শেষ অস্ত্র

কৌশিক দত্ত

 

ঊনত্রিশতম দিনে অবশেষে উঠে গেল স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও চাকরি না পাওয়া প্রতীক্ষায় ক্লান্ত ছেলেমেয়েদের অনশন। উঠে গেল মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাসের ভিত্তিতে। বলা ভালো, অনশন উঠল এমন একজন মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে, যিনি নিজে একসময় ছাব্বিশ দিন অনশন করে বাংলা কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। অতএব অনশন বিষয়ক সব কিছু তিনি বেশ ভালো জানেন এবং আশা করা যায় অনশনকারীদের পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পারেন, কারণ শেষ অব্দি অনশন তো অনশনই, যদিও হাই প্রোফাইল আর লো প্রোফাইল অনশনের একটা দৃষ্টিকটু পার্থক্য প্রায়শ প্রকট হয়ে ওঠে।

অনশন বিষয়ে লিখতে গিয়ে “প্রায়শ” শব্দটি লিখে ফেলে নিজের লেখা শব্দটিতেই হোঁচট খেলাম। অনশন তাহলে বিরল কোনও ঘটনা নয় আর? বাস্তব সেটাই। এই বাস্তব রীতিমতো ধাক্কা দেবার মতো। যদি যথার্থ “শকিং” মনে না হয়, তাহলে সেই মনে না হওয়াটা আরও বেশি শকিং, কারণ তাতে বোঝা যায় ক্রমাগত যুদ্ধ, মৃত্যু, সন্ত্রাস, অবিচার, ক্ষোভ, অবক্ষয় দেখতে দেখতে আমাদের অনুভূতি একেবারে ভোঁতা হয়ে গেছে। এসএসসি-র অনশন আন্দোলন চলাকালীন বিগত চার সপ্তাহে একবিংশ শতকের নাগরিক অনুভূতির বিভিন্ন দিক দেখা গেল স্পষ্টভাবে।

মূল ধারার সংবাদ মাধ্যম, মূল ধারার রাজনীতির মানুষেরা এবং “অরাজনৈতিক” সুশীল সমাজের বৃহৎ অংশ প্রথমাবস্থায় আন্দোলনটিকে স্রেফ উপেক্ষা করলেন। রাজনীতি-সচেতন সহৃদয় কিছু মানুষ একটু একটু করে সোচ্চার হতে শুরু করলেন, মূলত সোশাল মিডিয়ায়। কেউ কেউ পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। তিন সপ্তাহের কাছাকাছি হতে অনশনকারীদের অসুস্থ হয়ে পড়া যখন নিয়মিত হল এবং মরে যাবার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠল, তখন অরাজনৈতিক সুশীল মনে প্রথম আলো সঞ্চারিত হল। (সুশীল সমাজ মূলত মোমবাতি মিছিলে অভ্যস্ত, যা মৃত মানুষদের জন্য করাই দস্তুর। জীবিত সহনাগরিকদের জন্য মিছিল করতে তাই একটু বেশিই সময় লেগে যায় আমাদের।) এর চেয়েও দেরি করে মূল ধারার সংবাদমাধ্যম এঁদের সময় দিলেন এবং এত কিছু হবার পরে সরকারও এঁদের অস্তিত্ব স্বীকার করলেন।

এসব থেকে, বিশেষত সাধারণ মানুষের কথাবার্তা থেকে কিছু সত্য প্রতীয়মান হল। যাঁরা বিষয়টি নিয়ে আদৌ মুখ খুললেন, তাঁদের কেউ কেউ অনশনকারীদের নিয়ে মশকরা করলেন, গালিও দিলেন। যাঁরা অনশনক্লিষ্ট আন্দোলনকারীদের জন্য ব্যথিত, তাঁদের মধ্যে অনেকের কাছ থেকে সুললিত কবিতা পাওয়া গেল ফেসবুক দেওয়ালে। এই যে আমরা এতকিছু পারলাম একটা সমাজ হিসেবে… উপেক্ষা থেকে গালমন্দ, খিল্লি থেকে কাব্য… এতে বোঝা গেল যে কলকাতার বুকে জনসমক্ষে কিছু মানুষের চার সপ্তাহব্যাপী অনশন আমাদের একেবারে স্তম্ভিত করে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি আমরণ অনশনও আমাদের আমূল নাড়িয়ে দিতে পারছে না… সরকারকে না, সাংবাদিককে না, সাধারণ মানুষকেও না। তবে কি অনশনও তার শক্তি হারাচ্ছে?

