দুই সন্তান পলিসি: ভোটের মুখে অসম সরকারের অভিনব ফরমান

সুমনা রহমান চৌধূরী

 


শিক্ষক, সমাজকর্মী

 

 

 

১ জানুয়ারি ২০২১ থেকে অসমে চালু হয়ে গেল দুই সন্তান নীতি। এবার থেকে রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের উক্ত তারিখ থেকে এক বা একাধিক বিবাহ সূত্রে দুইয়ের বেশি সন্তান হলেই চাকরি চলে যাবে। এবং যাদের এখনও চাকরিতে নিযুক্তি হয়নি, তাদের কারও একইভাবে দুইয়ের অধিক সন্তান থাকলে রাজ্য সরকারের কোনও পদে আবেদন করার যোগ্যতা আর থাকবে না। একথা শুধু মুখে বললেই হবে না। রীতিমতো লিখিতভাবে কর্মচারীদের সরকারের সঙ্গে প্রতিশ্রুতবদ্ধ হতে হবে। সেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার ফরম্যাটও গেজেট নোটিফিকেশনের কপি সহ  অফিসগুলোতে এসে গেছে। নীতিপত্রতে আরেকটি পয়েন্টও ঢোকানো হয়েছে। কোনও সরকারি কর্মচারী ‘চাইল্ড ম্যারেজ’ অর্থাৎ শিশু বিবাহ করতে পারবেন না। সরকারের তরফে বলা হচ্ছে রাজ্যের জনসংখ্যার রাশ টেনে ধরতে এবং শিশুবিবাহ রোখা ও নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যেই এই নীতি নিয়ম লাগু করা হয়েছে।

