তুতিকোরিনে বেদান্ত-এর পাঠ: যক্ষপুরীর রূপকথা

দেবব্রত শ্যামরায়

 

তামিলনাড়ুর থুত্থুকুডি বা তুতিকোরিনে ভেদান্তা গ্রুপের স্টারলাইট তামা প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় দূষণ বিরোধী গণবিক্ষোভে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে গত মঙ্গলবার গুলি চালাল পুলিশ। গুলিতে এগারোজনের মৃত্যু হয়েছে। আহতের সংখ্যা প্রায় কুড়ি জন। না, পরিস্থিতি আয়ত্তে আনতে পুলিশ রাবার বুলেটের সাহায্য নেয়নি, সরাসরি সেমি-অটোমেটিকে চলে গেছে।

দেশজুড়ে সমালোচনা হচ্ছে এই গণহত্যার। মাদ্রাজ হাইকোর্ট অবিলম্বে স্থগিতাদেশ দিয়েছে স্টারলাইটের সম্প্রসারণের ওপর। আশার কথা, আমাদের দেশে এখনও অবধি মানুষের মৃত্যু একটা খবর, আমাদের সংবেদন এখনও মৃত্যুর খবরে সামান্য হলেও নড়ে ওঠে। যদিও সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয় আমাদের এই শোক, আমাদের নিন্দা। হয়তো আজ থেকে বিশ-তিরিশ বছর পর মৃত্যু, ধর্ষণ, সামাজিক ন্যায়ের উল্লঙ্ঘন — এইসব খবরের আলাদা করে কোনও অর্থ থাকবে না আমাদের কাছে। আমরা যে সুবিধেভোগী শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করি, আত্মরতিতে শুধু নাকটুকু ডুবতে বাকি আছে তার, পুরোটা তলিয়ে যেতে আর খুব বেশি বাকি নেই।

তাও যতদিন ভেসে আছি, নাড়া খাচ্ছি, ততদিন আসুন, একটু-আধটু চেঁচামেচি করা যাক।

ভেদান্তা নামের ব্রিটিশ-বহুজাতিক খনন সংস্থাটি যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৭৬ সালে। ইউরোপ থেকে শুরু করে ভারতবর্ষ ছুঁয়ে আফ্রিকা মহাদেশে পা রাখা — এই সুদীর্ঘ চার দশকে ভেদান্তা-র সফর যেন পুঁজির সাম্রাজ্যবিস্তার এবং রাষ্ট্র ও কর্পোরেট আঁতাতের এক ধ্রুপদী আখ্যান। ভেদান্তা নাম ভারতের মানুষ প্রথম শোনেন ২০০৪ সালে, যখন ওড়িশা মাইনিং কর্পোরেশন লিমিটেড-এর সঙ্গে যৌথ ব্যবস্থাপনায় নিয়মগিরি পাহাড়ের বনভূমি নির্মূলের অধিকার পায় ভেদান্তা। উদ্দেশ্য — বক্সাইটে সমৃদ্ধ নিয়মগিরি পাহাড় থেকে আকরিক নিয়ে নিকটবর্তী লাঞ্জিগড়ে নিজেদের অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় কাঁচামাল হিসেবে চালান করা। প্রকল্পের কথা জানাজানি হতেই নিয়মগিরির আদি বাসিন্দা ডোঙারিয়া কোন্দ উপজাতির প্রায় আট হাজার মানুষ তাঁদের জীবনযাত্রা, অরণ্য অর্থনীতি ও নিয়মগিরির বাস্তুতন্ত্র রক্ষার জন্য আন্দোলন শুরু করেন। শুরু হয় ডেভিড বনাম গোলিয়াথের এক অসম লড়াই। নিয়মগিরি তাঁদের পবিত্র আবাসস্থল; এই পাহাড়ের অরণ্য, নদী, বন্যপ্রাণ এবং মানুষ — হাজার বছর ধরে সবকিছুর দেখভাল করেন নিয়মরাজা। ক্রমশ বোঝা যায়, নিয়মগিরিতে পাহাড় ও বনভূমির অধিকার পেতে ২০০৬ সালের আদিবাসী ও অরণ্য আইন, ১৯৮৬ সালের পরিবেশ রক্ষা সক্রান্ত আইন, এবং ১৯৮০ সালের বন সংরক্ষণ আইন — কোনও না কোনওভাবে তিনটিরই উল্লঙ্ঘন করেছে ভেদান্তা। আর উন্নয়নের নামে এই কাজে তাকে হাতে হাত মিলিয়ে সাহায্য করে গেছে ওড়িশা সরকার। ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন এলাকার ভূমিপুত্র ডোঙারিয়া কোন্দ উপজাতির মত না নিয়ে প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না ভেদান্তা ও ওড়িশা সরকার। মানবধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ভেদান্তা থেকে নিজেদের বিনিয়োগ তুলে নেয় চার্চ অফ ইংল্যান্ড, নরওয়ে ও নেদারল্যান্ড সরকার। অবশেষে অসম লড়াইয়ের শেষে জয় আসে, যখন নিয়মগিরি পাহাড়ে আয়োজিত ডোঙারিয়া কোন্দ গ্রামসভাগুলির সর্বসম্মত প্রত্যাখ্যানে ভেদান্তা-এর প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। তবু এই জয় হয়তো চূড়ান্ত জয় নয়, আইনি সিদ্ধান্তকে ‘ওভারটার্ন’ করার নানা চেষ্টা এখনও করে যাচ্ছে ওড়িশা সরকার। সরকারি নীতি বদলের অপেক্ষায় নিয়মগিরি পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে লাঞ্জিগড়ে আজও ওঁৎ পেতে বসে আছে ভেদান্তা।

