প্রসঙ্গ রবীন্দ্র সরোবর: তবু সুমিতাদের লড়াই থামে না…

চার নম্বর নিউজডেস্ক

 

১৯২১ সাল। এক জলা জায়গায় খননকাজ। পরিণতিতে একটি হ্রদ। বর্তমান সময়। গড়ে দিনে ১০০০০ মানুষের আগমন। অপরূপ এক জীববৈচিত্রের সমাহার। পরিযায়ী পাখির মেলা। ১৯২ একর জায়গা জুড়ে তৈরি এক জমির ভেতর জলভাগ ৭৩ একর জায়গায়। প্রায় ১১০০০টি গাছের ভেতর অধিকাংশই ৭০ বছরেরও বেশি প্রাচীন। ১৯৯৭ সালে দেশের পরিবেশ মন্ত্রকের অধীন ন্যাশনাল লেক কনজারভেটরি প্রোগ্রামের পক্ষ থেকে জলাশয়টিকে জাতীয় হেরিটেজের তকমা। এককথায়— রবীন্দ্র সরোবর লেক।

অবশ্য এ তো অনেকেরই জানা। নতুনত্ব কোথায়? গল্প কোথায়? সেকথায় আসার জন্যই হয়ত প্রেক্ষিতের অবতারণা।

এই লেকেই প্রাতঃভ্রমণ করতে আসা মানুষজন। লেক লাভার্স ফোরাম। যার নেতৃত্বে দুর্গাপুরের মেয়ে সুমিতা ব্যানার্জি। ১৯৯০ সালে কলকাতায় পড়তে এসে বাংলায় স্নাতকোত্তর হয়ে শিক্ষকজীবনকে পেশা করে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় থেকে যাওয়া সুমিতার নেতৃত্বে রবীন্দ্র সরোবরকে ভালোবেসে একদল মানুষের ক্রাউডফান্ডিং। কিন্তু, শুরুটা কোথায়? অর্ঘ্যর কথাই ধরি। লেকে ঘুরতে আসা ছেলেটির বাবা হঠাৎই দুর্ঘটনায় চলে যান। আকস্মিকভাবে অর্থাভাবে পড়ে যাওয়া অর্ঘ্য এবং তার মায়ের জন্য লেক লাভার্স ফোরাম থেকে চাঁদা তুলে ২০০০ টাকা শুরু করে শেষমেশ ৬ লাখ পর্যন্ত জমা হয়। ফোরামের নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। অর্ঘ্যরা জীবন পায়, আশা পায়, বেঁচে থাকতে শেখে।

এ তো গেল ব্যক্তিগতভাবে পাশে থাকার ইতিহাস। এর বাইরেও অন্য গল্প। বৃহত্তর গল্প। ২ কিলোমিটার দূর থেকে রোজ সকালে লেকে হাঁটতে আসা সুমিতার রুটিন বলতে হাঁটার চেয়েও অনেক বেশি পরিবেশের কাজ করা। লেক এলাকায় হকারদের নিয়ন্ত্রণ, নাগরিক ও এলাকাবাসীদের যত্রতত্র আবর্জনা ফেলতে নিষেধ করা, সচেতনতার বিকাশ, লেক এলাকায় কড়া পাহারা, সরকারি বেসরকারি আধিকারিকদের সঙ্গে লেক বাঁচানোর জন্য আলাপ-আলোচনা— গত দু দশক ধরে সুমিতার জীবন এমনই। ভোর সাতটা থেকে দুপুর তিনটে— এই স্বাভাবিক রুটিনের বাইরেও কখনও কখনও সন্ধে করে ফেরেন বাড়ি। ক্লান্তিতে লেকের জলের কথা মনে করে শুয়ে পড়েন সুমিতা। কাজের আনন্দে…

