শঙ্খ ঘোষ: সঙ্গ-অনুষঙ্গ

সমীর ঘোষ

 




চিত্রশিল্পী, প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক

 

 

 

 

 

১৯৯০ সালে পরপর বেশ কয়েকটি মর্মান্তিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করবার পর, এ-রাজ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছু ক্ষোভ জেগে ওঠে। সেটা গুরুতর হয়ে উঠতে পারে এমন আঁচ পেয়ে বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে একটি আলোচনাসভা আহ্বান করা হয় তথ্যকেন্দ্রের দোতলায়, সুপ্রসর ঘরে। আহূত সেই ‘বুদ্ধিজীবী’ সম্মেলনে হাজির ছিলেন তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তাঁর সামনে, ক্ষীণ দু-একটি ব্যতিক্রমের কথা ছেড়ে দিলে, প্রায় সকলেই জানাতে থাকেন যে তেমন কোনও সঙ্কট নেই কোথাও, জনমানসে কোথাও কোনও ক্ষোভ নেই, বাইরে যা-কিছু বলা হচ্ছে তার সবটাই বামবিরোধী গণমাধ্যমের প্রত্যাশিত কিন্তু নিষ্ফল অপরটনা মাত্র। বামফ্রন্ট সরকারের পক্ষে এ-নিয়ে দুর্ভাবনার কোনও কারণ নেই। স্বরে আর ব্যক্তিত্বে বক্তাদের মধ্যে সেদিন প্রবলতম ছিলেন উৎপল দত্ত।

আর সরকারের কাজের সমালোচনা করে, সরকারের সঠিক দিশা নির্দেশে যাঁরা কিছু মত-মন্তব্য প্রকাশ করেছিলেন, যেমন শঙ্খ ঘোষ, দেবেশ রায়, পূর্ণেন্দু পত্রী— তাঁদের প্রতি বিদ্রুপ বর্ষিত হয়েছিল সেইদিন।

…বামফ্রন্টের প্রতি আস্থা যে সকলেরই অটুট, এই প্রস্তাবের পক্ষে তখন হাত তুলতে বলা হল সবাইকে। অসংখ্য হাত উঠবার পর, গণনা নিষ্প্রয়োজন বুঝে, কৌতুকভরে বলেন সভাপতি (মন্ত্রী নন): লজ্জাবশত যে দু-একজন হাত তুলতে পারলেন না এখানে, তাঁরা যেন নিজের নিজের বাড়িতে গিয়ে তুলে দেন হাত। হাস্যরোলে শেষ হয়ে যায় সভা।

উদ্ধৃত অংশ ‘অবিশ্বাসের বাস্তব’ (প্রথম তালপাতা সংস্করণ: জুলাই ২০০৯) বইয়ের ‘দ্বিতীয় সংস্করণ প্রসঙ্গে’ শঙ্খ ঘোষের লেখা থেকে নেওয়া। ‘১১ সেপ্টেম্বর ১৯৯০ বামফ্রন্ট আয়োজিত বুদ্ধিজীবী সমাবেশে পঠিত’ শঙ্খ ঘোষের বিবৃতিটির নাম— ‘প্রতাপ-অন্ধতা’। কী বলেছিলেন সেদিন শঙ্খ ঘোষ? কেন বিদ্রুপে বিদ্ধ হতে হয়েছিল কবিকে, কিছু স্তাবকের কৌতুকে?

অনেক দেরিতে হলেও, এরকম একটি সমাবেশের আয়োজন যে শেষ পর্যন্ত হতে পেরেছে, এটা সুলক্ষণ। কিন্তু এ সমাবেশে যদি সত্যি সত্যি কোনও আত্মসমীক্ষা না ঘটে, তবে এর উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে বলে মনে হয় না।…

…প্রতাপ-মত্ততা এবং প্রতাপ-অন্ধতা কোনও সরকারের পক্ষে সর্বনাশের সূচক। সে-রকমই কিছু মত্ততা আর অন্ধতায় আমরা ভুলে যাচ্ছি মানুষের যথার্থ ক্ষোভের প্রকৃতি এবং পরিমাণকে, ক্ষোভ আর প্রতিবাদের প্রকাশ-মাত্রকেই ধরে নিচ্ছি শত্রুপক্ষীয় আচরণ। কিন্তু বামফ্রন্ট সরকারের সবচেয়ে বড় বন্ধুদেরই আজ বলা দরকার যে, জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এক দঙ্গল সমাজবিরোধীর হাতে; চেতনা প্রসারের চেয়ে অনেক অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে অন্ধ আনুগত্যময় দলীয় প্রসারকে; বহুদিন ধরে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলবার এক ভুল রাজনীতির গোলকধাঁধায় ক্রমাগত টেনে নেওয়া হয়েছে আমাদের। এবং এসবেরই মর্মান্তিক ফল হিসেবে দেখা দিয়েছে গত কয়েক মাসের লজ্জাজনক ঘটনা।…

