পেরিয়ারের ‘দলিত-পুরোহিত’ বনাম ‘সনাতনী অস্পৃশ্যতা’

সুমিত দাস

 


৮২℅ দলিত-আদিবাসীর দেশ তামিলনাড়ু। জনগণের মন্দিরে তাঁরা ব্রাত্য। রামস্বামী পেরিয়ারের দাওয়াই ছিল 'দলিত পুরোহিত।' তাতে সংঘাত বাড়লো। অস্পৃশ্যতায় মন্দির ছাড়তে বাধ্য হলেন কেউকেউ। ৪% ব্রাহ্মণ, তবু দ্রাবিড়রাজ্যের বাজারহাট, মন্দিরে আজও 'সনাতনী-আগ্রাসন' চলে । চলে সংগ্রাম। উদয়নিধির 'সনাতন'-মন্তব্যে সেই সংঘাতেরই বয়ান।

 

 

রাখিগড়ির প্রাচীন কঙ্কাল সাফ জানিয়েছে, সাড়ে চার হাজার বছর আগের ভারত ভূখণ্ডের কোথাও, আর যাই হোক আর্যাবর্ত নেই। হরপ্পার সময়কালের সেই কঙ্কাল আরও জানান দিয়েছে- বেদ, বৈদিক ধর্ম, মনুবাদ, ব্রাহ্মণ্যবাদ, হিন্দু, সনাতন নামক যাবতীয় যা যা দিয়ে আজকের ভারত রাষ্ট্রের ধারণা নির্মাণ করা চলছে, বা চলে – তা সম্পূর্ণ আরোপিত। মিথ্যা। কে এই কঙ্কাল-জননী? ২০১৮-র সেপ্টেম্বরে ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট ধরে উত্তর পাওয়া গেছে। এই কঙ্কালের পরের প্রজন্মের অস্তিত্ব দক্ষিণ ভারতেই বেশি। এরপরও, যা কিছু উঁচুনিচু, গোলগাল- তাতে শিবলিঙ্গ আরোপ করলে শিবরাম চক্কোত্তি আর ভিরমি খাবেন না! চন্দ্রযানের ল্যান্ডিং পয়েন্ট ‘শিবশক্তি’ নাম পেলে, বহু যুগের ওপারে ছুঁড়ে দেওয়া হবে আজকের রাজনীতি। দখলবাসনা। দক্ষিণ হস্তে সাড়ে চার হাজার বছর আগের ডিএনএ, উল্টোদিকের চন্দ্রযান মিশনেও- জেগে থাকবে দখল করা ‘সনাতন’। প্রকট থাকবে বর্ণবাদ, জাতপাত?

প্রগতিশীল অবস্হান, মন ও মনন বলছে- ধর্ম ব্যক্তিগত। রবীন্দ্রনাথও বলছেন। আসলেই কি তাই? নাকি এটিও একধরনের আরোপ, বা এমন হলে ভাল হতো? ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণব্যবস্হায় সব বর্ণের ধর্ম আলাদা, নাকি ওই জাতপাতের কাঠামোটিই ধর্ম? যা ধারণ করে বেঁচে থাকতে বাধ্য হয় সিংহভাগ! যা আসলে ঈশ্বরবিশ্বাসীর সারল্যে আরোপিত? জাতের লড়াই, সমাজের লড়াই, অর্থনীতির লড়াই, সংস্কৃতির লড়াই – সবটাই বিশ্বাস-অবিশ্বাস আর শ্রম ও উৎপাদনের মধ্যে নিহিত। আর, মন্দির সবকিছুর কেন্দ্রে।

