সৌমিত্র ছিলেন এক ইন্টেলেকচুয়াল হিরো

অনিল আচার্য

 


লেখক প্রাবন্ধিক, গল্পকার ও কবি; সাহিত্যপত্র ‘অনুষ্টুপ’-এর সম্পাদক

 

 

 

আজ রোববার পনেরোই নভেম্বর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় চলে গেলেন। আমার নিজের মনে হল, যেন শুধু বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি সিনেমার জগৎ নয়, সারা পৃথিবীর সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সিনেমার জগতে একটি নক্ষত্র পতন হল। যত দূর স্মরণে আসে, তিরিশের দশকে সৌমিত্র পৃথিবীতে এসেছিলেন, জন্মেছিলেন, হয়ত বাঙালির গৌরব বর্ধন করার জন্যেও কিছুটা। ওঁর বাবার বদলির চাকরি ছিল। ফলে বিভিন্ন জায়গাতে সৌমিত্র লেখাপড়া করেছেন, বড় হয়ে উঠেছেন। কৃষ্ণনগরে ছিলেন, তারপরে কলকাতার শিয়ালদা অঞ্চলে ছিলেন। ভর্তি হয়েছিলেন সিটি কলেজে, বাংলা সাহিত্য নিয়ে লেখাপড়া করতেন। গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেছিলেন। কিন্তু যখন উনি এই পড়াশুনো করছেন সিটি কলেজে, তখন থেকেই নাটকের প্রতি তাঁর এক গভীর আকর্ষণ। তিনি প্রায়ই শিশির ভাদুড়ির কাছে চলে যেতেন। বাংলা নাটকের জগতে তখন শিশিরবাবু একটি অবিস্মরণীয় নাম। তাঁকে সবাই বড়বাবু বলে ডাকতেন। এসব কথা আমি শুনেছি অনিল মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে যিনি শিশির ভাদুড়ির সঙ্গে অভিনয় করেছেন এবং শিশির ভাদুড়ির উপর একটি বই লিখেছেন। বলা বাহুল্য, শিশির ভাদুড়ির উপরে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও একটি বই লিখেছিলেন। অনেকটা যেন গুরুদক্ষিণার মতো। খুব শ্রদ্ধা করতেন তাঁর অভিনয়কে। সৌমিত্র অভিনয় শুরু করেছিলেন কিন্তু মঞ্চের অভিনয় দিয়ে। আর আবৃত্তি দিয়েও। এই সময় ভুললে চলবে না, ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি কবিতা লিখতেন। অনেক বাংলা কবিতা লিখেছেন তিনি। এই তো সদ্য দু বছর আগে, তাঁর একটি বিশাল কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে। আমার সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র কিন্তু সিনেমা নয়, বরং কবিতাও নয় সেই অর্থে। আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় একজন সম্পাদক হিসেবে। ১৯৬৪ সালে তিনি এবং নির্মাল্য আচার্য একটি পত্রিকা শুরু করেন, যার নাম ‘এক্ষণ’। ‘এক্ষণ’ পত্রিকা এক অর্থে একটি নতুন ইতিহাস তৈরি করল এই জন্যে বলি যে শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্তদের জন্যে একটি পত্রিকার দরকার ছিল। বাংলা পত্রিকার অনেকগুলিই প্রকাশিত হচ্ছিল, কিন্তু সেগুলির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মূলত রাজনীতি। সামগ্রিকভাবে রাজনীতির বাইরে অথবা রাজনীতিকে অন্যরকম দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করা এবং সাহিত্যের বিভিন্ন আঙ্গিক এবং বাঙালি জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রথম যে পত্রিকাটি দৃষ্টি আকর্ষণ করল, তা হল এক্ষণ পত্রিকা। সঙ্গে এলেন সত্যজিৎ রায়। সৌমিত্র নির্মাল্যবাবুকে সত্যজিৎ রায়ের কাছে নিয়ে যান। প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে সত্যজিৎ এসেছিলেন ঠিকই, কিন্তু পরে এক্ষণ পত্রিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। কুরোসাওয়ার লেখা এক্ষণের জন্য জোগাড় করে দেন সত্যজিৎ। এই ত্রয়ীর জন্য বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি জগৎ সাংঘাতিক ঋণী হয়ে আছে। সত্যজিতের সিনেমার উপরে বেশ কিছু স্ক্রিপ্ট আমরা বাংলা ভাষায় এক্ষণ পত্রিকার পাতায় দেখেছি। বিখ্যাত ‘অপুর সংসার’ নামের সিনেমাটি কিন্তু আমরা তখনই দেখে ফেলেছি। এবং তখনই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নামটি আমাদের কাছে একজন ম্যাটিনি আইডল। এই এক্ষণ প্রসঙ্গেই একটা কথা বলে নিই। এক্ষণ তখন দুমাসে একটা করে বেরুত। বিখ্যাত মহিলাদের জীবনী যেমন কানন দেবীর জীবনী ছাপা হল। কলকাতার ইতিহাসের উপর বেশ কিছু ভালো লেখা ছাপা হল। কমলকুমার মজুমদার, বিনয় ঘোষ, রাধারমণ মিত্র ইত্যাদি লেখককে আমরা পেয়েছি। কার্ল মার্ক্সের উপরে একটি বিশেষ সংখ্যা বেরিয়েছিল। নির্মাল্য-সৌমিত্রের সম্পাদনায় আরও দুটি বিশেষ সংখ্যার কথা উল্লেখ করা যায়- দান্তে সম্পর্কিত এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডায়রি নিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যা। একটা সময়ে ওঁরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। তারপর থেকে এক্ষণ বছরে একটা করে বেরুত। পরে প্রিয় বন্ধু এবং এক্ষণ-এর সহ-সম্পাদক নির্মাল্য আচার্যের প্রয়াত হবার পর অনুষ্টুপ-এ ‘এক্ষণ ও নির্মাল্য আচার্য’ শীর্ষক ক্রোড়পত্রে সৌমিত্রের একটি বড় সাক্ষাৎকার ছিল। মনে আছে আমার বন্ধু পল কক্স নামে এক ডাচ পরিচালকের ছবিতে সৌমিত্রর অভিনয়ের কথা ছিল, কিন্তু তখন ওঁর ক্যান্সার এতটাই বাড়াবাড়ি হয়েছিল, যে তিনি ওখানে অভিনয় করতে পারেননি। গ্লোবালি সৌমিত্রবাবুর অভিনয় থেকে দর্শক বঞ্চিত হল। গত বছর পয়লা বৈশাখে ওঁর কবিতার বইয়ের প্রকাশের পরে উনি একদিন আমায় ডেকেছিলেন। সেখানে অনেকক্ষণ ওঁর সঙ্গে আমার কথা হয়। আজকের অন্ধকার সময় নিয়ে অনেকগুলো কথা তিনি বলেছিলেন। সাময়িক অভিমান থাকা সত্ত্বেও নির্মাল্য আচার্যের উপর তাঁর শ্রদ্ধা এবং বন্ধুপ্রীতির কথা শুনেছিলাম তাঁর মুখে। মজার কথা হল, ষাটের দশকের শেষ দিক থেকে আশির দশক পর্যন্ত অনুষ্টুপ ও এক্ষণ দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী পত্রিকা। অথচ অনুষ্টুপের সঙ্গে ওঁর এবং ওঁর পরিবারের খুবই হৃদ্যতা ছিল।

