বিশাখাপত্তনম— ধারাবাহিক গণহত্যার তালিকায় আরও একটি নাম

সোমেন বসু

 



লেখক রাজনৈতিক ভাষ্যকার

 

 

 

 

কৈলাস পাওয়ার। ভোপালের সেই অভিশপ্ত রাতে বেঁচে গেছিলেন। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে জীবন দিয়েছিলেন তাঁর মা। কৈলাস বেঁচে গেছিলেন বটে, কিন্তু ধ্বংস হয়ে দুটো ফুসফুসই। কাজ করতে পারতেন না। বেঁচে ছিলেন পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে। আশা ছিল ক্ষতিপূরণ পাবেন। নিজের দুটো ফুসফুসের দাম, কর্মহীন জীবনের দাম, মায়ের জীবনের দাম। ১৯৮৯তে সরকার আর ইউনিয়ন কার্বাইডের গাঁটছড়ায় মৃত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের যে অনিন্দ্যসুন্দর তালিকাটি নির্মিত হল, তা দেখার বা শোনার কয়েক সপ্তাহ পর গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করলেন কৈলাস।

তালিকাতে মৃতের সংখ্যা ছিল ৩০০০। স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা পার্মানেন্ট ইনজুরি ৩০০০০ জনের। ভোপালের এক সিনিয়র প্যাথলজিস্ট সেই ঘটনার পরে প্রথম দু সপ্তাহে একাই ১০০০০টি ডেথ সার্টিফিকেটে সই করেছিলেন!

রিমেম্বার ভোপাল মিউজিয়াম। ২০১৪ সালে গড়ে ওঠা একটি সম্পূর্ণ ডেনেশন-নির্ভর মিউজিয়াম। ২০১৭ সালে পথশিল্পীদের একটি দল এলাকায় চাঁদা তুলছিল। মিউজিয়ামের কিউরেটররা তাঁদের ভেতরে ডেকে আনেন। দলটির ড্রামার একটি সাদাকালো ছবির সামনে গিয়ে নিস্পন্দ হয়ে যান এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন। দশ মিনিট পর খানিক ধাতস্থ হয়ে তিনি জানান ছবিটি তাঁর স্ত্রীর। যাঁকে তিনি সেই রাতের পর এই দেখলেন, এই মিউজিয়ামের দেওয়ালে, এই ছবিতে, ছবিটি সাদাকালো।

এরকম অসংখ্য গল্প। ভোপালের। যদিও আমি এখানে বিশাখাপত্তনমের কথা লিখতে বসেছি। কিন্তু ভোপালের স্মৃতি ফিরে ফিরে আসছে বার বার…

বিশাখাপত্তনমে এলজি পলিমারস-এর কারখানা থেকে স্টাইরিন গ্যাস লিক হয়েছে। ১০ মে পর্যন্ত পাওয়া সরকারি রিপোর্টে ১২ জন মারা গিয়েছেন। হাজারের ওপর মানুষ হাসপাতালে ভর্তি। এটুকু এখন অবধি আমরা জানতে পেরেছি। অন্য প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে, একটু এই স্টাইরিন পদার্থটিকেই দেখে নেওয়া যাক…

 

স্টাইরিন সম্পর্কে

এলজি পলিমারস দাবি করছে লিক হওয়া গ্যাসটি স্টাইরিন। প্রথম কথা, স্টাইরিন গ্যাসীয় নয়, একটি তরল পদার্থ। এর স্ফূটনাঙ্ক অত্যন্ত বেশি। অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণের মতো প্রচুর তাপ-উদ্রেককারী কোনও ঘটনা না ঘটলে স্টাইরিনের গ্যাসীয় অবস্থায় আসা সম্ভব নয়।

স্টাইরিন বিষাক্ত নিঃসন্দেহে। স্বল্পমাত্রায় দীর্ঘদিন ধরে এর সংস্পর্শে এলে ক্যান্সার হতে পারে। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে ক্ষতি হতে পারে। শ্রবণশক্তি নষ্ট হওয়া, স্নায়ু বিকল হওয়ার মতো সমস্যাও হতে পারে।

তবে স্টাইরিন সংজ্ঞাহীনতা এবং মৃত্যুর কারণ হতে পারে অত্যন্ত বেশি মাত্রায় মানুষের শরীরে প্রবিষ্ট হলে।

কত বেশি?

