বুড়োরাজ

সোমেন বসু

 

বিকেলের পাটুলী স্টেশন। ডাউন জঙ্গীপুর লোকাল তার লম্বা যন্তর দেহটা নিয়ে গড়িয়ে আসছে স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে। নির্দিষ্ট হোক। কলকাত্তাইয়া মানুষ আজকাল পাটুলী বলতে বাইপাস-সংলগ্ন নব্য টাউনশিপের কথাই বোঝে। আমাদের পাটুলী বর্তমান পূর্ব বর্ধমানস্থ, ২ নং পূর্বস্থলী ব্লকস্থ, ভাগীরথীর তীরস্থ লেবড়ে শুয়ে থাকা এক প্রাচীন জনপদ। এখানকার মাটির কয়েক পরত খুঁড়লেই পাওয়া যাবে সিরাজউদ্দৌল্লার সাথে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য ক্লাইভের বাহিনীর ঘোড়ার খুরের দাগ। আরও কয়েক পরত গেলে তুর্কী হানাদারদের পদচিহ্ন। তবে সে সব ভিন্ন কথা। এখন ট্রেন আসছে কাটোয়ার দিক থেকে। পাটুলীর দুই স্টেশন পর। কাটোয়া।দিনটাও নির্দিষ্ট করা যাক। দু’হাজার সতেরোর ৯ই মে’র বিকেল। পঁচিশে বৈশাখ, চোদ্দোশো চব্বিশ বঙ্গাব্দ। কিন্তু বেহদ্দ হাতড়াহাতড়ি করেও রবি ঠাকুরের কোনও চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না দূর দূর তক। সকালে আসার সময় দেখেছি ব্যান্ডেল পার হতেই লোকটা গোপন হয়ে পড়ল। রাস্তার মোড়ের চিৎকৃত চোঙগুলো থেকে বোধহয় সেঁধিয়ে গেল মধ্যবিত্তদের ড্রয়িং বা বেডরুমে। আর এখানে সেই গোপনীয়তার এতটাই দাপট যে লোপ হল বলে ভ্রম হয়। এই যে বিকেল চারটে চল্লিশের ডাউন জঙ্গীপুর ঢুকছে, আর একটা তীব্র গুঞ্জরব একটু করে স্পষ্টতর হয়ে উঠে মাথার মধ্যে ঢুকতে চাইছে, সেই গুণগুণের সঙ্গেও ঐ ভদ্রলোকের কোনও সম্পর্ক স্থাপন করা মুশকিল।