…আজও যদি তাকে আমরা জেনেও না-জানার ভঙ্গি করি, আজও যদি তার বিরুদ্ধে তীব্রতম প্রতিবাদ না জানাই, তবে এর ভয়াবহ ফল আরও বহু দিন ধরে আমাদের গোটা সমাজকে আচ্ছন্ন করে ক্ষতলাঞ্ছিত করে রাখবে। শেষ পর্যন্ত তাতে সরকার বা দেশ, দুয়েরই পরম ক্ষতি।

শঙ্খ ঘোষ তাঁর কথা শেষ করেছেন এইভাবে—

তাই বিগত কয়েকটি দুঃখজনক এবং নিন্দনীয় ঘটনার জন্য আমরা মর্মাহত, এটুকু বলাই আজ যথেষ্ট বলে মনে হয় না। বলা উচিত যে সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলির বিরুদ্ধে আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং যে অশুভ শক্তিকে ব্যবহার করবার দীর্ঘকালের অভ্যাসে এগুলি ঘটতে পারছে, আমরা তার সম্পূর্ণ অপনোদন চাই।

১১ সেপ্টেম্বর ১৯৯০-এর সময়কালীন এই লেখায় শঙ্খ ঘোষ প্রতাপ-অন্ধতা কিংবা প্রতাপ-মত্ততার বিরুদ্ধে যেভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, তার আগে বা পরেও বারবার সেভাবেই প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন কবি। সব প্রতিবাদের ভঙ্গি যে একই ধারার তা নয়। কখনও বিস্তারিত, কখনও আবার অতি সংক্ষিপ্ত। মৌখিক মন্তব্য কিংবা লেখায়। আবার অনেক সময়েই কবিতায় বাঙ্ময় হয়েছে প্রতিবাদের স্বর। কৌতুকে কিংবা গূঢ় ব্যঞ্জনায়।

৩ এপ্রিল ২০০৭। সমাজ-রাজনীতি সঙ্কট-সন্ধিক্ষণে। সংঘাতময় আবহে শঙ্খ ঘোষ কিছু বলবেন। উপলক্ষ: ষষ্ঠ প্রণবেশ সেন স্মারক বক্তৃতা। খবর কাগজে সংবাদ পড়ে জানলাম। তবে সভায় প্রবেশ অবাধ কি না তা জানার জন্য শঙ্খদাকে ফোন করি। তিনি জানান তেমন কোনও ব্যাপার নয়, চলে এসো। কলকাতার শিশির মঞ্চে সেদিন বহু মানুষের উপস্থিতি। গোটা প্রেক্ষাগৃহ ভরে উঠেছে। সমস্ত পরিবেশ নিথর, নিস্তব্ধ। শঙ্খ ঘোষ শুরু করলেন ভাষণ পাঠ। কথার ফাঁকে ফাঁকে স্বভাবসুলভ কৌতুক। হাস্যরোল, আবার স্তব্ধ প্রেক্ষাগৃহ। সে এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা। কিন্তু কী ছিল সেদিনের ভাষণে, কেন মন্ত্রমুগ্ধ ছিলেন শ্রোতারা? শুধু কি শঙ্খ ঘোষের বাচনভঙ্গি, স্বরক্ষেপ, মাদকতার আকর্ষণ— যেমন আমরা জানি তাঁর কবিতা পাঠের বিষয়ে?

