বলিভিয়া: যে দেশটা বাঁচতে চায়

এদুয়ার্দো গালেয়ানো

 

তর্জমা: সুশোভন ধর

(মূল স্প্যানিশ থেকে)

২০০৩ সালে বলিভিয়া বিক্ষোভ, গণ-অভ্যুত্থান ও বিদ্রোহে উত্তাল হয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বামপন্থী ও আদিবাসী নেতা এভো মোরালেস। উরুগুয়ের প্রখ্যাত সাংবাদিক, লেখক ও ঔপন্যাসিক, এদুয়ার্দো গালেয়ানো বলিভিয়ার সেই মুহূর্তের ঘটনাগুলি নিয়ে এই প্রবন্ধটি লেখেন। লেখাটি আজও আমাদের মনোযোগ দাবি করে, বিশেষ করে বলিভিয়ার সাম্প্রতিক নির্বাচনে বামপন্থীদের পুনরায় জয়যুক্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে।

একটি বড় আকারের গ্যাস বিস্ফোরণ! এবং একটি গণ-অভ্যুত্থান! কেঁপে উঠল বলিভিয়া। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি সাঞ্চেজ দে লোসাদা পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। বাধ্য হলেন পালাতে। পিছনে পড়ে রইল সারি বাধা মৃতদেহ।

যৎসামান্য মূল্য ও অল্প রয়্যালটির বিনিময়ে এই গ্যাস পাঠানোর তোড়জোড় চলছিল চিলির ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে। এই ভূখণ্ড ছিল এককালে বলিভিয়ার অংশ। সেই ভূখণ্ডের এক বন্দর দিয়ে এই গ্যাস পাচারের বন্দোবস্ত পুরনো ক্ষতে নতুন রক্তক্ষরণের জন্ম দেয়। বন্দরে পৌঁছনোর এই পথের ওপর বলিভিয়ার দাবি শতাধিক বছরের পুরনো। এই দাবির প্রতি অবহেলাও ততোধিক পুরনো। ১৮৮৩ সালে এক যুদ্ধে চিলি জয়লাভ করে। ফলশ্রুতিতে বলিভিয়া হারায় ওই ভূখণ্ডের ওপর তার অধিকার।

তবে শুধু গ্যাস-রুটের কারণেই চারিদিকে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠল তা নয়, বরং বঞ্চনার বিরুদ্ধে বলিভিয়া যখনই ক্ষোভে উত্তাল হয়েছে নিয়মমাফিক গুলি চালিয়ে সরকার পথে পথে ছড়িয়ে দিয়েছে লাশের স্তূপ। রূপা, সোরা টিন ও আরও সম্পদ নিয়ে যা কিছু আগে ঘটেছিল, গ্যাসের ক্ষেত্রে তার পুনরাবৃত্তি ঘটতে দিতে রাজী ছিল না বলিভিয়ার মানুষ।

স্মৃতি যন্ত্রণা দেয়, স্মৃতিই শেখায়। অ-পুনর্নবীকরণযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ চুপিসারে পাচার হয়ে গেলে আর কখনও ফিরে আসে না।

 

বলিভিয়া তার সন্তানদের কাছে অস্তিত্বহীন

১৮৭০ সালে, এক ইংরেজ কূটনীতিককে ঘিরে বলিভিয়ায় এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। ওই কূটনীতিককে স্বৈরশাসক মারিয়ানো মেলগারেখো এক গ্লাস চিচা (ভুট্টা গেঁজিয়ে বানানো স্থানীয় পানীয়) পান করতে দিয়েছিল। তিনি সবিনয়ে  তা প্রত্যাখ্যান করে নিজের চকলেটপ্রীতির কথা জানিয়ে দেন। মেলগারেখো তাঁকে ভরপেট খাওয়ায়, অতঃপর এক জালা চকলেট পান করতে বাধ্য করে। শেষমেশ উলটো গাধায় চড়িয়ে লা পাজ শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘোরায়। লন্ডনে রানি ভিক্টোরিয়া বিষয়টি জানতে পারেন, একটি মানচিত্র চেয়ে পাঠান, বলিভিয়ার ওপর ক্রস কেটে বলেন: বলিভিয়ার কোনও অস্তিত্ব নেই।

