রোহিত স্মরণে না বলা কিছু কথা

অমিত কুমার ঘোষ

 


ছাত্র, গবেষক

 

 

 

আপনাদের নিশ্চয় রোহিতকে মনে আছে। রোহিতের মৃত্যুর আজ পাঁচ বছর পূর্ণ হল। রোহিত ভেমুলাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম না। আমাদের কোনওদিন দেখা হয়নি। রোহিত বেঁচে থাকলে আমাদের দেখা হতে পারত, আবার নাও হতে পারত— পুরোটাই ছিল প্রবল অনিশ্চয়তা। তবুও রোহিত আমার জীবনের অতি পরিচিত, নিবিড় আত্মীয়। রোহিতের জীবনে ঘটে যাওয়া প্রত্যেকটি অন্যায়, অবিচার আর তাঁর মৃত্যু আমাকে রোহিতের জীবনের অনেক কাছাকাছি এনেছে। রোহিতের মৃত্যু যা আজও আমাকে ভাবায়, আমাকে কাঁদায়! আজও যখন রোহিতের নিষ্পাপ তরতাজা মুখটা আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে তখন এক অদৃশ্য মানসিক যন্ত্রণা আর পাপবোধ আমাকে কুড়ে কুড়ে খায়। তবে আমরা কি প্রত্যেকেই মেনে নেব বা মেনে নিলাম যে— “আমার জন্মই হল এক ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা!”

মৃত্যুকালে রোহিত তাঁর শেষ চিঠিতে লিখেছিল যে সে লেখক হতে চেয়েছিল, বিজ্ঞানের লেখক। সে ভালোবেসেছিল বিজ্ঞান, নক্ষত্র আর প্রকৃতি। তারপর সে ভালোবেসেছিল মানুষকে। এটা বুঝবার আগেই যে মানুষ আজ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন। তাই রোহিত বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল মানুষে আর খুব সহজেই বেছে নিয়েছিল আত্মহননের পথ। মৃত্যুর আগে রোহিত এও উপলব্ধি করেছিল যে তার মৃত্যুর পর তাকে সবাই বোকা, ভীরু আর স্বার্থপর বলবে। তাই রোহিত লিখেছিল আসলে এসব কথাতে আমার কিছু এসে যায় না। ‘My birth is my fatal accident’— এই উক্তিতেই ছিল তাঁর সম্পূর্ণ বিশ্বাস।

নিঃসন্দেহে একবিংশ শতকের ভারতে রোহিতের মৃত্যু আমাদের আরও একবার স্মরণ করিয়ে দেয় এদেশের ব্রাহ্মণ্যবাদ আর পুঁজিবাদের এককাট্টা শোষণ, নিপীড়ন আর বঞ্চনার ইতিহাসকে। ব্রাহ্মণ্যবাদ আর পুঁজিবাদের যৌথ নেতৃত্বাধীন এই সমাজব্যবস্থাই রোহিতকে ঠেলে দিয়েছিল মৃত্যুর মুখে। এই শোষণমূলক ব্যবস্থাটিই আজও রোহিতের মতো শত শত মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর মুখে। কেউ সেখানে জীবনের সমস্ত শক্তি দিয়ে লড়াই করে নিজেদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রয়েছে। কেউ বা পরাজিত সৈনিকের মতো মুক্তির পথ হিসেবে বেছে নিচ্ছে রোহিতের মতো মৃত্যুকে। তবে মৃত্যুই কি আমাদের জীবনের একমাত্র মুক্তির পথ? আসলে তা নয়, রোহিত। আমাদের মুক্তির পথ আসলে বাবাসাহেব আর তাঁর জীবনদর্শন। যে দর্শন যাপন করে শত শত দলিত আজও মুক্তির পথ খোঁজে, জীবনে আশার আলো দেখে। বাবাসাহেবই তো আমাদের মানুষের উপর বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন। মানুষে বিশ্বাস হারানো যে মহাপাপ। আর সেই ভুলটাই আসলে তুমি সেদিন করেছিলে, রোহিত!

রোহিত আমাকে বা আমার মতো জন্মসূত্রে পিছিয়ে থাকা শত শত আর্থিক-সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জাতি ও শ্রেণির মানুষদের নতুন করে শিখিয়েছে, ভুল শুধরোবার সুযোগ করে দিয়ে গেছে তার মৃত্যু দিয়ে। বুঝিয়েছে জীবনে সংগ্রামের আবশ্যিকতাকে।

রোহিতের মতো আমিও উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিয়ে পড়তে এসেছিলাম এই মহানগরীর বুকে সুপ্রতিষ্ঠিত এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ব্যক্তিগতভাবে আমি ছিলাম আমার পরিবার তথা গ্রামের প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী। আর আমার রাষ্ট্রীয় পরিচয় আমি আর্থিক-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিকভাবে পিছিয়ে পড়া সমাজের অন্তর্ভুক্ত। ভালো ইংরেজি বলতে না-পারা আর উত্তরাধিকার সূত্রে পড়াশোনার সুযোগ না পাওয়ার কারণে আমাকে প্রতিটি পদে পদে অপমানিত হতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথমদিনই শুনেছি “Reservation— হাঁ ইসি লিয়ে তুমহারা জ্যায়সা বান্দা ইহাপে ঘুস গ্যায়া।” কলকাতা এবং তার ভদ্রলোক-অধীনস্থ শিক্ষা ও সংস্কৃতি জগত আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে জন্মসূত্রে পাওয়া আমার পরিচিতি ও অধিকারের সীমানাকে! আর যখনই আমি তাদেরই দেওয়া পরিচিতি আর অধিকারের প্রশ্ন নিয়ে, বাবাসাহেবের জীবনদর্শনকে সামনে রেখে Assert করেছি আমার Identity-কে ঠিক তখনই এই ভদ্রলোক-প্রভাবিত শিক্ষা সংস্কৃতি সমাজ আমাকে বলে উঠেছে “You don’t look like a Dalit!”

আমার জীবন আর অভিজ্ঞতা দিয়ে আমি বুঝেছি এই বাংলার সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে আছে জাতিভেদ আর জাতপাতের নোংরা শোষণমূলক রাজনীতি। কিন্তু ভদ্রলোক-শাসিত এই বঙ্গসমাজ বরাবরই সেটাকে উপেক্ষা করেছে।

তাই আজ আবার আমাদের বলবার সময় এসেছে— আর কোনও রোহিতের মৃত্যু নয়, সময় এসেছে দাবি করার “My birth is not my fatal accident.” আমরা মানব না, মানতে চাই না ব্রাহ্মণ্যবাদের তৈরি করা এই শোষণমূলক নৃশংস সমাজকাঠামোকে। আমাদের মুক্তির পথ আসলে ‘Annihilation of caste’। আর সেই পথের দিকনির্দেশক স্বয়ং বাবাসাহেব।

“Be Educated, Be Organised and Be Agitated.”

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3088 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...