বা(ই)ক্‌স্বাধীনতা বনাম বিচারব্যবস্থা: একটি কলোনিয়াল ডিসকোর্স

প্রশান্ত ভট্টাচার্য

 

 


লেখক প্রাবন্ধিক, কবি, সাংবাদিক

 

 

বাক্‌স্বাধীনতা এবং অধিকারকে অর্থবহ করতে হলে সাধারণ নাগরিকদের মনের কথা পড়ার ক্ষমতা বিচারপতিদের থাকতে হয়। অন্যথায় বিচার ও রায় শাসকদের তুষ্ট করে।

সলিল চৌধুরীর একটা গান ছিল, ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা/ আজ জেগেছে সেই জনতা, সেই জনতা।’ সংশয় হচ্ছে,  আজকের ভারতরাষ্ট্রের বিচারপতিরা সেই গানের দুটি লাইন শুনেই গায়ক, গীতিকার— সবাইকে আদালত অবমাননার দায়ে ফাটকে না পুরে দিতেন। আসলে সাংবিধানিক নৈতিকতাকে পরোটার মতো উল্টেপাল্টে দেখলে দেখা যাবে, সে তার সেরা বন্ধু এবং পরামর্শদাতার কথা শোনে না। জানি না, আর কেউ কি তা শুনছে? আমি জানি না, আমাদের দেশের মহান বিচারপতিরা কবে রাজা লিয়ারের মতো আর্তনাদ করবেন, ‘I am a man/ More sinned against the sinning.’

এই এলোমেলো কথাগুলো মাথায় আসছে, কেন না, অভিজ্ঞ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ আমাদের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, এবং আসছে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) তাঁর সাজার পরিমাণ জানা যাবে। যে শাস্তিই হোক, আমাদের কাছে জানার, কোন দুয়ারে খটখট করে বিচারালয়ের ঘুম ভাঙালেন প্রশান্ত ভূষণ!

কোথায় যেন গোটা ব্যাপারটাই হাস্যকর হয়ে উঠেছে। কেমন যেন মনে হচ্ছে, উমবের্তো একো বা জাক দেরিদা থাকলে, ‘বাইকসংস্কৃতি ও বিচারব্যবস্থা: একটি কলোনিয়াল ডিসকোর্স’ শীর্ষক একটি মনোজ্ঞ ও মেধাবী আলোচনা আমরা পেলেও পেতে পারতাম। প্রশান্ত ভূষণ ট্যুইট করে যতটা নাড়া দিয়েছিলেন, লোকপ্রচার করেছিলেন, তার চেয়ে ঢের বেশি মাইলেজ দিয়ে দিল আদালত। মানুষ জেনে গেল, কে যেন লকডাউনের মেঘলা দিনে, একটা অর্ধকোটি টাকা মূল্যের মোটরবাইকে বসে পোজ দিচ্ছিলেন। প্রশান্ত ভূষণকে শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে, আমাদের শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ ভবিষ্যতের সমাজবিজ্ঞানের গবেষক, ইতিহাসবিদদের হাতে একটি রসদ তুলে দিলেন। আরও ভাল, আরও মুক্ত পরিসরের গণতন্ত্রে ভাবী ঐতিহাসিকরা সম্ভবত আমাদের সময়কে এমন মূল্যায়নের জন্য সমর্থনমূলক প্রমাণ হিসাবে পেয়ে যাবেন প্রশান্ত ভূষণের ট্যুইট এবং তার দৌলতে প্রাপ্ত শাস্তির মতো একটি আকর। ভবিষ্যতের মানুষ হয়তো বলবে, ২০২০ সালের করোনা অতিমারির সময়, যখন অভিবাসী শ্রমিকরা ন্যায়বর্জিত হয়ে পথে মারা যাচ্ছে, তখন নিরোর মতো বেহালা না বাজালেও বাইকে চড়ে শখ মেটাচ্ছিল কেউ কেউ। তাও আবার, মাস্ক ছাড়া…

আসল কথা অবশ্যই অন্যত্র। প্রশান্ত ভূষণ বিচারব্যবস্থার সেই মূলে আঘাত করেছেন, যেখানে একটি অমানবিক সরকারের লেজুড় হিসেবে কাজ করছে আমাদের ন্যায়ালয়। আজকের বিচারপতিরা যেভাবে ভাবছেন, ভবিষ্যতের পৃথিবীও ঠিক তেমনভাবেই ভাববে, তা মনে করাটা কী একটু আহাম্মকি হয়ে যাচ্ছে না!

যে বিচারালয় ও বিচারপতিরা আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে সোক্রাতেসের বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন, তাঁরা হয়তো সেদিন আথেন্সের শাসককুলের প্রসাদে পুষ্ট হয়েছিলেন, কিন্তু ভবিষ্যতের মানবসমাজ সোক্রাতেসকেই প্রণম্য বলে সাদরে গ্রহণ করেছে, আর ছুড়ে ফেলে দিয়েছে আথেন্সের সেই বিচারকমণ্ডলীকে। আমি জানি না, প্রশান্ত ভূষণকে সাজা দিয়ে আমাদের মহামহিম এই বেঞ্চ কাদের কাছে পুরস্কৃত ও কাদের কাছে নিন্দিত হয়ে উঠতে চাইলেন। তবে ভবিষ্যৎ বলবেই। আমরা তো দিনের পর দিন দেখতে পাচ্ছি, শাসকের মনঃতুষ্টিকর রায় দেওয়ার প্রতিদানে নানাভাবে পুরস্কৃত হচ্ছেন বিচারপতিরা। কেউ উচ্চকক্ষে, কেউ বা লাটসাহেবের বাড়িতে। আসলে প্রশান্ত ভূষণকে হাজতে ঢোকানোর মধ্য দিয়ে একটা সুপ্রিমেসির প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে। রকের লবজে ভাবটা এই, আমার সঙ্গে পাঙ্গা নিতে গেলে সবারই ভূষণ হাল হবে। কিংবা হয়তো প্রকারান্তরে কোনও হাড়হিম করা বার্তা… দেখে নাও, প্রশ্ন করলে তার ফল কী হতে পারে। এটাও একটা সন্ত্রাস, আইনি জোব্বার ভিতর থেকে সন্ত্রাস।

