দধীচির হাড়

দধীচির হাড় -- অশোক তাঁতি

অশোক তাঁতি

 

অসময়ে চলে গেলেন গল্পকার অশোক তাঁতি। আমাদের পাঠকদের তাঁর লেখার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এবং তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে আমরা প্রকাশ করলাম তাঁর এই গল্পটি। গল্পটি সাত্যকি হালদারের সৌজন্যে পেয়েছি আমরা।

তার প্যান্টের জিপারের কাছটা অনেকক্ষণ ধরেই ভিজে ভিজে বোধ হচ্ছিল। ঘুমের ঘোরে ব্যাপারটা কী দেখতে ইচ্ছা করছিল না। বেশ ঠান্ডা পরিবেশ। গ্রীষ্মকালে পারতপক্ষে সে ইভনিং শিফটে ছুটি নেয় না। নাইট শিফটে তো প্রশ্নই নেই। নাইটে এলে ঠান্ডাতে ঘুমটা ভালো হয়, সঙ্গে নাইট অ্যালাউন্সের করকরে কিছু টাকা।

ঠেলাঠেলিতে ঘুম ভেঙে চোখ কচলে ভবেশ দেখে কন্ট্রোল অ্যাসিস্টেন্ট উপিন্দরদা তার মুখের ওপর ঝুঁকে আছে। উপিন্দর চোখ পাকিয়ে বলে— ভবেশ তোর আর তোর ছেলের অভ্যেস দেখছি একইরকম। তোকে এখন সাহস করে সুইচইয়ার্ড ইনস্পেকশনে পাঠাব কিনা ভাবতে হবে।

ভবেশ প্যান্টের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে— ওই হারামির বাচ্চা মানিক প্যান্টে জল ঢেলে দিয়েছে। তুমি ওর নামে রিপোর্ট না করলে আমি কোথাও যেতে পারব না।

কন্ট্রোলরুমের সবাই হেসে উঠেছিল। সারারাত জেগে থাকার জন্য কারুর পিছনে না লাগলে চলে না। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসতে চায়।

ভবেশ আরও রেগে ওঠে— না উপিন্দরদা এর একটা হেস্তনেস্ত আপনাকে করতেই হবে। আমার সঙ্গে যখন যা ইচ্ছে তাই করবে এ চলতে পারে না। দরকার হলে আমি বড় সাহেবকেও বলব। গত সপ্তায় আমার প্যান্টের পকেটে ক্যান্টিনের লাড্ডু ঢুকিয়ে দিয়েছিল। ইঁদুরটা পকেটে ঢুকেছিল। যদি ওখানে কামড়ে দিত আপনি দেখতে আসতেন?

ভবেশকে কিছুতে থামানো যাচ্ছে না দেখে উপিন্দর বলে— কী রিপোর্ট? তোর কী করেছে একটা লিখিত দরখাস্ত দিস। আমি শিফট ম্যানেজারকে ফরওয়ার্ড করে দেব। তবে এক বাত ইয়াদ রাখনা, পহলে তোরা দুজন সাসপেন্ড হয়ে যাবি। তারপরে এনকোয়ারি হবে। কী করবি বল?

সাসপেন্ড হওয়ার কথা শুনে ভবেশ চুপসে যায়। উপিন্দর বলে— এখন যা ইসমাইলের সঙ্গে ট্রান্সফর্মারগুলো দেখে আয়।

আজ সন্ধেবেলা ওখানে মেনটেনেন্স ডিপার্টমেন্টের বিজনসাহেবের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।

রাত দশটা নাগাদ বিজন সুইচইয়ার্ডে কাজ করে ফিরছিল। সারিয়ে তোলা ট্রান্সফর্মারটা হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে— বাঁচাও বাঁচাও!

সুইচইয়ার্ডে আর যে হাজারো নানা কাজের ট্রান্সফর্মার ছিল, নানারকম ব্রেকার, আইসোলেটর তারা সবাই চমকে ট্রান্সফর্মারটার দিকে ফিরে তাকাল। ওর আবার কী হল? বিজনসাহেব আজ শুধুমাত্র ওর জন্য এই মাঝরাতে প্ল্যান্টে এসেছিলেন। গায়ে ঘন্টাখানেক ধরে স্নেহের হাত বুলিয়ে দিয়েছেন। তাদের অনেকের গায়ে তো বিজনসাহেবের স্নেহের হাত বেশ কয়েকদিন হল পড়েনি। শুধু রোজ সকালে যেমন আসেন, তেমনি এসে তাদের সামনে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে, দেখে চলে গেছেন। মনে মনে তিনি জিজ্ঞেস করেন— কী ছেলেমেয়েরা, সব ভালো তো?

