পুতুলরানি কথা

রিমি মুৎসুদ্দি

 

পুতুলরানি মরিয়াছে। গলায় ফাঁস লাগাইয়া কীভাবে সে সত্যি সত্যি মরিতে সক্ষম হইল সে খোঁজে সারা পাড়া আর তেমন উত্তাল হইল না। আজ পুতুলরানির মরিবার খবর শুনিয়া কাহারো বিশেষ কিছুই মনে হইল না। আসলে পুতুলরানি তো মরিতই একদিন। শুধু সে নহে, আমরা সবাই একদিন মরিব। কিন্তু মরিবার তরে আমাদের কি দুঃখ হয়? শোক হয়? নিজের জন্য শোক? কেবল নিজের জন্য বিলাপ?

পুতুলরানি আর ফিরিবে না। তাহার এককামরার থেকেও ছোট স্যাঁতস্যাঁতে সেই ঘুপচি খোলের ভেতর সে আর ফিরিবে না। ওইটুকুই তাহার সাম্রাজ্য ছিল। সে ছিল সেই সাম্রাজ্যের একমাত্র সম্রাজ্ঞী। স্বামী যতদিন জীবিত ছিল ততদিন সে সাম্রাজ্যে তাহার প্রবেশাধিকার ছিল না। বিহারের কোনও এক অজ গাঁয়ের বধূটি একবেলা খাইয়া অথবা অভুক্ত থাকিয়াই তাহার দিনাতিপাত করিতেছিল। বাড়ি হইতে বেশ কয়েক ক্রোশ দূর হইতে সে জল আনিত। ঘরদোর, গোয়াল বাছুর সামলাইত। জা ভাশুর দেবর শ্বশুর সকলের ফাইফরমাইশ দিনরাত খাটিত। আর বিস্তর বকুনি, সকলের খোঁটা শুনিতে শুনিতেও সে বাঁচিয়াছিল। বেশ প্রবলভাবেই সে বাঁচিয়াছিল। তাহা না হইলে আমার সঙ্গে পুতুলরানির দেখা হইবে কী করিয়া?

যেদিন প্রথম পুতুলরানিকে দেখিলাম, তাহার একমাথা চুল। পিঠ ছাপাইয়া কোমর পর্যন্ত বিস্তৃত। ছিপছিপে ফরসা গড়ন, কিন্তু তন্বী তাহাকে বলা চলে না। কোনও কঠিন রোগে রীতিমতো শুকাইয়া চিমসে হইয়া পড়া এক অদ্ভুত গড়ন। গায়ের রংখানি কেমন ফ্যাকাসে, রক্তশূন্য!

‘একে দিয়ে কোনও কাজই হবে না। এই নতুন ফ্ল্যাটে এ আবার কী আপদ এল। নতুন কাজের লোক পেলেই একে দূর করে দিতে হবে।’

সদ্য কলেজে পা রাখা চপলস্বভাবের আমি সেদিন পুতুলরানিকে ঝাঁটা হাতে ঘর ঝাড় দিতে দেখিয়া একথাই বলিয়াছিলাম। আমার মাতৃদেবী আমার কথাকে বিন্দুমাত্র আমল না দিয়া পুতুলরানিকে সেদিন হইতেই কাজে বহাল করিলেন। আর সে একা নয়, সঙ্গে তাহার দুই শিশুপুত্র ও দুই কন্যাও। মায়ের টিউশন পড়াইবার ঘরটিতে তাহাদের পাকাপাকি জায়গা হইল। আমরা যে কদিন উত্তর কলকাতার বাসিন্দা ছিলাম আমাদের ফ্ল্যাটটিতে ও আমাদের মনের মাঝেও পুতুলরানি সপরিবারে এক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করিয়া লইল।

স্বামী জীবিত থাকাকালীন এতদিন কেন সে কলিকাতায় আসে নাই? প্রশ্নের উত্তরে সে হাসিয়া উঠিত।

–ভাগনিয়া সে পেরেম থা যো উনকো। ক্যায়া করে? হামে ইধার লে কার আনে সে উনকি ও বিবিকো গুসসা নেহি আয়গ্যা?
–প্রেম? তুমি মেনে নিলে?
–ক্যায়া করে? পেরেম থা জো!
–তুমহারা জ্বলন নেহি হোতা থা?
–নেহি। হামে তো পেরেম নেহি করতা থা কভি।
–দুখ? দুখ নেহি হোতা থা?

