এপার ওপার

অজন্তা

 

 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ — বাসুদেব দাস

১৯৬৮ সনে লখিমপুর জেলার কয়লামারি চা-বাগিচায় অজন্তার জন্ম হয়। স্কুল এবং কলেজ জীবনের শিক্ষা উত্তর লখিমপুর এবং যোরহাটে। বর্তমানে অরুণাচল প্রদেশের রাজ্যিক সচিবালয়ে ব্যক্তিগত সচিব রূপে কর্মরত। প্রকাশিত গ্রন্থ্ (শিশুদের জন্য) অরুণাচলের সাধু, সুগন্ধী পরীর কাহিনি, বরফের ঘর। উপন্যাস অরুণাভ স্যার, ক্রেইট, যাযাবরী যাত্রার প্রেম। গল্প সঙ্কলন অজন্তার নির্বাচিত গল্প, স্পর্শ, প্রান্তিকের গল্প।

কখনও ওপার থেকে স্তরে স্তরে মেঘগুলি এপারে উড়ে আসে। আমি চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকি। ওদের মেঘদূত বলি। সীমা পার হল কি হল না… ওরা হঠাৎ নাই হয়ে যায়। আমি অবাক হই; হঠাৎ কোথায় অন্তর্ধান হল মেঘদূতরা? মেঘদূতদের খোঁজার জন্য আমি প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াই। কখনওবা আবার ওরা এসে একেবারে আমাদের বাড়ির দরজায় পৌঁছে যায়। খোলা জানালা দিয়ে স্তরে স্তরে মেঘ ঢুকে আসে এবং জানালার মুখে আমার টেবিলটিতে থাকা বইগুলি ভিজিয়ে রেখে যায়। আমি আনন্দ পাই এবং আমার মা-বাবা আমাকে বকাবকি করে। রাগ করে এসে দরজার জানালাগুলি বন্ধ করে দেয়। মেঘদূতরা যখন ওপার থেকে আমাদের পারে উড়ে উড়ে আসে তখন ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে নেমে আসে। কখনও হাত দিয়ে ধরে ফেলার মতো অবস্থা হয়। আমি যে ওদের ধরে ফেলার জন্য কত লাফালাফি করি। আমার মনে হয়, আমাদের অঞ্চলটা পার হয়ে ওরা কিন্তু চলে যায় না। আমাদের বাড়ির উঠানে থেমে, যেদিক থেকে ওরা উড়ে আসে তার বিপরীত দিকে তাকালে দেখি ওদের কোনও চিহ্নই নেই। আশ্চর্য, কোথায় নাই হয়ে গেল ওরা? কখনও কখনও ওদের দেখার জন্য আমি সীমা অতিক্রম করে কিছু দূরের টিলার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে গলা বাড়িয়ে দেখি। আমরা সীমার বাসিন্দা হওয়ার জন্য পাসপোর্ট ছাড়া সীমাপারের গেটটা এপার-ওপার হওয়ায় আরক্ষীরা খুব একটা বাধানিষেধ আরোপ করত না। দুইপারের ব্যবসায়ীরাও তাদের পরিচিত। অবশ্য কেবল এপার ওপারের। দুই পারের ব্যবসায়ীদের আদানপ্রদান অপরিহার্য হয়ে পড়ে বলে একটা বোঝাবুঝিতে এসে অলিখিতভাবে সীমা পাহারাদার আরক্ষীরা আইনকানুন কিছুটা শিথিল করে দেয়। কিন্তু কখনও কখনও এরকম একজন পাহারাদার আরক্ষী আসে যে গেট পার হওয়া তো বাদই, ওপারের দিকে মাথা তুলেও কেউ তাকাতে সাহস করে না। যখন স্থানীয় অরুণাচলের আরক্ষীর জায়গায় সিআরপিএফ-এর জওয়ান থাকে তখন তো কথাই নেই। স্থানীয় আরক্ষীরা ভ্রাতৃপ্রেম বুঝতে পারে। এটা যে অসম-অরুণাচলের মধ্যে যুগ যুগ ধরে চলে আসা ভ্রাতৃ-ভগ্নির ভালবাসার বন্ধন। একটা সময় ছিল যখন অরুণাচলে যানবাহন সেভাবে চলত না। সেই দিনগুলিতে অরুণাচলের লোকেরা সীমান্তবর্তী অসমের বাজারগুলিতে পায়ে হেঁটে বাজার করতে যেত। পাহাড় বেয়ে কত দূরত্ব অতিক্রম করে যে তারা অসমে বাজার করতে আসত সে কথা ভেবে আমি অবাক হয়েছিলাম। সুদীর্ঘ পাহাড়িয়া পথ অতিক্রম করে অসমে বাজার করতে আসা লোকেরা নাকি প্রায়ই আমাদের সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাস করা অসমের লোকদের বাড়িতে রাত কাটাত। দুই রাজ্যের মানুষের ভ্রাতৃ্ত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। অরুণাচল প্রদেশে যানবাহনের সুব্যবস্থা হল যদিও আজও কিন্তু দুই রাজ্যের মানুষগুলির মধ্যে সেই স্নেহ অক্ষুণ্ণ রয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে অরুণাচলের মানুষের সম্পর্কের মধুরতা বেশি গাঢ়। মানুষগুলি কথাগুলি ভুলে যায়নি। আরক্ষীরা তো সেই রাজ্যের মানুষই। সীমান্তবর্তী মানুষের জন্য কঠোরতা অবলম্বন করার জন্য তারাও কষ্ট পায়। কিন্তু সরকারি অধ্যাদেশ, অমান্য করাও যায় না। এভাবে দুটি রাজ্যের দুটি সীমার মধ্যে আমার শৈশব কৈশোর পার হয়েছিল। একদিকে অসমের লখিমপুর জেলা, অন্যদিকে অরুণাচল প্রদেশের রাজধানী ইটানগর। বর্তমানের পাপুমপারে জেলা, অতীতের আপার সুবনসিরি জেলা। এই দুই রাজ্যের সংযোগস্থল বান্দরদেয়া নামের জায়গায় আমাদের কয়েক পুরুষ বসবাস করে আসছে সেটা আমার বাবাও জানে। আমার বাবা নেপালি সম্প্রদায়ের এবং মা অসমিয়া পরিবারের। আমি কিন্তু আমার মায়ের পরিবারের কোনও লোককে কখনও দেখিনি। শৈশবেই মার মা-বাবাাকে হারানোর কথা শুনেছি। আমার মা-বাবার মুখে আমি রূপকথার গল্প শোনার মতো দুই রাজ্যের কথা শুনেছি। নিজের চোখে দেখেছিও। তাই সেই রাজ্য থেকে উড়ে আসা মেঘগুলির প্রতি আমার খুব ভালবাসা। শৈশবে, আমি এবং আমার খেলার সঙ্গীরা যখন চেক-গেট পার হয়ে ওই রাজ্যের মেঘদূতগুলিকে দেখার জন্য দৌড় মারত তখন প্রায়ই আমাকে চেক-গেটের আরক্ষী জওয়ানরা খ্যাপাত। অরুণাচলে নিয়ে যাবে বলে ভয় দেখাত। আমার কিন্তু সেই রাজ্যের প্রতি কৌতূহলের অন্ত ছিল না। মনে অজস্র প্রশ্ন দেখা দিত কেন আমরা যেতে পারি না সেই মেঘের রাজ্যটিতে? আমাদের থেকে ক্রমান্বয়ে ওপরের দিকে উঠে গিয়েছিল সেই জায়গাটা। বড় ভাল লাগত সেই ঢালু জায়গাটা। মনে হত, যেন যেতেই থাকব  যেতেই থাকব। আমাদের দুই রাজ্যের মধ্যে পাহাড়ের একটি বিরাট প্রাচীর। পাহাড়টার এপারে অসম, ওপারে অরুণাচল। আমাদের বাড়িগুলি আর দোকানগুলি এত কাছে যে পাহাড়টার গায়ে হেলান দিয়ে আছে বলে মনে হয়। অথচ আমরা পাহাড়টা বেয়ে উঠতে পারি না। ইচ্ছা হলেই আমি পাহাড়ের ওপারে চলে যেতে পারি না। আমার যে তীব্র ইচ্ছা হয়েছিল পাহাড় বেয়ে ওপারে যাওয়ার জন্য।