বিজনসাহেব সব যন্ত্রপাতিগুলোকে ডেকে বলেছিলেন, আজকে আর বেশি দুষ্টুমি কোরো না। আজকে আমার অনেক ফাইলপত্র দেখতে হবে।

 

গ্রীষ্মের দুপুরে প্রচণ্ড গরম। পাখিগুলো পর্যন্ত বিশ্রাম নিতে চলে গেছিল। রোদগুলো ঘামের মতো গলে গলে পড়ছিল। এত কষ্টের মধ্যে তারা সবাই সারাদিন শান্ত হয়ে ছিল। ঠিক সন্ধের সময়, টু-টোয়েন্টির লাইটিং বাসটা, যেটা থেকে রাস্তায় আলো জ্বলে, হঠাৎ বেঁকে বসেছিল। সন্ধের সময় ঘুম থেকে ওঠার পর আজকে সাহেবকে দেখতে না পেয়ে তার খুব অভিমান হয়েছিল। সাহেবের পুরো সন্ধেটা ও বরবাদ করে দিয়েছে। তারপর ওই ট্রান্সফর্মার, ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছিল।

জেনারেটর ট্রান্সফর্মারকে ডেকে গম্ভীর গলায় বলল— ভাই, তোর এসব বাহানা এবার কমা। রাত হলেই শেয়াল দেখে ভয় পাওয়াটা ভালো অভ্যাস নয়।

তিন নম্বর একটা ট্রান্সফর্মার বলল— শেয়াল নয়, ও চোরদের দেখে ভয় পাচ্ছিল।

অন্ধকারের এক কোণ থেকে কেউ ঘুমের ঘোরে চেঁচাল— চোর, চোর!

শেয়াল, ছোট ছোট ট্রান্সফর্মার, ব্রেকার সবাই হুক্কাহুয়া করে উঠল— চোর, চোর!

মাত্র গত সপ্তায় একটা অসুস্থ ব্রেকার ঘুমন্ত অবস্থায় চুরি হয়ে গেছে। সুইচইয়ার্ডের ঠিক পরে প্ল্যান্টের বাউন্ডারি ওয়াল। সিকিউরিটিকে একটা পাত্তি দিয়ে ম্যানেজ করতে পারলে নিশ্চিন্তে পাঁচিলের ওপারে ভ্যানে ফেলে দেওয়া যায়। প্রচণ্ড গরমে সারাদিন ওভারটাইম করার পর তারা সবাই ঝিমিয়ে পড়েছিল। গ্রীষ্মের রাতের মৃদু হাওয়া হচ্ছিল। কারখানার কর্মীরা কেউ কেউ ঠান্ডা কন্ট্রোল রুমের প্যানেলের আড়ালে চট, খবরের কাগজ, প্যাকিংবাক্স পেতে শোয়ার আয়োজনও করে ফেলেছিল।

শেয়ালটার সঙ্গে ওই ব্রেকারটার বন্ধুত্ব ছিল। শেয়াল রাতের খাবার খেয়ে ফেরার পর তারা দুজন গায়ে গা লাগিয়ে ঘুমিয়ে থাকত। সেদিন দেখতে না পেয়ে শেয়ালটা চিৎকার করে সারারাত কেঁদেছিল। বিরক্ত হয়ে সিকিউরিটি ভোররাতে গুলি চালিয়েছিল। এখনও ঘাসের ওপর শেয়ালের চাপ চাপ রক্ত দেখা যায়। ট্রান্সফর্মারটার সেই থেকে শেয়ালভূতের ভয় হয়েছে। রাতে ঝিমোতে ঝিমোতে হঠাৎ হঠাৎ গোঁ গোঁ করে ফিট হয়ে যায়। তারা সবাই মিলে বোঝালেও ওটা কিছুতেই বুঝতে চায় না। বন্ধু-আত্মীয়রা মারা গিয়ে ভূত হয়ে ভয় দেখাতে আসতে পারে না, এই কথাটা ওকে কিছুতেই বোঝানো যাচ্ছে না। পরপর এক সপ্তা টেনশনের পর আজ রাতে ও প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছে। সেজন্যই বিজনসাহেবের প্ল্যান্টে আসা।

চিৎকার শোরগোলের মধ্যে ট্রান্সফর্মারটার কথা শোনা যাচ্ছে না। সে বারবার বলার চেষ্টা করে, কেউ তার কথা শুনতে পায় না। তারপর সবাই যখন চারদিক দেখার পর মাটিতে বিজনসাহেবের গায়ের ওপর ইয়ার্ডের এক পাশে দাঁড়ানো আইসোলেটরটা পড়ে থাকতে দেখতে পায় তখন চেঁচিয়ে ওঠে— ওরে ও আহ্লাদি ওঠ, সাহেবের হাড়গোড় সব ভেঙে যাবে। এত বয়স হল এখনও তোর সোহাগীভাব গেল না! তোর ওই এক মণ শরীর নিয়ে সাহেবের গায়ের ওপর পড়েছিস কোন আক্কেলে?

নীচে পড়ে এমনিতেই তার গায়ে চোট লেগেছে। গড়িয়ে যে পাশে সরে যাবে সেটুকুও পারছিল না। সবার বকাবকি শুনে আইসোলেটরটা কাঁদতে শুরু করেছে। সাহেবের সঙ্গে যেসব টেকনিশিয়ান ছিল তারা তাড়াতাড়ি ফার্স্টএড থেকে একটা গাড়ি জোগাড় করে সাহেবকে তুলে হসপিটাল নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় বণিক তাকে পা দিয়ে ঠেলে চারদিক দেখে কিছু বোঝার চেষ্টা করে। অবাক হয়ে বলে— মাউন্টিং ব্রাকেট তো ঠিকই আছে। মালটা পড়ল কী করে? কোথাও ভাঙার কোনও চিহ্ন নেই!

সমরেশ আইসোলেটরটার গায়ে লাথি মেরে বলে— যত্ত সব ফালতু মাল। রায়সাহেব কত কাটমানি খেয়েছে ঠিক আছে!