শহরের বাতাসে স্টাইরিন কনসেন্ট্রেশন ০.০৬ থেকে ০.৪ পার্টস পার বিলিয়ন। যে সমস্ত শ্রমিকরা ৮০০ পার্টস পার মিলিয়ন স্টাইরিনের মধ্যে চার ঘণ্টা ধরে থাকেন তাঁদের শ্বাসকষ্টের সমস্যা হয়। এখানে মনে রাখতে হবে স্টাইরিনের যে সমস্ত ক্ষতিকর প্রভাব দেখা গেছে, সবই যে সমস্ত কারখানায় স্টাইরিন ব্যবহৃত হয় তার শ্রমিকদের মধ্যে। কারখানার বেড়া ডিঙিয়ে লোকালয়ের মানুষদের ক্ষয়ক্ষতি কখনওই দেখা যায়নি। ফলে লোকালয়ে এর ক্ষতি ছড়িয়ে পড়ার জন্য এর পরিমাণ কত মাত্রায় বেশি হওয়া প্রয়োজন তার একটা অনুমান আগের অঙ্কটা থেকে পাওয়া যেতে পারে।

আরও একটা তথ্য দেওয়া থাক। স্টাইরিন যথেষ্ট ঘন। তার নিজে নিজে সাড়ে চার কিলোমিটারের বেশি ছড়ানো মুশকিল।

অতএব, স্টাইরিন হলেও, শুধু স্টাইরিন নয়। এলজি পলিমারস, যদি মিথ্যে কথা বলছে নাও বলি, অর্ধসত্য বলছে।

 

আবার ভোপাল

এলজি কর্তৃপক্ষ জানাল স্টাইরিন স্টোরেজ ট্যাঙ্কের ভেতরে তাপমাত্রা পরিবর্তনের কারণে অটো পলিমারাইজেশন ঘটেছে, এবং স্টাইরিন বাষ্পীভূত হয়েছে। তাদের এক সিনিয়র অফিসিয়াল আরও বললেন গ্যাসটির ভালভ কন্ট্রোল ঠিকমতো না হওয়ার কারণেই এই দুর্ঘটনা।

অর্থাৎ দোষটা শ্রমিকদের। যাঁরা ভালভ কন্ট্রোলের কাজে রয়েছেন।

সকাল সাড়ে দশটায় পুলিশ কমিশনার গ্যাসটি বিষাক্ত নয় বলে জানালেন! অন্ধ্র পুলিশ মানুষকে দুধ কলা গুড় খেতে পরামর্শ দিল।

পাঠক, ওপরে ভোপালের যে সরকারি মৃত্যুর খতিয়ানটা দিলাম একবার দেখে আসুন। সেই মালিক পক্ষ, সেই সরকার, সেই একইভাবে বিপর্যয়কে লঘু করে দেখানোর ঘৃণ্য অপচেষ্টা— সব দেখবেন চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। এবং দায়টা শ্রমিকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টাটাও মিলে যাচ্ছে বড্ড।

ভোপালের মতো এখানেও কোনও আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি।

ভোপালকে মনে না করে উপায় নেই বাস্তবিকই…

 

শ্রমিক, আইনকানুন, পরিবেশ এবং রাষ্ট্র-কর্পোরেটের নির্লজ্জ কোলাকুলি

শ্রমিকদের কথা উঠলই যখন একবার এলজি পলিমারস-এর শ্রমিক চিত্রটা দেখা যাক। কারখানার শ্রমিক ইউনিয়নের এক প্রাক্তন সদস্য সিটু-র গঙ্গা রাও জানাচ্ছেন, কারখানাটিতে স্থায়ী শ্রমিক মাত্র ৫০ জন। আর চুক্তি এবং ঠিকা শ্রমিকের সংখ্যা ৩৫০। যখন এই দুর্ঘটনাটি ঘটে তখন সেখানে মাত্র ১৫ জন শ্রমিক ছিলেন যাঁরা প্রত্যেকেই ক্যাজুয়াল, এবং যাঁদের একটি কেমিক্যাল প্ল্যান্ট রিস্টার্ট করার কোনওরকম পূর্ব অভিজ্ঞতাই ছিল না।

দোষ তো তাঁদেরই, নাকি?