কবি সেদিন পাঠ করেছিলেন, যার শিরোনাম ‘অন্ধের স্পর্শের মত’।

জীবনের শেষ কয়েকটা বছর চোখে দেখতে পেতেন না আমার বাবা। বই পড়তে ভালোবাসতেন, কিন্তু পড়া বন্ধ হয়ে গেল। ভালোবাসতেন কথা বলতে। কিন্তু কথাও কিছুটা থমকে গেল। অভ্যাগতেরা কেউ দরজায় এসে দাঁড়ালে চমকে উঠে জিজ্ঞেস করতেন: ‘কে?’ নাম শুনে ‘কই, হাতটা দেখি’ বলে বাড়িয়ে দিতেন হাত। তারপর সেই অভ্যাগতের হাত ধরে অনেকক্ষণ বসে থাকতেন চুপ করে। কথা কখনও হত, কখনও হত না। কিন্তু হাতের ওই জড়িয়ে থাকা-টুকু ছিলই।

এরপর পাঁচটি অংশ জুড়ে এই স্পর্শের, এই অনুভবের কথাই বলেছেন নানা অনুষঙ্গে। বিচিত্র অভিজ্ঞতার বয়ানে। এসেছে নিজের কথা, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ, শিক্ষকদের কথা, এমনকি চিকিৎসকের কথা, যিনি রোগীর চিকিৎসা করতে এসে নিজেকে পরিবারের সকলের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন— ‘এই ওষুধটা দিয়ে দুদিন আমরা দেখব। এতে যদি ফল না হয় তাহলে আমাদের আরেকরকম করে ভাবতে হবে।’ আমি থেকে আমরা— চিকিৎসকের এই কথাকেই শঙ্খ ঘোষ জুড়ে দিতে চান স্পর্শের অনুভবের সঙ্গে। আবার, ‘আমরা’ এই কথাটার মধ্যেও যে লুকিয়ে থাকে ভিন্নধর্মী আমিত্বের প্রকাশ, উদ্ধত মনোভঙ্গি— তাকেও বিশ্লেষণ করেছেন কবি। ভাষণের শেষ অংশ—

মাস দেড়েক আগে, বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনের প্রযোজনায়, একটি অভিনয় চলছিল কার্জন পার্কে। পড়তি বিকেলে, খোলা জায়গায়, ছোট একটি বৃত্ত তৈরি করে নিয়ে সেখানে রক্তকরবীর অভিনয় করছিলেন কয়েকজন মানুষ, কেউ যাঁরা চোখে দেখতে পান না। দর্শক ছিলেন অল্প কয়েকজন। পূর্ণ অন্ধদের সেই সুঠাম অভিনয় শেষে দর্শকেরা যখন উচ্ছ্বাস জানাচ্ছেন, আশ্চর্য একটি দৃশ্যের জন্ম হল তখন। সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে কুশীলবেরা সবাই তাঁদের খোলা দুহাত বাড়িয়ে রেখেছেন প্রার্থীর মতো। কী চান তাঁরা? কিছু কি চান? তাঁদের মধ্যে একজন বললেন: ‘আপনারা সবাই এসেছেন, কিন্তু আমরা তো দেখতে পাচ্ছি না। আপনারা যদি আমাদের সকলের হাতের ওপর একটু হাত ছুঁয়ে যান, আপনাদের ভালো-লাগাটা আমাদের মধ্যে পৌঁছবে, আমাদের ভালো লাগবে।’ দর্শকেরা একে একে সকলের হাতে হাত রাখলেন, কারও কারও চোখে এল জল।…

…আমরা যখন সত্যিকারের সংযোগ চাই, আমরা যখন কথা বলি, আমরা ঠিক এমনই কিছু শব্দ খুঁজে নিতে চাই, এমনই কিছু কথা, যা অন্ধের স্পর্শের মতো একেবারে বুকের ভিতরে গিয়ে পৌঁছয়। পারি না হয়তো, কিন্তু খুঁজতে তবু হয়, সবসময়েই খুঁজে যেতে হয় শব্দের সেই অভ্যন্তরীণ স্পর্শ।

প্রণবেশ সেন স্মারক বক্তৃতার বিষয় ‘সংযোগের ভাষা’ এবং তার সূত্র ধরেই শঙ্খ ঘোষ ৩ এপ্রিল ২০০৭ যে ভাষণ পাঠ করেছিলেন— ‘অন্ধের স্পর্শের মত’, তার সর্বাঙ্গে প্রচ্ছন্নে জড়িয়ে আছে তৎকালীন রাজনৈতিক আবর্তের অনুষঙ্গ। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম ঘটনাক্রমে আমরা-ওরা বিভাজন, পরস্পর আলোচনা, মুক্তমনে পর্যালোচনার সার্বিক পরিসর ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে উঠেছিল। ক্ষমতা তখন পুনরায় প্রতাপ-অন্ধতা আর প্রতাপ-মত্ততায় মাতাল। এমনই আবহে শঙ্খ ঘোষ সেদিন পাঠ করলেন তাঁর অবিস্মরণীয় ভাষণ—