সেই শুরু। এরপর থেকে ভেদান্তা-র নাম শোনা গেছে ভারত তথা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, এবং প্রত্যেকবারই অস্বচ্ছতা ও প্রকল্পগত দুর্নীতির কারণে। ২০০৯ সালে ছত্তিশগড়ের কোরবায় বালকো-র তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে একটি চিমনি ভেঙে চল্লিশজন শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে। ২০১২ সালের একটি তদন্তে সামনে আসে যে এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ছিল বালকো কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, সঙ্গে ঠিকাদার আর সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলির দুর্নীতি। এখানেই শেষ নয়। ২০১৭-র সেপ্টেম্বরে ছত্তিশগড় পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ ১৯৭৪ সালের জলদূষণ সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের অপরাধে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিতে বলে। বালকো নিয়মিতভাবে কারখানার দূষিত জল বিভিন্ন নালা ও খালের মাধ্যমে নিকটবর্তী হাসদেও নদীতে নিয়ে ফেলছিল। প্রসঙ্গত, এই ভারতীয় সংস্থা বালকো-এর ৫১ শতাংশের মালিকানা ভেদান্তা-রই।

২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট গোয়ায় সেসা গোয়া প্রাইভেট লিমিটেড, এই ভেদান্তা-র মালিকানাধীন লৌহ উত্তোলন সংস্থার সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ করে দিতে বলে কারণ এই সংস্থা ২০০৭ সালেই শেষ হয়ে যাওয়া আইনি ছাড়পত্র নিয়ে এতদিন অবধি কাজ চালাচ্ছিল।

