পিতৃতন্ত্র ও যৌন শুচিতা

স্রোতা দত্ত আচার্য

 

২০১২ সালে নির্ভয়া কাণ্ডের ছ’দিনের মাথায় বিচারপতি ভার্মার নেতৃত্বে এক তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। পরের বছর রিপোর্ট জমা দেয় কমিটি। সেই রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যু না হওয়াই ভালো। তা সত্ত্বেও সেই সুপারিশ উপেক্ষা করে, ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে ফাঁসিকে অনুমোদন দিয়ে পাশ হয় ক্রিমিনাল অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট। সেই সময়ে কলকাতা হাইকোর্টের এক আইনজীবী কথাচ্ছলে জানিয়েছিলেন, যাঁরা ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে ফাঁসিকে সমর্থন করছেন, তাঁরা জানেন না, মহিলাদের জন্য তা কতটা বিপজ্জনক। এত দিন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মেয়েদের ধর্ষণ করে, পাশবিক অত্যাচার চালিয়ে ছেড়ে দেওয়া হত। এবার থেকে ধর্ষণের পর মেয়েদের আর বাঁচিয়ে রাখা হবে না। প্রমাণ লোপাট করতে স্রেফ মেরে ফেলা হবে। মেয়েদের মূল্যটা কোথায় নামল বুঝতে পারছেন? কথাটা মিলে যাচ্ছে কি? ২০১৪-র পর যে সব কুখ্যাত ধর্ষণের ধটনা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে, তাতে কতগুলো রেপ অ্যান্ড মার্ডার কেস?

ঠিক যে সময় হায়দ্রাবাদের নারকীয় ঘটনা ঘটেছে, এক-দুদিনের হেরফেরে রাঁচিতেও একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এক আইনের ছাত্রীকে বারো জন মিলে একটি ইটভাটায় নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। তবে তারা যে কেন মেয়েটকে মেরে ফেলেনি! নইলে পরদিন থানায় গিয়ে মেয়েটি ওই বারো জনের নামে নালিশ জানানোর সুযোগ পেত? তাঁর নালিশের সূত্র ধরে এক দিনের মধ্যে মায় ধর্ষিত-র মোবাইল-ঘড়ি ইত্যাদি সহ সবাইকে পুলিশ ধরতে পারত?

পাঠক, এইটা পড়ে নিশ্চয়ই ক্ষুব্ধ? মনে মনে ভাবছেন, এক ধর্ষিতের মৃত্যুকামনা কী ধরনের মানবতা? বিশেষত এক মহিলার কাছে এই রকমের মন্তব্য আশা করা যায় না! কিন্তু মনে মনে একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন, আমাদের কি সত্যিই কিছু যায় আসে? দুটি ঘটনা প্রায় একই সময়ে ঘটলেও, যেহেতু রাঁচির মহিলা বারো জনের দ্বারা অত্যাচারিত হওয়ার পরেও ঘুরে দাঁড়িয়ে পরের দিন নিজে গিয়ে থানায় নালিশ জানালেন, ঘটনাটি জনমানসে তার ‘আকর্ষণ’ হারাল, কারণ, তার থেকেও ভয়াল, ও ‘চিত্তাকর্ষক’, ধর্ষণ করে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মেরে দেওয়ার মতো ঘটনা।

একদিকে ঘটনার ভয়াবহতা। অন্যদিকে তার অনুপুঙ্খ বিবরণে ত্রাস সৃষ্টি করা। আরও একটা দিক, এই লাগাতার বর্ণনার মাধ্যমে এক বিকৃত ধর্ষকামকে গোপনে প্রশ্রয় দেওয়া। এটাই কি চায় না পিতৃতন্ত্র? একদিকে ত্রাস, অন্য দিকে এক একান্ত পুরুষোচিত বিকৃত লালসার পরিতৃপ্তি। ধর্ষণ, তার বিবরণ, তা নিয়ে আইনি বাদানুবাদ ও পরিশেষে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। গোটা প্রক্রিয়াটা সেই ক্ষমতারই প্রতিফলন।

বিচারপতি ভার্মার রিপোর্টেই পাওয়া যায়, ধর্ষণ শুধু অত্যাচার, নৃশংসতা নয়। আসলে তা ক্ষমতার খেলা। ক্ষমতার প্রকাশ। এই ক্ষমতার বিরুদ্ধে কীভাবে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে রিপোর্টের ছত্রে ছত্রে। এই রিপোর্টে ধর্ষণের শাস্তি মৃতুদণ্ডের বিরোধিতায় আমল দেয়নি সরকার। আমল দিলে দীর্ঘমেয়াদি যে নীতি দরকার, এই অশিক্ষিত হাড়-হাভাতের দেশে, তা হয়ে দাঁড়াবে আরও একটা ‘খায় না মাথায় দেয়’ জাতীয় সমাধান। আর নীতি-র সুফল যদি নাড়িয়ে দেয় পিতৃতন্ত্রের ভিত? তাছাড়াও প্রশাসনিক খামতির কারণে, বিচারব্যবস্থার যে গয়ংগচ্ছ প্রক্রিয়া ও তার যে রাজনৈতিক ফায়দা, সে দিকটাও তো ফেলনা নয়! সর্বোপরি, ভারতবর্ষের মতো আদ্যন্ত পিতৃতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ধর্ষণের শাস্তি, চরম শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড আইনত বলবৎ করলে পিতৃতন্ত্রের হাতই আরও বজ্রকঠিন হয়, তা বুঝতে বেশি পাকা মাথার প্রয়োজন নেই।

