কয়েকটি অণুগল্প

পি কে পারাক্কাদাভু

 


অনুবাদ: তৃষ্ণা বসাক

 


পি কে পারাক্কাদাভু-র জন্ম ভাতাকারা, কালিকট, কেরলে ১৫ অক্টোবর, ১৯৫২ সালে। তাঁর আসল নাম আহমেদ। বাবা পোন্নামকতে হাসান, মা মেরিয়াম। বালায়ামের সরকারি স্কুলে এবং ফারুক কলেজে পড়াশোনা। গালফ কান্ট্রিতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।

দীর্ঘদিন কেরল সাহিত্য অকাদেমির জেনারেল কাউন্সিল এবং এক্সিকিউটিভ কমিটির মেম্বার। কালবুর্গির মতো লেখকের হত্যার পর কেন্দ্রীয় সরকার এবং সাহিত্য অকাদেমির নীরবতার প্রতিবাদে কেরল সাহিত্য অকাদেমি থেকে পদত্যাগ করেন।

গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, অনুবাদ, স্মৃতিকথা, শিশুসাহিত্য মিলিয়ে ৪২টি গ্রন্থের রচয়িতা। ইংরেজি, আরবি এবং বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় তাঁর লেখা অনূদিত হয়েছে। পেয়েছেন কেরল সাহিত্য অকাদেমি, এস কে পত্তেকাত্তু পুরস্কার, ফকানা পুরস্কার, বশির পুরস্কার এবং অন্যান্য আরও পুরস্কার।

বর্তমান অণুগল্পগুলি থ্রু দা মিনি লুকিং গ্লাস বই থেকে মেওয়া। প্রকাশক: লিড বুকস। প্রথম প্রকাশ: নভেম্বর ২০১৩। মালয়ালম থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ভি কে শ্রীলেশ।

 

লেখকের কথা

…আমি একবার খুব খুব ছোট গল্পের রসায়ন নিয়ে লিখেছিলাম। আর একবার উদ্ধৃত করা যাক।

একটি শব্দের মধ্যে ঘুমিয়ে আছে আগুন। অন্য শব্দের মধ্যে আছে জোছনার সৌন্দর্য। আরেকটি শব্দে আছে পাহাড়ের কুয়াশার শীতলতা। এই হচ্ছে রহস্যময় সমাহার, ছোট্ট গল্পের পেছনের রসায়ন।

অণুগল্প লেখার পেছনে বনসাই বানানোর কৌশল নেই। অণুগল্পের মধ্যে প্রচলিত গল্পের চেয়ে কিছু বেশি আছে। এর মধ্যে থাকে একটি বীজ।

একবার আমার এক বন্ধু জিজ্ঞেস করেছিল—

‘এইসব মাইক্রো গল্পের মধ্যে আছেটা কী?

আমি হেসে দেখলাম তার সামনে শব্দগুলো ভেঙে খুলে যাচ্ছে।

সে দেখল তার মধ্যে জীবনের অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে…।

 

অনুবাদকের কথা

…অতিমারির মধ্যে যখন মূলত ঘরেই সময় কাটছে, তখন ডাকযোগে এসে পৌঁছল তাঁর সাম্প্রতিক বই ‘থাম্ব টেলস’। পড়তে পড়তে এত মুগ্ধ করল গল্পগুলো, যে একটানা দুদিন ধরে পঞ্চান্নটি গল্প অনুবাদ করেই ফেললাম। বিখ্যাত সমালোচক সুকুমারন এবং পদ্মনাভন পারাক্কাদাভুর গল্পকে রবীন্দ্রনাথের এবং বনফুলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দুটোই সত্যি। পারাক্কাদাভুর প্রথম বইটিতে যে গল্প পড়েছিলাম, তার চলন বনফুলের তির্যক ব্যঙ্গ মনে পড়ায়। কিন্তু এই থাম্ব টেলস বইটির গল্পের সুর যেন রবীন্দ্রনাথের লিপিকার। অদ্ভুত একটা নির্জনতা আছে এর মধ্যে, আছে ঈশ্বর, প্রকৃতি, ভালবাসা আর মৃত্যুচেতনা। এগুলো গল্প না কবিতা? নাকি কবীরের দোঁহা? নাকি গালিবের নজম? সত্যি এ এক আশ্চর্য সফর। পাঠক এই সফর শেষে আর একটু বোধসম্পন্ন, আর একটু অন্তর্দীপ্ত হবেন, এ আমি মানস চোখে দেখতে পাচ্ছি…

[অনুবাদকের ভূমিকার কিছু অংশ, টিপ গল্প, পি কে পারাক্কাদাভু, অনুবাদক তৃষ্ণা বসাক, রা প্রকাশন, ২০২১]

 

নীড়

বিয়ের পর সে তাকে তার সুন্দর বাড়িতে নিয়ে গেল।

—ডান পা আগে দিয়ে ঢোকো— চৌকাঠে দাঁড়িয়ে সে বলল।

বাড়িটা সুন্দর সাজানো ছিল।

ওয়াশিং মেশিন
রেফ্রিজারেটর
টিভি

বসার ঘরে বিশাল টিয়ার খাঁচা দেখে সে অবাক হয়ে গেল।

খালি খাঁচার দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে সে বলল— এরকম কেন?

