বিজেপি-র উত্তরপ্রদেশ মডেল— দুটি ঘটনা

পীযূষ দত্ত

 



বাংলা সাহিত্যের ছাত্র

 

 

 

 

কটা মাস কাটলেই ২০২২, উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন। ইতিমধ্যেই জাতীয় স্তরে নির্বাচনী হাওয়ার আঁচ অল্প হলেও পাওয়া যাচ্ছে। বিজেপির শেষ সম্বল হতে পারে এই রাজ্য। একাধিক রাজ্যে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর, উত্তরপ্রদেশ-ই রইল, ফের আরেকবার জাঁকিয়ে বসার জন্য।

বিজেপির যে ‘মডেল’-এর প্রচার গুজরাট দিয়ে শুরু হয়েছিল, সেই মডেলের তালিকায় ২০১৭ পরবর্তীতে উত্তরপ্রদেশের নাম যে যুক্ত হয়েছে, তা বলা বাহুল্য। ছবিতে, প্রচার ব্যানারে, ভাষণে, সর্বত্র আলোচিত উত্তরপ্রদেশ, মোদির মাস্টারস্ট্রোক। ২০১৭-র বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি উত্তরপ্রদেশ দখল করে ৪০২-এর মধ্যে ৩১২-টা আসন নিয়ে।

এই বছরের নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়েও, বিভিন্ন প্রচারে উঠে আসছে উত্তরপ্রদেশ মডেল। উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার অসামান্য সাফল্য, নারী সুরক্ষা, চাকরি, কৃষি, পিছিয়ে থাকা জাতিদের অবস্থানগত উন্নতি, আরও একাধিক বিষয়। তবে এই সমস্ত উন্নয়নের মডেল, প্রচার, ভাষণের আড়ালে রয়েছে এমন কিছু খবর, যা, এই মডেলকে, উত্তরপ্রদেশ সরকারকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে। খানিক হলেও ভ্রূ কুঁচকে দেয়।

যখন প্রচারে লাগাতার সামনে আনা হচ্ছে যে উত্তরপ্রদেশে ৪ লক্ষ লোককে চাকরি দেওয়া হয়েছে যার মধ্যে ১ লক্ষ নারী, তখন উত্তরপ্রদেশে ১৫৭ দিন ধরে শিখা পাল তার বাদবাকি সহকর্মীদের নিয়ে অবস্থানে বসে রয়েছেন। শিখা পাল হলেন সেই ২৬,০০০ জনের একজন, যারা স্কুলে শিক্ষকতার চাকরির জন্য অপেক্ষারত। জানা যাচ্ছে, শেষ ১০৬ দিনে, শিখা পাল এডুকেশন ডাইরেক্টোরেটের নিশাতগঞ্জের ক্যাম্পাসে একটি ১০০ ফুট জলের ট্যাঙ্কের উপর বসে অবস্থান করছেন। এরপরেও উত্তরপ্রদেশ সরকারের দিক থেকে কোনওরকম পদক্ষেপ নজরে আসছে না।

এদিকে বেসিক এডুকেশন ডিপার্টমেন্টের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী উত্তরপ্রদেশে ১,১৩,২৮৯টি সরকারি স্কুল, যার মধ্যে ৪৫,৬২৫ উচ্চ প্রাথমিক স্কুলে মোট ৭২,৭১২টি সহশিক্ষকের পদ খালি পড়ে রয়েছে। গ্রামের উচ্চ প্রাথমিক স্কুলগুলিতে ৫১,১১২টি শিক্ষকের পদ খালি পড়ে রয়েছে।

ফলত, শিক্ষক নিয়োগে এই ঘাটতির ফলেই নজরে আসছে উত্তরপ্রদেশের শিক্ষাক্ষেত্রের বেহাল দশা, চাকরির জরাজীর্ণ বাজার এবং উত্তরপ্রদেশ মডেলের কঙ্কালসার রূপ।