বিচারপতি ভার্মার রিপোর্টে বৈবাহিক ধর্ষণকে শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় আনার সুপারিশ ছিল। কিন্তু হিন্দু বিবাহ ‘সাত জন্মের বন্ধন’-এর দোহাই দিয়ে তা সংসদে নাকচ হয়। অথচ ‘সাধারণ’ ধর্ষণের ক্ষেত্রে চরম শাস্তি। বিবাহিতা ও অবিবাহিতার পার্থক্যের পিছনে সামাজিক ও শারীরিক পরিবর্তনের চিহ্নায়নে তা স্পষ্ট। সেই সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে শুচিতা ও এক অবিবাহিতার দৈহিক শুচিতার প্রশ্নে পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবও স্পষ্ট। এছাড়াও, ধর্ষণের চরম শাস্তিতে খারাপ পিতৃতন্ত্র (অর্থাৎ যে পৌরুষত্ব মহিলাদের উপর বা দুর্বলদের উপর ক্ষমতার প্রকাশে পরিতৃপ্ত)-এর উপর ভালো পিতৃতন্ত্র (যে পৌরুষত্ব দুর্বলেরে রক্ষা করে, দুর্জনেরে হানে)-এর প্রতিষ্ঠা হয়। এতে সাপও মরল লাঠিও ভাঙল না। সুপিতৃতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। যৌনশুচিতার বিষয়টি জনমানসে গেঁথে দেওয়া। নারী আরও একবার সেই বজ্রকঠিন পিতৃতন্ত্রের শিকার। বোঝা যায়, নারীত্ব ও তার যৌনতার প্রশ্নে আসল নিয়ন্ত্রক ও নিয়ন্তা কে!

আরও একটা ব্যাপার ভাবায়। ইংরেজি খবরের কাগজে বহুবারই একটা শব্দবন্ধ চোখে পড়ে— ‘rape surviver’ অথবা rape victim। যেন তার নারী পরিচয় বা তার সত্তা নয়, তার শরীরের উপর ঘটে যাওয়া বর্বরতাই তার আসল পরিচয়। যেন ধর্ষণ এমন একটা চরম অত্যাচার, সেখানে মহিলার মরে যাওয়ারই কথা ছিল। ফাঁকতালে বেঁচে গেছে। তাই সে surviver, আবারও সেই পিতৃতান্ত্রিক শক্তি প্রদর্শন ও যৌনতা বিষয়ে শারীরিক বিশুদ্ধতার নিদান। অন্যদিকে এক ধর্ষিত কিন্তু victim অর্থাৎ ‘শিকার’! কীসের ‘শিকার’ তা বলাই বাহুল্য!

প্রশাসন, রাজনৈতিক হর্তা-কর্তা থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়ের শঙ্কর মুদি, সবাই নানা-ভাবে চিন্তিত নারীর সুরক্ষা নিয়ে। সেই সঙ্গে পিতৃতন্ত্র রক্ষায় কায়েমি স্বার্থ নিয়ে। নারীর যৌনশুচিতা রক্ষা আদৌ প্রয়োজন কিনা এ বিষয়ে মহিলাদের মতামত অগ্রাহ্য তো করাই হয় বরং একটুও টসকালে তার জন্য বরাদ্দ, ছেনাল থেকে পতিতা-র মতো নানা শব্দবন্ধ। আমরা যাই কোথায়? ঘুরে দাঁড়ানোর কি কোনও উপায় নেই? কেমন হয় যদি এই যৌন শুচিতার এই গোটা ভাবনাটাকে আমরা নস্যাৎ করার মনের জোর আনতে পারি? বলতে পারি, “দেহ ধ্বংস হলেও আমি ধ্বংস হইনি।” সে পথ দেখিয়েছেন আমার আপনার মতো মহিলারাই। ভাঁওরিদেবী তো রয়েইছেন। ভার্মা কমিটির রিপোর্টে উল্লিখত এক বিখ্যাত উক্তি বলে,

A rape is horrible. But it is not horrible for all the reasons that have been drilled into the heads of Indian women. It is horrible because you are violated, you are scared, someone else takes control of your body and hurts you in the most intimate way. It is horrible because you lose your “virtue”. It is not horrible because your father and your brother are dishonored. I reject the notion that my virtue is located in my vagina, just as I reject the notion that men’s brains are in their genitals.

শুধু আইনি দলিল বা প্রমাণপত্রে নয়, নবনীতা দেব সেন তাঁর এক ছোট গল্পে দেখিয়েছেন, এক ধর্ষিত কীভাবে পড়াশুনো শেষ করে নিজের পছন্দের জনকে বিয়ে করেছে। আর সেই রাঁচির মেয়েটি? নির্যাতন, অপমান, লাঞ্ছনা, সামাজিক ভাবনা সবটুকুকে দূরে সরিয়ে রেখে দাবি জানিয়েছে, ‘বিচার চাই।’

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3088 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...