এই ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে দেখা উচিত। কেন এত অনশন করতে হচ্ছে ছোট ছোট ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য? কেন আমরা ততটা বিড়ম্বিত হচ্ছি না আর? কেন নির্বাচিত সরকার অনশনকে অবজ্ঞা করছেন দীর্ঘ সময়? কখন কীভাবে ব্যবহার করা হবে অনশনকে? এ বিষয়ে কোনও অলিখিত নীতি তৈরি হবে কি? অনশন আন্দোলনের পরিকল্পনা হলে কি গণ আন্দোলনের অভিজ্ঞ নেতারা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে পাশে এসে দাঁড়াবেন (আন্দোলনটিকে রাজনৈতিকভাবে হাইজ্যাক করার চেষ্টা না করে)? নাকি অনশন আন্দোলন বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সীমিত ক্ষমতায় বিচ্ছিন্নভাবে সংগঠিত হবে এবং অদূর ভবিষ্যতে ব্যর্থও হবে? (বন্ধের মতো, কিন্তু বন্ধের সঙ্গে তুলনীয় নয়, কারণ বন্ধ করতে সংগঠন লাগে, অনশন একাও করা যায়।) আজ একটি অনশন শেষ হল। এসব বিষয়ে ভাবনা শুরু করার সময় এখনই।

এসএসসি আন্দোলনটির যৌক্তিকতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বেশ কিছু লেখালেখি হয়েছে এই কদিনে। স্কুল সার্ভিসের পরীক্ষা, মেধা তালিকা এবং চাকরি দেবার পদ্ধতিতে যে বিস্তর গলদ আছে, তা তর্কাতীত। প্রচুর অস্বচ্ছ এবং বেআইনি কার্যকলাপ হয়েছে চাকরি দেবার ক্ষেত্রে, তাও মোটামুটি সকলে জানেন। চর্বিতচর্বণ এড়িয়ে যাচ্ছি। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা এবং আন্দোলনকারীদের পেশ করা দাবিপত্রও এতক্ষণে প্রায় সকলেই পড়ে ফেলেছি। পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন৷ গতকাল মুখ্যমন্ত্রী অনশনস্থলে আসার পর ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছিল, অনশন প্রত্যাহারের এটি উপযুক্ত সময়। ইতোপূর্বে শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাসবাক্য একবার অন্তঃসারশূন্য প্রমাণিত হয়েছে। তাঁকে বিশ্বাস করে একবার ঠকেছেন আন্দোলনকারীরা, তবু মুখ্যমন্ত্রীকে একবার বিশ্বাস করাই যায়, অন্তত তাঁর সাংবিধানিক পদটির সম্মানার্থে। তাছাড়া নির্বাচনী বিধি লাগু হবার পর এই মুহূর্তে সরকার অনেক কিছুই করতে পারেন না। জুন মাস পর্যন্ত অনশন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপকে একটি নৈতিক জয় বা প্রথম ধাপের সাফল্য ধরে নিয়ে এখনকার মতো অনশন প্রত্যাহার করে সংলাপের সূচনা করা যায়। দাবিদাওয়া জারি থাকবে। জুন মাসের মধ্যে দাবি অনুযায়ী কাজ সম্পূর্ণ করার জন্য চাপ দেওয়া যেতে পারে। সময়সীমার মধ্যে সরকার বলার মতো অগ্রগতি না দেখালে আবার আন্দোলন। অবশ্যই এটা ব্যক্তিগত ভাবনা এবং তা মেনে নেবার দায় কারও নেই। আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের ভাবনা ও সিদ্ধান্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেখা গেল, আন্দোলনকারীরাও অনেকটা সেরকমই স্থির করেছেন।