ট্রেন ঘেঁচিয়ে স্থির হল। কিন্তু সেটা টের পাওয়া গেল না। মোচরানি দিয়ে থামার আওয়াজ থেকে আবার ঈষৎশাওয়া ছেড়ে চালু হওয়া– এই গোটা সময়কালকে লেপে রইল তার পেট থেকে হওয়া এক হুড়হুড়ে উদ্গার। গাদা গাদা লাফানো, হুমড়োনো, সশব্দ মানুষ। বেশ কিছু পাঁঠা ও ভেড়াও। গলায় দড়ি-ঘণ্টি বাঁধা। যে দড়ি কোনও না কোনও মানুষের হাতে, অনিবার্যভাবেই। যাদের পেছনে অত বড় ইস্পাতের শরীরটা ব্লারিত ব্যাকগ্রাউন্ডের মতো খানিক থেকে চলে গেল দখিনপানে। বিভিন্ন বয়সের মানুষ। নারী পুরুষ দুইই। টোপলাটুপলি থেকে একরকমের বেতের ছোট লাঠি অনেকের হাতে। যার একটা দিক পাকিয়ে আংটার মতো করা। তার পরে বড় লাঠি, রড। এবং তারও পরে রাম-দা, তলোয়ার, খাঁড়া। দৈর্ঘ্যে দেড় থেকে তিন-চার ফুট অব্ধি। নিস্তরঙ্গতায় অভ্যস্ত স্টেশন এই অযাচিত উচ্ছ্বাসে কেঁপে উঠতেও ভুলে গিয়ে স্থাণুবৎ, বোবায় পাওয়া। প্ল্যাটফর্মের ধারে ছোট কদমের ডালে বসে থাকা কাকটা, চায়ের দোকানের পাশে বিড়ে পাকিয়ে থাকা রুগ্ন কুকুরটা, প্রাথমিক ইনস্টিংক্ট অনুযায়ী দৌড়ে বেরনোর পর গেটটার একপাশে সরে গিয়ে, দুই-তিন যৌথ প্ল্যাটফর্মের জারুলের ডালে কাঠবিড়ালীটা, স্টেশনের ওপারে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা সোনালি ভারী ধানগাছ, বাতাস। যাবতীয় বাতাস এখন এই হেথায়, এই এক নম্বরে, ট্রেনের আসা এবং যাওয়া এবং এতগুলো মানুষের নাক, মুখ (পেছন ঠাহর করা হয়নি, সম্ভবও ছিল না) দিয়ে বেরনো জৈব বায়ুপ্রবাহের সাথে মিশে এক তপ্ত হাওয়ার দলা। ভিড়টাও দলাপাকানো, যেটা হঠাতই মাঝে এক জায়গায় একটা ফাঁকা মোটের ওপর নিখুঁত বৃত্তাঞ্চল তৈরি করে পরিধিতে আরও বেশি করে দলা পাকিয়ে গেল। বৃত্তের কেন্দ্রে এক সুঠাম, কৃষ্ণকায় বাঙালি গ্রাম্য যুবা, পড়ন্ত সূর্যের আলোয় যার দেহমুখের ঘাম আর হাতের তিনফুটিয়া ধারালো অস্ত্রটা ঝিকমিকোচ্ছে। টানটান ঋজু হাতে অস্ত্র উঠে গেল মাথার ওপর। তারপর নেমে আসল প্ল্যাটফর্মের শানবাঁধানো পাটাতনে তেরছা ভঙ্গিতে। যে বৃত্তটা এতক্ষণ আন্দাজি ছিল, তা সুস্পষ্ট রূপে এবং সজোরে অঙ্কিত হল অতঃপর। বৃত্তের পরিধি আঁকতে আঁকতে অস্ত্রের শাণিত ধাতব ফলা প্ল্যাটফর্মের সিমেন্টের সঙ্গে ঘর্ষণে তারাবাজির মতো আগুনের ফুলকি ছড়াতে লাগল। দূরাগত যে ভীমরুলের ঝাঁকের মতো শব্দটা এতক্ষণে প্ল্যাটফর্মে এসে আছড়ে পড়লেও আরও নানা শব্দের সঙ্গে মিশে স্পষ্টতার অভাবে গুমরোচ্ছিল, এই ক্ষণেকের নীরবতার সুযোগে সে যেন খানিকটা দম নিয়ে এবার আছড়ে পড়ল কেটে কেটে—

–জ্জয় বাবা আ আ বুড়োরা আ আ আ আ আ জ….

#

“ছেচল্লিশেই হব্যে বোধহয়? নয়? বড় দাঙ্গাটা?” “ধুর! অত মনে থাক্যে! আমাদের তো তখন জন্মও হয় নাই!” “জন্ম দিয়ে কী হয়? উইদিন সনাতনের দোকানে যে কুরুক্ষেত্তরের গল্প শোনাইসিল্যি, তখন জন্ম হস্যিল তোর? ভূগোল পড়িস নাই?” “ধুর শালো…” “হাঃ হাঃ…”

