রমানাথ রায় কেন বিশিষ্ট

ইন্দ্রজিৎ ঘোষ

 


সাহিত্য গবেষক ও আলোচক। অনুবাদক

 

 

 

রমানাথ রায় কে?

রমানাথ গদ্যকার। ছোটগল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখেছেন। বেশিরভাগ প্রবন্ধ সাহিত্য বিষয়ক। তবে রমানাথ নিজেকে মূলত ছোটগল্পের লেখক হিসাবেই দেখতে চান।

 

কেন রমানাথের ছোটগল্প পড়ব?

কারণ স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা কথাসাহিত্যে (fiction) তিনি স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি বাঁকবদল (departure)। যেভাবে মাইকেল মধুসূদন দত্তের পরে রবীন্দ্রনাথ নতুন বাঁক, বঙ্কিমচন্দ্রের পরে শরৎচন্দ্র নতুন কণ্ঠস্বর।

 

সাহিত্যে বাঁকবদল মানে কী?

প্রত্যেক বড় লেখকের লেখার নিজস্ব ভঙ্গি থাকে। বহু লেখকের ভিড়ের মধ্যে তাঁর লেখাকে আলাদা করে চেনা যায়। পড়লেই বুঝতে পারা যায় এটা তিনিই লিখেছেন। রমানাথের ক্ষেত্রে একথাটা খুব সত্যি।

***

 

লেখকের নিজস্বতা ফুটে ওঠে বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকে। মূলত আঙ্গিকে। বিষয়বস্তু (content) হল কী বলছেন, আঙ্গিক (form) হল কীভাবে বলছেন। যেমন, ধরুন আপনি আপনার পছন্দের পুরুষকে বলতে চান যে আপনি তাঁর প্রেমে পড়েছেন। আপনি সরাসরি সে কথা তাঁকে জানাতে পারেন। সেটা এক ধরনের প্রকাশ হল। আবার, আপনি একটি প্রেমের গানের সুর গুনগুন করে গেয়ে কথাটা তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করতে পারেন। হতেই পারে আপনার গলায় সুর নেই, আপনার কথা বলা ও গান গাওয়ার মধ্যে কোনও ভেদ থাকে না, পুরুষটি বুঝল না। আবার এও হতে পারে, আপনি ঠিক সুরে গাইলেন কিন্তু আপনার প্রেমাষ্পদ সুরকালা। এবারও আপনার ভালোবাসার খবর জানানো হল না। আপনি প্রেম নিবেদনে ব্যর্থ হলেও আপনার প্রকাশভঙ্গি কিন্তু আলাদা হয়ে রইল। ‘তুমি কি আমায় ভালোবাসো’ বা ‘ঘুমের ওষুধ খেলেও তোমার সুরকালা মুখ আমার মনে পড়ে খালি, ঘুম আসে না’— এরকম বলার ভঙ্গি ও গুনগুন গানের মধ্যে দিয়ে প্রেমপ্রকাশ, তা সে যতই বেসুরো হোক না কেন, আলাদা ভঙ্গি। দুরকম প্রেমের ভাব প্রকাশ করার চেষ্টা, দুরকম প্রকাশভঙ্গি। মানে, আলাদা আঙ্গিক।

লেখক যে ভাষায় লিখছেন, তাকে কীভাবে ব্যবহার করছেন, সেটা আঙ্গিকের অংশ। যেমন— বাক্য কত বড় হবে; বাক্য সহজ হবে না জটিল হবে; শব্দ রোজকার ভাষার হবে নাকি লিখিত ও মান্য হবে; যতিচিহ্নের ব্যবহার কেমন হবে, শুধু দাঁড়ি কমা থাকবে নাকি ড্যাশ কোলন ইত্যাদিরও ব্যবহার হবে; অনুচ্ছেদ কত বড় বড় হবে; অধ্যায় কত বড় হবে ইত্যাদি। কথাসাহিত্যের উপকরণগুলি কীভাবে ব্যবহার করছেন লেখক সেটাও আঙ্গিক। যেমন— সংলাপের ধরন; চরিত্রের উপস্থাপনা; ঘটনা কীভাবে এগিয়ে চলবে; ঘটনার কালক্রম কেমন হবে; গল্পটা কে বলছে, অর্থাৎ গল্পকথক (narrator) কে; গল্পকথক এক না একাধিক, ইত্যাদি।