পিরিতি বিষম জ্বালা। এ জ্বালা জঠরজ্বালার চাহিয়া কম কিনা তাহা সেই বলিতে পারিবে যে এই দুই আগুনের আঁচে গমগম করিতে করিতে নিজেকে সেঁকিয়া লইবার সুযোগ পাইয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে কোনও দুই সমান্তরাল সরলরেখা মিলিতে পারে না। অসীম কোনও ক্ষেত্র ছাড়া। ‘পিরিতি আর জঠর দুই জ্বালায় একসঙ্গে কেউ কি জ্বলতে পারে?’ এই প্রশ্ন করিয়াছিলাম নিজেকে? না এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াইয়া উত্তর খুঁজিতে বিস্তর পড়াশোনা করিতে হইবে বলিয়া তাৎক্ষণিক নিশ্চিন্ত নিরুপদ্রব হইয়াছিলাম?

পুতুলরানি ঝুঁকিয়া বেঁকিয়া কাজ করিত আর আমি শুধু এই একটি প্রশ্নই গুনগুন করিতাম।

‘দুখ! দুখ নেহি হোতা তেরা?’

আমাদের পাড়ায়, গোটা অঞ্চল জুড়িয়া ঠিকে ঝিয়ের কাজ নেহাত কম নাই। বিশাল বিশাল দালানওয়ালা বাড়ি ক্রমে সব অবাঙালিদিগের হস্তগত হইতেছে। এমটিভির ধামাকা, ‘কিঁউকি শাস ভি কভি বহু থি’ সিরিয়ালের সঙ্গে পাল্লা দিয়া বিশ্বায়নের ঢেউ আছড়াইয়া পিছড়াইয়া পড়িতে লাগিল পাড়ার সমস্ত বাড়ির উঠোনে, গলির মোড়ে, রকের আড্ডায়। ছোটবড় বাচ্চা-বুড়ো একসঙ্গে বসিয়া পানাহার, দোলের দিনে ভাঙ-সিদ্ধি আর মাইক বাজাইয়া ‘হোলি হে’-র একচিলতে মস্তি।

রামনবমীতে সিংজির দোকানে,

–নমস্তে সিংজি। কুছ খিলাইয়ে? আজ তো রামনবমী। পার্টিফান্ড মে ভি কুছ দিজিয়ে?
–চান্দা?
–তা নয়তো কী? আসমান সে পড় গিয়া?
–লেকিন ও খাটাল কি পিছে যো বস্তি হ্যায় ও তো অভি তক খালি নেহি হুয়া মুখার্জীবাবু।
–আরে আপ আভিতক কুছ ঠান্ডা নেহি পিলায়া। পহেলে ঠান্ডা তো পিলাও?
–সচমুচ গলতি হো গিয়া। রাম বোলো বাবু রাম বোলো। আরে ও রাধেশ্যাম, আরে ও কানাচোদা, জলদি মুখার্জীবাবুকে লিয়ে একগেলাস ঠান্ডা লস্যি আন। রাবড়ি ভি লানা। আউর এক প্যাকেট দেশি ঘি কা লাড্ডু।’
–চাঁদা?
–লেকিন বাবু…
–সিংজি মাংস খায়েগা?
–আরে রাম বোলো বাবু রাম বোলো!
–মছলি?
–আরে রাম বোলো বাবু রাম বোলো!
–দারু পিয়েগা?
–আরে রাধেশ্যাম রাধেশ্যাম। রাম বোলো বাবু রাম বোলো।
–সিংজি লড়কি চাইয়ে? একদম ছোকরি। ভেজ দু আজ?
–আরে বাবু জরুর ভেজো। একেবারে নিউ আইটেম আছে তো?
–ওসব ন্যায়া পুরানা আমার ওপর ছেড়ে দাও সিংজি। খাটালের পিছনের বস্তি আর খাটাল দুটোই তোমার। আমাকে কী কমিশন দেবে বলো? একটা তিনকামরার ফ্ল্যাট তো এমনিই তুমি আমায় দিচ্ছই। পার্টিফান্ডে যেন মোটা কিছু দিও এবার। নাহলে এতকিছু তোমার জন্য করতে পারব না আর। পুলিশের রেড হলে যে ছেলেগুলো সব তোমার মাল সামলায় ওদের রেটও কিন্তু বেড়ে গেছে। একটু বেশি না ছাড়লে আর সত্যিই পারছি না মাইরি।

