কবিতায় যুগলবন্দি

কবিতায় যুগলবন্দি : পিয়াল দাস ও তাপস দাস

পিয়াল দাস তাপস দাস  

 

ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিল নকশা, টানাপোড়েন, কিংবা বিভিন্ন বাঁক কবিতায় বর্ণনা করার সময় লিপিকারের যে অন্তর্নিহিত চিন্তা কাজ করে, সেই বোধ ও চেতনার উদ্ভব কি একটি লিঙ্গনির্ভর প্রক্রিয়া? জটিল মানবিক সম্পর্কের গভীর রহস্য উন্মোচনে পুরুষ ও প্রকৃতির অনুভূতি কি প্রকৃতই আলাদা? এবং তার প্রকাশ হিসেবে, কাব্যভাষাতেও কি তৈরি হয় পার্থক্য, যখন অনুরূপ বিষয়ে কলম ধরেন বিপরীত লিঙ্গের দুই কবি?

উত্তর দেওয়া সহজ নয়। এর কোনও নৈর্ব্যক্তিক উত্তর সম্ভবত হয়ও না, কারণ কবিতা মানেই আত্মনিষ্ঠ চিন্তার প্রকাশ, ফলে কাব্যভাষা সাব্জেক্টিভ হওয়া অবশ্যম্ভাবী। অন্যদিকে, জেন্ডার স্টাডিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, কাব্যভাষায় লিঙ্গবিভাজনের ছাপ পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এই তত্ত্বগত তকরারে না জড়িয়ে, আমরা দেখতে চেয়েছিলাম একই বিষয় নিয়ে লিখলে, প্রকাশভঙ্গি, কাব্যভাষা, এবং বক্তব্য কীভাবে বিন্যস্ত হয় দুজনের কবিতায়। সেই কৌতূহল থেকেই এই প্রচেষ্টা।

আমরা তিনটি ভিন্ন বিষয় বেছে নিয়েছি। লেখা হয়েছে প্রতিটি বিষয়ের ওপরে দুটি দুটি করে যুগল-কবিতা, মোট ছটি। তাদের মধ্যে একটি জোড়া-কবিতা শুরুই হয়েছে অভিন্ন পংক্তি দিয়ে, তারপর যার যার লেখনী এগিয়েছে নিজস্ব রাস্তায়।

এই পরীক্ষানিরীক্ষার ফলাফল কী? তা একমাত্র পাঠকরাই বলতে পারবেন।

 

দ্য রেইনমেকার

তাপস দাস

কী ডোবা ডুবেছ বালিকা!
হরিদ্রাভ বেদিমূলে শস্পরাজি কাজল কালো
মনোরম মেলে ধরো— সেখানে বৃষ্টিতে
নিজে ডোবো, প্রৌঢ়কেও ডোবাও
সিক্ত আলপথ প্রৌঢ়ের গতায়াতে
অপূর্ব রং ধরে প্রগাঢ় গোলাপি
বীজপত্র খুলে যায়, পারিজাতও
লজ্জা পায় তীব্র দেহবাসে
বালিকার নাসারন্ধ্র ঝড়ের রাতে
বেসক্যাম্পের তাঁবুর মতো ফুলে ওঠে
এই এক আশ্চর্য খেলার রীতি
নিষ্ঠুর, সশব্দ ও কোমল— দীঘির উষ্ণ আঁধারে
যৌথভাবে জ্বলে ওঠে শ্বেতপদ্মের আখর,
কী ডোবা ডুবেছ বালিকা
নিজে ডোবো, প্রৌঢ়কেও ডোবাও!

 

বর্ষামঙ্গল

পিয়াল দাস

কী ডোবা ডুবেছ বালিকা,
অঙ্কুরিত ঋতুর প্লাবনে।
অন্যমনস্ক হেঁটে যাওয়া, গতবাঁধা হাসি—
অস্থিরতা মাছের কাঁটার মতো
নিরন্তর ফুটে থাকে সূক্ষ্ম ও ধারালো—
গার্হস্থ্য দিবানিদ্রার ভেতর তৃষ্ণার্ত এই জেগে থাকা
কখন গোধূলি আসে—
অমলিন শিশুর মতো টেলিফোন হেসে ওঠে অভীষ্ট পুরুষের স্বরে
বালিকার স্তম্ভন জাগে, সহস্র ব্যাকুল পদ্ম দীঘির অতলে—
এ ভারী রহস্য বটে!
আত্মহারা হাতের আঙ্গুল
আবিষ্ট ঝঙ্কারে ছুঁয়ে চলে পুষ্পপত্র। গর্ভাধান—
বারংবার উরু বেয়ে ত্রস্ত উপাখ্যান, দীর্ঘকায় দক্ষ বীণকার
দূরভাষে বালিকার তন্ত্রী ছুঁয়ে ঝালায় ঝালায়
মীড়, জমজমা, গমকে— বালিকা উন্মত্তপ্রায়!
কী ডোবা ডুবেছ বালিকা
বৃষস্কন্ধ প্রৌঢ় পুরুষে,
বৃন্দাবনী সারং বেজে যায়।

