ফ্যাসিস্ত বনাম মানুষ; পুলিশ এবং/বনাম মানুষ

প্রবুদ্ধ ঘোষ

 


লেখক সাহিত্য-গবেষক, দাবা-প্রশিক্ষক

 

 

 

 

Gordon: If we’re gonna play games, I’m gonna need a cup of coffee.
Joker: Ah, the ‘good cop, bad cop’ routine?

পুলিশ বিজেপি সমর্থকদের ওপরে লাঠিচালনা করায় এবং জলকামান থেকে রঙিন জল ছোঁড়ায় নেটিজেনদের আনন্দের সীমা নেই। বহু ছাত্র, শিক্ষক, ভদ্রবৃত্তের বিজেপিবিরোধী কলকাতা পুলিশের সামাজিক-মাধ্যম পেজে গিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন। পোস্ট করেছেন পুলিশের লাঠিচার্জের ছবি দিয়ে, বিজেপি-সমর্থকদের মার খাওয়ার ছবি দিয়ে। উল্লাস করেছেন পুলিস পিটিয়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে বলে। এই মুহূর্তে আরএসএস ও তাদের সংসদীয় মুখোশ-দল বিজেপি সারা ভারতবর্ষে সন্ত্রাস কায়েম করেছে। যে যে রাজ্যে ক্ষমতায় আছে, সেখানে সংখ্যালঘু, দলিতদের ওপরে নির্যাতন এবং আইনের অপব্যবহারকে নিত্যঘটনায় পরিণত করেছে। যে রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল এবং ক্ষমতার গন্ধ পেয়েছে সেখানে প্রতিমুহূর্তে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ও বিভেদের রাজনীতিতে উস্কানি দিয়ে চলেছে। আর, কেন্দ্রের শাসক হয়ে একের পর এক জনবিরোধী, পরিবেশবিরোধী ও আর্থ-সামাজিক প্রগতিবিরোধী আদেশ দিয়ে চলেছে। এমন একটি ফ্যাসিস্ট দল প্রকাশ্য রাস্তায় পুলিশের বেদম মার খেয়েছে— এ তো উল্লাসেরই বিষয়! কিন্তু, আপাত-উল্লাসের তলায় কিছু বেয়াড়া প্রশ্ন কুটকুট করেই।

বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক দোলাচলে ভুগছে। বর্তমান দক্ষিণপন্থী শাসক প্রায় সাড়ে নয় বছর ক্ষমতায়, অসংখ্য ভুল ও অপরাধ করে ফেলেছে। উগ্র দক্ষিণপন্থী বিজেপি বিগত লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকেই শক্তিবৃদ্ধি করে এখন বিধানসভার ক্ষমতার দিকে ছুটে আসছে। বিগত শাসনক্ষমতার সমস্ত ভুল ও অপরাধের ওপরে জোড়াতাপ্পি দেওয়া উত্তর-সত্য যুক্তি প্রচার করে সংসদীয় বামেরা রাজ্যে ক্ষয়িষ্ণু কংগ্রেসের সঙ্গে পুনরায় জোটবদ্ধ হয়েছে। রাজ্যের সাংবিধানিক শীর্ষপদে থাকা রাজ্যপাল একদিকে রাজ্য সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ে বিরোধিতার ট্যুইট করছেন এবং অন্যদিকে এক সদ্যনিহত বাহুবলী/গুণ্ডার দেহ রাজভবনে এনে বাহুবলী-রাজনীতির উদ্‌যাপন শুরু করেছেন। বিজেপি সরকারের শাসনে এবং ধর্মীয়-সামাজিক ক্ষেত্রে ভূমিকায় সাধারণ মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত। ফেসবুকে অন্তত আমার বন্ধুবৃত্তের দেওয়া বিজেপিবিরোধী পোস্ট-মিমে নিউজফিড ভরে ওঠে। উত্তরপ্রদেশের হাথরসে, পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক ঘৃণাপ্রচারে, কৃষিবিলের প্রণয়নে, নয়া শিক্ষানীতির প্রবর্তনে, অভিবাসী শ্রমিকদের প্রতি অমানবিক ব্যবহারে, সিএএ-আনআরসি নীতিতে, অর্থনীতির ক্ষয়িষ্ণুতায় ও ভারতজুড়ে দলিত-সংখ্যালঘু নিপীড়নে এবং এরম অসংখ্য ঘটনায় বিজেপি-আরএসএসের ভূমিকায় সামাজিক মাধ্যমের বন্ধুপরিসর ক্ষিপ্ত হয়ে ছিল। ৪ঠা অক্টোবর বাহুবলী-থেকে-কাউন্সিলর বনে যাওয়া মণীশ শুক্লা খুন হওয়ার পরে ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে। স্বয়ং রাজ্যপাল এক গুণ্ডার মৃত্যুতে ব্যথিত হয়ে রাজ্য পুলিশকে ভর্ৎসনা করছেন— এমন অভূতপূর্ব ঘটনাও ঘটে (আগের প্রবন্ধে এর উল্লেখ রয়েছে)। জনগণ জানেন যে তাঁরা শুধুমাত্র ‘সাধারণ ভোটার’ এবং ‘ভোট মেশিনারি’র দখল যাদের হাতে তারাই নির্বাচনে জিতে পরবর্তী পাঁচবছর শোষণের দায়িত্ব পাবে। তবু এই ঘটনাগুলো তাঁদের ব্যথিত করে, ক্ষুব্ধ করে। তাই বিজেপিকে ‘স্যাটা ভাঙা ক্যাল দেওয়া হোক’ বলে স্বস্তি পান তাঁরা।