পুতুলরানির ক্ষয়ে যাওয়া শরীরে বাড়িতে থাকা ব্যথায় একের পর এক কাজ সে ছাড়িতে লাগিল। মন নিয়া বিলাসিতা করার ন্যায় দানাপানি তাহার ঘরে মজুত ছিল না। কোমর থেকে পা পর্যন্ত টনটনে ব্যথাই তাহার নিত্যসঙ্গী। এখবর অনেকের কাছেই আসিয়া পৌঁছাইল। সাত আটদিন তাহার নাগাড়ে ছুটি নেওয়া গা সওয়া ততদিনে। আটদিন বাদে তাহার উপস্থিতিতেও বিশেষ সুবিধা হইবে না বুঝিয়াই তাহার আগমনবার্তায় পাশ ফিরিয়া শুইতাম। ভোর ভোর তাহার প্রথম আগমন হইত আমাদিগের ফ্ল্যাটে। কখনও আবার প্রশ্ন করিতাম,

‘দুখ নাহি হোতা তেরা?’

দুখের কথায় মুচকি হাসিয়া সে আরও বেশি মনোযোগ সহকারে খাটের তলা ঝাড় দিতে শুরু করিত। যদিও রাতে পড়ে থাকা ছেঁড়া কাগজের পাতা, অন্যমনস্কতায় ছিটকে পড়া পেনসিল, কিছুই সে খাটের তলায় খুঁজিয়া পাইত না। সে সব নেহাত তুচ্ছও নয়। একদিন তাহাকে প্রশ্ন করিলাম আবার,

–তেরা আদমি মর ক্যাইসে গেয়া?
–দারু পিতা থা। বহুত দারু পিতা থা।

সারা পাড়ার বিস্তর খবর আনিয়া সে গল্প ফাঁদিত। উপরের ফ্ল্যাটের অনিল সাহু বিরাট ব্যাবসায়ী। বউ ঘুমাইলে ছাদে একটি ষোলো বছরের বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে দিল খুলিয়া গল্প করে। সাহাবাড়ির পাগল মেয়েটাকে কে যেন মাতৃত্বের স্বাদ দিয়াছে। কেহ জানে না। কুমারী মেয়ের কলঙ্ক তড়িঘড়ি চাপা দিতে চায় বাড়ির লোকে। অথচ তরু না পারে কাহারও নাম বলিতে, না চাহে সে মাতৃত্বের স্বাদ থেকে মুক্তি। লোকলজ্জার ভয়ে ভীত হওয়ার মতো পরিপক্ক বুদ্ধি ঈশ্বর তাহাকে দেয় নাই। আবার কোনও বাড়ির অসুস্থ শয্যাশায়ী বৃদ্ধাটিকে দিনের পর দিন খাইতে দেওয়া হয় না, পাছে কাপড়চোপড়ে হাগিয়া ফেলিইয়া বাড়ির লোকের খাটুনি বাড়াইয়া দেয়। বুড়ির চিঁ চিঁ গলার স্বর আর কেহ শুনিতে পায় না, শুনিলেও উপেক্ষা করে। পুতুলরানির কাছে সেই স্বর ঠিকঠাক পৌঁছাইয়া যায়।

–কুছ খানে কো মাংতি, বুঢ়িয়া। বহুত ভুখ লাগতা হ্যায়। খানা নেহি দেতা কোই।
–তু কুছ দেতি কিঁউ নেহি? হামারা ইয়াহা সে খানা লেজানা।’
–দেনে নেহি দেগা কোই। গালি দেতা বহুত। খানে সে টাট্টি হো যাতা। কোন সাফ করেগা? তিন বেটা বহু সব হ্যায়। কোই নেহি করেগা। কামওয়ালি ভি নেহি রাখেগা। পয়সা খরচা নেহি করেগা বুঢঢি কে লিয়ে।
–লেকিন ও মকান তো বুঢ়িয়া কা হ্যায়।
–ক্যায়া করে?
–দুখ নেহি হোতা তেরা?