আঙ্গিক বিস্তৃত বিষয়। এখানে তার একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হল। রমানাথ আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা করেছেন, নিজস্ব কণ্ঠস্বর তৈরি করেছেন, কীভাবে নতুন ভাবে গল্প বলা যেতে পারে তার দিশা দিয়েছেন। তাঁর সমকালীন কোনও কথাসাহিত্যিকের মধ্যে এই পরীক্ষাপ্রবণতা চোখে পড়ে না।

অর্থাৎ, নতুনভাবে গল্প বলার মধ্য দিয়ে রমানাথ বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্ট হলেন, এবং স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে বাঁকবদল হয়ে উঠলেন।

 

(২)

রমানাথের সাহিত্যের রস আস্বাদন করতে গেলে ‘শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন’ সম্পর্কে একটু জানা দরকার।

১৯৬৬ সালে রমানাথের নেতৃত্বে বাংলা সাহিত্যে ‘শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন’ শুরু হয়। প্রচলিত কথাসাহিত্যরীতিকে শাস্ত্র বলা হয়েছে। অর্থাৎ, যেভাবে সেই সময় গল্প-উপন্যাস লেখা হচ্ছিল। রমানাথরা সেই রীতিতে লিখতে চাননি। পুরনো রচনারীতি বর্জন করে তাঁরা নতুন রীতিতে লিখতে চেয়েছেন। পুরনো রচনারীতি বলতে তাঁরা বাস্তববাদী রীতি বুঝিয়েছেন।

 

বাস্তববাদী রীতি কী?

বাস্তববাদী রীতি একটি প্রকাশভঙ্গি; অর্থাৎ, গল্প কীভাবে বলা হবে। বাস্তববাদী রীতি (realism) ও বাস্তবতা (reality) আলাদা। বাস্তবতা হল সত্য, যার খোঁজে কবি, শিল্পী, বিজ্ঞানী, গণিতবিদ সকলেই রয়েছেন। বাস্তবতা বা সত্য এক এবং একমাত্র, এরকম কিছু নয়। তার রকমফের রয়েছে। সত্যের রকমফেরের বিষয়ে দার্শনিক আলোচনা ও বিতর্কের অবকাশ আছে। আমরা সে আলোচনা এখানে করব না। আমাদের এখানে দরকারি জানাটা হল— বাস্তববাদী রীতির সঙ্গে বাস্তবতাকে গুলিয়ে ফেলা সাহিত্যপাঠের খুব বড় ভুল।

বাস্তববাদী রীতির উদ্ভব ইউরোপে। মোটামুটি ১৮৩০ সাল থেকে ১৮৯০-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত এর সময়কাল। এই রীতি প্রথমে রিয়ালিজম ও পরে ন্যাচারিলজম নামে খ্যাত হয়।

 

বাস্তববাদী রীতির বৈশিষ্ট্য

জীবনকে আলোকচিত্রের মত দেখা। মানে, ফটোগ্রাফে যেভাবে দেখি সেভাবে বর্ণনা করতে হবে। চরিত্রের শারীরিক গঠনের, তার পোশাকের, সে যেখানে থাকে সেই অঞ্চলের, তার বাড়ির, রাস্তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করে বাস্তবকে ফুটিয়ে তুলতে হবে। কাহিনি গড়ে উঠবে নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষকে কেন্দ্র করে। চরিত্রের শ্রেণিগত সামাজিক অবস্থানকে যত্ন নিয়ে ফুটিয়ে তোলা হবে। দৈনন্দিন জীবনের বর্ণনা থাকবে বিশদে। মানুষের দারিদ্র ও সংগ্রামের কথা থাকবে। ছকের মত সাজানোগোছানো প্লটের মধ্য দিয়ে কাহিনি এগিয়ে চলবে। চরিত্ররা ডায়ালেক্টে কথা বলবে। ইত্যাদি ইত্যাদি।

