সলিল বিশ্বাস: জ্যান্ত মানুষ, পূর্ণ মানুষ

আশীষ লাহিড়ী

 



বিজ্ঞানের দর্শন ও ইতিহাসের গবেষক, প্রবন্ধকার, অনুবাদক

 

 

 

 

 

সলিল বিশ্বাস (১ আগস্ট ১৯৪৭-২১ মে ২০২১) এমন একজন মানুষ যাঁর কর্মক্ষেত্র বহুদিকে বিস্তৃত ছিল। তার অল্প দু একটার কথা এখানে বলা যেতে পারে।

 

অন্য শিক্ষা

তাঁর সবচেয়ে বড় কাজের জায়গা, আমার মনে হয়, শিক্ষাক্ষেত্র। শিক্ষা মানে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়। তিনি নিজে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ছাত্র ছিলেন, কলেজের অধ্যাপক ছিলেন, সাউথ সিটি কলেজের প্রিন্সিপাল হয়েছিলেন, কিন্তু এগুলো তাঁর আসল পরিচয় নয়। তিনি ছাত্রকাল থেকেই নকশালবাড়ি আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এটা বুঝেছিলেন যে যাঁদের আমরা সাবল্টার্ন বলি, অর্থাৎ যাঁরা সমাজের তথাকথিত ‘নিম্নস্তরের’ মানুষ, যাঁদের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো অন্ধকার কোনওটাই পৌঁছয় না, তাঁদের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া না গেলে কোনও দিনই কোনও আন্দোলন সফল হবে না। সমাজবদলের জন্য আমাদের সব আন্দোলনই ব্যর্থ হয়েছে তার একটা কারণ, যাঁরা আসল লড়াইটা লড়েন সেই খেটেখাওয়া মানুষদের কাছে আমরা ঠিক শিক্ষাটা পৌঁছে দিতে পারিনি। এই সত্যিটা সলিল বিশ্বাস খুব অল্প বয়স থেকেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি যখন অধ্যাপনা করছেন, তখন অধ্যাপক সমিতির মধ্যেই নানা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে সরকার-তোষিণী অধ্যাপক-রাজনীতি যে একটা বিচিত্র রূপ নিয়েছিল, যার ফল ভালো হয়নি (তারপর অবশ্য অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে), তার বিরুদ্ধে একেবারে প্রথম থেকে যাঁরা প্রতিবাদ করে আসছেন, সলিল বিশ্বাস ছিলেন তাঁদের একজন। অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকেও একটা সুস্থ, মানবিক ও ন্যায়সঙ্গত স্তরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি নিরন্তর লড়াই করেছিলেন; কিন্তু আরও বড় লড়াই করেছিলেন, যাঁরা এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আওতা থেকে বহু বহু দূরে, যাঁদের দুবেলা ঠিক করে খাবার জোটে না, এরকম মানুষদের কাছে কীকরে শিক্ষাকে নিয়ে যাওয়া যায়, সেই উদ্দেশ্যে।

বলা বাহুল্য, এই শিক্ষাকে নিয়ে যাওয়ার পদ্ধতিটাও হবে আলাদা। এটা তো সাধারণ স্কুল কলেজের ক্লাসের শিক্ষা দিয়ে হবে না। এই “অন্য” শিক্ষার পদ্ধতির ব্যাপারটা তাঁর মাথায় ঢোকে কয়েকটি বিখ্যাত বই থেকে, যে বইগুলি অনুবাদের জন্য তিনি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছেন: তার একটা হচ্ছে ‘আপনাকে বলছি স্যার, বারবিয়ানা স্কুল থেকে’। এই বিকল্প শিক্ষার ভিত্তি ছিল পাওলো ফ্রেইরি-র শিক্ষাতত্ত্ব, যেখানে বলা হচ্ছে পরীক্ষায় যে ছাত্রটি অকৃতকার্য হচ্ছে, সেই অকৃতকার্যতার আসল ব্যর্থতার দায় তার শিক্ষকের। শিক্ষা মোটেই একমুখী একটা প্রক্রিয়া নয়, দিবে আর নিবে-র সূত্র এখানেও খাটে। এই শ্রেণিবিভক্ত সমাজে খুব স্বাভাবিকভাবেই ‘প্রিভিলেজ’গুলো তো নানারকম হয়। যারা একটু ওপরের স্তর থেকে আসছে, তারা নিজেদের অজান্তেই কতকগুলো প্রিভিলেজ ভোগ করে, ফলে পরীক্ষায় তারা বেশি নম্বর পায়, নানা ধরনের আইকিউ টেস্টে তারা ভালো স্কোর করে, কিন্তু এগুলো মোটেই তাদের উচ্চমেধার অকাট্য পরিচয় নয়। কারণ যারা ওই পরীক্ষাগুলোতে কম নম্বর পাচ্ছে বা আইকিউতে কম স্কোর করছে, তারা কিন্তু তাদের পরিবেশের পশ্চাদ্‌পদতার শিকার, যার দ্বারা তাদের শিক্ষা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এগুলো তাদের নিম্নমেধার পরিচয় নয়। আমরা যদি ঠিক পদ্ধতিতে, শিক্ষার্থীর আর্থ-সামাজিক স্তরটির কথা মাথায় রেখে, প্রয়োজনীয় জিনিসগুলি খেটেখাওয়া মানুষদের কাছে পৌঁছে দিই, একমাত্র তাহলেই শিক্ষা একটা ব্যাপক সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। আবার পিছিয়ে-থাকার কতকগুলো সুবিধাও আছে; বিশেষ করে কায়িক শ্রমকে শিক্ষার অঙ্গ করে নেওয়ার ব্যাপারে। সেটাকে যদি সাফল্যের মানদণ্ড ধরা যায়, তাহলে ওই “প্রিভিলেজ্‌ড” শ্রেণির ছেলেমেয়েরা গরিব খেটে-খাওয়া মানুষের ধারেকাছেও আসতে পারবে না।

