বিলকিস বানো কেন আমার ভারতবর্ষের প্রতীক, কেন ওই এগারোজন নয়

সোমেন বসু

 



রাজনৈতিক ভাষ্যকার

 

 

 

এগারোজনই। অর্থাৎ সবাই। মুক্ত। কিন্তু, প্রথমেই এই ঘোষণাটা থাকুক— আমি, এই সামান্য নিবন্ধের সামান্যতর লেখক, ওই মানুষগুলোকে নিজের সহনাগরিক হিসেবে মানতে অস্বীকার করছি, ওদের সঙ্গে একজাতীয়তার সংশ্লেষণে আমার তীব্র আপত্তি এই নিবন্ধেই লিপিবদ্ধ থাকল। কারণ, আমি বিলকিস বানোকে আমার সহনাগরিক হিসেবে মানি। মেনে গর্ববোধ করি।

কেন করি?

মাত্র উনিশ বছর বয়সে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা একটি মেয়ে চোখের সামনে দেখেছিল তার মাকে ধর্ষিতা হতে; সেই ধর্ষিতা মা-সহ তার পরিবারের সাতজনকে খুন হয়ে যেতে যার মধ্যে তার তিন বছরের শিশুকন্যাও ছিল— সেই বাচ্চা মেয়েটার মাথাটা থেতলে দিয়েছিল এই যে এগারোজন বেরিয়ে এসেছে তাদের মধ্যেই এক নরপশু; গণধর্ষিতা হয়েছিল নিজেও— এই এগারোজনেরই হাতে; এবং এই সব নারকীয়তা ঘটে গেছিল অল্প কিছু সময়ের মধ্যে, এক-একটা ঘটনা— যার যে-কোনও একটাই কোনও মানুষকে সারাজীবনের জন্য ট্রমায় পাঠিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট— সংঘটিত হয়েছিল একদম ওপর-পড়া হয়ে, অফিসটাইমে লোকাল ট্রেনে যেমন ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষ একজন আরেকজনের ওপরে। এই ভয়াবহতার অভিঘাত সামলে সেই মেয়ে— বিলকিস বানো— শুধু উঠেই দাঁড়াননি, রুখে দাঁড়িয়েছেন। পুলিশ অভিযোগ নেয়নি, ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে বারংবার, ডাক্তার প্রমাণ লোপাট করেছে— ছাড়েননি বিলকিস। কেস সিবিআইয়ের হাতে গেছে, এবং সিবিআইয়ের হাতেই শেষ পর্যন্ত ২০০৪-এ ধরা পড়েছে লোকগুলো। তারপরও চলেছে লাগাতার ভয় দেখানো, প্রাণনাশের হুমকি— কেস সরে গেছে গুজরাট থেকে মুম্বাইতে। সেখানেই শেষমেশ বিলকিসের অদম্য লড়াই জেলে ঢুকিয়েছিল সেই এগারোজনের সব কটাকে। ন্যায়বিচার পেয়েছিলেন— এ-কথা বলার ক্ষমতা আমার নেই। কারণ যে-ঘটনা ঘটেছিল বিলকিসের সঙ্গে, কোনও বিচার দিয়ে তার ‘ন্যায়’-সঙ্গত প্রতিকার সম্ভব আমার মনে হয় না। তবু, এটুকু বলাই যায়, দেশের বিচারব্যবস্থা বিলকিসকে খালি হাতে ফেরায়নি শেষতক। ২০১৯-এ সুপ্রিম কোর্ট বিলকিস বানোকে ৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ, একটি সরকারি চাকরি, এবং একটি থাকার জায়গার ব্যবস্থা করে দিতেও নির্দেশ দেয় গুজরাট সরকারকে। অতএব, জিতেছিলেন বিলকিস— হেরেছিল সেই মানুষগুলো, যারা ২০২২-এর সেই নারকীয় গুজরাট নরমেধ যজ্ঞের হোতা ছিল।

তবু শুধু হার-জিতের মতো সরল হিসেবেও বিলকিসকে মাপা অন্যায়। বিলকিস বানো একটি প্রতীকের নামও বটে। রাণা আয়ুবের প্রত্যক্ষ-দর্শনের অভিজ্ঞতা শুনুন—