মেঘগুলির মতো কখনও রোদও ভাল খেলা খেলে। কখনও ওপারে মুখ ফুলিয়ে রাখা মেঘগুলি এভাবে বর্ষিত হতে শুরু করে যে অনেকদিন পর্যন্ত আমরা সবুজ রেখাটা দেখতে পাই না। সবুজ রেখা মানে, আমাদের এদিক থেকে ওপারের আকাশের দিকে তাকালে আকাশ স্পর্শ করে থাকা একটা গাঢ় সবুজ রেখা দেখা যায়। সেই রেখাটা শৈশবে আমরা কতবার যে এঁকেছিলাম। সেটা পাহাড়রেখা। ওপারে যতদূর পর্যন্ত আমাদের চোখ যায় ততদূর পর্যন্ত তাকালে আমরা বুঝতে পারি ওপারে রোদ উঠেছে না বৃষ্টি হচ্ছে। এদিকে রোদ ঝলমল হাসিতে খিলখিল করতে থাকা আমাদের জায়গাটা সোনালি হলদে হয়ে উঠে। আমি তখনও লক্ষ করছিলাম যে সীমান্তের চেকগেটটা পার হয়ে সোনালি হলদেগুলি কিছুদূর গিয়ে হঠাৎ নাই হয়ে যায়। নাহলে ওপারের সবুজ রেখাটা এভাবে অদৃশ্য হয় কি; মেঘ বর্ষিত হলে ওপারে ধোঁয়াশা কুয়াশা হয়ে থাকে। আমাদের কথা যে আমরা সীমান্তে থাকা মানুষগুলি ওপারের মেঘ এবং এপারের রোদের সমান অংশীদার হই। আমাদের সীমান্তের মানুষগুলি সেই সবুজ রেখাটাকে পাহাড়লাইন বলে।