আমরা অনেক সময়েই সকলের করা কাজটাকে বলতে শুরু করি ‘আমার কাজ’। ব্যক্তিগত স্তর থেকে সামাজিক-রাজনৈতিক স্তর পর্যন্ত এই ‘আমি’ তখন হয়ে ওঠে এক ঘোষণা-শব্দ, চিৎকার-শব্দ, যার মধ্য দিয়ে এগোতে থাকে অবারণ একটা জোর দিয়ে বলবার প্রতাপভঙ্গি। আর সেই চোরাপথে এগিয়ে আসে ফ্যাসিবাদ। ফ্যাসিবাদ আমাদের স্বভাবের একটা অনিয়ন্ত্রিত চিৎকার।

বৈশাখ ১৪১৪, মে ২০০৭, ২৫শে বৈশাখ, ধর্মতলা আয়োজন করা হয়েছিল প্রতিবাদী সম্মেলন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার সমাবেশ ঘটেছিল সেদিন। রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করা হয়েছিল ভিন্ন আবহে। সেই উপলক্ষে একটি সঙ্কলন প্রকাশ করেছিলাম— ‘প্রতিবাদে-প্রতিরোধে তিমিরহননের গান’। এক ফর্মার পুস্তিকায় সঙ্কলিত হয়েছিল অশ্বিনীকুমার দত্ত (স্বদেশি) থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, নবারুণ ভট্টাচার্য, সব্যসাচী দেব, মৃদুল দাশগুপ্ত, জয় গোস্বামী, গৌতম ঘোষদস্তিদার এবং স্বপ্নময় চক্রবর্তী। গদ্য ও কবিতার এই সঙ্কলনে শঙ্খ ঘোষের চারটি কবিতা তাঁর সম্মতিতে প্রকাশ করেছিলাম। গানের মতো, তুমি নেই আর সে তুমি, ন্যায়-অন্যায় জানিনে, এবং স-বিনয় নিবেদন। তিনি প্রুফ দেখে দিয়েছিলেন, প্রতিটি কবিতার এবং গদ্যের নির্বাচনেও সাহায্য করেছিলেন। কবি শঙ্খ ঘোষের গোটা জীবন জুড়ে ছড়িয়ে আছে সময়বিশেষে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের অজস্র রচনা। শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, উচ্চারণ করেছিলেন—

হাতে হাতে প্রত্যক্ষ ফল না পেলে অনেক সময় আমরা দমে যাই, আমাদের মনে হতে থাকে কাজটার আর মানেই নেই বুঝি। তেমন হতাশার গ্লানি যাতে আমাদের ছুঁতে না পারে, তার জন্য প্রথম থেকেই মনে রাখা চাই যে আজই এই মুহূর্তে কোনও প্রত্যক্ষ ফল যদি না-ও দেখতে পাই আমরা, তবুও নিরর্থক হবে না আমাদের চেষ্টা, কাজের ফল হয়ত পৌঁছবে দূর ভবিষ্যতের কোনও প্রজন্মের হাতে।

এই বিশ্বাসেই স্থির ছিলেন শঙ্খ ঘোষ, আমৃত্যু।

প্রতাপ-অন্ধতা, ধ্বংসস্তূপে আলো, সম্প্রীতির সাহিত্য, সম্পর্কের উৎসব, এ আমরা কী করছি, জাতীয় লজ্জা, আর্তনাদ, ‘ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা’, অবিশ্বাসের বাস্তব, ‘জেনো হয়ে গেছে বহু দেরি’, আমাদেরই গান— এই নিয়ে তৈরি হয়েছে একটি বই, ‘অবিশ্বাসের বাস্তব’। বিভিন্ন সময়ে সমাজ-সঙ্কটে কবির প্রতিবাদ এবং সমস্যার মূল্যায়ন, সমাধানের প্রয়াস নিয়ে এই বই। খুব যে পরিচিত, প্রচারিত— এই বই তেমন নয়। তবে সমাজ-রাজনীতির আবর্তে, সঙ্কটে এই বই আমাদের দিশা নির্দেশে পরম সহায়।