আমি এই গল্পটি বেশ কয়েকবার শুনেছি। ঠিক এভাবেই কি ঘটেছিল? হয়তো। হয়তো না।

তবে সাম্রাজ্যবাদী ঔদ্ধত্যের এই গল্প বলিভিয়ার মানুষের ওপর চেপে বসা এক অত্যাচারের ইতিহাসের সংশ্লেষ হিসাবে পাঠ করা যেতে পারে। ঘূর্ণায়মান নাগরদোলার মতোই এই ট্র্যাজেডিগুলির পুনরাবর্তন। বলিভিয়ার অতুলনীয় সম্পদ আসলে পাঁচশো বছর ধরে বলিভিয়াবাসীর উপর অভিশাপ। সেই অভিশাপে তারা দক্ষিণ আমেরিকায় দরিদ্রতম। বলিভিয়া অস্তিত্বহীন। তার সন্তানদের কাছে তার অস্তিত্ব নেই।

 

সেররো রিকো আদিবাসীদের গিলে খেয়েছে

ঔপনিবেশিক সময়ে, দুশো বছরের বেশি সময় ধরে ইওরোপীয় পুঁজিবাদী বিকাশকে পুষ্টি জুগিয়েছে পোতোসির রুপো। পোতোসির মতো দামী বললে ধরে নেওয়া হত যে বস্তুটি অমূল্য।

ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি রুপো ওগরানো এই পাহাড়ের পায়ের তলায় জন্ম নেয় আর বেড়ে ওঠে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল, সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং সবচেয়ে অপচয়ী শহর। আদিবাসীদের গ্রাস করে নেয় সেই সেররো রিকো বা সমৃদ্ধ পাহাড়। পোতোসির এক ধনী খনিমালিক লেখেন, “রাস্তাগুলি এতটাই জনাকীর্ণ যে দেখে মনে হচ্ছে হেঁটেচলে বেড়াচ্ছে গোটা একটা রাজ্য।” চারদিক থেকে বন্দি করে আনা ঘরছাড়া পুরুষের মিছিল যেত খনির মুখে। বাইরে হিমশীতল আবহাওয়া। ভেতরে নরক। খনির ভেতরে ঢোকা প্রতি দশ জনের মধ্যে মাত্র তিন জন বেঁচে ফিরতে পারত।

খনিতে নিক্ষিপ্ত এই মানুষগুলিই গড়ে দিয়েছিল ফ্লেমিশ, জার্মান আর জেনোয়ার ব্যাঙ্কারদের ভাগ্য, যারা স্পেনীয় রাজবংশকে অর্থ ধার দিত। ইউরোপকে ইউরোপ করে তোলার পেছনে যে পুঁজির পুঞ্জীভবন তা এই আদিবাসীদেরই দৌলতে। আর বলিভিয়ায় ভাগ্যে কী পড়ে ছিল? একটি ফাঁকা পাহাড়, ক্ষয়, নিরতিশয় ক্লান্তিতে মৃত অগণিত আদিবাসী এবং কয়েকটি ভূতে পাওয়া প্রাসাদ।

 

আরসমুদ্র হারিয়ে গেল

উনিশ শতকে তথাকথিত প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধে বলিভিয়া সমুদ্রে যাওয়ার পথ হারিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার মাঝে কোণঠাসা হয়েছিল। সেই সঙ্গে হারিয়েছিল তার সোরার ভাণ্ডার।

সরকারি ইতিহাস বা সামরিক ইতিহাসের বয়ান অনুযায়ী চিলি ছিল বিজেতা কিন্তু ইতিহাসের প্রকৃত বয়ান বলে যে বিজয়ী ছিলেন ব্রিটিশ ব্যবসায়ী জন থমাস নর্থ। একটি গুলি না চালিয়ে বা এক টাকা খরচ না করেই নর্থ, বলিভিয়া ও পেরুর অঞ্চলগুলি জয় করে সোরার দখল নেন, যা তদ্দিনে ইউরোপের ক্লান্ত জমিতে পুষ্টিদানের জন্য প্রয়োজনীয় সার হিসাবে কাজ করতে শুরু করেছে।

 

