দেবেশ রায়ের সঙ্গে আড্ডা: এক পূর্বপ্রকাশিত সাক্ষাৎকারের পুনরুদ্ধার

দোলনচাঁপা চক্রবর্তী

 

২০১৪-র শারদোৎসবের বিজয়া দশমীর পর তরুণ লেখক বন্ধু শমীক ঘোষ এবং আমি এক সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম দেবেশ রায়ের বাড়ি। নতুন পত্রিকা কথা সোপান ওঁকে দেব, আর গল্প করব। এক সময় প্রতি মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার প্রতিক্ষণ পত্রিকা অফিসে দেবেশ রায়ের আড্ডায় আমরা নিয়মিত ছিলাম। আমি, ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়, নলিনী বেরা, আফসার আমেদ, কখনও স্বপ্নময়, ভগীরথ মিশ্র, তপন বন্দ্যোপাধ্যায়। আশি-র দশকের কথা তা। দেবেশ রায় সাহিত্য-শিল্প ছাড়া কথা বলেন না। সেই কথাই বলছিলেন।

সে ছিল ঘন্টা দুইয়ের আড্ডা। মাঝখান থেকে তা আমি রেকর্ড করে নিই আমার মোবাইল ফোনে। দেবেশ রায় তা জানতেন না। তাঁকে না-জানিয়ে তাঁর কথা রেকর্ড করা নিশ্চয় অনুচিত হয়েছিল। কিন্তু তা করেছিলাম, ৭৯-তে পৌঁছে যাওয়া লেখকের দুর্লভ কথাবার্তা নিজের কাছে রেখে দেওয়ার জন্য। দেবেশ রায় আমার লেখক। ভারতীয় উপন্যাস তাঁর কলমে এক মহত্তর জায়গায় পৌঁছেছে।

সাক্ষাৎকারটি বুকপকেট ওয়েবজিন-এ পূর্বপ্রকাশিত।

*** 

দেবেশ রায় – বাড়িতে খুব উত্তেজিতভাবে বলছিলাম যে অমররা তো উপন্যাসের ধাঁচা বদলে দিল। আমাকে একজন একটা খবর দিল যে আনন্দলোকে একটা ভালো উপন্যাস বার হয়েছে। আমাকে বলল দারুণ, আপনি অবশ্যই পড়বেন। সাধারণত এসব খবর পেলে আমি সঙ্গে সঙ্গে পড়ি। তা সেটা কিনলাম। তখন আমার তোমাদের তিনটে লেখা পড়া হয়ে গেছে। আরও পড়েছি রবিশংকরের লেখাটা।

অমর মিত্র – দেশ পত্রিকায় সুপ্রিয় চৌধুরী নামে একজন ‘দ্রোহজ’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন, ভালো।

দেবেশ রায় – আচ্ছা, আমার তো পড়া হয়নি। ভালো?

শমীক ঘোষ – আমার মতে এইবার আনন্দবাজারে যা ছাপা হয়েছে, তার মধ্যে ‘দ্রোহজ’ উপন্যাসটা সবথেকে ভাল।

দেবেশ রায় – এখন তো দেশ প্রতি সংখ্যাতেই দু-তিনটে গল্প ছাপে, আমি খুব মন দিয়ে পড়ি। উপন্যাসগুলোও পড়ি। সাধারণত, কোনও লেখা পড়তে শুরু করে মাঝপথে ছাড়ি না – ছোটবেলা থেকেই সেরকম অভ্যেস নেই আমার।