সে উত্তর দিল— তোমার ডানা মেলে এর মধ্যে ঢুকে যাও।

সে কিছু বলার আগেই ছেলেটি তাকে খাঁচায় বন্দি করে ফেলল।

 

পাখির গান

কুয়াশাঢাকা সকাল শরীরে যেন হাজার ছুঁচ ফোটায়,

বাইরে একটা পাখি গান গায়, কম্বলে শরীর ঢেকে জানলা দিয়ে তাকাই।

গাছের সবচেয়ে উঁচু ডালে বসে একটা পাখি গান গাইছে,

ঘুম ভাঙানোর গান,

সে জিজ্ঞেস করল— এই কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে আমার স্বপ্ন ভাঙিয়ে দিলে কেন?

রেগে বলল—

—কেন আমাকে ঘুম পাড়াতে পারো না?

কেন বুঝতে চাও না যে এই গান আমাকে পুড়িয়ে দেয়।

পাখিটা ডানা ঝাপটিয়ে ওর দিকে চেয়ে হাসল।

—আকাশ তোমার সীমা এই গর্ব আমি ভেঙে দেব

বলে পাখিটাকে গুলি করল।

বিভ্রান্ত পাখিটা পড়ে গেল। সেই রাতে কোনও পাখি ডানা ঝাপটাল না, সে আরামে ঘুমোল।

পরেরদিন ভোরে সে দেখল হাজার পাখি তার ফুলগাছের ডালে বসে গান গাইছে।

 

মেঘ থেকে বাড়ানো হাত

সে অনেকক্ষণ দেওয়ালে ঝোলানো স্যুরিয়েল ছবিটার দিকে তাকিয়ে ছিল।

একটা বিছানার জন্য অপেক্ষারত নারীকে জড়িয়ে আছে মৃত্যুর হাত।

তার হাত মৃত্যুর হাতে— লম্বা ঘাড় ছড়ানো মাদুরে— নীল দাগের পাশে ছাই ছোপ।

তারপর অন্ধকার—

তার মনে হল ওই নারী আসলে সে।

তার মন মেঘ থেকে বাড়ানো হাতের জন্যে অপেক্ষা করল। জানলার ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে এল শৈত্য।

সে জানলার পাল্লা খুলল।

মনে হল অন্য কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে।

হঠাৎ বাজের শব্দ— সে ভয় পেয়ে গেল। তারপর স্মৃতির বিদ্যুৎরেখা।

শান্ত সন্ধে— সে বারান্দায় বসে বন্ধুত্ব উপভোগ করছিল।

ছেলেটি তার ব্যারিটোনে একটা কবিতা আবৃত্তি করছিল।

—যুগ যুগ ধরে শত সহস্র হৃদয় থেকে ওঠা ব্যথা আর যন্ত্রণা মেঘে জমা হয়।

সে যখন অন্যমনস্ক হয়ে কবিতা আবৃত্তি করছিল, বাইরে বাতাস গজরাচ্ছে।

ভারি বৃষ্টি নামতে চলেছে। বাতাস ভয়ঙ্কর আছড়াচ্ছে, গাছ ভয়ে আন্দোলিত হচ্ছে।

মেয়েটি বলল— ভেতরে যাওয়া যাক

সে হাসল আর তারপর নম্রভাবে রাজি হল।

—তোমার স্মৃতি তোমার ছায়া ছাড়া আর কিছু দেয় না। তুমি চুম্বন করো অথবা বৃষ্টি এখানে একাই পড়ছে

বৃষ্টি বরাবর তার দুর্বলতা। সে আনমনা হয়ে বসে বসে বৃষ্টি দেখছে— এটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক দৃশ্য ছিল। আবার, যখন সে বাধ্য হয়ে ভেতরে যাচ্ছিল, হঠাৎ মেঘের ভেতর থেকে বার হওয়া ভয়ানক হাত তাকে আলতো করে নাড়িয়ে দিল। যখন জ্ঞান ফিরল, সে হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে আছে। তারপর তারাদের কথা মনে করে দিন কাটছিল— যখন বাতাস এসে জোর করে জানলা বন্ধ করে দিল, সে শিউরে উঠল।

