তিনটি অণুগল্প

সুবর্ণা রায়

 

চোখ

ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল পার্থ।

“মামা! মামা! কী হয়েছে আপনার?”

মামা অর্থাৎ জটিলেশ্বর ভট্টাচার্য চোখ বন্ধ করে সাদা ধবধবে বিছানায় শুয়ে। ভাগ্নের ডাকে মুখে কিঞ্চিৎ হাসির আভাস দেখা গেল। বাড়ির সবচেয়ে বড় ঘরটায় এইমুহূর্তে গোটাকতক জীবনদায়ী মেশিন প্রাণপণে আওয়াজ দিয়ে অস্তিত্ব জাহির করলেও, জটিলেশ্বরের আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেছে। শরীর স্থির। শুধু চোখ দুটো অন্ধকার লাইটহাউসের জোরালো সার্চলাইটের মত চতুর্দিক ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ঘরে মজুত আরও ছয়জন। জটিলেশ্বরের স্ত্রী, দুই ছেলে, দুই বৌ। কড়া নজরে পার্থকে মেপে যাচ্ছে চারজন। জটিলেশ্বরের স্ত্রী এক নাগাড়ে বিলাপ করে যাচ্ছেন।

ছয়নম্বর হল জটিলেশ্বরের পার্সিয়ান বিড়াল, ছুমকি। ভালো নাম ছম্মকছল্লো। সে আপাতত জটিলেশ্বরের পাশে দুই থাবায় মুখ রেখে উদাস চোখে গ্লুকোজের ফোঁটা পড়া দেখছে।

অনাথ পার্থকে ছোটবেলা থেকে মানুষ করেছেন জটিলেশ্বর। সোনা আর রত্নের পারিবারিক ব্যবসায় লাগাবেন ভেবেছিলেন। ছেলেটা খুব বুদ্ধিমান। তাঁর নিজের দুটোর মতো ফুর্তিবাজ, অকর্মণ্য নয়। কিন্তু তাকে বাকিরা কেউ পছন্দ করত না। পার্থ হাড়ে হাড়ে টের পেত। লেখাপড়া শেষে ভালো চাকরি জোগাড় করে মাত্র ছয় মাস হল তাই চলে গেছে দিল্লি।

“এলেন আপদ!” বড়বৌ মুখ ব্যাঁকাল। ছেলেরা আগুনঝরা দৃষ্টিতে পুড়িয়ে দিল।

পার্থ তখন মামার চোখের ভাষা পড়তে ব্যস্ত।

“হ্যাঁ, বলুন। পেন? লিখব?”

জটিলেশ্বরের দৃষ্টি পার্থর পকেটে।

“না? লেখা হয়ে গেছে? কী? উইল?”

কান খাড়া ছিল, চোখ অতিসজাগ। এবার আরও কাছে ঘেঁষে এল জটিলেশ্বরের সংসার। উইল আবার কবে লেখা হল! তারা তো কিছুই জানে না!

আরও কিছু প্রশ্নোত্তরের পর যা বোঝা গেল, উইল আছে জটলেশ্বরের পড়ার ঘরের কোথাও। ঠিক কোথায় এটা উদ্ধার হল না।

দুদ্দাড় করে ছুটল ছেলেরা, বউরা, মায় জটিলেশ্বরের স্ত্রীও! বাড়ির আনাচকানাচ সবার চেয়ে তিনিই বেশি জানেন কি না!

জটিলেশ্বরের নিশ্বাস ক্ষীণ হয়ে আসছে। তাঁর ডানহাতের মুঠোটা শক্ত করে ধরা পার্থর হাতে। মাথা নীচু করে বসে চোখের জল আটকাচ্ছিল। বড্ড ঋণী সে মামার কাছে।

“ঘ্র্যাঁওওওও”

চমকে তাকাল পার্থ। ছুমকি ওইরকম বাঘের মতই ডাকে। নারীসুলভ কোনও হাবভাবই তার নেই।

ছুমকির ধমকে বুঝল পার্থ, বৃদ্ধের আরও কিছু বলার আছে। তিনি আকুল হয়ে তার দিকেই তাকিয়ে।

“হ্যাঁ, মামা। বলুন।”

জটিলেশ্বর দুবার চোখ পিটপিট করে ছুমকির দিকে তাকালেন। অনেক কষ্ট করে ঠোঁট ফাঁক করে বললেন “হ্যালো”! আবার চোখ পিটপিট।

তারপর চোখ বন্ধ করলেন। আর খুললেন না।

“মামা!” আর্তনাদ করে উঠল ভাগ্নে। ছুটে এল সবাই। শোকে ভেঙে পড়ল গোটা বাড়িটা।

তিনদিনে কাজ হয়ে গেল। মামার শেষের কথা পার্থর বোঝা হল না। ছোট ব্যাগটা নিয়ে পরেরদিন ভোরে রওনা হবে, ঘরের দরজার বাইরে পা দিতে সামনে ছুমকিকে দেখতে পেল পার্থ।

“ঘ্র্যাঁওওওও”

ছুমকি চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে। তারপর পরিষ্কার দুবার চোখ পিটপিট।

সেদিন জটিলেশ্বরও! আর আজ ছুমকি?

