অমলাশঙ্কর বেঁচে থাকবেন তাঁর অগণিত উত্তরসূরির সৃষ্টিতেই

ললিতা ঘোষ

 


লেখক নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যে ডক্টরেট

 

 

 

 

একটি প্রতিভাময় নৃত্যযুগের অবসান ঘটিয়ে কলকাতায় ঘুমের মধ্যেই প্রয়াত হলেন ভারতীয় নবনৃত্যধারার অসামান্য এক ধারক, অমলাশঙ্কর। বর্ণময়, কিংবদন্তী, স্বামী ব্যতিক্রমী নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করের সঙ্গে তাঁর নাম একই সঙ্গে উচ্চারিত হলেও মাথায় রাখা দরকার, উভয়েই যে নবনৃত্যের ঘরানা তৈরি করে গিয়েছিলেন ব্রাহ্মণ্যবাদী ঔপনিবেশিক ভদ্রলোকি ক্ল্যাসিক্যাল বা ধ্রুপদী নৃত্যধারার প্রতিস্পর্ধী ঘরানা হিসেবে, সেটি আজ ভারতীয় নৃত্যধারায় এক অসামান্য নবতম সংযোজন হিসেবে পরিগণিত এবং সেই নির্মাণে অমলাশঙ্করের অবদান খুব কম নয়। নবনৃত্যধারায় পুরুষের দেহছন্দের সঙ্গে মিলিয়ে নানান দেশীয় হস্ত, পদ মুদ্রা, গ্রীবাভঙ্গি আলাদা করে সংশ্লেষ করিয়ে অসামান্যা প্রকৃতির সরোষ নির্ঘোষ তৈরি করেছিলেন অমলাশঙ্কর। বিশ্বজুড়ে নানান নৃত্যধারার সংমিশ্রণে যে নব্যধারাটি শঙ্কর দম্পতি বিকাশ ঘটালেন এবং ভিত্তি দিলেন, সেই ভিত্তি অনুসরণ করে তার উত্তরসূরি হিসেবে, তার সময়েই উঠে এলেন নৃত্যশিল্পী মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার, মঞ্জুশ্রীর হাত ধরে রঞ্জাবতী সরকারের মত আরও এক ঝাঁক নৃত্যশিল্পী। তৈরি হল ড্যান্সার্স গিল্ডের মত একটি অসামান্য দল।

আমি নিজে সত্রীয়া শিল্পী। অসমের শঙ্করদেব সঙ্ঘকে অসম ভবনের সহাতায় ২০০৭-এ কলকাতায় অনুষ্ঠান করাতে নিয়ে আসি। শঙ্করদেব সঙ্ঘের কর্মকর্তাদের দাবি ছিল অমলাশঙ্করের হাত দিয়ে অনুষ্ঠান উদ্বোধনের। আমরা তাঁকে রাজি করাতে গিয়েছিলাম গড়িয়াহাটের বাড়িতে। অবাক হয়েছিলাম তিনি আমায় নামে জানেন। তিনি অনুষ্ঠান উদ্বোধনে বিশদে বললেন, আনন্দশঙ্করকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা কীভাবে একদা অসমিয়া নৃত্য খুব মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করেছিলেন। সেই স্মৃতিচারণার আজ আর কোনও নথিকরণ নেই।

আজকের অমলাশঙ্কর সেদিনের অমলা নন্দীর জন্ম হয়েছিল যশোরে ২৭ জুন ১৯১৯এ। বিশ্ব তখন উথালপাথাল। বাবা অক্ষয় কুমার নন্দীর সঙ্গে এগারো বছর বয়সে যান প্যারিসে ইন্টারন্যাশনাল কলোনিয়াল এক্সিবিশনে। সেখানেই উদয়শঙ্করের সঙ্গে আলাপ। উদয়শঙ্করের সঙ্গে ছিলেন অন্য দুই ভাই আর মা হেমাঙ্গিনীদেবী। অমলাকে দেখেই পছন্দ হয় হেমাঙ্গিনীদেবীর। শোনা যায় তিনি ছোট্ট অমলাকে নিজে শাড়ি পরিয়ে দিতেন। সেসময় রবিশঙ্করের সঙ্গেই খেলতেন অমলা। রবিশঙ্কর দাদা উদয়শঙ্করের দলের সঙ্গে নাচতেনও। অমলারও ইচ্ছে দলে ঢোকার।