—হে ভগবান, আবার আরেকটা বর্ষা এল।

বাইরে বৃষ্টি আছড়ে পড়ছিল। সে বারান্দায় বেরিয়ে এল। ততক্ষণে তার ভেতরে বিষাদবৃষ্টি হচ্ছে।

সে উঠোনে নামল আর মেঘের মধ্যে থেকে বাড়ানো হাতের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।

 

আলো এবং অন্ধকার

জানলাটা একটু খোলো, আলো আসতে দাও— আমি বলি

সে জানলা খুলে দিল, বাইরে থেকে আলো এসে ঘর ভরে দিল।

এখন আমাকে খুলে দাও, আমার মধ্যেও আলো আসুক— আমি বললাম।

সে আমাকে খুলে দিল।

আমার মধ্যে আলো এসেছে, আমি মুক্ত। কিন্তু সে এখনও অন্ধকারের গরাদের পেছনে।

 

সমুদ্র

একটা সমুদ্র, যেখানে কোনও ঢেউ পরস্পরকে আঘাত করে মরে যায় না, তার স্বপ্ন ছিল।

সে বলল— সমুদ্রের অপেক্ষা এক নিদ্রাহীন আত্মাকে সান্ত্বনা দিতে পারে।

যদি গিব্রান থেকে ধার করেও বলি, তোমার কি শোধ না-করা ঋণ ফেলে চলে যাওয়া উচিত?— নারীটি জিজ্ঞেস করল।

সে উত্তর না দিয়ে তাকে ফেলে অপেক্ষারত সমুদ্রের দিকে এগিয়ে চলল।

নারীটি তীরে বসে রইল সমুদ্রের প্রহরী হয়ে।

 

দুঃখের র

সে রান্নাঘরে কেক বানাচ্ছিল।

রান্নাঘরের দরজা খোলা ছিল।

নিচু হয়ে স্টোভের আঁচ বাড়ানো কমানো করতে করতে সে বলল— প্লিজ দেখো, কাক এসে না ছোঁ মারে

তার সমস্ত মনোযোগ ছিল কেকের ওপর।

কীভাবে তার মন আর চোখের এক মুহূর্তের অসতর্কতায় একটা ধূর্ত কাক দরজার ফাঁক দিয়ে উড়ে এল।

কিন্তু দেখা গেল কেকের সংখ্যা এক আছে।

সে খুব ভাল প্রহরী। কাকদের চঞ্চুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে সে ওকে হাত নেড়ে বিদায় জানাল।

সেদিন থেকে কাকের কালো রং দুঃখের প্রতীক।

 

বিয়ের রাত

বিছানাভর্তি জুঁইফুল, যখন বাইরে আকাশে ফুলের মতো তারা।

টেবিলের ওপর এক গ্লাস দুধ যৌবনের মতো বইতে চলেছে,

আজ তোমার বিয়ের রাত— সে বলল মেয়েটির কানে কানে

মেয়েটি তার মুখে হাত বোলাল। তারপর সে তার দুটো চোখ গেলে দিল। ছেলেটিও তাকে কষ্ট না দিয়ে তার জিভ টেনে ছিঁড়ে দিয়েছিল।

সেদিন থেকে তাদের সমস্ত দিন আর রাতে জুঁইয়ের সুগন্ধ আর তারার ঝিকিমিকি।

 

প্রাজ্ঞ লোকের হাসি

গলা ভেজানোর এক ফোঁটা জল না পেয়ে তেষ্টায় কাতর লোকেরা সুফির কাছে গেল।

বৃষ্টির জন্যে ভগবানকে ডাকো— তারা সুফির কাছে কাকুতি করল।

প্রাজ্ঞ লোকের মতো হেসে সে ভাবল—

—ঈশ্বরের সঙ্গে আমার লড়াই, আমি যা চাইব ঈশ্বর ঠিক উল্টোটা করবেন

লোকে এ কথা বিশ্বাস করল না।

এরপর সুফি নিজের পোশাক খুলে ভিজিয়ে তারে মেলে শুকোতে দিল, অমনি আচমকা ভারি বৃষ্টি এল।

 

সময়

সে পুনর্জন্ম নিয়ে বকবক করেই চলছিল। শুনে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল।

ঠান্ডা হাওয়া আসছিল।

আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে গুনগুন করছিলাম।

বৃষ্টি চালের ওপর ঢিল পড়ার মতো চড়বড় আওয়াজ করছিল।

আমার কি একটু ঢুল এসে গিয়েছিল?

যখন চোখ খুললাম, দেখলাম অন্য চেয়ারে আমার দিকে মুখ করে একটা বেড়াল বসে আছে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4726 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...