দুই রাজ্যের সংযোগকারী আমাদের জায়গাটার ব্যবসায়িক গুরুত্ব কিন্তু যথেষ্ট। জায়গাটার ব্যবসায়িক গুরুত্ব দেখেই হয়তো আমার পূর্বপুরুষের কোনও একজন কখনও এসে এই জায়গায় বসতি স্থাপন করেছিল। আমাদের পরিবারটা কীভাবে কোথা থেকে এসে এখানে বসতি স্থাপন করেছিল সে কথা আমি আজও জানি না। কিন্তু জ্ঞান হওয়ার পর থেকে কথাগুলি জানতে আমার খুব আগ্রহ জেগেছিল। আমার এই প্রশ্নগুলির উত্তর আমার মা-বাবা কোনওদিন দেয়নি। আমিও জিজ্ঞেস করিনি। অতীত নিয়ে পড়ে থেকে লাভ কী; সীমান্ত অঞ্চল বান্দরদেওয়ায় আমাদের পরিবারের সুন্দর ব্যবসা। আমাদের ব্যবসাও ঠিক যেন আমার সমবয়সি। আমি যখন খুবই ছোট ছিলাম তখন আমাদের ব্যবসা এতটা জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। যখনই আমি বড় হতে শুরু করলাম, আমাদের ব্যবসাও আমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বৃদ্ধি হতে লাগল। মানুষদের এই একটি সুবিধা যে ছোটখাটো হলেও যে কোনও ব্যবসায় হাত দেওয়া যায়। দুইপারের মানুষের প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ রেখে বিভিন্ন ব্যবসা জমে ওঠে। আমাদের বান্দরদেওয়া অঞ্চলে আবাসিক হোটেল, ভাল রেস্তোরাঁ, চাইনিজ এবং ফাস্টফুডের দোকান, দুইপারের যাত্রী দাঁড়িয়ে খাওয়ার মতো ছোট ছোট চা-মিষ্টির দোকান, কাপড়ের দোকান, মনিহারি, জুতোর দোকান, গ্যারেজ, পেট্রোল পাম্প, ছোট ছেলেমেয়েদের খেলার সামগ্রীর দোকান… মোটের উপর কী নেই; এমনকি চোলাই মদ থেকে নামীদামি ওয়াইন শপ পর্যন্ত সমস্ত কিছু আমাদের বান্দরদেওয়ায় অতি সহজেই পাওয়া যায়। সীমান্ত অঞ্চলের লোকদের জন্য এটা যোগাত্মক দিক। অন্তত দুই রাজ্য সংযোগী আমাদের জায়গাটিতে কাউকে ক্ষুধার্ত থাকতে হবে না। দুই রাজ্যে প্রবেশ করা এবং বেরিয়ে যাওয়া যানবাহনের যাত্রীদের মধ্যে চানাবাদাম, চা-বিস্কুট, কাঠা নারকেল এবং ডাবের জল ইত্যাদি বিক্রি করেও কত লোক পরিবার প্রতিপালন করছে। চোর, পকেটমার, এমনকি দেহোপজীবিনীও সচ্ছলভাবে বেঁচে থাকে আমাদের জায়গাটিতে। আমার মনে পড়ার মধ্যে আমাদের পুরনো ব্যবসার ভেতরে আমাদের একটি ছোট দোকান ছিল যা এখনও রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র ছিল সেখানে। বালা, মণি, লিপস্টিক, সিঁদুর থেকে আরম্ভ করে বিস্কুট, চকলেট, চিপস, কোল্ডড্রিঙ্কস এমনকি তামোল পান, মিষ্টি পান। ছোট দোকানটি জিনিসপত্রের ঠাসা ছিল। দোকানটির সঙ্গে একটি পিসিও ছিল। কোনওভাবে একটি মানুষ প্রবেশ করতে পারা ছোট্ট একটি ঘরে একটি ল্যান্ডফোন। পিসিওটিতে এত মানুষ যে কখনও মানুষকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হত। মোবাইল ফোন না থাকা সেই দিনগুলিতে দুইপারের মানুষ আসত পিসিওটিতে। ভিন্নভাষী, ভিন্ন পোশাক-পরিচ্ছদ, ভিন্ন আকৃতির মানুষ আসত পিসিওটিতে। আমার কৌতূহলের অন্ত ছিল না। মানুষগুলি কী কথা বলে? কার সঙ্গে কথা বলে মানুষগুলি? যদিও আমাদের পিসিওর ব্যবসা ছিল আমাদের বাড়িতে কিন্তু কোনও টেলিফোন ছিল না। আর ফোন করার মতো তেমন কেউ আমাদের ছিলও না। যে কয়েক ঘরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তারা জোরে ডাকলেই শোনার মতো দূরত্বে ছিল। আমি স্কুলে যাওয়ার আগে থেকে কখনও মায়ের সঙ্গে আর কখনও বাবার সঙ্গে দোকানে আসতাম। মা-বাবা দোকানে গ্রাহকদের সঙ্গে ব্যস্ত থাকার সময় আমি খেলাধুলা করতাম। গ্রাহকরা আমাকে আদর না করে যেতে পারত না। আমার আরও একটি খেলা ছিল ওপার থেকে আসা মেঘগুলির সঙ্গে। দুই রাজ্য-সংযোগী সীমান্তবর্তী জায়গাটিতে অহরহ গাড়ি মোটরের ভিড় লেগেই থাকত। তার মধ্যে নিজেকে বাঁচিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে বেড়ানোর কৌশল আমি খুব শৈশবেই নিজের অজান্তে আয়ত্ত করে ফেলেছিলাম। খেলাধূলা করার জন্য আমাদের সেভাবে কোনও খোলা বড়সড় জায়গা ছিল না। সত্যি কথা বলতে গেলে, বাজারেই আমার জন্ম, বাজারেই ঘর, বাজারেই আমাদের জীবন। সারাদিন সারারাত মোটরগাড়ির গর্জন, ধুলো আর ধোঁয়ায় ধূসরিত হয়ে থাকে আমাদের জায়গাটা। ধোঁয়া, ধূলি এবং হুলুস্থূলে আমরা অভ্যস্ত।