ইয়ার্ডের নতুন সব যন্ত্রগুলো তাদের বোনের এরকম অসম্মান দেখে রাগে গর গর করতে থাকে। একটা বৃদ্ধ ট্রান্সফর্মার তাদের বুঝিয়ে ঠান্ডা রাখে— যন্ত্র হয়ে যখন জন্মেছ মানুষের এসব অসম্মান অল্পবিস্তর সহ্য করতেই হবে। না হলে সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।

কমবয়সি যন্ত্ররা ভাবে, এইসব বুড়োভামগুলোর জন্য তাদের কোনও উন্নতি হচ্ছে না। এত বয়সেও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে যাচ্ছে। জেনারেটরের সঙ্গে এদের খুব বন্ধুত্ব আছে বলে তারা কিছু বলতে পারে না।

ভবেশ প্যাকিং বাক্সের বিছানা ছেড়ে উঠতে উঠতে বলে— শালা যত সব ঝরঝরে যন্ত্রপাতি! ওগুলো ফেলে দিলেই পারে, তা নয়!

ইসমাইল বলে— তোর বুড়ো বাপের তো শুনছি অসুখ লেগেই আছে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে বেডসোর হয়ে গেছে। একদিন গলা টিপে শ্মশানে ফেলে দিয়ে আসলে তো পারিস।

–মানুষ আর যন্ত্র এক হল?
–পার্থক্য কোথায়? পাম্পের মতো তোর হৃদপিণ্ড কাজ করছে। ক্রেনের দাঁড়ার মতো হাতগুলো। ফ্লেম স্ক্যানারের মত চোখ। এমনকি চিনমির মত সারাক্ষণ শরীর থেকে কিছু না কিছু পেচ্ছাপ, পায়খানা বেরিয়ে যাচ্ছে।

বেরোবার আগে গজগজ করতে করতে উঠে ভবেশ বলে— আমার কাছে একটা টর্চ না দিলে আমি যাব না।

উপিন্দর চেঁচিয়ে ওঠে— গত সপ্তায় একঠো টর্চ হারিয়েছিস। রোজ রোজ আমি কি টর্চ তৈয়ার করব?

ইসমাইল কথা না বলে তার হাতে একমাত্র টর্চটা ধরিয়ে দিয়ে বলে— ঠিক আছে, এটা তোর কাছে রাখ।

কার্বন ব্ল্যাকের ছোট বয়লার চেঁচিয়ে টিপিএসের বড় বয়লারকে প্রশ্ন করে— বড়দা, বিজনটা কে? সে নাকি যন্ত্রদের ভীষণ ভালোবাসে? তোমার মুখে আমি তার কোনও গল্প শুনেছি বলে তো মনে পড়ছে না।

টিপিএস বয়লার সেফটি ভালভের নাকে নিজের মুদ্রাদোষে একটা খোঁচা মেরে তুচ্ছ জিনিস উড়িয়ে দেওয়ার মতো ফুস করে শব্দ করে বলে— আমি তাকে একদিনও দেখিনি। মেয়েলি স্বভাবের কেউ হবে, জীবনে হাতুড়ি ধরেনি। ওইরকম ন্যাকা স্বভাবের লোকদের খোঁজে আমি রাখি না। ওই লোকগুলো মোটর, ট্রান্সফর্মার, ব্রেকারের মত মেয়েগুলোর চারপাশে ঘুরঘুর করে। আর ওগুলো এক একটা শয়তানি। বেস তোর সঙ্গে ফস্টিনস্টি করবে। দেখে বোঝা যাবে না। একটু বেসামাল আদর করতে গেলে তো মরলে। কখন যে গোপনে তোমার প্রাণ নিয়ে নেবে বোঝা যাবে না।

–আমাদের প্লান্টে সবাই ওদের এড়িয়ে চলে। বলে, যাদের চলন-বলন কাজকম্মো কিছুই বোঝা যায় না তাদের থেকে দূরে দূরে সাবধানে থাকা ভালো। আমাদের এখানে এএমসি দেওয়া আছে। সমস্যা হলে কন্ট্রাক্টর এসে মেনটেনেন্স করে দিয়ে যায়।
–অদৃশ্য বিদ্যুৎকে সবাই ভয় পায়। শুনছি একমাত্র ওই ক্ষ্যাপা বিজনই নাকি ভয় পেত না।

বয়লারদুটো ঘটনাকে খুব বেশি পাত্তা না দিয়ে একমনে স্টিম তৈরি করে যেতে থাকে।

সবার মুখে মুখে বিজনসাহেবের অ্যাক্সিডেন্টের খবরের সঙ্গে সঙ্গে আইসোলেটরের খবরও ছড়িয়ে পড়ে।

টিপিএসের জেনারেটর আর টারবাইন গাঁটছড়া বেঁধে একমনে ঘুরে যাচ্ছিল। টিপিএসের জন্ম থেকেই তাদের একসঙ্গে পথ চলা। মাঝেমধ্যে খুচরো কিছু সমস্যা নিয়ে তাদের মধ্যে খিটিমিটি বাঁধেনি এমন নয়। রেগে গিয়ে দু-একবার একজন অন্যজনকে ট্রিপ করেও দিয়েছে। তবে সেটা খুব অল্প সময়ের জন্য, কিছু পরেই তারা একে অন্যের কাছে দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে। তারা গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘুরপাক খেতে খেতে গল্প করছিল। টারবাইন বলছিল— গোমড়া কেন? মন কেন খারাপ হল, কেন হল?