থমকে দাঁড়াল পার্থ। ছুমকি হাঁটা দিয়েছে। কয়েক পা গিয়ে পিছন ফিরে তাকাচ্ছে। মোটা লেজটা মাটিতে আছড়াচ্ছে।

কিছু যেন আন্দাজ করতে পারছে পার্থ। চোখ পিটপিট। চোখ! বিড়ালের চোখ! ক্যাটস আই! তাই কি? শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শিহরণ উঠল পার্থর।

“চল্‌!”

সবে সকাল হচ্ছে। বাগানের গাছগুলোতে পাখির ডাক ছাড়া আর সাড়াশব্দ নেই কোথাও।

ছুমকি সিঁড়ি বেয়ে উঠল তিনতলায়। পিছনে পার্থ। ঠাকুরঘর। রাধাগোবিন্দর হাসিহাসিমুখ। সেখানে দাঁড়িয়ে ছুমকি বলল “ঘ্র্যাঁওওওও”।

মূর্তি সরিয়ে আসনের তলা থেকে ছোট্ট কাঠের বাক্সটা খুঁজে বের করতে খানিক সময় লেগে গেল পার্থর। বাক্সটার গায়ে নাম্বারলক।

পার্থর গলা শুকিয়ে কাঠ। উত্তেজনায়। কিন্তু, লকের কোড? সেটা তো জানা নেই!

বিদ্যুৎ চমকের মতো মনে পড়ল মামার শেষ কথা। হ্যালো।

ফোন নম্বর কি? নাম্বারের ঘর চারটে। শুরুর চারটে নাম্বার চেষ্টা করল। হল না। শেষের চারটে। হল না। মাঝের চারটে দুবার চেষ্টা করতে হালকা ‘ক্লিক’।

হৃদপিণ্ড গলায় আটকে পার্থর। কম করে হলেও পঞ্চাশটা ক্রিসোবেরিল। হলুদ-সবুজ রং। সবচেয়ে ভালো ধরনের ক্যাটস আই পাথর! যার এক ক্যারেট নাহলেও আশি হাজার টাকা দাম। ছোটবড় পাথর মিলিয়ে টাকার অঙ্কটা ভেবে পার্থর মাথা ঘুরে গেল।

কিন্তু সে ভেবে পেল না, এই বাক্স কি তার জন্য, নাকি দিয়ে দেবে ভাইদের?

প্রশ্নবোধক চোখে ছুমকির দিকে তাকাল। ছুমকি তার গা ঘেঁষে এল। মুখ তুলে তাকাল। কঠোর ভাবটা নেই। এই ছুমকি মোলায়েম তুলোর বল। সবুজ চোখ দুবার পিটপিট করে প্রথমবার লাজুক হাসল সে, “ম্যাও!”

 

অনুপ্রেরণা

ভোর চারটে। প্রফেসর দাস স্পিড বাড়ালেন। টকাটক টকাটক। কিবোর্ডে ঝড়। বাইরে আকাশ একটু একটু করে ফর্সা হচ্ছে। টের পান প্রফেসর। এই টের পাওয়াটাই ওনার টিআরপি। সব টের পেয়ে যান, দেখার দরকার পড়ে না।

লেখালেখির কাজ উনি রাতেই করেন। জানলা দরজা বন্ধ করে। সন্তর্পণে। এমনকি স্ত্রীকে পর্যন্ত আগে ঘুমোতে পাঠিয়ে দেন। কাউকে বিশ্বাস নেই!

