লকডাউন নাকি আনলক নাকি…

বিষাণ বসু

 


লেখক চিকিৎসক, গদ্যকার, প্রাবন্ধিক

 

 

 

লকডাউন আর আনলক আর আবারও লকডাউন আর তারপর…

এইসব গোলচক্করে ঘুরে চলার মাঝে কিছু কথা বলা যায়। কথাগুলো আপনার জানা, কখনও বা কখনও নিশ্চিত শুনেছেন, মনে রেখেছেন কিনা বলা মুশকিল।

১. লকডাউন কোনও চিকিৎসাপদ্ধতি নয়। বরং বলতে পারেন, লকডাউন ছেলেবেলার সেই খেলার আচমকা স্ট্যাচু বলে ওঠা, যেখানে স্ট্যাচু বললেই থেমে যেতে হবে— থেমে যাওয়াই নিয়ম। কিন্তু, স্ট্যাচু বললেই কেউ স্ট্যাচুতে পরিণত হয়ে যেত না খেলায়, খানিকক্ষণ পরেই যথাপূর্বং তথাপরম, লকডাউনেও তা-ই।

২. লকডাউন যখন শুরু হয়, তখন দেশজুড়ে রোজ আক্রান্তের সংখ্যা ছিল একশোরও কম। লকডাউন যখন শেষ হয়, বা প্রথম দফার আনলক, তখন সংখ্যাটা তার একশোগুণ। লকডাউনের সাফল্য নিয়ে সিদ্ধান্ত আপনি নিজেই নিন।

৩. এত বড় দেশে নড়বড়ে সরকারি পরিকাঠামোয় এবং উপযুক্ত প্রস্তুতি ছাড়া লকডাউন সফল হওয়া সম্ভব ছিল না। মানুষের আইন ভাঙার অভ্যেস বা নিয়ম মেনে না চলার প্রবণতা নিয়ে শ্লেষাত্মক মন্তব্য করার মুহূর্তে খেয়াল রাখুন, আয়করের হিসেব দেওয়ার দিন এসে পড়ছে— সেখানে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আইন বা নিয়ম মানতেন, তাহলে দেশের এমন হাল হত না— এবং সেখানে নিয়ম ভাঙেন যাঁরা, তাঁদের কেউই বস্তিতে থাকেন না।

৪. অন্তত লকডাউনের ক্ষেত্রে, সম্পূর্ণ লকডাউন যদি লাগু করতেই হত, অর্থাৎ যেমন লকডাউনের কথা সরকার ভেবেছিলেন, সেটি সফল করতে হলে সরকারের তরফে যতখানি সক্রিয়তা প্রত্যাশিত ছিল, সরকার নিজেই তেমন করে পরিকল্পনা করেননি। অর্থাৎ সমস্যাটা লকডাউন কার্যকরী করার পদ্ধতির মধ্যে নয়, সমস্যাটা পরিকল্পনার মধ্যেই— সরকারবাহাদুর ধরেই নিয়েছিলেন, লকডাউন ঘোষণা হওয়া মাত্রই লোকজন ঘরে দুয়োর এঁটে বসে যাবেন— দেশের নেতাদের কাজ বলতে ওই মাঝেমধ্যে জাতির উদ্দেশে ভাষণ।

৫. শুধু পরিযায়ী শ্রমিক বা অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরতদের কথাই নয়, যেকোনও মানুষের পক্ষেই খেয়েপরে বেঁচে থাকতে হলে দোকানেবাজারে যেতে হয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হয়, ওষুধপত্তরও লাগে। এর মধ্যে কোনওটিই দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা না করে স্রেফ বাড়ি থেকে খবরদার বেরিও না বললে খুব একটা কাজের কাজ হওয়ার কথা নয়— হয়ওনি।

৬. এর পরেও লকডাউনে আদৌ কোনও কাজ হয়নি, এমন নয়। স্ট্যাচু বলে হাঁক দেওয়ার পরে সবাই থেমে না গেলেও অনেকেই স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, খেলার নিয়ম মেনেই। সংক্রমণের হার যতখানি বাড়তে পারত, ততখানি বাড়তে পারেনি। কিন্তু, লকডাউনের সময়টা যেভাবে কাজে লাগানো যেতে পারত, ততখানি কাজে লাগানো যায়নি। অর্থাৎ পরিকাঠামো গুছিয়ে নেওয়ার কাজটা সেভাবে এগোয়নি।