২০০২ সালের মে মাসের দুপুরে আমরা মুম্বাই থেকে কিছু ছাত্র-স্বেচ্ছাসেবক গুজরাটে গেছিলাম। লক্ষ্য ছিল আক্রান্ত মহিলা ও শিশুদের সাহায্য করা… বাসে করে গেছিলাম কম্বল, জামাকাপড় আর সামান্য যা কিছু জোগাড় করা গেছিল, তা নিয়ে। প্রত্যেক রিলিফ ক্যাম্পে নিজেদের গল্প শোনাচ্ছিলেন, দগদগে ঘা দেখাচ্ছিলেন কেঁদে-কেটে একসা হওয়া মহিলারা। বাচ্চারা মায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাইছিল, বায়না করছিল। কিন্তু মায়েরা শুনিয়েই চলেছিল তাদের ভয় আর ক্ষতের কাহিনি। তরুণীর শরীরে যে ঘা, তা ঘিরে মাছি ভনভন করছিল। সে সময়েও ক্যাম্পে ক্যাম্পে ফিসফিস করে তারা এক মেয়ের গল্প আওড়াত৷ দাহোড়ের সেই মেয়ে, যে গণধর্ষিত হয়েছে, যার পরিবারকে কেটে ফেলা হয়েছে, যার শিশুকে আছড়ে মারা হয়েছে, অথচ যে কিনা পুলিশে গেছে, যে কোর্টে দৌড়চ্ছে৷ সেই সাহসী মেয়েটিই বিলকিস বানো।

বিলকিস এরকমই একটি প্রতীক, যা একদিকে যেমন বারবার চোখে আঙুল দিয়ে গোটা জগৎকে দেখিয়ে দেয় সেই মুখগুলোকে যারা নাকি আজ সন্ত সাজতে চাইছে; অন্যদিকে সাহস জাগায় সেইসব নরকযন্ত্রণা ভোগ করা মানুষগুলির মনে যাঁদের সবক শেখাতেই আয়োজিত হয়েছিল সেই ঘৃণ্য নরমেধকাণ্ডের।

কিন্তু, আপাতত, মুক্ত সেই এগারোজন। আইনকানুন মেনেই হল সব কিছু। এরকম ঘটনা যে বিরল, তাও বলা যাবে না। ১৫ আগস্ট এবং ২৬ জানুয়ারি এরকম ক্ষমাপ্রদর্শন করা হয়ে থাকে বটে।

আইনকানুনের কথা উঠল যখন দেখা যাক। এই এগারোজনেরই সাজা হয়েছিল যাবজ্জীবন। সাজা ঘোষণা হয় ২০০৮ সালে। মুম্বাইয়ের স্পেশাল সিবিআই কোর্টে। এরা তার বিরুদ্ধে মুম্বাই হাইকোর্টে আপিল করে, এবং ২০১৭ সালে মুম্বাই হাইকোর্ট সে আপিল নাকচ করে সাজা বহাল রাখে। উল্লেখ থাক, বিশেষত এ-বিষয়ে একটা ভুল ধারণা যখন চালু আছে— যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের অর্থ যাবজ্জীবনই, কোনও ১৪ বছর বা ২০ বছরের কারাবাস নয়। এবার কিছু শর্তের ওপর ভিত্তি করে সরকার এরকম আসামিদের ক্ষমাপ্রদর্শন করতে পারে, সেই শর্তগুলির মধ্যে একটি হল অন্তত ১৪ বছর কারাবাস। কিন্তু সেটা কোনও নিয়ম নয়, একান্তই রাজ্য সরকারগুলির এ-সংক্রান্ত নীতিসাপেক্ষ, কার্যক্ষেত্রে ইচ্ছাধীনও বটে। যাই হোক, এদের সব মিলিয়ে জেলজীবনের মেয়াদ হয়েছিল ১৫ বছর ৭-৮ মাস। ১৪ বছর হওয়ার পর এরা মুক্তির আর্জি জানিয়ে গুজরাট হাইকোর্টে আপিল করে, কিন্তু যেহেতু এদের বিচার এবং রায়ের গোটা প্রক্রিয়াটিই হয়েছিল মুম্বাইতে, তাই গুজরাট হাইকোর্ট এ-ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করে। তখন এরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। এ-বছর মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় বিচার মুম্বাইতে হলেও, যেহেতু ঘটনাটি গুজরাটের, অতএব গুজরাট সরকার এদের আবেদনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী। এবং সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে গুজরাট সরকারের ১৯৯২ সালের রেমিট্যান্স পলিসি মোতাবেক, কারণ এদের সাজা ঘোষণা হয়েছিল ২০০৮ সালে, তখন গুজরাটে সরকারের ওই রেমিট্যান্স পলিসিটিই কার্যকরী ছিল। এটি বিশেষ করে উল্লেখের কারণ, ২০১৪ সাল থেকে গুজরাট সরকার নতুন রেমিট্যান্স পলিসি নিয়েছে। সেই নতুন রেমিট্যান্স পলিসির দুটি বিষয় এখানে উল্লেখ না-করলেই নয়। এক, ধর্ষণ এবং খুন বা গণধর্ষণ জাতীয় মামলার আসামিরা এই রেমিট্যান্স পলিসির আওতায় পড়বে না; এবং দুই, সিবিআই যেসব কেসে তদন্ত করেছে সেসব কেসের আসামিদেরও কোনও মুক্তিভিক্ষা গ্রাহ্য করা হবে না। যাই হোক, গুজরাট সরকারের বক্তব্য, এসব যেহেতু সেই ১৯৯২ সালের পলিসিটিতে ছিল না, অতএব তারা আইন মোতাবেকই এদের রেহাই দিয়েছে।

