তারান্তিনো, সিজন দুই — নয়

প্রিয়ক মিত্র

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

একটানা ডেকে চলেছে একটা রাতচরা পাখি।

এই ডাকটা শুনলেই দেহ আনচান করে ওঠে নরেনের।

দৈহিক অনুভূতি কী এবং কেন, তা আজ পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারেনি নরেন, ওরফে জন।

তাই সেদিন যখন ওই মেয়েটিকে ও বহন করে নিয়ে আসছিল হাসপাতাল অবধি, তখনও ওর কিছুই মনে হয়নি। বরং মনে ছিল, প্রথমে মেয়েটির কাছে যেতেই তার ফোঁস, তার প্রতিরোধ। তখনই মনে হয়েছিল নরেনের, অচেতন অবস্থাতেও যখন মেয়েটিকে স্পর্শ করবে নরেন, ওকে বয়ে আনতে গেলে ওকে স্পর্শ করতেই হবে, তখন যেন একচুলও অসোয়াস্তি না হয় মেয়েটার। মেয়েটি যাতে ওকে ভরসা করে, আস্থা রাখে ওর ওপর, তাই চেয়েছিল নরেন।

কিন্তু এই রাতচরা পাখির ডাক নরেনের শরীরে হিল্লোল তোলে।

ওর আবছা মনে পড়ে ওদের পল্লী, ওর পুরনো জীবন।

যে জীবন ছেড়ে সে এখানে এসেছে।

ওর মনে পড়ে ঝিরিয়ার কথা।

অনেক ছোট তখন নরেন। আর ঝিরিয়ার বয়স তিরিশ পেরোচ্ছিল।

ওই ছোটবেলায় ঝিরিয়াকে দেখলে নরেনের কেমন ছটফটে লাগত।

আজ এতদিন পর ঝিরিয়ার কথা মনে পড়ছে নরেন ওরফে জনের। আশ্চর্য উথালপাথাল হচ্ছে ওর শরীরের ভেতর।

আর মনে পড়ছে ডমরুর কথা।

ফাদার লুইস, ওদের নতুন ফাদার এখানে আসার পর ওদের জীবনে অনুশাসন অনেক কমে গিয়েছিল। একটা হোমে থাকা এবং খাওয়ার বন্দোবস্তের বিনিময়ে যতটুকু কাজ ক‍রতে হয়, ততটুকুই করত ওরা।

সেসময় একদিন ডমরু ওরফে স্টিফেন হোম ছেড়ে পালায়।

ডমরু পালিয়ে কোথায় গেছে কেউ জানে না। কিন্তু এটুকু সবাই জানে, স্টিফেন নামটা এখন আর ও মনে রাখে না। ও নিজের পরিচয় দেয় ডমরু কাহার বলে। আর বলে, বিরসা ভগবান ওর মধ্যে দিয়ে ফিরে এসেছে।

পাগল হয়ে গিয়েছিল ডমরু।

ডমরু পালানোর আগের একটা দিনের কথা মনে পড়ে নরেনের।

ডমরু তখন কাজ করছিল না। হোমের কোনও কাজই নয়। সকলেই কমবেশি হাল ছেড়ে দিয়েছিল। ফাদার লুইস তো মাথাই ঘামাতেন না। বরং সকলকে বলে দিয়েছিলেন, ডমরুকে কেউ যেন বিরক্ত না করে।

কিন্তু মাইকেল ঝামেলাটা পাকাল।

গিরিন ওরফে মাইকেল আনমনা ডমরুর কান ধরে ধমক দিয়েছিল, ‘ওঠ! উঠে কাজ কর!’

ডমরু কিছু বলেনি প্রথমে। তার কিছুক্ষণের মধ্যে হোমের পেছনদিক থেকে একটা গোঙানি শুনে দালানে কর্মরত সকলে ছুটে যায়।

গিয়ে আবিষ্কার করে, একটা মাটি কোপানোর কোদাল গলায় ঠেকিয়ে মাইকেলের চোখে চোখ রেখে ঠায় তাকিয়ে আছে ডমরু।

মাইকেলের গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। তার দৃষ্টি বিস্ফারিত। চোখ ঠিকরে আসবে যেন।

ডমরুর চোখের দৃষ্টি দেখে প্রথমে কেউ এগতে সাহস পায়নি তার দিকে।

ওই দৃষ্টি কোনও দিন ভুলবে না নরেন।

ডমরুর চোখ দেখে সেদিন বোঝা গিয়েছিল, ওকে আর পোষ মানানো যাবে না।

পোষ মানাতে চাইছেই বা কে? ফাদার রুবেল কোনও দিন কাউকেই পোষ মানাতে চেয়েছেন বলে তো মনে হয় না।

ফাদারের কথা মনে পড়তেই হঠাৎ চিন্তার স্রোত বাঁক নিল নরেনের।

কলকাতায় গেছেন ফাদার? হঠাৎ কেন কলকাতায়? কী কাজ থাকতে পারে ফাদারের কলকাতায়?

