কর্পোরেট লবি ও সরকারের আগ্রাসী নীতির প্রতিরোধ: ধারাবাহিক কৃষক আন্দোলন

শুভার্থ মুখার্জ্জী

 


লেখক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র, ছাত্র-আন্দোলনের কর্মী

 

 

 

গত কুড়ি তারিখ রবিবার রাজ্যসভায় পাস হয়ে গেল কৃষিসংক্রান্ত তিনটি বিল। অতি নিঁখুতভাবে বিরোধীশূন্য অবস্থায় আগেকার অর্ডিন্যান্সগুলিকে আইনে রূপান্তরিত করার জন্য বিল পাশ হল, তারপর রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হল। কৃষকদের বিভিন্ন সংগঠন, নানা রাজনৈতিক দলের হাজার অনুরোধ সত্ত্বেও দেশের চাষিদের সচ্ছল ভবিষ্যতের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে মহামান্য রাষ্ট্রপতি গত ২৭শে সেপ্টেম্বর আইনে সম্মতি জানালেন।

আইনগুলি কী আর নতুন করে বলতে হয় না। কীভাবে মান্ডিব্যবস্থা দুর্বল করে দিয়ে ফসলের দাম পাওয়ার নিশ্চয়তা খোঁড়া করে, চুক্তিচাষের মাধ্যমে কর্পোরেট লবির কাছে চাষির ভবিষ্যৎ বিকিয়ে দেওয়া হল, তা আর দেশবাসীর অজানা নয়। চাষিরাও জো হুজুর বলে মেনে নেবেন, তাও হয় না। দেশজুড়ে গতমাস থেকেই প্রতিবাদের হাওয়া বইছে। গত সপ্তাহেই সেসব নিয়ে এখানে লিখেছি বিস্তারিত। আজ আন্দোলনের কথা।

মোট তিরিশটি কৃষক সংগঠন নিয়ে তৈরি সারা ভারত কৃষক সংঘর্ষ সমন্বয় কমিটির নেতৃত্বেই আন্দোলন চলছে। গত পঁচিশ তারিখ ভারত বন্ধের ডাক দেওয়া হয়েছিল। আন্দোলনের মূলকেন্দ্র পাঞ্জাবে রাস্তা অবরোধ করে একদিন সমস্ত যোগাযোগ প্রায় অচল করে দেওয়া হয়। সংগ্রুর-পাতিয়ালা, চন্ডীগড়-ভাতিন্দা, আম্বালা-রাজপুর-লুধিয়ানা, মোগা-ফিরোজপুর রোড সারাদিন বন্ধ থাকে। হরিয়ানাতেও কর্নাল-মিরাট, রোহতক-ঝজহর, দিল্লি-হিসার রোডেও সক্রিয় পথ অবরোধ হয়। সরকারি বাস পরিষেবা, পেপসু রোড ট্রান্সপোর্ট স্থগিত করা হয়।

পাঞ্জাবের বাইরেও হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, কেরল, তেলেঙ্গানা, গুজরাট, গোয়া, ওড়িশা, তামিলনাড়ুতে প্রতিবাদ সংগঠিত হতে থাকে। কৃষক সংগঠনগুলির পাশাপাশি নানা ছাত্র-যুব সংগঠন রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখায়।

২৬শে সেপ্টেম্বর থেকে ‘রেল রোকো’-র ডাক দেওয়া হয়। লাগাতার তিনদিন চাষিরা রেললাইনের উপরে বসে থাকেন। অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা বাদে বাকি সমস্ত পরিবহন স্থগিত রাখা হয়েছিল। আন্দোলনের ছাপ পড়ে উত্তর প্রদেশে। ট্রাক্টর, বাইক ও পায়ে হাঁটা মানুষের এক বিশাল মিছিল দিল্লিতে ঢোকার মুখে নয়ডা গেটে আটকায় পুলিশ। ভারতীয় কিষান ইউনিয়নের নেতৃত্বে মিছিলটি সম্ভবত পার্লামেন্ট ভবন ঘেরাওয়ের উদ্দেশ্যে চলেছিল এই অগণতান্ত্রিক আইন বাতিলের দাবীতে।