রামাস্বামী পেরিয়ার ঈশ্বরবাদের ঘোর বিরোধিতা করেছেন। একই সঙ্গে সমাজে সিংহভাগ প্রান্তিক দলিতের মন্দিরে প্রবেশের অধিকার নিয়েও সোজাসুজি অবস্হান নিয়েছেন। ব্রাহ্মণ্যধর্ম, যাজক বা পুরোহিতের মধ্যে ব্রহ্ম অর্থে জ্ঞান আরোপ করেছে। পেরিয়ার সে পথেই শূদ্রের পৌরহিত্য দেখতে চেয়েছেন। কৌশলগত লড়াই? নাকি সমাজে ধর্ম অর্থে বহিরঙ্গে ঈশ্বরবাদ নিহিত আছে বলেই – সমাজের নিয়ন্ত্রণ কায়েমের পদ্ধতিতে শিলমোহর? আরেকটি বড় কারণ- যেহেতু মন্দিরই বর্ণবাদ ও অস্পৃশ্যতার কেন্দ্র, তাই সেখানে দখল ও প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো জরুরি। তাই, কমিউনিস্ট পার্টি বা দলিত সংগঠন আজও কর্মসূচি হিসেবে ‘দলিতের মন্দিরে প্রবেশ’ কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেয়। বাকি আলোচনায় এগোনোর আগে সামান্য তথ্য, – তামিলনাড়ুতে অনগ্রসর শ্রেণি ৭১%, তপশিলি জাতি ২০%, আদিবাসী ১.১%, উচ্চবর্ণ ৪ %। আর মোট জনসংখ্যার ১২% সংখ্যালঘু।

২০১০ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, – তামিলনাড়ুর গ্রামগুলিতে ৮০ রকম অস্পৃশ্যতার অনুশীলন আছে। মানুষ তো বটেই, কুকুর পর্যন্ত মানুষের বর্ণবাদের শিকার। নিচুজাতের পোষ্য কুকুর প্রভাবশালী জাতের পোষা কুকুরের সঙ্গে সঙ্গম করলে বিবাদে জড়িয়েছে দু-পক্ষ। এমন ঘটনাও আছে। ২২ টি জেলার ১৮৪৯ গ্রামে পুরুষের গোঁফ বিবাদের কারণ। জুতো পরা, পোশাকে ধাতুর ব্যবহার – সবই বর্ণবাদের কবলে। চুল কাটার সেলুনেও জাতপাত, চাইলেই যেকোনও সেলুনে ঢুকে চুল কাটানো যায় না। চায়ের দোকানের গ্লাস ও কাপেও বিভাজন স্পষ্ট। শুধু মন্দিরই নয়, শ্মশানও সর্বত্র এক নয়। কোনও কোনও মুদি-দোকানে মহিলাদের স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখা নিয়ে কড়া নিষেধাজ্ঞা আছে।

অর্থনীতির উপর সরাসরি বর্ণবাদের প্রভাব আছে চিরকালই। চলমান সময়ে বেকারত্ব বাড়লে অস্পৃশ্যতা পাল্লা দিয়ে বাড়ে। যেন বাজার আলাদাই থাকে! থাকতে হবে। ২০১০-এর সমীক্ষায় নানান জাতের নানা গ্রামের দৃশ্যও আলাদা। বাড়ি তৈরির নিয়ম আলাদা, ছাদ-দেওয়াল ভিন্ন। কে দালানে থাকবেন, আর কে খেজুর পাতার ঘরে- প্রবাহমান অস্পৃশ্যতা নতুন শতকেও স্পষ্ট। ২০২৩ সালে ছবি আমূল বদলানো সম্ভব নয়। আরএসএস-বিজেপি ভোট না পেলেও, উচ্চবর্ণের সমাজে, মন্দিরে তাদের প্রভাব চরমে। গোরা উচ্চবর্ণ আজও পদেপদে মনে করিয়ে দেয়, রামস্বামী পেরিয়ারের লড়াই চাইলেই শেষ হবার নয়।

 

দুই।

নানা জাত বয়ে, নানা পথ বেয়ে মূর্তি নির্মাণ হল। মন্দির হল, মন্দিরে মূর্তি এল। অগ্রজ পুরোহিত মূর্তি জাগ্রত করলেন। শুরু হল আরাধনা। মন্ত্রোচ্চারণ, ঢাক-ঢোল-ঘন্টায় চলল পূজা। পুরোহিতের পিছনে ব্রতী এসেছেন মঙ্গলকামনা আর মানত নিয়ে। মন্ত্রের স্বর উচ্চ হয়, ভক্ত-ব্রতী দক্ষিণা দিয়ে প্রণাম করেন। অগ্রে যিনি আছেন, মানে অগ্রে স্হাপিত- তিনি পুরোহিত। তিনিই মূর্তির কাছে পৌঁছে দিলেন ভক্তের মনস্কাম। আর্তের আর্তি। মূর্তির জেগে ওঠা, জেগে থাকা তারই উপাচারে, উচ্চারণে। যদি অতঃপর জানা যায়, – পুরোহিতের নাম স্বয়ং শম্বুক! মানে শূদ্র, দলিত!