এসির একটা ঘ্যানঘ্যানে আওয়াজ ছাড়া আর শব্দ নেই। অথচ মাঝেমাঝেই হালকা ঠুকঠুক করে শব্দ হচ্ছে। দোতলার ফ্ল্যাট ওনার। ওপরে তিনতলার ঘরে কেউ কিছু করছে হয়ত।

কিন্তু এত ভোরে তো কেউ ওঠে না! প্রফেসর একাধারে চমকিত এবং বিস্মিত এবং খানিক ভীত হলেন। কান পেতে শুনলেন। না, ওপরে তো নয়! বসার ঘর থেকে আসছে আওয়াজটা। একমাত্র ছেলে বোর্ডিং-এ পড়ে। স্ত্রী এ ঘরেই বিছানায়। এছাড়া আর কেউ নেই ফ্ল্যাটে।

পা টিপে টিপে নিঃশব্দে দরজা খুলে বসার ঘরে উঁকি দিয়ে প্রফেসরের শিরদাঁড়ায় শিহরণ খেলে গেল।

একজন মাঝবয়েসি বিদেশি ভদ্রলোক। নিখুঁত স্যুট-টাই পরা। ব্যাকব্রাশ করা অল্প চুল। পায়ের ওপর পা তুলে সোফায় রাজকীয়ভাবে বসে। মুখে পাইপ। তামাকের দামী গন্ধে ঘরটা ম ম করছে। প্রফেসর বুঝলেন ওই পাইপটাই ঠোকা হচ্ছিল। তারই আওয়াজ পেয়েছেন।

“লেখা হল প্রফেসর?” জলদগম্ভীর কঠিন আওয়াজে ভিরমি খাবার জোগাড়।
“আজ্ঞে, চলছে … স্যর!” ইতস্তত করে স্যরই বললেন প্রফেসর। ভীষণ চেনা চেনা লাগছে। অথচ মনে করতে পারছেন না।
“এ তো চলতে পারে না প্রফেসর। তাই আমাকে আসতেই হল। আরও অনেকেই আসতে চাইছিলেন। তাঁরা সবাই এলে তোমার বেশ অসুবিধা হত।”

এত অবধি বলে থামলেন ভদ্রলোক। সরাসরি তাকালেন। তারপর ধীরে সুস্থে উঠে এগিয়ে এলেন প্রফেসরের দিকে।

ভদ্রলোক এক পা এগিয়ে আসছেন, প্রফেসর এক পা পিছিয়ে যাচ্ছেন। উনি এগোচ্ছেন, ইনি পিছোচ্ছেন।

প্রফেসরের পিঠ ঠেকে গেল শেলফে, আর কাচের ফুলদানিটা সশব্দে আছড়ে পড়ল মার্বেলের মেঝেতে। আর ধাঁ করে মনে পড়ে গেল, ইনি কে।

ভদ্রলোকের তামাকসুবাসিত বরফের মতো নিঃশ্বাস তখন প্রফেসরের মুখের ওপর পড়ছে। ভীষণ ঠান্ডা লেগে কাঁপুনি ধরে যাচ্ছে। প্রফেসর দুই হাত জোর করে প্রায় কেঁদে ফেললেন, “এইবার ছেড়ে দিন স্যর, আর কখনও হবে না!”

ভদ্রলোক গলা টিপে ধরেছেন, প্রফেসরের দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গোঙানির আওয়াজ হচ্ছে শুধু।

 

“কী হল? এই যে! আরে, শুনছ? গোঙাচ্ছ কেন?”

প্রফেসরের স্ত্রী দুই হাতে প্রাণপণে ঝাঁকাচ্ছেন তাঁকে। হার্ট অ্যাটাক হল কি না কে জানে!

প্রফেসর অতি কষ্টে চোখ মেলে কোনরকমে বললেন, “ঠিক আছি।”

কিবোর্ডের ওপর মাথা দিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। অনেকগুলো এস পড়ে গেছে লাইন দিয়ে।

এসএসএসএসএসএসএসএস…

ধড়ফড় করে উঠে বসলেন প্রফেসর। স্ক্রিনে তখনও খোলা একটা জানালায় “দ্য লেটার”। পাশের জানালায় তাঁর নিজের লেখা। অনুপ্রাণিত আধখানা গল্প।

আর এক জানালায় সেই ভদ্রলোকের স্মিত হাসি পাইপ মুখে। সমারসেট মম! “স্বপ্নই”, বলে প্রফেসর একটু দম নিয়েছেন কি নেননি, স্ত্রীর উচ্চস্বর কানে এল, “ফুলদানিটা কী করে ভাঙল?”

 

মলিন

মলিন। কে যে রেখেছিল এমন নাম! হয়ত গায়ের রঙ চাপা বলে। নাও হতে পারে। মলিন অনাথ। আধময়লা জামাকাপড় পরে চায়ের দোকানে ফরমাশ খাটে। সেইজন্যও হতে পারে।

কেদার হাঁক দেয়, “মলিইন্যা! তিন নম্বর দ্যাখ!”