#

 

গোকুলের মা

অন্ধকার ঘন হলে বলেছিল, ‘আর নয়, এবার ফিরে যা’-
ফেরার আগেই খাকি রঙের বিদ্যুৎ দরজায়
রিভলভার গর্জে ওঠে গর্জায় গোকুল
রাষ্ট্রীয় ডালকুত্তা ছিঁড়ে নিল এক খাবলা চুল
রাতকানা মায়ের চোখে কুরুক্ষেত্রে বেল্টের পিতল, বুট, জলস্রোতে নামে অন্ধকার

২০০৫ সালের ১০ই জুন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের দাবিতে অনশনরত ছাত্রছাত্রীরা। রাতের অন্ধকারে পাগলা কুকুরের মতো দাঁতনখ শানিয়ে ঢুকে পড়ে পুলিশ আর সিপিএম ক্যাডার। তাদের সশস্ত্র আক্রমণে আহত হয় ছাত্রছাত্রীরা, কয়েকজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। ২০১০ সালের ১০ই নভেম্বর। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে কালো পতাকা দেখানোর অপরাধে পুলিশ-নিরাপত্তারক্ষী ও কর্মচারী সংসদের কর্মীসদস্যদের যৌথ আক্রমণ নেমে আসে বিক্ষোভরত ছাত্রছাত্রীদের ওপরে। প্রহাররত পুলিশ ও স্লোগানরত ছাত্রছাত্রীদের ছবি প্রতিটি কাগজের শিরোনাম হয়। ২০১৪, ১৬ই সেপ্টেম্বর। শ্লীলতাহানির অভিযোগের যথাযোগ্য ও দ্রুত তদন্তের দাবিতে অবস্থানরত ছাত্রছাত্রীদের ওপরে রাতের অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়ে উর্দিধারী আইনরক্ষকেরা। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের আলো নিভিয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগ দেয় ‘গেঞ্জি-পুলিশ’ আর তৃণমূল কর্মীরা। বহু ছাত্রছাত্রী আহত হয়, দু দিন পরের মিছিলে শহর উত্তাল হয় ‘হোক কলরব’ স্লোগানে। ১৯৭১ সালের ১২-১৪ই অগাস্ট রাত। বরানগর-কাশীপুর অঞ্চলে সংঘটিত হয় নারকীয় গণহত্যা। কমিউনিস্ট কর্মীদের হত্যা করতে তিন রাত পরপর গোটা এলাকার বাড়ি বাড়ি অত্যাচার চালায় পুলিশ-কংগ্রেস-গুণ্ডা মিলিত বাহিনী, সঙ্গত দেয় সংসদীয় বামেরা। পরবর্তীকালে এপিডিআর-এর বইতে, সাহিত্যিকদের আত্মকথায় ও সাহিত্যে তার উল্লেখ থেকেছে। কংগ্রেস জমানায় খাদ্য আন্দোলনে গুলিচালনা থেকে কমিউনিস্ট দমনে নরখাদকীয় সক্রিয়তা, বাম জমানায় ভিন্নধর্মের বাধা হয়ে দাঁড়ানো থেকে গণআন্দোলনে গুলি চালিয়ে কৃষক-আদিবাসী হত্যা এবং তৃণমূল আমলে হিংসাত্মক পদ্ধতিতে গণআন্দোলন দমন থেকে