 

বাংলা কথাসাহিত্যে বাস্তববাদী রীতির প্রবেশ ও রয়ে যাওয়া

১৮৫০ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় তাদের প্রথম উপন্যাসগুলি লেখা হয়। উপন্যাসের পর ছোটগল্প লেখা শুরু হয়। বাংলায় প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয় ১৮৬৫ সালে— বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’। ১৮৯০ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষায় ছোটগল্পের প্রতিষ্ঠা করেন। এঁদের সামনে কথাসাহিত্যের আদর্শ হিসাবে ছিল ইউরোপীয় কথাসাহিত্য যা তখন রিয়ালিজম ও ন্যাচারিলজমের ধারা অনুসরণ করে লেখা হচ্ছিল। কিন্তু এই দুই শক্তিশালী লেখক এই দুটির কোনও ধারাকেই অন্ধভাবে অনুসরণ করেননি। নিজস্ব কণ্ঠস্বর তৈরি করতে পেরেছিলেন।

বিশ শতকের শুরুর দিকে মার্কসবাদী সাহিত্য আদর্শের হাত ধরে সোশাল রিয়ালিজমের প্রবেশ ঘটে। সোশাল রিয়ালিজম রিয়ালিজমেরই আর এক রূপ। বাংলার তরুণ সাহিত্যিকরা রিয়ালিজম তথা সোশাল রিয়ালিজম দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত হন।

অন্যদিকে বিশ শতক শুরু হবার একটু আগে থেকেই ইউরোপে ন্যাচারিলমের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এই প্রতিক্রিয়ার ফল মডার্নিজম, যা অন্য এক রচনারীতি। এরপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতেই থাকে। আরও নতুন নতুন রীতির উদ্ভব হতে থাকে। বাস্তববাদী রীতি ‘অনেকগুলো রীতির মধ্যে কোনও একটি রীতি’ হয়ে যায়।

বাংলা সাহিত্যের দিকে তাকালে দেখা যায় ছবিটা অন্য। এখানে আঙ্গিক নিয়ে বিশেষ ভাবনা-চিন্তা হয়নি। যেমন, এখন ২০২০ সাল। রমানাথের বয়স আশির ঘরে এসে গেছে। মডার্নিজমের পরে একশোর বেশি বছর পেরিয়ে গেছে। এই একশো বছরের মধ্যে পৃথিবীতে বহু কথাসাহিত্য বিভিন্ন রচনারীতিতে বিভিন্নভাবে লেখা হয়েছে। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের লেখকরা সেসবের খবর রাখেননি। মানে, তাঁরা পড়েননি বিশ্বসাহিত্য। তাঁরা এখনও দেড়শো বছরের পুরনো রিয়ালিজমের রীতিতে লিখছেন, ফটোগ্রাফিক বর্ণনা দিয়ে চলেছেন।

পাঠকও সেই সমস্ত লেখা পড়ে বড় হচ্ছেন। বলা বাহুল্য তাঁদের সাহিত্যবোধ সেই আদর্শেই নির্মিত হচ্ছে। লেখা যে অন্যভাবেও হতে পারে তা তাঁদের কল্পনাতেও আসছে না।

 

প্রকাশভঙ্গি

শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল প্রকাশভঙ্গি বা আঙ্গিককে কেন্দ্র করে। বাস্তববাদী রীতি বাদ দিয়ে অন্য আঙ্গিক খুঁজে পেতে চাইছিলেন তাঁরা। পাঠক! অন্যভাবে লেখার কথাটা হয়ত শুরুতে আপনার বুঝতে অসুবিধা হবে। কিন্তু আপনি যদি কথাসাহিত্য ছাড়া অন্য শিল্পমাধ্যম নিয়ে ভাবেন তাহলে দেখবেন খুব সহজেই অন্য প্রকাশরীতির কথা ভাবতে পারছেন।