এবারে গোটা বিষয়টাকে একটু ভালোভাবে পর্যালোচনা করা যাক। অসমের মোট জনসংখ্যা ২০১১ সালের জনগণনা তথ্য মতে ৩ কোটি ১২ লক্ষ। নয়া নীতিতে বলা হচ্ছে জনসংখ্যার এই হার রাজ্যের জন্যে ক্ষতিকারক। তাই সরকারি কর্মচারীদের উপর এই ফরমান। এখানেই গোটা বিষয়টা অদ্ভুতভাবে জট পাকিয়ে যায়। ৩ কোটি ১২ লক্ষ জনসংখ্যার রাজ্যে মেরেকেটে ৫-৬ লক্ষ মানুষ সরকারি কর্মচারী। সরকারের এই নীতি মতে তবে পাঁচ-ছয় লক্ষ সরকারি কর্মচারী বছর বছর গন্ডায় গন্ডায় সন্তান জন্ম দিয়ে রাজ্যের জনসংখ্যা বাড়িয়ে তুলছেন! নাকি পাঁচ-ছ লাখ সরকার কর্মচারিকে জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের আওতায় আনলেই রাজ্যের জনসংখ্যা সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে! গোটা বিষয়টা কোনও কর্মচারীর কাছেই পরিষ্কার নয়! আবার পয়েন্ট নং দুই অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীরা শিশুবিবাহ করতে পারবেন না বলে যে নীতির উল্লেখ করা হয়েছে, সেটাও যথেষ্ট গোলমেলে। কেননা বাল্যবিবাহ বা শিশুবিবাহ এখনও বহুলভাবে প্র্যাকটিস হয় ভারতবর্ষের গ্রাম এবং বস্তি অঞ্চলগুলোতে। আর্থিকভাবে, সামাজিকভাবে, শিক্ষার দিক থেকে  পিছিয়ে পড়া অনুন্নত জাতি, উপজাতিদের মাঝেই এই ব্যবস্থা টিকে আছে। পিতৃতান্ত্রিক ভারতবর্ষে এখনও কন্যাসন্তানদের পরিবারের বোঝাই ভাবা হয়। শহুরে উচ্চশিক্ষিত পরিবারটি যদিও বা স্ট্যাটাসের খাতিরে বা ভালো জায়গায় পাত্রস্থ করার খাতিরে কন্যাসন্তানকে উচ্চশিক্ষায় পাঠায়, সে জায়গায় ভারতবর্ষের গ্রাম, বস্তিগুলোতে সব দিক থেকে পিছিয়ে থাকা পরিবারটি মেয়ের বোঝা আলাদা করে টানার সৌখিনতা বাবুদের মতো দেখাতে পারে না বলেই ক্লাস ফাইভ সিক্সে পড়ুয়া মেয়েটিকে পাত্রস্থ করে দায়মুক্ত হয়! সরকার বাহাদুর থেকে সেইসব স্কুলছুট কন্যাশিশুদের উচ্চশিক্ষা তথা শৈশব বাঁচিয়ে রাখার কোনও নীতি নিয়ম আইন না এনে সরকারি কর্মচারীদের উপর এই জবরজুলুম নীতি প্রণয়ন যথেষ্ট গোলমেলে বিষয়ই বটে! মাঝারি বা উচ্চশিক্ষিত সরকারি কর্মচারীটি নিশ্চয় চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়া মেয়েটিকে বিয়ে করে আনবে না! আজ অব্দি আমার কোনও সহকর্মীর ক্ষেত্রে এরকমটা দেখিওনি। একই যুক্তি দুই সন্তান নীতির ক্ষেত্রেও। বেশি সন্তান সরকারি চাকুরিজীবীদের না ভারতবর্ষের সেই সব মানুষদের যারা শিক্ষাদীক্ষা, রোজগার, আর্থিক অবস্থান, সামাজিক স্ট্যাটাস  সবকিছুতেই পিছিয়ে! তাহলে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ ঠেকাতে রাজ্যের সেই অগুনতি মানুষদের জীবনধারনের মান উন্নত করার, শিক্ষা তথা চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নত করার বদলে পাঁচ-ছ লাখ সরকারি কর্মচারীর উপর খড়্গহস্ত কেন সর্বানন্দ সরকার? উত্তরটা বোধহয় আগামী বিধানসভা নির্বাচন। সিএএ, এনআরসি, ডিটেনশন ক্যাম্প, বেকারত্ব, টেট শিক্ষকদের চাকরি এখনও নিয়মিত না করতে পারা, নিউ পেনশন পলিসি, দ্রব্যমূল্যের আকাশছোঁয়া দাম, বেহাল রাস্তাঘাট, বেহাল চিকিৎসাব্যবস্থা ইত্যাদিতে জবুথবু সরকার বাহাদুর মনে মনে ঠিক জানেন, শুধু অযোধ্যার রামমন্দির আর জয়শ্রীরাম স্লোগানবাজি অসমে আমদানি করলেই ভোট বৈতরণী পার হওয়া যাবে না। তাই নজর ঘোরাতে প্রথমে কদিন সরকারি মাদ্রাসা তুলে দেওয়ার আইন টাইন আনা, তারপর অসমে মোগল আক্রমণ এখনও অব্যাহত আছে মন্তব্য, বাংলাদেশি মুসলমানে রাজ্য ভরে গেছে জিগির, এবং শেষে সরকারি কর্মচারীদের উপর এই নতুন ফরম্যান। সব ছকে বাঁধা। হিন্দু কর্মচারীদের বুঝানো হবে, আরে এই নীতি নিয়ম তো মুসলমানদের জন্যে আনা হয়েছে। হিন্দুদের কোণঠাসা করতে তিন বিবি চল্লিশ বাচ্চা পলিসি নিয়ে এরা ‘বাচ্চা জেহাদ’ করে। হিন্দু কর্মচারীটিও ‘মুসলমানদের বাচ্চা জেহাদ রুখতে’ এই নীতি সম্পর্কে কোনও উচ্চবাচ্যে যাবে না। কখন যে তার বেডরুমের ভেতরও সরকার ঢুকে গেছে সেটা সে বোঝার চেষ্টাও করবে না। আর যাতে বুঝে ফেলার অবকাশটুকুও না পায় তার জন্যেই গোটা অসমের প্রতিটা মোড়ে মোড়ে, গলি গ্রামে রামমন্দির বানানোর ব্যানার ঝোলানো। পুজোতে, বিহুতে, পিকনিকে রামমন্দির বানানোর গান। ধার্মিক নাগরিকটির দুর্বলতম নাড়ি স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের সরকার বাহাদুরেরা নিজেদের হাতে সযত্নে সামলে রাখেন। বেগড়বাই হলেই সোজা নাড়ি ধরে টান। ব্যস!