নর্থ ব্লক থেকে যে সন্ত্রাস সংসদের অনুমোদন নিয়ে ছড়ানো হয়।

কী ট্যুইট করেছেন প্রশান্ত ভূষণ? গত মাসে নিজের টুইটার অ্যাকাউন্ট-এ তিনি লেখেন, ‘ভবিষ্যতে ইতিহাসবিদরা যখন গত ৬ বছরের দিকে ফিরে তাকাবেন তখন দেখতে পাবেন যে, ঘোষিত জরুরি অবস্থা না হলেও কীভাবে দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে।’ এতে তেমন আপত্তি নেই, কিন্তু এরপরেই তাঁর টিপ্পনী, সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা ও ৪ জন বিচারপতির ভূমিকাও সেসময় বিশেষভাবে চিহ্নিত হবে। আর যায় কোথায়? এছাড়াও, আর একটি ট্যুইটে প্রশান্ত ভূষণ সরাসরি প্রধান বিচারপতি শরদ অরবিন্দ বোবড়েকে উল্লেখ করেন। তিনি প্রধান বিচারপতির একটি দামী বাইকে চড়ার ছবি নিয়ে লেখেন, ‘এমন একটা সঙ্কটের সময় প্রধান বিচারপতি মাস্ক ও হেলমেট না-পরে বাইকে চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অথচ এই লকডাউনে দেশের নাগরিকরা বিচার পাচ্ছেন না।’ প্রধান বিচারপতি বোবড়ে ব্যাখ্যা দেন, বাইকটির সুইচ বন্ধ ছিল। ছবিতেও দেখা যাচ্ছে, সেটি স্ট্যান্ডে দাঁড় করানো। তাই চালানোর প্রশ্নই নেই। সুতরাং হেলমেট পরার প্রশ্নও ওঠে না। যথা জবাব। নিজের পক্ষে সওয়ালে ভূষণ জানান, নিজের টুইটে যা বলেছেন, তা থেকে তিনি সরবেন না। প্রধান বিচারপতির যুক্তি মেনে বক্তব্যের ওই অংশটুকুই শুধু প্রত্যাহার করতে পারেন, যেখানে হেলমেট না-পরার কথা বলা রয়েছে।

রায় ঘোষণার পর ট্যুইট করে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রের প্রশ্ন, ‘আমাদের রক্ষা করা যাঁদের কাজ, কেন তাঁদের গায়ের চামড়া এত পাতলা হবে?’ সিপিএম সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি মনে করেন, ‘সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকার ন্যায্য সমালোচনাও এ বার অবমাননার গণ্ডিতে পড়বে।’

এদিকে ‘সেন্টার ফর পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন’এর তরফে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত দুর্ভাগ্যজনক। অনেকেই এখন মনে করেন, দেশের অন্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি বিরোধীদের অপরাধী তকমা দিচ্ছে। তাঁরা এও মনে করেন, সুপ্রিম কোর্টও এখন বিচার ব্যবস্থা নিয়ে কোনও গুরুতর প্রশ্নকে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। এই রায়ে সেই দৃষ্টিভঙ্গিই আরও জোরদার হবে।’ এই প্রসঙ্গে সংগঠনটি ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে সুপ্রিম কোর্টের ৪  বিচারপতির ‘বিদ্রোহের’ বিষয়টি টেনে আনে। ওই ৪ প্রবীণ বিচারপতি সাংবাদিক বৈঠক করে তখনকার প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের সঙ্গে নিজেদের মতবিরোধের কথা প্রকাশ্যেই জানিয়েছিলেন। ‘সেন্টার ফর পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন’-এর বক্তব্য, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতির কথা বলেছিলেন ওই ৪ বিচারপতি। তাঁরা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ওই নীতিগুলি মেনে চলা হচ্ছে না।’

শুধু প্রশান্ত ভূষণ নন, সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতিসহ আরও অনেকে লকডাউন চলাকালীন দরিদ্র, প্রান্তিক ও অভিবাসী শ্রমিকদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার সুরক্ষিত করতে আদালতের অক্ষমতার সমালোচনা করেছেন। অতএব, অন্যান্য পাবলিক প্ল্যাটফর্মে অন্যদের দ্বারা অনুরূপ মন্তব্য করার সময় প্রায় চোখ-কান বন্ধ করে আছে সর্বোচ্চ আদালত। সব ব্যাটাকে ছেড়ে দিয়ে বেড়ে ব্যাটাকে ধরার মতো প্রশান্ত ভূষণকেই দোষী সাব্যস্ত করার বেঞ্চের পদক্ষেপটি বিস্মিত করে তোলে।

এটা কি আসলে কর্তাদের খুশি করার আয়োজন, কেন না, ভূষণ দেশের শাসককুলের এক নির্মম সমালোচক। না কি সত্যিই বাক্‌স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ অন্ধকার! তিমিরবিনাশী হওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে আমরা ও আমাদের রক্ষা করার সংস্থাগুলো কী তবে তিমিরবিলাসী হয়ে উঠছে!

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...