শঙ্খ ঘোষ তাঁর লেখার বিষয়ভাবনা ছড়িয়ে দিয়েছেন নানা পরিসরে। কবিতা কিংবা কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধ যেমন লিখেছেন, আরও ব্যাপ্ত হয়েছে তাঁর রবীন্দ্রভাবনা। আছে জার্নাল, ভ্রমণ, আত্মগত উপলব্ধির আকর্ষক ভাষ্য। নানা বিষয়ে বিশিষ্ট মানুষদের কাজকর্ম কিংবা প্রিয়জনদের কথা নিয়ে আন্তরিক ভাষ্য। যা লিখেছেন, সবই যেন মনে হয় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। স্বাদু ও রম্য শুধু নয়, ভিন্নমাত্রিক। কিন্তু স্মৃতিকথা সে-ভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছয়নি। নানা আলাপচারিতায়, জিজ্ঞাসার উত্তরে বলেছেন নিজের কথা, অভিজ্ঞতার বিনিময় ঘটেছে কথাবার্তায়।

তবে শঙ্খ ঘোষের শৈশব-কৈশোর-যৌবনে প্রবেশের সেই ফেলে আসা সময়ের ছবি ধরা পড়ে তাঁর ছোটদের জন্য কয়েকটি গদ্যরচনায়।

শঙ্খ ঘোষ শুরু করেছেন এভাবে—

অনেকদিন আগে, দুই বাংলা যখন এক ছিল, এ হল সেই সময়কার গল্প। পদ্মানদীর বাঁধের পাশে ছোট একটা কলোনি। কলোনির শিয়র ঘিরে সারি বাঁধা বন। বনের ওপারে মস্ত হরধনুর মতো বাঁকানো আছে রেললাইন, গভীর রাতে মেল ট্রেনের গুম গুম আওয়াজ শোনা যায়। লাইনের এ-ধারে ও-ধারে ভারী সুন্দর কয়েকটি ছোট গ্রাম, কোনওটির নাম রূপপুর, কোনওটির বা শাপুর। সেই কলোনির এক প্রান্তে, একদিন খুব সকালবেলায় ঘুম ভাঙতেই টপ করে উঠে বসল নীলমাধব।

১৯৬৪ সালে শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন এই গদ্য, ছোটদের জন্য ‘সকালবেলার আলো’। প্রথম প্রকাশ আশ্বিন ১৩৭৯।

ছোটদের নিয়ে লেখা ছোটদের এই উপন্যাস। অনেকদিন আগে, দুই বাংলা যখন এক ছিল, পদ্মানদীর ধারে বেড়ে উঠেছে এক কিশোর। তার চারদিকে ভারি সুন্দর পৃথিবী। কিন্তু এরই মধ্যে সে অল্পে অল্পে বুঝে নিচ্ছে যে তাকে চলতে হবে একেবারে একা।…

…সদ্য সদ্য দেশভাগ হয়েছে তখন। একজন কিশোর তার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে কীভাবে অনেকে ছেড়ে আসতে চাইছে তাদের চিরদিনের দেশ। আর সেইসঙ্গে পিছনে পড়ে থাকছে হারিয়ে যাওয়া কত প্রিয়জন, কত প্রিয় ছবি। এই সব নিয়ে লেখা নতুন এই কিশোর-উপন্যাস। লেখকের ‘সকালবেলার আলো’ বইটির পরবর্তী এক অংশ।

‘সুপুরিবনের সারি’— ‘সকালবেলার আলো’র কিছুদিন পরের এই গল্প। স্বাধীনতা এসেছে সবে, আর দু-টুকরো হয়ে গেছে দেশ, সেই সময়ে একবার তাদের গ্রামের বাড়িতে চলেছে নীলু। একই গ্রাম তার ঠাকুর্দা আর দাদামশাইয়ের। কিন্তু বহুদিন হল ঠাকুর্দাও নেই, সেই বাড়িতেও কেউ নেই। ছোটবেলা থেকে মামাবাড়িতেই তারা উঠেছে বেশি, বাড়ি বলতে তাই নীলুরা বোঝে মামাবাড়ি। পুজোর ছুটির সময়ে, খাল নদীতে ঘেরা সেই বাড়ি যাওয়ার পথে, একদিন খুব রাত্রিবেলায় ঝগ-ঝগ-ঝগ-ঝগ জল কাটতে কাটতে এগিয়ে চলেছে স্টিমার, দোতলায় ডেকের ওপরে রেলিং ধরে তাকিয়ে আছে নীলু। নীলু কে? কে আবার, শঙ্খ ঘোষ নিজেই। কিংবা তাঁর মতো আরও যাঁরা সেই বয়সেই দেশ-হারা।

