বাঁয়ে ঝুঁকে থাকা ভাসমান ভোট কার বাক্সে যাবে, প্রশ্ন তা নিয়েই

মৈত্রীশ ঘটক ও বিষাণ বসু

 




মৈত্রীশ ঘটক লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স-এ অর্থনীতির অধ্যাপক, বিষাণ বসু চিকিৎসক। ‘দ্য ওয়্যার’ ওয়েব-পোর্টালে প্রকাশিত তাঁদের এই মূল নিবন্ধটি লেখকদের অনুমতিক্রমে চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে অনূদিত ও পুনঃপ্রকাশিত হল

 

 

 

রাজ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ভোট সমাপ্ত। চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনের পর ২০১১ সালের পরিবর্তন— তারপর দেখতে দেখতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের এক দশক পার হয়ে গেল— এবার তাঁর সরকারের পরীক্ষা। কর্মসংস্থানের অভাব, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও গা-জোয়ারির অভিযোগ এবং ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া— সব মিলিয়ে পরিস্থিতিটা তাঁর পক্ষে “এ বড় সুখের সময় নয়, এ বড় আনন্দের সময় নয়”। বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প, কন্যাশ্রী বা স্বাস্থ্যসাথীর মতো জনমুখী প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি একটা পোক্ত সমর্থকভিত্তি তৈরি করতে পেরেছেন নিঃসন্দেহে— বিশেষত রাজ্যের নারীদের মধ্যে তো বটেই— কিন্তু তা দিয়ে এ যাত্রা বৈতরণী পার হওয়া যাবে কি না, নিশ্চিত নয়। অপরদিকে, ভারতীয় জনতা পার্টি— তাদের পক্ষেও এই নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন তো তাঁদের কাছে সামান্য একটি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন নয়। ঐতিহ্যগতভাবে বামদিকে ঝুঁকে থাকা, এবং চিন্তাশীল ও সচেতন হিসেবে পরিচিত একটি রাজ্যকে যদি গেরুয়া পতাকার তলায় এনে ফেলা সম্ভব হয়, জাতীয় স্তরে তার তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। আত্মপরিচয়ের রাজনীতি, বিশেষত ধর্মপরিচয়-ভিত্তিক কিংবা জাতপাতের রাজনীতি এই রাজ্যের ভোটে সেভাবে প্রকাশ্যে আসত না— এবারে পরিস্থিতি ব্যতিক্রমী। আবার স্থানীয় আত্মপরিচয়— বাঙালি সংস্কৃতি বনাম অবাঙালি, অথবা স্থানীয় বনাম বহিরাগত— সেই রাজনীতিও মাথাচাড়া দিয়েছে।

অন্যান্য রাজ্য, যেমন কেরল, যেখানে বাম শাসনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে— সেখানকার মতো এই রাজ্যে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়ায় ঘনঘন সরকার বদল ঘটে না। কিন্তু, এ দফায় তৃণমূল সরকার পুনর্নিবাচিত হবে কি না, তা নিয়ে বিস্তর সংশয়। বামদল এবং কংগ্রেস, ঐতিহ্যগতভাবেই পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু এই রাজ্যে জোটের শরিক— সেই জোট অর্থনীতির প্রশ্নগুলো, মানুষের রুজিরোজগারের প্রশ্নগুলোকে সামনে এনে লড়তে চাইছে। প্রাক-নির্বাচনী জনমত সমীক্ষাগুলো অবশ্য তাদের খুব বেশি নম্বর দিচ্ছে না— মোটামুটি বিজেপি কিম্বা তৃণমূলের স্বল্প ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা বড়জোর ত্রিশঙ্কু বিধানসভার সম্ভাবনার কথাই বলছে (সারণী ১-এ সাম্প্রতিক কিছু সমীক্ষার ফলাফল দেওয়া রইল)।

সারণী – ১ : সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্বাচনী সমীক্ষার ফলাফল

পিপল্‌স পালস সি ভোটার এবিপি-সিএনএক্স টিভি-নাইন
তৃণমূল কংগ্রেস ৯৫ ১৬০ ১৪১ ১৪৬
সংযুক্ত মোর্চা ১৬ ২২ ১৮ ২৩
ভারতীয় জনতা পার্টি ১৮৩ ১১২ ১৩৫ ১২২

