সুমন জানা

সুমন জানা | চারটি কবিতা

চারটি কবিতা

 

চশমামুক্ত বিশ্ব

মোটা ফ্রেম, সরু ফ্রেম, রিম-লেস হতে হতে চশমা মিলিয়ে গেল সমুদ্র-বাতাসে। স্বপ্নের স্বাধীনতা। দীর্ঘদিনের পরাধীন সব চোখের নজর ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে— ঘাসে, মহাকাশে। ছায়াপথে কেউ কেউ চলল নীহারিকাপুঞ্জ মাড়িয়ে মাড়িয়ে। নক্ষত্রের পর নক্ষত্র সাজিয়ে, কখনও বা একটার জায়গায় আর একটা নক্ষত্র বসিয়ে, একই নক্ষত্রকে একবার খুলে নিয়ে পুনরায় সেই জায়গায় বসিয়ে তারা গড়ে তুলল নতুন নতুন রাশি, পাল্টে দিল পুরনো সব নক্ষত্রপুঞ্জের নাম। পুরোদস্তুর নয়নায়ন। যাদের সে দূরদৃষ্টি নেই, কেবল কাছের জিনিসটুকুই দেখতে পায়, তারা দেখল ঘাসের বুকে পতঙ্গদের হাতছানি। পতঙ্গদের লক্ষ চোখ। পতঙ্গদের চশমা লাগে না।

 

হেঁটমুণ্ড ঊর্ধ্বপদ

অক্ষমতা আমাকে বন্ধ্যা করে তুলছে ক্রমশ। আমার কলমে ঢুকে যাচ্ছে অন্য কোনও কালি, যা আমার নয়। আমি বেগুনি লিখতে চাইছি। লিখতে চাইছি নীল, আকাশি, সবুজ। অথচ লিখছি কেবল কালো। যেন কলমের নিব দিয়ে বেরিয়ে আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে বাদুড়। কালো বাদুড়। যারা বাস করত আমাদের গ্রামের বাড়ির শিরিষগাছে। শিরিষগাছ কাটার সময় থেঁতলে গিয়েছিল কয়েকটা বাদুড়ের দেহ। বাকিরা যে কোথায় গিয়েছিল, আর তাদের দেখিনি। সেইসব আশ্রয়হীন বাদুড়ের অভিশাপ আমাকে লেগেছে। আমি হলুদ লিখতে চাইছি। লিখতে চাইছি কমলা, লাল। আর কলমের নিব দিয়ে বেরিয়ে আসছে বাদুড়ের কালো রং। তাদের শুকিয়ে যাওয়া রক্ত। আমি হারিয়ে ফেলছি নিজের অবস্থান। পৃথিবী আর আকাশের মাঝখানে ঝুলে আছি এক শিরিষের ডালে। প্রতিদিন যার গুঁড়িতে একটু একটু করে বসে যাচ্ছে করাতের দাঁত।

 

ভ্যান গঘের সূর্য

ভ্যান গঘ একবার সূর্য এঁকেছিলেন নীল রঙে। সমালোচকের প্রশ্নের উত্তরে নাকি বলেছিলেন দুপুরের সূর্যের দিকে তাকিয়ে দেখতে। আমি সূর্যের দিকে তাকাইনি। চন্দ্রবিন্দুর গানে ছিল— সূর্যের দিকে চেও না, চোখে ঝিলমিল লেগে যাবে। আমি ঝিলিমিলিও যাইনি। মুকুটমণিপুরে যখন গিয়েছিলাম, মাওবাদী জমানা চলছে। কোনও গাড়িই রাজি হয়নি আমাকে ঝিলিমিলি নিয়ে যেতে। এখন মাওবাদীরা নেই। ঝিলিমিলি যেতে বাধা নেই। এখন চন্দ্রবিন্দুর জমানাও নেই। সূর্যের দিকে তাকাতেও কোনও বাধা নেই। কিন্তু এখন আমার সেই বয়সই নেই, যে বয়সে  ঝিলিমিলি গিয়ে কিছু ফুর্তি করতাম। এখন সেই দৃষ্টিভঙ্গিও নেই, ভ্যান গঘের ছবির সূর্য আর আকাশের সূর্যের তুলনা করার। দুপুরের সূর্যের রং যদি নীল না-ও হয়, ভ্যান গঘ তো আর তাঁর ছবির সূর্যের রং পাল্টে দিতে পৃথিবীতে ফিরে আসছেন না। অনর্থক আর দুপুরের সূর্যের দিকে তাকিয়ে নিজের চোখটাকে নষ্ট করার কী দরকার?

 

অক্তাভিও পাজ এবং শীলা ভট্টারিকার হারিয়ে যাওয়া চল্লিশটি কবিতা

শীলা ভট্টারিকার সঙ্গে অক্তাভিও পাজের কখনও দেখা হয়নি। মেক্সিকোর কবি অক্তাভিও পাজ যদিও বেশ কিছু বছর ভারতবর্ষে ছিলেন। এ দেশ নিয়ে লিখেওছেন অনেক কিছু। বিজ্জলা বা বিকটনিতম্বার মতো প্রাচীন সংস্কৃত কবিদের কবিতা অনুবাদও করেছেন। কিন্তু নবম শতাব্দীর অন্যতম সমৃদ্ধ কবি শীলা ভট্টারিকা সম্পর্কে তিনি আশ্চর্যজনকভাবে নীরব। সে কি তাঁর উদাসীনতা না কি কবিসুলভ অভিমান? কেননা পাজ যখন তাঁর খোঁজে যান, শীলা ভট্টারিকা বাড়িতে ছিলেন না। তিনি গিয়েছিলেন নর্মদার তীরে তাঁর অনুরাগী পাঠক বাংলার এক তরুণ সন্ন্যাসীকে নিজের সদ্য-রচিত কবিতাটি শোনাতে। তাঁর রচিত ছেচল্লিশটি কবিতার যে চল্লিশটিই এখন পাওয়া যায় না, এটি তার কোনও একটিই হবে। এতটাই গোপন ছিল সেই সাক্ষাৎপর্ব, শুধু অক্তাভিও পাজ-ই নন, চৈতন্য চরিতামৃতকার কৃষ্ণদাস কবিরাজও তা জানতে পারেননি। জানত কেবল আমাদের প্রাক-জন্মের আত্মারা। যারা তখন নর্মদার জলে সদ্য স্নান সেরে পাথরের উপরে শুকোচ্ছিল তাদের অবয়বহীন শরীর। নর্মদাতীরের কোন বেতসী তরুতলে বসে শীলা ভট্টারিকার কাব্যসুধা পান করছিলেন প্রেমিক চৈতন্যদেব তা তারা দেখেছিল। কিন্তু  দুরাত্মা-সুলভ চপলতায় অক্তাভিও পাজকে সম্পূর্ণ ভুল দিকনির্দেশ করেছিল। ফলে তিন সময়কালের তিন কবির সম্মিলনে যে ত্রিমাত্রিক বিস্ময় সৃষ্টি হতে পারত তার সম্ভাবনা চিরতরে বিনষ্ট হয়েছে। জন্মের আগের সেই পাপ আমাদের এই জন্মেও বর্তেছে। আমাদের কবিতা শুধু কাগজে-কলমেই হম্বিতম্বি করে গেছে। আমাদের হয়ে সশরীরে বাসে চেপে অফিস করে আসতে বা শীলা ভট্টারিকার হারিয়ে যাওয়া চল্লিশটি কবিতা খুঁজে আনতে  পারেনি।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5420 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.