জাম্বিয়ার চিনগোলা অঞ্চলে ভেদান্তা-মালিকানাধীন কংকোলা কপার মাইনস খননকার্য চালায়। সম্প্রতি চিনগোলার ১৮২৬ জন অধিবাসী ভেদান্তা ও কংকোলা কপার মাইনসের বিরুদ্ধে নদী দূষণ, নাগরিক স্বাস্থ্যহানি, ও সম্পত্তি ধ্বংসের অভিযোগ এনে ব্রিটিশ আদালতে মামলা করেছেন। আফ্রিকার জাম্বিয়ার মামলা ব্রিটিশ কোর্টে কেন করা হবে, ভেদান্তা এই নিয়ে বিরোধিতার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আদালতে তা ধোপে টেঁকেনি। বস্তুত, এই রায়ের ফলে পৃথিবীর যেকোনও জায়গায় ভেদান্তা-র লুণ্ঠনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ব্রিটিশ আদালতে মামলা দায়ের করার দরজা খুলে গেল।

মে ২৩, ২০১৮। রাষ্ট্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভেদান্তা-র কর্পোরেট লুণ্ঠনের এই দীর্ঘ তালিকায় শেষতম সংযোজন — তামিলনাড়ুর তুতিকোরিন।

এক্ষেত্রে অবশ্য লুঠের নীল নকশা তৈরি হয়েছিল বছর দশেক আগেই। ২০০৮-এ ভেদান্তা-র স্টারলাইট সংস্থা তুতিকোরিনে State Industries Promotion Corporation of Tamil Nadu (সংক্ষেপে SIPCOT)-এর অধীনে শিল্পউদ্যানে একখণ্ড জমির জন্য আবেদন করে। পাশাপাশি অনুরোধ করে যে তাকে যেন শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাক-শর্তস্বরূপ যে জনমত সমীক্ষার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া রয়েছে, তা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। প্রসঙ্গত, স্টারলাইট যে ধরনের শিল্পস্থাপন করতে চাইছিল, অর্থাৎ খনি থেকে নিষ্কাশিত তামার স্মেলটিং, তা ক্যাটেগরি ‘এ’-র অন্তর্ভুক্ত, এবং নিয়ম অনুসারে ক্যাটেগরি ‘এ’ শিল্পকে জনমত গ্রহণ পক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতেই হবে। অবশ্য, ২০০৬-এর পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা আইনে  (Environmental Impact Assessment act) আরেকটি কথাও বলা ছিল, কোনও শিল্পউদ্যানের মধ্যে যদি ক্যাটেগরি ‘এ’ নথিবদ্ধ শিল্প স্থাপন করতে হয়, তাহলে তার ক্ষেত্রে আর আলাদা করে জনমত গ্রহণ করার দরকার পড়বে না। আইনটি এক্ষেত্রে খানিক অস্বচ্ছ, আইনে এই অবস্থাটির কথা বলা নেই — যেখানে শিল্পউদ্যানটি যদি নিজেই ২০০৬-এর আগে স্থাপিত হয়, যার নিজেরই নতুন আইন মোতাবেক green clearance বা সবুজ সংকেত নেওয়া নেই, সেই শিল্পউদ্যানে যদি ক্যাটেগরি ‘এ’ শিল্প স্থাপন করতে হয়, তার ক্ষেত্রে শর্তগুলি ঠিক কী হবে। EIA-র এই গুরুতর ত্রুটির সুযোগ নিয়ে সবুজ সংকেত পেয়ে যায় ভেদান্তা-স্টারলাইট। অর্থাৎ তামা প্রক্রিয়াকরণের পরিবেশগত ক্ষতিকর দিকগুলি নিয়ে জনপরিসরে আলাপ-আলোচনা ছাড়াই শিল্পটি ছাড়পত্র পেয়ে গেল। মনে রাখা দরকার, তখন কেন্দ্রে ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন ইউ পি এ সরকার।

ভেদান্তা-স্টারলাইটের এই ছাড়পত্রের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। ২০১৩ সালে স্টারলাইট আবার নতুন করে সবুজ সংকেতের জন্য আবেদন জানায়। এবার আবেদন না-মঞ্জুর হয়। সেই সময় নিজেদের ক্ষমতা-মেয়াদের শেষের দিকে এসে পড়া, একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগে জেরবার, শক্তিহীন ইউ পি এ সরকারের পক্ষে স্টারলাইটকে আরেকবার সবুজ সংকেত দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব ছিল না। স্টারলাইটকে জানিয়ে দেওয়া হয়, ২০০৬-এর EIA আইন মোতাবেক সবুজ সংকেত নেই এমন কোনও শিল্পউদ্যানে ক্যাটেগরি ‘এ’ শিল্প চালাতে গেলে জনতার মতামত গ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতেই হবে।