দেশজুড়ে কৃষক আলোড়নের প্রেক্ষিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য হয় আন্দোলনের পাশে দাঁড়াতে। বিশেষত কংগ্রেস, যারা ইতিহাসে বারবার উদারীকরণ আর সবুজ বিপ্লবের নামে চাষির গলায় দড়ি পরানো সুনিশ্চিত করে এসেছে, আজ তারাও এই আইনের বিরোধী। ভগৎ সিংয়ের জন্মদিবসে তাঁর স্মৃতিজড়িত জন্মস্থানে কৃষিবিলের বিরুদ্ধে একটি অবস্থান-বিক্ষোভ হয়, যেখানেয়স্বয়ং পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। রাজ্য সরকার, এমনকি এনডিএর জোটসঙ্গী শিরোমণি অকালি দল ঠেলায় পড়ে বাধ্য হচ্ছে কৃষক আন্দোলনকে সমর্থন করতে। নিজেদের উদ্যোগে তিনটি পৃথক মিছিল হয়েছে শিখ ধর্মীয় তক্তগুলোর থেকে চণ্ডীগড় অব্দি। জোটসঙ্গী হয়েও আন্দোলনের চাপে দাবী তুলতে হচ্ছে আইন প্রত্যাহারের, এমনকি রাহুল গান্ধিও ঢোঁক গিলছেন। ভবিষ্যতে সরকারে এলে আইন প্রত্যাহারের কথাও বলেছেন, যদিও কংগ্রেসের ইতিহাস অন্য কিছুই বলে।

এর মধ্যেই জনাপনেরো যুবক ইন্ডিয়া গেটের সামনে ট্রাক্টর জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। পাঁচজনকে এই ঘটনায় গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছে পাঞ্জাবের বারনালে। চাষিদের পাশাপাশি ছাত্রযুবরাও স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভে সামিল হচ্ছেন। সেইভাবে নেমে আসছে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নও। আম্বালার অভিমুখে একটি মিছিলে জলকামান ব্যবহার করা হয়েছে পানিপথে। আন্দোলনকারীদের মনোবল ভেঙে দিতে ধরপাকড়-গ্রেপ্তার চলছেই।

অক্টোবরের এক তারিখ থেকে আন্দোলন আরও নতুন খাতে বইতে শুরু করে। কৃষক সংগঠনগুলি নিজেদের মূল শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করেছে আম্বানি ও আদানির মতো বৃহৎ শিল্পপতিগোষ্ঠীকে, যাদের স্বার্থে দাসানুদাস সরকার একের পর এক আইন পাল্টে চাষিদের জীবন বিপর্যস্ত করে তুলছে। তাই এদের দ্বারা পরিচালিত যাবতীয় কর্পোরেট হাউস, বেস্ট প্রাইস শপ, রিফাইনারি, শপিং মল বয়কটের ডাক দিয়েছে কৃষক সংগঠনগুলি। পাঞ্জাবে রিলায়েন্সের মোট ৮৫টি পেট্রোল পাম্পের সামনে অবস্থান-বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। বয়কটের ডাকে মানুষের অভূতপূর্ব সাড়াও মিলছে। রিলায়েন্সের বিক্রি কমেছে ৫০ শতাংশ। অবস্থান শুরু হয়েছে সমস্ত টোল প্লাজার সামনেও। সেখানে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করা হচ্ছে টাকা না নেওয়ার জন্য (লক্ষণীয়, ২০১৭ সালের মোটর ভেহিকেল অ্যাক্টে ট্রাক্টরের উপর থেকে ‘কৃষি যান’ তকমা প্রত্যাহার করায় চাষিদের অতিরিক্ত ট্যাক্সের ভার বইতে হত)। এর জেরে প্রথম ছয় দিনে সতেরোটি টোল প্লাজায় মোট চার কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে। শ্রুতিকটু হলেও কৃষকরা নিরুপায়, তথাকথিক ‘গণতন্ত্রে’র পীঠস্থান থেকে নামিয়ে আনা আক্রমণে অসহায় হয়ে শেষ উপায় হিসাবে সক্রিয় প্রতিরোধ-বয়কটের লাইন নিয়েছেন। সঙ্গে চলছে জিও সিম বর্জন। কৃষি ধ্বংসকারী লুটেরা আম্বানির পকেট ভরতে তাঁরা রাজি নন কোনওভাবেই। হোশিয়ারপুরে ক্যাম্পেন হয়েছে এই নিয়ে। ক্ষেতমজুরদের সংগঠন পেন্দু মজদুর ইউনিয়নও এই বর্জন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে।