তথ্যসূত্র https://www.ndtv.com/india-news/hung-assembly-in-bengal-upa-win-in-tamil-nadu-poll-of-opinion-polls-2398448 

এখন জনমত সমীক্ষার ওপর খুব বেশি নির্ভর করা মুশকিল। তবু, সবক’টি সমীক্ষা মেলালে এটুকু ধরে নেওয়া যায়, এই দফায় বামজোটের পক্ষে একক গরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গড়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সেই প্রেক্ষিতে দেখতে গেলে, একশ্ৰেণির ভোটার, যাঁদের আমরা বামমনস্ক বা বামঘেঁষা বলব, তাঁদের মনে কিছু সংশয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এঁরা আগে বামদলকে ভোট দিতেন এবং এখনও বামজোটের জেতার সম্ভাবনা বেশি হলে তাদেরই ভোট দিতেন, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশয়াকুল। আর তাঁরা যদি সেই সংশয়ের অবস্থান থেকে সিদ্ধান্ত নেন, সেই সংশয়ের অবস্থান থেকে তাঁরা ঠিক কাকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তার উপর এই নির্বাচনের ফলাফল বেশ খানিকটা নির্ভর করতে পারে। শুরুতেই বলে রাখা যাক, এই সংশয় কমিটেড বাম-ভোটারের নেই— অর্থাৎ যাঁরা সব পরিস্থিতিতেই নির্দিষ্ট চিহ্ন দেখে বোতাম টেপেন, এই আলোচনা তাঁদের নিয়ে নয়। আমাদের আলোচনা দোদুল্যমান ভোটারদের নিয়েই।

২০০৬ সালের ৫০ শতাংশ থেকে ২০১১ সালে একধাক্কায় বামভোট নেমে আসে ৪০ শতাংশে— ‘পরিবর্তন’-এর বছরে, যখন বামশাসনের অবসানে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসে। ২০১৬ সালে সেই ভোট আরও কমে গিয়ে দাঁড়ায় ২৬ শতাংশে। শতাংশের হিসেবে প্রাপ্ত ভোট কমে যাওয়ার প্রতিফলন হিসেবে বিধানসভায়ও বামেদের আসন কমতে থাকে। ২০০৬ সালে ২২৭ থেকে ২০১১ সালে ৬০, আর সেখান থেকে আরও কমে গিয়ে ২০১৬ সালে বামেদের আসন দাঁড়ায় ৩২। নীচের সারণী নং ২-এর দিকে যদি চোখ রাখি, তা হলে বুঝতে অসুবিধে হয় না, বামভোটের এই উত্তরোত্তর হ্রাসে মূলত লাভবান হয়েছে যে দলটি— ভোটের শতাংশের হিসেবে এবং আসনসংখ্যার নিরিখেও— সেই দলটির নাম তৃণমূল কংগ্রেস। বিধানসভার আসনের নিরিখে নগণ্য হলেও, বিজেপির ভোটও একটু একটু করে বেড়েছে। ২০০৬ সালে যা ছিল ২ শতাংশেরও কম, ২০১৬ সালে সেই ভোট বেড়ে দাঁড়ায় ১০.১৬ শতাংশে। ২০১১ সালের নির্বাচনে তৃণমূলের জোটসঙ্গী হওয়ার সুবাদে বামবিরোধী হাওয়ার সুফল পেয়েছিল কংগ্রেস— ২০০৬ সালে বিধানসভায় তাদের দখলে ছিল ২১টি আসন, ২০১১ সালে তা বেড়ে দ্বিগুণ হয়, ৪২টি। ২০১৬ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস বামেদের সঙ্গে সরাসরি জোট করতে না-পারলেও, প্রাক্‌-নির্বাচনী আসন-সমঝোতা হয়েছিল। কংগ্রেসের আসনসংখ্যা সামান্য বেড়ে ৪৪-এ এসে দাঁড়ালেও শতাংশের হিসেবে প্রাপ্ত ভোট তেমন বাড়েনি।

সারণী – ২ : রাজ্যের গত চারটি বিধানসভা ভোটের প্রাপ্ত আসন ও ভোট-শতাংশের নিরিখে দলভিত্তিক খতিয়ান 