ধরুন, আপনি নাটক দেখছেন। একই মঞ্চ কখনও আপনার কাছে একটি ছোট শোবার ঘর, কখনও আবার সেই মঞ্চই একটা প্রকাণ্ড মাঠ হয়ে উঠছে। এতে আপনার কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। আপনি কিন্তু প্রশ্ন করছেন না, কী করে একই আকারের জায়গা কখনও ছোট কখনও বড় হয়ে যাচ্ছে; এটা তো বাস্তবতাবিরোধী। আপনি প্রশ্ন করছে না, কারণ নাটকের ভাষায় নাটককে দেখছেন। অর্থাৎ, নাটকের প্রকাশভঙ্গি আপনি রপ্ত করে ফেলছেন। তাকে বুঝতে আপনার কোনও অসুবিধা হচ্ছে না।

এবার অন্য একটি শিল্পমাধ্যমে আসা যাক— চিত্রশিল্প। পাঠক, নিচের দুটি পেইন্টিং লক্ষ করুন।

রবীন্দ্রনাথের ছবি
প্রাচীন মিশরীয় ছবি

রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবিটি কিন্তু ফটোগ্রাফিক নয়। গাছপালা ওরকম দেখতে হয় না। কিন্তু তাতে ছবিটি উপভোগ করতে আপনার অসুবিধা হচ্ছে না। খুব স্বচ্ছন্দে ছবিটি আপনার মনের মধ্যে অনুভুতি সঞ্চার করতে পারছে।

প্রাচীন মিশরীয় ছবিটি দেখুন। মানুষের চোখ ওরকম কান থেকে নাক অব্দি টানা হয় না। মানুষ ওইভাবে ঘাড় বেঁকিয়েও থাকে না। আপনার কিন্তু ওদের মানুষ হিসাবে ভাবতে অসুবিধা হচ্ছে না। আপনি বরং বোঝার চেষ্টা করছেন ওরা চারজনে মিলে করছেটা কী।

 

শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন

শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের সময়কাল ১৯৬৬ থেকে ১৯৮১। ‘এই দশক’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন গড়ে ওঠে।

এই পত্রিকার এক সংখ্যায় প্রকাশিত “শাস্ত্র বিরোধিতা কেন এবং প্রকৃত বাস্তবতা” প্রবন্ধে রমানাথ লিখেছেন:

আমার প্রথম এবং প্রধান আপত্তি প্লট বা কাহিনী নির্মাণের বিরুদ্ধে।… জীবনকাহিনীর মত কার্যকারণ সূত্রে গ্রথিত ঘটনাসমষ্টি নয়।… সাহিত্যে মানুষের প্রকৃত পরিচয় আসবে ঘটনার তথ্যে নয়, আসবে জটিল, যুক্তিহীন, পরস্পরবিরোধী মানসিকতার উন্মোচনে।

শাস্ত্রবিরোধী সাহিত্যের দশ বিধি প্রচার করেন রমানাথ অন্য একটি সংখ্যায়। তার কয়েকটি নিচে উদ্ধৃত করা হল।

  • শিল্পের রাজ্য থেকে সমস্ত তত্ত্ব ও দর্শনের আমুল উৎখাত।
  • যা কিছু এতকাল ছিল গম্ভীর ও যুক্তিপূর্ণ তাই হাস্যকর।
  • শিল্প ও সাহিত্যে শাস্ত্রসম্মত পথকে বর্জন করতে হবে। শিল্পের ইতিহাস আঙ্গিকের বিবর্তনের ইতিহাস।
  • জীবন সম্পর্কে কোনওরকমের স্পষ্ট বা অস্পষ্ট ধারণা বা মত দেওয়ার আমরা বিরোধী।
  • মহৎ সাহিত্য বা চিরকালের সাহিত্য বলে কোনও সাহিত্য নেই। সব সাহিত্য নিজের কালের এবং যুগের।
  • সাহিত্য থেকে সেকেলে কার্যকারণবাদকে ছুড়ে ফেলা হোক।