তিন কৃষি আইনকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া পিটিশন কেন্দ্র সরকারের কোর্টে বল ঠেলে দেওয়ার পর গত তেরো তারিখ পাঞ্জাবের বিজেপি চিফ ও সাধারণ সম্পাদকের মিটিং বয়কট করা হয়েছিল ও ছয় ঘণ্টা ঘেরাও করে রাখা হয়েছিল। এইসময় পুলিশের সঙ্গে জনতার সংঘর্ষও ঘটে।

গত চোদ্দ তারিখ তিরিশটি কৃষক সংগঠনের সঙ্গে কেন্দ্র সরকার আলাপ আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছিল। কৃষক-প্রতিনিধিরা দিল্লি পৌঁছান, কিন্তু কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র সিং তোমর দেখা করতে চাননি। কৃষিসচিব সমস্ত কথা শুনলেও কোনও সমাধানসূত্র দিতে পারেননি। প্রতিনিধিরা শ্লোগান দিতে দিতে বেরিয়ে আসেন ও বাইরে কৃষিবিলের রেপ্লিকা জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখান। এই মিটিং কৃষকদের অপমান করার জন্য, তথা মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য ডাকা হয়েছিল সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।

একই দিনে সংগ্রুরে কয়েকজন বিজেপি নেতা স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে মিটিং ও রাজ্য কৃষিমন্ত্রীর সঙ্গে ভার্চুয়াল আলাপচারিতার কর্মসূচি নিয়েছেন, সেই খবর পেয়ে কৃষকরা দ্রুত সেখানে পৌঁছান। পুলিশ আটকাবার চেষ্টা করলেও দুটি ব্যারিকেড ভেঙে ক্ষিপ্ত জনতা সংলগ্ন স্কুলবাড়িতে বিজেপি নেতাদের ঘেরাও করে রাখেন প্রায় তিনঘন্টার মতো। কীর্তি কিষান ইউনিয়ন, কুল হিন্দ কিষান ইউনিয়ন, জামহুরি কিষান সভা, ভারতীয় কিষান ইউনিয়নের মতো সংগঠনগুলি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়।

অন্যত্র হিসার জেলার ক্রান্তিমান পার্কে হিসার, হাঁসি, বরাওয়ালা, উকলানা, আদমপুর থেকে কয়েক হাজার কৃষক একত্রিত হন। সেখান থেকে মিছিল করে বিজেপি এমপি ব্রিজেন্দ্র সিংয়ের বাড়ি ঘেরাও করেন। শুধু কৃষি বিল প্রত্যাহার নয়, সঙ্গে নষ্ট হওয়া ফসলের ক্ষতিপূরণ, ক্যানালে জল সরবরাহের দাবীতে প্রায় দুইঘন্টা তাঁকে আটক করে রাখা হয়।

হরিয়ানার উপমুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও করা হয়েছিল। দ্রষ্টব্য, এই ব্যক্তিই ইতিপূর্বে ২০১৭ সালে কৃষকদের আন্দোলনের সমর্থনে ট্রাক্টরে চেপে পার্লামেন্ট গেছিলেন।

এদিকে অক্টোবরের এক তারিখ থেকে চলছে অনির্দিষ্টকালীন ‘রেল রোকো’। প্রায় বারো হাজার কৃষক-ক্ষেতমজুর বসে পড়েছেন রেললাইনের উপর। এখনও অব্দি মোট কুড়িটি ট্রেন বাতিল হয়েছে বা গতিপথ পাল্টানো হয়েছে। প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে মারাও গেছেন এক মহিলা।