পড়ুন — যে যেখানে লড়ে যায়

অনশন প্রত্যাহৃত না হলে পরবর্তী ঘটনাক্রম কিছুটা জটিল হত। এই মুহূর্তে যেহেতু এর চেয়ে বেশি কিছু পাবার সম্ভাবনা ছিল না এই আন্দোলন থেকে, তাই এখন না থামলে জুন অব্দি চালিয়ে যেতে হত অনশন। মাঝখানে পিছিয়ে আসতে চাইলে তাঁরা উপযুক্ত কারণ খুঁজে পেতেন না। ফলে তখন অনশন ভাঙলে সরকারেরই বিজয় সূচিত হত। কেউ যদি জুন অব্দি অনশন চালিয়ে যেতে চাইতেন, তার জন্যেও উপযুক্ত কারণ দেখাতে হত। একটি প্রণিধানযোগ্য কারণ হতে পারত নিজের মৃত্যুর মাধ্যমে সিস্টেমের (বা তার নোংরামির) মৃত্যুঘণ্টা বাজানো। কিন্তু সেই চেষ্টা করলে সরকার তাকে নির্বাচনের মুখে অশান্তি সৃষ্টির তথা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের উপায় হিসেবেই ধরে নিতেন। তখন সরকারের প্রতিক্রিয়া কী হত, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে আন্দাজ করা যায় যে তাঁরা বলপ্রয়োগ করতেন। আবার খোলা রাস্তার উপর কিছু মানুষকে মরে যেতে দিলে, বাঁচানোর চেষ্টা না করলে, তার দায়ও প্রকারান্তরে সরকারের ঘাড়ে চাপত। সুতরাং এর পরেও অনশন চললে সরকার জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করতেন। সম্ভবত কোনও একজন অনশনকারীর গুরুতর অসুস্থতাকে উপলক্ষ করে পুলিশি অভিযান হত, অনশনকারীদের নাকে খাবারের নল গোঁজা হত এবং সমর্থনে সমবেত ব্যক্তিদের কয়েকজন গ্রেপ্তার হতেন আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেবার দায়ে। এসব হয়নি, তা একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। কিন্তু এরকম হলে আমাদের নাগরিক সমাজের ন্যায্য ভূমিকা কী হত, তা একবার মনে মনে ভেবে নেওয়া উচিত।

গতকালই কলকাতায় হবু শিক্ষকদের আরও দুটি দলের অনশন শুরু হয়েছিল। তাঁদের পরীক্ষা নিয়েও অনিয়ম হয়েছে, তাঁদের সমস্যাও ঘোর বাস্তব এবং চাকরি পেতে চাওয়া ন্যায়সঙ্গত দাবি। তাঁরাও আন্দোলনে যেতে পারেন অবশ্যই, কিন্তু সময়-নির্বাচন কিছুটা অবাক করেছে। নির্বাচনের আগে এই সময় সরকার কিছু দিতে অক্ষম, সুতরাং দাবি জানানো শুরু করার সঠিক সময় এটা নয় (কিছুদিন আগে শুরু হলে যুক্তিযুক্ত হত)। যদি এই ব্যাপারটা না বুঝেই তাঁরা অনশনে বসে থাকেন, তাহলে চিন্তার ব্যাপার, কারণ এর অর্থ হল সাংগঠনিক স্তরে প্রস্তুতি ও নেতৃত্বের অভাব। আর যদি কেউ নির্বাচনী উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য এঁদের অনশনে বসতে প্ররোচিত করে থাকেন এই সময়ে, তবে তা নিন্দনীয়। (সরকারের উদাসীনতার মতোই নিন্দনীয়।) আর এর পিছনে যদি থাকে এই ভাবনা যে মুখ্যমন্ত্রী ওঁদের কথা শুনছেন, তাহলে আমরাও এই সময়ে নিজেদেরটা বলে ফেলি, তাহলে বলব, অনশনের মতো সিরিয়াস আন্দোলনে কপি-ক্যাট কার্যকলাপ না হওয়াই ভালো।