উদয়শঙ্কর ভারতে ফিরে এসে আলমোড়ায় উদয়শঙ্কর কালচারাল সেন্টার ফর ড্যান্স তৈরি করলেন। নন্দী পরিবারের বন্ধু ছিলেন সুভাষ চন্দ্র বসু। তিনিই অমলাকে উদয়শঙ্করের কাছে নাচ শেখাবার পরামর্শ দেন। সেখান থেকেই অমলা উদয়শঙ্করের সঙ্গ করেছেন। দলের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশবিদেশ। শিখেছেন সেই সব দেশের নৃত্য ঘরানা, মিলিয়ে মিশিয়ে তৈরি করেছেন নবনৃত্যধারা। প্রথম শো আমস্টার্ডামের অপেরা হাউসে কালীয়দমন অনুষ্ঠান ১৯৩১এ। নিজে কালীয় হয়েছিলেন। ১৯৩৯এ উদয়শঙ্করের দলের সঙ্গে গিয়েছিলেন চেন্নাইতে এক অনুষ্ঠানে, সেখানেই উদয়শঙ্কর তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। তখন তার উনিশ বছর বয়স। ১৯৪২এ বিবাহ। তারপরেই আলমোড়ার কেন্দ্র অর্থাভাবে বন্ধ করে দিতে হয়। ১৯৪৮এ উদয়শঙ্করের অসামান্য কল্পনা। সেই চলচ্চিত্রে অমলার চোখকাড়া উপস্থিতি। শুটিং হয়েছিল চেন্নাইয়ের জেমিনি স্টুডিওয়। অমলা এক স্মৃতিচারণায় বলেছেন বারো বছর বয়সে কান চলচ্চিত্র উৎসবে গিয়েছিলেন বাবার সঙ্গে। আবার ২০১২য় এই চলচ্চিত্রটি কানে নতুন করে প্রদর্শিত হয়। তিনিও সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁকে রেড কার্পট সম্মান জানানো হয়। আমরা ভুলে যেতে পারি না ‘যমুনাকে তীরে‘র মত অসামান্য কম্পোজিশন যেখানে সাধারণ সুতির শাড়ি পরে সূক্ষ্ম অথচ তীক্ষ্ণ বিভঙ্গে যে সুরেলা ও গভীর অনুভূতির আবহ তৈরি করেছিলেন অমলাশঙ্কর তা পরিমিত শিল্পবোধের আদর্শ নিদর্শন হয়ে থাকবে।

উদয়শঙ্কর এবং তার দলবল ভারতীয় নৃত্য জগতে পৌরাণিকতার সঙ্গে সাম্প্রতিকতাকে নিয়ে এলেন বুকের পাটা দেখিয়ে এবং সেই সাম্প্রতিকতার ভিত্তি করতে তিনি তৈরি করলেন এক নতুন নৃত্যঘরানা যাকে সমালোচক, তাত্ত্বিকেরা নাম দিলেন নবনৃত্য। তিনি চলতি ধ্রুপদী নামক নৃত্যকে ব্রাত্য করলেন না, কিন্তু তাকে উপাসনাও করলেন না, তার সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন অন্যান্য অধ্রুপদীয় ঘরানাও।

ভারতীয় নৃত্যধারায় অমলাশঙ্করের এটাই গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তিনি যে নৃত্যধারাটি তৈরি ও ধারণ করে রেখেছিলেন, সেই নৃত্যশিখাটিকে নিভে যেতে দেননি, তাকে শেষ দিন অবধি জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। ৯২ বছর বয়সেও তিনি মঞ্চে সক্রিয় ছিলেন। শঙ্করদের তৈরি ঘরানা নিয়ে আজও এগিয়ে চলেছেন মমতাশঙ্কর, বৌমা তনুশ্রীশঙ্কর। সঙ্গীতে আনন্দশঙ্কর আজ প্রয়াত, কিন্তু তার অবদান অসামান্য। পরের প্রজন্ম হিসেবে রঞ্জাবতীর মত পথভাঙা নৃত্যশিল্পী তৈরি হওয়াই ভারতীয় নৃত্যজগতে অমলাশঙ্করের প্রত্যক্ষ অবদান। রঞ্জাবতী ফলিত এই নৃত্যবিদ্যার সঙ্গে উপনিবেশবিরোধী নৃত্যতত্ত্বের এক অসামান্য সংশ্লেষ ঘটালেন। বাংলা তথা ভারতীয় নৃত্যজগতের কপাল মন্দ যে খুব যুবা বয়সেই অসামান্য অমলার উত্তরসূরি হিসেবে উঠে এসেও রঞ্জাবতীর মত প্রতিশ্রুতিমান তাত্ত্বিক আত্মহত্যা করলেন। রঞ্জাবতীর নৃত্যতত্ত্ব বিকাশে অমলাশঙ্করের পরোক্ষ উদ্ভাসকে কোনওভাবেই খাটো করা যাবে না। অমলা বেঁচে থাকবেন তাঁর অগণিত উত্তরসূরির সৃষ্টিতেই। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3088 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...