দলদাসের নিষ্ক্রিয়তা— পুলিশের ভূমিকা একই থেকেছে। আর, ব্রিটিশ আমল থেকেই পুলিশি নির্যাতন ও অমানবিকতার অজস্র উদাহরণ কালোত্তরে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। সেই পুলিশই হঠাৎ ‘হিরো’ হয়ে যাচ্ছে বিজেপিকে পিটিয়ে। পুলিশ, লুই আলথুসারের মতে দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যতম প্রধান উপাদান, শাসকের মতাদর্শকে অক্ষুণ্ণ রাখতে শাসিতকে বাধ্যতামূলক ঘাড়-মাথা নিচু করিয়ে রাখে। তারাই হঠাৎ হিরোর তকমা পেয়ে গেল, তাদের রক্তমাখা উর্দি প্রশংসায় ভরে উঠছে? তাহলে কি শাসিতের অবস্থান বদলে গেল, নাকি শাসকের অবস্থান পাল্টে গেল? শাসকশ্রেণির দমনমূলক আধিপত্যের মতাদর্শ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে তৃণমূল সরকার শোষিতের পক্ষে দাঁড়াতে চাইল (নিদেনপক্ষে ফ্যাসিস্টবিরোধী অবস্থান নিল?)? পুলিশ সত্যিই বিজেপি-আরএসএসকে জনশত্রু তথা মানবতার শত্রু বলে চিহ্নিত করে খুব পিটিয়ে দিল? না, এই সবকটা প্রশ্নের উত্তর— না! পুলিশ বেতনভুক কর্মচারী; রাষ্ট্রযন্ত্রের বেতনভুক আদেশপালক মতামতহীন বোবাকালা ছোটসৈনিক। তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপি দুই দলেরই লক্ষ্য জনগণকে শোষণ করা এবং শাসকের মতাদর্শ অক্ষুণ্ণ রাখা; দেশে বিজেপি আর রাজ্যে তৃণমূল কোনওদিন কোনওভাবেই শ্রমজীবী, নিম্নবর্গের সরকার হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু, ক্ষমতার বাঁটোয়ারা নিয়ে দুই দলের দ্বন্দ্ব আছে, শাসকের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। পশ্চিমবঙ্গের এই একই পুলিশ কেন্দ্রীয়-সরকার-বিরোধী মিছিলে লাঠিচার্জ করে আবার রাজ্য-সরকার-বিরোধী যেকোনও মিছিলে লাঠিচার্জ করে। এই রাজ্য পুলিশ কেন্দ্রীয় সংস্থার নির্দেশে কোনও প্রতিবাদীকে মিথ্যে মামলায় জড়িয়ে ইউএপিএ দেয় এবং প্রতিরোধী ছাত্রছাত্রীদের নির্মম হিংস্র উপায়ে দমন করে। যে শাসক তাদের রুটিরুজি দেয়, সেই শাসকের রঙ লাল-সবুজ-গেরুয়া যাই হোক, সেই শাসকের কথায় রক্তরঞ্জিত দিনরাত্তির নামিয়ে আনে পুলিশ।

#

 

পুলিশ করে মানুষ শিকার
মানুষ শিকার করে পুলিশ
দলের পুলিশ কলের পুলিশ
কত ছলাকলার পুলিশ