রাত। পূর্ণিমা। জোছনা অতএব। নির্মেঘ আকাশে থালার মতো একটা চাঁদ, ব্লক অফিস কম্পাউন্ডের পশ্চিম পাশে অলস পড়ে থেকে সারাদিনের ধকল নিয়ে জাবর কাটা স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম, দু-তিনটে দায়সারা-জ্বলা আলো, কম্পাউন্ডের পশ্চিম ওয়াল আর স্টেশনের মধ্যেকার ঢালু অন্ধকার জমিটা থেকে ইতস্তত ভেসে আসা রাতপ্রাণীদের জেগে থাকার অস্ফুট আওয়াজ, মৃদু, তোমার ইচ্ছে না হলে তুমি নাও শুনতে পারো, এসবের মধ্যেই আমাদের পাঁচজনের রাতাড্ডা বসেছে বাপ্পাদার কোয়ার্টারের সামনে ফাঁকা সিমেন্ট বাঁধানো চত্বরটায়। সইফুলদা আর রমেনদা, ষাট ছুঁইছুঁই দুই আবাল্য দোস্ত, স্থানীয়। আমি আর অরিন্দম, চারের কোঠায় এবং বহিরাগত। বাপ্পাদা সর্বার্থেই মিডলম্যান এবং হোস্টও বটে। তাই অতীব প্রয়োজনীয়।

“ছেচল্লিশের কলকাতার ওদিকে বড় দাঙ্গার কথা শুনেছি পরে… অনেক মানুষ মইর‍্যেছিল… এখানে অত কিছু না। ওই… ও পাড়ায় কারও ধানের গোলায় আগুন লেগলে এ পাড়ায়ও য্যামন গরম হাওয়া বয়… ত্যামন। গরম হাওয়া…। আর সেও এই বুদ্ধু পূর্ণিমায়… বুড়োরাজের পুজোর সময়ে…! এই পাটুলীতে হিন্দু হয়তো কিছু বেশি হবে, তাও খুব নয়, ওই ধরেন হাফের থেকে এক মুঠি বেশি, কিন্তু এর চারপাশে এক্যেবারে একচেটিয়া মোছলমান। ওই পুবে এখেন থেকে তিন কিলোমিটার মতো গেলে গঙ্গা, গঙ্গার ওপারে নদীয়া ডিস্টিক। ওদিকটাতেই যা হিন্দু। বাকি তিনদিকেই মোছলমানে বোঝাই… যা হইস্যিল মনে হয়, আসলে আমরা তো দেখ্যি নাই, কিছু শোনা কথা আর কিছু ধারণা। …এই যে এত মোছলমান, এ তো একটা শক্তি, আর না দেখালে সেই শক্তি তো বুঝা যায় না। ও পাড়ার ভজুর ব্যাটা য্যামন দাও থাকতেও রদ্দা মেইর‍্যে নারকেল ফাটায়, সেইরকমই। আর সেই শক্তি দ্যেখানোর জইন্যে একটা বড় হিন্দু পরবের চায়ে আর ভালো কী হব্যে? আমাদের এই তল্লাটে দুগগাপুজোর থেইক্যেও বুড়োরাজের মেলা হিন্দুদের বড় পরব। এই পাটুলীর দশটার মধ্যে সাতটা ছাওয়ালের নামই বুড়ো হয় এখনও। হ্যাঁ, হিন্দু মোছলমান সবাইকার মইদ্যেই…। হিন্দুদের মইদ্যে থেক্যেও উস্কানি থেকতে পারে। কেউ হয়তো নেড়ে বা কাটা কিছু বলে দিস্যিলো, ওই যা হয় আর কী! বাড়িঘর জ্বলার আগে তো একটা ছোট্ট দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বল্যে…”

ইতিহাস বলে সেই কুখ্যাত দিন ছেচল্লিশের ষোলই আগস্ট। ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে। সম্মুখ সমরের দিন! কার সাথে কার সমর? “মানুষ মেরেছি আমি/পৃথিবীর পথে সেই নিহত ভ্রাতার ভাই আমি…”। সে যাক। কিন্তু বুদ্ধ পূর্ণিমা তথা বুড়োরাজের মেলা হয় মে মাসের প্রথম হপ্তায়। অতএব, অঙ্কবিচারে এ ঠিক অগ্নিকাণ্ড পরবর্তী উষ্ণ বায়ুপ্রবাহ নয়। বরং একটা দীর্ঘদিন ধরে চলা যে ষড়যন্ত্রের পরিণাম হিসেবে এক দগদগে ক্ষত বুকে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে উপমহাদেশ, সেই ষড়যন্ত্রেরই আঁচ পুইয়েছিল বুড়োরাজ।