আদৌ কলকাতাতেই গেছেন তো ফাদার?

এটা ভেবেই নরেন চমকে উঠল। সে কি ফাদারকে সন্দেহ করছে?

আসলে ফাদারকে বুঝে ওঠা খুব মুশকিল।

ফাদার কখনও তাদের কোনও শৃঙ্খলে বাঁধেনি। আগের ফাদার, যে নরেনকে সফলভাবে জন মাহাতো করে তুলল, তার সঙ্গে এর আকাশপাতাল ফারাক। হোম নিয়ে ফাদার আশ্চর্য উদাসীন। ডমরুর পালিয়ে যাওয়ার সময়ই সেটা টের পেয়েছিল নরেন।

শুধু চার্চে যাওয়া, চার্চের পাশের ঘরে বসে নিয়ম করে বই পড়া— এই হল ফাদারের নিয়মানুবর্তিতা। কর্মঠ বটে, তবে কেমন জানি গা-ছাড়া ভাব ফাদারের।

আর খুব শৌখিন ফাদার।

ফাদারের শৌখিনতার কথা ভাবতেই হঠাৎ একটা ঠান্ডা স্রোত খেলে গেল নরেনের শরীরে।

ফাদার একটা আতর মাখতেন। সেই আতরের গন্ধ অসম্ভব তীব্র।

অনেক সময় ঘটনার আকস্মিকতায় অনেককিছুর অনুভব স্পষ্ট হলেও তা লহমায় হারিয়ে যায়।

যেদিন ওই স্বদেশি করা মেয়েটাকে উদ্ধার করেছিল নরেন, সেদিন মেয়েটার কাছে পৌঁছনোর আগে একটা ছায়ামূর্তি নরেনকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। ধাক্কাটা আচমকা লাগার দরুন সেই ছায়ামূর্তির চেহারা আন্দাজই করতে পারেনি নরেন। কিন্তু তার নাকে এসেছিল একটা গন্ধ।

গন্ধটা তখনই চিনতে পেরেছিল নরেন। কিন্তু ওর পরে কিছুতেই মনে পড়েনি ও কোথায় আগে পেয়েছে সেই গন্ধ।

উত্তেজনায়, অস্থিরতায় ছটফট করতে করতে নরেন উঠে বসল বিছানায়।

মনে পড়েছে ওর।

ফাদার! ফাদার কাছে এলেই ওই গন্ধটা ও পেত।

সেদিন সদর হাসপাতালেও এটা ওর মাথায় খেলেছিল। কিন্তু ও দুয়ে দুয়ে মেলাতে পারেনি কিছুতেই।

ওর সব গুলিয়ে যাচ্ছে।

ওই মেয়েটাকে আহত অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছিল ফাদার? কেন? সুশ্রূষা করতে? না খুন করতে?

ফাদার কি ওই স্বদেশিদের বন্ধু, নাকি শত্রু?

 

‘যখন যা করবে, যেখানে যাবে, মাথায় রাখবে, নিজের কাছে সৎ থাকাটাই আসল!’

মায়ের এই কথাটা মাথায় বড্ড টোকা দেয় লতার। এখনও দিচ্ছে।

মৃন্ময়দাদার সঙ্গে পালানোর পরের দিনগুলোর কথা ভাবলে আজব লাগে লতার। সঙ্গে ছিল সূর্যবাবু আর আরও দুজন।

লতার কোনও দিন আরামের অভাব হয়নি ওর নিজের বাড়িতে। যা চেয়েছে, পেয়েছে হাতের কাছে।

অথচ, বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ার পর সব অন্যরকম হয়ে গেল।

কুঁড়েঘর থেকে পোড়ো বাড়ি, সর্বত্র ওরা পুরুষ-নারী মিলে ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকত। খাওয়াদাওয়ার ঠিক থাকত না।

লতা বুঝতে পারত, যত না দেশকে ভালোবেসে, তার চেয়ে অনেক বেশি মৃন্ময়দাদাকে ভালোবেসে ওর ঘর ছাড়া। তার জোরেই হয়তো ও টিকে যেতে পারত শত অসুবিধে সত্ত্বেও।

কিন্তু পুরুলিয়াতে পৌঁছেই বিপদটা ঘটল।

পুলিশ হঠাৎ খোঁজ পেয়ে গেল ওদের।

সূর্যবাবুর আদেশে আগে মৃন্ময়কে পালাতে হল।

তারপর শুরু হল ওদের লুকিয়ে বেড়ানো। আর কারও বাড়ি নয়। জঙ্গলে জঙ্গলে।

প্রথম প্রথম লতার বাড়ি ফিরে যেতে ইচ্ছে করত একছুটে। গিয়ে মায়ের কোলে মুখ লুকোতে ইচ্ছে করত। বাবা, যে বাবার সঙ্গে ছোট থেকেই একটা দূরত্ব ছিল লতার, যে বাবাদের গোটা প্রজন্মটাকেই বাতিলের খাতায় ফেলে মৃন্ময়দাদারা, সেই বাবার কথা মনে পড়ত লতার।

