ছায়াপাখি — খণ্ড ১, পর্ব ৫

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

পরিযায়ী পাখি

তখনও স্বপ্ন দেখার দিন।

হলুদ খামের মধ্যে চিঠিটা আবার সযত্নে ভাঁজ করে ঢুকিয়ে রাখার আগে অন্তত বার পাঁচেক পড়েছে হীরক। একদিনে তো কিছু হয়নি। যাওয়ার কথা গত একবছর ধরে এগোচ্ছে। প্রথমে যেটা ছিল শুধু দেখি না কী হয়, একসময় সেটাই ভালো যদি পেয়ে যাই হয়ে গেছিল। নিজের অজান্তে। হিন্দমোটরের গাড়ির কারখানায় দিনের পর দিন দম আটকে আসাটাও একটা কারণ ছিল। বুঝতে পারছিল, ভালো লাগছে না। অন্য কিছু করতে চায়, অন্যভাবে করতে চায়। আর সেই অন্য কিছু করার সমস্ত আশাটাও শেষমেশ আটকে গেছিল কবে এই হলুদ চিঠির আমন্ত্রণ হাতে এসে পৌঁছাবে সেই অপেক্ষায়। কিন্তু যখন সত্যি সত্যি হাতে এসে গেল, আনন্দ অথচ অনিশ্চয়তার অদ্ভুত টানাপোড়েনে অস্থির হচ্ছিল হীরকের মন। বারবার শব্দ ধরে ধরে পড়েও যেন বিশ্বাস করে উঠতে পারছিল না।

অ্যামেরিকা যাবে এরকম কোনও ভাবনা ওর মনে কোনওদিন ছিল না। আসলে সেরকমভাবে ভাবেওনি কোনওদিন। বাবার রিটায়ারমেন্টের আর কটা বছর! স্টিলপ্ল্যান্টে চাকরি করে কতই বা জমিয়েছে। শরীর খারাপ হয়ে গিয়ে ওভারটাইমও করতে পারছিল না বেশি। যা টাকা ছিল তাদের পড়াশোনায় আর রূপার বিয়েতে ফুড়ুত। চিনুটা বড় হচ্ছে, ও সেটল করার আগেই বাবা চাকরি থেকে অবসর নেবে। দাদা হিসেবে হীরকের একটা দায়িত্ব আছে। তাই বন্ধুবান্ধবদের অনেককে বাইরে পড়তে যেতে দেখে মনে ইচ্ছে জাগলেও, সেই ভাবনাটাকে কোনদিন প্রশ্রয় দেয়নি। যা হয়েছে সেটা হঠাৎ।

ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে অনিকেত চাকরিতে না ঢুকে যাদবপুরেই মাস্টার্সে করছিল। যে সব সপ্তাহে দুর্গাপুরে ফিরত না, হীরক চলে আসত ওর সঙ্গে আড্ডা মারতে। অনিকেত হস্টেলেই থাকত। লাঞ্চের পর হুজুগ হল চল সেই আগেকার দিনের মত একটা সিনেমা দেখি। এসপ্ল্যানেড। অনিকেতের অ্যাসাইনমেন্ট ছিল, প্রথমে কিন্তু কিন্তু করছিল। হীরকের ওসব বালাই নেই। শুধু সপ্তাহান্তের নোংরা কাপড়জামা থুপানো ছাড়া। বেরোনোর সময় সাবানজলে গুলে বেরিয়েছিল। সে না হয় একদিন বেশি ভিজবে। গন্ধ বেরোবে, কিন্তু সে অভ্যাস আছে।

সব দরকারি কাজকে এইভাবে নাকচ করে দুজনে হইহই করে ৮বি বাসে চেপে বসেছিল। কথায় কথায় অনিকেত বলল একদিন অ্যামেরিকান কনস্যুলেটে যেতে হবে রে, খোঁজখবর করতে।

বলিস কী? তুইও? হীরকের অবাক হবার কারণ ছিল। অনিকেত চাইলে আগেও যেতে পারত। বাড়িতে কোনও চিন্তা নেই, কিন্তু গোঁ ছিল, এদেশে বসেই রিসার্চ করব।

না রে হবে না। শুধু বসে বসে ছিঁড়ছি। ভালো কিছু করতে হলে— মাথা নাড়ল অনিকেত। দেশপ্রেম দেখাতে গিয়ে নিজের পিছনে গোঁজার কোনও মানে নেই।

কী যে মাথায় হল হীরকের। বলেছিল, তাহলে আর দেরি কেন গুরু? চল না এখনই যাই।

একগাদা প্যামফ্লেট নিয়ে যখন বেরোল তখন সিনেমার শোয়ের টাইম পেরিয়ে গেছে। সন্ধ্যাবেলা ট্রেনে করে হিন্দমোটর ফিরতে ফিরতে ভিড়ের ট্রেন, হাওড়া স্টেশনের আবর্জনা, ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার শ্রমিক বিক্ষোভের দেওয়াল লিখন, নিজের চাকরির অন্ধকার ভবিষ্যৎ সব কিছুর সঙ্গে কনস্যুলেটের শীততাপনিয়ন্ত্রিত ঘরের সুচারু পরিবেশের তুলনাটা বারবার মনে ঘুরে ফিরে আসছিল। বাড়ি থেকে দূরে থাকা। তেমন কোনও বন্ধুবান্ধবও ছিল না সন্ধ্যাগুলোকে ফেলে ছড়িয়ে নষ্ট করার জন্য। তাই নিজেকে খুব তাড়াতাড়ি জিআরইর জন্য তৈরি করে ফেলতে পেরেছিল। বাড়িতে জানায়নি, নিজের হাতে যেটুকু টাকা ছিল সেটা দিয়েই পরীক্ষার খরচ, বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে চিঠিপত্র পাঠানো চালিয়ে যেতে পেরেছে। বাবা মায়ের সঙ্গে এ বিষয়ে কথাই তোলেনি। একদম কোনও আভাসও নয়। ভয় ছিল শুনেই মার সংসারক্লান্ত চোখে যদি বাধার আবেদন দেখতে পায়।

আজ একেবারে হাতে সেই কাগজ। ফ্রি টিউশন, স্টুডেন্ট অ্যাসিস্যান্টশিপের জন্য টাকাও দেবে। এতটা আশাও করেনি। আবার এরকম কিছু না পেলে যে ওর কোনওদিন বাইরে পড়তে যাওয়া হতে পারে না সেটাও জানা ছিল। প্যাসেজ মানি কিভাবে জোগাড় হবে সেটাই এখন যা ভাবনা। ব্যাঙ্কে টাকা নেই মোটেই। চাকরিতে দু বছরও হয়নি এখনও। কী বা মাইনে পায়? কিন্তু জানে এই টাকার জোগাড় হয়ে যাবে। আর কিছু না হোক যেসব বন্ধুরা চাকরি করে তাদের কারও কাছ থেকেই নেবে না হয়। আসল কথা হল বাবা মাকে মানাবে কী করে। এক ছেলের চাকরি হয়ে গেছে, মেয়ের বিয়েও। ছোট ছেলেকে নিয়ে চিন্তা থাকলেও, কবে বড়ছেলের বিয়ে দিয়ে নাতিনাতনি নিয়ে অবসর জীবনযাপন করবে ওদের মাথায় এখন সেটাই ঘুরছে। অন্তত হীরকের সেটাই মনে হয়। এই অবস্থায় সে দূরে চলে যাবে, কীভাবে নেবে সেই খবরটা? চিন্তা করেই উদগ্রীব লাগছিল। অনিকেতের সঙ্গে কথা হল। ও বলল, এখনই ডিসাইড করিস না। অন্য অ্যাপ্লিকেশনের কী উত্তর আসে দ্যাখ। অনিকেতের জন্য একটু কষ্ট হচ্ছিল হীরকের। ও বেচারা পিএইচডি করবে ভেবেছিল, কিন্তু যেতে পারছে না। বাবার ক্যান্সার ধরা পড়েছে। মাস্টার্স করে দেশেই চাকরি নেবে একটা, টাকার দরকার পড়ছে খুব।

হীরক ভাবল, যাচ্ছে সেটা এখন নিশ্চিত। তাই বাবা মাকে জানানো দরকার। শনিবারের জন্য অপেক্ষা করতে মন চাইল না। দুদিনের ছুটি দরখাস্ত করে ট্রেনে চেপে বসল।

কী জানে যদি বাবা মায়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দুর্বল হয়ে যায়! তাই বাড়ি যাওয়ার আগেই চিঠি পাঠিয়ে দিল ইউনিভার্সিটিতে। হ্যাঁ, আমি আসছি, গ্রহণ করছি আপনাদের প্রস্তাবটা। পরে এটা নিয়ে অনেক ভেবেছে  হীরক। এটা কি স্বার্থপরতা ছিল তার দিক থেকে? যে বাবা মা তাকে মানুষ করল, জীবনের জন্য যোগ্য করে তুলল— তাদের মতামতকে অগ্রাহ্য করতে হল একবার আলোচনা না করেই? কেন মনে হল তার ভালো নিয়ে ওদের আর কোনও চিন্তা নেই, পরোয়া নেই!

এটা আরও বেশি করে তাকে দগ্ধ করল যখন বিমল খবরটা শুনেই উল্লসিত হয়ে উঠল। বড় ভালো করেছিস হীরু। এত ভালো রেজাল্ট করার পর এইভাবে কারখানার অন্ধকারে তোকে পচতে দেখে আমার যে কি কষ্ট হত! সারাদিন শুধু সেই কথাই ভাবতাম। খালি গায়ে লুঙ্গি পড়া বাবার বুকভরা পাকাচুলের আড়ালে তার জন্য এখনও এত চিন্তা জমে রয়েছে? নিজে এতগুলো বছর কারখানার গরম আর অন্ধকারে কাটিয়ে দিল, অথচ ছেলের জন্য সবসময়ে অন্য মহত্তর জীবনের কথা ভেবেছে বিমল। হীরকের লজ্জা হল। শুধু সেই কি নিজের জীবন নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, সারাদিনে এদের কথা কতটাই বা মনে পড়ে!

হীরকের যে চাকরিতে পোষাচ্ছে না সেটা বিমলের জানা ছিল। কিন্তু তার চাইতেও বড় কথা তার প্রিয় চ্যাটার্জিসাহেবকে দেখেছে। একসময়ের উজ্জ্বল ঝকঝকে চেহারার লোকটা চোখের সামনে কেমন ছাপোষা হয়ে গেল। নিজেই বারকয়েক বলেছিল হীরককে, আরও পড়াশোনা করতে। আজকাল স্টাইপেন্ড তো বেশি করে দিচ্ছে। যদিও সেই বলায় অত জোর ছিল না কক্ষনও। তার নিজের ভাঁড়ার যে ফাঁকা।

বিমল খুশি হলেও নীলিমা মনের থেকে অতটা খুশি হতে পারে নি। বিশেষ করে একা ছেলে কীভাবে সব সামলাবে সেটাই তার ভয়। তোর বাবা গেছিল পনেরো দিনের জন্য, তাতেই ভয়ে মরে গেছি হীরু। এখন তুই যাবি এতদূর। কু বলতে এসে পৌঁছাতে পারবি না তো। কে জানে কবে আসবি, হয়তো বছর কেটে যাবে একবার চোখের দেখাও দেখতে পাব না। আমরা বাঁচলাম কি মরলাম তার খবরও পৌঁছাতে পারা যাবে না— বলেই উদ্গত কান্না চেপে নীলিমা রান্নাঘরে আশ্রয় নিল।

হীরু মার দিকে তাকিয়ে কষ্ট পাচ্ছিল। শুধু মার জন্য না, নিজের জন্যও। একসময় কেমন মা অন্ত প্রাণ ছিল তার। এখন মায়ের এই কান্নাটাকেও তার কেবল নিজের পথের বাধা মনে হচ্ছে। সে কি নিষ্ঠুর আত্মসর্বস্ব হয়ে যাচ্ছে? মা, তুমি কেন বুঝতে পারছ না, আমি গেলে তোমাদের সকলের জন্যেই ভালো। ওদেশে অনেক বেশি টাকা পাব। চিনুকে নিয়েও তোমাদের আর কোনও চিন্তা করতে হবে না।

দাদা অ্যামেরিকা যাবে শুনে চিনু একেবারে হইহই। বরং মাকে ধমকাল। উফফ, ড্রামা কোরো না তো মা। কথা বলতে হলে ট্র্যাঙ্ক কল করবে, দাদা টাকা দিয়ে দেবে। চাই কি দাদা অনেকদিন থাকলে তুমিও কোনওদিন চলে গেলে দাদার কাছে।

বিমলও সমর্থন করল। এরকম খুশির দিনে মনখারাপ কোরো না নীলিমা। এদেশে থেকে ওর মত ছেলের জীবন নষ্ট করে কী লাভ বলো দেখি? কি আছে এখানে? বেকারি, গুন্ডামি আর সস্তা রাজনীতি। সবচেয়ে বেশি করাপশান। এখানে পিওন থেকে প্রধানমন্ত্রী, সব ব্যাটা চোর। কাউকে আর বিশ্বাস করা যায় না। ওই দেশে গিয়ে এসবের থেকে বরং বাঁচবে হীরু।

নীলিমা নিজের মতামত কবেই বা জোরের সঙ্গে দেয়। সবার যেটাতে ভালো সেটাই নিজের ভালো বলে চিরজীবন মেনে এসেছে। মুখের মেঘ সরিয়ে বলল, তাহলে রূপাকে খবর দিই। অনন্ত আর রূপা একদিন ঘুরে যাক হীরুটা এই দেশে থাকতে থাকতে।

–আমি এখুনি তো যাচ্ছি না মা। এখনও তো ভিসা অ্যাপ্লিকেশনও করা হয়নি। শুধু ইউনিভার্সিটি থেকে যা জানিয়েছে।
–জায়গাটা কোথায় বললি যেন? হীরক একবার বলেছে। কিন্তু তবু বারবার এটা নিয়ে আলোচনা করতে ভালো লাগছিল বিমলের। কালকে অফিসে গিয়ে ঠিকঠাক করে বলতে হবে চ্যাটার্জিসাহেবকে।
–ডেট্রয়েট, মিশিগান বাবা। ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান।
–দ্যাখ সেও তো গাড়ি বানানোর দেশ। ঠিক তোর হিন্দমোটরের মত।
–তার থেকে অনেক বড় বাবা। সেখানে কি একটা গাড়ির কারখানা? চিনু তার বিদ্যা ফলায়। তাবড় তাবড় মোটর কম্পানির অফিস ওখানে।

বিমল বলল, আচ্ছা প্লেনের ভাড়া কত, সেটা খোঁজ নিয়েছিস?