আমি কিছুটা বড় হওয়ার পরে দোকান এবং পিসিও প্রায় আমাকেই চালাতে হত। দোকানে থেকে থেকে শৈশব থেকেই আমি গণনায় দক্ষ হয়ে পড়েছিলাম। স্কুল ছুটির পরে বাড়িতে শুয়ে বসে থাকার স্বাধীনতা আমার ছিল না। নাকেমুখে ভাত কয়েকটা দিয়েই দোকানে দৌড়ে এসে মাকে অবসর দিতে হত। ততদিনে আমাদের ব্যবসা বেশ ভালই বেড়েছিল এবং মা-বাবা এই দোকানে খুব বেশি সময় দিত না। অবশ্য দোকানে বসতে আমার খুব একটা খারাপ লাগত না। দুই রাজ্যের বিচিত্র যাত্রী এবং গ্রাহকদের আসা যাওয়া, বিভিন্ন ধরনের গাড়ি-মোটরগুলি আমাকে মুগ্ধ করে রাখত। ওপার থেকে আসা যানবাহন এবং মানুষগুলির প্রতি আমার আগ্রহ ছিল বেশি।

তখন আমি দশম শ্রেণির ছাত্রী। দশম শ্রেণির একজন ছাত্রীকে পড়াশোনার সময় যতটা সচেতন হতে হয় আমার বাড়িটা ততখাানি সচেতন ছিল না। স্কুল ছুটির পরে আমাকে দোকানে যেতেই হত। একদিন ওপারের একজন যুবক দোকানে এল। ব্যাগটা দেখে তাকে দূরের যাত্রী বলেই মনে হচ্ছিল। তিনি বড় স্নেহ ভরা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। আমি বিন্দুমাত্র না হেসে তাকে হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলাম—

—আপনার কী চাই?

তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ইটানগর থেকে আশা দ্বীপ ট্রাভেলস এখানে কখন এসে পৌছাবে?

—আরও আধঘন্টা বাকি আছে। আমি ঘড়ি দেখে চট করে উত্তর দিলাম।
—ইস, আরও আধঘন্টা…। আমাকে ততক্ষণ এখানেই অপেক্ষা করতে হবে?
—নিশ্চয়।

আমি দোকানের ভেতর থেকে ছোট্ট টুলটা বের করে তাকে বসতে দিলাম। খুব সুন্দর মিষ্টি হেসে বললেন— থ্যাঙ্ক ইউ।

দোকানে গ্রাহক আসছে যাচ্ছে। তার মধ্যে তিনি আমাকে দুই একটি কথা জিজ্ঞেস করলেন—

—তোমার নাম কী?
—সোনালি
-সোনালি মানে… সোনা— মানে গোল্ড… রাইট?
—হ্যাঁ।
—তোমাকে তাহলে গোল্ডি বলে ডাকতে পারি।
—হ্যাঁ পারেন।

গোল্ডি কি কারও নাম হতে পারে? আমার মনে মনে হাসি পেল। কিন্তু মানুষটাকে আমার অজান্তে কোনও কারণে ভাল লেগে গেল। আমি কয়েকবার দেখব না দেখব না করে তার দিকে তাকিয়ে লজ্জায় মাথা নিচু করলাম। লোকটা স্থিরদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়েছিল।

আমি টুলটা এগিয়ে দিয়েছিলাম যদিও লোকটা কিন্তু বেশি সময় বসে থাকল না। উঠে দোকানের বিভিন্ন জিনিসপত্র দেখতে লাগল। ভ্রমণে প্রয়োজন হওয়া মিনারেল ওয়াটারের বোতল, ভিক্সের ডিবে, চিপস, বিস্কুটের প্যাকেট ইত্যাদি অনেকগুলি জিনিস কিনল। কথাপ্রসঙ্গে আমি দশম শ্রেণিতে পড়ি যেন খুব খুশি হল। সে কলেজে পড়ে। আমিও তাকে কিছু কথা জিজ্ঞেস করলাম—

—আপনাদের ওপারের মেঘগুলি আমাদের এখানে আসে। খুব সুন্দর আপনাদের মেঘগুলি।
—তাই? এখানে আসে?
—আসে তো। আমাদের এখানে পৌঁছেই আবার নাই হয়ে যায়। আপনাদের অনেক বড় বড় পাহাড় আছে না?
—আছে আছে। অনেক পাহাড়…
—পাহাড় অতিক্রম করেছেন?
—কেন করব না, পাহাড়ি মানুষ আমরা। এই ধরনের একটি পাহাড়ের ওপরেই আমাদের বাড়ি।
—বা, পাহাড়ের ওপরে বাড়ি… আপনার নাম কী?
—আমার নাম অ্যালবার্ট…
—ইংরেজি নাম দেখছি…
—হ্যাঁ। আজকাল আমাদের মধ্যে ইংরেজদের খুব অনুকরণ চলছে। এরকম চলতে থাকলে একদিন স্থানীয় ভাষার নামগুলি হারিয়ে যাবে।