জেনারেটর মিটমিটিয়ে বলে— বিজনসাহেবের অ্যাক্সিডেন্ট হল। পিঠের ওপর আইসোলেটর পড়ল।
–এখন তিনি কেমন আছেন? ভালো আছেন? ভালো আছেন?
–জানি না ঠিক। জানি না ঠিক।
–কাউকে পাঠাও। কাউকে পাঠাও।
–কারেন্টদের তো পাঠিয়েছি। রাস্তা তো আর সহজ নয়। পথে পড়বে এগারো কেভি-র ট্রান্সফর্মার। সেখান থেকে এ-জোন, বি-জোন, সাবস্টেশন। হসপিটালের থ্রি-ফেজ হয়ে এমার্জেন্সি ওয়ার্ড। ওই তো এল। বলো তোমরা খবর পেলে?

তিনটে ফেজের কারেন্ট একসঙ্গে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল— মাথাতে ইন্টার্নাল হেমারেজ হয়েছে। তাছাড়া কলার বোন ভেঙেছে। এখন জ্ঞান নেই। গভীর কোমা স্টেজে আছে।

শুনে জেনারেটর বিমর্ষ হয়ে গ্রিড থেকে নিজেকে প্রায় আলাদা করে নিচ্ছিল। টারবাইন চেঁচিয়ে উঠল— কী করছ? এখনই হয়তো বিজনসাহেবের হার্ট মনিটরিং দরকার। তুমি গ্রিড থেকে নিজেকে আলাদা করে নিলে তো হসপিটালে লোডশেডিং হয়ে যাবে।

জেনারেটর নিজেকে সামলে নেয়।

 

সুইচইয়ার্ডের চারদিকে এমন জঙ্গল হয়ে আছে, সাপ আর পাগল শেয়ালের ভয়ে তারা এখানে আসতে চায় না। ওপরওয়ালাদের অর্ডার। গরমে নাকি মেশিনপত্রগুলো প্রায়ই বিগড়ে যাচ্ছে। তাই ইলেকট্রিক কন্ট্রোল রুমের ঠান্ডা আরাম ছেড়ে রুটিন চেকিং-এর জন্য ভবেশ আর ইসমাইল ভেতরে ঢুকে থমকে দাঁড়ায়। আকাশে আর চাঁদ নেই। গ্রীষ্মের গুমোটে তারাগুলো কাঁপছে। সুইচইয়ার্ড জুড়ে চাপা গোঁ গোঁ শব্দ। কোনও যন্ত্রের কাছাকাছি এগোলেই সেটা বেশ জোরে গরর গরর গরর শব্দে পরিণত হচ্ছে। দুজন দুজনের দিকে তাকায়। বিজনসাহেবের কি কিছু হয়ে গেল? তেমন কিছু হলে আজকে…? এই রাতে…? অন্ধকারে…?

মাঝরাতে প্ল্যান্টে নানারকম অস্বাভাবিক জিনিস দেখা যায়। ভবেশ বলে— ইসমাইলদা তোমার মনে আছে, অফিসের সেই মোটা করে মহিলার কথা? বছর দুয়েক হয়ে গেল, না?

মহিলা পাওয়ার প্ল্যান্টের ছাদ থেকে কোনও কারণে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। নীচে রাস্তার ওপর সপ্তাহ খানেক ধরে থাকা অদৃশ্য রক্তের আবছা ছবিটা তাদের সামনে ভেসে ওঠে। ইসমাইল চমকে পিছনে তাকিয়ে ধমকে ওঠে— তুই একটু চুপ করবি? ইনশাল্লা, তা নইলে তোর মাথাটা ফাটিয়ে দেব!

একটা হিলহিলে ঠান্ডা হাওয়া তাদের মধ্যে দিয়ে বয়ে যায়। ভবেশ ইসমাইলের গায়ের কাছে সরে আসে। নিঃশব্দে কিছু উড়ে তাদের সামনে গিয়ে বসে। বাতাস না কাঁপিয়ে তাদের শরীর দুটো কেঁপে ওঠে। দুজনে গায়ে গা লাগিয়ে দেখল। একটা পেঁচা। কোনও কারণ ছাড়া পেঁচাটা যেন তাদের ভয় দেখাবার জন্যই কর্কশ স্বরে ডেকে ওঠে।

ঘাসের জঙ্গলের মধ্যে হঠাৎ কে যেন চলে গেল। ইসমাইল বলে— চল ফিরে যাই। আজকে আসা ঠিক হয়নি। এদিক ওদিক ঘুরে গিয়ে বলব সব ঠিক আছে। এখন আকাশের দিকে টর্চ জ্বালা। চোর হলে জেনে যাবে আমরা এখন চেকিংয়ে বেরিয়েছি।

টর্চটা বারকয় জ্বালানো নেভানোর মধ্যে হঠাৎই হাইটেনশন তার ওপর কাকে যেন দোল খেতে দেখা যায়। চোখ পিটপিট করে হাত নেড়ে তাদের ডাকছে। দপ করে ঠিক সেইসময় একটা হ্যালোজেন লাইট নিভে যায়। ভবেশ গোঁ গোঁ করে জ্ঞান হারায়। ইসমাইল ভয়ে জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করে ভাঙা কংক্রিটের রাস্তায় ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ে।