২০০১ ২০০৬ ২০১১ ২০১৬
পার্টি প্রাপ্ত আসন ভোট-শতাংশ প্রাপ্ত আসন ভোট-শতাংশ প্রাপ্ত আসন ভোট-শতাংশ প্রাপ্ত আসন ভোট-শতাংশ
তৃণমূল কংগ্রেস ৬০ ৩০.৬৬ ৩০ ২৬.৬ ১৮৪ ৩৮.৯৩ ২১১ ৪৪.৯১
কংগ্রেস ২৬ ৭.৯৮ ২১ ১৪.৭১ ৪২ ৯.০৯ ৪৪ ১২.৯৫
সিপিআইএম ১৪৩ ৩৬.৫৯ ১৭৬ ৩৭.১ ৪০ ৩০.০৮ ২৬ ১৯.৭৫
বিজেপি ৫.১৯ ১.৯৩ ৪.০৬ ১০.১৬
অন্যান্য বামদল ৪৯ ১০.৮৭ ৫১ ১১.২৮ ২০ ৯.৬ ৫.৯৪
ফরওয়ার্ড ব্লক   ২৫ ৫.৬৫ ২৩ ৫.৬৬ ১১ ৪.৮ ২.৮২
আরএসপি ১৭ ৩.৪৩ ২০ ৩.৭১ ২.৯৬ ১.৬৭
সিপিআই ১.৭৯ ১.৯১ ১.৮৪ ১.৪৫

তথ্যসূত্র https://www.indiavotes.com/ 

বামেদের ভোটক্ষরণের ফলাফল আরও নাটকীয়ভাবে দৃশ্যমান হয় লোকসভা আসনের দিকে চোখ রাখলে। নীচের সারণী (৩) যদি দেখি, দেখা যাবে যে ২০০৪ সালে রাজ্যের ৪২টি আসনের মধ্যে ৩৫টিই ছিল বামেদের দখলে। ২০১৯ সালে সেই সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে শূন্যয়। এ ক্ষেত্রেও, প্রাথমিকভাবে লাভবান সেই তৃণমূলই। ২০০৪ সালে মাত্র একটি আসন থেকে ২০১৪ সালে তাদের আসন বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪-এ, আর ২০১৯ সালে কিছুটা কমে গিয়ে দাঁড়ায় ২২-এ। এই সময়েই বিজেপিরও শক্তিবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। ২০০৪ সালে এ রাজ্যে যাদের একটিও লোকসভা আসন ছিল না, ২০১৯ সালে তাদের হাতেই আসে একেবারে ১৮টি। শতাংশের হিসেবে প্রাপ্ত ভোটের দিকে চোখ রাখলে বিজেপির শক্তিবৃদ্ধির বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়। ২০০৪ সালে যাদের ভোট দুই অঙ্কের কম, ২০১৯ সালে তাদের ভোট বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ শতাংশে। ওই ২০১৯ সালের ফলাফলই এই রাজ্যে তৃণমূলের মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিজেপিকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে।

সারণী – ৩ : গত চারটি লোকসভা ভোটে এ রাজ্যে প্রাপ্ত আসন ও ভোট-শতাংশের নিরিখে দলভিত্তিক খতিয়ান 

২০০৪ ২০০৯ ২০১৪ ২০১৯
পার্টি প্রাপ্ত আসন ভোট-শতাংশ প্রাপ্ত আসন ভোট-শতাংশ প্রাপ্ত আসন ভোট-শতাংশ প্রাপ্ত আসন ভোট-শতাংশ
তৃণমূল কংগ্রেস ২১ ১৯ ৩১.২ ৩৪ ৩৯.৮ ২২ ৪৩.৩
কংগ্রেস ১৪.৬ ১৩.৫ ৯.৭ ৫.৫
সিপিআইএম ২৬ ৩৮.৬ ৩৩.১ ২৩.০ ৬.৩
বিজেপি ৮.১ ৬.১ ১৭.০ ১৮ ৪০.২
অন্যান্য বামদল ১২.২ ১০.২ ৭.১ ১.২
ফরওয়ার্ড ব্লক   ৩.৭ ২.২ ০.৪
আরএসপি ৪.৫ ৩.৬ ২.৫ ০.৪
সিপিআই ৩.৬ ২.৪ ০.৪