শ্রমিকদের ফুসফুসের বিনিময়ে

বিংশ শতাব্দীতে, আন্তর্জাতিক বাজারে টিনের প্রধান সরবরাহকারী ছিল বলিভিয়া।

অ্যান্ডি ওয়ারহলকে বিখ্যাত করা টিনপ্লেট প্যাকেজগুলি যেসব খনি থেকে এসেছিল, সেই সব খনিতে উৎপন্ন হত টিন এবং বিধবা দুই-ই। খনির গভীরে সিলিকার অজস্র ধূলিকণা শ্বাসরোধ করে মারত শ্রমিকদের। সেখানে শ্রমিকরা তাদের ফুসফুসের বারোটা বাজিয়ে গোটা পৃথিবীর জন্য সস্তায় টিন পাওয়ার পথ প্রস্তুত করত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, মিত্রশক্তির পাশে দাঁড়াতে, বলিভিয়া এই ধাতুটি তার স্বাভাবিক দামের দশভাগের একভাগ দামে বিক্রি করে। মজুরি হিসাবে শ্রমিকদের এক-আধ কানাকড়ি দেওয়া হত আর তারা ধর্মঘট করলে ঠান্ডা করা হত মেশিনগান দিয়ে। বিখ্যাত টিন-ব্যাবসায়ী সিমোন পাতিনিয়োর হুকুমে চলত বলিভিয়া। সে কখনও কোনও ক্ষতিপূরণের ধার ধারেনি। কারণ মেশিনগানে গণহত্যা তো কর্মস্থলে দুর্ঘটনা হিসাবে গ্রাহ্য হতে পারে না।

সেই সময়, শ্রীযুক্ত সিমোন বছরে পঞ্চাশ ডলার আয়কর দিতেন, তবে তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি এবং তাঁর পুরো মন্ত্রিসভাকে অনেক বেশি অর্থ নজরানা দিয়েছিলেন।

এই না খেতে পাওয়া মানুষটির গায়ে লেগেছিল সমৃদ্ধি দেবীর জাদুদণ্ডের ছোঁয়া। তাঁর নাতি-নাতনিরা ইউরোপীয় আভিজাত্যের অংশ হয়ে ওঠে এবং কাউন্ট, মারকিস ও রাজারাজড়াদের আত্মীয়দের সাথে গড়ে ওঠে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক।

১৯৫২ সালের বিপ্লব যখন পাতিনিয়োকে হঠিয়ে টিনের জাতীয়করণ করে তখন এই খনিজ সম্পদটির আর বিশেষ কিছু অবশিষ্ট ছিল না। পড়ে ছিল বিশ্ববাজারের চাহিদা মেটানোর তাগিদে অর্ধ শতাব্দী ধরে বিপুল লুঠপাটের ধ্বংসাবশেষ।

 

আয়নায় থুথু ফেলো না

একশো বছরের ওপর আগে ইতিহাসবিদ গ্যাব্রিয়েল রেনে মোরেনো আবিষ্কার করেছিলেন যে বলিভিয়ার লোকেরা “শারীরিকভাবে অক্ষম”। তিনি আদিবাসী এবং মেস্তিজো মস্তিষ্ক দাঁড়িপাল্লায় রেখে দেখেছিলেন যে তাদের ওজন সাদা মস্তিষ্কের চেয়ে পাঁচ, সাত এবং দশ আউন্স কম।

সময় বয়ে গেছে, এই অস্তিত্বহীন দেশটি আজও বর্ণবিদ্বেষের শিকার। বাঁচতে চাওয়া এই দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসীরা কিন্তু তাদের বর্তমান অবস্থার জন্য লজ্জা পায় না। সেদেশ আয়নায় থুথু ফেলে না।

অপরের অগ্রগতির জন্য বলিপ্রদত্ত হতে হতে ক্লান্ত ধ্বস্ত এই বলিভিয়াই আসল বলিভিয়া। তবে ইতিহাসের উপেক্ষা এবং অসংখ্য বিশ্বাসঘাতকতার বাইরে রয়েছে তাদের অগুনতি অলৌকিক গল্প। অস্তিত্বের হীনম্মন্যতা ও নিজেদের অন্তর্কলহ কাটিয়ে উঠতে পারলে তারাও ছুঁড়ে দিতে পারে পাল্টা ঘৃণা।

খুব বেশিদিন হয়নি, এই প্রবল প্রাণশক্তির বিস্ফোরণ বিস্ময়কর সব ঘটনার জন্ম দিচ্ছে।

 