ভেদান্ত-স্টারলাইট অত সহজে পিছু হটবার বান্দা ছিল না। তারা অপেক্ষা করে। ক্ষমতার পট বদলায়। মে ২০১৪, মোদি-ম্যাজিকে ভর করে দিল্লির মসনদে আসে এন ডি এ সরকার। ক্ষমতায় এসেই দেশের শিল্পমহলের অনুরোধক্রমে দেশে ‘Ease of doing business’ সুনিশ্চিত করতে মোদি সরকার দ্রুত ক’টি পদক্ষেপ নেয়। তার মধ্যে গৃহীত একটি মেমোরান্ডাম ছিল — যেসব শিল্পউদ্যানের সেপ্টেম্বর ২০০৬-এর EIA সংস্থান মোতাবেক green clearance নেই, সেসব উদ্যানেও ক্যাটেগরি ‘এ’ শিল্প স্থাপন করা যাবে এবং তাদের জন্য কোনও জনমত গ্রহণের প্রয়োজন হবে না। সেইদিন, ডিসেম্বর ২০১৪-র এক সকালে, ওই একটিমাত্র কলমের আঁচড়ে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে যায়, খুন হয় ভারত রাষ্ট্রের প্রকৃতিবান্ধব পরিবেশনীতি, এবং খুনটি করে রাষ্ট্র স্বয়ং, যার সি ই ও নিজেকে ‘জনতার প্রধান সেবক’ বলতে ভালোবাসেন।

২০১৬ সালে National Green Tribunal ২০১৪  ডিসেম্বরের এই মেমোরান্ডামকে তীব্র ভাষায় ভর্ৎসনা করে। কিন্তু ততদিনে স্টারলাইট-এর কার্য উদ্ধার হয়ে গেছে। ২০১৫ সালের মার্চ মাসে তারা পেয়ে গেছে আগামী পাঁচ বছরের জন্য নবীকৃত ছাড়পত্র, আর এর জন্য তাকে জনমত গ্রহণের দীর্ঘ ও ‘অদরকারি’ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হল না।

তারপর এতগুলো বছর ধরে ভেদান্তা-স্টারলাইট কাজ চালিয়েছে নির্বিঘ্নে। পরিবেশের তোয়াক্কা না করেই স্মেল্টারগুলি চলেছে চব্বিশ গুণ সাত। দূষিত হয়েছে বায়ুমণ্ডল। ধীরে ধীরে আরও নীচে নেমে গেছে ভূমিস্থ জলের স্তর। নদীর জলে মিশেছে বিষ, ভেসে উঠছে মরা মাছ। জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ফলন কমে গেছে উল্লেখযোগ্য হারে। প্ল্যান্ট-পার্শ্বস্থ গ্রামগুলিতে, বিশেষত গ্রামের বাচ্চাদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট ও বিশেষ ধরনের চর্মরোগের প্রকোপ দেখা দিচ্ছে, যা আগে ছিল না। বিপরীত দিকে, পৃথিবীর পেটের ভেতর থেকে খুঁড়ে বের করা হয়েছে যে তাল তাল সোনা, তা চূড়ো করে জমা হচ্ছিল যক্ষপুরীর রাজকোষে। আর জমা হচ্ছিল মানুষের তীব্র অসন্তোষ, যা ফেটে পড়ল গত মঙ্গলবার, তুতিকোরিন কালেক্টর অফিসের সামনে।

