে ১১ অক্টোবর তিনি প্রয়াত হন।

২০২১-এর ৭ ফেব্রুয়ারির ঠিক ২ বছর ৩৫০ দিন পর সেই হিমবাহ ফাটার আশঙ্কাই ঘটে গেল। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর প্রতি হিন্দু ধর্মে প্রবল আস্থাশীল সানন্দজির ততটা আস্থা ছিল না, যতটা ছিল নরেন্দ্র মোদি, উমা ভারতীদের উপর। যেমন আগে সানন্দজি ছিলেন গঙ্গার উপর বাঁধের পক্ষে। পরে জীবনের অভিজ্ঞতায় বুঝেছিলেন, বাঁধ কতটা ক্ষতিকর। ঠিক তেমনই, জীবনের অভিজ্ঞতায় বুঝেছিলেন, মোদি সরকারের সঙ্গে মনমোহন সিং সরকারের তফাত কতটা।

মোদিকে লেখা শেষ চিঠিতে সানন্দজি লিখেছিলেন—

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং লোহরি নাগপালা প্রকল্প, যার ৯০ শতাংশ কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল, সেটি-সহ সব প্রকল্পের কাজ বন্ধ করেছিলেন এবং বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার লোকসান সত্ত্বেও মনমোহন সিং গঙ্গাজির স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এটুকুই নয়, এরপরেও তৎকালীন সরকার গঙ্গার ক্ষতি হতে পারে এমন সমস্ত কাজ যাতে ভবিষ্যতেও না হতে পারে, তার জন্য গঙ্গোত্রী থেকে উত্তরকাশী পর্যন্ত গঙ্গাকে ‘ইকো-সেনসিটিভ জোন’ ঘোষণা করে।

 

Text of Sanand Ji’s Last Letter

ইউপিএ সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে তার জন্য নিজেকে ‘গঙ্গাপুত্র’ দাবি করতে হয়নি। তিনি কর্পোরেট স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখেছিলেন মানুষ ও প্রকৃতির বাধ্যবাধকতাকে। কর্পোরেট স্বার্থেই যে মোদি সরকার চলে, সে কথাটাও অধ্যাপক জি ডি আগরওয়ালই লিখেছিলেন। সেই চিঠিতেই মোদিকে তিনি লেখেন—

“গত চার বছরে যে সব পদক্ষেপ আপনার সরকার নিয়েছে, তাতে গঙ্গাজির কোনওই উপকার হয়নি, তার বদলে লাভ হয়েছে কেবল কর্পোরেট সেক্টর আর বেশ কিছু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের। এখনও পর্যন্ত আপনি গঙ্গাজির থেকে কেবল লাভ আদায়ের কথাই ভেবেছেন।”

বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ, পরিবেশকর্মী, সাধারণ মানুষের কারও কথা না শুনে, সরকারি নথিতে জালিয়াতি করে, নীতি ভেঙে কেবল কর্পোরেট সেক্টর আর ব্যবসায়ীদের স্বার্থে লাভের টাকার হিমালয় বানানোর খেসারত দিতে হচ্ছে মানুষকে। দিতে হচ্ছে সমাজকে। মূল্য শোধ করতে হচ্ছে দেশকে। এই মহাবিপর্যয়ের দায় তাহলে কার?

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3172 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...