“…তবে এই সব কি আর আমাদের মাথায় আসে? আমাদের মানে সবাইকারই। এই আমার, রমনার, সুভাষদার (বাপ্পাদার ভালো নাম সুভাষ। কিন্তু দাদা!) বা আপনেদের.. এই সব এমনি লোকেরা! এই সব ভাবার আর ভাবানের লোক থাক্যে। অল্প কয়টা, কিন্তু থাক্যে। সব সময়েই থাক্যে…”

বিড়ি জ্বলল ক’টা। আগুনের ফুলকি উড়ে গেল কিছু। বিড়ির আগুন আর সিগারেটের ছাই গুজবের মতো, বড় ওড়ে। আজ দুপুরে পাটুলী বাজারে একটাই মাইক। একটা ছোট গুমটি ঘর, দুটো বেঞ্চিতে দুটো লোক, একটা সাইনবোর্ড, ‘হিন্দু জাগরণ মঞ্চ’, একটা কালো সাউন্ডবক্সে গুমড়োনো অনুরাধা পোড়ওয়াল। ‘জয় জগদীশ হরে, ওম জয় জগদীশ হরে’। বাপ্পাদা বলছিল, অফিসটা ভুঁইফোড়। স্থানীয় একটা গোলমালের পর স্বপ্নাদিষ্ট শিবলিঙ্গের মতো গজিয়ে উঠেছে। এরা সবসময়েই থাকে…

“সেই থামানের গল্পটা জানেন? সেই ছেচল্লিশের বুদ্ধু পূর্ণিমার দিন… জমিতে যখন আগুন লেগ্যে গেল… মেলা, দোকানপসারে মারামারি, লুটপাট… বুড়োরাজের মন্দিরেও হামলা হইস্যিল… আকাশেও তখন আগুন… বোশেক মাসের সূর্য সব পুড়িয়ে দিস্যে… সেই সময়েই নাকি বুড়োরাজ জেইগ্যে ওঠ্যে! যেখানে ম্যাঘের চিহ্নমাত্র ছিল না… সেখানে কোদ্দিয়ে পাঁচ মিনিটের মইদ্যে গোটা আকাশ কালো হয়ে তুমুল পানি নাম্যে..! পোকিতিও ঠাণ্ডা হয়ে যায়… আর সেই সাথে মানুষও! বুঝলেন? এই হল গিয়ে গল্প…”

উত্তরদক্ষিণে শুয়ে থাকা পাটুলীর একমাত্র পাকা সড়কটা সারাদিন ধরে দখিনমুখো। শরীরের ওপর চলা বেলাগাম দাপাদাপিতে টনটনে বিষ সারা গতরে। তার মধ্যে দিয়েই সারা রাস্তা জুড়ে ঢোল-করতালের বাজন, ছাগল-ভেড়ার অসহায় ম্যা ম্যা, আর ভয়লাগানো অস্ত্রের আস্ফালন দেখতে দেখতে ছাতনী মোড়। সে পেরিয়ে আরও দক্ষিণে খানিক ঢুকলেই জামালপুর, বুড়োরাজের বাড়ি। যে পথটা মূল মন্দিরের দিকে বেঁকে গেছে ডানদিকে, দুপাশে মেলার পসরা আর লাইন দিয়ে সাময়িক সন্ন্যাসী মানুষজন। একেবারে থইথই। সবাই বসে রাতের পুজোর অপেক্ষায়। হাতে সেই বেতের লাঠিখান, সন্ন্যাসের প্রতীক। ইটের রাস্তায় দণ্ডি কেটে চলা নারীপুরুষ। মন্দিরের ভেতরে পা ফেলা মুশকিল। যদি তাও ঢুকতে পারো, সামনের হাঁড়িকাঠ, ডানে যমের অশ্বত্থ, রংবেরং-এর সুতলিবাঁধা ঝোলানো মানতিইটের টুকরো সজ্জিত, সোজা বুড়োরাজের মূল ঘর, এসব ছেড়ে বাঁদিকে ঘুরে গেলে দীঘির পাড়ে মাটির মালসায় পাটকাঠির আগুনে চাল ফোটাতে দেখবে প্রচুর এরকম সন্ন্যাসীকে। আর পুরো পরিবেশেই বুঝতে পারবে আনাচেকানাচে জড়ামড়ি করে রয়েছে অজস্র গল্প… মিথ…।