 

উত্তরভাদ্রপদ

পিয়াল দাস

যে মেয়েটা চোখের কোণায় কাজলদীঘি ছাপ
যে লোকটা বুকের মধ্যে গনগনে উত্তাপ
মুখে তাদের বাড়া ভাতের ছাই।
লোকটা নিজের মত চলে,
মেয়েটাকে মন্দ কথা বলে,
তবু—
খড়কুটো সব কুড়িয়ে আনে,
মেয়েটাও তো সবই জানে,
দূরে গিয়েও ফিরে আসে
উপায়ান্তর নাই।

 

শেষরাতে

তাপস দাস

ফিরে আসতে ভালো লাগে।

প্রতিটি বাতিল ট্রেনের বাঁশির শব্দের সাথে
আমার আত্মা পূর্বদিকে ছুটে যায়
ওদিকে শহর আছে।
বৃক্ষবালিকা বসে আছে ভদ্রাসন আলো করে
তুলসীমঞ্চ যেমন।
যদিও ফাটার দাগ কাপ ভেঙে গেলে
সম্যক নজরে আসে সূক্ষ্ম হোক যত
হাওয়া থেমে আসে, যত ফোস্কা পায়ের তলার
বিদ্রোহ করে বলে— ‘গিয়ে কাজ নেই’
তথাপি শেষ রাতে দূরভাষ গুঞ্জন করে ওঠে
অস্ফুটে বালিকা বলে— ‘থাকো!’
তখন—

ফিরে আসতে ভালো লাগে।

 

করোনার দিনগুলিতে প্রেম – ১

পিয়াল দাস 

কোন সুদূর থেকে অবিরল স্বপ্নে— আলিঙ্গনে
ডালপালা, সর্ব অঙ্গ থেকে
সবুজ পাতারা অপরূপ স্পর্শে জোৎস্না-মেখে
মায়াময় ডাক দেয় আঁধার ঘনালে, আনমনে—
একদিন ছোঁবে ঠিকই সমর্থ আঙুল— এই ভেবে
শিহরণ। আত্মহারা রাখালীর পারা
খুঁজে ফেরে গাছের শিকড়— বৃক্ষ ছাড়া
অস্তিত্ব নেই, বুকের গভীরে শপথ, তাতে ডুবে—

“ওইখানে মাথা রেখো!”

অগস্ত্যযাত্রায় যাও হে অতিমারি
এই পোড়া সময় পেরিয়ে
অবশেষে যেন, প্রাচীন বটের বুকে
নির্বিঘ্নে ঘুম যেতে পারি।

 

করোনার দিনগুলিতে প্রেম – ২

তাপস দাস 

গাছের নামেতে নাম বালিকার, তার পাতা নড়ে ওঠে
রাত্রে যখন, তারই হাওয়ায় ভিন রাজ্যে বিবর্ণ ঠোঁটে
রক্তাভা ফুটে কেঁপে ওঠে অন্ধ বালক— প্রৌঢ় শরীরে
আজও বালকের মন এ কী তীব্র জটিলতা প্রভু, ভঙ্গুর খোলস ছেড়ে
শামুকের ধীরগামী শাঁস বেরোবে কি আরও একবার?
ক্ষতচিহ্ন আবারও নতুন, কিংবা ক্ষতে বালিকার
হাতের প্রলেপ— বিহ্বলতার এই হাহাকার
দূরভাষ বেয়ে অনন্ত ইথার-পথে অনুজ্জ্বল নক্ষত্রবীথি
বরাবর দাগ কেটে রেখে গেলে, বালিকার সলজ্জ সিঁথি
বিদ্রোহ করে ওঠে, অথবা ঘর ভাঙার আত্মধিক্কার সমস্ত পরিমিতি
আমূল ওলটপালটে ভূমিকম্প আছড়ে পড়ে ফোনের ওপাশে
চাপা কান্নার স্রোতে অজান্তে মিশে গেছে গোপনাঙ্গের আশেপাশে
আত্মরতির দাগ বালককে ভেবে। মাঝে দীর্ঘ রেলপথ
খাঁ খাঁ শুয়ে আছে নিঃসাড়— গাড়ি নেই যাত্রা নেই কেউ নেই, শপথ
নিয়েও তাই কেউ কারও কাছে যেতে পারেনিকো, বেঁচে থেকো বেঁচে থেকো
হে ঈশ্বর ক্রান্তিকাল পেরিয়ে চোখের দেখাটি যেন একবার অন্তত— এইটুকু দয়া রেখো
ওগো নাথ!
অতিমারি শেষে শুধু একবার যেন দুই হাতে আর দুই হাত
চেপে ধরে বালক-বালিকা একসাথে ভেসে
যেতে পারে— সমস্ত জীবনের পাপপুণ্যের বিনিময়ে দিনশেষে
এই-ই প্রার্থনা প্রৌঢ়ের শুধু— বালিকার আয়ু চেয়ে, তারপর মিশে
গেলে ক্ষতি নেই অনন্তের দেশে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3909 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...