ঠিকই। আইন মোতাবেক বটেই! মুশরফখান পাঠান। গুজরাটের সবরমতী সেন্ট্রাল জেলে বন্দি রয়েছে ২৫ বছর। তার মুক্তিভিক্ষার আর্জি গুজরাট সরকার খারিজ করে ২০১৪ সালের পলিসি দেখিয়ে। পরে সে যখন গুজরাট হাইকোর্টে যায়, হাইকোর্ট গত এপ্রিল মাসে সরকারকে বলে ১৯৯২ সালের পলিসি অনুযায়ী এই আবেদন বিচার করতে। ছয় সপ্তাহের মধ্যে। পাঠান জেলেই আছে এখনও। মহম্মদ উমর উর্ফ ফাইটারও। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত উমর ২০ বছর জেলে কাটানোর পর মুক্তিভিক্ষার আর্জি জানায় এবং সে আর্জি সেই ২০১৪-র পলিসি দেখিয়ে খারিজ হয়। গত ৭ জুলাই হাইকোর্ট যথারীতি একই কথা বলে— ১৯৯২-এর পলিসি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে চার সপ্তাহের মধ্যে। চার সপ্তাহ অনেকদিনই অতিক্রান্ত।

এইখানেই আইন-মোতাবেক জাতীয় শব্দবন্ধ অপ্রাসঙ্গিক তো বটেই, হাস্যকর হয়ে যায় এক্ষেত্রে। রুটিন ক্ষমাপ্রদর্শনের মতো নিরামিষ এ-ঘটনা, এ আমরা— দেশের সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা— আদৌ মনে করি না। গোটা দেশ সোচ্চার হয়েছে এই ঘটনার বিরুদ্ধে। বিরোধী রাজনীতিবিদ, নারী সংগঠনগুলি, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক— প্রতিবাদ উঠে এসেছে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে। এই লেখাটি লিখতে বসার আগেই দেখলাম মেলবক্সে প্রায় ৬০০০ বিশিষ্ট দেশবাসীর স্বাক্ষর সম্বলিত একটি প্রেসবিবৃতি এসে পৌঁছেছে, যাতে তাঁরা এই ঘৃণ্য ঘটনার বিরুদ্ধে তাঁদের উদ্বেগ এবং প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে অনুরোধ করেছেন। এসবই অত্যন্ত স্বাভাবিক, কারণ, আগেই বললাম, বিলকিস বানো কোনও সাধারণ মানুষ নন— বিলকিস বানো মামলা সম্পর্কিত কোনও কিছুই আর পাঁচটা কাজের মতোই একটা কাজ হতে পারে না। শুধু সচেতন দেশবাসীরাই এমন মনে করেন না, মনে করে সরকার তথা রাষ্ট্রও। বিলকিস বানো তাদের কাছে একটা গলার কাঁটা, তাদের কাছে এক পরাজয়ের নাম।

