তিনটি অণুগল্প

তিস্তা চক্রবর্তী

 

আত্মজা

“বাবা দেখো এই কাচবসানো চুড়িগুলো, এগুলো আমরা যেবার রাজস্থান বেড়াতে গেছিলাম সেবার তুমি আমায় কিনে দিয়েছিলে… মনে আছে? আর এই ঝুমকোটাও…শীলারটা যদিও বেশি সুন্দর ছিল। তুমি তো ওকেই বেশি ভালোবাসতে, তাই আমার ওটা পছন্দ জেনেও ওকে দিয়ে দিয়েছিলে! তোমার খালি এক কথা, ‘তুমি না বড়, ছোটদেরকে কখনও হিংসে করতে নেই জানো না!’ ধুর, আমি সবসময় বড় সেজে ঠকে যাই… ওম্মা…! এটা তো আমার সেই গোলাপি মুক্তোর হারটা! বুড়িপিসি এনে দিয়েছিল পুরী থেকে। রংটা এখনও কী সুন্দর আছে দেখেছ! সত্যি, মা এত যত্ন করে গুছিয়ে রেখেছে সব! বাবা জানো, মা বলে গোলাপি রঙে নাকি আমায় সবচেয়ে বেশি মানায়…”

গায়ে একটা ফ্যাকাশে গোলাপি নাইটি, শাড়ি সামলাতে পারে না বেশ কয়েক বছর ধরেই। সকাল থেকে বিছানায় সাতরাজ্যের পুরনো হাবিজাবি ঝুটো গয়না মেলে বসেছে মঞ্জুলা। পরে পরে দেখাচ্ছে সমরেশকে। সমরেশ মিটিমিটি হাসছেন এসব কাণ্ডকারখানা দেখে। মাঝে মাঝে আদর করে ওর কাঁচাপাকা চুলগুলো ঘেঁটে দিচ্ছেন মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার ছলে… নাহ্, চেহারাটা বড্ড ভেঙে গেছে মঞ্জুলার। সমরেশের চোখে সদ্য উনিশের পানপাতা মুখখানা ভেসে ওঠে থেকে থেকে…

বেলা সাড়ে এগারোটা বাজে। আর দেরি করা ঠিক হবে না। সমরেশ হাঁক দিলেন,

–শীলা, তোমার শাশুড়িমার স্নানের সময় হয়ে গেছে। গিজারটা অন করে দাও।

 

কন্যাদান

–শালা মেড়োর জাত… বাঙালির পেটে লাথি মেরে ব্যবসা করে চলেছে যুগ-যুগ ধরে। আর মানুষও হয়েছে তেমনি, হামলে পড়ছে সারাক্ষণ সেখানেই। এটুকুও বোঝে না, ওই ঠান্ডা সরবত খাইয়ে আর দুটো মিষ্টি-মিষ্টি কথা বলে শেষমেষ পুরো গলাটাই কেটে নেবে ঘ্যাঁচ করে…

তেমাথার মোড়ে নতুন গজিয়ে ওঠা খেলনার দোকানটার দিকে তাকিয়ে মাঝেমাঝেই এমন তিতকুটে শব্দ উগড়ে দেয় শ্যামল। ঈর্ষায় বুক জ্বলে যায় তার। ঝলমলে আলো, সুদৃশ কাচের দরজা আর দুর্দান্ত সব খেলনা… রিমোটটেপা গাড়ি, রোবট, বার্বিডল আরও কত কীসব… সবকটা নামও জানা নেই তার…

রংচটা দেওয়াল থেকে শিব-কালী-লক্ষ্মী-গণেশ হোক বা হনুমানজী-রামকৃষ্ণদেব-লোকনাথবাবা, সকলেই ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে তার দিকে। ভাগ্যের ফেরে লটকে থাকতে-থাকতে সে বেচারাদের মুখ থেকেও বরাভয় হাসিটি বিদায় নিয়েছে! আগে সকালবিকেল দুটো ধূপ বরাদ্দ ছিল ওনাদের জন্য। উৎসবের দিনটিন থাকলে মালাটালাও জুটে যেত কখনওসখনও। এখন সেসব অতীত। একটা ধূপকাঠিকেই ভেঙে আধখানা করে দুবেলার নিয়মরক্ষাটুকু সেরে ফেলতে হয়।

নিজের ফাটা কপাল আর মারোয়ারির মালামাল ব্যবসাকে মনে-মনে বাপবাপান্ত করতে-করতে নিজের দোকানের সস্তা খেলনাপাতির প্যাকেটগুলোর গায়ে জমে ওঠা ধুলোর পরত মুছতে থাকে শ্যামল। ভাগ্যিস আজকাল মালতীর পরামর্শে কিছু ইমিটেশন গয়নাগাটি-টিপ-নেলপালিশ এসব রাখাও শুরু করেছে। তাই কোনওমতে টিকে আছে এখনও এই বাজারে… নাহলে যে হারে দোকানপাট বাড়ছে, এতেও না কোনদিন শনির দৃষ্টি এসে পড়ে!