–নিয়েছি, দেখি কীভাবে জোগাড় করা যায়।

বিমলের কপালে ভাঁজ পড়ল। টিকিট যত তাড়াতাড়ি কাটবি দাম কম লাগবে। দাঁড়া তো, আমি একটু দেখি। তাড়াতাড়ি উঠে জামাকাপড় পড়ে তৈরি হয়ে নিল। শোন, আমি একটু বেরোচ্ছি। মজুমদারদার সঙ্গে একটু কথা বলে আসি। কোওপারেটিভ থেকে লাখখানেক টাকা জোগাড় করতে হবে। শুধু টিকিট নিলে তো হবে না, হাতেও কিছু রেস্ত থাকা চাই।

হীরক বাধা দিল না। এখুনি এখুনি টাকার দরকারও নেই। কিন্তু এখন আটকে কিছু করতে পারার সুখ থেকে বাবাকে বঞ্চিত করতে মন চাইল না।

নীলিমা রান্নাঘর থেকে মুখ বাড়াল। আসছে সপ্তাহে একবার তারকেশ্বর যেতে হবে বুঝেছ? ছুটি নিয়ে রেখো। তুই কী খাবি বল হীরু। বিদেশে গিয়ে কোথায় কী খেতে পাবি, যদিন মায়ের কাছে আছিস দুটো ভালোমন্দ খাইয়ে দিই।

মার কথা শুনে হেসে ফেলল হীরু। এবার দুহাতে জড়িয়ে ধরল নীলিমাকে। অনেকদিন বাদে। মায়ের শরীরে ছড়িয়ে থাকা রান্নাঘর আর সাবানকাচা গন্ধ নিজের মধ্যে শুষে নিচ্ছিল। বললাম তো মা, এখনও অন্তত কয়েক মাস দেরি আছে। আমি কালকেই চলে যাচ্ছি না।

কিন্তু কিছু কিছু দরকারি কাজের জন্য সময় খুব অল্পই হাতে আছে। আগে সব সময়ে ভেবেছে কথাটা খোলসা করে বলে নেওয়া দরকার, অন্তত নিজের দিক থেকে। ভরসা পায়নি। ছোটবেলায় কত একসঙ্গে খেলেছে, এক স্কুলে পড়েছে। কখনও কখনও রেখার চাহনি, দু একটা ছিটকে আসা কথা শুনে মনে হয়েছে হয়তো রেখাও তাকে ভালোবাসে। স্বভাবলাজুক হীরক মুখ ফুটে বলতে পারেনি। কিন্তু গল্পগুজব চলতেই থাকত। কাকিমা হীরককে খুব পছন্দ করতেন। মাঝখান থেকে শানুর সঙ্গে রেখার ঘনিষ্ঠতা হয়ে সবকিছু তোলপাড় হয়ে যায়। যেহেতু রেখাকে নিজে মনের কথা কোনদিন জানায়নি, কিছু বলারও তো ছিল না। তার উপর শানুও যে তার বন্ধু। মনের কথা মনেই চেপে রেখেছিল হীরক। এমন কি শানু আর রেখার মধ্যে সব কিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও। আসলে আগ বাড়িয়ে কিছু বলার ইচ্ছাটা দমে গেছিল। একটা অভিমান। ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে ওঠাবসা, আর কত সহজে রেখা শানুর সঙ্গে…! টেন পাশ করে রেখা কলকাতায় মাসির বাড়ি চলে গেল, কয়েক মাস বাদে বাদে বাড়ি ফিরত। তারপর হীরক নিজেও তো কলকাতায়। দেখা হয়েছে বার কয়েক। রেখা সেইরকমই অন্তরঙ্গ। কিন্তু তার বেশি কিছুতেই গড়াতে দেয়নি। হয় তো এরকম। খুব বন্ধু হলেই তো আর প্রেমিক হয় না। রেখা তাকে কোনদিনও সেভাবে নাই ভেবে থাকতে পারে। অথচ হীরকের জন্য রেখার তো সেই জায়গাটা কোন ছোটবেলা থেকে। কিছুতেই নিজের মনের কথাটা আর বাইরে আনতে পারেনি হীরক। আজ মনে হল, আর সময় নেই। বড় জোর কী হবে? না করে দেবে? বাইরে চলে যাবে, না করে দিলেও এরপর মুখোমুখি দেখা হওয়ার লজ্জাটা তো আর পেতে হবে না। নিজেকে এইসব বলে সাহস জুগিয়ে পায়ে পায়ে কখন পৌঁছে গেল রেখাদের বাড়িতে।

সন্ধ্যা নাবছিল। বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে শুনতে পাচ্ছিল রেখা গলা সাধছে। এই সময়ে কি বেল বাজিয়ে বিরক্ত করা উচিত হবে? বাইরে দাড়িয়ে এইসব সাতপাঁচ ভাবছিল। জানে যে সাহস সঞ্চয় করে আজ এখানে এসে পৌঁছেছে, যদি এবার ফিরে যায় আর হয়তো দেখা হবে না। হঠাত পিছন থেকে লেখা এসে না গেলে হয়তো ফিরেই যেতো হীরক।

টিউশন থেকে ফিরছিল লেখা। বড় হয়ে গেছে, দিদির মত না হলেও লেখাও খুব সুন্দর দেখতে হচ্ছে। রেখার থেকে অনেক বেশি ছটফটে। বাগানের গেট পেরিয়ে দু বিনুনি ঝুলিয়ে বইয়ের ব্যাগ কাঁধে তিড়িং তিড়িং করে ঢুকতে গিয়ে হীরককে দেখেই থমকে গেল। আরে হীরুদা? তুমি কতবছর পরে এলে আমাদের বাড়িতে! দিদি! দিদি! দ্যাখ কে এসেছে।

লেখার গলার আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে ভিতরের গান বন্ধ হয়ে গেল। মাধবীর গলা পাওয়া গেল, চুপ কর লেখি। বাড়িতে ঢুকতেই ঢুকতেই যত বাঁদরামো। দিদি গলা সাধছে আর তুই ওখান থেকে ষাঁড়ের মত চেঁচাচ্ছিস। এইসব বলতে বলতে এসে দরজা খুলেই অবশ্য গলা খাদে নেবে এল। নরম চোখ মেলে মাধবী বলল, ওমা —-হীরু, তুই? কতদিন বাদে তোকে দেখছি বাবা। তোর বাবা মার সঙ্গেও আর একদম দেখা হয় না। সব ভালো তো?

অনেকদিন বাদে এলেও লেখা সেই আগের মতই হাত ধরে টানাটানি করে নিয়ে চলল বসার ঘরে। তুমি একদম ডুমুরের ফুল হয়ে গেছ হীরুদা। আর আমাদের একদম ভুলে গেছ।

–কোন ক্লাসে পড়িস রে তুই? বাচ্চা মেয়ে আর এরকম ঠানদিমার্কা কথা শিখেছিস? হীরু লেখার মাথায় হালকা গাঁট্টা মারতে মেয়েটা জিভ ভেঙিয়ে দিদিকে ডাকতে গেল।
–আর বলিস না হীরু। রেখাটা যেমন শান্ত, লেখিটা তেমনি বাঁদর। ক্লাস নাইনে উঠেছে যেন হাতির পাঁচ পা দেখেছে।

রেখা ঢুকল। বাইশ বছরের পূর্ণ যুবতী। লম্বা ঘেরের স্কার্ট, ছোট হাতা লাল লাল বুটি দেওয়া সাদা জামা, বেড়া বিনুনি কাঁধের সামনে দিয়ে বুকের উপর আলগোছে পড়েছে। পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকে যখন বাঁদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে হীরককে দেখে বলল, আরে তুই? তার মনে হল যেন রাজহংসী গ্রীবা ঘুরিয়ে জগতটাকে দেখছে। যা বলবে মনে করে এসেছিল সব তালগোল পাকিয়ে একাকার। কোনওমতে বলল, কেন আসতে নেই নাকি?

–কোনওদিন তো আসিস না, তাহলে আজকে আসার নিশ্চয় একটা কারণ আছে। বলে মুখ টিপে হাসল রেখা। হীরুটাকে কোণঠাসা করে এখনও খুব মজা পায়।

বুকের মধ্যে যে কি উথালপাথাল হচ্ছিল হীরুর, বুকটা যেন ক্যাম্বিস বলের মত লাফাচ্ছে। আসলে আমি আমেরিকা চলে যাচ্ছি রে। তাই ভাবলাম তোদের সঙ্গে একবার দেখা করে যাই।

–ও, আর কোনওদিন দেখা হবে না বলে আলবিদা বলতে এসেছিস? রেখার শুকনো হাসিটা তীরের মত যেন বিঁধল হীরককে। ওর কি তাহলে কোনরকম অনুভূতি নেই হীরকের জন্য? রাগ পুষে রেখেছে এখনও? বিষাদের ছায়া ঘিরে ধরল হীরকের মনে।
–আরে, কী কাণ্ড! তুই বিদেশ চলে যাচ্ছিস নাকি? লেখি, তোর বাবা তো বাড়ি নেই। ছেলেটাকে একটু মিষ্টিমুখ করাই অন্তত। তুই রসময় থেকে দুটো মিষ্টি নিয়ে আয়। তুই চা খাবি হীরু?

হীরকের সম্মতির অপেক্ষা না করেই মাধবী আঁচলের গিঁট খুলে লেখার হাতে দুটো টাকা গুঁজে রান্নাঘরে পা বাড়াল। বসবি কিন্তু, হুট করে চলে যাস না যেন। আমি একটু চিঁড়েভাজা আর চা করে আনছি। মাধবী রান্নাঘরে। লেখা মিষ্টি আনতে। ঘরে হঠাৎ নেবে আসা নীরবতা।

–বাইরে কেন যাচ্ছিস রে হীরু? পড়তে না চাকরি করতে?
–পড়তে। মিশিগান ইউনিভার্সিটিতে এমএস। হীরক একটু সহজ হওয়ার চেষ্টা করছিল। তুই কী করছিস রে এখন?

নিজের কথাটা আলগোছে এড়িয়ে গেল রেখা। তারপর কি ফিরে আসবি?