বুশের ইংরেজি

২০০০ সালে নজিরবিহীনভাবে একটি শহরের থেকে তার জল কেড়ে নেওয়া হয়। তথাকথিত এই “জল-যুদ্ধ” ঘটেছিল কোচাবাম্বায়। কৃষকরা উপত্যকা থেকে বেরিয়ে এসে শহরটিকে অবরুদ্ধ করে, গর্জে ওঠে শহরটিও। সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে গুলি ও টিয়ারগ্যাস দিয়ে মোকাবিলা করার চেষ্টা করে। অদম্য উৎসাহে সম্মিলিত বিদ্রোহ অব্যাহত ছিল সেই চূড়ান্ত লড়াই অবধি, যে লড়াইয়ে তারা বেকটেল কোম্পানির হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল জল,  পুনরুদ্ধার করেছিল নিজেদের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। (ক্যালিফোর্নিয়ার বেকটেল কোম্পানির মাথায় এখন রাষ্ট্রপতি বুশ জলপট্টি পরাচ্ছে ইরাকে তাদের হাতে কয়েক মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা তুলে দিয়ে)।

কয়েক মাস আগে, বলিভিয়া জুড়ে আর একটি গণ-বিস্ফোরণ আইএমএফ-কে পরাস্ত করে। আইএমএফকে তাদের ভারী মূল্য চোকাতে হয়েছিল— তথাকথিত শৃঙ্খলারক্ষা বাহিনীর হাতে মারা গিয়েছিল তিরিশ-অধিক মানুষ, তবু তাদের দমানো যায়নি। আইএমএফ সরকারকে বাধ্য করেছিল চাকুরিজীবীদের ওপর কর চাপাতে। কিন্তু শেষ অবধি তা বাতিল করা ছাড়া সরকারের হাতে কোনও বিকল্প কিছু ছিল না।

এখন গ্যাসযুদ্ধ চলছে। বলিভিয়ায় আছে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল ভাণ্ডার। সাঞ্চেজ দে লোসাদা গ্যাসের এই ছদ্মবেশী বেসরকারিকরণের নাম দিয়েছিলেন ক্যাপিটালাইজেশন। কিন্তু দেশটি টিঁকে থাকতে চায়। তারা প্রমাণ করেছে যে তাদের স্মৃতিশক্তি লোপ পায়নি। দেশের সম্পদ কি আরও একবার উবে যাবে বিদেশিদের হাতে? বিক্ষোভের পোস্টারগুলি ঘোষণা করে “গ্যাস আমাদের অধিকার”। জনগণের দাবি ছিল, আজও আছে— শুধুমাত্র বলিভিয়ানদের প্রয়োজনের কথা ভেবেই যেন গ্যাস উত্তোলন করা হয়। ভূগর্ভস্থ এই সম্পদই যেন দেশের নীতিনির্ধারক না হয়ে ওঠে। “আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার” শুধু আওড়ানোই হয়েছে এতদিন, হয়ত বা কালেভদ্রে প্রয়োগ ঘটেছে, এখান থেকেই শুরু হল তার জয়যাত্রা।

গণ আইন অমান্যের ফলে প্যাসিফিক এলএনজি কর্পোরেশন এক লোভনীয় ব্যবসায় হারাতে বাধ্য হয়। রেপসল, ব্রিটিশ গ্যাস এবং প্যান-আমেরিকান গ্যাস জোটবদ্ধ হয়েছিল একই ছাতার তলায়। শেষোক্ত কোম্পানি আবার এনরনের জুড়িদার এবং বাজারে তার ব্যাপক সুখ্যাতি! পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল যে এই কর্পোরেশন প্রতি ডলার বিনিয়োগ পিছু দশ ডলার কামানোর ধান্দা করছিল।

পলাতক সাঞ্চেজ দে লোসাদা রাষ্ট্রপতি পদ হারিয়েছেন, কিন্তু আশিজন বিক্ষোভকারীকে খুন করার অপরাধ তার নিদ্রিত বিবেক বা নিদ্রা— কোনওটারই ব্যাঘাত ঘটায়নি। আর রক্তপাতও তিনি এই প্রথম ঘটালেন এমনটা নয়। আধুনিকীকরণের এই পুরোধা লাভজনক নয় এমন কিছু নিয়ে বিচলিত হন না। সবচেয়ে বড় কথা তিনি ইংরাজিতে ভাবতে এবং কথা বলতে পারেন। তবে তা শেক্সপিয়ারের ইংরেজি নয়, বুশের।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3170 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...