ভেদান্তা কর্পোরেট-রাষ্ট্র আঁতাতের একটি মুখ মাত্র, বিশ্বায়ন-পরবর্তী প্রতিটি পর্যায়ে একের পর এক বহুজাতিকের স্বার্থরক্ষায় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্র। প্রয়োজনে ‘উন্নয়ন’ নামের শিখণ্ডীকে দাঁড় করিয়ে, পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ আইনকে পাশ কাটিয়ে বারবার তছনছ করা হয়েছে প্রকৃতি ও প্রান্তিক মানুষের জীবন। কখনও পসকোয়, কখনও সিঙ্গুর বা গুরগাঁওয়ে। বদলে বদলে গেছে কর্পোরেট-এর নাম, কখনও তার নাম টাটা, কখনও বা সালিম গোষ্ঠী। প্রতিটি ক্ষেত্রে মুনাফাকারী সংস্থা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সেই শাসক দল ও রাষ্ট্রনেতাকে চুকিয়ে দিয়েছে পাশে দাঁড়ানোর দাম।

যেমন, ২০০৪-১৫, এই সময়কালের মধ্যে ভেদান্তা কংগ্রেসকে ঘোষিতভাবে অনুদান দিয়েছে প্রায় ৯ কোটি টাকা। একই সময়ের মধ্যে ভেদান্তার কাছ থেকে বিজেপিও পেয়েছে প্রায় ৬ কোটি টাকা। এছাড়া অঘোষিত ‘অনুদান’-এর পরিমাণ কত, তা আমার-আপনার জানার কথা নয়। মজার কথা হল, এই দুই দলের ক্ষেত্রেই এই ঘোষিত অনুদান গ্রহণও বেআইনি, কারণ Foreign Contribution Regulation Act 1976 & 2010 (FCRA) অনুযায়ী কোনও বিদেশি সংস্থার কাছ থেকে নির্বাচনী অনুদান নেওয়ার অর্থ বিদেশি সংস্থাকে দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করার সুযোগ উন্মুক্ত করে দেওয়া। আদালত দু’টি দলকেই দোষী সাব্যস্ত করেছেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। কিন্তু মোদি ক্ষমতায় আসার পর ২০১৬ সালের ফিনান্স বিল ও ২০১৮ ফেব্রুয়ারিতে একটি সংশোধনীর মাধ্যমে নিজের দল, এমনকি কংগ্রেসকেও কীভাবে সেই আইনভঙ্গের দায় থেকে মুক্ত করে দিলেন, সাপ ও নেউল এই একটিবার হলেও নিজস্বার্থে চুমু খেল পরস্পরের মুখে, সে অবশ্য এক অন্য গল্প!

ভেদান্তা-স্টারলাইটের ঘটনাক্রম প্রমাণ করে কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ধারণা তামাদি হয়ে গেছে। পুঁজির নিয়ম মেনেই আধুনিক রাষ্ট্র প্রকৃত প্রস্তাবে কর্পোরেটের দালাল, এক প্রতারক, গণতন্ত্রের মুখোশের ফাঁক দিয়ে আজকাল যার আসল রূপটা মাঝেমাঝেই বেরিয়ে পড়ছে। আর রাষ্ট্রব্যবস্থার এই ব্যর্থতা দিকে দিকে জমি তৈরি করছে অন্য এক অভ্যুত্থানের। রঞ্জনের লাশ পড়ে আছে প্রাকারের বাইরে। বিশু পাগলের গান বন্ধ করতে গর্জে উঠছে অ্যাসল্ট রাইফেল। আর কলিঙ্গনগর থেকে নন্দীগ্রাম, বস্তার থেকে খাম্মাম, নাসিক থেকে তুতিকোরিন — নিজেদের বাঁচার তাগিদে, দেশের নদী-খেত-পাহাড়-জঙ্গলকে সঙ্গে নিয়ে এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ে নেমেছেন আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষজন। গুটিকয়েক কালো অক্ষর সম্বল করে, অযোগ্য আমরা, তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি মাত্র।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3604 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...