–এখনও জানি না রে। চাকরি করার ইচ্ছা আছে।
–একবার গেলে আর কেউ ফিরতে চায় না। তুইও ফিরবি না, আমি ঠিক জানি। রেখার বিষণ্ণতা মাখানো সুরেলা গলায় হীরকের বুকের দ্রিদিম দ্রিদিমটা আবার জেগে উঠল।
–তা কেন। আমি তো আসব, একেবারে কি আর যাব?
–সে নিজের বাড়িতে আসবি। আমাদের কথা একদম ভুলে যাবি। এখনই মনে রাখিস না মোটে।
–সেটাও কি সম্ভব রেখা? মনে আছে তোদের বাড়ি ওঠার সময় ভাড়া থেকে পড়ে গিয়ে মাথা ফাটালি, বাড়িতে চিৎপটাং হয়েছিলি কতদিন। কে আসত রোজ তোকে দেখতে?
–সে তো টিভিতে খেলা দেখবি বলে, তখন তোদের বাড়িতে টিভি ছিল না। আমি জানি না যেন।
–ওইটা তো বাহানা ছিল, রোজ রোজ আসতে লজ্জা লাগত বলে… স্বভাবলাজুক হীরক ফিকে হাসল।
–সত্যি যদি আমাকে দেখতে আসতিস, সেটা বুক ঠুকে বলতে কী হয়েছিল? তুই সব কিছুতে এত লজ্জা পাস কেন রে হীরু? এখনও পাস। তোকে হস্টেলে ভালো করে র‍্যাগিং করেনি মনে হয়। মুখ টিপে হাসল রেখা, মজা পাওয়াটা চোখেও ছড়িয়ে যাচ্ছিল।

হীরকের মনে হল, এই মোক্ষম সময়। যে কথা বলতে পারেনি এতগুলো বছর, এখনই সেটা বলে ফেলা যায়। সাহস জুটিয়ে বলে ফেলল, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

রেখা মুখে কিছু না বলে অপলক চোখে হীরকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

জিভ দিয়ে শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটটা একবার চেটে নিল হীরক। মুখে বলতে চেয়েছিল আমি তোকে ভালোবাসি রেখা। মনে মনে বলছিল প্লিজ না বলিস না। তোর সঙ্গে শানুর কী সম্পর্ক ছিল সেদিন জানতে চাইনি, আজও জানতে চাই না। ভাবল মজা করে বলছি, কিন্তু কথাটা শোনাল এরকম— I always get confused and want to know for sure today. Do you love me or hate me? ভুল করে উল্টো জামা পড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লে নিজেকে যেমন জোকার লাগে, এই মুখ ফস্কানো বাক্যবন্ধে নিজেকে তেমনি জায়গায় পেল হীরক।

রেখার মুখে রাগের ঝলসটা বিদ্যুত চমকের মত মুহূর্তে মিলিয়ে গিয়ে এক বেদনার আঘাতে ছেয়ে গেল চোখেমুখ। ব্যস? চার বছর কোনও খোঁজখবরের বালাই নেই। আজ তুই জানতে এসে গেলি আমি তোকে ঘৃণা করি, না ভালোবাসি? এই দুটো ইমোশনই এত স্ট্রং, যে মুখে বলে জানতে হয় না। কিন্তু তবু তুই কনফিউজড। আসলে আমি এর কোনওটাই করি না। I am completely indifferent to you. You mean nothing to me.

রেখা মোড়ায় এক পায়ের উপর আরেক পা তুলে বসেছিল। শান্তভাবে বসা থেকে উঠল, স্কার্টের প্লিটটা ঠিক করল, ঘরে পড়ার চটিটা খুলে রেখেছিল সেটা পায়ে গলাল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের ঘরে চলে গেল। এই পুরো সময়টা ধরে হীরক প্রাণপণে কিছু বলতে চাইল। কিন্তু কী বলবে বুঝতে পারছিল না। প্রশ্নটা অন্যভাবে করা যেত হয়তো। কিন্তু সত্যিই যদি হীরকের জন্য ওর মনে কোনও স্থান থাকে, তাহলে কি রেখা এইভাবে উঠে যেতে পারত? আর কী হবে এইখানে বসে থেকে?

মাধবী যখন চা আর চিঁড়েভাজা নিয়ে ফিরল হীরক তখনও সেইভাবেই বসে আছে। এমা, তুই একা বসে কেন? রেখা, রেখা! কী কাণ্ড বলো তো! লেখিটাও এতক্ষণে ফিরে আসতে পারল না?

–কী হয়েছে হীরু? মেয়েটা উঠে গেল কেন?

হীরকের মুখের অবস্থা দেখে নিজেই বুঝে নিল মাধবী। পাশে এসে বসল। জানিস তো হীরু, তোদের বয়সটাই এমনি। আমরাও তো এই বয়সে ছিলাম, বুঝতে পারি। তুই আমাকে কিছু লুকাস না, বলতে পারিস।

মাধবীকে কী বলবে হীরক? যা রেখাকে বলতে চায়, সেকথা কি তার মাকে বলা যায়?

অনেক ডাকাডাকি করেও মাধবী রেখাকে ফেরাতে পারল না। বেশ খারাপ লাগছিল তার। খানিক চুপ থেকে বলল, তুই আছিস তো আর কদিন। আমি ওর সঙ্গে কথা বলব। তোদের ছোট থেকে একসঙ্গে দেখছি, হাতের যে আঙুলই কাটুক, ব্যাথা তো সমানই লাগে। আসলে রাখুর অভিমান বড্ড বেশি। ফটফট করে এমন কথা বলে দেবে, ওটাই সত্যি ভেবে বসে থাকলে…

মাধবীর মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই লেখা মিষ্টি নিয়ে ফিরে এসেছিল। লেখা থাকলে আর কারও ওখানে কথা বলার প্রয়োজন হয় না।

মাধবী শুধু বেরোবার মুখে বলল, তুই যাওয়ার আগে আমি একবার ঘুরে যাব তোদের বাড়ি। পারলে ওকে সঙ্গে নিয়েই আসব।

ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথায় যাবে কিছু বুঝতে পারছিল না। চারদিকটা কেমন অপ্রয়োজনীয়, অন্ধকার বোধ হচ্ছিল। কিছু না ভেবেই চলতে চলতে এসে পৌঁছেছিল শানুর বাড়িতে। এই বাড়িতে আসছে সে বোধহয় বছর চারেক পর। শেষ কবে এসেছিল ঠিক করে মনেও ছিল না আর। এখন ভেবেই লজ্জা লাগল। বন্ধুই তো ছিল তারা। কী করে একদম ভুলে গেল?

বাড়ির বাইরে বেল দিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়াতে হল। প্রথমে তো ভেবেছিল বাড়িতে কেউ নেই, কারণ বেশিরভাগটাই অন্ধকার। শুধু দুটো হলুদ আলো দেখা যাচ্ছিল, বোধহয় রান্নাঘরে। ফিরে যাবে ভাবছে তখন খুট করে দরজা খুলল। সুতপা। দেখে হীরক একটু চমকেই উঠেছিল। কি চেহারা হয়েছে কাকিমার?

–কাকিমা, আমি হীরক। চিনতে পারছেন?
–তুমি তো হীরের টুকরো ছেলে বাবা, চিনব না? অনেকদিন বাদে এলে। ছোটবেলায় শানুর কাছে অনেক এসেছ তুমি।

সুতপার গলায় যেন একরাশ ক্লান্তি। কণ্ঠস্বরও ঝড়ের রাতে কুপির আলোর মত কাঁপা কাঁপা। যেন কত বয়স হয়ে গেছে কাকিমার। অথচ কতই বা হবে, পঞ্চাশ বেশি হলে।

–শানু নেই কাকিমা?
–না, ওর বাবা কলকাতায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছে। কাল বিকেলে ফিরবে। তুই আসলি দেখা হল না। ও থাকলে খুব খুশি হত, পুরনো বন্ধুরা কেউ তো আর আসে না। বলতে বলতে হু হু করে কেঁদে ফেলল সুতপা। গত পাঁচ ছয় বছর কেঁদে কেঁদেও তার চোখের জল কেন শেষ হয় না কিছুতেই বুঝতে পারে না সুতপা। ভগবান তার কপালেই কেন এত কষ্ট লিখেছিল!

হীরক কী বলবে বুঝতে পারছিল না। এই জন্যেই এই বাড়িতে আসতে তার লজ্জা লাগে। সে যে শানুকে ছেড়ে এগিয়ে গেছে, এগিয়ে চলেছে তার জন্য এক অদ্ভুত অপরাধবোধ। আঁচলে চোখ মুছে সুতপা নিজেকে সামলে নিয়েছে ততক্ষণে। শিরা বের করা হাত হীরকের মাথায় রেখে বলল, ভালো থেকো বাবা। আর পারলে মাঝে মাঝে ছেলেটার একটু খোঁজ নিও। বড্ড একা হয়ে গেছে।

–হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি আবার আসব। ওকে বলে দেবেন। কেন জানি মনে হল সে আমেরিকা পড়তে যাচ্ছে শুনলে কাকিমার আরও বেশি কষ্ট হবে। আর কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি উল্টো পথে পা বাড়াল। পালাল যেন। ছোটবেলায় দেখা কাকিমার ধংসস্তূপ পিছনে ফেলে।

অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার অসম্ভব তাড়া নিয়ে।

 

যাওয়ার দিনটা হঠাৎ করেই কখন আগামীকাল হয়ে গেল। ভিসা হয়ে গেছে, টিকিট হয়ে গেছে, চাকরি ছেড়ে শেষ কদিনের জন্য বাড়িতেও কাটানো হয়ে গেছে। মার হাতের কচুর শাক, ইলিশভাপে, পুঁইডাঁটাচচ্চড়ি, ছোলার ডালের ঘুঘনি— একে একে সবই খাওয়া হল। অনেকটা সাপের শীতঘুমে যাবার আগের মত। অনেকদিন তো পেটে ভালো খাবার যাবে না, এখন ঢুকিয়ে দিয়ে তৈরি থাকা। শেষদিন মা আবার কিছু লোকজন বাড়িতে ডাকল তার চলে যাওয়া উপলক্ষে। শুনে না না করে উঠেছিল প্রথমে। অত লোকের মধ্যে হীরক হাঁফিয়ে যায় একদম। তাছাড়া এমন কী ঢাকঢোল পেটানোর আছে? আজকাল আরও অনেকেই যায়। কেন তার স্কুলের বন্ধু মণীশ তো পাশ করেই চলে গেল। হীরকের প্রথমে ভালো লাগেনি এইসব আয়োজন। কিন্তু যখন শুনল রেখাদেরও বলা হবে, চুপ করে গেছিল। যদি রেখা আসে এটা হবে তার বাড়তি সুযোগ, ভুল শুধরে নেওয়ার।

দমদম এয়ারপোর্ট থেকে ফ্লাইট রাতের। কিন্তু ওরা দুর্গাপুর থেকে বেরোবে সকালবেলা। বাবা এয়ারপোর্টের কাছে হোটেলে দুটো ঘর নিয়ে রেখেছে। সেইজন্য সবাইকে ডাকা হয়েছে মধ্যাহ্নভোজনে। কিন্তু তাদের ছোট বাড়িতে অত জায়গা কোথায়? অতএব বিমল ডেকরেটার্স এনে উঠোনে ছোট করে ম্যারাপ বাঁধাল। পঞ্চাশজন মত খেতে পারবে একসঙ্গে। রান্না অবশ্য নীলিমা নিজেই করেছে। রূপা আগের দিন এসে গেছিল, হাতে হাতে জোগাড় দিয়েছে। সব মিলিয়ে বেশ হইচই ব্যাপার। কিন্তু যেই মা বাবার সঙ্গে রেখা ঢুকল, হীরকের চারদিকে যেন নিস্তব্ধতা নেবে এল। রেখা এসেছে! মাধবী কিভাবে এই অসম্ভবকে সম্ভব করল? আজকে কি কিছু বলবে ও?

রেখার প্রতিটা পদক্ষেপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের বুকে একটা ঢিবঢিব আওয়াজ হচ্ছিল শুধু। আজ রেখার পরনে শাড়ি। সবুজ আর গোলাপি রঙের তাঁত, লম্বা হাতা পাড় দেওয়া ব্লাউজ। প্রতিটা পদক্ষেপে মুখের হাসির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পায়ে নুপুরের ঝুনঝুন। হীরক ভাবছিল রেখা কি ওর দিকে তাকাবে, অন্তত একঝলক হাসি? না সেদিনের রাগ আজও পুষে রেখেছে? চিরদিনের রাগ। হয়তো মা জোর করেছে বলে নিয়মরক্ষার খাতিরে এসেছে। কিছু আশা করার ভরসা ছিল না হীরকের।

ওকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে রেখা সোজা তার দিকেই হেঁটে এল। হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, কংগ্র্যাচুলেশনস হীরু। তোর মত বোকাহাঁদাও যে জীবনে এমন এগিয়ে যাচ্ছে এর পিছনে আমাদের সবার অনেক প্রার্থনা জমানো আছে, সেটা ভুলে যাস না।

রেখার সঙ্গে করমর্দনে যেন এক বিদ্যুতপ্রবাহ খেলে গেল হীরকের সর্বাঙ্গে। ইচ্ছা করছিল ওর ঈষদুষ্ণ করতল মুঠোর মধ্যে ধরেই রাখে। সারা জীবন। হয়তো এক মুহূর্ত বেশিই ধরে রেখেছিল। রেখা ছাড়িয়ে নিল।

–যার জন্য তুই ইনডিফারেন্ট তার জন্য প্রার্থনা করিস কেন রে রেখা?
–হুম রাগ হয়েছে বাবুর। ওনার রাগ থাকতে পারে আর আমার যেন রাগ থাকতে নেই? বলতে গিয়ে কি রেখার গলাটা একটু কেঁপে গেল। বলেই আর দাঁড়াল না। নিজেকে সামলে নীলিমার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে আবার একবার মুখ ফেরাল। মা তোর জন্য একটা উপহার এনেছে, ওটা কিন্তু আমার বানানো।

মনের মধ্যে একসঙ্গে অনেক পাখির কুজন। যেন ভোর হচ্ছে। রেখার সঙ্গে কটা কথা বলার জন্য মনটা ছটফট করে উঠল। অন্তত দুটো কথা তো বলে নেওয়া যায়। কত ভালো ভালো কথা মাথায় এসেছিল। কিন্তু যতক্ষণে সেটা ঠোঁট অবধি এসে পৌঁছাল, রেখা গিয়ে নীলিমাকে জড়িয়ে ধরেছে। কাকিমা, কতদিন বাদে যেন দেখছি তোমায়। আমাদের তো ভুলেই গেছ।

মুখে প্রকাশ করার সুযোগ না পেলেও হীরকের মনটা হঠাৎ পালকের মত হালকা হয়ে গেল। এত ভালো দিনটার কোটরে একটা দুঃখ জমা হয়েছিল। কিভাবে যাবার আগে রেখার সঙ্গে একটু গুছিয়ে কথা বলে এত বছরের ভুলবোঝাবুঝিটা মিটিয়ে নেওয়া যায়, সেই ভাবনাটা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল হীরককে। সেই দুঃখের মেঘ এখন আনন্দের বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে পড়ল হীরকের চোখেমুখে। অত কিছু হাঁদাও সে নয় যে এমন সন্ধিপ্রস্তাবটা বুঝতে পারবে না। তবুও যদি বোঝার কিছু বাকি থেকে থাকে সেটা লেখা ঘুচিয়ে দিল। উফ কি ফাজিল লেখাটা। মুখ বাড়িয়ে হীরুর কানে কানে বলল, হীরুদা দিদি বলেছে তোমার নাকি মুখে বলতে সব কথা গু-গু-গুলিয়ে যায়, তাই কিছু দরকারি কথা বলার থাকলে চিঠি লিখে জানাতে। হীরকের মনে হচ্ছিল এই মুহূর্তে সমস্ত লোক যদি হাওয়ায় বিলীন হয়ে যেত আর এখানে থাকত শুধু সে আর রেখা, অনেক জমানো কথার বন্যায় ভেসে যেতে পারত দুটো মানুষ। কিন্তু সে হবার নয়। ওর অন্য বন্ধুরা এসে গেছে। পাড়ার, স্কুলের। মনের ইচ্ছে মনে চেপে হীরক দ্রুতপায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল।

ছোটবেলার পাড়ার বন্ধুরা— তোতন, ঝন্টু, পিকলু সবাই এসেছে। ওদের সবার সঙ্গে নিয়মিত দেখাও হয় না আজকাল। বীরু কোথায় রে, ও এল না?

