দুএকটা মৃত্যুদৃশ্য– বসন্তকালীন হাতচিঠি

শাশ্বতী সান্যাল

 




লেখক কবি ও গদ্যকার।

 

 

মনে কর বোধিসত্ত্ব, এই রোদ প্রথম কবে দেখেছ? প্রথম কবে এতটা হেঁটে এসেছ ভোরের স্টেশনে? ওই যে ভোরের প্রথম লোকাল বেরিয়ে যাচ্ছে, ভেন্ডারে নারী পুরুষেরা, মূলত নারীই – তাদের শীতশেষের সবজিটুকু নিয়ে, ক্রমশ ফুরিয়ে আসা পোকায়কাটা গাঁদার বস্তা নিয়ে, মরশুমের অন্তিম আর বিস্বাদ ফুলকপি নিয়ে শহরে যাচ্ছে। এখন দরজা পেরোনো মানে দুএকটা সবজিক্ষেত ডিঙিয়ে, শাপলাবিল বাঁদিকে রেখে, ইতস্তত ফুলচাষের জমির পাশ কাটিয়ে সতর্ক পা ফেলা। ভোরের মফসসলি ট্রেন… দরজার পাশে নারীপুরুষের বসে থাকার ভঙ্গিটিও কী ভীষণ আর্ত ! কোকিলের ডাক জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ে, পাক খায় মানুষগুলোর শাড়িতে, জামায়, বাসি মুখচোখের ভাঁজে। খাঁচা জেগে ওঠা এই শরীরগুলো আসলে ছদ্মবেশ। তার ভিতরে দাঁড়িয়ে আছে এক একটা নিঃসঙ্গ ঘাসেঢাকা টিলা- তাদের ঘুমন্ত বুকে পিঠে কুহুরব গলাধাক্কা খেয়ে ফিরে যায়…

খেয়াল করে দেখেছি ‘নারী’ শব্দটা একটা অদ্ভুত ঝোঁক দিয়ে বল তুমি, তোমার সেই স্পষ্ট শহুরে উচ্চারণ আর উন্নাসিকতা ভালো লাগে আমাদের। কিন্তু কোনও ভালোলাগাকেই আমরা লালন করিনি। বরং দাঁতে-নখে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছি যাবতীয় পলাশমুহূর্ত। আমাদের অহংকার দূরের ওই বাজপড়া তালগাছটার মতো, নগ্ন অথচ সুন্দর। তাই তোমায় অনুকরণ করে ‘নারী’ নয়, ওদের আমরা মেয়েমানুষ বলব।

বাড়ির সামনেই দীর্ঘদিন একটা ঝাঁকালো গাছ ছিল আমাদের। কী গতর গাছটার। যৌবন যেন ফুরোতেই চায়না। শীতের শেষদিকে নতুন নতুন কচি ডালপালা বেরিয়ে আরও ঝুঁঝকো করে তুলতো তার শরীর। ফুল আসতো। অদ্ভুত মাদকগন্ধ সেই ফুলে। নাম জানতাম না গাছটার। মনে মনে তাই ওর নাম দিয়েছিলাম পটেশ্বরী। এই যেমন তোমার নাম জানিনা আমি। যে নামে তোমাকে এই পাঁচ সাতটা শহরের মানুষ চেনে, সেই নামটা এত শতচ্ছিন্ন, এত উইয়ে কাটা, যে জড়িয়ে ধরেও একেকদিন ছুঁড়ে দিই মেঝেতে। এই শীতশেষের রোদ্দুরে পুরোনো বইয়ের মতো ওই পোকালাগা নামটাকেও ফেলে রাখো কিছুদিন ছাদের কার্নিশে। সে জুড়ে নিক তার জামার ক্ষতগুলো, রিফুর দাগ। শহুরে প্রেমিকার লিপস্টিপ মুছে ফেলুক কলার থেকে। ততদিন নাহয় আমরা বোধিসত্ত্ব বলে ডাকবো। পরস্পরকে।

পটেশ্বরীর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তেমন ভালো ছিল না কোনওকালেই। তার ডালে ডালে যত না কাঠবিড়ালি ছিল, কাঠপিঁপড়ে ছিল তার ঢের বেশি। আর তাদের দংশন ছিল প্রথম প্রেমের মতো বিষাক্ত। কামড় খাওয়ার নেশা লেগেছিল তখন। সন্ধের দিকে দুবেণী আমি রেওয়াজ ভুলে প্রায়ই চলে যেতাম পটেশ্বরীর উঠোনে। দেখতাম তার আঁচল ফুলে উঠছে দক্ষিণ-বাতাসে। শরীরে অদ্ভুত গন্ধ। ফুল ফোটানোর আগে পোয়াতি মেয়েমানুষের মতো থমথম করছে সে… গোধূলিসন্ধিতে ওই রূপের সামনে দাঁড়িয়েই আমি বুঝেছিলাম প্রেম কী? ঈর্ষা কাকে বলে? যারা বলে, ‘নামে কিছু যায় আসে না’ – তারা ভুল বলে বোধিসত্ত্ব। নাহলে, যেদিন একটা চাপদাড়ি লোক এসে ঠাকুরদাকে ডেকে বলেছিল, ‘শিশিরবাবু, বাড়ির সামনে শ্যাওড়া গাছ পুঁতেছেন? বাচ্চাকাচ্চার সংসার। একটা অনিষ্ঠ বাধাবেন দেখছি! ‘ সেদিন কেন আমূল কেঁপে উঠেছিলাম আমরা? যেদিন শ্যাওড়া সন্দেহে ফুলে ভরা পটেশ্বরীকে ওরা কেটে ফেললো, কেন সেদিন আকাশের মুখ থমথম করছিল? জ্বোরো হাওয়া এসে কেন খানখান করে দিচ্ছিল আমাদের মধ্যবিত্ত বাড়িটার বে-আব্রু শরীর?