ব্রেকার আইসোলেটরকে ধমক লাগায়— এরকম ভয় দেখিয়ে ঠিক করিসনি।

আইসোলেটর বলে— বেশ করেছি। আমার বোনকে লাথি মারার সময়ে মনে ছিল না! মানুষগুলো আমাদের ওদের মতো ভেবেছে, নিজের বোনের ওপর অত্যাচার চুপচাপ মেনে নেওয়ার জন্য আমার যন্ত্রজন্ম হয়নি।

কারেন্টরা পরবর্তী অ্যাকশনের জন্য লাফালাফি করতে থাকে। সাহস করে কেউ জেনারেটরকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে না। অনেক সময় ধরে চুপচাপ থাকার পর জেনারেটর বলে— ডাক্তারবাবুরা কী বলল কিছু শুনেছিস কি?

–ডাক্তারবাবুরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে। কেউ সাহেবকে দেখছে না। একদল বলছে আইওডবলু পেশেন্ট দেখা রিস্কি। এমডি, জিএম সবাই দফায় দফায় ফোন করে মাথা খারাপ করে দেবে। ওনাকে সরকারি হসপিটালে পাঠিয়ে দেওয়াই ভালো। আর এক দল বলছে ইনজিওর্ড অন ওয়ার্ক পেশেন্ট বলেই আরও বেশি করে তা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। মাঝখানে সাহেব যেমন ছিলেন তেমনি পড়ে আছেন। ওঁকে নিয়ে কারও কোনও মাথাব্যথা আছে বলে মনে হল না।

জেনারেটর চিন্তামগ্ন হয়। বিজনসাহেব তাদের যেমন সন্তানস্নেহে দেখেন, আর কেউ তেমনি দেখে না। সাহেবের শরীর-স্বাস্থ্য, স্যারের মেয়ে সিমির বেড়ে ওঠা সবকিছুর দেখভাল করা তাদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। সাহেবের যদি খারাপ কিছু হয়ে যায় বর্তমান কোম্পানি আইনে ম্যাডাম ডেথ কেসে চাকরি পাবেন না। বাঁ হাতের ইনকাম সাহেবের নেই, ওঁর পরিবার অসহায়ভাবে পিষে যাবে।

জেনারেটরটা হঠাৎই ভীষণ রেগে যায়। এভাবে চলতে পারে না। এই ব্যবস্থার একটা বিহিত করার দায় শুধুমাত্র তাদের। সে বিয়ারিং-এর আরাম ছেড়ে উঠে সুইচইয়ার্ডের দিকে যেতে চায়। কাপলিং-এ মোচড় খেয়ে টারবাইন লাফিয়ে ওঠে— তুমি কী করছ! আমি যে ভেঙে পড়ে যাব। ভেবেচিন্তে কাজ করো। তুমি তাড়াতাড়ি করলেই কি সাহেবের অবস্থা ভালো হয়ে যাবে? সবাইকে নিয়ে একটা মিটিং ডাকো। সেখানে যা ঠিক হয় মেনে চলা যাবে।

 

ঘন্টাখানেক হয়ে গেছে। ইসমাইলরা ফিরছে না দেখে কন্ট্রোল অ্যাসিস্টেন্ট উপিন্দর মাইকে পেজিং করে। কেউ ধরে না। সে শিফট ম্যানেজারকে রিপোর্ট করে। শিফট ম্যানেজার সিকিউরিটির লোক নিয়ে সুইচইয়ার্ড থেকে দুজনকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করেন। চোখ মুখে জল দেওয়ার পর তারা দুজনেই ভয়ে চারদিক দেখে নিয়ে বলে— ভূত!

তাদের কিছুটা শান্ত রাখা যাচ্ছে না দেখে বাধ্য হয়ে হাসপাতালে পাঠাতে হয়। তাছাড়া ভবেশের মাথায় আর ইসমাইলের হাতে চোট লেগেছে।

 

অন ডিউটি মিটিং প্ল্যান্টে এই প্রথম। সবার মধ্যে তুমুল উত্তেজনা। তিনটে ফেজের কারেন্টের আজ তুমুল ব্যস্ততা। প্রত্যেকের বক্তব্য অন্য সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তাদের ওপর। এর মাঝে হসপিটাল থেকে লেটেস্ট মেডিকেল বুলেটিন নিয়ে আসা। কমবয়সি যন্ত্রপাতিগুলো জঙ্গি মনোভাব দেখায়। তারা তাদের ওপর অসম্মানে ভীষণ রেগে আছে।

তাদের তিন দফা দাবি।

এক) বিজনসাহেবের উপযুক্ত চিকিৎসার বন্দোবস্ত করতে হবে।
দুই) বিজনসাহেব তাদের যেমন সম্মান করে কথা বলেন তেমনিভাবে মানুষের সমান সম্মান দিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
তিন) ভালো জায়গাতে তাদের পোস্টিং দিতে হবে। দাবি মানা না হলে তারা প্ল্যান্ট ভেঙে ফেলবে।

বিজ্ঞ জেনারেটর আর অন্য সিনিয়র যন্ত্রপাতি একটু রক্ষণশীল। তাদের চাপে সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হল যে সাহেবের ব্যাপারে এমডি আর জিএমকে তাদের সঙ্গে এখনই আলোচনায় বসতে হবে। তা না হওয়া পর্যন্ত তারা কাউকে সুইচইয়ার্ডে ঢুকতে দেবে না। তবে কেউ যেন মানুষদের কোনও বড়সড় ক্ষতি না করে, জেনারেটর সতর্ক করে দেয়।