আমার কথাগুলি সে খুব আগ্রহ সহকারে শুনছিল এবং আগ্রহ নিয়ে উত্তর দিচ্ছিল। সে গুয়াহাটিতে যাবে। ইটানগর থেকে গুয়াহাটির বাস আছে। কিন্তু তার সীমান্তবর্তী নিরজুলি নামের জায়গায় একজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে বান্দরদেওয়ায় বাস ধরতে এসেছে। তার টিকেট করাই আছে। সে আমাকে বলল যে সে আবার যখন এপার ওপার করবে তখন আমাদের দোকানে ঢুকবে।

দ্বীপ ট্রেভেলস নামে বাসটা এসে দাঁড়িয়েছিল। সে আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসে উঠতে গেল। আমি তাকিয়ে রইলাম। সে জানালার পাশের সিটে বসে আমার দিকে তাকাল এবং হাত নাড়ল।

সেদিন আমার খুব ভাল লেগেছিল। ওপারের মানুষগুলি সত্যিই ভাল। রাতে আমি মায়ের সঙ্গে ঘুমোই। সেদিন মাকে বললাম— মা, ওপারের মানুষগুলি খুব ভাল তাই না?

মা অবাক হল। আমাকে জিজ্ঞেস করল— তুই কীভাবে জানলি?

—আজ ওপারের একজন কাস্টমার আমার সঙ্গে কথা বলছিল। তার কথাগুলি শুনতে ভাল লাগছিল।
—সাবধান মেয়ে। কাস্টমারের সঙ্গে বেশি কথা বলার কোনও প্রয়োজন নেই। ওপারের মানুষের সঙ্গে তো মোটেই নয়। ওরা আমাদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। ওরা আমাদের মেয়েদের ফুঁসলিয়ে নিয়ে যাওয়ার কায়দাকানুন খুব ভালভাবে জানে। কোনওভাবে ফুঁসলে ওপারে নিয়ে যেতে পারলে জীবনে কোনওদিন আর এপারে আসতে পারবি না।

মা আমাকে সাবধান করে দিয়েছিল। আমি কিছুই বললাম না। সেদিন আমার ঘুম আসছিল না। বাারবার অ্যালবার্টের মুখটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে বিরক্ত করছিল। কানে বাজতে থাকে তার কণ্ঠস্বর… গোল্ডি…

আমার মন কিছুতেই মেনে নিতে চাইল না অ্যালবার্ট নামের ওপারের মানুষটা মেয়ে ফুঁসলিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনও কায়দা জানে বলে। আমি কেবল প্রতিদিন তার পথ চেয়ে থাকি। আমি নিজেকে আশ্চর্যভাবে তার জন্য বদলাতে শুরু  করেছি। আমার পড়াশোনা খুব একটা মন ছিল না, কিন্তু সেই আমিই গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে লাগলাম। কারণ অ্যালবার্ট কলেজে পড়ে। সে আবার আসবে এবং আমাকে পরীক্ষার ফলাফল জিজ্ঞাসা করবে। ভাল নাম্বার পেয়ে পরীক্ষায় পাশ না করলে আমি কীভাবে তাকে বলব। একদিন আমাকে অ্যালবার্টের মতো কলেজে যেতে হবে।

আমাকে অবশ্য খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হল না। গুয়াহাটি থেকে ফেরার পথে অ্যালবার্ট পুনরায় আমাদের দোকানে প্রবেশ করল। হঠাৎ সেদিন তাকে আমার সামনে দেখে বিব্রত হয়ে পড়েছিলাম। সে খুব উৎফুল্ল। আমার দিকে তাকিয়ে হাসল এবং জিনিস নিয়ে থাকা গ্রাহকরা চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমাকে কিছু বলল না। গ্রাহক চলে যাওয়ার পরে সে জিজ্ঞেস করল—

—কেমন আছ গোল্ডি?
—ভাল আছি। আপনি কবে ফিরেছেন?
—এইমাত্র ফিরেছি। ডে সুপারে।

বান্দরদেওয়া চেকগেটে ওপারে যাওয়া এপারের মানুষগুলির পাসপোর্ট পরীক্ষা করে। তার জন্য বাসটাকে অনেকক্ষণের জন্য থামতে হয়। সেই সুযোগে অ্যালবার্ট আমার দোকানে দৌড়ে এসেছিল। তাড়াহুড়ো করে সে কয়েকটি জিনিস নিল এবং আমার সঙ্গে কথা বলতে থাকল। সে মেয়েদের চুলে লাগানো ক্লিপ, কানের ফুল, ক্রিম ইত্যাদি নিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম—

—কার জন্য এগুলি?
—আমার একটি ছোট বোন আছে, তার জন্য।
—আপনার জন্য কিছু নেবেন না?
—আমার জন্য নিতে পারার কিছু আছে কি? কিছুই তো চোখে চোখে পড়ছে না।
—আছে আছে। দাঁড়ান আমি দিচ্ছি।

কিছুদিন আগে সুন্দর ছোট কিছু বাক্স এসেছিল। প্রতিটি বাক্সে একটি রুপোলি চেইন এবং একটা লকেট ছিল। লকেটগুলিতে ইংরেজিতে বিভিন্ন অক্ষর লেখা ছিল। অক্ষরগুলি অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে। চেইনটা আমার খুব ভাল লেগেছিল। সেই চেনগুলি আমাদের অঞ্চলের ছেলেগুলির গলায় গলায় ঘুরছিল। ছেলেগুলি নিজের নিজের প্রেমিকার নামের প্রথম অক্ষরটির লকেট পরে খুব খুশি হয়েছিল। অ্যালবার্ট তখনই জি আর এস অক্ষরের লকেট দুটো বের করে নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল— এস ফর সোনালি না জি ফর গোল্ডি? কোনটা নেব?