আজকাল অনেক পত্র-পত্রিকায় যেগুলো ধারাবাহিক উপন্যাস হয় তাতে যা যা হলে উপন্যাস হবে না, ঠিক সেই সেইগুলোই করে। এইবার অমর, স্বপ্নময় এবং জয়ন্ত যা লিখেছে তাতে মনে হল ওই লেখাগুলোর পাশে অনেক পত্রপত্রিকায় ছাপা হওয়া উপন্যাসই দাঁড়ায় না। অনেক উপন্যাসেই প্রচুর নলেজ আছে। কিন্তু এই সাংঘাতিক বিপদটা বুঝতে পারে না। সমরেশ বসুর মতো পাওয়ারফুল ঔপন্যাসিকও এখন খুবভাবে পঠিত হন না। এই বিপদের জায়গাটা বুঝতে পারাই একজন ঔপন্যাসিকের জন্য সবচেয়ে বড় কাজ। একজন ঔপন্যাসিকের সবচেয়ে বড় বিপদ হল যে সে যদি নিজেকে চিনতে পারে। সে যদি নিজেকে না চিনতে পারে – মানে যা লিখতে চাইছে তা লিখতে পারছে কিনা, হচ্ছে কিনা, একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে যাচ্ছে, কোথাও বেশি লিখছে, কোথাও কম লিখছে – নিজের সম্পর্কে এই সন্দেহ যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণ উপন্যাস হয়। যে মুহূর্তে একজন লেখক জানে যে তার নিশ্চয়তা কোথায়, সে আর উপন্যাস লিখতে পারবে না। অন্য কিছু পারতেও পারে। আমি জানি না।

সমরেশ বসুর সঙ্গে একবার কথা হচ্ছিল। আমি ওঁকে বললাম, ‘সমরেশদা, আপনার ওই উপন্যাসটা পড়লাম। আপনি যদি ওই জায়গাটায় আরেকটু বাড়াতেন, আরেকটা গল্পের মধ্যে চলে যেতেন, তাহলে তো দারুণ সম্ভাবনা ছিল।’ সমরেশদা আমাদের মতামতকে ভীষণ মূল্য দিতেন। কিন্তু ওঁর তো লেখাটা জীবিকা। উনি শুনলেন। তারপর বললেন, ‘আমারও মনে হয়েছিল।’ আমি বললাম, মনে হওয়াটা তো স্বাভাবিক। আপনি লিখছেন, লিখতে লিখতে পড়ছেন এবং পড়তে পড়তে লিখছেন। আপনি তো দেখতেই পাচ্ছেন যে গল্পটা এদিকে খুব ভালো যেতে পারে। উনি বললেন, হ্যাঁ, কিন্তু আমি তবুও লিখলাম না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন। উনি বললেন, ‘আমি ভাবলাম যে ওটা আরেকটা উপন্যাস হতে পারে।’ আমার সাথে খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। আমি বলেছিলাম, আপনার লেখার স্বাভাবিক গতির যে বৃদ্ধি তাকে আপনি আটকে দিয়েছেন। এর বেশি খারাপ কাজ একজন লেখক আর কী করতে পারে?

ওঁর তিনটে উপন্যাস – সওদাগর বলে একটা উপন্যাস আছে, দারুণ লেখা। তখনও উনি বেস্ট সেলিং হননি। ফলে গল্পটাকে যতদূর পযন্ত নিঙড়ানো সম্ভব, ততদূর পর্যন্ত নিঙড়েছেন। একজন লেখকের সব থেকে বড় জিনিস আনসার্টেনটি। নাহলে আমি পাঠক হিসাবে পড়তে যাব কেন? লেখক কি হাত দেখে নাকি যে তার গল্প আমাকে পড়তে হবে?

একজন ঔপন্যাসিক আসলে একটা ভ্যাকুয়ামকে অ্যাড্রেস করছে। টোটাল ভ্যাকুয়াম। তার মধ্যে আনসার্টেনটি থাকে। এটা বোধহয় ঠিক ধরতে পারলাম না। মাথার ভিতরে তো একজন পাঠক থাকে। এটা বোধহয় কনভেয়েড হল না। এটা বোধহয় বেশি করে ফেললাম। এটা বোধহয় কম করে ফেললাম। এটাতে আরও বেশি জোর দিতে হবে। এই আনসার্টেনিটির মধ্যে দিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু এই আনসার্টেনিটি যত বেশি যাচ্ছে, লেখাটা তত বেশি পুষ্ট হচ্ছে। কারণ আমি একটা নভেলাইজেশন প্রসেসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। নভেল কী? আলাদা কিছু নাকি? এই চেয়ারটা নিয়ে নভেল হয়। যা কিছু নিয়েই নভেল হোক। তাকে নভেলাইজ করতে হবে। একটা দরজা নিয়ে একটা নভেল হয়ে যায়। নভেলাইজেশন এই পদ্ধতিটাই করতে হবে। নভেলের কোনও গল্প থাকে না। যে কোনও জিনিস, এনি ড্যাম থিং। এই দেখুন দস্তয়েভস্কি। কোনও গল্প আছে? একেবারে মোক্ষম গল্পগুলো নিয়ে বসে। কে কাকে খুন করল না করল (হেসে) ওই গল্প লিখতে তো একটা লোকের জীবন চলে যাবে। খুব অনায়াসে একটা পাতায় দুটো খুন করে দিল। তারপর সেটার জাস্টিফিকেশন। এটাকেই নভেলাইজ করা বলে। কী দারুণ কাজ!