এ-কথা অস্বীকার করা যাবে না যে দেড় দশক ধরে প্রায় গোটা দেশে ক্ষমতা ভোগ করার পরেও বিজেপি তথা তার বর্তমানের প্রধান মুখগুলির কাছে ২০০২-এর গুজরাট নরমেধ এখনও একটা গলার কাঁটা হিসেবেই রয়ে গেছে। সেই কাঁটা ওপড়াতে তারা চেষ্টা কিছু কম করেনি— নির্লজ্জের মতো অস্বীকার, প্রমাণ লোপাট, বিচারব্যবস্থা-পুলিশ সবাইকে হাত করে নিজেদের পক্ষে রায় আনা, সে-সব বর্বরতার বাধাস্বরূপ মানুষদের ওপর মিথ্যা নানারকম মামলা চাপানো থেকে খুন পর্যন্ত করা— এ-সবই দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু তাতেও সত্য ধামাচাপা দেওয়া যায়নি। আর সেই সত্য উন্মোচিত হয়েছে যে-সব ঘটনায় তার অন্যতম হল বিলকিস বানো-র ঘটনা।

ফলে, না সরকার, না দেশবাসী— কারও কাছেই এই ক্ষমাপ্রদর্শন একটি নেহাত রুটিনকাজ হতে পারে না।

এই ঘটনায় বরং নির্মিত হয় অমোঘ কিছু ছবি। অশীতিপর পার্কিনসন রোগগ্রস্ত ফাদার স্ট্যানিস্লাউস লৌরডুস্বামী, হাত কাঁপে, গ্লাস বা কোনও খাবার পাত্র হাতে ধরতে পারেন না তাই, সেই কারণে জেলে সঙ্গে একটি স্ট্র রাখার আবেদন করেছিলেন আদালতে। বিরোধিতা করা হয়েছিল সেই আবেদনের, অনুমতি দেওয়া হয়নি প্রথমে। তাঁর জামিনের আবেদন নাকচ হয়েছিল বারংবার। অবশেষে কারারুদ্ধ অবস্থাতেই মারা গেছেন ফাদার। আরেক অশীতিপর অসুস্থ কবি ভারভারা রাও জামিন পেলেন এই সেদিন, কিন্তু এখনও কার্যত নজরবন্দি। তালিকার আরও নামগুলি পাঠক জানেন। জানেন তাঁদের কী অপরাধ।

এরই পাশের ছবিটা— এগারোজন ধর্ষক এবং খুনি বেরিয়ে এল জেল থেকে, ফুল-মালা-মিষ্টি সহযোগে বরণ করে নেওয়া হল তাদের।

বার্তা নগ্ন। আমরা এদের, আমরা এঁদের নই। আমাদের শাসিত এই ভারতবর্ষ এদের, আমাদের শাসিত এই ভারতবর্ষ এঁদের নয়।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের বিশেষ ক্রোড়পত্রে এই সেদিন সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, আমরা যারা সাধারণ মানুষ, তাদের লুকিয়ে পড়ার জায়গাগুলি কেড়ে নেওয়া হয়েছে সন্তর্পণে। এই ছবিগুলি মনে করে সত্যি যে পাশ ফিরে শুতে যাব নিজের সযত্নলালিত মধ্যবিত্ত নির্লিপ্ততাকে সঙ্গী করে— এই ঘটনায় যেমন মোটের ওপর শুয়ে রয়েছে বাংলার মিডিয়াকুল— দেখছি পাশবালিশটা সরিয়ে নিয়েছে কেউ, খাটের পাশের দেওয়ালটাও। একচিলতে বিছানার পাশেই আঁধার অতলান্ত।

বহু-বিজ্ঞাপিত অমৃত মহোৎসবের দিনটি শুরু হয়েছিল রাজস্থানে এক উচ্চবর্ণ শিক্ষকের হাতে একটি ন বছরের দলিত শিশুর হত্যার কাহিনি দিয়ে। শেষবেলার ছবি— বরণ করে নেওয়া হচ্ছে মুক্তিপ্রাপ্ত বিলকিস বানোর ধর্ষকদের। মাঝে লালকেল্লায় কে কী বলেছেন— উওমেন এমপাওয়ারমেন্টের যাবতীয় বাগাড়ম্বর সহ— আনুষ্ঠানিকতা, নেহাতই। বাহুল্য মাত্র।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. অসম্ভব নাড়া দেওয়া লেখা !
    ভয় পাচ্ছি খুব, এই যে আমার স্বর্গাদপি গরিয়সী অপূর্ব দেশ, তাকে ঘাড় ধরে পাঠান হচ্ছে কোন নরকে!

আপনার মতামত...