৭. আগেই বলেছি, স্ট্যাচু বলে হাঁক দিয়ে খেলায় সবাইকে থামিয়ে দেওয়া গেলেও সে কোনও পাকাপাকি থামিয়ে দেওয়া নয়— খানিকক্ষণ বাদেই সবকিছু আগের মতন। অতএব, লকডাউন যদি চূড়ান্ত সফলও হত, তাহলেও এই জুন মাসের শুরুতে সংক্রামিতের সংখ্যা দাঁড়াতে পারত মার্চের শেষের সংখ্যার কাছাকাছি। যাঁরা ভাবছিলেন, বা যাঁদেরকে ভাবানো গিয়েছিল, যে, লকডাউন করেই করোনাকে ভ্যানিশ করে দেওয়া যাবে, বা যাঁরা এখনও ভেবে চলেছেন, যে, সবাই লকডাউন মেনে চললেই এতদিনে দেশ করোনামুক্ত হয়ে যেত— তাঁরা, প্লিজ, বদ্ধমূল ভ্রান্তিগুলো থেকে বেরিয়ে আসুন।

৮. বছরের গোড়ায় দেশের অর্থনীতি এমনিতেই খুব হইহই করে দৌড়াচ্ছিল, এমন নয়। সেই খোঁড়ার পা লকডাউনের খানায় পড়ে অবস্থা শোচনীয়। অতএব, আনলক ব্যাপারটাকে প্রায় এমার্জেন্সি প্রয়োজনীয়তা হিসেবে ভাবতে পারেন। পাশাপাশি, সরকারের আয়ও তলানিতে গিয়ে ঠেকলে সবখাতেই ব্যয় করার সুযোগ কমে যায়।

৯. লকডাউন যেমন পরিকল্পনা-রহিত ছিল, আনলকও তেমন। যেমন ধরুন, আপিসকাছাড়ি খুললেও, তাতে লোক আসবেন কী করে, সে নিয়ে ভাবনাচিন্তা হয়নি। যথেষ্ট গণপরিবহনের ব্যবস্থা ছাড়াই মানুষকে কর্মক্ষেত্রে যেতে বলা হলে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা মুশকিল।

১০. পাশাপাশি, করোনার দিকে নজর দিতে গিয়ে বাকি অসুখে ভোগা মানুষগুলোর চিকিৎসার কী হবে, সে কথাও আদৌ ভাবা হয়নি। ক্রনিক অসুখে ভোগা বিপুলসংখ্যক মানুষ পড়েছেন ঘোর বিপদে। তাঁদের আপাতনিয়ন্ত্রণে থাকা অসুখ এখন লাগামছাড়া অবস্থায় পৌঁছেছে। টিকা বন্ধ থাকায় অসংখ্য শিশু আগামীদিনে সংক্রামক ব্যাধিতে ভোগার ঝুঁকিতে। করোনা শেষমেশ কী অবস্থায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটা অনুমানযোগ্য হলেও বাকি অসুখগুলো যে পরবর্তী সময়ে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর খুব বড় চাপ হয়ে দাঁড়াবে, সেটা সুনিশ্চিত।

১১. আবারও মনে করিয়ে দিই, লকডাউন যখন শুরু হয়, তখন নতুন করে সংক্রামিতের সংখ্যা রোজ যত ছিল, এই মুহূর্তে সংখ্যাটা তার একশো গুণেরও বেশি। প্রতিটি সংক্রামিত মানুষ যদি নির্দিষ্ট সংখ্যার মানুষকে সংক্রামিত করার ক্ষমতা রাখেন, তাহলে সংক্রমণ ছড়াবে দ্রুত— খুব দ্রুত। এবং, তেমনটাই দেখা যাচ্ছে। এতে চমৎকৃত হওয়ার কিছু নেই, শিহরিত হওয়ারও কারণ নেই।

১২. নতুন করে লকডাউন চালু করলে এই সংক্রমণের হার আপাতত স্থিতিশীল করা সম্ভব। কিন্তু, লকডাউন উঠে গেলেই ব্যাপারটা যে কে সে-ই। সঙ্গে মনে রাখা জরুরি, একই প্রচারে মার্চ বা এপ্রিল মাসে মানুষ লকডাউন যতখানি মেনে চলেছিলেন (সেটা প্রয়োজনের তুলনায় কম ছিল নিশ্চিত), এই মুহূর্তে ততখানি মেনে চলার সম্ভাবনা কম।

১৩. তাহলে, ব্যাপারটা ঠিক কী দাঁড়াল?