রাজ্যের স্বাস্থ্য এবং পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা জানিয়েছেন রাজ্য সরকারি কর্মীদের সার্ভিস রুল পরিবর্তন করার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রের তরফেও যাতে এমনই নিয়ম চালু করা হয় তার প্রস্তাব কেন্দ্র সরকারকে দেওয়া হবে। এখানেই আরেকটা বিষয় উল্লেখ্য যে, বিজেপিরই এক আইনজীবী নেতা অশ্বিনীকুমার উপাধ্যায় কিছুদিন আগে দিল্লি হাইকোর্টে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মাবলি বেঁধে দেওয়ার দাবিতে এক আর্জি জমা দিয়েছিলেন। আদালতের কাছে তার দাবী ছিল, আদালত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে দুই সন্তান নীতির মতো নির্দেশিকা বেঁধে দিক। কিন্তু দিল্লি হাইকোর্ট অশ্বিনীকুমারের সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। তাতে দমে না গিয়ে অশ্বিনীকুমার উপাধ্যায় পুনরায় আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টে। তাঁর করা আবেদনের ভিত্তিতেই কেন্দ্রের মতামত জানতে চায় সর্বোচ্চ আদালত। গত ৭-ই ডিসেম্বর নিজেদের মত জানিয়ে আদালতে একটি হলফনামা জমা দেয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার। সেই হলফানামায় বলা হয়েছে, কোনও দম্পতিকেই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাধ্য করা কেন্দ্রের পক্ষে সম্ভব নয়। ভারতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি পুরোপুরি ঐচ্ছিক। যা কিনা প্রত্যেক দম্পতিকে অধিকার দেয়, তাদের পছন্দমতো পরিবারের সদস্যসংখ্যা এবং পরিবার নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি বেছে নেওয়ার। এটা সম্পূর্ণই তাদের উপর নির্ভর করে, এবং কাউকেই বাধ্য করা হয় না। আর কেন্দ্র পরিবার নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্দিষ্ট নিয়মাবলি দেশবাসীর উপর চাপিয়ে দেওয়ার বিপক্ষে। হলফনামায় আরও বলা হয়, ‘গত কয়েকবছরে ভারতে জন্মনিয়ন্ত্রণ হচ্ছে। আর সেটা কোনও নিয়মকানুন লাগু করা ছাড়াই হচ্ছে। ভারতে বর্তমানে জন্মহার নিম্নমুখী। পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের উপর হস্তক্ষেপ করলে তার কুপ্রভাব পড়তে পারে সার্বিকভাবে।

যেখানে কেন্দ্র সরকার হলফনামা দিয়ে আদালতে জানাচ্ছে কোনও দম্পতিকে সরকার বাধ্য করতে পারে না পারিবারিক সদস্য নিয়ন্ত্রণে, স্পষ্টভাবে জানান দেওয়া হচ্ছে ভারতে বিগত কবছর ধরে জন্মনিয়ন্ত্রন হচ্ছে, সে জায়গায় অসম সরকারের এই নতুন আইন, নীতি কিসের উপর ভিত্তি করে লাগু করা হল! অসম প্রদেশটি কি ভারতবর্ষ নামক দেশটি থেকে আলাদা? নাকি বাকি ভারতের কোনও আইন অসমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না! সবচেয়ে বড় বিষয় গেজেটটির প্রথম পয়েন্ট যেখানে লেখা ‘এক বা একাধিক বৈবাহিক সূত্রে দুইয়ের বেশি সন্তান’। সেখানে এসেই তো স্পষ্ট হয়ে যায় ঠিক কোন সম্প্রদায়ের মানুষদের উদ্দেশ্য করে এই নীতি লাগু করা হয়েছে! ‘তিন বিবি চাল্লিশ অওলাদের’ জেনোফোবিক স্লোগানের উৎপত্তি তো আর আজকের নয়!