—জি ফর গোল্ডি।

আমি বললাম। সে চেইনটা নিয়ে আমার দিকে দামটা এগিয়ে দিল। আমি বললাম—

বাকি জিনিসগুলির দাম রেখেছি। এটার দাম দিতে হবে না। এটা আমার তরফ থেকে আপনাকে উপহার দিলাম।

সে আপত্তি করেছিল। চিন্তায় পড়েছিল, আমাকে তো মা-বাবাকে হিসাব দিতে হবে। তার বাসে হর্ন বাজছিল। আমি বললাম—

—আপনার বাস চলে যাচ্ছে আর… আপনি যান… পরে কখনও মিলিয়ে নেব।

সে বাসের উদ্দেশ্যে দৌড় মেরেছিল। ওপার থেকে এপারে আসতে অ্যালবার্টের অনেকদিন পার হয়ে যায়। কিন্তু সে আসে। যখনই আসে তার বুকে ‘জি’-অক্ষরটি জ্বলজ্বল করতে থাকে। অক্ষরটিতে আসলে ফসফরাস দেওয়া আছে যার জন্য অন্ধকারেও জ্বলজ্বল করে। আমরা কেবল এপার ওপারের কথা বলি। আমরা সীমান্তে থাকা মানুষগুলি যে কখনও এমন কিছু সমস্যার সম্মুখীন হই যা কিছু উত্তরহীন প্রশ্নের মতো মনে হয়।

কখনও হঠাৎ দুই রাজ্যের মধ্যে কিছু সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষগুলি প্রায়ই অন্যান্য যুব সংগঠন বা রাজনৈতিক কারণে হয়। আমাদের মতো ছোটখাটো ব্যবসায়ীদের মগজের মধ্যে ঢুকতে না পারা বিষয়। কিন্তু এই ধরনের সংঘর্ষ যখন সীমা পার হয়ে যায় তখন তার প্রভাবটা পড়ে আমাদের সীমান্ত অঞ্চলের লোকদের মধ্যে। এই সংঘর্ষের ফলে কখনও প্রতিবাদ সাব্যস্ত করে এপার থেকে জিনিসপত্র যেতে না দেওয়ার মতো অর্থনৈতিক অবরোধ করা হয়। সেরকম পরিস্থিতিতে দিনরাত প্রাণোচ্ছল হয়ে থাকা আমাদের সীমান্ত অঞ্চল ঝিমিয়ে পড়ে। জনশূন্য হয়ে পড়ে। জিনিসপত্র এপার ওপার করা তো দূরের কথা প্রতিবাদকারীদের রোষের বলি হতে হয় বলে অন্য মানুষের আসা-যাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে। এমনকি অসমের উত্তরপার এবং দক্ষিণপারের মধ্যে চলাচল করা যানবাহনগুলিও তখন এখানে থামে না। ফলশ্রুতি আমাদের ব্যবসা হয়ে পড়ে মন্দ। এপার ওপার হতে না পারলে দুপারের সাধারণ নাগরিকদের চলে না। চলে কেবল প্রতিবাদকারী, সংঘর্ষকারীদের। কিছু একটা বোঝাবুঝিতে না আসা পর্যন্ত সেই সময়গুলি আমাদের যেন আর পার হতে চায় না। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে থাকে আমাদের সীমান্তবাসীরা।

কথাগুলি শুনে অ্যালবার্ট দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। আমরা দুজনেই কথা বলি, যদি এই এপার ওপার না থাকে আমরা প্রত্যেকেই তাহলে একপারেই থাকতাম; অ্যালবার্ট আমাকে কথাগুলি বোঝাতে চেষ্টা করে, বিভিন্ন প্রশাসনিক এবং দেশের সীমা সুরক্ষার স্বার্থে অরুণাচল প্রদেশে পাসপোর্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হ্যাঁ কথাগুলি আমি বুঝি। কিন্তু…,

আলবার্ট না আসা দিনগুলিতে আমার একখণ্ড মেঘ হয়ে উড়তে উড়তে ওপারে যেতে ইচ্ছা করে। একটা পাহাড়ের ওপরে থাকা অ্যালবার্টের ঘরটিতে এক টুকরো মেঘ হয়ে ঢুকে অ্যালবার্টের বুকে ঝুলতে থাকা ‘জি’ অক্ষরটিকে ভিজিয়ে দিতে ইচ্ছা করে।

এইবার চলে যাওয়ার পরে অ্যালবার্ট পুনরায় ওপার থেকে আসতে অনেকদিন, অনেক মাস পার হয়ে যায়। আমি হাইস্কুল শিক্ষান্ত পরীক্ষায় সুখ্যাতির সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চতর মাধ্যমিকের শেষ পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হই। অ্যালবার্টের মহাবিদ্যালয় শেষ হয়। আমাদের এই বন্ধুত্বের কথা কেউ ঘুণাক্ষরেও জানতে পারে না। ওপারের একটি ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা বলে জানতে পারলে, মা আমাকে বাড়ি থেকে বেরোনোর দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ  করে দেবে। হ্যাঁ অ্যালবার্ট অরুণাচলের জনজাতীয় ছেলে। খ্রিস্টান ধর্মের। অতীতে ওরা নাকি ডঁঞিপলং ধর্মাবলম্বী ছিল।