ক) করোনা কতদিন থাকবে, সে নিয়ে আমরা কেউই জানি না। মার্চ মাস থেকে শুনে আসছি, সামনের মাস বা তার পরের মাসের শেষে সংক্রমণ শীর্ষে পৌঁছাবে। ভদ্রলোকের এক কথার মতো এখনও তেমনই জানা যাচ্ছে। কাজেই, ওসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই।

খ) কোভিডের এখনও কোনও নিশ্চিত নিরাময় নেই। প্রতিদিনই নতুন ওষুধের নাম জানা যাচ্ছে, কিন্তু যে অসুখের ওষুধ এত ঘন ঘন “আবিষ্কৃত” হয়, সে অসুখের আদতে ওষুধ পাওয়া যায়নি বলে বোঝাই ভালো।

গ) প্রতিষেধক কবে আসবে, টিকা কখন বাজারে আসবে, এলেও আপনি পাবেন কিনা— সবই অনুমাননির্ভর। আর যে টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ শুরু হওয়ার আগেই টিকা বাজারে আসার দিনক্ষণ ঘোষণা হয়ে যায়, সে টিকা বিষয়ে শিরদাঁড়া বেয়ে হিমেল স্রোত নেমে যাওয়া ভিন্ন দ্বিতীয় অনুভূতি জাগিয়ে তোলা মুশকিল।

ঘ) আমাদের হাতে থাকল কী? কেন?? শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলা। হাত ধোয়া। যখন সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার সুযোগ নেই, তখন স্যানিটাইজার ব্যবহার করা। কুড়ি-পঁচিশ টাকায় ছোট্ট শিশি চারপাশেই পাওয়া যাচ্ছে— পকেটে রাখুন। কেনার আগে শুধু সত্তর শতাংশ অ্যালকোহল আছে কিনা দেখে নেবেন। মাস্ক ব্যবহার করুন। নাক এবং মুখ ঢাকা মাস্ক ব্যবহার করুন। এন-৯৫ না হলে সার্জিকাল মাস্ক। কাপড়ের শৌখিন মাস্ক কতখানি কাজের, এখনও জানা নেই।

ঙ) কেউ সংক্রামিত হলে প্যানিক করবেন না। কেননা, তিনি সংক্রামিত সেটা আপনি জানেন। এতদিনে জেনে গিয়েছেন, তাঁর থেকে আপনার সংক্রমণের ঝুঁকি কীভাবে কমাতে হবে। বরং, তাঁকে সাহায্য করুন, তাঁর পরিবারের পাশে থাকুন— যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের খোঁজে তাঁদের বাড়ি থেকে বেরোতে না হয়। আপনার আসল ঝুঁকি তাঁদের থেকেই, যাঁরা সংক্রামিত কিনা আপনার জানা নেই, জানার সুযোগ নেই। হ্যাঁ, এই অসুখে সংক্রামিত আশি শতাংশ মানুষেরই উপসর্গ থাকে না। অতএব, প্রতিটি মানুষের থেকেই সাবধানতা অবলম্বন করে চলা উচিত। প্রত্যেকেই সংক্রামিত হতে পারেন, এবং আপনাকে সংক্রামিত করতে পারেন।

গুরুতর অসুস্থ হলে হাসপাতাল তো আছেই। বেসরকারি হাসপাতালে বেড পাওয়া মুশকিল হলেও সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এখনও বেডের অভাব নেই।

সংক্রমণের ঝুঁকি থাকবেই। সংক্রামিত হলে যাঁদের দ্বারস্থ হতে হবে, সেই চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের অচ্ছুৎ করে দেবেন না। বিপদের মুহূর্তে তাঁরাই একমাত্র সহায়।

এর পরে লকডাউন নাকি আনলক নাকি আবারও লকডাউন নাকি ইত্যাদি ইত্যাদি সেসব তাত্ত্বিক আলোচনার জন্যে সান্ধ্য টিভি বা সোশ্যাল মিডিয়া তো রইল। সময় কাটান সেখানে। শুধু আগের কথাগুলো ভুলে না গেলেই হল।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3607 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

আপনার মতামত...