–ও এখন যুবনেতা, কতরকমের কাজ। সবসময় কি আর পাওয়া যায়? ঝন্টুর বলার ভঙ্গিতে একটা চাপা অভিযোগ ছিল। ও ছোটবেলা থেকে ডানহাত ছিল বীরুর, এখন হয়তো অত পাত্তা পায় না। তাই রাগ, অথবা অভিমান।
–সেটা বলছিস কেন? হেল্পও তো করে। আমাকে যে দোকানঘরটার ব্যাবস্থা করে দিল, ও না থাকলে পেতাম?
–তুই দোকান দিয়েছিস তোতন? কিসের? ছোটবেলার বন্ধু তোতনের জন্য হীরকের চিন্তা হত। একটু লেংচে হাঁটে বলে নয় শুধু। পড়াশোনায় ভালো ছিল, মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করল। তারপর কী যে হল, হায়ার সেকেন্ডারিতে ফেল করে পড়াশোনাই বন্ধ। ও কি পরে আর পাশ করেছে, সেটাও জানা হয়নি কোনওদিন। সময় মানুষকে কিভাবে দূরে নিয়ে যায়। তবে কলেজে আর পড়তে যাওয়া হয়নি তোতনের। সেটুকু জানে।

ম্লান হাসল তোতন। অগতির গতি রে হীরু। যেসব বঙ্গসন্তানের কিছু হয় না, কিংবা আর কিছু হওয়ার নয় তারা স্টেশনারি দোকান দেয়। নিজেকেই সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে বলল তোতন। মাধ্যমিকের পর বাবা বলল সায়ান্স ছাড়া আর কিছু পড়ে লাভ নেই। সেই অঙ্কে ধ্যারালাম। একবছর বাদে টায়েটুয়ে পাশ, তারপর করেসপন্ডেন্সে বিএ। আমায় কে চাকরি দেবে বল তো? তার উপরে ল্যাংড়া? বাবা বলল দোকান দে, বেশি হাঁটাহাঁটিও করতে হবে না। ব্যস। আমার খেল খতম। বলতে বলতে তোতনের গলার স্বরটা কেমন মিইয়ে গেল।

থাম তো তোতনা। পিকলু ওর কথা এই রাস্তায় আর এগোতে দিল না। দুপুর বেলা খেতে ডেকেছে মানেই এটা কোন শ্রাদ্ধবাড়ি নয়, যে প্যানপানাবি। হীরু, এবার তো দুপুরবেলা দিয়ে সারলি। এরপর যেদিন ফিরবি, সেদিন কিন্তু রাতে। ডিউটি ফ্রি থেকে একটা ঝকাস দেখে বোতল ঝাড়বি। দাঁত বের করে হাসল পিকলু।

হ্যাঁ, হ্যাঁ নিশ্চয়ই। তোতনের কাঁধে হাত রাখল হীরক। একদিন অনেক কথা বলতে হবে রে বসে। আমাদের কত কথা জমে আছে।

ওরা সবাই জানে ওরকম দিন আসার সম্ভাবনা আগেও কম ছিল। এখন আরও কমে গেল। কিন্তু জোরে জোরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতে কসুর করল না কেউ।

হীরকের মনে হচ্ছিল যারা এসেছে, সকলের সঙ্গে একবারটি কথা বলা তার কর্তব্য। বাবার অফিসের দু-একজন, চ্যাটার্জী সাহেব, পাড়ার কাকুজেঠুরা। বন্ধুদের ছেড়ে ওদের দিকে এগোতে গিয়ে পা আটকে গেল। নীলিমার অনুরোধে রূপার হারমোনিয়ামটা নিয়ে রেখা গান গাইতে বসেছে— পুরনো সেই দিনের কথা সেই কি ভোলা যায়…

রেখা ভালো গান করে সেটা জানা ছিল হীরকের। স্কুলে রবীন্দ্রজয়ন্তী বা অ্যানুয়াল ডেতে শুনেছে। কিন্তু সে ছোটবেলায়। এত ভালো গান গাইছে আজকাল? প্রতিটা শব্দে বড় মমতা মিশিয়ে গাইছে, হৃদয়ের প্রতিটা তারকে ছুঁয়ে দিতে দিতে। হীরকের মনে হল রেখা তাকে যখন যা বলতে চায় গান গেয়েই বলে। সবসময়। এমনি কথার সময় যেন ছুঁচ ফোটায় আর গান গেয়ে বুলিয়ে দেয় ভালোবাসার নরম পরশ। একটা সুখের পায়রা বকবকম করে উঠল ওর বুকের মধ্যে। সমস্ত শরীর আনন্দে কাঁটা দিয়ে উঠল। ভালোবাসা পাওয়ায় এত আনন্দ? আজ সত্যিই এক বিশেষ দিন। শুধু বাইরে যাচ্ছে বলে না, মনে হল সত্যিই জীবনের একটা নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। একই সঙ্গে মনটা অসম্ভব ব্যথায় ভরে গেল। এতদিন কেন আর একটু এগিয়ে যেতে পারেনি? একটু জোর দিয়ে ঝিনুকের ডালা খুলে মুক্ত বের করে আনতে কিসের বাধা ছিল তার? কোন অভিমান, কোন লজ্জা, কিসের সন্দেহ তাদের পিছনে আটকে রেখেছিল। ঠাস ঠাস করে নিজের দু গালে চড় মারতে ইচ্ছে করছিল।

পিঠে দমাস করে একটা চড় খেয়ে ভাবনার সুতোটা ছিঁড়ল। বীরুদা!

–কী হিরো? এই দেশ আর ভালো লাগছে না, ভোকাট্টা মারছ? বীরুর বলার ভঙ্গিতে একটা ভারিক্কি দাদা দাদা ভাব। দেশ তোদের পিছনে গাদা গাদা টাকা ঢালল, আর তুই ক্যাপিটালিস্টদের পা চাটতে ছুটলি?

তোতনটা মুখফোড়। বলে উঠল, কেন রে? তোদের মস্কোর দাদারাও তো এখন গ্লাসনস্ত আর পেরেস্ট্রোইকা বলে অ্যামেরিকার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তার বেলা?

–সেটা আমাদের লাইন না। কিছু বলার আগে একটু পড়াশোনা করে আয় তোতন। পড়াশোনার জন্য তো পা লাগে না, ওটায় কেন পিছিয়ে পড়ছিস?

এমন আচমকা আক্রমণের জন্য তৈরি ছিল না হীরক। এইসব তর্কে জড়াতেও চাইল না। বীরুর আলটপকা কথায় তোতনের মুখটা কালো হয়ে গেছিল। হীরক তাড়াতাড়ি কথা ঘোরাল। আরে তুই তো শুনলাম এখন বিশাল লিডার। আসার সময় পাবি কিনা মুশকিল। ভাবতেই পারিনি যে এসে পড়বি।

–জনসংযোগ। গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থায় ওটা তো করতেই হয়। তবে তোর কথা আলাদা, একসঙ্গে খেলেছি, দেশের জন্য একসঙ্গে জেলেও গেছি। তোকে বাই বাই করতে না আসলে হয়?

জেলে যাওয়ার কথাটা বাড়াবাড়ি। ওদের থানায় ধরে নিয়ে গিয়েছিল, ধমক দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। কেস ফাইল করেনি শেষ অবধি। সেটা করলে ওর পাসপোর্ট পেতে আরও দেরি হত। কিন্তু হীরক সেটাকে নিয়ে আর জলঘোলা করতে চাইল না। এটাকে জেলখাটা বললে বীরুর নেতাগিরিতে সুবিধা হয়, আর ধামাচাপা দিতে পারলে তার বিদেশ যেতে। যার যাতে আখের গোছানো হয়।

বীরুকে কোনওদিনই ভালো লাগত না হীরকের। সবসময়ে মাতব্বরি। আরই কলেজে হীরকের অনেক বন্ধু আছে। ওদের মুখে শুনেছে কলেজের ইলেকশানে লোকাল ছেলেদের গ্যাং নিয়ে গিয়ে এসএফআইয়ের সঙ্গে জুটে হামলা করার হোতা এই বীরু। একবার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের একটা ছেলেকে এমন মেরেছিল প্রাণ নিয়ে টানাটানি পড়ে যায়। তাই ওর সঙ্গে বেশি কথা বলতে ইচ্ছা করছিল না হীরকের। কীভাবে পাশ কাটিয়ে যাবে সেই ফিকির খুঁজছিল। সুযোগ এসে গেল। শানু।

যাকে একদম আশা করেনি, সেই শানুকে ঢুকতে দেখে চমকে উঠল হীরক। মাকে জিজ্ঞেস করেছিল শানুদের বাড়িতে বলা হয়েছে কিনা। নীলিমা রাজী হয়নি। বলেছিল, আজকাল শানুকে সবসময় আটকে রাখা যায় না রে হীরু। যাকে তাকে দেখে দু ঘা দিয়ে দেয়। কাজের বাড়িতে কিছু হলে তারপর…

মা যেটা বলেনি সেটাও মাথায় ছিল হীরকের। রেখা এলে সেখানে শানুও থাকলে কোনও গোলযোগ হলে তখন? শানু কখন কী করে বসবে কেউ নাকি বলতে পারে না। অনেক লোকের মধ্যে ওকে কেউ আনতে চায় না। হীরকও আর চাপ দেয়নি।

শানু খুব রোগা হয়ে গেছে। কিন্তু জামা পরে আছে আগেকার, তাই ঢলঢল করছে। খাকি প্যান্টের এখানে ওখানে কালচে দাগ। মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি। গাল ঢুকে হনু বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু সবচেয়ে কষ্ট দেয় ওর চোখদুটো। একসময়ের উজ্জ্বল ভাবনাপূর্ণ একজোড়া চোখে আজ যেন কোন প্রত্যন্ত গুহার ভিতর থেকে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি মেলেছে। হীরকের মনে পড়ল সেই ছোটবেলার শানুর কথা, প্রথম যেদিন স্কুলে এল ক্লাস সিক্সে থাকতে। পোশাকপরিচ্ছদে স্মার্ট, টিপটপ। তেমনি ক্লাসে সব ব্যাপারে অনেক আগে। প্রতিটা পদক্ষেপে আত্মপ্রত্যয়, কিছুটা অহমিকা। সেই ছেলের আজ কি হতদীর্ণ অবস্থা। লম্বা লম্বা পায়ে এগিয়ে গেল হীরু। আরে আয়, আয় শানু। ওকে বুকে জড়িয়ে কিছুটা আশ্বাস, ভরসা দেওয়ার একটা চেষ্টা।

জড়িয়ে তো ধরল, কিন্তু শানু কিছুতেই সেই আলিঙ্গন ছাড়ছিল না। শুধু মিট মিট করে হাসছিল। রোগা হলেও হাতে কী অসীম শক্তি। পাগলদের কি গায়ে বেশি জোর হয়ে যায়? হীরকের হঠাৎ ধৃতরাষ্ট্রের লোহার ভীম চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়ার গল্প মাথায় এল। সে তো আর লোহার নয়। ছটফট করতে করতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল কোনওমতে। এবার শানু হা হা করে হেসে উঠল।

–কিরে ভয় পেলি? আরে আমি অতকিছু পাগল নই। কিন্তু সেয়ানা পাগল। তুই তো আমাকে ডাকিসনি, দ্যাখ আমি নিজেই চলে এলাম। শুনলাম তুই অনেকদূরে চলে যাচ্ছিস। না এসে পারি? আবার হা হা হাসি। মাথাটা মাঝে মাঝে বিগড়োয়, কিন্তু আজ বেশ ঠিক আছে। ভাবলাম একবার পাত পেড়ে খেয়ে যাই। ওর হা হা করে হাসি শুনে সবাই ঘুরে ঘুরে দেখছিল, কিন্তু শানুর কোনও হেলদোল নেই। নীলিমা দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসেছিল। ভালো আছ বাবা? তাড়াতাড়িতে তোমার মায়ের সঙ্গে কথা বলা হয়নি। তুমি এসেছ দেখে খুব ভালো লাগছে। এদিকে এসো, মুখে কিছু দাও দেখি।

নীলিমার হাত ধরে সুবোধ বালকের মত বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেল শানু। হীরক বুঝতে পারল সবাই এখন বাইরে খেতে বসবে। মা ওকে আলাদা করে ভিতরে খাইয়ে দেবার চেষ্টা করছে। একদিকে ভালোই, ও যে কখন কী করে বসে তার তো ঠিক নেই। বাড়ির মধ্যে ওরা পুরোপুরি ঢুকে গেলে একটা শান্তির নিঃশ্বাস ফেলল হীরক।

সব শান্তিতে মিটে গেছিল সেদিন। শানু কোনও গোলমাল করেনি। রেখা যাওয়ার আগে বলে গেছিল, ওখানে গিয়ে তোর ঠিকানাটা পাঠিয়ে দিস হীরু। আমি তোর সেদিনকার প্রশ্নের জবাব দিয়ে দেব।

কী ভাগ্যে সরস্বতী ভর করেছিল হীরকের জিভে। বলল, যদি আরও কিছু প্রশ্ন থাকে, তাহলে?

