উত্তরপ্রদেশ নির্বাচন: কয়েকটি প্রাথমিক কথা

নীলাশিস বসু

 



রাজনৈতিক কর্মী

 

 

 

 

২০২১ সাল বাংলার নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে ছিল গোটা দেশ; আর আসন্ন ২০২২ সালের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ বোধহয় হতে চলেছে উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন। মোদি সাম্রাজ্যের প্রকল্পিত হিন্দুত্ববাদী শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ল্যাবরেটরি হল এই উত্তরপ্রদেশ। বিজেপির হিন্দুত্ববাদের পোস্টার বয় হলেন উত্তরপ্রদেশের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী অজয় মোহন বিস্ত, যিনি যোগী আদিত্যনাথ নামেই সর্বাধিক প্রচারিত। গেরুয়াধারী সন্ন্যাসীর এইভাবে মুখ্যমন্ত্রীত্বের আসনে বসা ভারতের ইতিহাসে বিরল। সেই যোগী সরকারের অগ্নিপরীক্ষা সামনের ২০২২ সালে। এই নির্বাচন বিজেপির শাসনব্যবস্থা ও তাঁর সামগ্রিক রাজনীতির কাছেই অগ্নিপরীক্ষা। এই নির্বাচনে বিজেপি হারলে নিঃসন্দেহে সেটা হবে বিজেপির জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা। যদি জেতেও এবং বিরোধীরা আগের তুলনায় শক্তিশালী হয় সেটাও বিজেপির জন্য মোটেও সুখকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে না।

বিভক্ত হওয়ার পরেও উত্তরপ্রদেশ বিধানসভাই দেশের সবচেয়ে বড় বিধানসভা। ৪০৩ আসন বিশিষ্ট এই বিধানসভায় বর্তমান সমীকরণটা দেখলেই বোঝা যাবে কেন আসন্ন নির্বাচন গোটা দেশের কাছেই ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে! বর্তমান উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার ছবিটা অনেকটা নিম্নরূপ:

  • এনডিএ— ৩১৮টা আসন (বিজেপি ৩০৯, এডিএস ৯)
  • সপা নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট— ৫৯টা আসন (সপা ৫৪, এসবিএসপি ৪, পিএসপিএল ১)
  • বিএসপি— ৫টা আসন
  • কংগ্রেস— ৫টা আসন
  • অন্যান্যরা— ৭টা আসন
  • বর্তমানে ৮টা আসন বিধায়ক শূন্য

এই অবস্থায় বিরোধীদের কাছে নিঃসন্দেহে বড় চ্যলেঞ্জ বিজেপি-বিরোধী বৃহত্তর জোট গঠন করে সব শক্তিকে সেখানে সমাবেশিত করা। বিরোধী শক্তি হিসেবে সমাজবাদী পার্টিকেই এই সমাবেশিত করার কাজটা করতে হবে। আর এই নির্বাচনের আগে বিরোধীদের কাছে অবশ্যই শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলনের শিক্ষা। যে আন্দোলন প্রমাণ করে দিয়েছে বিজেপিকে পিছু হটানো সম্ভব। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে উত্তরপ্রদেশের মুজফফরনগরের ভয়াবহ দাঙ্গা, যা সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ভোটকে সংহত করতে বিজেপিকে বড় সাহায্য করেছিল; সেই মুজফফরনগরেই কয়েক লাখ কৃষকের মহাপঞ্চায়েত থেকে বিজেপির দিকে চ্যলেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে ১০০টা বিধানসভা আসন আছে। এইখানেই ২০১৪ লোকসভা আর ২০১৭ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি সবচেয়ে বড় জয় পেয়েছিল। কার্যত এই ক্ষেত্রের ওপর ভর করেই ডানা মেলেছিল মোদি-যোগীর বিজয়রথ। এবার সেই পশ্চিম উত্তরপ্রদেশই হয়ে উঠেছে যোগী শাসনের কাছে সবথেকে সঙ্কটের। যে জাঠ এবং মুসলমানদের মধ্যে ২০১৩ সালের দাঙ্গাকে কাজে লাগিয়ে বিজেপির ক্ষমতায়ন, কৃষি আইনের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই জাঠ ও মুসলিম ঐক্য কার্যত ভীত করে তুলেছে বিজেপি নেতৃত্বকে। বিশ্লেষকদের কথায় এই সমীকরণ এবারে যথেষ্ট বেগ দেবে বিজেপিকে। বিরোধীদের কাছেও চ্যালেঞ্জ এই সমীকরণকে কতটা তারা নিজেদের পক্ষে আনতে পারবে!