একই দিনে শুরু হয়েছে বড় কর্পোরেট হাউস ঘেরাও। আইন প্রত্যাহার হওয়া না অব্দি আন্দোলন চলবে।

তিন কৃষি আইন কেন আনা হল, সেই উদ্দেশ্য পরিষ্কার জনৈক জেডি(ইউ) এমপির বক্তব্যে— ‘১৯৯০ দশকের উদারীকরণ কৃষিক্ষেত্রকে ছাড় দিয়েছিল। সেই অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করতেই এই কৃষিবিল।’ স্পষ্টত নব্বই দশকের নয়া-উদারীকরণ দেশকে বহুজাতিক কোম্পানির হাতে বেচে দেওয়ার যে যাত্রা শুরু করেছিল, যে যাত্রা এখনও চলছে, এবার কৃষিক্ষেত্রে সেই শকুনের নজর পড়েছে। চাষিকে দেউলিয়া করে শুষে না খাওয়া অব্দি শান্তি নেই। নরেন্দ্র মোদি বলেছেন ‘এবার থেকে চাষিরা মান্ডির বাইরে নিজের মর্জিমতো দামে ফসল বেচতে পারবেন।’ পেপসিকো, রিলায়েন্সের মতো বৃহৎ কোম্পানির সঙ্গে চাষির চুক্তিতে কে ‘আপার হ্যান্ড’ নেবেন, আর কার ‘মর্জি’মতো দাম ঠিক হবে— সেগুলি বুঝতে রকেট সায়েন্স লাগে না।

সেইজন্যই যখন গোটা দেশে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি ‘তানিষ্ক বয়কট’ করার ডাক দিচ্ছে, অন্নদাতা কৃষকরা বলছেন— বয়কট করো দেশের আসল শত্রুদের, যারা দেশের জল-জঙ্গল-জমি লুটে নিজেদের সম্পদ বাড়াচ্ছে। যেখানে লকডাউনে লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ হারাচ্ছে, অভিবাসী শ্রমিকরা রেললাইনে চাপা পড়ে মারা যাচ্ছে, আম্বানিরা বিলিয়ন ডলারের মালিক হচ্ছেন, তাঁদের স্বার্থে পরিবেশ আইন পাল্টে যাচ্ছে। মানুষের শ্রম শুষে নিতে অসুবিধা হচ্ছিল ধনকুবেরদের, তাই দালাল সরকার পাল্টে ফেলল শ্রম আইন। কৃষিক্ষেত্র থেকে সর্বাধিক মুনাফা লোটায় সমস্যা হচ্ছিল, তাই আনা হল নতুন কৃষি আইন। নতুন শিক্ষা আইনের কথাও এত দিনে সবাই জানেন।

সব আন্দোলনের মতোই এই আন্দোলনেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে অনেক। আন্দোলনকারীরা মুখ্যত ধনী কৃষক। ছোট-মাঝারি কৃষকদের অংশগ্রহণ তুলনায় কম। পাঞ্জাব-হরিয়ানা বাদে দেশের বাকি জায়গায় আন্দোলনের ছাপ কম পড়েছে। এসব প্রতিকূলতার পিছনে ১৯৬০-এর দশক থেকে দেশের কৃষিনীতির যে বড় অবদান আছে, তা আগের লেখাতেই উল্লেখ করেছি। এমনকি আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এমন অনেক দলের সংগঠনও রয়েছে, নয়াউদারনৈতিক নীতিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর করতে যারা অতীতে যথেষ্ট সক্রিয়তা দেখিয়েছে। কিন্তু সে ভিন্ন আলোচনার বিষয়।

আপাতত ভ্রান্ত মুসলিমবিদ্বেষ, ‘লাভ জেহাদে’র সাজানো গল্পের উল্টোদিকে ধর্মমতনির্বিশেষে চাষি-মজুর-খেটে খাওয়া জনতার সক্রিয় প্রতিরোধে দেশ বাঁচানোর লড়াইয়ের দিশা দেখাচ্ছে চলমান কৃষক আন্দোলন।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2763 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...