রেখার দুচোখে হাসির ওই ঝিলিকের জন্য যেন কতযুগের অপেক্ষা ছিল। স্কুলে থাকতে কুইজ করতিস। এখন তুই কি কুইজমাস্টার নীল ওব্রায়েন হয়ে গেছিস? শুধু প্রশ্ন আর প্রশ্ন? আমি অত ভালো ছাত্রী নই, ফেল করে যাই যদি? ওর ধারালো চোখের দৃষ্টি ভালোবাসায় নরম হতে দেখছিল হীরক। রেখার কণ্ঠমণিতে একটা ঢেউ উঠল, কিছু বলতে চাইছিল। কিন্তু ঠিক ওই সময়ে বীরু, তোতন, ঝন্টু ওরা খেয়েদেয়ে হাতমুখ ধুয়ে আসছিল। রেখা আর উত্তরের জন্য দাঁড়াল না। দ্রুত পায়ে লেখার হাত ধরে বেরিয়ে গেল। কিছু কিছু ঢেউ যেমন তীরে এসে আছড়ে পড়ার আগেই তার উচ্চতা হারায়, রেখার কথাটাও ঠোঁটে শব্দ হয়ে ফোটার সময় পেল না। তবু জীবনের কোনও কোনও মুহূর্তে মুখে কিছু না বলেও কিছু কথা জানিয়ে দেওয়া হয়, এ যেন হীরকের জীবনের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

ভাবনাটাকে ধরে রাখার সময় পাওয়া গেল না কারণ চ্যাটার্জীসাহেব কথা বলতে এলেন, সঙ্গে বিমল। বয়সের সঙ্গে একটু ঝুঁকে গেছেন ভদ্রলোক। ছোটবেলায় এত লম্বা চওড়া মনে হত, কিন্তু এখন দেখল আসলে উনি বেঁটে। কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, খুব ভালো করেছ হীরক। তোমার বাবার মুখে সব খবরই পাই। আমার ছেলে শুভেন্দুও এখন ইঞ্জিনিয়ারিং সেকেন্ড ইয়ার। ও তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে, বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতিটা একটু বুঝিয়ে দিও তো ওকে। বিমলের মুখের দিকে না তাকিয়েও হীরক বুঝতে পারছিল, বাবার মুখ এখন গর্বে কিরকম জ্বলজ্বল করছে! যে চ্যাটার্জিসাহেবের উজ্জ্বল ছবি সামনে ধরে বিমল ছেলেকে উৎসাহিত করেছে ছোটবেলায়, আজ সেই লোক নিজের ছেলের জন্য হীরুর পরামর্শ চাইছেন। হীরকের মনে হল আজকের এই মুহূর্তটা যে সে বাবাকে দিতে পারল তার দাম ভবিষ্যতে সে কত ডলার বিদেশ থেকে পাঠাতে পারবে তার চাইতে অনেক বেশি।

এখন মাটির থেকে তিন হাজার ফুট উপরে বসে এই কথাগুলো বারবার মনের মধ্যে জপমালার মত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভাবছিল। বাবা মা সবাইকে ছেড়ে আসার দুঃখ আছে, নতুন একটা দেশে পৌঁছে যাওয়ার উত্তেজনা— তাও তো কিছু কম না। কিন্তু রেখার সঙ্গে এই হাতে গোনা কিছু মুহূর্ত যেন সব ছাপানো ঢেউয়ের মত বালির উপর অন্য সব আঁকিবুঁকি বিলীন করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

 

জীবনে প্রথম উড়ান। সেও কিনা এক ধাক্কায় আঠেরো ঘণ্টা আকাশে। লল্ডন আর টরোন্টো এয়ারপোর্টে স্টপওভার ছিল। ডেট্রয়েট ছুঁতে লাগল তিরিশ ঘণ্টা। ততক্ষণে হীরকের রাত আর দিনের হিসেব একাকার। তবে মজা হল হিসেবমতন যেদিন ভোররাতে কোলকাতা ছেড়েছিল, সেইদিনের সন্ধেতেই পৌঁছে গেল ডেট্রয়েট।

লন্ডন অবধি আকাশ দেখার সিট পেয়েছিল। কিন্তু জীবনের প্রথম বিমানসফরের উত্তেজনা কেড়ে নিয়েছিল রেখা। হীরকের সমস্ত মন প্রাণ হঠাৎই যেন ওই মেয়েটার কব্জায়। চলতে চলতে ঠোঁটচাপা হাসিতে ফিরে তাকানোর মুহূর্তটা বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মাথার মধ্যে এক রিলের বায়োস্কোপ। ডান ভুরুর ধার ঘেঁষে না-মেলানো কাটা দাগে একবার হাত বুলিয়ে দেওয়ার উদ্গত ইচ্ছা হীরকের শরীরে কষ্ট দিচ্ছিল। রেখার কানের পাশে গালে লেপটানো চুলের গুচ্ছ, আঁচলের পাড় ভেঙে বুকের কোমল উচ্ছাস, করমর্দনের মুহূর্তের সেই স্পর্শসুখ নিরন্তর ঢেউয়ের মত হীরকের চেতনায় বারবার আছড়ে পড়ছিল। প্রেমের এই অসীম শক্তির কাছে নিরুপায় হীরক যেন অশান্ত সমুদ্রে ডিগবাজি খাওয়া পানসিমাত্র। আর থাকতে না পেরে কাগজ কলম নিয়ে চিঠি লিখতে বসে গেল।

জীবনে তেমন করে চিঠি লেখেনি হীরক। শুরু শুরুতে হস্টেলে থাকতে বাবা মাকে দুএক লাইন লিখত। পরের দিকে তাও না। কোনও মেয়েকে তো নয়ই। কী লিখবে, কীভাবে শুরু করবে সেই ভাবনা ছিল। কিন্তু দেখা গেল এত বছরের বহু কথা তার মনে জমে আছে। এমনকি দশ বছর বয়সের ন্যাড়ামাথা রেখা যেদিন মার হাত ধরে রিক্সা থেকে ওদের ভাড়াবাড়ির সামনে নামল সেদিনটাও কী স্পষ্ট। মনে আছে রেখা, তোর নাম শুনে ক্লাসে বরুণ স্যার বলেছিলেন রেখা কোথায়, এ তো গোলক। অনেকদিন অবধি পাড়ায় তোকে নেড়ি বলে ডাকত সবাই। এমনকি বড়রাও। লিখতে লিখতে শান্ত হয়ে যাচ্ছিল হীরকের মন, ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠছিল তৃপ্তির হাসি। যেন চোখের সামনে রেখা বসে আছে, আর হীরক গল্প করছে। আর যেবার তুই কপাল ফাটালি। মার কথায় আমি আমার ক্লাস নোটসের কপি নিয়ে যাচ্ছিলাম তোদের বাড়িতে। রাস্তায় বীরুটা ধরে কেড়ে নিল, বলল ভাগ। তোকে দিতে হবে না। আমি তখন ভাবছি তোকে কোন ছুতোয় দেখতে যাওয়া যায়। এর মধ্যে লেখা এসে বলল, আমার নোটস পেয়েছিস কিন্তু কিছু কিছু শব্দ নাকি পড়তে পারছিস না। আচ্ছা রেখা, সত্যি কি পড়তে পারছিলি না সেদিন, নাকি আমাকে আসতে বলছিলি? আমি শিওর হতে পারিনি, কিন্তু সেই দুই সপ্তাহ নোটস লিখতে গিয়ে ইচ্ছা করে আঁকিবুঁকি কেটে রাখছিলাম যাতে নোটস বীরু পৌঁছে দিলেও পড়ে দেওয়ার জন্য আমাকেই যেতে হয়। কী বাচ্চা ছিলাম না আমরা? এমনি কত কথা হীরকের কলম থেকে টুপটাপ বৃষ্টির মত পাতায় গড়াল। অবিরাম।  যথেষ্ট ঘুমাতেই পারেনি প্লেনে। যখন পৌঁছাল চোখ ঢুলুঢুলু, মাথা ভারী।

কিন্তু ইমিগ্রেশনের লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে নতুন দেশ, নতুন পরিবেশের ধাক্কায় ঘুম উধাও। উত্তেজনায় টানটান হয়ে গেল। এই সেই ডেট্রয়েট! এতদিন ম্যাপে খুঁজে পাওয়া, ছবিতে দেখা ডেট্রয়েট শহরের দোরগোড়ায় আজ। প্রথম দিন। প্রথমেই যেটা ওর কানে ধাক্কা দিল— নৈঃশব্দ। এতগুলো লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কেউ পাসপোর্টের পাতা উলটালেও যেন লাইনের পিছন থেকে শোনা যাবে। শব্দ যেমন নেই, তেমনি রঙের উচ্ছলতা নেই। গন্ধের তীব্রতা নেই। সব কিছুই কেমন নিয়ন্ত্রণের আওতায়। গেট দিয়ে এসে লম্বা করিডর ধরে ইমিগ্রেশন গেটের দিকে হাঁটছে এতগুলো মানুষ। পোশাকের মধ্যে দেখতে গেলে সেই বাদামী, ছাইরঙা অথবা কালো। এমন কি মেয়েদেরও তাই। এরকম একটা ভীড়ের জায়গায় থাকলে কলকাতায় কোনও রং দেখা বাকি থাকত? গায়ে ঘাম মুছে দিয়ে ধাক্কা মেরে এগিয়ে যাওয়ার কেউ নেই, বরং সবাই এত বিনীত এক্সকিউজ মিয়ের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে এক ফুট পাশ দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেলেও। হীরকের মনে হচ্ছিল যেন হট্টমালার দেশে পৌঁছে গেছে। মানুষগুলো এমনি নাকি এখানে? না কি এই লম্বা লাইনে জড়ো হওয়া লোকগুলো সবাই তার মতো নতুন দেশে এসেছে আর নিজেদের সবচেয়ে ভদ্র মুখোচ্ছবি তুলে ধরতে চাইছে। পরে বুঝতে পারবে হীরক যে এর দুটোই আংশিকভাবে সত্যি। নিজেরও টেনশান হচ্ছিল বেশ। ইমিগ্রেশন নিয়ে অনেক কথা শুনেছে। কাকে কখন আরও জেরা করার জন্য নিয়ে যাবে কিচ্ছু বলা যায় না। কে জানে তার ভাগ্যেই যদি সেরকম থাকে। এদের যেমন কথা খেয়ে নিয়ে শব্দ ছোঁড়ার অভ্যেস, কথোপকথন কেমন দাঁড়াতে পারে ভেবেই পেটের ভিতর কীরকম গুড়গুড় করে উঠল। তার চারদিকে এতগুলো লোক। পোষাকের বর্ণহীনতা পুষিয়ে দিয়ে লাল, সাদা, বাদামী, কালো— সব মানুষের ভিড়। গায়ের চামড়া যদি পাঁচরকম রঙের হয়, মাথার চুল পঁচিশ। হীরক সাদাদের মধ্যে বুঝে ফারাক করতে পারল না কারা অ্যামেরিকান আর কারা নয়। চাইনিজদের বরং সহজে বোঝা যায়। আসলে জাপানি, কোরিয়ান, থাই সবাইকেই সেদিন চাইনিজ মনে হয়েছিল হীরকের। কিন্তু দেশের লোক কোথায়? এই জনারণ্যে আর একটি ভারতীয়কে খুঁজে বার করবার জন্য মন ছটফট করছিল। সারা জীবন পশ্চিমবঙ্গে কাটিয়েছে। দুর্গাপুর আর কলকাতা। এই ছিল তার দৌড়। একবার শুধু ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুরে ব্যাঙ্গালোর গিয়েছিল। সে মনেপ্রাণে আগাপাশতলা বাঙালি। আজ এই সুদূর অ্যামেরিকার ইমিগ্রেশন লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের ভারতীয়তাকে ছুঁতে চাইছিল হীরক। চারদিকের সাদা কালো লাল হলুদ মুখের ভিড়ে অন্তত আর একটি বাদামী মুখের খোঁজ। তার জীবনের সত্যিকারের জনগনমন মুহূর্ত।