৮ই অক্টোবর বিজেপি যে দাবিগুলিকে সামনে রেখে মিছিল করেছে, সেগুলি প্রকৃতবিচারে কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে ব্যুমেরাং হতে পারে। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব ভালভাবেই জানত যে, এই মিছিল আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে পেশিশক্তি ঝালিয়ে নেওয়ার মিছিল। তাই, স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধিকে কাঁচকলা দেখিয়ে হিংসাত্মক উন্মত্ততায় ফাঁকা নবান্নে ধেয়ে যায় তারা। বিজেপি এমনই এক ঘৃণ্য সন্ত্রাসবাদী দলের (আরএসএস) সংসদীয় মুখোশ যে, তার সমর্থকেরা প্রকাশ্য রাজপথে মার খেলে আমাদের হৃদয় উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। এই বিজেপির গুণ্ডারাই কিছদিন আগে দিল্লিতে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার করেছে। এই বিজেপির ছাত্র সংগঠন এবিভিপি কয়েক মাস আগে ভারতের বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণতন্ত্রপন্থী ছাত্রছাত্রীদের ওপরে সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ধর্ষকদের সমর্থনে জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিল করে এরাই, হিন্দু বনাম মুসলমান প্রতর্কে দাঙ্গাপ্রবণতাকে ন্যায্যতা দেয় এরাই। কিন্তু, খেয়াল রাখা প্রয়োজন যে, এই প্রত্যেক ক্ষেত্রে বিজেপি-আরএসএসকে মদত ও সুরক্ষা দেয় পুলিশই। হাথরসে ধর্ষিতার পরিবারকে ভয় দেখানো, তাদের বয়ান পাল্টাতে বাধ্য করা কিংবা সাংবাদিকদের আটকে দেওয়ার মতো ঘৃণ্য কাজ পুলিশই করেছে। খাকি বা সাদা উর্দির ছোট থেকে বড়স্তরের পুলিশেরা রাষ্ট্রনির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে এবং ‘আইন-কানুন’ বজায় রাখতে প্রতিবাদীদের ওপরে নির্যাতন করতে এক মুহূর্তও ভাবে না। মিথ্যে মামলা দিয়ে জেলে ভরতে, ভুয়ো এনকাউন্টার করে সত্য ধামাচাপা দিতে কিংবা গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করতে পুলিশের ভূমিকা সর্বজনবিদিত। বিজেপি ফ্যাসিস্ট নিঃসন্দেহে, বিজেপি ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু, একটি ফ্যাসিস্ট দলের সমর্থকদের মার খাওয়ার আনন্দে ফ্যাসিস্ট মতাদর্শের রক্ষক-প্রচারক পুলিশ বাহিনীকেই মদত জুগিয়ে ফেলছি না তো আমরা? ফ্যাসিবাদ কাদের ভরসায় ক্ষমতায় গেঁড়ে বসে থাকে? পুলিশ-মিলিটারি-দমনযন্ত্র ছাড়া কে বলপ্রয়োগে টিঁকিয়ে রাখবে একে? ব্রাউন শার্ট, স্টর্ম ট্রুপার, গেস্টাপো— বিভিন্ন নামে শাসক মতাদর্শের তাঁবেদারি এরাই করে এসেছে। বিজেপি সমর্থকদের মেরে পুলিশ হঠাৎ ‘মানবিক’ বা ‘ফ্যাসিবাদ-বিরোধী’ হয়ে যায়নি; যা তাদের চিরাচরিত রাষ্ট্রীয় কর্তব্য সেটাই পালন করেছে মাত্র। জনগণের পক্ষে নয় বরং রাজ্যের শাসকদলের পক্ষ নিয়ে বিরোধী দলের সমর্থকদের (কেন্দ্রীয় শাসকের সমর্থকদের) পিটিয়েছে। শাসকশ্রেণির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, যা ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য, তার জন্যেই রাজ্যপুলিশ বিজেপি সমর্থকদের রং গোলা জলকামানের তোড়ে ধুইয়ে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রতিরোধী উদ্‌যাপন নয়, রাষ্ট্রশক্তিরই নমুনা প্রদর্শন এটা। শোষিত মানুষের ফ্যাসিবিরোধী উদ্‌যাপন নয় বরং ফ্যাসিবাদের রক্ষকদের স্বাভাবিক ভূমিকা এটা। শ্রমজীবী-নিম্নবর্গের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের জয়োল্লাস নয়, বরং এক দক্ষিণপন্থী শাসকের অপর উগ্র-দক্ষিণপন্থী শাসকের বিরুদ্ধে ক্ষমতা প্রদর্শন এই ঘটনা। বিজেপির মিছিলে আসা এক সশস্ত্র ব্যক্তির ‘শিখ’ জাতিপরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে শিখ-সম্প্রদায়ের দ্বেষ জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিল বিজেপির তথ্যপ্রযুক্তি কোষ। যদিও, কলকাতার শিখ-সম্প্রদায়ের তৎপরতায় বিজেপির মন্দবুদ্ধি মাঠে মারা গেছে। ফ্যাসিস্ত বনাম ফ্যাসিস্ত-রক্ষকদের সংঘর্ষের মধ্যে এ এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