আমরা জানলাম, শিল্পে জীবনকে বিভিন্নভাবে প্রকাশ করা যায়। বাস্তববাদী রীতি অনেকগুলির মধ্যে একটি প্রকাশভঙ্গি। উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে ইউরোপ থেকে ভারতের কথাসাহিত্যে এই রীতির প্রবেশ ঘটে। উনিশ শতকের শেষদিক থেকে ইউরোপে অন্যান্য প্রকাশরীতির আবির্ভাব ঘটতে শুরু করলেও বাংলা কথাসাহিত্যে এই রীতিই প্রায় একমাত্র রীতি হয়ে ওঠে। এই রীতির একাধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াস্বরূপ শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের জন্ম হয়।

 

(৩)

নতুন মেঘ (১৯৩৭): নন্দলাল বসু

বাস্তববাদী রচনারীতির বিরোধিতা, নতুন প্রকাশভঙ্গির খোঁজ ও শাস্ত্রবিরোধী সাহিত্য আদর্শের প্রেক্ষাপটে রমানাথের কয়েকটি গল্পে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক এবার। এখানে বলে রাখা ভালো, এই গল্পগুলির সারসংক্ষেপ করা যায় না। কারণ গল্পগুলিতে সেই অর্থে প্লট নেই। নতুন আঙ্গিকে কীভাবে গল্প লেখা হল তা জানতে গেলে পুরো গল্পটাই পড়তে হবে। মুখে বলে বা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। তাতে গল্প পড়ার আনন্দও পাওয়া যাবে না। যেমন, বেটোফোনের ‘মুনলাইট সোনাটা’ সিম্ফনির আনন্দ কেউ আপনাকে শব্দের মধ্য দিয়ে সরবরাহ করতে পারবে না। বা নন্দলাল বসুর ‘নতুন মেঘ’ পেন্টিংয়ের মজা কথায় দেওয়া সম্ভব নয়।

আপনাকে মনে রাখতে হবে গল্পগুলিতে গল্প বলার ভঙ্গিই গল্প হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, গল্পের ফর্ম ও কনটেন্ট মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

আমরা উদাহরণ হিসাবে তিনটে গল্প এখানে পেশ করছি।

 

প্রথম উদাহরণ — গল্প: “জাল কলকাতা”

গল্পটি শুরু হয় এইভাবে।

সেই রাস্তা, ট্রামলাইন, ভিড়, ঠেলাঠেলি।

তারপর রাস্তা, বাস, ফুটপাথ, মানুষের ছোট ছোট বর্ণনা দিয়ে লেখক লেখেন:

এখানে ফুটপাথে ভিড়। রাস্তায় ভিড়। বাসে ভিড়। দোকানে ভিড়। এটা কলকাতা। চারদিকে তাকালে তাই মনে হবে।

পরের অনুচ্ছেদে ধুয়োর মত প্রথম লাইনটা আবার ফিরে আসে:

সেই রাস্তা, ট্রামলাইন, ভিড়, ঠেলাঠেলি।

তারপর লেখক চেনা চারপাশকে অন্য রহস্যে মুড়তে থাকেন:

এটা কলকাতা। তাই এই রাস্তার নাম সূর্য সেন স্ট্রীট। আর এটা যদি সূর্য সেন স্ট্রীট হয় তাহলে সামনে কলেজ স্ট্রীট আছে। আর কলেজ স্ট্রীট থাকলেই কলেজ রো থাকবে।

সেখানে রাণী থাকে। লেখক সেখানে যাবেন রাণীর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি রাণীকে অনেকদিন দেখেননি।

লেখক হাঁটতে থাকেন। রাস্তা দোকান সব পরিচিত, সব হাতের তালুর মত চেনা। অথচ অচেনার আভাস লেখার আঙ্গিকে ফুটে উঠতে থাকে। রাস্তায় তিন বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়। তাঁরা লেখককে চিনতে পারেন না। যাই হোক, লেখক রাণীর বাড়ি পৌঁছে যান। গল্প শেষ হয় এইভাবে:

আমি ডোরবেল টিপলাম।

রাণী বেরিয়ে এল। সেই চুল। সেই চোখ। সেই নাক। সেই গাল।

–কাকে চাই?

আমি চমকে উঠলাম। মুখ দিয়ে কোন কথা বেরল না। দাঁড়িয়ে রইলাম।

–কাকে চাই?