শমীক ঘোষ – আচ্ছা একটা প্রশ্ন করছি। হয়তো ধৃষ্টতা হবে। আপনার ঘরের মধ্যে সমসাময়িক আন্তর্জাতিক অনেক লেখকের বই দেখছি। যেমন মো ইয়ান, বেন ওকরি এবং আরও অনেকে। এদের পাশাপাশি সমকালীন বাংলা লেখালেখিকে কীভাবে দেখেন আপনি?

দেবেশ রায় – মো ইয়ান ভালো লেখক। তবে খুব ভালো নয়। আমাদের অনেক লেখক ওর চাইতে ভালো। (হেসে ফেলে)। বিদেশে ইংরাজিতে অনুবাদ হয় তো। লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রি হয়।

অমর মিত্র – আপনার কোন কোন লেখা অনুবাদ হয়েছে? তিস্তাপারের বৃত্তান্ত বাদ দিয়ে?

দেবেশ রায় – তিস্তাপারের বৃত্তান্ত হয়নি।

অমর মিত্র – হয়নি! সাহিত্য একাদেমি এখনও করেনি?

দেবেশ রায় – অন্য ভারতীয় ভাষায় হয়েছে। ইংরাজিতে হয়নি। এইবার যে নোবেল প্রাইজ পেয়েছে মোদিয়ানো। ওঁর লেখা আমি পড়িনি। নামও জানতাম না। সাধারণভাবে এটা হয় না। আমি জেনে যাই। এর নাম জানতাম না। ওঁর দেশের অনেক লোকই জানে না। তা আমি জানব কী করে! এখানে পেলাম না। বাইরে বলেছি। আমার মনে হয় কাল পরশু চলে আসবে।

অমর মিত্র – আপনি বলছিলেন দস্তয়েভ্‌স্কির কথা দিয়ে নভেলাইজেশনের কথা।

দেবেশ রায় – বালজাকের একটা লেখা…

অমর মিত্র – আমি আপনার লেখা নিয়ে বলছি। এইবার সমসাময়িক-এ যেটা লিখেছেন। বিষয়টাই হচ্ছে যে এক শহর থেকে তিস্তায় সূর্যোদয় দেখা যায়। আবার কাঞ্চনজঙ্ঘায় তার রিফ্লেকশনটাও দেখা যায়। মানে একটা শহর থেকে দুটো সুর্যোদয় দেখা যায়। বিষয়টা এটাই। এইবার সেই শহরটা নিয়েই উপন্যাসটা লেখা। এটাই কী-পয়েন্ট বলা চলে। এইবার বাকিটাই নভেলাইজ করা।