আমার বিচারে সৌমিত্র ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেতা। শুধু তাই নয়, তিনি একজন সুশিক্ষিত অভিনেতা যিনি এক নতুন চিন্তাভাবনা, নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার করেছেন অভিনয়ের ক্ষেত্রে। সিনেমা অ্যাকটিং কাকে বলে সেটা বুঝতে গেলে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়কে ভালোভাবে দেখতে হয়। এবং মজার কথা হচ্ছে, তিনি যে শুধু সত্যজিৎ রায়ের ছবিতেই অভিনয় করেছেন তা নয়, সত্যজিৎ রায় তাঁকে দিয়ে অনেক এক্সপেরিমেন্ট করেছেন। আমরা ‘চারুলতা’র কথা তো জানি। আবার তাঁকে দিয়ে ফেলুদার সিরিজও করলেন। এখন ফেলুদার অনেক অনুকরণ হচ্ছে, কিন্তু সৌমিত্রর ফেলুদা এখনও অনুকরণীয় বলে মনে হয় না আমার, অননুকরণীয় অভিনয় করেছেন সৌমিত্র ফেলুদা সিরিজে। এছাড়াও, তখন আমার দেখি যে তখন আমাদের দুজন ছিলেন, দুজন আমাদের একমাত্র বড় অভিনেতা, তাঁরা হলেন উত্তমকুমার এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তার মধ্যে সৌমিত্র আমরা ধরতাম ইন্টেলেকচুয়াল হিরো হিসেবে। যেমন ‘ঝিন্দের বন্দী’। এখানে উত্তর ডাবল রোল করলেও, এখানে সৌমিত্র ময়ূরবাহন চরিত্রটিতে যে প্রতিভা দেখিয়েছেন, তার কোনও তুলনা হয় না। এবং সেই দিক থেকে সাধারণ কমার্শিয়াল ফিল্মে বাণিজ্যিক ছবিতেও সৌমিত্রর অবদান অনস্বীকার্য। এই সেদিনও, এই বৃদ্ধ বয়সে তিনি ‘পোস্ত’ ছবিটিতে যেভাবে অভিনয় করে দেখালেন, তারও কি কোনও তুলনা হয়? আবার ২০১৬ সালে থিয়েটারে তিনি তাঁর নাতি এবং তাঁর মেয়ের সঙ্গে যে অভিনয় করলেন তারও কোনও তুলনা হয় না। সেই ‘অপুর সংসার’ থেকে এতগুলো বছর পেরিয়ে গেল আমরা সৌমিত্র পেলাম। আরেকটি বড় কথা, তিনি কিন্তু নাটক লিখেছেন, অনেকগুলি নাটক লিখেছেন। কবি হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এইরকম একজন মানুষ যখন চলে যান, তখন মনে হয় সত্যি সত্যিই সংস্কৃতির সূর্য যেন অস্ত গেল। সৌমিত্রকে হারানো যে কত বড় ক্ষতি তা বলার নয়। তবু একটা কথা মনে হয়, ভালো মন্দ সব মিলিয়েই একজন মানুষ। যেমন, এই কোভিডের সময় যখন তিনি বাইরে বেরুচ্ছেন, অভিনয় করছেন, তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি কেন ঘরের বাইরে বেরোচ্ছেন, তখন তাঁর উত্তর ছিল, ‘কী করব, পেট তো চালাতে হবে।’ আসলে তিনি ঘরে থাকার মানুষ ছিলেনও না। ‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া’, রবীন্দ্রনাথের এই কথাটা সৌমিত্রর ক্ষেত্রে বড় খাটে। এই মানুষটা একমাসের উপরে শয্যাশায়ী থেকে আজ চলে গেলেন। দীপাবলির আলোর মধ্যে বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি জগতের এত বড় এক আলো নিভে গেল। গত দুবছরে আমরা বাংলা সংস্কৃতি জগতের অনেক বড় বড় মানুষকে আমরা হারিয়েছি। অরুণ সেন, মৃণাল সেন, দেবেশ রায় চলে গেছেন। আমরা এভাবে ক্রমশ হারাচ্ছি কেবল হারাচ্ছিই। এবং এখন এমন একজন মানুষকে হারালাম, যিনি রাজনৈতিকভাবে, সাংস্কৃতিকভাবে আমাদের আলো দেখাতে পারতেন এবং আলো দেখিয়েওছেন। তাঁকে হারিয়ে আমরা এত বিমর্ষ যে ভাষায় প্রকাশ করা যাচ্ছে না, আর প্রকাশ করে লাভই বা কী? আমরা তো ক্রমশ আলো থেকে অন্ধকারের দিকে যাচ্ছি। সময় হয়ত একদিন বদলাবে। কিন্তু এই সময় সৌমিত্রর চলে যাওয়াটা খুব খারাপ একটা স্মৃতি হয়ে থাকবে।