বারবার দুখের কথা বলিতে বলিতে আমরা হাসিয়া উঠিতাম।

–তেরা আদমি প্যায়ার নেহি করতা থা তেরে সে? তো চার বাচ্চা ক্যায়সে হুয়া? ছয় সাল শাদি মে চার বাচ্চা? ও ভি পতি পেয়ার নেহি করতা থা?
–দিদি আপ ছোটা হ্যায় লেকিন ইতনা ভি ছোটা নেহি। বাচ্চা হোনে কে লিয়ে প্যায়ার জরুরি হ্যায়?
–আশ্চর্য! বিনা প্যায়ারকে তু নে মানা কিউ নেহি কিয়া?
–বাচ্চা নেহি হোতা তো নিকাল দেতা ও লোক। কোই ঘর নেহি লেতা। না মা বাপ না শশুরাল। আউর বাচ্চা হ্যায় তব না ইঁহা উনকি খোলি মে আ কর ইয়ে শহর মে রহতি হুঁ।
–ফিরভি? ক্যায়সে হোতা থা?
–যব গাঁও আতে থ্যে, রাত কো একবারই ঘরকে অন্দর আতে থে। ওসব কর কে বাহার যাকে শোতা থা। এইসে হি সাতদিন কভি মহিনাভর হোতা থা। আউর এক এক করকে খুশবু, মোহন, রবি আউর এই লাস্ট মে মধু আই।
–লেকিন ইতনা পেট তো চালানা ভি মুশকিল হ্যায়। আউর তু কাম তো বিলকুল কর নেহি সকতি।
–নেহি বাচ্চা বিলকুল ঠিক হ্যায়। বিন বাচ্চো কে জিতি ক্যাইসে?

পুতুলরানি বাঁচিল। চার সন্তান প্রতিপালন করিতে করিতে বাঁচিল সে। মেয়ের বিবাহ দিল। ছেলেকে বিএ পর্যন্ত পড়াইয়া চাকরির পরীক্ষা দিতেও তৈরি করিতেছিল। ওই ঝুঁকে বেঁকে যাওয়া কোমর, কাজ হারাইতে হারাইতেও আবার নতুন কাজ পাওয়া উপার্জনে চলিতেছিল। একবার বিশুদ্ধানন্দ হাসপাতাল একবার মারোয়াড়ি রিলিফ সোসাইটি থেকে ওষুধ আনিত। মেডিক্যাল কলেজে লাইন দিয়া টিকিট কাটিয়া ওপিডিতে হাড়ের ডাক্তারও দেখাইয়াছিল একবার।

‘অপারেশন করতে হবে। স্পাইনাল কর্ডের হাড় ক্ষয়ে যাচ্ছে।’

তাহার প্রেসক্রিপশন দেখিয়া ওষুধের ব্যবস্থা হইল কিন্তু অপারেশন করানো সম্ভব হইল না। এই প্রকারে চলিতে চলিতে আর ব্যথার ওষুধও কাজে আসিল না। অপারেশন করানোর খরচ, সময়, ঝুঁকি কোনওটাই সম্ভব হইল না। ব্যথা বাড়িতেই লাগিল। রোজ রাতদুপুরে তাহার ব্যথার চিৎকার পল্লীবাসীবৃন্দের নিদ্রিত চোখের ভিতর দিয়াও মরমে গিয়া পশিত। এমনভাবে বাঁচিয়া থাকা যে যন্ত্রণার তাহাও মনে করাইয়া দিত কোনও কোনও সুহৃদ। এমত অবস্থায় লকডাউন। কাজের বাড়ি বলিতে একটিই। মাইনে আর কতদিন বসিয়া পাইবে সে? ওষুধ কিনিবার টাকাও ফুরাইয়া আসিল। প্রত্যেকবার সে টিভির খবরে মনোযোগ দেয়। লকডাউন উঠিল কি না? অথচ কর্ম করিবার শক্তিও তাহার নিঃশেষ। তবু কিসের আশায় সে জানিতে চাহিত লকডাউন উঠিল কিনা? মিউনিসিপালিটি থেকে স্যানিটাইজ করিতে আসিলে সে ভাবিত সব বুঝি ঠিক হইয়া গেল। এবার সে যেভাবেই হোক অপারেশন করাইবে। ব্যথা যে আর সহ্য হয় না!

শেষপর্যন্ত পুতুলরানি পারিল না। কোনও এক নিদাঘ দুপুরে মেয়ের পাশে শুইয়া ব্যথায় ছটফট করিতেছিল। হঠাৎ পাশের ঘরে যাইল। পাশের ঘর বলিতে একটুকরো রন্ধনের জায়গা। কোনও কাজের বাড়ির দেওয়া একটা পুরানো পাখা ঝুলিতেছিল কড়িকাঠ দিয়া। সকলে খাইতে বসিলে ওই পাখাটুকুতে আর বাতাস বহিত না একচিলতে সংসারে। সেই পাখার ওপরই পুতুলরানির বড় লোভ হইল। একাকী দুপুর, একলা পুতুলরানি আর একটা বাতিল হইয়া যাওয়া পাখা সব ক্ষুধা তৃষ্ণা ব্যথাদের সহিত একসঙ্গে অতীত হইয়া মিশিয়া গেল।

তাহাকে আর প্রশ্ন করা হইল না, ‘দুখ নাহি হোতা তেরা?’

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2947 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...