তথ্যসূত্র https://www.indiavotes.com/ 

ভোটসংখ্যার এই উত্থানপতন থেকে অনুমান করা কঠিন নয়, বেশ কিছু সংখ্যক ভোটার দলীয় দায়বদ্ধতার অবস্থান থেকে ভোট দিলেও, বড় সংখ্যার ভোটারকেই নির্দিষ্ট কোনও ছকে ফেলা মুশকিল— যাঁদের বলা যেতে পারে ‘ভাসমান’ বা ‘দোদুল্যমান’ ভোটার। এঁরা পরিবেশ-পরিস্থিতির বদল অনুসারে বিভিন্ন নির্বাচনে বিভিন্ন দলকে ভোট দিতে পারেন, দিয়ে থাকেনও। যেমন ধরুন, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির আকস্মিক বৃদ্ধি দেখে অনুমান করা কঠিন নয়, বেশ কিছু ভোটার, যাঁরা এর আগে বামদলকে ভোট দিতেন, তাঁরা সে যাত্রা তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন— তৃণমূলের মুখ্য প্রতিপক্ষ হিসেবে বিজেপিকে নির্ভরযোগ্য বলে মেনে নিয়েছিলেন।

কিন্তু, শুধুই বাম-ভোটারদের বিজেপিকে ভোট দেওয়ার অভিযোগ তুলে এই সংখ্যাবৃদ্ধিকে ব্যাখ্যা করা মুশকিল। এ কোনও একমুখী ট্র‍্যাফিক নয়, এমনকি একটি নির্দিষ্ট রাস্তা ধরে দুটি দলের মধ্যে যাতায়াত করা উভমুখী ট্র‍্যাফিকও নয়। ২০১৯ সালের আগেই ঘটে গিয়েছে ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন— ব্যাপক অনিয়ম-রিগিং-সন্ত্রাসের অভিযোগের মধ্যেই তৃণমূলের ভোটসংখ্যা বেড়েছে বিপুল হারে। লক্ষণীয় বিষয় হল, সেই নির্বাচনে, বিরোধী দলগুলোর মধ্যে একমাত্র বিজেপির ভোটই বৃদ্ধি পেয়েছিল। ২০১৮-র সেই চমকপ্রদ ফলাফলের ঠিক একবছরের মাথায় সংঘটিত ২০১৯-এর নির্বাচনে তৃণমূলের ভোটসংখ্যা একধাক্কায় ৪০ শতাংশ কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৪৩.৩%-এ। অর্থাৎ, পঞ্চায়েত নির্বাচনে যাঁরা তৃণমূলকে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁদের একটা বড় অংশ লোকসভা নির্বাচনে ভোট দিলেন বিজেপিকে— যদি না এমন হয়ে থাকে যে, পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল ও বিজেপির বিপুল ব্যবধানের পুরোটাই নির্বাচনী অনিয়ম বা রিগিং-এর কারণে। আর গত কয়েকমাসে তৃণমূল কর্মী-নেতাদের ক্রমাগত বিজেপিতে যোগদানের বহর দেখে এটুকু স্পষ্ট, এই রাজ্যে বিজেপির ক্ষীণ ধারাটি খরস্রোতা নদীতে পরিণত হওয়ার পিছনে জলের যোগান অনেক পথেই এসেছে।

বর্তমান ভোটের প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। একজন ভোটারের সিদ্ধান্ত অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। বিধানসভা নির্বাচন, লোকসভা নির্বাচন আর পঞ্চায়েত নির্বাচন একই নয়— ভোটারের বিবেচনার বিষয়গুলিও একই থাকে না— এবং একই ভোটার বিভিন্ন নির্বাচনে বিভিন্ন দলকে ভোট দিতে পারেন। তবু, দুটো বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়— দলীয় মতাদর্শ আর ক্ষমতাসীন দলের সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান। অনেক ভোটারের সিদ্ধান্তই মতাদর্শগত দায়বদ্ধতা কিম্বা দলীয় আনুগত্য দ্বারা নির্ধারিত হয়। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে, যে নির্বাচনে বামেরা একটি আসনও জিততে পারেনি, তারা পেয়েছিল প্রায় সাড়ে সাত শতাংশ ভোট— ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনে তাদের কাছে ছিল ২৬ শতাংশ ভোট।

সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান আর একটা গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক। যে ভোটার কোনও একটি বিশেষ সরকারের কাছ থেকে কিছু সুবিধে পেয়েছেন, তাঁরা মতাদর্শ-নিরপেক্ষ হয়েই সেই সরকারের পক্ষে ভোট দিতে পারেন। তার দুটো কারণ হতে পারে— এক, মতাদর্শগত অবস্থানের বিষয়ে তাঁরা তেমন অনড় নন; অথবা দুই, তাঁরা মতাদর্শগত আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠেই কোনও বিশেষ লাভের আশায় নির্দিষ্ট কোনও চিহ্নে ভোট দিচ্ছেন। ঠিক একই কথা প্রযোজ্য সরকারের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ভোটারের ক্ষেত্রেও, অর্থাৎ যিনি মতাদর্শ কিম্বা দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে, সরকারের প্রতি বিরক্ত হয়ে কোনও চিহ্নের বিরুদ্ধে ভোট দিচ্ছেন।

দলের অনুগত তথা ‘কমিটেড’ ভোটার বনাম দোদুল্যমান ভোটার, সরকারপন্থী ভোটার বনাম সরকারের বিরুদ্ধে থাকা অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্ট ভোটার— কথাগুলো এমনিতে সোজাসাপটা, কিন্তু, ত্রিমুখী লড়াইয়ে এই সরল হিসেবগুলোই কিছু জটিলতার সৃষ্টি করে।

উদাহরণ হিসেবে বামঘেঁষা ভোটারদের কথা ধরা যেতে পারে। আগেই বলেছি যে আমরা মতাদর্শগতভাবে দায়বদ্ধ অর্থাৎ কমিটেড বাম ভোটারদের কথা বলছি না। বলছি এমন বামঘেঁষা ভোটারদের কথা, যাঁরা বামেদেরই ভোট দিয়ে আসছেন, বামেদের সরকার গড়ার সম্ভাবনা থাকলে এবারেও বামেদেরই ভোট দিতেন— কিন্তু এই মুহূর্তে পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনা করে সংশয়ে পড়েছেন। ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাঁদের প্রাথমিক পছন্দের দলটি অবশ্যই বাম, কিন্তু বাকি দুটি দলের মধ্যে কোনটি তাঁদের বেশি অপছন্দ, তা তাঁদের সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে দাঁড়াতে পারে। সে অবশ্য নতুন কোনও কথা নয়, কিন্তু এই বিশেষ ক্ষেত্রে মুশকিলের ব্যাপার হল, এই ধরনের ভোটারদের বিবেচনায় বাকি ভোটারদের সাধারণ চিন্তাভাবনা কী, বা ভোটের জেনারেল ট্রেন্ড কী, সেই বিবেচনাও ভোটদানের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। ধরা যাক, এমন বামঘেঁষা ভোটার, যাঁরা তৃণমূল এবং বিজেপি দুই দলেরই বিরোধী, কিন্তু বিজেপি-বিরোধিতাই প্রবলতর। সে ক্ষেত্রে, তাঁদের এমন মনে হতেই পারে, বামেদের ভোট দেওয়ার অর্থ বিজেপি-বিরোধী ভোটটাকে ভাগ করে ফেলা, যা কিনা প্রকারান্তরে বিজেপিকেই সাহায্য করে ফেলতে পারে, যেটা খুবই অনুচিত কাজ তাঁদের পক্ষে। একই কথা প্রযোজ্য তৃণমূল-শাসনে অতিষ্ঠ বামঘেঁষা ভোটারদের ক্ষেত্রে, অর্থাৎ তাঁদের মনে হতে পারে, বামেদের ভোট দেওয়ার অর্থ তৃণমূল-বিরোধী ভোটটাকে ভাগ করে দিয়ে তৃণমূলকে জিততে সাহায্য করা।