বুঝতে পারলাম আমার ভুল হয়েছে।

–রাণী আছে?

–এখানে রাণী বলে কেউ থাকে না।

মুখের উপর দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। আমি আর দাঁড়ালাম না। আবার সব ভাল করে দেখব বলে কলেজ স্ট্রীটে ফিরে এলাম। দেখি ট্রাম বাস দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তা গমগম করছে। কিসের শব্দ? উত্তর দিক থেকে বিরাট মিছিল আসছে। হাতে সব লাল পতাকা।

কলকাতাতেও ঠিক এমনি মিছিল বেরোয়। তাদের হাতেও ঠিক এমনি লাল পতাকা থাকে।

এইভাবে চেনা অচেনা, বর্হিজগৎ অন্তর্জগৎ আঙ্গিকের মধ্য দিয়ে মিলেমিশে যায়। আবারও বলছি, গল্পের পুরো মেজাজ পেতে গেলে পুরো গল্পটা পড়তে হবে। কোনও আখ্যান নেই এর মধ্যে যার সংক্ষিপ্তসার দেওয়া যায়। এখানে কনটেন্ট ও ফর্ম একাকার।

 

দ্বিতীয় উদাহরণ — গল্প: “সেলাই মেশিন”

[দ্বিতীয় উদাহরণের অংশটি পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ ‘এক অনন্য প্রতিভার সৃষ্টি: রমানাথ রায়ের গল্প’ থেকে নেওয়া]

বাবা একদিন অসুখে পড়ল এবং মারা গেল। ভাবলাম, মা এবার শোকে ভেঙ্গে পড়বে, বিছানা নেবে। না, সেসব কিছু হল না। ক’দিন কান্নাকাটি করে আবার সংসার করতে লাগল।

ছেলে ভাবল, মার জন্য এবার কিছু করা উচিত। মা ছেলেকে নানা প্রস্তাব দিল। ঘুরে আসার প্রস্তাব, দিদিকে এনে রাখার প্রস্তাব, যাতে মা একটু ভালো থাকেন। কিন্তু মা বললেন, “আমায় একটা সেলাই মেশিন কিনে দে।” বাবা পছন্দ করত না, মেশিনের শব্দ সহ্য করতে পারত না। তাই সেলাই মেশিন কেনা নিয়ে ঝগড়া হত বাবা-মায়ের মধ্যে। বাব কিনে দেয়নি। ছেলে দিল।

মা এই সেলাই মেশিন নিয়েই থাকে। কারও অসুবিধা গ্রাহ্য করে না। মা মারা গেল। ছেলেটি বিয়ে করল। ছেলের স্ত্রীরও দাবি, একটি সেলাই মেশিনের। এ নিয়ে ঝগড়া। অবশেষে কিনে দিল ছেলেটা। কিন্তু সমস্যা রয়ে গেল। স্ত্রীর স্বামীর দিকে নজর নেই। ছেলেও বুড়ো হয়ে গেছে। মেশিন বন্ধ করতে বললে করে না স্ত্রী। সে মারা গেল। এল ছেলের বউ, তারও দাবি সেলাই মেশিন। বুড়ো মানুষের অনুরোধ সে শুনল না। মেশিন চালাতে লাগল। মেশিনের শব্দ অসহ্য। একদিন ছেলের বউ মারা গেল। কিন্তু মেশিনের শব্দ থামছে না। বুড়ো শুনতে লাগল সেলাই মেশিনের শব্দ।

গল্পে কোনও বৃত্তাকার কাহিনি নেই। একটি মানুষের দাবি পূরণ ও অসহায়তার গল্প, যা একেবারে সংসার থেকে উঠে আসা গল্প। আপাতভাবে কোনও গল্প নেই রমানাথের গল্পে। সেটাই এইসব লেখার আকর্ষণ। কথাচ্ছলে শুরু হয়, বিস্তার ঘটে, শেষে অজানিত পরিণতি আমাদের বিস্ময়ের সামনে দাঁড় করায়। এ এমন জাতের গল্প, যার নিদর্শন বাংলা ভাষায় নেই।

 

তৃতীয় উদাহরণ — গল্প: “ফিরে এলেন মহাদেব”