সমাজবাদী পার্টি এবং কংগ্রেস যদি এক জায়গায় আসতে পারে তাহলে বিজেপির জন্য সেটা চিন্তার বিষয় হবে। বর্তমানে বহুজন সমাজ পার্টির অবস্থান খুবই অস্পষ্ট এবং ধোঁয়াশাময়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ইস্যুতে সমাজবাদী পার্টি কিছুটা রাস্তায় থাকলেও বিএসপি কার্যত অদৃশ্য। কংগ্রেসের নিচুস্তরে সাংগঠনিক ভিত্তিকে সংহত করার ক্ষেত্রে সঙ্কট আছে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধিকে মুখ করেও সাংগঠনিক এই সমস্যার সমাধান আদৌ হবে কিনা তা সময় বলবে। কিন্তু লাগাতার যে বিক্ষোভ বিভিন্ন পরিধিতে উত্তরপ্রদেশ জুড়ে দেখা গেছে সেখানে প্রধান বিরোধী দলগুলির অনুপস্থিতি দৃষ্টিকটু। সীমিত শক্তি নিয়েও বাম দলগুলো বরং সেই চেষ্টা চালিয়ে গেছে। তার ফলও দেখা গেছে, উত্তরপ্রদেশের বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচনে সিপিআই (এম-এল), হিন্দি বলয়ে যা ভাকপা (মালে) নামে বেশি পরিচিত, তারা সহ বামপন্থীরা বেশ কিছু পঞ্চায়েত সমিতি, মুখিয়া পদে জয়ী হয়েছে। তাই শুধুমাত্র বড় বিরোধী দলগুলোর মধ্যে আটকে না থেকে নীচুতলার আন্দোলনের সমস্ত শক্তিকেই ঐক্যবদ্ধ করাটা সময়ের দাবি।

প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলির সমীকরণের বাইরেও আলোচনার বৃত্তের বাইরে থেকে যায় উত্তরপ্রদেশব্যাপী ক্রমবর্ধমান যুবকদের ক্ষোভের খবর। যোগী ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে যেকোনও সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রেই যে চরম দুর্নীতি, তার বিরুদ্ধে উত্তরপ্রদেশ জুড়ে বারবার ক্ষোভে ফেটে পড়েছে সেখানকার যুব সম্প্রদায়। এই কয়েক বছরে ঘটে গেছে কর্মসংস্থানের দাবিতে একের পর এক বিশাল বিশাল আন্দোলন। আসন্ন নির্বাচনের আগে প্রায় সবকটা জেলাতে ‘রোজগার অধিকার সম্মেলন’ করে লখনউতে ‘রোজগার অধিকার সমাবেশ’ করে জানান দেওয়া হয়েছে যোগী সরকারের বিরুদ্ধে কাজের অধিকারের দাবি এইবারের নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

বিজেপির হিন্দু ভারত কেমন হবে তার নজির উত্তরপ্রদেশ। একের পর এক ভিড়-হত্যা সংগঠিত করা, দাঙ্গার বীজ বোনা, গণতন্ত্রের নামে প্রহসন, যে কোনও বিরোধী স্বরকে গ্রেপ্তার, পুলিশরাজ, বিরোধী দলের নেতৃত্বকে হয় গৃহবন্দি অথবা তাদের পার্টি অফিসে পুলিশ দিয়ে আটকে রাখা ব্রিটিশ শাসকের কায়দায়, মিটিং-মিছিলে গুলি-লাঠি চালনা এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে গেছে। এহেন উত্তরপ্রদেশে তাই বিরোধীদের কাছে ইস্যুর অভাব নেই, গণক্ষোভও যথেষ্ট মজুত রয়েছে। তাকে দিশা দেওয়া এবং ঐক্যবদ্ধ করার কাজটাই বিরোধীদের করতে হবে।

উত্তরপ্রদেশে সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলনের এই ব্যাপ্তি বিজেপির ভ্রূ কুঞ্চিত করার যথেষ্ট কারণের জন্ম দিয়েছে। অনেকে বলছেন সামনের উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনের দিকে তাকিয়েই ভীত হয়ে বিজেপি কৃষি আইন প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু তাতেও চিঁড়ে ভিজবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে। উত্তরপ্রদেশই হয়ত হয়ে উঠবে মোদি-যোগীর ওয়াটারলু। এখন অপেক্ষা ২০২২ সালের।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...