১৪ আগস্ট, ২০২১, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন ২৩ জন অব্রাহ্মণ পুরোহিত নিয়োগ করলেন। কঠিন ও জোরালো পদক্ষেপ, সন্দেহ নেই। সত্তর দশকে পেরিয়ারের দেখা স্বপ্ন বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছেন স্ট্যালিন, এমন মনে হচ্ছিল।

মাত্র কিছুদিন আগে শ্রীভিলিপুথুরের শেঠু-নারায়ণা পেরুমাল মন্দিরের নতুন পুরোহিত হলেন কানাবিয়ান। বছর তিরিশের দলিত যুবক অভিযোগ করলেন, – ব্রাহ্মণরা প্রতিদিন অপমান করছেন। কাজ ছাড়ার চাপ এতটাই বাড়ল, মনে হল পরিবারও আক্রান্ত হতে পারে। ‘বর্ণ-বৈষম্য হৃদয়ের কাঁটা’- বলেছিলেন পেরিয়ার, শূদ্রের ধর্মস্হানে প্রবেশের পাশাপাশি, পুরোহিত পদে সবার অংশগ্রহণ দাবি করেন তিনি। বললেন- সবাইকে আর্চাকা হওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক। ৭১ সালে তাঁর দাবি বাস্তবায়নের পথে হাঁটে ‘দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজগাম’ (ডিএমকে)। তামিল হিন্দু ধর্মীয় ও চ্যারিটেবল এন্ডোমেন্টস অ্যাক্ট সংশোধন করে বংশগত নিয়োগ বাতিল করার জন্য সংশোধনী আনে ডিএমকে।আদালতে যায় বিরোধী দলগুলি। ৭২-এ সুপ্রিম কোর্ট সংশোধনী বৈধ বলে।

 

তিন।

২০০৬ সালে মুখ্যমন্ত্রী এম করুণানিধি একটি আইন পাশ করান। তাতে বলা হয়, – যথাযথ যোগ্যতা এবং প্রশিক্ষণ থাকলে যে কেউ আর্চাকা হবেন। ঠিক হয়, – রাজ্যের অধীনে থাকা ৪৪,৭১৩ টি মন্দিরের যোগ্য আর্চাকা নিয়োগ করবে হিন্দু ধর্মীয় ও চ্যারিটেবল এন্ডোমেন্ট (এইচআর ও সিই)। ২০০৮-এ ১৮ মাসের কোর্স চালু হয়। ২৪০ জন ভর্তি হন। ২০৭ জন প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত প্রার্থী হিসেবে উত্তীর্ণ হন। বর্ণ হিন্দু-গোষ্ঠী ‘অল ইন্ডিয়া আদি সাভা সিভাচারাগাল সেভা সঙ্গম’ সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলিকে চ্যালেঞ্জ জানায়। সর্বোচ্চ আদালন ২০১৫ সালে ফের কোর্স চালু করার অনুমতি দেয়। ২০০৬-২১, করুণানিধির ১৫ বছর পর স্ট্যালিনের হাতে নিয়োগ।