লকডাউন শুরুর পরে সামাজিক মাধ্যমের বন্ধুতালিকায় অনেকে বলেছিল, ‘যারা বাইরে বেরোচ্ছে, পুলিশ প্যাঁদাক তাদের!’ আমফান দুর্যোগের পরে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ-জলের অসহায়তায় বিক্ষোভ করছিলেন অনেকে; সামাজিক মাধ্যমে বহু চেনাজানা বলেছিল, ‘পুলিশ পেঁদিয়ে এদের ঠান্ডা করে না কেন?’ যা কিছু সমস্বর আমাদের অপছন্দ, অস্বস্তির; যা কিছু সমবেত/একক আমাদের মতের বিরোধী, আমরা হ্যা হ্যা হেসে বলি, ‘পুলিশ এসব টলারেট করে কেন? মেরে স্যাটা ভেঙে দিক!’ পুজোর ভিড়, ঈদের বাজার থেকে রেশন দোকানের লাইন— পুলিশ ক্যালালেই জনগণের শিক্ষা হবে— সুন্দর ভোর হবে! এমনটাই বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত আমরা।

পুলিশ মহান— সাম্প্রতিক বেশ কিছু সিনেমা, ওয়েব সিরিজ দেখেও এটাই মনে হয়। আর, সবগুলোই প্রবল জনতোষী চলচ্চিত্র, আইএমডিবি-রেটিং মারাত্মক! পুলিশ, সেনা ও রাষ্ট্র প্রায়ই দায়িত্ববিচ্যুত, তারা ঘুষ খায় ও ধর্ষণ করে— কিন্তু ওরাই আসল নায়ক, মহান। ওরাই পারে সব সমস্যার সমাধান করে দিতে! সমাজের সব কালো সরিয়ে আলো করে দিতে! দুষ্কৃতকারীদের এনকাউন্টারে মেরে ধর্ম সংস্থাপন করতে। কিছু ভুল বাস্তবে করে ফেলে বটে, কিন্তু চাইলেই সব ঠিক করে দিতে বেলাইন জনতাকে কেলিয়ে লাইনে এনে দিতে পারে পুলিশ-মিলিটারি-গুপ্তচর সংস্থা।

ওয়েব সিরিজগুলোকে এখনও উদারনৈতিক ভাবনাপ্রয়োগের কিছু সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তাই সমাজের ‘অন্ধকার’, সমাজের ‘প্রান্তিক’দের কথা দেখাতে পারছে। আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় সেসব বাস্তব নেই বলেই হয়তো ‘উফ, আহা!’ লাগছে সেসব! কিন্তু, সব আখ্যানের কেন্দ্রে সেই পুলিশ-গুপ্তচর-বীর! নিয়মমাফিক অশুদ্ধকে শুদ্ধ করছে, একটু ভুল সিস্টেমকে দারুণ ঠিক করছে এবং আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, স্থিতাবস্থা বজায় আছে! শুধু নিজেদের আরও ভালো হতে হবে! আর, তেমন আইনমাফিক ভালো হতে না পারলে? পুলিশ মেরেধরে জেলে ভরে সব সামলে দেবে! জনতোষী সংবাদমাধ্যম, জনতোষী আইন, জনতোষী বন্দোবস্ত।

#

 