পটেশ্বরীর জন্য কেউ কাঁদেনি । সামান্য গাছের জন্য মানুষের মানুষীর কান্না যে শোভনীয় নয়, সেসব বুঝে ফেলেছি ততদিনে। ফাঁকা উঠোনে তখন আমাদের অঢেল বসন্ত, এককোণে পটেশ্বরীর মোটা গুঁড়ির গোল কাটা অংশটা ঢেকে মাধবিলতা ফুটেছে । বিকেলে পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসছে সাগর সেনের গলা : মোর বিরহবেদনা রাঙা হল কিংশুক রক্তিম রাগে… কাঁদিনি আমি, রোদনভরা বসন্ত বুকের বাঁ-দিকে কাটা গুঁড়ির মতো ঝিম হয়ে বসে গেছে ততদিনে। পিঁপড়ে চলার দাগ শরীরের এদিকেওদিকে। তার আশেপাশে মাধবিলতা ফুটে ওঠে বটে ঋতুতে ঋতুতে, কিন্তু সন্দেহের কুঠারক্ষত তারা মুছে দিতে পারে না। বড়জোর ঢেকে রাখে লোকচক্ষুর অন্তরালে

স্টেশনের বেঞ্চিগুলোয় নতুন নীলসাদা রঙ পড়েছে। তারই একটায় বসে আছ তুমি। চোখ মাটির দিকে। এসব আধচেনা শহরতলির মাটি ততখানি লাল নয়, যতখানি হলে পলাশসম্ভাবনা জেগে ওঠে। অদূরে একজোড়া রেললাইন। কিছুপথ সমান্তরাল হেঁটে অনন্যোপায় বাঁক নিয়েছে তারা। এই বাঁকের দুপাশে কিছুদিন পরেই জেগে উঠবে কৃষ্ণচূড়া। তাদের অসহ্য খুনি রঙ আস্ফালন ছুঁড়ে দেবে আকাশের দিকে।দূর থেকে দেখে মনে হবে এতদিন ধরে ট্রেনে কাটা পড়া মানুষগুলো, তাদের অগুন্তি ছিন্নমুণ্ড লাশ, রক্তে ভেজা শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। তাদের মৃত্যুকালীন হাহাকার বসন্তবাতাসে ছেঁড়া পাপড়ির মতো উড়ে উড়ে পড়ছে মাটিতে। এই মফসসল-মাটির কালো শরীরের লজ্জা ধুয়ে দিচ্ছে কৃষ্ণচূড়ার রক্ত।

জরিপের যন্ত্র নিয়ে ঘুরছ বুকপকেটে। খুব সন্তর্পণে। দেহাতি মেয়েমানুষের মতো শ্যামলা, উঁচুনিচু, লাজুক এই জমির অংশভাগ চাও তুমি। তার ভরন্ত গ্রামীণ শ্রোণির গভীরে পুঁতে দিতে চাও অধিকারচিহ্ন। তার জন্য দুএকটা পুরুষ গাছ, দুএকটা প্রেমিক গাছ কেটে ফেলা কী আর এমন! ফলত পটেশ্বরীর প্রেমিকেরা তাদের বিষণ্ণ বাদামি শরীর নিয়ে একে একে ঢুকে পড়ছে তোমার স্বপ্নের করাতকলে… একটা প্রায়-গরীব মফসসলে, বুনো কুলের ঝোপ পেরিয়ে, লেভেল ক্রসিংয়ের ঢালু রাস্তা ধরে ক্রমশই বড় হচ্ছে বেমানান ভারি মহার্ঘ জুতোর শব্দ। এই জুতোর দাগের আড়ালেই একদিন লুকিয়ে ছিল এক কিশোর লখিন্দরের নীল সাদা হাওয়াই চটি। তার গোড়ালিতে সাপের দাঁতের দাগ… ফুলে প্রায় বেগুনী হয়ে আসা কিশোর শরীর, দুঃস্বপ্ন আর বিষজ্বর তুমি ফেলে এসেছ কোন গতজন্মে! ফেলে এসেছ বসন্তের দিনে মহুয়াগন্ধ মাখা লালমাটির পথ। ঘুনসিতে মন্ত্রপূত শেকড় বেঁধে দেওয়া মায়ের আরণ্যক মুখ। এখন সকালের দ্বিতীয় বা তৃতীয় ট্রেনে শহরে যে ফিরছে, সে আমাদের বোধিসত্ত্ব নয়। সে কারও বোধিসত্ত্ব নয়। তার বসন্তদিনের ছেঁড়া চটি কবেই হারিয়ে গেছে কোনও এক শীর্ণতোয়ার ধারে, ঘাসের জঙ্গলে…

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3248 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...