চারদিকে যুদ্ধ যুদ্ধ পরিবেশ তৈরি হয়।

পড়ে যাওয়া আইসোলেটরের জায়গায় অন্য একটা লাগাতে বিজনের এইচওডি রায়সাহেব প্ল্যান্টে আসে। মাঝরাতে কন্ট্রাক্টরের ছেলেদের জোগাড় করাটাই একটা সমস্যা। রাত তিনটে বেজে গেছে। বাংলা মদ খেয়ে ছেলেগুলো অঘোরে ঘুমোচ্ছে। অত উঁচুতে উঠে কাজ, ওদের ছাড়া চলবে না। জোর করে বস্তির ঘর থেকে টেনে তুলতেই অনেক সময় চলে গেছে।

এদিকে ইলেকট্রিক কন্ট্রোলরুম কিছুতে হাইভোল্টেজ বাসটার শাটডাউন দিতে পারছে না। উপিন্দর বলে— দেখিয়ে জি, এয়সা হি হররোজ হাম প্রবলেম ফেস করতে হে। আপকা ডিপার্টমেন্ট মে কমপ্লেন করনে সে ও বতা দেতা কি ম্যানুয়াল অপারেশন কর লিজিয়ে। আপ বতাইয়ে ইতনি রাত মে কোন সুইচইয়ার্ড জায়েগা? এক তো হাইভোল্টেজ লাইন মে কোই ভি অ্যাক্সিডেন্ট হো সাকতা। আভি তো মেরা দো আদমি উধার কেয়া দেখা পতা নেহি। দোনো কো চোট আয়া, ফির বেহোঁশ হো গিয়া থা।

রায় রেগে যায়। এই বাঞ্চোত অপারেশনের লোকগুলো ঠান্ডা ঘর থেকে একটুও নড়বে না। খাবার সাজিয়ে ওদের মুখের সামনে ধরতে হবে। কোনও দিন কাজ না করে হঠাৎ একদিন গেলে অ্যাক্সিডেন্ট হবে না তো কি? রায় তার লোকজন নিয়ে সুইচইয়ার্ডে যায়। হাতে করে ব্রেকার বন্ধ করতে গেলেও সেটা বন্ধ হয় না। ইয়ার্ড জুড়ে চাপা রাগের আগুন। ফিসফাস, গুঞ্জন। রায় নিজে একবার লিভারটা টেনে দেখে। কে যেন ধমক দেয়— এই শালা, গায়ে হাত দিবি না!

রায় চমকে হাত সরিয়ে নেয়— কে বলল কথাটা?

কন্ট্রাক্টরের ছেলেগুলো মুখ চাওয়াচাওয়ি করে— ব্রেকারটা থেকে আওয়াজ এল মনে হচ্ছে রায়সাহেব।

–ইয়ার্কি মারার জায়গা পাচ্ছ না? বেকারের কি হঠাৎ করে মুখ গজিয়েছে?

রায় খিস্তি মেরে আবার হাত দিতে গেলে ব্রেকার থেকে পোর্সেলিনের একটা টুকরো ভেঙে ছিটকে এসে তার হাতে লাগে। কারা যেন চিৎকার করে ওঠে— ভাগ শালা। সুইচইয়ার্ডে কোনও যন্ত্রের গায়ে হাত দিবি না।

সবার চেঁচামেচিতে কিছুই ঠিকঠাক বোঝা যায় না। দু-চারটে বাংলা ছাড়া চিনা ভাষার মতো চ্যাঁ-চোঁ-চিং-চুং শোনা যায়।

কন্ট্রাক্টরের ছেলেগুলো ছুটতে শুরু করে। রায় ভোররাতে ঠান্ডাতেও ঘামতে ঘামতে ইয়ার্ড থেকে বেরিয়ে আসে।

জিএম রায়কে ফোন করেন— সুইচইয়ার্ডের একটা ছোট আইসোলেটর লাগাতে আপনারা এত দেরি করছেন কেন? উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি। আর এক মাসের মধ্যে বিধানসভার ভোট। এ সময়ে শুধু একটা ছোট যন্ত্র লাগানোর জন্য পঞ্চাশ মেগাওয়াট লোড কম হলে আমাকে কত জায়গায় কৈফিয়ত দিতে হবে জানেন? একা বিজন নেই বলে কি আপনাদের ডিপার্টমেন্টে উঠে গেল নাকি? বিজন এত ভালো কাজ করত বলে তো কখনও শুনিনি। আমি কোনও কথা শুনতে চাই না। আজ সকালের মধ্যে যেন ট্রান্সফর্মারের কাজটা হয়ে যায়।