দেবেশ রায় – এটা দেজ-এ দিয়েছি। পাঁচটা উপন্যাস নিয়ে বই করবে। এটা প্রুফ দেখতে গিয়ে হুড় হুড় করে বেড়ে গেল। তারপর একটা দারুণ এপিসোড ছিল – মনে মনে খুব তা দিয়ে রেখেছি যে এটা খুব জমিয়ে লিখব। ওমা যখন ওদের ফাইনাল এপিসোডটা দেব… সেটা হচ্ছে তিস্তার চর দিয়ে যে ট্যাক্সিগুলো যেত সেই ট্যাক্সিগুলো নিয়ে নানা গল্প আছে মজার মজার। মানে আমি যেটা লিখব ভেবেছিলাম সেটা হচ্ছে – ট্যাক্সিটা তিস্তার চর দিয়ে আসছে, ওই বন টন যেখানে খুব বাঘ থাকে। তারপর কোর্টে এসে দাঁড়িয়েছে। তারপর এরকম করে পয়সা চেয়েছে। পয়সা পাচ্ছে না। তাকিয়ে দেখে সিটে একটা বাঘ বসে আছে। এবং সে নড়াচড়া করছে না। যার গাড়ি সে নামতেও সাহস পাচ্ছে না। বসে থাকতেও সাহস পাচ্ছে না। ঐ ট্যাক্সিগুলোর গিয়ারের দারুণ আওয়াজ হত। মনে হত বজ্রপাত হচ্ছে। সেইরকম একটা গিয়ার তুলে, গাড়ি ঘুড়িয়ে আবার তিস্তার দিকে চালাচ্ছে। তারপর এক জায়গায় এসে দেখে বাঘটা আর নেই, নেমে গেছে। গল্পটা আমার এরকম ছিল যে বাঘটা আসলে ওই কাছারির বিল্ডিং ফিল্ডিং দেখে আর নামার সাহস পাচ্ছে না। এটাকে জমানোর জন্য তো আসলে আনবিলিভেবলকে বিলিভেবল করার অনেক প্রসেস আছে। তারপর আমার কেমন মনে হল আসলে ওই সময়টা আমি মিস করেছি। তখনই লিখে ফেলা উচিত ছিল। মনে হল যে এই জায়গাটা এক্সেস হয়ে যাবে। জল্পেশগুড়ির যে মজাটা সেই মজাটা মনে হবে বানানো। সেই জন্য আর লিখলাম না।

অমর মিত্র যখন এসেছিল তখন লিখলে হয়ত হয়ে যেত।

দেবেশ রায় হ্যাঁ তখন লিখলে ওই টিউনে চলে আসত। তোমাকে যেটা বলব ভেবেছিলাম তোমার উপন্যাসটা নিয়ে। দারুণ লিখেছ। দারুণ। আমি প্রায় কাঁটা হয়ে ছিলাম কী সর্বনাশ করবে শেষে। মানে এটা তো আন্দাজ করতেই পারছি যে দুটো বাচ্চা হবে না। তারপর ভাবলাম হলেই বা ক্ষতি কী? হোক না। তোমার দিক থেকে একটা অনিশ্চয়তা আসছে। সেটা এই জায়গায় আসছে। যে এটা কতটা বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে। মানে ওটা যে একটা রূপক হবে। এই রূপকগুলো তৈরি হয় অদ্ভুতভাবে। আমাদের লোকজীবনে এই প্রবাদটবাদগুলোর মধ্যে তুমি দেখবে যে পট করে একটা রূপক আছে। এক কথাতে লোকে বুঝে যাবে। রূপকের কোয়ালিটির উপর সেটা নির্ভর করে। তুমি যদি রূপকটা বাইরে থেকে বানাও তাহলে দেখবে সেই রূপকটা নিয়ে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। কিন্তু রূপকটার মধ্যে যদি একটা বিলিভেবিলিটি থাকে তাহলে ইজিলি লোকের ভালো লাগবে। বাকিটা লোকে তোমার জন্য অপেক্ষা করবে না। নিজেরা বানিয়ে নেবে।

(তুমি দেখবে যে ওই যে কাঞ্চনজঙ্ঘা আর তিস্তা দুদিক থেকে সূর্য উঠছে। এটা মিনিমাম স্পেসে আছে।)

অমর মিত্র – একদম শেষে গিয়ে বোঝা যাচ্ছে।

দেবেশ রায় – হ্যাঁ প্রথম দিকে আছে। কিন্তু গোলমাল করে দেওয়া আছে।

অমর মিত্র – অনেক বিষয় আছে তো। তার মধ্যে ওটা ডুবে রয়েছে।

দেবেশ রায় – এটা এমন একটা কবিত্বময় কল্পনা। লোকে বিশ্বাস করার জন্য রেডি থাকবে। (হেসে)। একটা লজিক আছে। এদিক থেকে সূর্য উঠছে। ওদিকে যাচ্ছে। সেটা ওই বৈদ্যবাটির কবরেজ সে প্রথম বলছে যে এদিকেও ওঠে ওদিকেও ওঠে। এবং ও বৈদ্যবাটি থেকে বলছে। যে ওদিকে যান কেন এদিকে গেলেই পারেন। ব্যাপারটা যেন ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট। যখন তুমি একটা রূপককে সেন্ট্রাল পয়েন্ট করবে, তখন তোমাকে সেই রূপকটাকে যতদূর পর্যন্ত সম্ভব… মানে রূপকের কোয়ালিটিটা বুঝতে হবে। তোমার এই রূপকটা এত কবিত্বময় যে সেটা তুমি বলবার আগেই বিশ্বাস করে ফেলবে। শেষটা দারুণ।