মহাদেব মিত্র নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ। একদিন অবসাদে তিনি তাঁর দশ তলার ফ্ল্যাট থেকে ঝাঁপ দেন। কিন্তু তিনি মাটিতে আছড়ে পড়েন না। মাধ্যাকর্ষণের নিয়ম বদলে যায়। তিনি হাওয়ায় ভাসতে থাকেন। ভাসতে ভাসতে কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ান। মহাদেব কোন দিকে ভেসে যাবেন সেটা অবশ্য তাঁর ইচ্ছাধীন নয়।

প্রচুর মানুষ মহাদেবকে ভেসে বেড়াতে দেখেন। দ্রুত খবর ছড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে মহাদেবকে নিয়ে প্রচুর রটনা তৈরি হয়ে যায়। কেউ বলেন, মহাদেব ঈশ্বরের অবতার; দিনে তিনটে বেলপাতা খেয়েই থাকেন। কেউ বলেন, উনি যোগী মহারাজ। রাস্তায় প্রচুর মানুষ মহাদেবের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করতে থাকেন।

প্রচুর লোক জড় হয়ে যায়। পুলিশকে রাস্তায় নামতে হয়। মহাদেব ভেসে এক থানা থেকে অন্য থানার এলাকায় চলে যান। ফলে একাধিক থানার পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। খবর মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে যায়।

মুখ্যমন্ত্রী ঘরে বসে বসেই সিদ্ধান্ত নেন, মহাদেব আসলে সন্ত্রাসবাদী। শত্রুপক্ষের সঙ্গ নিয়ে তিনি একটি গণঅভ্যুত্থানের চেষ্টা করছেন। মুখ্যমন্ত্রী পুলিশের কাছে এও জানতে চান, রাস্তায় মানুষ কোনও সরকারবিরোধী প্রার্থনা করছে কিনা।

এসবের মধ্যে সন্ধে হয়ে যায়।

সন্ধে হতেই হাওয়া মহাদেবকে তাঁর বাড়ির দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তাঁর বাড়ির ব্যালকনিতে নামিয়ে দেয়। ততক্ষণে মহাদেবের আত্মহত্যার ইচ্ছে চলে গিয়েছে। তিনি আবার বাঁচার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন।

গল্পের শেষটুকু এইরকম:

এ কী বাতাস? মাধ্যাকর্ষণ শক্তি? নাকি অন্য কিছু? মহাদেব মিত্র তা বুঝতে পারলেন না। তার আগেই কোনও এক অদৃশ্য অলৌকিক শক্তি তাঁকে তাঁর ফ্ল্যাটের বারান্দায় নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। তিনি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলনে।

ঠিক এই সময়ে ডোরবেল বেজে ঊঠল। তিনি দরজা খুলতে এগিয়ে গেলেন। নিশ্চয় তাঁর শ্যালক অজিত এসেছে। কিন্তু দরজা খুলে তিনি চমকে উঠলেন। তাঁর সামনে কয়েকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। তাঁদের মধ্যে একজন তাঁকে জিজ্ঞেস করল, আপনি মহাদেব মিত্র?

মহাদেব মিত্র বললেন, হ্যাঁ।

আপনাকে একবার থানায় আসতে হবে।

কেন?

আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে।

কী অভিযোগ?

আপনি একজন সন্ত্রাসবাদী। আপনি এই দেশের পক্ষে ক্ষতিকর।

পুলিশের নিরপরাধীকে অপরাধী সাজানোর গল্প তো আমরা অনেক পড়েছি। কিন্তু এরকম গল্প কি পড়েছি? এমন হাসির মোড়কে দেখেছি কি, কীভাবে রাষ্ট্র এত ভীতু হয়ে গেল যে, একজন শক্তিহীন একলা বুড়োকে আততায়ী বানাতে হল? কিন্তু সে-সব না দেখে আপনি যদি ভাবতে থাকেন, একজন মানুষ কী করে ঝাঁপ দিয়ে মাটিতে না পড়ে হাওয়ায় ভাসতে থাকল, তাহলে জানবেন আপনি বাস্তববাদী রীতির চশমা পড়ে ভাবছেন। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সূত্রকে আর একবার সুনিশ্চিত করার জন্য বা পদার্থবিজ্ঞানের একটি প্রাথমিক ধারণা সম্পর্কে আপনাকে অবগত করানোর জন্য গল্পটা লেখা হয়নি। এই কার্যকারণ সূত্রকে লঙ্ঘন করার পর যা ঘটল তাই গল্পের উপজীব্য। অর্থাৎ, রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তি।