কিন্তু পেল না। যদিও আসার আগে এই নিয়ে খবরাখবর নিয়েছে। ভারতীয় একদম নেই তেমন নয়। আছে বাঙালিও। কম। তবে ডেট্রয়েট শহরটাকে জানার চেষ্টা করতে গিয়ে একটু হোঁচট খেয়েছে হীরক। কোন স্কুলে অ্যাডমিশান নেবে ঠিক করার আগে সমস্ত ইতিহাস ভূগোল ঘেঁটে দেখেনি। নিজে গাড়ির কারখানায় চাকরি করে বলে ডেট্রয়েট নামের প্রতি আকর্ষণ ছিল। আসার আগে জায়গাটা সম্বন্ধে আরও বিশদে জানতে গিয়ে ষাটের দশকের সিভিল আনরেস্টের খবরে দমে গেছিল। মাত্র বছর কুড়ি আগেই ঘটে গেছে মারণযজ্ঞ। হিন্দু মুসলমান দাঙ্গার মত। ডেট্রয়েটের কোনও এক স্পোর্টস বারে গভীর রাতে শুরু হওয়া সংঘর্ষ আগুনের ফুলকি হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সারা শহরে। কত মানুষ মরেছে, শহর ছেড়ে পালিয়েছে আরও বেশি। পাখি উড়ে গেছে, ফেলে রেখে গেছে এক বিশাল শহরের খাঁচা। যে কোনও শহরের জীবনস্পন্দন তার মানুষ। সেই ভাঁড়ারে টান পড়লে শহর পিছিয়ে যেতে থাকে। ডেট্রয়েটের তাই হয়েছে। এমন একটা মরা শহরে থাকতে আসছে শেষ অবধি? এসব পড়ে খুব মনখারাপ। ফোনে জিজ্ঞেস করতে বিজু অবশ্য উড়িয়ে দিয়েছে। ও এক বছর আগে থেকেই এখানে। বলল ওইসব নিয়ে ভাবিস না। তুই তো ডেট্রয়েটে থাকবি না। আমাদের শহর অ্যান আরবার। এখানে কত দেশের সব রকমের ছাত্রছাত্রী আসে, হইচই কাণ্ড। তোর খুব ভালো লাগবে। তাছাড়া যা ঘটেছে সেটা কুড়ি বছর আগে, সেসব কার মনে আছে আর।

হয়তো বিজুই ঠিক। কিন্তু এসব ঘটনার দাগ সহজে মেলায় না। বাবার নানান কথায় অনেকবার দেশভাগের দুঃখের স্মৃতি পিছলে বেরোতে দেখেছে। দাঙ্গা, লঞ্চে করে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে পালানো। সেসব ক্ষত লোকে বয়ে নিয়ে বেড়ায়। সারা জীবন। আবার আর একটা স্ফুলিঙ্গ পেলেই দাবদাহ ছড়িয়ে পড়ে। তবে ডেট্রয়েটে থাকতে হবে না, সেটাই বাঁচোয়া। কিন্তু চল্লিশ মাইল দূরেই থাকবে। এমন কী দূর। সে জীবনের অনেকটা দুর্গাপুরে কাটিয়েছে। কলকাতার অদূরে। কলকাতার ঝড়ঝাপ্টার প্রকোপ দুর্গাপুরে পড়েছে বৈকি। অন্য একটা দেশে বসতি বানানোর মুখে এইসব ভাবনায় ছেয়ে যাচ্ছিল হীরকের মন।

হিন্দমোটরে যে কোয়ার্টারে থাকত হীরক, তার সামনে ঘেঁষেই ছিল এক বড় বিল। সেপ্টেম্বর মাস থেকে সেখানে দূরাগত পাখিদের মেলা। শুনেছে সুদূর রাশিয়া থেকে মাইলের পর মাইল উড়ে আসে এই সব সারসেরা। সকালবেলা পাখিদের কোলাহলে জমজমাট। বিল ঘিরে গাছের প্রতিটা ডালে কাঠকুটোর বাসা। এখানেই ডিম পাড়ে, ডিম ফাটে, বাচ্চা হয়, উড়তে শেখে। আবার শীতের শেষে পাখা মেলে নিজের দেশে ফেরত যাবার পালা। হীরক অনেক সময় অবাক হয়ে ভেবেছে কিসের সুখে নিজের দেশ গাঁ ছেড়ে এই পাখির দল এক অপরিচিত দেশের অজানা গাছের ডালে বাচ্চা পাড়তে আসে! কী অনায়াসে জায়গাটাকে নিজের করে নেয়। এতই কি সোজা! আজ সেও এক পরিযায়ী পাখি। ফারাকের মধ্যে সে এমনভাবে বারবার ফিরে ফিরে আসা যাওয়া করবে না। কিন্তু ওই পাখিদের মতো কি পারবে সুখের বাসা তৈরী করে এই অচেনা দেশের অজানা শহরে নিজের সন্তানসন্ততিকে লালন করতে? তার বাবা মাও নিজের দেশ ছেড়ে নতুন ঠাই গড়ে নিয়েছিল। তবে সেটা সময়ের চাপে, রাজনীতির শিকার হয়ে। আর সে ঝাঁপ দিয়েছে নিজের ইচ্ছায়। নিজের স্বপ্নপূরনে। এতদূর কখনও ভেবে দেখেনি আগে। পৌঁছানর মুহূর্তে একটা অস্বস্তি কুবো পাখির মত কুবকুব করতে থাকল। নিজের বাড়ি, নিজের দেশের জন্য আগে না বোঝা এক অদ্ভুত টান আজ ভীষণ নাড়া দিচ্ছিল  হীরককে।

মাথার চিন্তা ঝেড়ে ফেলে চারপাশটা আবার জরিপ করতে শুরু করল। ইমিগ্রেশন অফিসারদের মধ্যে সাদা আর কালো দুইই আছে। সেটা দেখে মনে হল বিজুর কথাই ঠিক। এখন সব স্বাভাবিক। তবে অদ্ভুত ব্যাপার লাইনে দাঁড়িয়ে হীরক চাইছিল যে তার ভাগ্যে যেন সাদা অফিসারই জোটে। কালো অফিসারের দশাসই চেহারা না কি তার মনের সুপ্ত বর্ণবৈষম্য? এই দেশের সঙ্গে হীরকের পরিচয় আঙ্কল টমস কেবিন আর টম সয়ারের হাত ধরে। সেই কোন ছোটবেলায়। বর্ণবৈষম্য, দাসপ্রথা হীরক তো মেনে নিতে পারেনি। তাহলে আজ কেন প্রথমবার সত্যিকারের কিছু কালো মানুষের মুখোমুখি হতেই জোয়েল গারনারের বল ফেস করার অনুভূতি? নিজের মধ্যে এই অদ্ভুত বৈপরীত্য অবাক করে দিচ্ছিল ওকে। মানুষ নিজেকে এবং চারপাশকে সম্পূর্ণ চিনতে পারে বোধহয় শিকর উপড়ালেই। সেই দিক দিয়ে দেখতে গেলে নিজেকে চেনার যাত্রা আজ থেকে শুরু। উনিশশো অষ্টাশি সালের সাতই জানুয়ারি হীরকের জন্য একটি বিশেষ দিন হয়ে রয়ে যাবে। সারা জীবন।

প্লেন থেকে নাবতে নাবতেই আরেকটা ধাক্কা ছিল ঠান্ডার। এয়ারপোর্টের ভিতরে ঠান্ডা দাঁতের কামড় বসাতে পারেনি। কিন্তু প্লেনের জানালা দিয়ে বাইরে চাঁই চাঁই বরফের স্তূপ দেখে শরীরে কাঁপুনি ধরে গেছে। যতদূর চোখ গেছে বরফে সাদা। সে নিজেই উইন্টার সেমেস্টার নিয়েছে। না হলে আসছে বছরের জন্য অপেক্ষা করতে হত। এই সময়ে ডেট্রয়েটে মাইনাস পঁচিশ। দুর্গাপুরেও ঠান্ডা পড়ে, কিন্তু থার্মোমিটারের পারদ ১-২ ডিগ্রিতে এসেই থমকে যায়। এদেশে মাইনাস কুড়ি পঁচিশে কি হয় সেটা হীরকের বোধগম্যের বাইরে। চারদিকে সবার পরনে সোয়েটার, তার ওপরে কোট, তার ওপরে হাঁটু ছাড়ান ওভারকোট। হাটু অবধি চামড়ার বুট। মুখে পাইপ দিয়ে দিলেই একেবারে ছবিতে দেখা শার্লক হোমস। সেই তুলনায় তার পরনে শুধু একটা চামড়ার জ্যাকেট। গড়িয়াহাটে কেনার সময় এটাকে দেখেই গায়ে ঘাম ছাড়ছিল। এই ঠান্ডায় সেটা এখন ফিনিফিনে ফতুয়া। এয়ারপোর্টের ভিতরেই এমন, বাইরে কী হবে কে জানে। এখন ভেবে আর কী লাভ। দাঁতে দাঁত চেপে ঠান্ডা সহ্য করতে হবে।

ইমিগ্রেশান কাউন্টারে আশাতীত সংক্ষেপে কাজ হয়ে গেল। সব কাগজপত্র দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। বুক ঢিবঢিব করছিল। কাউন্টারের লোকটা মুচকি হেসে বলেছিল, Hope you don’t have a snake in your backpocket. প্রথমে তো কি বলছে সেটাই ধরতে পারেনি। যখন মানে উদ্ধার করতে পারল, তখন হীরক তার পকেটে যে সেরকম কিছু নেই বুঝাতে পিছন ফিরে পকেট উল্টে দেখাতে গেল। লোকটা— You are good, you are good বলে কোনওমতে হীরককে নিরস্ত করেছিল।

কারাওজেল থেকে ব্যাগ খুঁজে পেতে অত অসুবিধা হল না। স্যুটকেসে জামা কাপড় যত না আছে, বেশি আছে বিভিন্ন রকম শুকনো খাবারের পোঁটলা। বইও আছে। এসেব নিয়ে দুটো ঢাউস স্যুটকেসে দাঁড়িয়েছে। টানতে টানতে কাঁচের দরজা ছাড়িয়ে বাইরে পা দিতেই ঠান্ডা হাওয়ার ধাক্কায় আবার ভিতরে ঢোকার উপক্রম। এরকম কোনওদিন অনুভব করেনি হীরক। বরফের হাত দিয়ে যেন কেউ তাকে জাপ্টে ধরে ঠান্ডা সাঁড়াসিপ্যাঁচে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। চোখের জল বেরোলেও বোধহয় বরফ হয়েই চোখ থেকে খসে খসে পড়বে। ভীষণ দমে গেল হীরক। এ কোথায় এসে পৌঁছল সে? অপরিচয়েরও একটা শৈত্যপ্রবাহ আছে। অচেনা দেশের অজানা মুখের ভিড়ে নিজেকে অসহায় মনে হচ্ছিল খুব। হতাশার এই অন্ধকার থেকে তাকে টেনে তুলল এক দঙ্গল দেশির হইচই।

অপেক্ষমান লোকের ভিড়ে তার চোখ বিজুকে খুঁজছিল। এয়ারপোর্টে নিতে আসবে কথা ছিল। কিন্তু এটা ভাবেনি যে সঙ্গে ছোটখাটো একটা দলও থাকবে। ওরা তিনজন এসেছে, জানা গেল গাড়িতে জায়গার সমস্যা না থাকলে আরও জনা পাঁচেক দেশি চলে আসত ঠিক। নতুন দেশে, নতুন পরিবেশে পৌঁছে কী করবে, কীভাবে সব ম্যানেজ হবে এটা নিয়ে একটা টেনশন এতক্ষণ ক্লান্ত করে দিয়েছিল হীরককে। এদের দেখে সেসব এক ফুৎকারে হাওয়া।

–কী রে, কলকাতা থেকে আমাদের জন্য কিছু খাবার এনেছিস তো? বিজু হাসতে হাসতে এসে তাকে হাগ করল। এটা নতুন, কলকাতায় থাকতে এরকম আলিঙ্গনে অভ্যস্ত ছিল না হীরক। চার পরত গরম জামা ভেদ করেও এই অভ্যর্থনার উষ্ণতা ওকে চাঙ্গা করে দিল।
–Yes, we demand Bengali sweets. সাউথের ছেলে রাধাকৃষ্ণন হাসতে হাসতে এগিয়ে এল। মোটা গোঁফ আর পুরু ঠোঁটের ছেলেটা আই অ্যাম রাধা বলে হাত বাড়িয়ে দিল। বিজু বাঙালি বলে কোনও স্পেশাল ডিল করলে চলবে না কিন্তু। কলকাতার মিষ্টি আমরাও খেতে চাই। ইংরাজিতেই বলছিল, কিন্তু কিছু কিছু শব্দে পালিশ চড়লেও অ্যাক্সেন্টে একদম দক্ষিণী ছাপ্পা মারা।