–একটা চোখ পিটপিট পুতুল কিনে দাও না মা…
–আবার বায়না কচ্ছিস বিন্নি! বলচি না অত পয়সা নেই আমার কাছে। চুপচাপ পা চালা… সারাক্ষণ খালি এই কিনে দাও ওই কিনে দাও… জ্বালিয়ে খেলে যেন…

একটা বছর সাতেকের মেয়ে। একমাথা কোঁকড়া তামাটে চুল। ঘ্যানঘ্যান করেই চলেছে মায়ের হাত ধরে যেতে-যেতে…

দৃশ্যটা ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই শ্যামল হাঁক দিল জোরে,

–এই বাচ্চা… এদিকে আয় দেখি একবার।

মেয়ের মা ভুরু কুঁচকে বলে ওঠে তাড়াতাড়ি,

–না না, ওসব পুতুল-ফুতুল কিনতে পারবুনি গো দাদা, এই চল চল…

জংধরা স্টিলের আলমারি থেকে শ্যামল ততক্ষণে বের করে ফেলেছে মালটা। মেয়েটার হাতে ধরিয়ে দিয়ে একটু গাল টিপে আদর করে। তারপর বলে,

–যা পালা…

মেয়েটার চোখের তারায় অপার্থিব খুশির ঝিলিক। মেয়ের মায়ের চোখে এখনও অবিশ্বাস লেগে। চলে যাচ্ছে ওরা। শ্যামল সেদিকে তাকিয়ে চট করে মুছে ফেলে অবাধ্য চোখ। মালতীর জন্য বুকটা টনটন করে ওঠে তার। একটা মেয়ের শখ ছিল খুব, দুজনেরই। কত আব্দার করে কিনেছিল এই সোনালি চুলের চোখ পিটপিট পুতুলখানা ধর্মতলা থেকে…

বিবর্ণ দেওয়াল জুড়ে আজ অনেকদিন পর হর-পার্বতী ও তেনাদের সাঙ্গপাঙ্গরা মিটিমিটি হাসছেন।

 

প্রস্থান

লোকটা শুধুই খোঁজে। কী খোঁজে সেটা ঠিক করে বলা কঠিন, তবে প্রাণপণে খোঁজে। ঝোপেঝাড়ে আদারেবাদারে আলোয়আঁধারে কুয়াশায়রোদ্দুরে— খোঁজার কোনও শেষ নেই তার। হারানের চায়ের গুমটির পেছনেই থাকে লোকটা। ভাঙাচোরা কীসব কুড়িয়ে নিয়ে জড়ো করে তার একচিলতে ছিটেবেড়ার ঘরে। মাঝেমাঝে দোকানের সামনে টাঙানো বিবর্ণ শব্দগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে… “বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়…” কী বোঝে কে জানে! অবশ্য হারানই বা এসব কতটুকু বোঝে…

তবে কখনও কাউকে বিরক্ত করে না লোকটা, কথাবার্তাও বলে না বিশেষ। খাওয়াদাওয়া… কে জানে কীভাবে জোটে!

লকডাউনের আঁটোসাঁটো বাজারে এমনিতেই কদিন হল খদ্দের বেশ কম হারানের দোকানে। লোকটাকে এর মধ্যে একদিনও বেরোতে দেখেনি কেউ তার ঘর থেকে। মরেটরে গেল নাকি! একবার খোঁজ তো নিতেই হয়…

লোকটার ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে গলাখাঁকারি দেয় হারান। কোনও সাড়া মেলে না। বার দুয়েক হাঁক ছাড়ে, লাভ হয় না তাতেও। একপ্রকার বাধ্য হয়েই প্রায় ভাঙা দরজাটার গায়ে আলতো ধাক্কা দেয়। দরজা হাট করে খুলে যায়। কেউ নেই ভেতরে। অথচ দড়িতে দিব্যি ঝুলছে ভাঁজ করে রাখা ময়লা জামাপ্যান্ট, দেওয়ালে লটকানো বাসি ক্যালেন্ডারে নীল রঙের মাকালী আর শিবঠাকুর— আছে তোবড়ানো কিছু বাসনকোসন, ভাঙা মোম, দেশলাই, চাকা খুলে যাওয়া বাচ্চার সাইকেল, জটপড়া চুলের ময়লা পুতুল, পাতলা হয়ে আসা একজোড়া হাওয়াই স্যান্ডেল আরও না জানি কত কী…

তেলচিটে তোষকের ওপর ওটা কী পড়ে আছে?… উইয়ে কাটা আধখোলা একটা বই। সামনের মলাটটা খানিক ছিঁড়েখুঁড়ে গেলেও, রথের দড়ি ধরে বসে থাকা কৃষ্ণকে দেখেই হারান চিনে ফেলল বইটা। গীতা।

শুধু লোকটা কোথাও নেই।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3604 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. ‘প্রস্থান’ ভাল লাগল।
    মাঝেমাঝে দোকানের সামনে টাঙানো বিবর্ণ শব্দগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে… “বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়…” কী বোঝে কে জানে! অবশ্য হারানই বা এসব কতটুকু বোঝে…
    হারানের পরিচয় না দিয়েই হারানের প্রসঙ্গ এসে গেছে। খুব সম্ভবত “মাঝেমাঝে হারানের দোকানের” হবে।

Leave a Reply to ইন্দ্রজিৎ ঘোষ Cancel reply