ভাবার কথা এটাও যে অন্যদের আন্দোলন থেকে এভাবে সুযোগ নেবার কথা ভাবতেই বা হচ্ছে কেন? এই ভাবনাও তো একধরনের অসহায়তাকে সূচিত করে। ‘যে যেখানে লড়ে যায়’, তা আমাদেরই লড়া যদি হয়, তবে যে যেখানে লড়বে, অন্তত অনশনের মতো বড় যুদ্ধ যখন ঘোষণা করবে, তখন শুধু নিজের কথা না বলে নিজের মতো আরও অনেকের কথা, ব্যক্তির বদলে নীতির কথা কি বলবে না? যদি সেভাবে বলার ক্ষমতা আমাদের রপ্ত হয়, তবে গণতান্ত্রিক আন্দোলন অধিকতর পূর্ণতা পাবে। নইলে ক্রমশ শক্তি হারাবে আমাদের প্রতিবাদের এক একটি অস্ত্র, ধর্মঘটের পর অনশনও। শাসক ইতোমধ্যে অনশনকে অগ্রাহ্য করতে শিখে গেছেন। গঙ্গা বাঁচানোর জন্য লাগাতার অনশনে প্রাণ দিচ্ছেন একের পর এক হিন্দু সন্ন্যাসী আর তাঁদের মৃত্যুমালাকে অবিচলিতভাবে উপেক্ষা করছেন হিন্দুত্ববাদী ভারত সরকার। নিদারুণ প্যারাডক্স শুধু নয়, এ এক অশনি সংকেত। অনশনও ব্যর্থ হলে আর কোন রাজনৈতিক অস্ত্র থাকবে সত্যাগ্রহী নিরস্ত্র জনতার হাতে? কোন অস্ত্রে হবে প্রতিবাদ? আত্মহত্যা? চাষিরা তো সে চেষ্টাও করে দেখেছেন। শতশত আত্মহত্যা পেরিয়েও তো আমরা নির্বিকার থেকেছি। তবে কি তিব্বতি আন্দোলনকারীদের মতো পার্লামেন্টের সামনে গায়ে আগুন দেওয়াই হয়ে দাঁড়াবে একমাত্র পথ? তারপর একদিন সেটাও হয়ত “ব্রেকিং নিউজ” থাকবে না৷

পড়ুন — ইলেকশন এক্সপ্রেস ২০১৯

জনগণও শিখে ফেলছে অনশনকারীদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবার শিল্প। মুখ ফিরিয়ে নিতে শিখবে মানুষ সব মৃত্যু থেকেই একদিন। কলেজের এক দাদা একদিন বলেছিলেন, “মৃত্যু ক্লিশে হয়ে গেছে।” তাঁর কথা বিশ্বজনীন সত্য না হোক। মানুষের মৃত্যু, মানুষের জীবন ক্লিশে না হোক। মুখ ফিরিয়ে নেবার কৌশল ফ্যাশনে পরিণত না হোক। মানুষ মানুষের পাশে এসে দাঁড়াক, ভেসে দাঁড়াক, এবং ভালোবেসে দাঁড়াক।

তখনই সাধারণ মানুষ ছুটে এসে অন্যের পাশে দাঁড়াবে, যখন সে অন্যের লড়াইয়ের মধ্যে দেখতে পাবে নিজের লড়াইকে, অন্যের দাবির মধ্যে নিজের চাওয়াকে ভাষা পেতে দেখবে। আন্দোলনের ভবিষ্যৎ আর ভবিষ্যতের আন্দোলন নিয়ে ভাবার সময় এখনই।

হেডার ছবি : তন্ময় ভাদুড়ি

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4007 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...