বিজু জিভ ভ্যাঙ্গাল। আমি হীরুরটা খাবই না, আমার মা আমার জন্য স্পেশাল প্যাকেট পাঠিয়েছে। তাই না রে হীরু? সেখান থেকে আমি কাউকে দেব না।

–নেহি বিজু, শেয়ার করনা পরেগা। হীরকের ট্রলি টানতে টানতে রণধীর ঘাড় ঘুরিয়ে বলল। ইয়াদ রাখনা, গাড়ি ড্রাইভ করকে ম্যায় লেকে যা রাহা হু সবকো। এই বরফে গাড়ি চালানো সোজা কথা? তাই তো হীরক? এমনভাবে তাকে সাক্ষী মানল যেন কতদিনের চেনা। মনে একটা অদ্ভুত নিশ্চিন্তি ছেয়ে যাচ্ছিল।

গাড়ি চালানোটা সত্যিই খুব কঠিন কাজ। গাড়ি পার্কিং থেকে বেরোতেই রাস্তা বরফে ঢাকা। কী করে চালাচ্ছে কে জানে! রণধীর অবশ্য নিশ্চিন্ত করল, এমন রাস্তা নাকি শুধু শুরুর মাইল দুয়েক। তার পরেই ফ্রি ওয়েতে ঢুকে যাবে। ওখানে বরফ পড়ার আগেই গাড়ি করে গাদা গাদা নুন ছড়িয়ে রাখে, বরফ সহজে গলে যায়। শুধু ঝক্কি ফ্রি ওয়ে ছাড়িয়ে। ভিতরের রাস্তা দিয়ে মাইল পাঁচেক যেতে হবে অ্যান আরবার শহরের মধ্যে ঢুকে। ওখানে বরফের স্তূপ।

নতুন জানা ফান্ডা থেকে হীরক জিজ্ঞেস করল, কেন, ওরা নুন দেয় না?

রাধা হেসে উঠল। তা দেবে কেন! সবগুলো চিপকোর বাচ্চা। নুন দিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করবে না। ব্যস পায়ে বরফ আর হাতে হ্যারিকেন!

বিজু বলল, জানিস তো হীরু, এখানে লোকে তিনটে জিনিস নিয়ে কথা বলে— বরফ, গাড়ি আর আপ নর্থ। হীরকের জিজ্ঞাসু চোখের দিকে তাকিয়ে হাসল বিজু। গাড়ি তো বুঝতেই পারছিস কেন। ফোর্ড, জিএম, ক্রাইসলার সবাই এখানে। ছোটবেলা থেকে যেসব ব্র্যান্ড আর মডেলের নাম শুনেছিস মাস্তাং, ক্যাডিলাক, পন্টিয়াক, পর্শে সব একসঙ্গে রাস্তায় দেখতে পাবি। আর বরফ? বছরের ছয়মাস ঝরছে। যখন বরফ দেখতে দেখতে একেবারে ক্লান্ত হয়ে যাবি, বেশ কয়েকবার ব্ল্যাক আইসে আছাড় খেয়ে হালুয়া টাইট হয়ে যাবে, মনে হবে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি, তখন শীত মহারানির মনে হবে এবারের মত যথেষ্ট জ্বালালাম, এবার যাই।

–আর আপ নর্থের ফান্ডাটা কী?

বিজু গ্লাভস খুলে ডান হাতের পাতা মেলে ধরল। উপরে বাঁ হাত। বেড়াতে যাওয়ার কথা উঠলেই মিশিগ্যান্ডাররা এইভাবে মিশিগানের ম্যাপ দেখায় আর দেখিয়ে দেয় মিশিগানের উপর দিককার টাউনগুলো, আপ নর্থ। গরমের সময় উইকেন্ডে আপ নর্থে নিজের নিজের কেবিনে ছোটে সব যেভাবে বাঙালিরা হাজারিবাগ, দেওঘর যেত একসময়।

হীরক অবাক হয়ে বিজুর মুখের দিকে তাকিয়েছিল। কথা বলায় বিজু সবসময়েই অনর্গল। সেজন্য আশ্চর্য হয়নি। ও এমনভাবে বলছিল যেন কত বছর আছে। কে বলবে ওর জন্যে এটা সবেমাত্র দ্বিতীয় শীত। এত তাড়াতাড়ি নিজেকে আর একটা দেশের বানিয়ে ফেলেছে বিজু। ওকে দেখতেও কি অন্যরকম লাগছে? হাতে গ্লাভস, গলায় মাফলার, লাল রঙের ঘন উলের ওভারকোট, তার নিচে আরও তিন থাক গরম জামা। জামাকাপড়ে অনেক বেশি যত্নের ছাপ। বেশ গ্ল্যামারাস। তবে এত ভাগে জামা পড়ে ওকে একটু মুশকোই লাগছে। জিজ্ঞেস করতে বিজু মুখ কুঁচকে বলল, ইস, আমি খুব মোটা হয়ে গেছি না? আসলে এত জাঙ্ক খাই আর কোক—

–কোক মানে কোকা কোলা? হীরক এমনভাবে বলল যেন মুখ দিয়ে লাল টপকাচ্ছে। কেমন খেতে রে? থামস আপের মত?
–এ মা, তোর জন্যে আনতে হত একটা। কোই বাত নেই, এখানে খাবার সময় লোকে জলের বদলে কোক খায়। কদিন বাদে তুইও খাবি। এক টাকায় বার্গার, কোক আর আলুভাজা।
–টাকা? অতখানি অবাক না হলেও চলত। কিন্তু হীরক অবাক হয়েছিল এদেশে টাকায় কোনও জিনিসের দাম কেমন করে হয়।

বিজু হাসতে হাসতে বলল, আরে বাবা, ডলার, ডলার। আমরা দেশি লোক টাকা বলি। ডলার বললেই কেমন সাতাশ দিয়ে গুণ করতে ইচ্ছা হয় মনে মনে।

হীরক জানালার বাইরে চোখ মেলল। তার চারদিকে এক নতুন পৃথিবী। চেনাজানা জগতের গণ্ডি ছাড়িয়ে। আসার আগে থেকে বুক দুরদুর করছিল হীরকের। একদিকে নতুনের হাতছানি, অন্যদিকে আলাদা পরিবেশে নিজেকে মিশিয়ে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ। এদের মাঝখানে অনেকটা শান্ত হয়ে গেছে। বাইরের অন্ধকারের মত নিস্তরঙ্গ। যদিও গাড়ির আলোয় ফ্রি ওয়ের দুই পাশে বরফের স্তূপের উপর পড়ে কেমন একটা আধিভৌতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

সেটা বলতেই রাধা বলল, ধুর! মিশিগানে কেউ থাকে নাকি! বছরে ছমাস আইস বক্স হয়ে আছে। আমি পোস্ট ডক শেষ হলেই সোজা ক্যালিফোর্নিয়া। এমন কি অ্যারিজোনাতে যেতেও রাজী আছি। কিন্তু এইখানের ঠান্ডায় আমার পোষাবে না। দক্ষিণ ভারতের ছেলে রাধা অনেক গরম সহ্য করতে পারে, কিন্তু ঠান্ডা একেবারে নয়। গত চার বছর এই ঠান্ডার সঙ্গে লড়াই করেছে, আর করবে না। ব্যস!

–বরফের মধ্যে এই রাস্তায় গাড়ি চলে কীভাবে বিজু? ট্রেন নেই কোনও?
–হয়তো কোনওকালে ছিল, এখন বন্ধ।
–মালগাড়ি চলে, সেটা বাদ দিলে নামমাত্র। এই তো সেদিন মেট্রো ডেট্রয়েট স্টেশানের সৎকার কর্ম দেখে এলাম।
–মানে? হীরক খুব অবাক হল বিজুর কথা শুনে।

জানুয়ারির ছয় তারিখে ডেট্রয়েট মেট্রো স্টেশান থেকে শেষ ট্রেন ছাড়ল অ্যামট্র্যাকের। ভাব একবার, মনে কর আমাদের হাওড়া স্টেশান ক্লোজ ডাউন করছে। আমার বন্ধু সুজান নোভাস্কির বাবা একসময় এই স্টেশানের চিফ ছিল। রিটায়ার করেছে। কিন্তু এমন একটা ইমোশনাল মোমেন্টে পুরো ফ্যামিলি যাচ্ছিল, আমিও জুটে গেছিলাম।

–এই যা! আমি ভেবেছিলাম অ্যামট্র্যাকের ট্রেনে করে নিউ ইয়র্কে যাব। রাধা খুব হতাশ গলায় বলল।
–না, না ট্রেন চলছে। তুই তো অ্যান আরবারের স্টেশান থেকেই ধরতে পারবি। কিন্তু দিনে দুটো ট্রেনের জন্য তো ডেট্রয়েটের মত অত বড় একটা স্টেশান চালানো যায় না। ওদের আঠেরোটা প্ল্যাটফর্ম ছিল।
–ম্যায় ভি তো উস দিন গয়াথা বিজু। তুঝে দেখা নেহি।
–অত বড় স্টেশান, সেদিন শেষ দিন বলে খুব ভিড় ছিল দেখার জন্য। সুজানের বাবা রিক খুব ইমোশনাল হয়ে গেছিল। বলল এক সময় এই স্টেশান থেকে লোক গেছে যেমন, তেমনি এসেছেও। কাতারে কাতারে।
–কোথায়, ডেট্রয়েটে এত ভিড় তো দেখি না। বাড়িয়ে বলেছে। রাধা মানতে রাজী নয়। ভিড় দেখতে হলে যা নিউ ইয়র্কে।
–সে তো এখন। এই শতাব্দীর প্রথম দিকে ডেট্রয়েট ছিল আমেরিকার সবচেয়ে বড় শহর রাধা। অটো ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের খোঁজে তখন হাজার হাজার লোক এসে পৌঁছেছে এই ডেট্রয়েট স্টেশানে। রিকের কথায় এই স্টেশান ছিল ডেট্রয়েটের এলিস আইল্যান্ড, ইমিগ্র্যান্টদের প্রবেশদ্বার।
–কোথা থেকে আসত ওরা? হীরক নিজেকে সেদিনের অভিবাসীদের সঙ্গে তুলনা করে উত্তেজিত বোধ করছিল। এখন ও সেই দলে।
–ইউরোপ আর মিডল ইস্ট। ইংল্যান্ড, ইটালি, পোল্যান্ড কোথা কোথা থেকে না আসত! সাউথের থেকে তাড়া খেয়েও এসেছে অ্যাফ্রিকান আমেরিকানরা।
–হ্যাঁ, হ্যাঁ জানি। ফোর্ডের পিকেট অ্যাভেনিউয়ের ফ্যাক্টরিতে মডেল টি বানানো শুরু করার পর প্রচুর কাজ তৈরি হয় এখানে।  ব্যাস, ইমিগ্র্যান্টদের আসা শুরু হল। রাধা মেক্যানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, অটোমোবাইলে মেজর। নিজের ইন্ডাস্ট্রির হালহকিকত ওর নখদর্পণে।
–ঠিক, সেটাই রিক বলছিল। কী ছিল সেই যুগ আর এখন কী। তখন নাকি এলিস আইল্যান্ডে বলে দেওয়া ছিল স্কিল্ড ইমিগ্র্যান্ট হারবারে এসে পৌঁছালে তাদের যেন ডেট্রয়েট স্টেশানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
–স্টেশানটার কারুকাজ দেখেছিলি বিজু? বড় বড় থাম। অবশ্য এর আর্কিটেকচার নিউ ইয়র্কের গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল স্টেশানের আদলে। কপি অনেকটা।
–হতে পারে, কিন্তু রিকের কাছে শুনেছিলাম, এই স্টেশানের মত অত উঁচু সেন্ট্রাল টাওয়ার আর কোথাও ছিল না তখন— পনেরো তলা। ডেট্রয়েট ছিল আমেরিকার সবচেয়ে উঁচু রেলওয়ে স্টেশান।
–রিয়ালি?
–তাই তো বলল। ভদ্রলোক খুব আবেগাপ্লুত হয়ে গেছিল। আমরা যখন পৌছালাম শেষ ট্রেন যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। সেদিকে তাকিয়ে রিক বলল, কিসব ট্রেন গেছে একদিন এই স্টেশান দিয়ে। টোয়াইলাইট, মার্কারি, উলভারাইন— সোজা ডেট্রয়েট থেকে নিউ ইয়র্ক। এম্পায়ার স্টেট এক্সপ্রেস— এখান থেকে ক্লিভল্যান্ড হয়ে নিউ ইয়র্ক। সেই ডেট্রয়েট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ছোট হওয়া শুরু করল। এই স্টেশানও তার গ্ল্যামার খোয়াতে শুরু করল।
–কেন? অ্যামেরিকা তো তখন পৃথিবীর রাজা?
–জাপানিদের হাতে লেঙ্গি খেল যে। রাধা অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিঙে মাস্টার্স করছে। নিজের টপিক পেয়ে সোৎসাহে ফান্ডা দেওয়া শুরু করল। ইকোনমিতে তখন অনেক টাকা। সবার চোখ আপ মার্কেট গাড়ি বানানোয়। ফোর্ড জিএমের সস্তার গাড়ি বানানোর সময় কোথায়। সেই ফাঁক ভরাতে জাপানি কার ইম্পোর্ট  করা শুরু হল। সেই যে জাপানিরা ঢুকল, আর আটকানো গেল না। তখন থেকেই এখানে চাকরির বাজার মন্দা। চাকরি কমতে লাগল, বেকার লোকের সংখ্যা বাড়তে লাগল। চুরিচামারি, তার সঙ্গে দাঙ্গাহাঙ্গামা।