–আমরা কিছু করতে পারছি না স্যার। সুইচইয়ার্ডে ঢুকতে গেলেই সার্কিট ব্রেকারগুলো তেড়ে আসছে। বলছে অ্যাক্সিডেন্টের পর বিজনের চিকিৎসার ভালো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? বাইরে থেকে কোনও বড় ডাক্তার এনে চিকিৎসা করানো হচ্ছে না কেন, এমার্জেন্সি বেসিসে ভেলোর থেকে ভালো যন্ত্রপাতি ধার করে আনা হচ্ছে না কেন? যতক্ষণ না তা করা হবে ওরা কাউকে সুইচইয়ার্ডে ঢুকতে দেবে না বলছে।
–এই গরমে আপনার আর আপনার যন্ত্রপাতিগুলোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কুলিং ওয়াটারে একবার ভালো করে স্নান করে নিন।
–না স্যার কুলিং ওয়াটারেও কোনও লাভ হচ্ছে না। জেনারেটর রাগে আগুন হয়ে গেছে। ওর শরীরে পেঁচানো তারের শিরা-উপশিরা দপ দপ করছে। জলপটি দিয়ে কোনও লাভ হচ্ছে না। ও-ই স্যার নেতৃত্ব দিচ্ছে।
–পেছনে কোন ইউনিয়নের মদত আছে বোঝা যাচ্ছে কি?
–না স্যার কোনও ইউনিয়ন আছে বলে মনে হচ্ছে না। বিজনই ওদের আদর দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলেছে। ইউনিয়ন থাকলে তো অনেক আগেই আমি ম্যানেজ করতে পারতাম। এমনকি ওরা নিজেরা অ্যাক্সিডেন্ট করেছে বলে ওদের মধ্যে ভাঙন ধরাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওরা এক জোট।
–পুজো আচ্চা করে? কোন ধর্মের মেশিন কিছু বোঝা যাচ্ছে কি?
–চালু করার সময় তো আমরা নারকেল ভেঙে সিঁদুর পরিয়ে হিন্দু ধর্মে দীক্ষা দিয়েছিলাম। আপনিও একটা নারকেল ভেঙেছিলেন। সেই মতো ওরা সবাই হিন্দু। কিন্তু এখন কেউ কোনও ধর্ম মানতে চাইছে না স্যার।
–ধর্ম না মানুক, আমেরিকা, জার্মান, চিন, কে কোন দেশ থেকে এসেছে সেই অনুযায়ী ওদের মধ্যে বিভেদ বাঁধানো যাচ্ছে না?
–আলাদা দেশ হলেও সব দেশের কোম্পানিতে অন্য দেশের শেয়ার আছে। এদের আলাদাভাবে দেশ অনুযায়ী ভাগ করা যাচ্ছে না। মেশিনগুলোকে স্যার বিশ্বনাগরিক বলা যায়। তবে তাদের শিপমেন্ট চিন থেকে হয়েছে তারাই বেশি ঝামেলা করছে।
–এই একটা কাজের মত খবর দিলেন। এবার ওদের আলোচনার টেবিলে বসান।
–ওদের কথা স্যার একটুও বোঝা যাচ্ছে না। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে ওরা কী বলছে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। চিনা ভাষা ছাড়া ওরা কিছু জানে না।
–আপনার মতো একজন ম্যানেজারের কাছে এটা কোনও সমস্যা হতে পারে না। আজকেই আপনি রাঢ়ের জঙ্গলে চলে যান। নকশালপন্থীরা এখন গ্রামেগঞ্জেই বেশি সক্রিয়। ওদের খুঁজে বের করুন। নকশালরাই তো বলেছিল চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান। ওদের মধ্যে কেউ চিনা ভাষা জানলে তাকে বুঝিয়েসুঝিয়ে নিয়ে আসুন।
–ওরা এখন একথা আর বলছে না স্যার। বরং এখন বড় বড় শিল্পপতিরা এই মতের সমর্থক।
–শিল্পপতিরা সব নকশাল হয়ে যাচ্ছে বলছেন?
–না স্যার আপনি কী যে বলেন! শিল্পপতিরা এখন শিল্পোন্নত চিনের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে এগোতে চাইছে। শিল্প ছেড়ে চিনের সঙ্গে এক্সপোর্ট ইমপোর্টের ব্যবসা করলে লাভ বেশি। ইন্ডাস্ট্রি বানিয়ে খরচ তোলা দীর্ঘকালীন পদ্ধতি। কেউ আর অত ঝঞ্ঝাটের মধ্যে যেতে চাইছে না। বরং ব্যবসা করা সুবিধাজনক।
–অর্থাৎ আপনার মতে নকশালরা সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে আছে বলছেন? চিনের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার কথা ওরাই প্রথম বলেছিল। তাহলে আন্দোয়ানে ওরা আমাদের ট্রান্সফর্মার উড়িয়ে দিয়েছে কেন?
–স্টোরের ট্রান্সফর্মারগুলো এখন সুযোগ পেয়ে এই কথাই বলছে স্যার। বলছে আন্দোয়ানের মতো অজ জায়গাতে ওদের পাঠানো যাবে না। সবাই ইস্টার্ন বাইপাসের ধারে নতুন তৈরি হওয়া পাঁচতারা হোটেলগুলোতে যেতে চায়। ওখানে সুযোগ-সুবিধা যেমন বেশি তেমনি সবসময় লাইমলাইটে থাকা যায়।
–সাবধান, খুব সাবধান। নতুন কোনও ঝামেলাতে জড়িয়ে পড়বেন না। সবটা এখন ঝুলিয়ে রাখুন। আমি এমডি সাহেবকে রিপোর্ট করি। ওনার সঙ্গে আলোচনা করে আমাদের এগোতে হবে। দরকার হলে বোর্ডমিটিঙে সব পাশ করিয়ে নিতে হবে। ঠিক আছে?