সৌমিত্রর জীবনে রাজনীতি ঘুরেফিরে এসেছে। তিনি প্রথম জীবনে সরাসরি রাজনীতি করতেন না। কিন্তু পরে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সমর্থনে যাদবপুরে প্রাক-নির্বাচনী প্রচারে নেমেছিলেন। মনে আছে সত্তরের দশকে যখন উত্তমকুমার একবার প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে সরোজ দত্তের হত্যার ঘটনা দেখে ফেলেন এবং তা সৌমিত্রকে বলেন, তখন সৌমিত্রর মাধ্যমেই তা অনেকের কাছে ছড়িয়ে পড়ে। পড়ে ব্রাত্য বসুর ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটকেও তার ছাপ দেখা যায়। ফলে সত্তর ও নকশাল আন্দোলন কিছুটা হলেও তাঁর মধ্যে প্রভাব ফেলেছিল। রাজনীতির মধ্যে প্রভাব ফেলেছিল। এখন, এই সময়ে দাঁড়িয়ে, তিনি কিন্তু শাসক দলকে খুশি করতে রাজনীতি করেননি। নিজের বিশ্বাস থেকেই পক্ষাবলম্বন করেছেন। স্রোতে ভাসেননি। তিনি তাঁর কর্মজীবনে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও আমৃত্যু একজন বামমনষ্ক মানুষ ছিলেন। তাঁকে এক আদর্শ মানুষ বলেই আমি মনে করি। সেই জন্যেই আমি বলেছি, সৌমিত্র একজন ইন্টেলেকচুয়াল হিরো। তাই সব মিলিয়ে শিক্ষিত এবং প্রগতিশীল এক মানুষ আজ চলে গেলেন।

Facebook Notice for EU! You need to login to view and post FB Comments!
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3848 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...