কখনও সীমান্তে ভয়ানক সংঘর্ষ হয়। সীমান্তবর্তী এপার ওপারের মানুষের মধ্যে সংঘর্ষ হওয়া বলে দুটি রাজ্যে হুলুস্থূল লাগে। আশ্চর্যের কথা, আমরা তো সব সময় মিলেমিশেই থাকি। আমরা সীমান্তবর্তী মানুষগুলি এপার ওপারের আদান-প্রদান বুঝে মিলেমিশে না থাকলে আমাদের চলে নাকি? কখনও চলে না। তার চেয়েও বড়ো কথা এপার ওপার বাদ দিয়ে আমরা প্রতিবেশী। আমরা দেখি, দুপারের কিছু অপরিচিত দুর্বৃত্ত সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। কিন্তু আমাদের সীমান্ত অঞ্চলের প্রতিটি মানুষকে আমরা জানি বলে বুঝতে পারি ঝামেলা করা মানুষগুলি আমাদের নয়। কিন্তু আমরা বদনামের ভাগী হই। আমাদের দোকান বাজার বন্ধ হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে নাকি অ্যালবার্টের খুব চিন্তা হয়। আমারও খুব খারাপ লাগে । অ্যালবার্ট এলে আমরা কথা বলি। অ্যালবার্টের আসা না হলে আমাদের কথা বলার কোনও মাধ্যম নেই।

একদিন আমি অ্যালবার্টকে জিজ্ঞেস করেছিলাম— খিলঞ্জিয়া মানে কি আলবার্ট?

—এই সম্পর্কে আমার ধারণাও স্পষ্ট নয় গোল্ডি।
—জানো অ্যালবার্ট যখন সীমান্তে সংঘর্ষ হয় তখন এপারের মানুষ বলে এই সংঘর্ষগুলি খিলঞ্জিয়া লোকেরা করে না। বহিরাগতরা করে। আমি বুঝতে পারি না আমরা আসলে বহিরাগত না খিলঞ্জিয়া‌। আমাদের তো ভারতবর্ষ ছাড়া আর কোনও দেশ নেই। বাবাও জানে না আমাদের পূর্বপুরুষরা কে কখন এসে এই অঞ্চলে উপস্থিত হয়েছিল। অসমের জলহাওয়ায় বড় হয়েছি, অসমিয়া বলি, অসমিয়া গান গাই। অসমের জন্য প্রাণ দিতে আমরা জনমে জনমে প্রস্তুত।
—সত্যি, কথাগুলি বড় জটিল গোল্ডি। আমাদের এপারের লোকরাও প্রতি পদক্ষেপে অরুণাচল, অরুণাচলের বাইরের হিসেব করে। নির্বাচনের সময় কিন্তু অরুণাচলের ভোটগুলি গণনা করে নেয়। এপার যদি খোলা না হয় ওপারের মানুষ ক্ষুধায় মরবে। ওপারের মানুষ নিজের উপার্জন দিয়ে এপারে বাজার করতে এসে টাকা-পয়সা খরচ না করলে দিল্লি মুম্বাই থেকে মানুষ আসবে নাকি বাজার করতে? আমরা যদি শুধু ভারতীয় হতে পারতাম; শুধু যদি মানুষ হতে পারতাম।

অ্যালবার্টকে আমি আমাদের দুঃখের কথাগুলি বলি। আমরা অসম বা অরুণাচল কোনও একটি রাজ্যের না হয়ে মানুষের মনে শুধু বান্দরদেওয়া বা সীমান্তের মানুষ হয়ে পড়ি। কখনও কখনও এরকম মনে হয় যে আমরা কোনও পারেরই মানুষ নই। আবার কখনও মনে হয় যে আমরা দুই পারেরই মানুষ।

কিছু কথা মনে পড়লে আমি একা একাই হাসি। অ্যালবার্ট এলে সে আমাকে বলে— গোল্ডি, ওই হাইওয়ের ওপারের দোকানটিতে একটু  আসবে তো।

বলেই সে হাইওয়ের ওপারের দোকানটিতে যায়। কিছুক্ষণ পরে আমিও যাই। এমনিতেই দোকানে এটা ওটা দেখে একটু সরে যাই। অ্যালবার্ট একটা ডেয়ারি মিল্ক চকলেট কেনে এবং সুযোগ বুঝে আমার হাতে চকলেটটা গুঁজে দেয়। আমি তাকে বলি—

—চকলেট তো আমার দোকানেও আছে।
—তোমার দোকান থেকে কিনে আবার তোমাকেই কীভাবে দেব? এটা খেয়ে দেখো তো। এর স্বাদ আলাদা।

সত্যিই। অ্যালবার্টের দেওয়া চকলেটটা এত মিষ্টি ছিল যে খোসাটাও আমি ফেলে দিইনি। সুন্দর করে ফুলের আকারে একটি বইয়ের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখেছিলাম।