‘উত্তরপ্রদেশ মডেলের কঙ্কালসার রূপ’ আলোচনা হয়ত এখানেই থামানো যেত, কিন্তু আমরা যদি আরেকটু গভীরে হাতড়াই তবে এই মডেলের আরও কটা দিক খুঁজে পাব। ২০২১-এর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগেও একাধিক জায়গায় ‘বঙ্গ’ বিজেপি নেতানেত্রীদের উত্তরপ্রদেশের উদাহরণ টানতে দেখা গেছে, বিশেষত গরুপাচার, মুসলিম ‘তোষণ’, আইনশৃঙ্খলা জাতীয় আলোচনা যখন-ই উঠেছে। উত্তরপ্রদেশ মডেলের নাম করে একাধিক জায়গায় ‘এনকাউন্টার করে দিতাম’ জাতীয় উচ্চারণ-ও করা হয়েছে। এবার প্রশ্ন হল এই উত্তরপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ মডেল, আইনশৃঙ্খলা, এনকাউন্টার, এগুলির সম্পর্কটা ঠিক কী?

দ্য ওয়ারে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ২০১৭ সালে যোগী আদিত্যনাথ ক্ষমতায় আসার পর থেকে উত্তরপ্রদেশে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখবার নামে ৮,৭৪২টা এনকাউন্টার হয়েছে। যার মধ্যে ৩,৩০০ জন এনকাউন্টারে গুরুতরভাবে আহত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ১৪৬ জনের। যদিও বরাবরের মতোই প্রতিটা এনকাউন্টারের পর উত্তরপ্রদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে ‘ভয়াবহ সংঘাত’-এর গল্প ফাঁদা হয়েছে। গল্পের গরু গাছে চড়েছে। পুলিশের গল্পের ধাঁচা প্রতিটা এনকাউন্টারের ক্ষেত্রেই মোটের উপর একই থেকেছে। প্রথমে আসামি-রা গুলি চালায়, এবং তখন আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়। সম্প্রতিক কালে ঘটে যাওয়া এনকাউন্টারের ক্ষেত্রেও এ গল্পের বিশেষ হেরফের নজরে আসে না।

উত্তরপ্রদেশের লোনি অঞ্চলে সাতজন মুসলিম যুবককে গোহত্যা এবং গরুপাচারের অভিযোগে গ্রেফতার করেছে গাজিয়াবাদ পুলিশ। তবে প্রতিটি অভিযুক্তের ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, তাদের পায়ে, অর্থাৎ হাঁটুর কিছুটা নিচে ক্ষতচিহ্ন। সাতজনের-ই এক জায়গায়। পুলিশের মত জানতে চাইলে, সামনে আসে সেই সংঘাতের গল্প। পুলিশের কথা অনুযায়ী তারা লোনির একটি গোডাউনে রেইড চালায় এবং সেখানে এই সাতজন অভিযুক্ত পুলিশকে লক্ষ্য করে সাত রাউন্ড গুলি চালায় তাই পুলিশ পাল্টা তেরো রাউন্ড গুলি চালাতে বাধ্য হয়। অভিযুক্তদের পরিবারের মতে তারা কেউ গোহত্যা তো দূরস্থান, গোপাচারের সঙ্গেও যুক্ত ছিল না। তাদের মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরিবারের মত অনুযায়ী এই যুবকরা স্রেফ মুসলিম হওয়ায় তাদের ফাঁসানো হয়েছে। শোয়েব, মুস্তাকিন, শালমান, মোনু, ইনতেজার, নাজিম এবং আরেকজন যুবক (যার নাম এখনও জানা যায়নি), এরা প্রত্যেকেই ঘরের একমাত্র উপার্জনকারী। ফলত এদের গ্রেফতারির সঙ্গে সঙ্গে দুমড়ে গেল সাত-সাতটা পরিবার।

উত্তরপ্রদেশের এই বিচার বহির্ভূত হত্যা, পুলিশের হাতে বাড়তি ক্ষমতা দেওয়ার মতো ঘটনাগুলোও আসলে ‘উত্তরপ্রদেশ মডেল’-এর অংশ। দেশের বিচারব্যবস্থা থাকার পরেও অভিযুক্তকে আদালতে তোলার আগেই হত্যা করা এবং এই হত্যাকে সমাজে ন্যায্যতা দেওয়ার মতো যে ভয়াবহ রীতি উত্তরপ্রদেশে প্রতিদিন নিজের ভিত শক্ত করছে, তা শুধু উত্তরপ্রদেশ নয়, গোটা ভারতকে নিয়েই চিন্তাভাবনা আরও খানিক বাড়িয়ে তোলে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4007 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...