মলিন ছুটে গিয়ে কাঁধ থেকে কাপড়ের টুকরোটা দিয়ে টেবিল মুছে দেয় যত্ন করে। অপেক্ষা করে।

“অ্যাই, তোর নাম মলিনা?” খুক খুক করে হাসে যুবতী, যুবক।

এবার সত্যিই মুখ আর নাম এক হয়ে যায়।

“না, ওর নাম মলিন।” পরানকাকা। পিঠে হাত রাখে। আলতো চাপ। মলিনের গা শক্ত হয়ে যায়। সামান্য সরে যায়। ঘুরে তাকায় চোখে চোখ রেখে। আগুন চোখ। পরানকাকা কথা বাড়ায় না। কেটে পড়ে।

 

রাতে ধোওয়া-মোছা হয়ে গেলে দোকানেই বিছানা পেতে শুয়ে পড়ে তিনজন। প্যান্টের ওপর পরানের হাত ঘোরাফেরা করত। মলিন কেদারকে বলে দিয়েছিল। সেই থেকে কেদার মাঝে শোয়।

“মামা, কাকাকে তুমি বলবে না কিছু?” মলিন ফিসফিস করে কেদারের কানে।

কেদার বুঝদার ছেলে। পরানের দোকান দাঁড় করিয়েছে। খড়কুটো খুঁজে পেয়েছে, ছেড়ে দেবে?

“বড় হচ্ছিস মলিন। পনেরো হয়ে গেল। এখন নিজেরটা নিজে বোঝ। তোর লড়াইটা তোর। বুঝলি?”

লড়াইটড়াই বোঝে না মলিন। এই যে কেদার ওর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, ভারী ভালো লাগছে। পিঠের মাঝখানে ব্যথাটা গুমরে গুমরে উঠলেও মলিন চোখ বুজে নরম বিছানায় ডুবে যাচ্ছে। পালকের মতো হালকা লাগছে নিজেকে। গোলাপী আলোয় ঠান্ডার আমেজ। কি সুন্দর সুর ভেসে আসছে একটা। গান গাইছে কেউ। অনেক দূরে। সুরটা চেনা। গলাটা আরও বেশি চেনা। মা!

 

ধড়ফড় করে উঠে বসে মলিন। স্বপ্নটা আগেও দেখেছে কয়েকবার। পিঠটা টনটন করছে ব্যথায়। আজ পূর্ণিমা বলে বোধহয়।

 

“রাত্তিরে নিয়ে যাব এক জায়গায়। এখন ওঠ। পড়তে বোস।” কেদার উঠে যায়। টিনের চালের ফুটো দিয়ে ছোট ছোট গোল আলো খেলা করে গায়ে। নরম হাতে আলোগুলো আঁজলা করে মুখে মেখে নেয় মলিন।

মাঝেমাঝে স্কুলে যায় মলিন। পরীক্ষার সময়গুলো। ছেলেগুলো বিরক্ত করে। মলিন মিশতে পারে না। ওদের মতো করে চলতে পারে না। ওরা হাসাহাসি করে। রানি শুধু বন্ধু ওর। একসাথে পড়ে। দোকানের দুটো ঘর পরেই ওদের খোলি।

 

রাত এগারোটা হবে এখন। টিলার ওপরে পাশাপাশি বসে দুজন। মফস্বলের আলো পিছনে রেখে আবছায়া মায়াময় এখানে। আকাশে গোল চাঁদ। আর অজস্র তারা। যেদিকে চোখ যায়, কুচি কুচি হীরে, আর হীরে। এমনটা আগে দেখেনি কখনো মলিন। ওর মুখ উজ্জ্বল জ্যোৎস্নার মতো লাগে কেদারের।

“যা, এবার উড়ে যা!” কেদার পিঠের মাঝখানে হাত রাখে। মলিনের সারা শরীর জুড়ে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। একটা গোলার মতো আগুন পিঠ থেকে ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে। সেই মুহূর্তে পালকের মতো হালকা হয়ে যায় মলিন। মাটি থেকে শূন্যে ওঠে একটু একটু করে। একটা সুর ভেসে আসছে। চেনা সুর। আরও অনেকটা উঠে যায় মলিন।

“পরী! আমি জানতাম তুই পরীই!” কেদারের চোখ ঝাপসা। শিরদাঁড়া সোজা। “ওড়! আরও উঁচুতে যা! যা!”

মলিন ডানা ঝাপটায়। আরও একটা ম্যাজিক চাই ওর। তিননম্বর চোখ। রানি বলেছিল, “তোর মুখটা না একদম মা দুর্গার মতো!”

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2947 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...