১০০০-এরও ওপর প্রাতঃভ্রমণকারীর সই সংগ্রহ করে সুমিতাদেবীদের লড়াই তাঁদের প্রথম মঞ্চ পায় ২০১৪ সালে, যখন হাইকোর্ট থেকে লেকের ভেতর হকার নিয়ন্ত্রণে আদেশ জারি করা হয়। ২০০৫-০৬ সালে লেকের সৌন্দর্যায়নের নামে জীববৈচিত্র ধ্বংস করে দেওয়া প্রচেষ্টাকেও দৃঢ় হাতে প্রতিহত করেছিলেন সুমিতারা। এর বাইরেও চলে আসে ধর্মীয় বেড়াজাল, যেখান থেকে বেরোনো অসম্ভব কঠিন। ছটপুজোর সময় লেকের জলে বিভীষিকা। প্রতি বছরে নিয়ম করে প্লাস্টিক, থার্মোকল, ৫০ লিটারেরও উপর তেল— লেকের জলকে রিক্ত করে দিত আচারসর্বস্বতা। একটি পিটিশনে সে সমস্তও বন্ধ করেন সুমিতা। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর পরিবেশবিদ সুভাষ দত্তের মধ্যস্থতায় ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনালের পক্ষ থেকে রবীন্দ্র সরোবরে সমস্ত ধর্মীয় ও সামাজিক রীতি নিষিদ্ধ করা হয়। আরেক ধাপ জেতেন সুমিতাদেবীরা। আর তার পরেই এক ভয়ঙ্কর সময়। ট্রাইবুনালের রায়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ২০১৯ সালে ১৫০০০-এরও ওপর ভক্ত লেকের গেট ভেঙে ঢুকে পড়ে তাণ্ডব চালায়। বাজি, বোমা, ডিজে এবং সর্বোপরি ভয়ঙ্কর জলদূষণ। এতদিনের সমস্ত পরিশ্রম জলে ধুয়ে যেতে দেখলেন সুমিতাদেবী। সাউথ এশিয়ান ফোরাম ফর এনভায়রনমেন্টের হিসেব বলছে, এই ঘটনা প্রতি লিটার জলে ২২.৩ মিলিগ্রাম তেল এবং গ্রিজ নিক্ষেপ করেছিল, যেখানে পারমিশিবল লিমিট প্রতি লিটারে ১০ মিলিগ্রাম। অন্য একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১৮-১৯ সালে পোঁতা প্রায় ৫০ লাখ চারাগাছ ধ্বংস হয়েছিল ২০১৯-এর ওই একটি দিনে। এখানেই শেষ না। লেকের রক্ষক অর্থাৎ কাস্টডিয়ান কলকাতা মেট্রোপলিটান ডেভেলপমেন্ট অথরিটির পক্ষ থেকে খোদ লেক ধ্বংস করতেই ট্রাইবুনালের রায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে সুপ্রিম করতে মামলা রুজু করা হল, বলা হল ধর্মীয় ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হোক। যদিও কোর্ট সেই হাস্যকর দাবি মানেনি।

সুমিতা সেই দিনগুলো মনে করতে পারেন। বহু রাত ঘুমোতে পারেননি। নার্ভাস ব্রেকডাউন। শারীরিক এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়া এই লড়াকু নারী হালটুকু ছাড়েননি যদিও। ২০২০ সালে সেই কেএমডিএ-র পক্ষ থেকেই লেকে ভক্তদের ঢুকতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। নেওয়া হয় জরুরি বেশ কিছু পদক্ষেপ। লেকের কাছাকাছি ছটপুজোয় তারপর থেকে আর অনুমতি মেলেনি, দেখা যায়নি তাণ্ডব।

সুমিতা এইসব আলো আঁধারির ভেতর বেঁচে থাকেন। ধর্ম, উন্নয়ন, মানুষের সচেতনতার অভাব ছাড়াও দেখতে পান সরকারি বা কর্পোরেট লবি, রাজনীতির করাল রূপ। এমনকী হত্যার হুমকি, প্রচেষ্টাও। ২০১৮ সালে সুমিতার গায়ে পেট্রোল ঢেলে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হয়। খোদ সিসিটিভির সামনে ঘটলেও মাত্র একদিনের মধ্যেই ছাড়া পেয়ে যায় দুষ্কৃতীরা। মিথ্যে মামলায় সুমিতাকে জড়িয়ে অন্যভাবে লেক লাভার্সদের আটকানোর চেষ্টাও কম হয়নি তারপর।

সুমিতা এইসব, ভয় এবং ভালোবাসার মধ্যেই বেঁচে আছেন। লেকের জল, মাছ, বৃক্ষের সারির ভেতর বেঁচে আছেন। রিলকের কবিতার মতো। ‘বিউটি অ্যান্ড টেরর’। সুমিতা জানেন এই দুই মুখেরই মুখোমুখি হতে হবে তাঁকে, তাঁদের। সুমিতা জানেন, তাঁরা লড়বেন…

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. অত্যন্ত জরুরি একটি মন খারাপ-ভালো করা লেখা।

Leave a Reply to হীরক সেনগুপ্ত Cancel reply