যাবে না কেউ এবার, কেননা দেশ নাকি এবার ভাগ হয়ে গেছে। নীলুদের গ্রামটা নাকি এখন অন্য একটা দেশ। ভারী আজব কথা।

অনেক বড় কথা। বড়দের কথা সহজ উচ্চারণে তুলে ধরেছেন শঙ্খ ঘোষ, ছোটদের কাছে। যেমন—

পুজো আর ঈদ সেবার ছিল কাছাকাছি সময়ে। উঠোনে বসে লক্ষ্মীপুজোর প্রসাদ খেতে খেতে হারুন বলেছিল: ‘কয়দিন পরেই ঈদ, আমাগো ঘরে যাবি তো হেইদিন? দাওয়াত দিলাম কিন্তু।’ গিয়েছিল তো নীলু। কত আদর করে সেমুই খাইয়েছিল হারুনের আম্মাজান। দেওয়ার আগে বলেছিল অবশ্য: ‘খাবা তো মনু? বকপে না তো কেউ তোমারে?’ কই তার জন্য তো আবদুল কখনও বকেনি তাকে। নেমে বসতে বলেনি তো বিছানা থেকে। তাহলে?

আখ্যান শেষ হয় এইভাবে—

শেষ? হ্যাঁ, শেষ। প্রণাম তোমায়, শেষ। প্রণাম তোমায়, এই দ্বাদশীর বিকেল। প্রণাম, ওই খালের মুখে নদীর জলের ঢেউ। প্রণাম তোমায় তুলসীতলা, মঠ। প্রণাম ফুলমামি। প্রণাম, তবে প্রণাম তোমায় সুপুরিবনের সারি।

মনে মনে বলতে চায় নীলু: ‘হারুন, আসব আবার।’ কিন্তু বলতে পারে না কিছু। আবার একবার ডানদিকে বাঁক নিয়ে, নৌকো শুধু চলতে থাকে মচর মচর, ঢিমে তালে, একটানা পশ্চিমের দিকে।

নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে মস্ত এক অচেনা কলকাতায় এসে পৌঁছেছে এক কিশোর। শহরের পথে পথে, আর অলিতেগলিতে, একটু একটু করে সে দেখে নিচ্ছে কত মানুষজন, চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে শিল্পের সংস্কৃতির রাজনীতির নতুন কত জগৎ। সে কিশোর এগিয়ে চলেছে ছমছমে এক যৌবনের দিকে।

এক সময়ে বাংলা ভাষায় ছাপা হয়েছিল ছোটদের অর্থনীতি, ছোটদের রাজনীতি নামের বই। ছোট বয়সকে উপেক্ষা না করে, সহজ করে লেখা হয়েছিল এই ধরনের বই। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন ছোটদের জন্য ‘আমার বাংলা’। ছবি এঁকেছিলেন শিল্পী চিত্তপ্রসাদ।

২০১০, জানুয়ারি— শঙ্খ ঘোষের লেখা ‘শহরপথের ধুলো’ আর এক অবিস্মরণীয় আখ্যান। তাঁর নিজের কথায়—

‘সুপুরিবনের সারি’র কয়েকটা দিন পর। ঘোর দুর্যোগ শুরু হয়নি তখনও, উনিশশো পঞ্চাশের তখনও অনেক দেরি। তবু, দেশভাগের পর-পরই দলে দলে অনেকে চলে আসছেন ও-বাংলা থেকে এ-বাংলায়, অনিশ্চয়ের দিকে। এখানে-ওখানে সাময়িক আশ্রয় খুঁজে ফিরছেন সবাই। সেই সময়টায় একদিন ঘোর দুপুরবেলায় খটখট খটখট শব্দ করতে করতে পিচের রাস্তার ওপর দিয়ে এগিয়ে চলেছে একটা ঘোড়ার গাড়ি, ভিতর থেকে ডাইনে-বাঁয়ে সব বাড়িঘর দেখতে পাচ্ছে নীলু। মা-বাবা-ভাই-বোন কথা বলছে না কেউ, নীলুও বলছে না কথা। শেয়ালদা স্টেশনে এসে নামবার পর থেকেই চুপ করে আছে সবাই। আগে আগে যখন ওরা কলকাতায় আসত, তার থেকে কতই-না আলাদা এটা। এ হল একেবারে থাকবার জন্যই আসা, বেড়াবার জন্য নয়। ট্রেন থেকে দলে দলে যত লোক নামছিল, সবারই মুখ ছিল কেমন থমথমে।