তবে একটা কথা। আমার মত যে তোমার উপন্যাসে ওই বাবার চরিত্রটাকে কবি না করলেই হত। আসলে কবি বা লেখক – সেটা তো একটা কৃত্রিমতার কাজ। সেটাকে কেউ লেবার ভাববে না। এটা আমার মত। তোমার লেখাটার শেষে যে ওয়েট সেটা একটা কবি-ফবি বেয়ার করতে পারবে না।

জয়ন্তর উপন্যাসটা দারুণ হয়েছে। দারুণ। কিন্তু ওর উপন্যাসেও এইটা রয়েছে। প্রথমদিকে ওভারওয়েট হয়ে গিয়েছে। ও যে একটা রহস্যের মধ্যে যাচ্ছে সেটাকে রিয়েলাইজ করার জন্য অনেক বেশি খরচ করেছে।

একজন ঔপন্যাসিক তার লেখার অনেকটা অংশ না জেনে রিচ করে। সেইজন্য তার কোনও কনফিডেন্স থাকে না। সব সময় সে জলের মধ্যে দিয়ে হাঁটছে।

অমর মিত্র – আমাদের যখন প্রতিক্ষণের আড্ডা হত তখন তারাশঙ্করের ‘নাগিনী কন্যার কাহিনী’ নিয়ে একটা কথা বলেছিলেন যে— নাগিনী কন্যার কাহিনী বেরোনোর পর অনেকে সমালোচনা করেছিল যে এইগুলো বেদেদের মিথ নয়। এইগুলো তারাশঙ্কর বানিয়ে দিয়েছেন সব। আপনি সেই প্রসঙ্গে বলেছিলেন এতে প্রমাণ হয় তারাশঙ্কর কত বড় লেখক এবং এই মিথটাকে উনি কীভাবে বানিয়েছেন।

দেবেশ রায় – এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার। কম্যুনিস্টরা কত অখাদ্য পাঠক। পরিচয়ে বিশাল রিভিউ বেরিয়েছিল যে ‘নাগিনী কন্যার কাহিনী’টা পুরোটা বানানো। আমার তখন কতটুকু বয়স— খুব কম বয়স। পরে যখন আমার একটু গোঁফ টোফ উঠেছে তখন আমি লিখলাম আরে একজন ঔপনাসিক তো বানানোর জন্যই লেখে। সেকি অ্যানথ্রোপোলজি পড়ে লিখবে নাকি? দাদাকেই বলেছিলাম বোধহয়। তারাশঙ্কর তো এই সমালোচনা বার হওয়ার পরে খুব দুঃখিত হয়েছিলেন। কথা বলতেন না কম্যুনিস্টদের সাথে।

তবে অনেকের লেখা পড়তে গেলে মনে হয় খুব বানানো। ওটা পড়া যায় না। একটা প্রোজ আসলে দুটো কাজ করতে পারে। তিনটে কাজ করতে পারে না। এক একটা বস্তুর পরিচয় দিতে পারে। বস্তুর, মেটিরিয়ালের। এই টেবিলটার পরিচয় দিতে পারে। এটার নাম প্রোজ যে আপনাকে মেটিরিয়ালাইজ করছে। আরেকটা হচ্ছে আর্গুমেন্ট দিতে পারে। আর্গুমেন্টের আর কোনও পদ্ধতি নেই। যুক্তি দিয়ে একটা কথা বলতে পারে।

অনেকে কত দার্শনিক কথাবার্তা বলে। ওরা এত দর্শন জানল কী করে সেটাই আমার কাছে একটা রহস্য। সাবানের ফেনার মত। আমার ধারণা আমাদের সময়কার বেস্ট প্রোজ রাইটার হচ্ছে মতি নন্দী। মতির যেগুলো বড়দের লেখা, তার কোনও সময় প্রোজের সেনটেন্সের… ও আর্গুমেন্টের মধ্যে খুব যায় না। যে বস্তুটাকে বর্ণনা করছে সে বস্তুর বাইরে কখনও যাবে না। অসম্ভব ভালো লেখক। খুব বড় লেখক।