“জামালপুরের পাশে নিমদের যদু ঘোষের দুইশোটা গরু আর পঞ্চাশটা মতো মোষ ছিল। গোয়ালারা সেই সময় ওখেনকার জমিদার মানুষ। তা যদুর সেরা গরু নাকি ছিল শ্যামলী। এবার কি হল, হঠাত করে সে শ্যামলী আর দুধ দেয় না। যদু ঘোষ অনেক খোঁজখবর করল, কিন্তু কটা আখালকে পেটানো আর তাদের চাকরি খাওয়া ছাড়া আর কোনও সুরাহাই করতি পারল না। শেষমেশ একদিন দ্যাখে শ্যামলী একা একা জামালপুরের দিকে জঙ্গলপানে কই চইল্যে যায়! যদু তো গেল পিছন পিছন, গিয়ে বনবাদাড় ঠেঙ্গিয়ে দ্যাখে এক জায়গায় গিয়ে শ্যামলী ফোয়ারার মতো দুধ ফেইল্যে দিস্যে। এমনি এমনি, বুঝলেন তো? কেউ দোয়াস্যে না, কিছুই না! যদু টাকার লোকসানের জন্য ক্ষেইপ্যে উঠতে পারত, কিন্তু ও সিন দেখে ঘেবড়ে গেল বেশি। আর ঘাবড়াইলে তো বিজ্ঞ মানুষের কাছে যাওয়ানেরই নিয়ম, আর সে সময় বামুন ছাড়া বিজ্ঞ আর কেই বা হব্যে! সে দৌড়ল জামালপুরের মধু চাটুজ্জের কাছে, টোলুয়া পণ্ডিত। মধু শুইনে আসল যদুর সাথে। এসে দেখল একই সিন। কিন্তু ও তো বিজ্ঞ, তাই যেইখানে দুধ পড়স্যে সেইখানে একটা পাথর আবিষ্কার করল। এই পাথরটাই বুড়োরাজ, সেইটা সেইদিন আতে বুড়োরাজ নিজে স্বপ্নে এসে মধুকে বল্যে যায়। ওই জঙ্গলই হল গিয়ে এখন বুড়োরাজের মন্দির। মধু চাটুজ্জে জামালপুরের বাগদিদের দিয়ে ওই জঙ্গল সাফা করিয়ে বুড়োরাজের ঘর বানিয়েস্যিল। এখনও মন্দিরের ঘর ছাওয়ানের কাজ ওই বাগদিদের, কোনও টাকাপয়সা নাই। খালি পুন্যি হব্যে। ওরা পাঁঠাবলি হলে মাথাটা পায়, আর কোনও ভক্তের থেকে চেয়েচিন্তে কয়টা টাকা! ওদিকে মধু চাটুজ্জের বংশ কয় পুরুষ পরেই শেষ। তখন সেবাইত হল নদীয়ার ধর্মদা গ্রামের বন্দোরা। এরা চাটুজ্জেদের জামাই, আর এই বিয়ে দিতেও নাকি বুড়োরাজ স্বপ্নে এসে বল্যে দিস্যিল। ভগবান, আল্লা যেই কন, বেটিছাওয়ালের হাতে পুজো নিতে চায় না!…”