আস্তে আস্তে কঠিন হতে শুরু করল লতা।

দেশকে সেও ভালোবাসে। মৃন্ময়দাদার থেকেও দেশ তার কাছে অনেক বেশি জরুরি, এইটা সে আস্তে আস্তে বুঝতে শিখল।

বাকিদের সঙ্গে সেও মানিয়ে নিতে শুরু করল।

তারপর একদিন পল্টনবাহিনির মুখোমুখি হতেই হল ওদের।

আর গুলি এসে লাগল সেই লতার গায়েই।

মৃন্ময়দাদা কোথায়? সূর্য মিত্রই বা কোথায়? জানে না লতা।

লতার শুধু দুজনের কথা মনে হয়। প্রায় অচেতন অবস্থায় তাকে বহন করেছিল কে? তার গা থেকে একটা তীব্র গন্ধ ছাড়া আর কিছুই পায়নি লতা। তাকে দেখতেও পায়নি।

দেখেছিল সে ওই ছেলেটিকে। যে কাঠ কাটতে এসে উদ্ধার করেছিল তাকে।

সে তার প্রাণ বাঁচিয়েছে ঠিকই। কিন্তু তার আজকের এই বন্দিদশাও তারই জন্য।

ওই ছেলেটাকে ঘৃণা করে লতা। আবার কৃতজ্ঞও বোধ করে।

কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট আর দারোগা যখন হাসপাতালে তার পাশে বসে ফিসফিস করে কথা বলছিল, সে শুনেছিল, ওই ছেলেটি একটা মিশনারি হোমে কাজ করে।

কোনও এক মিশনারি সাহেব তাদের দলে আছে, একথা বলেছিল মৃন্ময়দাদা।

এটা ভেবে একটু সচকিত হল লতা।

ফাদার বলে সম্বোধন করে যার সঙ্গে কথা বলছে ম্যাজিস্ট্রেট মহেশ সেন, সে তো ওই পুরুলিয়াতেই একটা হোম চালায়।

আর সবচেয়ে বড় কথা, এই ঘরে ঢোকার পর থেকেই একটা আজব গন্ধ পাচ্ছিল সে।

গন্ধটা কি…

ভাবতে ভাবতেই ওর চোখ গেল কমবয়সি দারোগাটার দিকে।

মহেশ সেন আর ওই দারোগা, যার নাম নাকি জনার্দন সান্যাল, দুজনেই ওকে নিয়ে গোপন আলোচনা করছিল অনেকক্ষণ।

এখন মহেশ সেন কথা বলছে ফাদারের সঙ্গে। আর জনার্দন সান্যাল ঠায় তাকিয়ে তার দিকে।

জনার্দনের চোখের দৃষ্টি তার মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দিল।

এবার হঠাৎ তার কানে এল সনাতন হাজরার গলা।

‘এটা কী!’

শুধু তার না, ঘরের সকলেরই কানে গেছে সনাতন হাজরার আর্তনাদ।

আর্তনাদটা হাঁড়িতে চড়ানো একটা রান্না দেখে।

জয়চাঁদ নামক লোকটা হাত কচলে হেঁ হেঁ করে বলল, ‘এজ্ঞে মুরগির মাংস।’

চোখমুখের হালহকিকত পালটে গেল সনাতনের। থমথমে মুখে সে ভুরু কুঁচকে বলল, ‘রামপাখি!’

‘এজ্ঞে হ্যাঁ ওই।’ গা জ্বালানো হাসি হেসে উত্তর দিল জয়চাঁদ।

‘কেন মশাই, আপনার কি ওতে রুচি নেই?’

প্রশ্নটা করলেন মহেশ সেন।

সনাতন কি উত্তর দিল সেটা আর কানে ঢুকল না লতার। তার চোখ আটকে গেছে সনাতনের খড়মে।

এই ঘরে ধুলোর আস্তরণ সর্বত্র। তাই খালি পায়ে থাকা চলে না। সকলেই তাই জুতো পরে।

কিন্তু সনাতনের খড়ম দেখে মাথা ঘুরে গেল লতার।

খড়মের নিচের অংশে একটা কিছু ঝিলিক মারছে।

কী ওটা?

খড়মের নিচটা ফাঁক হয়ে আছে একটু, আর তা থেকেই যেন বিচ্ছুরিত হচ্ছে একটা মৃদু আলো।

ঘরের আর কারও কি চোখে পড়ছে না ব্যাপারটা?

আবার আগামী সংখ্যায়


তারান্তিনো-র সমস্ত পর্বের জন্য ক্লিক করুন: তারান্তিনো — প্রিয়ক মিত্র

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5420 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.