দু’টি অণুগল্প

রুখসানা কাজল

ভাতগন্ধী নারী

গাঁওগেরামে পা দিয়ে ভরভরন্ত ধানক্ষেত দেখতে ছুটলাম। ভাগরাখালিরা বসে আছে গাছের ছায়ায়, পাকা ধানের দুধ গন্ধে প্রজাপতি উড়ে উড়ে শুঁকে নিচ্ছে সোনালি শীষ। দরদরিয়ার জুন্নু জেলে কাটা ধানে আগল বাঁধতে বাঁধতে জানাল, পেটভরে ভাত খাওয়াতে পারেনি বলে পোয়াতি বউটা মরে গেল এই বর্ষায়!

গেল রাতে ফিরিয়ে দেওয়া ভাতের থালা মনে পড়ে গেল। ছোটবেলায় ভাত ফেলতে নেই বলে কুড়িয়ে বাছিয়ে সব ভাত খাইয়ে দিতেন মা বাপি। একটি ভাতের দানাও পরম মমতায় তুলে নিতেন কপাল ছুঁয়ে। কে একজন নাকি আছেন কোন অসীমের খাঁচায়। তার কাছে ফেলে দেওয়া ভাতেরা শিউলি ফুল হয়ে উড়ে গিয়ে নালিশ করলে ভাগ্য থেকে মুছে যাবে ভাতগন্ধ। নিরন্নের হাহাকারে বাজবে শূন্য হাঁড়ি। ভয় পেয়ে খুব ভেবে নিতাম, আগে তো বড় হই, কে খায় এই সাদা সাদা ভাত!

দূর থেকে জুন্নু জেলেকে দেখি। জলমগ্ন শাপলা নালীর মতো রঙ। বউটি বড় সুন্দর তেল কই রাঁধত। চালতার আচার। আতান্তরে কলমি শাক, আমরুলের টক আর গমের খুঁদ ভাত। একবার বাজারে বটি পেতে চাকুরে ভাবীদের মাছ কুটে দিয়ে বউ নথ কিনেছিল একটা। পেতলের নথ। নকশায় পুরাতনী ঢং।

সে রাতে চাঁদ নেমেছিল জুন্নুর ঘরে। শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে খেলা ভাঙার রাঙা জ্যোৎস্নায় বউ এক দরিয়া হয়ে ভেসেছিল আদরে। পেতলের নথে চুমু খেয়ে বুকের উপর মুখ রেখে আহ্লাদে গলে বলেছিল চাঁদ, আমাকে সন্তান কর্‌ মা। বউ হেসেছিল খলবল জোয়ারে পোয়াতি নদীর হাসি।

ধান ফুরালো, চাল ফুরালো, প্রতিবেশীর হাত ফুরালো। ঘরে ঘরে নেচে গেল মৃত্যু। বকুল ফুল সখীর হাতে নথ রেখে হারিয়ে গেল বউটা।

তখন ভরা বর্ষা। মহাজনের নায়ে রূপালি ইলিশ গোলাপি গাল ভরে ডেকে বলে, ঘরে চল্‌ না বাপ! সাদা ভাতে দানা দানা স্বপ্ন ভাসে। জুন্নু হাসে, এই তো ফিরছি ধীবরের পো! ততদিনে ওর শূন্য দাওয়ায় ইঁদুরের ঘর। হাতে ধরা এক হালি ইলিশ। ভরসন্ধ্যায় ভাত গন্ধে পাগল হয়ে মগজে ঢেউ তোলে। জুন্নু কই যায়, কী করে, কী বলে, কাকে বলে, কেন বলে কে জানে!

গাঁওগেরাম থেকে ফিরে আসছি। পাকা ধানের সুগন্ধে দুধমুখী শিশুর আঁতুড় গন্ধ। কেঁপে কেঁপে উঠছে নুয়ে পড়া ধানশীষ। যেন দুলে যাচ্ছে অজস্র শিশুহাত। আমার চোখ ছুঁয়ে অমৃত বুক আর কোলের পাঁজরে গুঙিয়ে উঠে বাতাস। নরম ভেজা স্পর্শে পা জড়িয়ে ধরে অনাগত কেউ কঁকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে, আমাকে গর্ভে নিবি ভাতগন্ধী নারী?

 

নাঙ্গেলি

 

এটা কী ড্রেস রে?

দেওয়াল আয়নায় ঘুরে ফিরে নিজেকে দেখছিল রুরু। বিমুগ্ধ নার্সিসিজম ওর চোখে মুখে। কখন যে ওর দরোজায় রাহি এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারেনি মোটেও। একটু চমকে উঠে ঘুমঘুম আচ্ছন্নতায় উত্তর দেয়, নাঙ্গেলি! অসাম তাই না মা?

বেবি ব্লু রঙের লং গাউন। গাউনের শেষে চিকন রূপালি লেস। মাছের লেজের মতো গাউনের পেছন ছড়িয়ে পড়েছে সাদা ফ্লোরে। নীল বিদ্যুৎপ্রভা খেলে যাচ্ছে রুমে। বাম দিকের হাতা আছে, ডান দিকেরটা নেই। বরং ডান বগলের নীচ দিয়ে ডিপ কাট্‌ গলা উঠে গেছে বাম কাঁধের উপর। সবুজ নিমের মতো অগভীর ক্লিভেজ নিষ্পাপ নেমে গেছে বুকের ভেতর। জ্বলজ্বল করছে সদ্য তরুণ দুটি বুক। চোখ ফেরাতে পারে না রাহি।

আয়নায় নিজেকে আবার দেখে রুরু বলে, ওয়াও! প্রিটি নাইস ড্রেস! কিছু তো বলো মা!