তিরুভানমালাইয়ের অরুণাচলেশ্বর মন্দিরের ভিতর প্রতিমা তৈরি করে প্রশিক্ষণ নেন অব্রাহ্মণরা। এ সময় বংশজ ব্রাহ্মণদের হাতে হয়রানি চলতে থাকে। এসব পেরিয়ে স্নাতক হলেন বছর তেত্রিশের কারাবিরান। নিচু জাত হিসেবেই সমাজে পরিচিত। ফলে কেউ তাঁকে মন্দিরে বা বাড়িতে ডাকত না। উপহাসের পাত্র হয়ে পেশা বদলাল কারাবিরান। তাঁর সহপাঠী সমবয়সী ভেলুমুরুগানেরও ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। নিয়োগের আগে রীতিমত হুমকি ফোনকল পেয়েছেন। আগামা, অর্থাৎ তামিল পুরোহিত দর্পণ, যাতে মন্দির ও মূর্তি স্হাপন, আচার লিখিত আছে। সেই আগামা নাকি যথাযথ সম্মান পাচ্ছে না ভেলুমুরুগানের পূজায়! ২৩ জন অব্রাহ্মণ পুরোহিতের ১০ জনের অভিজ্ঞতা জানা যায়। এর মধ্যে মাত্র দু’জন বলেন- তাঁরা কাজ করতে পারছেন, একমাত্র কারণ- তাঁদের কোনও ব্রাহ্মণ সহকর্মী নেই৷ আর, বিশ্বাসী ভক্তরা তাঁর উপাচারে খুশী। কারাবিরান কিন্তু কাজ ছাড়তে বাধ্য হন। আর্চাকা পদে নিয়োগ হলেও, তাকে মন্দিরে জমাদারের কাজই করতে হয়েছিল। পৌরোহিত্য নয়।

দক্ষিণ তামিলনাড়ুর ৩১ বছর বয়সী এক দলিত পুরোহিতেরও একই অভিজ্ঞতা। মন্দিরের গর্ভগৃহে ঠাঁই মেলেনি। ৩৪ বছরের মুরুগামকে অফিসিয়ালি প্রসাদ রান্নার কাজ দেওয়া হয়েছিল। বাসন ছুঁতে পর্ষন্ত দেওয়া হয়নি। উল্টে হাতের ওপর জ্বলন্ত কর্পূর রেখে তাঁকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল এক ব্রাহ্মণ। তামিল আর্চাকা অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি, ২০০৮ ব্যাচের ভি রঙ্গনাথম তো বলেই ফেললেন, ‘আইএস বা রাষ্ট্রপতি হওয়া সহজ, পুরোহিত নয়।’ তাঁর মতে, এই ব্রাহ্মণ্যবাদী আরোপ আসলে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৭ লঙ্ঘন।
এইচআর অ্যান্ড সিই-মন্ত্রী চলতি কর্মকাণ্ডে হোয়াটসঅ্যাপ মারফত এক অব্রাহ্মণ পুরোহিতের অভিযোগ পান। সে অভিযোগকারী আসলে মুরুগান। মুরুগান বলেন, ব্রাহ্মণদের পাশে কাজ করা ভয়ের। অন্যত্র, যেখানে ব্রাহ্মণ নেই, এমন জায়গায় বদলি চেয়েছিল মুরুগান। সংস্হার কমিশনার কুমার গুরুবর্ণন মন্দিরে বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতা স্বীকার করে নেন। তিনি অব্রাহ্মণ ও দলিতদের লড়াই জারি রাখার আবেদন করেন।

অব্রাহ্মণ পুরোহিত, আধিকারিক বা ওয়াকিবহাল মহলের কেউ কেউ মনে করেন, ‘ভক্ত ও সরকার মনে করলে মন্দিরে বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতা, সঙ্গে বর্ণবাদী মানসিকতা দূর হতে পারে। ভক্তদের প্রশ্ন করতে হবে, কেন অব্রাহ্মণ পুরোহিতরা মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করছেন না! একই সঙ্গে, মন্দির কমিটিগুলোকেও নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পবিত্রতার নামে অস্পৃশ্যতার অন্ধকার না থাকে।’

