অনুরাধা কুণ্ডার কবিতা

দিনলিপি ভুলে গেলে

 

তারিখ ভুল হয়ে গেলে
যে আশ্চর্য দিনলিপির পাশে
নতমুখে বসে থাকো সারাদিন
সে এক আদ্যন্ত নদী।
এপার থেকে ওপার বেশ দেখা যায়
দেখা যায় ছিটের ফ্রক, হাতপাখা
টিনের বাক্স আর জলের কুঁজো
আর সারাক্ষণই কানের কাছে
কে যেন বাক্সকে বাসকো বলতো
বলতো আর বাসকো গোছাতো
তার কথা হাঁসফাঁস করে।
কিছুতেই নাম মনে আসে না,
মনে আসে না জন্মদিন, অন্নপ্রাশনের দিন
এক অক্ষৌহিণী সেনা দাঁড়িয়ে থাকে
বিরহের অন্তরালে তীর গাঁথবে বলে
কোনও তারিখই মনে থাকে না তাই
জন্মদিন, বিবাহদিনকে নাইয়ে ধুইয়ে
কপালে কাজলের টিপের চুম্বন দাও।
এসব তারিখ ডুবিয়ে দিয়ে জলে
কেবল অনন্ত মৃত্যুদিন চেয়েচিন্তে
ভিক্ষাপাত্র প্রেমজ ভেবেছো
এক গলা জলে নেমে আর কি বিশদে বলা যায়!

 

স্বপ্নে

 

কী ছিল স্বপ্নে? শৌচাগারে?
অবিশ্বাস্য লম্বা ট্রেন। এদিক, ওদিক।
কোথাও শৌচাগার নেই।
কোথাকার স্যাৎস্যাতে হাসপাতাল
তারও পিছনদিকে আছে বুঝি?
কারা সব অতিকায় দানবের মতো
মাটি আর সারা দেহে খড়চাপা হয়ে
বসে আছে,শুয়ে আছে প্রেতের মতন!
তারা অতিমানবের দল। চোখ নেই।
পরিবর্তে অন্ধকার। খড় চাপা মমি।
গোঙানির শব্দ আর মাটি মাখা দেহ
মাটি আর খড় ছেড়ে উঠতে পারে না
ফুঁসে ফুঁসে ওঠে আর ভয় পায়।
কী যেন অদম্য শোক অন্ধ করে রেখেছে তাদের
তারা খাবি খায় আর দূর থেকে
কোন অজ্ঞাত ভয় জ্ঞাত স্বরে জাগে আর
অন্তরাত্মা কেঁপে কেঁপে ওঠে।

 

বোনেরা

 

প্রকৃতি ও সংস্কৃতি দুইটি বহিন।
একের কপালে চাঁদটিপ, তামা সীসে
অপরে কাজলধোওয়া চোখে ঘুম।
কে যে দরোজায় এসে আধোচোখে তাকিয়েছে
ঠাহর হল না।
প্রকৃতিকে পিশাচিণী বলে পাথর মেরেছে
আর সিলিকন সার্জারি অন্যটিকে।
এদের কেহই আর বেঁচে নেই।
নিঃশ্বাস নেই আর স্পন্দন ও শেষ।
প্রকৃতি একাকী বলে ঢেলা মারা সোজা
সংস্কৃতি সিন্থেটিক বিষাদ মলিন।
মৃতদেহগুলি যত্নভরে দেওয়ালে গাঁথানো
চোখ নখ উপড়িয়ে সেজেছে শহর,
হঠাৎ ঘূর্ণি এলে মনে পড়ে, যদি মনে পড়া
স্বতঃসিদ্ধ হয় আর গতিশীল
প্রকৃতির প্রেতজন্ম এখনও ভোলেননি
তার কাজলনয়না বোনটিকে।

 

বাঘিনীরা

 

একটা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে
আজকাল খুব ফাঁকা লাগে।
তাদের আর দেখা পাই না
যারা এই কার্নিশ থেকে ও কার্নিশ
এই বারান্দা থেকে ঐ বারান্দা
লাফ দিয়ে পার হত
আর পাঁচিলের ওপর বসে
থাবা পরিষ্কার করতো চেটে চেটে।
রাস্তায় স্পষ্ট পেতাম তাদের ওম
গোল হয়ে বসে থাকাটুকু,
প্রখর চাহনি, দৃঢ় ছাপ
যেন এইমাত্র বাঘিনী হয়ে উঠবে।
খুব মনে হয়, মনে হয়
বাঘিনী হয়ে ওঠাটুকু আর ধারালো নখ
নিমগাছের আড়ালে চোখ
মার্বেল খেলতাম যারা, তারাই জানে
মার্বেলে কতরঙ থাকে আর চোখে
সেই তারাই বুঝিয়ে দিত বাঘিণীরা
সুখী গৃহস্থকোণে থাকে,
শুধু বেঁচেবর্তে থাকবার তরে
চোখ দুটি চাই আর ধারালো নখর।

 

উভয়েই

 

স্নান করে চুল মুছতে মুছতে
সন্ধ্যামাসি আমাকে বলে-
তুমি দীক্ষা নাওনি?
আমি বলি, না, আমার দীক্ষা নেই
হবেও না। মাসি মুখ ভার করে।
বলে, দীক্ষা না নিলে দেহ শুদ্ধ হয় না।
সারা ঘরে মাইসোর স্যান্ডাল গন্ধ
নাক টেনে আমি বলি, বিশ্বাস নেই।
মাসি বলে, গরমে কলাই ডাল এনো।
আমি পাশ ফিরে শুই।
সিরিয়াল দেখতে দেখতে সে হাসে
বলি, সাউন্ডটা কম করো না!
সে যদি উত্তর হয়, আমি দক্ষিণ
সে যদি ডাঁটাশাক হয় আমি কর্নফ্লেক্স।
রাত বাড়লে বোঝা যায়।
তার ঘরে তার ঘুম
আর আমার ঘরে আমার
এরাই পরিপূরক। আমার অপছন্দে
তার খিলখিল হাসি, পছন্দে চুপচাপ
এইগুলো পরস্পরকে খোঁজে।
তার পাকাচুলে হেয়ার ডাই, আমার কালার
কড়াইশুঁটির ঘ্রাণ, আদা চা
এরা কাটাকুটি খেলে। কী আলাদা, কী আলাদা!
শুধু শ্বাস জানে, উভয়েই নারী।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5395 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.