এমতাবস্থায় কী করণীয়? তবে কি এমন ভোটাররা যাবতীয় বিরক্তি অগ্রাহ্য করে দ্বিতীয় পছন্দের (বা কম অপছন্দের) দলকে ভোট দিয়ে আসবেন? ‘লেসার ইভিল’ তত্ত্বে যাঁরা বিশ্বাস করেন, তাঁরা এমন করেই ভাবছেন। যেমন ধরুন, নো-ভোট-টু-বিজেপি-র সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তৃণমূল-বিরোধী বামঘেঁষা ভোটারদের কথা। কিন্তু এখানেও সমস্যা আছে। ধরুন, এঁরা বিজেপিকে আটকাতে তুলনায় কম অপছন্দের তৃণমূলকে দলে দলে ভোট দিয়ে এলেন আর তৃণমূল বিপুল ব্যবধানে জিতে গেল, কেননা বিজেপির পক্ষে তেমন হাওয়া আদপেই ছিল না। এই ভোটাররা তৃণমূলকে একেবারেই দেখতে পারেন না এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে পড়ে তাঁরা এ যাত্রা তৃণমূলকে ভোট দিলেও, এই সিদ্ধান্ত তাঁদের পক্ষে সহজ ছিল না— তাঁদের এই সিদ্ধান্তের এমন প্রতিফল তাঁরা কখনওই মেনে নিতে পারবেন না। আবার, বামেরা হয়তো এমনিতেই জিতত না— কিন্তু এমন বামঘেঁষা ভোটারদের সমর্থনও না-পেয়ে, ভোটসংখ্যার হিসেবে, বামশক্তি একেবারে অপ্রাসঙ্গিক ও প্রান্তিক শক্তিতে পর্যবসিত হয়ে পড়ল, যেটা এই ভোটাররা কখনওই চাননি। দুদিক থেকেই ব্যাপারটা সুবিধের হল না।

কিন্তু, এমন পরিস্থিতিও দাঁড়াতে পারে যাতে এমন সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত হতে পারে। ধরুন তৃণমূল সামান্য ব্যবধানে জিতল অথবা বিজেপির কাছে হেরে গেল। সে ক্ষেত্রে এই ভোটারদের এটুকু সান্ত্বনা থাকবে, সবচেয়ে অবাঞ্ছিত পরিণতিটা ঠেকাতে তাঁর ভোটটি কাজে এসেছে, কিংবা (বিজেপি জিতে গেলে) সবচেয়ে অপছন্দের পরিণতি ঘটানোর পেছনে অন্তত তাঁর দায় নেই। ঠিক একই যুক্তি প্রযোজ্য এমন বামঘেঁষা ভোটারদের ক্ষেত্রে, যাঁরা বিজেপির তুলনায় তৃণমূলকে আরও বেশি অপছন্দ করেন এবং সেই অপছন্দের মাত্রা অনুসারে সাধারণ ট্রেন্ড অনুমান করে ভোটদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

তা হলে এত আলোচনার শেষে আমরা কী কী দেখলাম? এখানে আরও একবার বলে রাখা দরকার, কাকে ভোট দেওয়া উচিত সে উপদেশ দেওয়া আমাদের কাজ নয়, আমরা তা চাইও না। আমরা কেবল বামঘেঁষা ভোটারদের দ্বিধা-সংশয়ের জায়গাটাই বুঝতে চেয়েছি। যেটুকু দেখা গেল, বামঘেঁষা ভোটাররা তাঁদের প্রথম পছন্দের দলটিকে ভোট দিতে তো পারেনই, এমনকি দ্বিতীয় পছন্দের দলটিকেও ভোট দিতে পারেন— পরিস্থিতির বিভিন্নতা অনুসারে দুরকম সিদ্ধান্তের পক্ষেই যথেষ্ট যুক্তির জোগান দেওয়া যেতে পারে।

কিন্তু, বাকি ভোটারদের চিন্তাভাবনা কিম্বা ভোটের সাধারণ ট্রেন্ড, কোনওটিরই আগাম আন্দাজ পাওয়া মুশকিল, কাজেই উপযুক্ততম সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজটা কঠিন— খুবই কঠিন। ২০১১ সালের নির্বাচনে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের স্পষ্ট ঝোড়ো বাতাস ছিল, তদুপরি এমন ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার ব্যাপার ছিল না। ভোটারদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজটা ছিল অনেক সহজ— হয় আপনি নিজের পছন্দের দলকে ভোট দিচ্ছেন, অথবা আপনি পরিবর্তন চেয়ে ভোট দিচ্ছেন। এবারের ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই একদিকে যেমন বামঘেঁষা ভোটারদের একাংশকে জটিল সংশয়ের মধ্যে ফেলেছে, অন্যদিকে তেমনই নির্বাচনের ফলাফল অনুমানের কাজটাও দুঃসাধ্য করে দিয়েছে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3172 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...