হীরক এখানের দাঙ্গার কথা পড়েছে। এখানে আসার আগে মিশিগানের ইতিহাস ঘাঁটতে ঘাঁটতে পরা। সেটাই বলল, ৬৭র দাঙ্গার কথা পড়লাম তো। অনেক লোক মারা গেছিল, বেশিরভাগ অ্যাফ্রিকান অ্যামেরিকান। শয়ে শয়ে বাড়ি ভাঙচুর।

–ঠিক তাই। এই শহর খাবি খেতে শুরু করল, সঙ্গে সঙ্গে এই স্টেশানের শেষের ঘণ্টা বাজতে শুরু করল। ওই দাঙ্গার পর গত কুড়ি বছর ধুঁকে ধুঁকে চলেছে। বেচারা রিকের চোখ ছলছল করছিল। একসময় এই স্টেশানের চিফ স্টেশান মাস্টার ছিল। ওর দুঃখটা বোঝা যায়।

এইভাবেই সময় বদলে যায়।

কথায় কথায় অনেক দূর চলে এসেছে। এই অন্ধকারেও সাঁ সাঁ করে চারদিকে ছুটন্ত গাড়ি দেখতে দেখতে বলল হীরক। শুধুই গাড়ি, বাস নেই। আর লম্বা লম্বা ট্রাক। দেশে অ্যাম্বাসাডার অথবা ফিয়াট ছাড়া গাড়ি কোথায়? গত ক বছর অবশ্য মারুতি গাড়ি বাড়ছে। কিন্তু এখানের এতরকমের বিশাল বিশাল গাড়ির কাছে কিছুই না। সত্যিই গাড়ি বানানোর দেশে এসে পড়েছে হীরক।

–এখানে গাড়ি ছাড়া লোকের চলে না রে। পাবলিক ট্র্যান্সপোর্ট নাম মাত্র। আমাদের খুব অসুবিধা, গাড়ি নেই তো। আমি তো এখনও চালাতেই জানি না। তবে রণধীরের মত কয়েকজনের গাড়ি আছে। তাই এই রাস্তায় গাড়ি চালানোর হিসেবটা রণধীরই দিতে পারবে।

অবাক লাগছিল হীরকের। আর যাই হোক, চাকরি তো করে না। পোস্ট ডক করছে। এইখানে এসে এক দুই বছরে এত বড় গাড়ি কিনে ফেলল? রণধীর ভুল ভাঙাল। অত সোজা নয় বস। এটা পনেরো বছরের পুরনো গাড়ি। গাড়ির মালিক ফেলে দিচ্ছিল, তাই দুশো ডলারে কিনে নিয়েছি। আমার সিটে বসলে দেখতে পেতে পায়ের তলা দিয়ে ছুটন্ত রাস্তাও দেখা যাচ্ছে।

–তোর যা গাড়ি, মালিক এমনিতেই ফেলে দিত। মুফতে দুশো টাকা নিয়েছে।
–এখানে পুরনো জিনিস কেনার দিকে নজর রাখতে হয় হীরু। এখানে এমন ঠান্ডা, ফেব্রুয়ারিতে টেম্পারেচার আরও নামবে। তুই শীতের যা পোশাক পড়েছিস এখানে যথেষ্ট নয়। খুব শিগগির একদিন তোকে পুরনো জামাকাপড়ের দোকানে নিয়ে কিনিয়ে দেব, শীত পড়ার আগেই।

বিজুর মধ্যে সবসময়েই এরকম প্রোটেকটিভ ভাব। কলেজেও এমনি ছিল। একেকসময় বিরক্ত লাগে, কিন্তু এখন খুব কৃতজ্ঞ বোধ করছিল মেয়েটার উপর। আসার আগের থেকে সব কিছু ব্যবস্থা করে রেখেছে। এমনকি থাকার জায়গাও। বিদেশে এসে এইরকম নিশ্চিন্ত আশ্রয় পাবে ভাবতে পারেনি। কিন্তু বিজু আর অন্য সবাই হইহই করে তার সমস্ত দুশ্চিন্তাকে যেন এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে। এনে দিয়েছে সাহস, ভরসা। হীরক মনে মনে নিজেকে তৈরি করছিল। নিত্যনতুন অনেককিছু দেখবে, জানবে। সেটা নিয়ে ঘাবড়াবার কিছু নেই। নতুন দেশ তাকে দুই হাত দিয়ে আলিঙ্গন করেছে। তার জন্য বিজু, রাধা, রণধীর এদের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা বোধ করল হীরক। বিজুকে বলতে ও কানের কাছে ফিসফিস করল, দেখবি এখানে নিজের আত্মীয়পরিজন থেকে এত দূরে থাকার জন্য বন্ধুত্বের মানে অনেক বেশি গভীর। খুব কম সময়েই বন্ধুরা আত্মীয়ের থেকেও কাছের মানুষ হয়ে দাঁড়াবে।

এয়ারপোর্ট ছাড়াতেই রাস্তার দুধারে বরফের স্তূপ বাড়ছিল। অনেকটা এসে গেছে, কিন্তু এবার টুপটুপ করে বরফ পড়া শুরু হল। ঠিক যেন পালকের মত ভেসে ভেসে পড়ছে। এমন বেড়ে গেল ওয়াইপারে সরাতে সরাতেই আবার কাঁচ সাদা হয়ে যাচ্ছে। কী দারুণ না? কেমন সাদা হয়ে আছে চারদিক।

–একদিন দুদিন এসব ভালো লাগে বস। তারপর বেয়ার করা যায় না। এত গ্লুমি!
–বছরের প্রথম কটা স্নো ডে সবাই খুব এনজয় করে বুঝলি। Everyone likes a white Christmas. কিন্তু জানুয়ারি পড়তেই সবাই তিতিবিরক্ত। ফেব্রুয়ারিতে তো ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি।
–আমার নভেম্বর, ডিসেম্বর কোনও সময়েই বরফ ভালো লাগে না। এর চেয়ে আমার মে মাসের গরমে অগ্নিনক্ষত্রম অনেক ভালো। রোম্বা নাল্লা! রাধা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এমনভাবে বলল, যেন কালকেই মাদ্রাজ যেতে বললে চলে যায়। আর সকালে ইডলি ধোসা দিয়ে গরমে পিঠ সেঁকতে সেঁকতে ব্রেকফাস্ট সারে।

হীরকের মনে হল গাড়ির ভিতরে ভারতবর্ষ চলেছে তার অকৃত্রিম রূপে। অথচ বাইরের রাস্তাটা বিদেশের। ওর খুব জানতে ইচ্ছে করে এই বিজু, রাধা কিংবা রণধীর তাদের অ্যামেরিকান বন্ধুদের পাশাপাশি কীভাবে এই ভারতীয়ত্ব রক্ষা করে। রাশিয়া থেকে উড়ে আসা পরিযায়ী পাখিদের মত বিলে সারা বছর ধরে থাকা মাছরাঙ্গা, পানকৌড়ি, ফিঙ্গেদের সঙ্গে কী ধরনের ইন্টার‍্যাকশন হয়? হঠাৎ মাথায় এল, রাশিয়ান সারসেরা কীভাবে হিন্দমোটরের বিলে এসে নিজের পছন্দমত খাবার খায়?

খাবারের কথা ভাবতেই মায়ের হাতের ডাল আর পোস্তর স্বাদ একেবারে জিভের ডগায়। নাঃ! ওসব না ভাবাই ভালো। যস্মিন দেশে যদাচার ভেবে যা পাবে তাই খেতে থাকবে। হীরক জিজ্ঞেস করল, তোরা কী ধরনের খাবার খাস রে?

–মচ্ছি মিল হো জায়েগা বাবুমোশাই, লেকিন খুদ পাকানা পড়েগা। নেহি তো বর্গার অউর ব্যাগেল খাকে জিনা হারাম। তারপর হাসতে হাসতে রণধীর বলল, বঙ্গালী লোগ ভেজ খা সকোগে? ডেট্রয়েট ইস্কন টেম্পল যা সকতে হো, মুফত মে খিচড়ি মিলেগা। বলে পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে হা হা করে হেসে উঠল এবার।
–রণধীর তু পিছে মত মুড়, focus on the road. বিজু ধমক দিল। জানিস হীরু, এরা দল বেঁধে রোববার করে ইস্কনে খিচুড়ি খেতে যায়। আমার পোষায় না। অবশ্য রণধীরের ইস্কন যাবার অন্য উৎসাহও আছে। তাই না রণধীর?
–তেরি শোচ গলত হ্যায়। ঘনঘন মাথা নেড়ে প্রতিবাদ করল রণধীর। বিজুর কথায় বোঝা গেল ও শুধু খিচুড়ি খেতেই যায় না, ভজনকীর্তনও করে। ইছামতী দাসী নামে এক সন্ন্যাসীনীর সঙ্গে তার খুব ঘনিষ্ঠতাও আছে। ইছামতী দাসী কোনও নদীয়ার থেকে আসা মেয়ে নয়, আসল নাম অ্যাডেল। ক্যালিফোর্নিয়ার মেয়ে, ওখানেই  কৃষ্ণচেতনায় আপ্লুত হয়ে শ্রী শ্রী প্রভুপাদ নামের গুরুজির সঙ্গে কণ্ঠিবদল করে ডেট্রয়েট এসে গেছে এখানকার মন্দির গড়ে তোলার কাজ নিয়ে।
–That’s a shit joke Biju. Repulsive! রণধীরের হাবভাব দেখে বোঝা যাচ্ছিল ওর মোটেই ভালো লাগছে না কথাগুলো। রণধীরের ঠিক পেছনে বিজু, তাই মুখ দেখতে পাচ্ছে না। হীরক পেছনে, কিন্তু কোনাকুনি। বুঝতে পারলে বিজু হয়তো আর এগোত না। কথার নেশায় বলে যাচ্ছিল। প্রভুপাদ কিছুদিন আগে বেপাত্তা হয়েছেন। ইছামতী দাসী এখন রণধীরের সঙ্গে কণ্ঠিবদল করার প্ল্যান করছেন। তাই না রণধীর? বলতে বলতেই বিজু হীরকের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল, তার মানে লেগ পুল করছে ছেলেটার। কিন্তু বিজুর এমন টিপ্পনিতে রণধীর এবার রাগে ফেটে পড়ল। That’s below the belt Biju. কী জানিস তুই এই বিষয়ে? শুধু শুধু এমন একজন সাধ্বীর নামে যা তা বলছিস!

গলার স্বরে বিজু সতর্ক হয়ে গেল। এত রেগে যাবে আগে থাকতে বুঝতেই পারেনি। ছোড় দো রণধীর। যা শুনেছি লোকের কাছে তাই বলেছি।

রণধীর রাগে গড়গড় করছিল। কে বলবে একটু আগেই এত হাসি মজা হচ্ছিল গাড়ির ভিতর। এমন অন্যমনস্ক হয়ে গেছিল যে অ্যান আরবারে ঢোকার রাস্তাটাই মিস করে চলে যাচ্ছিল।

রাধা তারস্বরে চেঁচাল, রণধীর, এক্সিট, এক্সিট!

রণধীর সেটাই করল যেটা বরফের রাস্তায় একদমই করা উচিত নয়। রাস্তার বাঁকটা চলে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে একটা শার্প টার্ন নিয়ে ভুল শোধরানোর চেষ্টা করল। গাড়িটা শোল্ডারের উপর দিয়ে ভয়ানক শব্দে ঘুরতে ঘুরতে বরফের স্তূপে ধাক্কা খেয়ে সম্পূর্ণ উল্টো। সবকিছু হল এক মুহূর্তের মধ্যে। গাড়িটা উল্টানোর মুহূর্তেই হীরক বুঝতে পারল তার অনভ্যস্ত হাতে সিট বেল্ট ঠিক করে লাগেনি। ও নিজের সিট থেকে প্রায় উড়ে গিয়ে বিজুর মাথায় ভীষণ জোরে গুঁতো মেরে গাড়ির ছাদে যতক্ষণে মাথা ঠুকল, সেই ছাদও ততক্ষণে রাস্তা ছুঁয়েছে। এরপর হীরকের আর কিছু মনে নেই।

 

(আবার আগামী সংখ্যায়)


ছায়াপাখি-র সমস্ত পর্ব পড়ুন এখানে: ছায়াপাখি — বিশ্বদীপ চক্রবর্তী

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2947 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...