একদিন অ্যালবার্ট এসে বলল, সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাবে। স্নাতকোত্তর, তারপরে পিএইচডি। তারপরে বোধহয় ভারতীয় প্রশাসনিক সেবার প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসবে। কে জানে হয়তো অনেক বছর লেগে যাবে। আমার মনটাও যেন তখনই দুপার হল। একপারে অ্যালবার্ট… আমার ওপারের বন্ধুটির উচ্চশিক্ষার জন্য দিল্লি যাওয়ার আনন্দ। অন্যপারে আমার ওপারের বন্ধুটি বহু দূরে চলে যাওয়ার বিষাদ। অ্যালবার্ট একটা মোবাইল ফোন নিয়েছে। আমাকে বের করে দেখাল। তখন মোবাইল ফোনের যুগ শুরু হয়েছে। নাম্বারটা সে একটা কাগজের টুকরোয় লিখে দিল।

আমি কোনওমতে কলেজে পা রেখেছিলাম। অ্যালবার্ট দূরে চলে গেছে। আমি তার জন্য অপেক্ষা করতে পারলাম না। একদিন মা-বাবা জানাল আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। আমাদের পিসিও থেকে কাঁপা কাঁপা হাতে অবরুদ্ধ কন্ঠে আমি অ্যালবার্টের নাম্বারটা ডায়াল করলাম—

—আমি গোল্ডি
—গোল্ডি… কেমন আছ? তোমার কণ্ঠস্বর এরকম শোনাচ্ছে কেন?
—অ্যালবার্ট আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে…

অ্যালবার্ট বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। আমি ফুঁপিয়ে কাঁদছিলাম। কয়েকটি নির্বাক মুহূর্ত;

—গোল্ডি… তুমি না থাকলে… আমি কীভাবে সীমা পার হব? সেই জায়গাটাতে আমার বুকে কী যে হাহাকারের সৃষ্টি হবে… কিন্তু তুমি সুখী হও গোল্ডি।

আর কী বলবে গোল্ডি; আমরা তো কোনওদিন প্রেমের কথা বলিনি। কেউ কাউকে কোনও প্রতিশ্রুতি দিইনি। আমি সীমান্ত ছেড়ে স্বামীর সঙ্গে ভেতরের একটি নির্জন গ্রামে চলে এলাম। সীমান্তের হইচইয়ের অভাবে, এপারের মেঘ আর ওপারের রোদের ঝিলমিলের মিলনের অভাবে অনেকদিন আমার ভাল করে ঘুম আসেনি। প্রথমদিনের পর দিন গেল। তারপরে মাস, বছর পার হয়ে গেল। মা বাবার বাড়িতে গেলে আমি খুব দোকানে যাই। ওপারে যাওয়া বাসগুলির দিকে অপলক নেত্রে তাকিয়ে থাকি। এরকম মনে হয়, হঠাৎ যেন অ্যালবার্ট এসে আমার সামনে উপস্থিত হবে আর সেই চিরপরিচিত হাসিতে আমাকে ডাকবে—

“কেমন আছ গোল্ডি…?”

আমার প্রথম কন্যাসন্তানটি এবার হাইস্কুল-শিক্ষান্ত পরীক্ষা দিয়েছে। তার দীর্ঘদিনের বন্ধে আমি মায়ের কাছে এসেছি। আগের মতোই দোকানে গিয়ে বসেছি। আমার মেয়েটিও আমার সঙ্গে বসে আছে। একটা বিলাসী বাহন এসে আমাদের দোকানের সামনে থামল। একজন পুরুষ তার পত্নীর সঙ্গে গাড়ি থেকে নামল। গ্রাহকের আশায় আমি তৎপর হলাম। পুরুষটি আমার অবিকল চেহারার মেয়ের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। জিজ্ঞেস করল—

—নাম কী তোমার?
—গোল্ডি। মেয়ে বলল।
—গোল্ডি? তুমি সোনালির মেয়ে নাকি?

আমি চমকে উঠলাম। কে সে? পুরুষটি এবার আমার দিকে তাকাচ্ছে…

—গোল্ডি?
—অ্যালবার্ট?

আমি বাসগুলির দিকে তাকিয়ে থাকার সময় কোন ফাঁকে অ্যালবার্ট বিলাসী গাড়ি নিয়ে দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছে বুঝতেই পারিনি। তাঁর পত্নী এবং আমার মেয়ে আমাদের পুরনো পরিচয়ে খুব মজা পেল। দুজনেই মুচকি হাসতে লাগল।

আমি দেখলাম চালচলনে আকর্ষণীয় অ্যালবার্টকে, ধবধবে সাদা দামি কোম্পানির শার্টের বুকে একটা চেইনের সঙ্গে লকেট পরে আছে। চেইনটা সোনার, চকচকে। লকেটটা কিন্তু রুপোলি। চেইনটা আর লকেটের মধ্যে কোনও মিল নেই। লকেটটা ইংরেজি ‘জি’ অক্ষরের আকারের। বয়সের ছাপ পড়ে লকেটটা বিবর্ণ হয়ে গেছে। কিন্তু সে তার অস্তিত্ব হারায়নি। এখনও হয়তো অন্ধকার রাতে ‘জি’টা জ্বলজ্বল করে ওঠে।

ওপার থেকে আসা একখণ্ড মেঘ হঠাৎ এপারের সমস্ত কিছু ভিজিয়ে রেখে গেল।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4503 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

আপনার মতামত...