মাঠে গর্ভিণী ধান এখনও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। পাকতে দেরি হয়েছে, কৃষকের শাণিত কাস্তে এখনও তাদের গোড়া স্পর্শ করে উঠতে পারেনি সব। “এ বছর তো লোকই নাই মেলায়..!” “থাকব্যে কি করে? ধান কাটব্যে, না মেলায় আসব্যে? আগে তো প্যাট রে বাপু!” সকালে চায়ের দোকানে কৃষকসুলভ বাস্তববাদী কথাবার্তা। তিথিপ্রণেতারাও ছিলেন, বাস্তববাদী। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে সম্মান দিয়ে প্রায় সমস্ত পরবই ফসল ঘরে ওঠার পরপর। দেবতাদের শিক্ষাও সেমতো। তারা পাঁঠা ভালোবাসে, ছাগল নয়!

“আমার আব্বা-চাচারা তো সন্ন্যাস নিত বুড়োরাজের পুজোর সময়ে। অনেক মোছলমানই নিত। আসলে গাঁ-গঞ্জে দেবতার অত ধর্মভেদ নাই। কত হিন্দুই তো পীরের মাজারে মানত কর‍্যে, পুজো দেয়। কিন্তু ওই ছেচল্লিশের পর থেকে সব ওলটপালট হয়ে গেল। মোছলমানরা বুড়োরাজকে হিন্দুর দেবতা মনে করা শুরু করে দিল। হিন্দুরাও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আসা শুরু করল। এখন তো এইটাই নিয়ম হয়ে গেছে। আমাদের হিন্দু-মোছলমানের সম্পর্কটা যেন ডিমের মতো। ওপরে শক্ত খোল, কিন্তু একটু চাপ পড়লেই খোলা ফেটে এক্কেবারে গল্যে যায়। কিন্তু মজাটা হস্যে, অস্ত্রশস্ত্র আইসতে থাকল, ওই দাঙ্গার ভয়েই আনা শুরু হল, কিন্তু এতগুলো বছরেও আর কিছুই হল না। ডিমের খোল শক্ত হয়ে গেছে। কে চায় বলেন তো, নিজেদের মইদ্যে খামোখা মারামারি কাটাকাটি কইরতে?”…

বাপ্পাদাই আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। ‘হিন্দুত্বের আগ্রাসী রূপ দেখতে হলে বুড়োরাজের মেলা দেখে যা।’ রোববারের সন্ধের ঠেক সরগরম ছিল তখন এই যুক্তিতে, রামনবমীর অস্ত্রমিছিল কিছুতেই মহরমতূল্য নয়। ওটা রীতি, এটা আরোপিত দুরভিসন্ধিমূলক প্ররোচনা। বুড়োরাজের ভক্তকুলের সশস্ত্র আস্ফালনও প্ররোচনাসঞ্জাত। বাস্তব প্ররোচনা, দগদগে ছেচল্লিশ। কিন্তু সে এখন অনেকটাই বিস্মৃতির পলিতে চাপা পড়ে স্রেফ নিয়ম। কিন্তু আদিম হিংস্র মানবিকতা সত্য। হাতে অস্ত্র আসলে সে হিংস্রতার দেহে জলবাতাস সত্য। পাঁঠা সত্য। ছাতনী মোড় থেকেই জায়গায় জায়গায় পুলিশ, র‍্যাফদের যে দেখা যেতে লাগল, সে হালের কথা। যখন এই সশস্ত্র ভক্তেরা অস্ত্রের শান পরীক্ষা করা শুরু করেছিল নিজেদেরই ওপর। বলির মাংস কাড়াকাড়ি করতে গিয়ে।