চার।

২০২১-এর ৩০ জুলাই। তফশিলি জাতিভুক্ত পারাইয়ার’রা মাদুরাই জেলার কোক্কুলাম গ্রামের শ্রী পেক্কামান করুপাসামি মন্দিরে ঢুকলেন। সময় লাগল একশো বছরের বেশি। অন্যদিকে আরেক গ্রামের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী কলার’দের করুণাস্বামী মন্দিরে ঢুকতে দেয়নি উচ্চবর্ণ। অথচ, সরকারি জমিতে থাকা মন্দিরে দলিত পুরোহিত ছিল। অধিকাংশ মন্দিরে আজও বর্ণহিন্দুরা নিচুজাতের সঙ্গে বসে প্রসাদ খায় না। কোথাও কোথাও একসঙ্গে মন্দির প্রাঙ্গনে পা রাখে না। এই নিয়ে তামিলনাড়ুর কোর্টগুলিতে বহু মামলা চলছে। নতুন মামলা বাড়ছে ক্রমাগত। অভিযোগগুলি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৭ ও ২৫ লঙ্ঘনের সমতুল্য৷ অস্পৃশ্যতায় ‘টেম্পল এন্ট্রি অথোরাইজেশন অ্যাক্ট’, ১৯৪৭-এর ধারা ৩-ও লঙ্ঘন হয়৷ একই আইনের ৭ নম্বর ধারা- ‘মন্দিরে সমস্ত রকম হিন্দুর উপাসনার অধিকার সুনিশ্চিত করে।’ বাধা দিলে তা শাস্তিযোগ্য। বিশেষত, সরকারি মন্দিরে আইন মানার জোরালো দাবি থাকলেও বর্ণবাদের সামনে তা চ্যালেঞ্জের। আইন দ্রুত সমাধানে পৌঁছতে পারে না।
অতিদলিত কলার’রা মন্দিরে ঢুকতে পারে না। পুরোহিত বলেন, দেবতা বিপন্ন হবেন!

মহিলারা অল্প কিছু মন্দির বাদে, প্রবেশ করতে পারেন না। ব্রাহ্মণ পুরোহিত অন্যের হাতে জল খান না, নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেন না। জানা যায়, বেশ কিছু ছোট মন্দিরের দখল নিয়েছে পারাইয়ার’রা। তাতে কী, মন্দির কেন্দ্র করে শেষমেশ বেঁচেই থাকে অস্পৃশ্যতা। মূর্তি বা ভগবানের ঘনিষ্ঠ অথবা দূরের মানুষের ফারাক- নেহাত কম নয়। বর্ণে যত খাটো, দূরত্ব তত বেশি।

শেষমেশ আম্বেদকরেই ফিরতে হয়। ‘প্রণামীর বাক্স, জমিজমা সবই মন্দিরে। সরিয়ে নিলে গল্প বদলাবে।’ ভগবান নিদ্রা যান, কেউ জাগান, কেউ ভাবেন জেগেছে। বাক্সটা ভর্তি হয়। বিশ্বাস অর্থনীতিতে বদলায়। অর্থনীতি ক্ষমতায়। রাজার ওপর থাকেন পুরোহিত, তার ওপর ঈশ্বর। সাধে কি নরেন্দ্র মোদি নিজেকে ঈশ্বর ভাবেন!

শেষমেশ, রামস্বামী পেরিয়ার প্রয়াত হন ১৯৭৩-এ। এই দশকে দ্রাবিড় রাজনীতিতে শক্তিশালীভাবে মাথা তোলে দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগম, বা ডিএমকে। তামিল বর্ণবাদী রাজনীতি আজও স্পষ্ট। নানান সামাজিক, অর্থনৈতিক লড়াই চলছে। পাড়ার মোড়, চায়ের দোকান, সেলুন, মুদি দোকান বা খেলার মাঠ,- বাছবিচার, জাতপাত আছেই। ‘আর্যাবতের ব্রাহ্মণ্যবাদীরা যদি এই ব্যবস্হাকে ‘সনাতন’ পন্হা বলেন, তবে স্ট্যালিনপুত্র উদয়নিধির ‘সনাতন ধর্ম-ব্যবস্হার’ বিরোধিতা সম্পূর্ণ জায়েজ। তামিল সমাজ প্রতিমুহূর্তে এই বর্ণবাদের সঙ্গে লড়তে লড়তে- যে মোড়ে এসে দাঁড়ায়, সেখানে পেরিয়ার আর আম্বেদকরের মূর্তি বসানো। চেন্নাই হোক বা তামিল মফস্বল, গঞ্জ, গ্রাম- সে মূর্তি বেশির ভাগই লোহার জালে ঢাকা। বর্ণবাদীরা আজও সমানে পাথর ছোঁড়ে বর্ণবাদবিরোধীর গায়ে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4721 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...