লম্বা শ্যামলা মেয়েটাকে পরীর মতো লাগছে। কিন্তু এই ড্রেসের নাম নাঙ্গেলি! কেন!

ফ্যাশন ডিজাইনের থার্ড সেমিস্টারের ছাত্রী রুরু। পড়াশুনায় তুখোড়। বাবা মার মতো ডাক্তার হবে বলে প্রথমে ডাক্তারিতেই ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু ছ’মাসের মাথায় ডাক্তারিকে গুডবাই জানিয়ে ভর্তি হয়ে গেছে ফ্যাশন ডিজাইনে।

এখানেও ভাল রেজাল্ট করছে। দু’বারের শো স্টপার। র‍্যাম্পে পারফর্ম করতে দেশ বিদেশের প্রচুর অফার আসে। এই উনিশেই রু ইসলামের হট প্রোফাইল হাই ইমেজ পার্সোনলাটি। বেছে বেছে শো নেয়। নেক্সট টার্গেট প্যারিস।

স্বপ্নের ভেতরেও প্যারিসের র‍্যাম্পে পারফর্ম করে ও। পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি রুরুর একটাই দুঃখ, ইসসস মা, ওমা, মাগো যদি পাঁচ ফুট আট হতে পারতাম! মিনিমাম এইট ইঞ্চ! ওয়াও আই উড বি দ্য ফ্যাশন আইকন!

একাই চা বানিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় রাহি। ক্লাস নাইন টেনে মেয়ের খুব বই পড়ার নেশা ছিল। প্রতিটা ছুটির দিন বাবা মাকে নিয়ে বই কিনে নিয়ে আসত। কত রকমের বই। ওদের তো ভয় ছিল এত গল্পের বই পড়ে রুরু প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষায় খারাপ না করে বসে!

রাহি রুম্মানের ইচ্ছা ছিল তাদের মেয়েও তাদের মতোই ডাক্তার হোক। বোর্ডের পরীক্ষাগুলোয় অভূতপূর্ব রেজাল্ট করে রুরু চমকে দিয়েছিল ইশকুল কলেজসহ সবাইকে। তাই ওদের স্বপ্নটা আরও মজবুত হয়েছিল। ওই সময়েই কেমন গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে থাকে মেয়ে। বরাবরই বুদ্ধিতে, কথায়, চলাফেরা, আত্মসম্মানে তুখোড় তাদের বিতর্কে চ্যাম্পিয়ন মেয়ে।

দুজনেই সার্জন ওরা। মেয়ে যাতে ডাক্তারি পড়তে ভয় না পায় সে কারণে প্রায় প্রতিটি অপারেশনের বিষয় মেয়ের সামনেই আলোচনা করত ওরা। রুরুও অংশ নিত কোনও কোনও আলোচনায়। সেই মেয়ে ডাক্তারি ছেড়ে ফ্যাশন ডিজাইন বেছে নেওয়ায় ধাক্কা খেলেও ওরা বাঁধা দেয়নি। এখন রুরুর গল্পগুলোই ওরা শোনে। শুনে শুনে প্যারিস, লন্ডন, দিল্লির অনেক ডিজাইনার আর মডেলকে তারা ঘরের মানুষের মতোই জানে।

কিন্তু ফ্যাশন ডিজাইনের সাথে নাঙ্গেলি কী করে মেলে? রাহি চায়ে চুমুক দিয়ে বারবার মেলাতে চেষ্টা করে, একটা আলট্রামডার্ন সুপার-অ্যাট্রাক্টিভ ড্রেসের নাম কী করে নাঙ্গেলি হওয়া সম্ভব?

লম্বা হাতে মাকে জড়িয়ে ধরে রুরু, কী ভাবছ মা?

রাহি চমকে ওঠে না। তার মেয়ে এরকমই। বারমুডা আর গেঞ্জিতে ছিপছিপে কিশোরীর মতো লাগছে এখন মেয়েকে। মায়ের হাত থেকে কাপ নিয়ে দু’চুমুক খেয়ে চোখ পাকায়, আবার চিনি খাচ্ছ মা! দাঁড়াও বাপিকে রিপোর্ট করছি।

তারপর রাহির দু’হাঁটু জড়িয়ে ধরে, জানো মা এবারের অনুষ্ঠানটা হচ্ছে ব্রেস্ট ক্যান্সারের উপর। একটা শর্ট ডিসকাশনও আছে। তোমার মনে আছে মা নাঙ্গেলির কথা? সেই যে কেরালার ট্রাভাংক রাজ্যে মুলাক্কাবম বা ব্রেস্ট ট্যাক্স দিতে নাঙ্গেলি নামের মেয়েটি নিজের ব্রেস্ট কেটে দিয়েছিল রাজাকে! আমি ডিসিশন নিয়েছি ওইদিন নাঙ্গেলির কথা বলব। নারীর শরীর তো রাজনৈতিক ক্ষমতার শিকার হতে পারে না। নারীই তার শরীরের মালিক, তাই না মা? তারাই তো ঠিক করবে তাদের এই দেহ, মন নিয়ে তারা কী করবে না করবে। আর সে জন্যে নারীদের আর্জেন্টলি জানতে হবে কী করে এই শরীরকে সুস্থ রাখা যায় সে সম্পর্কে। হাউ এবাউট দ্যাট মাম?

রাহির হাতের কাপে চে গ্যেভেরার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3248 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

আপনার মতামত...