পুলিশ কখনও কোনও অন্যায় করে না তারা যতক্ষণ আমার পুলিশ

ফ্যাসিস্তদের বিরোধিতা করা সবসময়েই ন্যায্য। ফ্যাসিস্তদের প্রতিটা অত্যাচার ও অত্যাচারের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধ মানুষের ন্যায়সঙ্গত অধিকার। প্রকাশ্য রাজপথে ফ্যাসিস্তদের মেরে প্রতিশোধ নিচ্ছে মানুষ, ইতিহাস এর সাক্ষী। কিন্তু, তা মানুষের প্রতিরোধ, নির্যাতিত মানুষের প্রতিশোধ। বিজেপি-আরএসএস যৌথসন্ত্রাসীর বিরুদ্ধেও সেটাই কাম্য। রাষ্ট্রের বেতনভুক পুলিশবাহিনী মেসিহার মতো অবতীর্ণ হয়ে নিপীড়িত মানুষের হয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছে, এমনটা নয়। সাধারণ মানুষ, ফ্যাসিবাদবিরোধী মেহনতী মানুষের জোট সম্ভাব্য সমস্ত উপায়ে ফ্যাসিস্ত-আগাছা নির্মূল করুক। কিন্তু, নিপীড়িত মানুষের বিক্ষোভ-লড়াই পুলিশ কখনও লড়ে দিতে পারে না। আমাদের অপারগতার জন্যে, পরিকল্পিত রাজনীতিহীনতার জন্যে ফ্যাসিস্তদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রাম এখনও গড়ে তুলতে পারছি না— তাই পুলিশের লাঠিচালনাকেই বিকল্পক্ষেত্রের স্বস্তি হিসেবে মনে করছি। ‘অন্য কেউ তো আমাদের হয়ে সঠিক কাজটা করে দিলল– এই ভাবনা থেকেই কলকাতা পুলিশকে ধন্যবাদ জানিয়ে আসা, পুলিশের জলকাম-লাঠিচালনার গৌরবগাথা প্রচার করা! কিন্তু, এই পুলিশই ফ্যাসিবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে লাঠি-গুলি চালাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। আমফান-পরবর্তী সময়ে উত্তর চব্বিশ পগণায় শাসক দলের ব্যাপক রেশনদুর্নীতির প্রতিবাদে গ্রামবাসীরা বিক্ষোভ করলে পুলিশ তাদের মারধর ক’রে জেলে ভরে দেয়। সম্প্রতি কলকাতায় কেন্দ্রবিরোধী যেক’টা মিছিল হয়েছে (তৃণমূলের মিছিল বাদে) পুলিশ সবক’টা মিছিল আটকে দিয়েছে এবং বিক্ষুব্ধদের গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের জামায় বরাবরই রক্তের দাগ লেগে থাকে। তাই, পুলিশ আপনার হয়ে আমাদের হয়ে বিজেপিকে মেরেছে— এই ভেবে তৃপ্তি পাওয়ার কিছু নেই। আগামী বিধানসভায় পালাবদল হলে উগ্র-দক্ষিণপন্থীদের কথায় ওঠবোস করবে পুলিশ। পুলিশের ডান্ডার একটাই ধর্ম— শাসন-শোষণের স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে প্রতিবাদের সমস্ত স্বরকে বলপ্রয়োগে স্তব্ধ করে দেওয়া। পুলিশ বিজেপিকে পেটানোয় উল্লসিত না হয়ে আমরা বরং আরেকটু সংগঠিত করি নিজেদের; বিজেপি-আরেসেসের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বর্শামুখে শান দিই। পুলিশ শাসকের মতাদর্শ তথা ফ্যাসিবাদের পক্ষেই ছিল, আছে এবং থাকবে। আর, আমরাও তাই নিজেদের ব্যূহ সাজিয়ে নিই যুদ্ধদিনের বাস্তবতায়। ফ্যাসিস্ত দল আর তাদের পেটোয়া রক্ষীবাহিনীকে সূচ্যগ্র মেদিনী যেন ছেড়ে না দিই সেই প্রস্তুতি জরুরি— সময়ের দাবি সেটাই।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2763 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. লেখককে ধন্যবাদ। এক দিক দিয়ে ঠিকই লিখেছেন। তবু কিছু কথা।
    পুলিশ, লুই আলথুসারের মতে দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যতম প্রধান উপাদান, শাসকের মতাদর্শকে অক্ষুণ্ণ রাখতে শাসিতকে বাধ্যতামূলক ঘাড়-মাথা নিচু করিয়ে রাখে”
    তার অনেক আগেই মারক্স লেনিন রাষ্ট্র আর বুর্জোয়াদের সম্পর্ক নিয়ে বিষদে অনেক কথাই বলে গিয়েছেন।
    আমার বক্তব্য অন্য জায়গায়। রাষ্ট্রকে বামপন্থা ডানপন্থা সবাই নিজের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে। police, military are state instruments to keep the conflict Between capitalist and the working class under control. যখন কেবলমাত্র ক্ষমতার প্রশ্ন থেকে যায়। মানে পার্টি, এবং আদ্যন্ত তা পলিটিকাল. এইভাবে শুধু দেখলে বিমূর্ততা আসে।
    বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর কথাই যখন এল তাহলে তো মরিচঝাঁপি সবচেয়ে ভালো উদাহরণ ছিল। কোনটাই আমরা সাপোর্ট করি না। খারাপ। নোংরা। অমানবি। কিন্তু চরিত্রগত দিক থেকে সবগুলি আলাদা। কেবল যে ক্ষমতায় সেই পুলিসকে দিয়ে রামপ্যাদানি দেয় বললে অনেক কথা ঢাকা পড়ে যায়। আরও বড় শত্রু পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, সবচেয়ে বড় পুঁজিবাদ। আসল শত্রুই তো আড়ালে থেকে গেল।

আপনার মতামত...