“পুজোর নিয়মকানুন থাক্যে নানারকম। ওসব আমরা তো সব বলতে পারি না। বামুন বা সেবায়েতরা ভালো বলতে পারবে। তবে একটা জিনিস জানি, বুড়োরাজের মন্দিরে শিবের সাথে যমেরও পুজো হয়। মন্দিরে ঢুকলে ওই যে অশথগাছটা, ওইটে যমের। বলিটা নাকি খায় যম। আর শিব খায় পায়েস। ওই যে, শ্যামলীর দুধ খাওয়া দিয়ে শুরু, সেই নিয়ম। এইবার মধু চাটুজ্জে ক্যানে শিবের সাথে যমকেও ঢুকিয়ে দিয়েসিল, সে কে জানে! আবার অনেকে বলে শিবের পুজো মানে তো শক্তির পুজো। এই সব যুক্তিতত্ত্ব দিয়েই কয়েক হাজার পাঁঠার জান যায় প্রতি বছর। কাল দুপুরে গেল্যে দেখবেন, শানবাঁধানো মেঝের সাদা শান নাই! অক্তে থইথই করসে…”

#

কাক ডাকছে ইতিউতি। ‘ডাকে পাখি, না ছাড়ে বাসা/খনা কহে তাকেই ঊষা’। কিছু পরেই আজন্ম নাগরিক আমাদের দুজনের সকালের মোরগের ডাক শোনার সৌভাগ্য হবে। এই ঊষার না ফোটা আলো আর রাতের ক্লান্ত বাল্বের ঝিমুনি আলোর মধ্যে দিয়ে ব্লক অফিসের সরু ইটবাঁধানো রাস্তাটা দিয়ে পাশাপাশি হেঁটে চলে যাচ্ছে দুটো মানুষ। একটু থেমে একটা দেশলাইকাঠি দিয়ে দুজনে দুটো বিড়ি ধরিয়ে নিল। একটা ছবি। মামুলি বলতে পারো, বা চিরকালীন। যে ছবিটা এই মুহূর্তে আমার মগজে ফেভিকলের ডিম ফাটানোর অ্যাডটার সাথে ওভারল্যাপ করে যাচ্ছে।

এরকম আরও কিছু ছবি নিয়েই বিকেলের ডাউন জঙ্গীপুর লোকাল। পাটুলী। বুড়োরাজ। জামালপুর…

ব্লক অফিসের লোহার গেটের গায়ে লটকানো একটা হলদে ব্যানার। বেআইনি অস্ত্র লইয়া বাবা বুড়োরাজের মন্দিরে প্রবেশ নিষেধ। বাঁদিকের ওপরের কোণটা খুলে মুখ গুজরোনো।

ফেরত পূণ্যার্থীদের দল। দলের সামনে দুটি ছেলে। ছেলেদুটির কাঁধে শুয়ে থাকা ছোট বাঁশ। বাঁশে সামনের দুটো এবং পেছনের দুটো ঠ্যাং বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা একটি পুরুষ ছাগদেহ। মুণ্ডহীন।

ছাতনী মোড়ে বসে বসে এক ডব্লুবিপি আর এক র‍্যাফ খৈনি মলতে মলতে হাস্যরসে ব্যস্ত। দুজনেরই জামার ওপরের দুটো করে বোতাম খোলা। ইতিউতি ছড়ানো আরও কজন।

পাটুলী-ছাতনী-জামালপুর সড়কের পাশের লোকালয় যেথা যেথা, রাস্তার দুধারে সার দিয়ে দাঁড়ানো নারীপুরুষ। পূণ্যার্থীদর্শন। বাচ্চা কাঁখে সিঁথিতে সিঁদুর আর কপালে টানটান ঘোমটা পাশাপাশি।

চোঙা, রঙিন কাপড় এবং লম্বা বেঞ্চি শোভিত সশব্দ জলসত্র। বেশি করে শোভিত রঙিন কাপড় জড়ানো বংশদণ্ডগুলির জায়গায় জায়গায় উঁচিয়ে থাকা তেরঙায় ঘাসফুল বা গেরুয়ায় পদ্ম।

এবং…

উন্মত্ত, সশস্ত্র একদল হিন্দু যুবকের সামনে মেলায় হাসতে হাসতে মায়ের সাথে কাঁচের চুড়ি পছন্দ করতে থাকা দুই মুসলিম কিশোরী…

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3842 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. আপনাদের এই সংখ্যা শুরু করলাম এই লেখাটা দিয়ে এবং পয়সা উসুল।

আপনার মতামত...