রায় তার টেকনিশিয়ানদের ঘরে অপেক্ষা করতে বলে।

 

চরম প্রতিরোধে সুইচইয়ার্ড রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। প্রখর গ্রীষ্মে ইয়ার্ডের মধ্যে পড়ে থাকা ব্রেকার, আইসোলেটর, ছোট-বড় ট্রান্সফর্মার সবাই ঘামতে থাকে। তাদের জং ধরা, মরচে পড়া গা, কাদামাটি বালির বহুরূপতার আড়ালে রুক্ষ চেহারা, দীর্ঘদিন অবজ্ঞা, অবহেলা, পায়ের ঠোক্কর খেয়ে পড়ে থাকা রাগ ক্রমশ গরম হতে থাকে। চলন্ত মেশিনগুলোর নার্ভের মতো প্যাঁচানো তারের টেম্পারেচার বাড়তে থাকে, টারবাইনের পায়ের তলার বিয়ারিং আগুনগরম হয়ে ওঠে। রাগে যন্ত্রগুলোর শরীর থেকে ধোঁয়া বের হতে থাকে। এর মধ্যে কারেন্টরা খবর নিয়ে আসে, বিজনকে মহকুমা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকে জিটি রোড হয়ে এখন অ্যাম্বুলেন্স ছুটছে। কোথায় যাচ্ছে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। জিটি রোড ধরে খুব কম জায়গাতে পোল লাগানো আছে। মাঝে মাঝে হাইটেনশন ট্রান্সমিশন টাওয়ার থেকে যেটুকু খবর পাওয়া যাচ্ছে।

সূর্য অস্ত গেছে। সুইচইয়ার্ডের মাথার ওপর আবছা নীল হ্যালোজেন চাঁদ। চাঁদকে তারা বিজনসাহেবের খবর জিজ্ঞেস করে। চাঁদ কাউকে না রাগিয়ে মুচকি হেসে চুপ করে থাকে। কোনও জবাব না পেয়ে তারা সবাই একমত হয় যে বিজনের মৃত্যু হয়েছে। ঝামেলা হওয়ার ভয়ে তাদের কাছ থেকে মৃতদেহ সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। মানুষগুলো তাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেই চলেছে। এমএএমসি, বিওজিএলের মতো যারা দেশের গর্ব ছিল, অল্প অসুস্থতায় তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সামান্য অ্যান্টিবায়োটিকটুকুও দেওয়া হয়নি। এমনকি মৃত্যুর পরে সঠিক সৎকার পর্যন্ত করা হয়নি। যন্ত্রপাতিগুলো এখানে সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মরে পড়ে আছে। কারেন্টরা খবর আনে— মানুষগুলো ওখানে প্রস্তর যুগের সভ্যতা আনতে চাইছে। ভেতর থেকে আমরা কোনও খবর আনতে পারছি না। কারেন্টদের চলাচলের রাস্তায় পরিখা খনন করা হয়েছে।

আকাশের বিদ্যুৎ লাইটনিং অ্যারেস্টার ঝাঁপিয়ে পড়ে বলে— ওখানে এখন যন্ত্রপাতির মরা হাড়ের ব্যবসা রমরম করে চলছে।

–মানুষগুলো সব চামার হয়ে যাচ্ছে। দধীচির পবিত্র হাড় থেকে আমাদের জন্ম এ কথা ওরা ভুলে যায়।
–ওরা যন্ত্রকে মর্যাদা দিচ্ছে না। প্রয়োজন ফুরিয়ে যেতে ওদের কাছে আমরা সামান্য লোহা।

উত্তেজনায় সবাই টগবগ করতে থাকে। এর বিহিত হওয়া দরকার। টারবাইন ঠান্ডা মাথায় তার স্টিম ঠান্ডা করে যন্ত্রদের প্রতি দুর্ব্যবহারের খবর বয়লারে পাঠিয়ে দেয়। সেই জল গরম হয়ে স্টিম হয়ে বয়লারের রাগের খবর নিয়ে আসে। বয়লার অভিজ্ঞতার আগুনে পুড়ে যাওয়া শক্তিশালী ধোঁয়া, ছাই পাঠায় আশেপাশের সব কারখানায়। জেনারেটর ফিল্ডব্রেকার হঠাৎ করে খুলে যায়। মানুষগুলো যখন ট্রিপ করার কারণ বের করতে ব্যস্ত তখন টারবাইন রাগে ভয়ানক জোরে একবার ঘুরে বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। বয়লারের সেফটি ভালভ রণভেরী বাজিয়ে দেয়। আশেপাশের বিভিন্ন কারখানা থেকেও নানারকম আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে। তাদের সবার অস্তিত্বের সঙ্কট।

রায়কে ছোট্ট একটা কেবল নিঃশব্দে প্যাঁচাতে থাকে।

জিএমের ঘরের ফ্লুরোসেন্ট আলো থেকে আগুন বের হতে থাকে। ধোঁয়াতে জিএম বাঁচাও বাঁচাও বলে চেঁচিয়ে ওঠেন।

এমডির হাত থেকে সুইচটা কিছুতে খুলতে চায় না। তিনি চিৎকার করেন, কিন্তু গলা থেকে স্বর বের হয় না।

স্টিম, বিদ্যুৎ, স্টিল, কেমিক্যাল সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষদের ওপর।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...