গঙ্গা রাও আরও জানাচ্ছেন, দুদিন আগে মাত্র একটা ফোন কলের মধ্যে দিয়ে কারখানা খোলার অনুমতি নিয়ে নিয়েছিল এলজি পলিমারস। এরকম একটা রাসায়নিক কারখানা, লোকালয়ের মধ্যে, যেখানে এটা তৈরি হতে পারল কী করে সে নিয়েই প্রশ্নচিহ্ন জাগে, সেই কারখানাটা ৪০ দিন ধরে বন্ধ পড়েছিল কোনওরকম রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি ছাড়াই, সেটি পুনরায় খোলার অনুমতি দেওয়ার আগে রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ বা কোনও সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক একবার পরিদর্শনের প্রয়োজনও অনুভব করল না!

যেটা বলছিলাম, এরকম একটা লোকালয়ের মধ্যে এরকম একটা রাসায়নিক কারখানা হওয়ারই কথা ছিল না। সত্যিই তাই। ১৯৯৭ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত এই কারখানা পরিবেশগত ছাড়পত্র পায়নি। তাতে অবশ্য কোনও কিছুই আটকায়নি। যেমন আটকাল না ৪০ দিন বন্ধ থাকার পর কোনওরকম তদারকি ছাড়াই কারখানা খুলে ফেলতে।

এই যে এরকম একটা লোকালয়ের মধ্যে অবস্থিত কারখানায় স্টাইরিন জাতীয় বিষাক্ত রাসায়নিক সর্বোচ্চ কতটা পরিমাণে জমা রাখা যাবে, সে নিয়েও দেশে আইন রয়েছে। হ্যাজার্ডাস কেমিক্যাল অ্যাক্ট, ১৯৮৯। কিন্তু প্রয়োগ না হলে আইন থাকা আর না থাকার মধ্যে পার্থক্য কতটা?

আরও— কোন যুক্তিতে প্লাস্টিক একটা এসেনশিয়াল কমোডিটি হয়, যাকে এই দেশজোড়া লকডাউনের মধ্যেও খোলার ছাড়পত্র দেওয়া যায়?

আমাদের দেশের পরিবেশ এবং শ্রম আইনগুলি এমনিতেই যথেষ্ট কর্পোরেট-বান্ধব। এবং সেগুলিও প্রয়োগের নমুনা এইরকম।

পাঠকদের মনে করিয়ে দিই বেদান্ত-এর নাম, মনে করিয়ে দিই নির্বিচারে লুঠ হয়ে যাওয়া দেশের জল-জঙ্গল-পাহাড়ের কথা, মনে করিয়ে দিই নিয়মগিরি, বস্তার… এবং সর্বোপরি মনে করিয়ে দিই সেই ভোপাল।

সর্বত্র একই গল্প। পরিবেশকে শিকেয় তুলে, শ্রম আইন যথেচ্ছ দলে পিষে, রাষ্ট্রের নির্লজ্জ মদতে মুনাফাখোর কর্পোরেটদের লুঠতরাজ।

কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ২০১৪তে ক্ষমতায় এসে প্রথমেই পরিবেশগত ছাড়পত্রের নিয়মকানুন শিথিল করে দেয়। এই আজও, যখন করোনাতঙ্কে জবুথুবু দেশ আবার উৎপাদন শুরুর কথা ভাবছে, রাজ্য সরকারগুলি প্রথমেই চাঁদমারি করছে শ্রম আইনকে, শ্রমিকদেরকে, শ্রমিকদের বিভিন্ন অধিকারকে।