সরকারি কর্মচারীদের বিষয়টি বাদ দিলেও আরও বহু সমস্যা জড়িয়ে আছে নতুন এই নীতির সঙ্গে। জড়িয়ে আছে লিঙ্গপছন্দ এবং পুত্রসন্তান বাছাইয়ের বিষয়টি। ভারতীয় উপমহাদেশে নারীর তার নিজের জরায়ুর উপর কোনও অধিকার নেই। তার মা হওয়া অথবা না হওয়া নির্ভর করে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের মতামতের উপর। সন্তানের লিঙ্গ বাছাইয়ের অধিকারও তার নেই। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসূত্রে একথা আমরা অনেকেই জানি, নির্দিষ্ট সংখ্যক বাচ্চা জন্ম দেওয়ার যে কোনও জবরদস্তি নিয়ম দেশকে পাল্টা উৎপাদনমূলক এবং জনসংখ্যার বিকৃতির দিকে ধাবিত করে। প্রতিবেশী দেশ চিনের উদাহরণ এখানে দেওয়া যেতেই পারে। চিনের এক-শিশু নীতির আইন সে দেশে লিঙ্গ বাছাই এবং গর্ভপাতের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলেছিল। মহিলাদের পাচার ও জোর করে পতিতাবৃত্তিও বৃদ্ধি পেয়েছিল কয়েকগুণ। কদিন আগেই একটা কোন কাগজে দেখছিলাম চিনে নারীর সংখ্যা কমে যাওয়ার দরুন সে দেশের পুরুষেরা পাকিস্তান, বাংলাদেশ তথা এশিয়ার অন্যান্য দেশের নারীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন।

আমাদের দেশে তো জনসংখ্যা নীতি লাগু করার আগেই দেশের নারী-পুরুষের গড় অনুপাত স্বাভাবিকের তুলনায় শোচনীয়ভাবে কম। ১০০০ জন পুরুষের বিপরীতে ৮৯৬ জন নারী। গত বছর ভারত সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রক দ্বারা প্রকাশিত ২২টি রাজ্যে চালানো সমীক্ষাতথ্য মতে, ভারতের ১৯টি রাজ্যে মহিলাদের মধ্যে গড়ে দুটি শিশুর কম রয়েছে। এছাড়াও, আমাদের দেশের পরিবারগুলিতে এখনও পুত্রসন্তানকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সে জায়গায় দাঁড়িয়ে পরিবারগুলোকে যদি দুটোর বেশি সন্তান জন্মদানে বাঁধা দেওয়া হয় তাহলে পুত্রসন্তান লাভের আশায় কন্যাভ্রূণ হত্যা এবং অনিরাপদ গর্ভপাত করার ঘটনাগুলো বহুলভাবে বেড়ে যাবে। এতে গোটা দেশের লিঙ্গ অনুপাতের হার আরও শোচনীয় মোড় নেবে।

ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় যৌনতা বিষয়টাই ট্যাবু। দোকানে কনডোম কিনতে গেলেও এদেশে ছেলেমেয়েদের লজ্জার মুখে পড়তে হয়। অসুরক্ষিত যৌনতাও জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি মুখ্য কারণ। সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে গত আট বছরে কনডোমের ব্যবহার ৫২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর অন্যতম পরিণতি অনিরাপদ গর্ভপাত অথবা না চাইতেও সন্তানের জন্মদান। ভারতের অর্ধেকেরও বেশি গর্ভপাত অসুরক্ষিত। গর্ভপাতের বিষয়গুলি থেকেই বোঝা যায় যে নারী বা পুরুষেরা পারিবারিক আকার যদিবা নিয়ন্ত্রণ করতেও চান, তাদের কাছে কোনও নিরাপদ অ্যাক্সেস নেই! তাহলে সুরক্ষিত পদ্ধতি ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যবিধি, হাইস্কুলের পাঠ্যক্রমে সেক্স এডুকেশন বিষয়টির অন্তর্ভুক্তি এসবে কোনও তোড়জোড় না করে সরকার জনগণের ব্যক্তিগত জীবনে, পারিবারিক জীবনে রক্তচক্ষু ধারণ করে প্রহরায় ব্যস্ত কেন!

ভারতের জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন বাজেটের প্রায় ৪ শতাংশ পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে ব্যয় করা হয়, যার প্রায় বেশিরভাগই পরিবার ও সেবা সরবরাহকারীদের বন্ধ্যাত্বকরণে উৎসাহ দেওয়ার জন্য রয়েছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য রাজ্যসভায় ২০১৮ সালের বিলে যে সব পরিবারে স্বামী/স্ত্রীর বন্ধ্যান্তকরণ করানো হবে, তাদের পরিবারকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাদেরকে উন্নত স্বাস্থ্যপরিষেবা দেওয়া হবে একথাও বলা আছে। অথচ বাস্তব সত্য হল সেইসব বন্ধ্যাত্বকরণ অপারেশনগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানসম্পন্ন বিধি বা যত্ন না নিয়েই করা হয়। উদাহরণস্বরূপ বিলাসপুরের নাম উল্লেখ করা যায়। ২০১৪ সালের দিকে একদিনে সেখানকার এক সরকারি হাসপাতালে ৮৪৩ জন নারীর বন্ধ্যাত্বকরণ করা হয়। যার মধ্যে অপারেশনের পর পরই ১৩ জন নারী মারা যান।

এইসমস্ত সমীক্ষা রিপোর্ট, তথ্য পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় ভারতবর্ষের জনগণ পরিবারকে নিয়ন্ত্রণ করতেই চান। অর্থনৈতিক অবস্থানের হিসাবেই হোক বা একটু সচ্ছল অবস্থানে থাকার উদ্দেশ্যেই হোক, পরিবারগুলো দুই সন্তানের অধিক সন্তান জন্ম দিতে চায় না। কিন্তু সামাজিক ট্যাবু এবং রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা এই দুইয়ের ফলে তাদের সেটা করা সম্ভবপর হয় না। যৌনতা বিষয়ক অসচেতনতা, অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্কের দরুন তাদের না চাইতেও দুইয়ের অধিক সন্তান মেনে নিতে হয়। সরকারের যদি রাজনীতি না করে সত্যিই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সদিচ্ছা থাকে, নারীর ক্ষমতায়নের উদ্দেশ্য থাকে তবে চোখ লাল করে নাগরিকদের উপর একতরফা আইন আর নিয়মকানুন লাগু নয়, বরং পরিবার পরিকল্পনার জন্য বাজেট আরও বৃদ্ধি করা হোক। বয়ঃসন্ধিকালে যত্ন এবং সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আরও বেশি গ্রামে গ্রামে আশা-কর্মীদের নিয়োগ করা হোক, গর্ভনিরোধক ট্যাবলেট, কনডোম ইত্যাদি ব্যবহারে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ট্যাবুগুলিকে হ্রাস করার কর্মসূচি নেওয়া হোক। একমাত্র তবেই সুষ্ঠুভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নচেৎ ‘আমরা-ওরা’র ভোটের রাজনীতি চলতেই থাকবে আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জনসংখ্যাও বাড়তেই থাকবে দেশের।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3501 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...