 

(৪)

এই প্রবন্ধ পড়ার পর পাঠকের কাজ হল রমানাথ রায়ের গল্পগুলো পড়া। গল্পগুলো পড়ে আনন্দ পাওয়া। পড়তে পড়তে ভাবা গল্প কতরকম ভাবে লেখা যেতে পারে।

এই প্রসঙ্গে একটি বইয়ের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে, যে বইটির কথা রমানাথ মাঝেমাঝেই উদাহরণ হিসাবে দিয়ে থাকেন। বইটি হল ফরাসি সাহিত্যিক রেমো কনোঁর (Raymond Queneau) Excercises in Style। (মূল ফরাসি— Excercises de style, প্রকাশকাল-১৯৪৮)। এই বইটিতে একটি সামান্য ঘটনা নিরানব্বইরকমভাবে বলা হয়েছে। গল্প লেখা শুধু অনুপ্রেরণানির্ভর নয়, সেটি একটি কলা (craft), তাকে পরিশ্রম করে আয়ত্ত করতে হয়— এই কথাটা পাঠক ধারণা করতে পারবেন বইটি পড়ে। আগ্রহী পাঠক বইটি পড়ে, রমানাথের গল্পগুলি পড়ে আমার কথার সত্যতা যাচাই করে নিতে পারেন।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3495 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

11 Comments

  1. বহুদিন আগে রমানাথ রায়ের ‘অমুকচন্দ্র অমুক’ শিরোনামে একটা গল্প পড়েছিলাম। আপনার চমৎকার বিশ্লেষণী লেখাটা পড়ে রমানাথের গল্প আরো বেশি করে পড়বার আগ্রহ জন্মালো। লেখককে আন্তরিক ধন্যবাদ।

    • ভাল লাগল, নাহার তৃণা!
      ‘অমুকচন্দ্র অমুক’ ‘গল্পপাঠ’ ওয়েবজিনে রয়েছে। এছাড়া আরও দু’টো ছোটগল্প ওখানে পাওয়া যায়।

  2. reality ও realism-এর পার্থক্য খুব সহজ ভাষায় বলা হয়েছে। সংগের উদাহরণগুলো বিষয়কে আরো সহজবোধ্য করে তুলেছে। রমানাথ রায় আমার প্রিয় লেখক। কিন্ত এই প্রবন্ধ ওনার লেখাকে আরো প্রিয় করে তুলবে বলে আমার বিশ্বাস।

    লেখককে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। আশা রাখি লেখক এরকম সহজ ও প্রাঞ্জল লেখা আরো লিখবেন।

  3. রমানাথ রায়ের মত বিরাট লেখকের লেখা পড়তে পাওয়াটাই সৌভাগ্যের ব্যাপার । তার উপর কেউ যদি তাকে নিয়ে এরকম লেখেন তবে তো সোনায় সোহাগা। এত সুন্দরভাবে রমানাথ রায়ের লেখা ব্যাখ্যা করেছেন ইন্দ্রজিত ঘোষ যে তিনিও একজন দক্ষ লেখক সেটা বোঝা যাচ্ছে।

  4. Ei lekhatar form r representation ta khub specific r effective..akta jotil bisleshan khub sundar vabe present kara hayeche..flow of topic/thoughts r setar saral , sundar representation darun laglo..lekhak ke asesh avinandan eto sundar akta lekha pathok ke upohar debar janna?

    • ভালো লাগল, দেবজিৎ! এই মন্তব্য আমার আত্মবিশ্বাসের জন্য ‘এফেক্টিভ’ হয়ে থাকবে।

আপনার মতামত...