মাঝে মাঝে মনে হয় অনেকই লিখেছি। কিন্তু মধ্যবিত্ত মানুষ নিয়ে কোনও বড় উপন্যাস লিখলাম না। মানে আমাদের জন্মকাল থেকে এই বয়সকাল পর্যন্ত মধ্যবিত্ত জীবনটা তো একেবারে বদলে গেল। কিন্তু এটা নিয়ে কোনও বড় উপন্যাস লিখলাম না।

‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ মানে সে কখনওই মনে করে না যে এনাফ হ্যাজ বিন ডান। আমার আরেকটা উপন্যাস লেখার ইচ্ছা। কিন্তু কয়েকটা বছর তো লাগবে। কিন্তু অতদিন বাঁচব না। ছোট লেখার কথা বলছি না। আমাদের জীবনকালের কথা বলছি মানে এখন যাঁদের আশি বছর বয়স। মধ্যবিত্তের জীবনের নিরিখটাই বদলে গেছে। এটা না আনতে পারলে মনে হবে যে একটা জীবন যাপন করলাম কিন্তু দলিল করলাম না।

আগে আমার একটা কথা ছিল। আমি বলতাম যে পঁয়ষট্টি বছরের পর আর উপন্যাস লিখব না। এখন দেখছি তার পরেই তো উপন্যাস আসে।

(শমীককে) আপনার কথা শোনা হল না। আপনি গল্পের জন্য চাকরি ছেড়ে দিলেন?

শমীক ঘোষ – না গল্পের জন্য নয়। সিনেমার জন্য।

দেবেশ রায় – সিনেমা করবেন? আমি একসময় প্রচুর স্ক্রিপ্ট লিখেছি।

শমীক ঘোষ – আপনারও সিনেমা করবার ইচ্ছা ছিল?

দেবেশ রায় – এখনও বললে কেউ করব।

অমর মিত্র – আমি অনেক স্ক্রিপ্ট করেছি। টিভিতে হয়েছে। ফিল্মের জন্যও একবার লিখেছিলাম। টেলিভিশনের একদম প্রথমদিকে সোনেক্সে ছিল জোছন দস্তিদার। ওরা আমাকে দিয়ে কতগুলো স্ক্রিপ্ট করিয়েছিল।

দেবেশ রায় – আমি অনেকগুলো ডকুমেন্টারি করেছি। সেন্ট্রাল ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস। ওরা বরাত দিয়েছিল। অনেকগুলো।

অমর মিত্র – এটা তো কেউ জানে না।

দেবেশ রায় – এটা অনেকেই জানে না। আমি প্রায় খান বারো চোদ্দ করেছি। সবই প্রায় আঠাশ মিনিটের। ল্যাঙ্গুয়েজের কোনও একটা অ্যাস্পেক্ট নিয়ে। তারপর একবার মাথায় চেপেছিল রবীন্দ্রনাথের কয়েকটা গল্পের ফেমিনিস্ট ফিল্ম করব। টিভির জন্য। অনেকগুলো স্ক্রিপ্ট করেছিলাম। একটা হচ্ছে জীবিত ও মৃত। তিনটে গল্প সিলেক্ট করেছিলাম। তারপর একজন এসে কথা বলল। শেষ অবধি হল না।

আমি সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে পড়েছি উনি হলিউডের ছবি দেখে বাড়িতে গিয়ে স্ক্রিপ্ট করতেন। ছবিটা দেখার পরে। তারপর সেই স্ক্রিপ্টটা জোগাড় করে মেলাতেন। পনেরো বছর এই কাজ করেছেন।