এই হল আমাদের রাষ্ট্র। বিশাখাপত্তনমে কতজন মারা গেল, তাতে তার আদপেই কিছু যায় আসে না। যেমন যায় আসেনি ভোপালে…

 

…সঙ্গে গণহত্যা, বারংবার, ধারাবাহিক

বিশাখাপত্তনমের ঘটনার দিনেই ছত্তিশগড়ের রায়গড়ে একটি পেপার মিলে বিষাক্ত গ্যাস লিক হওয়ার ফলে সাতজন শ্রমিককে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

একই দিনে তামিলনাড়ুর নেভেলিতে একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বয়লার বার্স্ট করে আট জন শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন। দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

এগুলিও, প্রকৃত প্রস্তাবে, গণহত্যাই। সন্দেহ থাকলে উপরের অংশটা আরেকবার পড়ে আসুন।

বস্তারে কোনও পাহাড় জঙ্গল কর্পোরেটদের ভেট দেওয়া হলে সেখানে কনস্ট্রাকশনের লোক আসার আগে প্যারামিলিটারির তাঁবু পড়ে। রাষ্ট্রের বন্দুকের ডগায় চলে স্থানীয় আদিবাসী জনগণের সম্মতি গ্রহণ এবং তাঁদের উচ্ছেদ।

নিয়মগিরির ডোঙরিয়া কোন্ধদের দাগিয়ে দেওয়া হয় মাওবাদী বলে। রাষ্ট্রের পাকা অ্যালিবাই তৈরি হয়ে যায়। মুচকি হেসে ঘর গোছায় সেই বেদান্ত রিসোর্স।

খাদান শ্রমিকদের সিলিকোসিস একটি সাধারণ রোগ। তাঁদের সংখ্যাটা? দেড় কোটি।

সাফাইকর্মীরা বাধ্য হন কোনওরকম সুরক্ষা ছাড়া কাজ করতে। পরিণতি? গড়ে প্রতি পাঁচ দিনে প্রাণ হারান একজন।

মেঘালয়ে ইঁদুরের গর্তের মতো কয়লাখনিতে আটকে পড়ে প্রাণ হারান ১৯ জন শ্রমিক।

তুতিকোরিনে সেই বেদান্ত-স্টারলাইটের তামা প্রক্রিয়াকরণ কারখানার বিরুদ্ধে দূষণবিরোধী আন্দোলনরত জনতার ওপর পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মেরে ফেলে ১১ জন মানুষকে।…

আজকের বিশাখাপত্তনমকে বিচার করতে হবে এই গণহত্যার ধারাবাহিকতাতেই। বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করার সমস্ত সুযোগ রাষ্ট্র বন্ধ করে দিয়েছে সুনিপুণ দক্ষতায়।

যেমন, একই গণহত্যার সূত্রেই গ্রথিত হবে ঔরঙ্গাবাদের রেললাইন এবং তাতে পড়ে থাকা শুকনো রুটিগুলি। যে রুটিগুলি সেই গত পরশু থেকে আমাদের এই লকডাউনের বাজারেও সাজানো খাবার থালাকে যাচ্ছেতাই রকমের ব্যঙ্গ করে চলেছে।

এবং, যেটা বলেই চলেছি, সর্বাগ্রে স্মরণ করতে হবে ভোপালকে…

 

শেষ কথা

এই আমাদের ভারতবর্ষ। কর্পোরেটদের মুনাফালালসার মৃগয়াক্ষেত্রে পরিণত হওয়া ভারতবর্ষ, তাদের প্রতি রাষ্ট্রের নির্লজ্জ তাঁবেদারির ভারতবর্ষ, গণহত্যার ভারতবর্ষ… এবং একই সঙ্গে গণপ্রতিরোধের ভারতবর্ষ।

এর মধ্যে কোন ভারতবর্ষটাকে নিজের দেশ বলব, সে তো আমাদের নিজেদেরই ঠিক করতে হবে। তাই না?

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...