‘সকালবেলার আলো’। তারপর ‘সুপুরিবনের সারি’। এরপর ‘শহরপথের ধুলো’ মেখে নীলু প্রাক-যৌবনে নতুন জীবনে প্রবেশ করছে। এখানে এসেছে একে একে হেমাঙ্গ বিশ্বাস, জর্জদা কিংবা—

রেডিও থেকে ভেসে আসে স্বর। কান্নাভেজা, কিন্তু স্থির মন্থর গাঢ় সেই স্বর। শোনা গেল: দ্য লাইট হ্যাজ গান আউট অফ আওয়ার লাইভস!… আমাদের প্রিয় সেই বাপু আর নেই, অন্ধকারে ছেয়ে গেছে সব। কার কাছে যাব আমরা আর?

‘গান্ধীজি আর নেই’ এই খবর শুনে—

ঘরের সকলের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। ঘরে ঘরে নিভিয়ে দেওয়া হচ্ছে আলো।

চোখের জল মুছে নিচ্ছে নীলুরা।

সমাজজীবনের সমস্যা সঙ্কটের সঙ্গে, সময়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে বড় হয়ে ওঠে নীলু। ছোটদের জন্য লেখা হলেও নিজের শৈশব, কৈশোর, প্রাক-যৌবনের অভিজ্ঞতাকে সঞ্চারিত করতে চেয়েছেন তাদের মনে। কোনও বিষয়কেই পরিত্যাজ্য মনে করেননি শঙ্খ ঘোষ। বিতর্কিত বিষয়কে সহজেই তুলে এনেছেন সময়-সন্ধিক্ষণের নিরিখে—

‘স্বাধীনতা স্বাধীনতা কইত্যাছে লোকে, কিন্তু সত্যিকারের স্বাধীন কি হইছি আমরা? হই নাই। যারে কয় সত্যিকারের স্বাধীনতা, সেইটা আননের লাইগ্যা এখনো অনেক লড়াই করন লাগব।’
‘ও বাবা, তুমি কি আমাকে লড়াই শেখাতে নিয়ে যাচ্ছ নাকি?’
‘যাইলে ক্ষতি কী? ক্ষতি আছে? ইচ্ছা করে না তোর? ক তো দেখি, এইটা কোন পদের স্বাধীনতা? দ্যাশটা রে দুই টুকরা কইরা ফ্যালাইয়া, তোগো-আমাগো মতো হাজার হাজার মাইনষের কপালে রিফিউজি লেভেল লাগাইয়া দিয়া, এইটা কোন ছাতার স্বাধীনতা রে? গরিব লোকগুলা কি আজও দুই মুঠা খাইতে পায়? নাকি তাগো পরনের কাপড় আছে? না থাকনের জায়গা আছে? কেমনতর স্বাধীনতা এইটা?’

চিমনিকাকুর সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে হেঁটেছিল নীলু, মিছিলে। মিছিল থেকে ভেসে এসেছিল গান— রেশটা অনেকদিন লেগেছিল নীলুর কানে। মাঝেমাঝে নিজের মনে গুনগুন করত নীলু, মিছিলের সেই গান—

হেই সামালো হেই সামালো
হেই সামালো ধান হো
কাস্তেটা দাও শান হো
জান কবুল আর মান কবুল
আর দেব না আর দেব না
রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ হো…

এই নীলুই একদিন বড় হয়ে, কত অন্যায়-অসঙ্গতির বিরুদ্ধে কবিতা লিখেছে, প্রতিবাদী মিছিলে হেঁটেছে। দলীয় আনুগত্য ছাড়াই, একান্ত ব্যক্তিগত বিশ্বাসে, শিরদাঁড়া সোজা রেখে— জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত।