আসলে ব্যাপারটা কী জানেন। যে কোনও শিল্পপ্রকরণে টেকনিকটাই বাই ইটসেলফ শিল্প। আর তো কোনও শিল্প নেই। একজন লেখককে চেনা যায় তার সব থেকে খারাপ লেখা দিয়ে। সেই লেখাতেও কী এলিমেন্ট আসছে। আমাদের বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস। আমার নিজের মতে— ওঁর পথের পাঁচালী, অপরাজিত, আরণ্যক, দৃষ্টিপ্রদীপ, আদর্শ হিন্দু হোটেল, এই পাঁচটা উপন্যাস খুব বড় উপন্যাস। গ্রেট। একজন ঔপন্যাসিকের পক্ষে পাঁচটা গ্রেট উপন্যাস লেখা খুব কঠিন। একটা, দুটো— ব্যাস! তার বেশি হয় না। বিভূতিভূষণ পাঁচটা লিখেছিলেন। এরপর ওঁর খারাপ লেখা হল কেদার রাজা, দুই বাড়ি। রাবিশ। মানে ওঁকে কেউ বুঝিয়েছে আপনার খুব নেচার আসে। উনি একটু নেচার দিয়ে দিলেন। কিন্তু ওই লেখাগুলো এখনও পড়ি। অমন একটা বাজে গল্প। তাড়ায় লিখছেন। খারাপ লেখা। কোনও কন্টিনিউটি নেই। যেখানে গল্পটা থামার কথা তারপরে চোদ্দ পৃষ্ঠা ধরে লিখছেন। কিন্তু সেইখানে দ্য বেস্ট অফ হিজ ট্যালেন্ট প্লে করছে।

আমি তো সত্যজিতের সিনেমাতে দেখতে যাই আলোর খেলা। আলো কীভাবে ইন্টারপ্রিটেড হচ্ছে। আমি কী ফিল্ম হচ্ছে সেটা দেখতেই চাই না। আমি শুধু দেখতে চাই কোথা থেকে ক্যামেরাটা এল। কোথা থেকে ধরল। গল্পের সিনট্যাক্স যদি আমি বুঝতে চাই, গল্প বাই ইটসেলফ, আমি ওর থেকে অনেক ভালো গল্প পাব।

আমি কুরোসাওয়া বলতে পাগল হয়ে যাই।

শমীক ঘোষ – আপনার সব থেকে প্রিয় ফিল্ম কোনটা কুরোসাওয়ার?

দেবেশ রায় – ও আমি বলতে পারব না। এভরিথিং।

শমীক ঘোষ – একটা কথা আজকে জানা গেল। যে আপনারও ফিল্ম করার ইচ্ছা ছিল।

দেবেশ রায় – ফিল্ম করতে পারব না কেন? একটা কথা যেমন জানি গান গাইতে পারব না। কিন্তু সিনেমা করতে পারব। কিন্তু শিখতে হবে। তার ফার্স্ট লেসন হচ্ছে স্ক্রিপ্ট লেখা। আর আমি একসময় পাগলের মত স্টিল ফটোগ্রাফি করতাম। জলপাইগুড়িতে ছিলাম যখন। একটা পার্টিকুলার ফেজ অফ লাইফ। নিজের বাড়িতে আমি ডার্করুম বানিয়েছিলাম। তখন সাদা কালো। সবে কালার আসছে। আমি কালার তুলিনি।

শমীক ঘোষ – এইগুলো নিয়ে লিখেছেন কখনও? ছবি তোলা। এই দিকগুলোর কথা।

দেবেশ রায় – এইটা একটা দিক হল নাকি? তবে ওই যে বারো চোদ্দটা ডকুমেন্টারি করেছি সেইটা মজার আছে। তাতে বড় বড় অ্যাকটর করেছে। একটাতে কবীর সুমন করেছেন, অশোক করেছে, অলকানন্দা রায়।

শমীক ঘোষ – ছবি তোলা শেষ কবে?

দেবেশ রায় – একসময় বুঝলাম আঙুল কাঁপছে। একসময় ভেবেছিলাম মাস্টারির চাকরি ছেড়ে ছবি তুলব। সেটা খুব হিরোইক কাজ না। সেই সময় মাস্টারির মাইনে এত কম।

শমীক ঘোষ – সিনেমা? আচ্ছা, বুঝতে পেরেছি। অন্য একটা বিষয় থেকে আমার মনে হয়েছে যে আপনি কুরোসাওয়ার খুব ভক্ত। আমি আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে চাই। ভুল হতে পারে প্রশ্নটা সম্পূর্ণ – সেজন্য একটু সঙ্কোচ বোধ করছি। যাইহোক, আপনার লেখায়, ধরা যাক এই উপন্যাসটা – ‘মানুষ খুন করে কেন’- অসম্ভব ডিটেল রয়েছে। এত ইন্ট্রিকেট ডিটেল বোধহয় বাংলা ভাষায় আর কারুর লেখায় নেই। আপনার কি মনে হয় যে আপনার দেখার একটা অন্য রকম চোখ ছিল, সেইজন্য হয়েছে?

দেবেশ রায় – এটা আসলে লেখার পরে অন্যের মুখে শুনেছি যে আমার লেখায় প্রচুর ডিটেল। তারপরে তার আপত্তিও শুনেছি যে এত ডিটেল কেন। আমি কোনওটারই কোনও উত্তর জানি না। দেখার কোনও ব্যাপার নেই। আমি যে লেখাটা লিখতে চাইছি সেই লেখাটা কী করে আসবে যদি তা ডিটেলে না হয়। আমি এটা যুক্তি দিচ্ছি না।

অমর মিত্র – আপনার দেখাটা ওইরকম।

শমীক ঘোষ – আপনার চরিত্রগুলোতে– তার যত কথা আপনি লিখে রাখেন, তার ফলে আপনার জন্যে ফিল্ম করাটাও খুব সহজ বিষয় ছিল। আর, কেউ বোধহয় জানেই না যে একজন ফটোগ্রাফারের চোখটাও আপনার আছে।

দেবেশ রায় – ফটোগ্রাফি যখন আমি করেছি তখন আমি লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

শমীক ঘোষ – কখনও মনে হয়নি যে দুটোর মধ্যে একটা বিরোধ আছে?

দেবেশ রায় – আমার ওই সমস্ত কোন তাত্ত্বিক অসুবিধা নেই। অনেকেরই ধারণা আমি খুব তাত্ত্বিক লোক। কিন্তু আমার কখনও মনে হয় না যে একটার তাত্ত্বিক জগৎ আরেকটার তাত্ত্বিক জগতের সাথে কোনও বিরোধ তৈরি করছে। বাংলাদেশের খুব নামকরা একজন নারী ঔপন্যাসিক, নাসরীন জাহান, একদিন আমার এই বাড়িতে বসে বলছে, “দাদা, আপনে কী জানেন যে আপনের গল্প-উপন্যাসের থেইকা লোকে আপনারে পণ্ডিত বইল্যা বেশি জানে!” তা আমি বললাম, নাসরিন, এইটা কী আমার পক্ষে খুব আনন্দের খবর! বলে, না – আমাদের পক্ষেও খুব আনন্দের খবর না, কিন্তু লোকে তো জানে তাই। কী করে যে দূর করা যাবে এটা যে আমি পণ্ডিত না-! (হাসি) কিন্তু ও একটা ভীষণ ইন্টারেস্টিং কথা বলেছিল। ও বলল যে, দাদা, আমরা তো গল্প-উপন্যাস লিখি। গল্প-উপন্যাস লিখে তত্ত্ব তো লিখি না। আর আপনি তো তত্ত্বও লেখেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, সেইগুলো পড়ে পড়ে কি আমার লেখা পড়ার চেষ্টা করেন? তো বলল যে, না। কিন্তু আপনার তত্ত্বগুলো পড়ে তো আমাদের লেখাটা ফলো করতে পারি। নাসরিন নিজে কিন্তু ভীষণ পাওয়ারফুল লেখিকা।

কালকেও এসেছিল কে একজন। আমি বললাম, ওইগুলো আবার কেউ পড়ে নাকি। সে বলল যে, বলেন কী! সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স হিসেবে পাঠ্য। যথেষ্ট বিক্রি হয়, সেটা জানি। আমার উপন্যাসের চাইতে বেশি বিক্রি হয়। কিন্তু অনেকে বলে এবং তারা অত্যন্ত ভুল কাজ করে – আমার তাত্ত্বিক বইগুলোতে যে তত্ত্ব বলা আছে, সেইটা দিয়ে আমার লেখা বিচার করা উচিত। এইটা মারাত্মক ভুল।


যে বইয়ের উল্লেখ তিনি করেছেন:

  • পাউডার কৌটোর টেলিস্কোপ – স্বপ্নময় চক্রবর্তী
  • অ্যান্টি হিরো – জয়ন্ত দে
  • জননীসমুদ্র – অমর মিত্র
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...