শঙ্খ ঘোষের দ্বিসপ্ততিতম জন্মদিন উপলক্ষে এই সঙ্কলন গ্রন্থ। উপলক্ষটি প্রায় অবান্তর, যেমন আমার বন্ধু অধ্যাপক শিশিরকুমার দাশ বলছিলেন— বই নিয়ে তো কথা, একটু সময় নিয়ে করো। উদ্যোগের ব্যক্তিগত-সমষ্টিও অবান্তর, যেমন বন্ধুরা বারবার জিজ্ঞাসা করেছেন কারা লিখেছেন, কী লিখছেন, প্রুফ দেখতে হবে কি না। তাহলে, যা সত্য তাই সত্য হয়ে বেরিয়ে আসে— শঙ্খ ঘোষই একমাত্র প্রাসঙ্গিক। আর এই ধরনের সঙ্কলন, যার লেখাগুলি কোনও একজনকেই উৎসর্গ করা হচ্ছে মিলিতভাবে, সমাজস্বীকৃত সৌজন্য জ্ঞাপনের একটা ভঙ্গি— শঙ্খ ঘোষের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা জানানোর সবচেয়ে অনাটকীয় একটা ভঙ্গি। আমাদের প্রতিদিনে তিনি এমনই জড়িয়ে ও তাঁর প্রতিদিনের টুকরোগুলিতে আমরাও সবাই কখনও কখনও এমনই জড়িয়ে যে তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ থাকার কারণও যে সেই সব দিনানুদিনেই পুঞ্জিত হয়ে উঠছে তা জানানোর মতো দূরত্ব তৈরি হয় না, তা জানানোর মুদ্রাও তৈরি হয়ে ওঠার মতো অবকাশ মেলে না। সেই কারণেই অপ্রাসঙ্গিক উপলক্ষ খুঁজে অপ্রাসঙ্গিক উদ্যোগ নিতে হয়। প্রসঙ্গ থাকেন শঙ্খ ঘোষই।

–দেবেশ রায়। শতসানুদেশ, ভূমিকা। দে’জ, ২০০৩।

শঙ্খ ঘোষের ৭২-এর জন্মদিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছিলেন সাহিত্যিক দেবেশ রায়। ‘শতসানুদেশ’ নামের এই সঙ্কলন তৈরি হয়েছিল দেবেশ রায়ের একক উদ্যোগে। বিশেষ কিছু বলেননি। শুধু বলেছিলেন একটা লেখা চাই, তুমি যে বিষয়ভাবনা নিয়ে লেখালেখি করো, তেমনটাই। পরে, বিশেষ একটি দিনে, সকাল সকাল পৌঁছে যেতে বলেছিলেন নির্দিষ্ট গন্তব্যে।

ঠিক দিনে, ঠিক সময়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম। তেমন লোকজন বিশেষ ছিল না সেখানে। সামান্য সময় পর দেখলাম, প্রায় সমবয়সি, এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন, কোনও কিছু খুঁজছেন! এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, তিনিও দেবেশ রায়ের কথামতো এখানে এসেছেন। তিনি অমিতেশ সরকার। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেবেশদার আবির্ভাব। সঙ্গে অরুণ সেন-শান্তা সেন, জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায়-মালবিকা চট্টোপাধ্যায়, কাকলি রায়, স্বপ্না দেব, সমরেশ রায়, আরও কেউ কেউ। সবার কথা ঠিক স্মরণে নেই এই মুহূর্তে। দেবেশদার নেতৃত্বে আমরা সদলবলে প্রবেশ করি শঙ্খদার ফ্ল্যাটে, স্বল্প পরিসরে এত মানুষের উপস্থিতিতে কিছুটা অবাক হয়েছিলেন তিনি। হয়তো আগের থেকে কোনও অনুমান করতে পারেননি। দেবেশদাই তুলে দিয়েছিলেন কবির জন্মদিনে কবির হাতে এই সঙ্কলন-গ্রন্থ। এর আগে বা পরে কোনওদিনই শঙ্খদার জন্মদিনে উপস্থিত হইনি তাঁর ফ্ল্যাটে। দূর থেকে প্রণাম জানিয়েছি। দু হাজার একুশের জন্মদিনে সেই সুযোগ অধরাই থেকে গেল। ‘শতসানুদেশ’— এই সঙ্কলনের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন শঙ্খ ঘোষ এবং দেবেশ রায়, অরুণ সেন— আরও কত প্রিয়জন। সবই আজ স্মৃতিতে, স্মরণে…

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5420 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.