সলিল বিশ্বাস এই নিয়ে প্রায় সারা জীবন লড়াই করেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি যে আজ থেকে চল্লিশ বছরেরও বেশি আগে, তখনকার গড়িয়ায়, একটা জীর্ণ বটগাছের তলায় তাঁরা কয়েকজন মিলে স্থানীয় বস্তির কয়েকটি ছেলেমেয়েকে এইভাবে শিক্ষা দেওয়া যায় কিনা, তা নিয়ে চেষ্টা করেছিলেন। সলিলের পরম সুহৃদ পদার্থবিদ দীপাঞ্জন রায়চৌধুরী এ কাজে তাঁর সঙ্গী ছিলেন। তাঁরা খানিক দূর এগিয়েও ছিলেন, তারপর স্থানীয় মস্তানরা এসে হামলা চালায়, তাঁদের ওই প্রথম প্রয়াসটি ব্যর্থ হয়। (সে-গল্পটাও সলিল করেছিল হাসতে হাসতে, যেন সেটার মধ্যে কোনও ঝুঁকি ছিল না, যেন সেটা একটা মজার ব্যাপার!) তাঁরা সারা জীবন বিভিন্ন জায়গায় এই ধরনের প্রয়াসে লিপ্ত থেকেছেন। এই কয়েক বছর আগেও অসুস্থ শরীর নিয়ে শ্রীরামপুরে শ্রমজীবী হাসপাতালের অনুরূপ একটি শিক্ষা উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। শ্রমজীবী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিচালিত এই স্কুলে নিম্নবর্গের ঘরের ছেলেমেয়েরা আসত, শিক্ষাগ্রহণ করত। সেখানে দাঁত মাজা, ক্লাসঘর পরিষ্কার রাখা, নিজে পরিচ্ছন্ন থাকা থেকে শুরু করে জলের রাসায়নিক বিশ্লেষণ কিংবা আপেক্ষিক গুরুত্বর তত্ত্ব বোঝা, সবটাই ছিল শিক্ষার অঙ্গ। সেইসব ছাত্রছাত্রীদের কেউ কেউ বড় হয়ে সলিলের সঙ্গে দেখা করতে আসত। সে-দৃশ্য চোখে জল আনত। দীপাঞ্জন রায়চৌধুরী, শুভাশিস মুখোপাধ্যায়— এঁরাও দীর্ঘদিন ধরে এই স্কুলের পেছনে সময় ব্যয় করেছেন, পরিশ্রম করেছেন। প্রসঙ্গত, দীপাঞ্জন রায়চৌধুরীও কিছুদিন আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। সলিল অত্যন্ত বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিল সেসময়, কিন্তু ভেঙে পড়েনি। অসুস্থ শরীর নিয়ে সলিল প্রতি সপ্তাহে তিনদিন করে শ্রীরামপুর যেত। ওখানকার ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সলিলের মেলামেশাটাও একটা দেখবার মতো জিনিস ছিল।

কদিন আগেই বই-চিত্র কালাচারাল সোসাইটির তরফ থেকে আমরা সলিলের স্মরণে একটা অনলাইন অনুষ্ঠান করেছিলাম। সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে শ্রীরামপুরের ওই হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত বাসুদেব ঘটক বলছিলেন, “আমি তো দিনের পর দিন সলিলদার সঙ্গে শ্রীরামপুর যেতাম, আবার একই সঙ্গে ফিরতাম। সলিলদার সঙ্গে তাত্ত্বিক কথাবার্তা, রসিকতা, খাওয়াদাওয়া, সহজ মানবিক কথাবার্তা সবই যেমন হত, অন্যদিকে সলিলদা যে কীভাবে ওইসব ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মিশে যেতে পারতেন, তা না দেখলে বিশ্বাসই হত না। অথচ সলিলদা একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ, সামাজিক প্রথানুযায়ী তাঁর তো সমাজের উচ্চস্তরেই ঘোরাফেরা করার কথা, তা তিনি করতেনও, তিনি বিভিন্ন স্তরেই স্বচ্ছন্দ ছিলেন; কিন্তু ওই ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গে যখন মিশতেন, তাঁর একটা অন্য চেহারা বেরিয়ে আসত।” সলিল বিশ্বাসের নানা দিকে নানা কর্মকাণ্ড, কিন্তু সমস্ত কর্মকাণ্ডের ওপরে যে কাজটির জন্য সলিল আমাদের ও অন্য অনেকের কাছে পরেও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, সেটি হল তাঁর শিক্ষাবিষয়ক প্রয়াস। কারণ সেই প্রয়াস শুধু বই লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, শিক্ষাচিন্তাকে তিনি কার্যক্ষেত্রে হাতেকলমে প্রয়োগ করার চেষ্টা আজীবন করে গেছেন।

 

বন্ধু

এটা গেল একটা দিক। মানুষ হিসেবেও সলিল অন্য অনেকের চেয়ে খুব আলাদা ছিল। “ছিলেন” না বলে “ছিল” এই জন্য বলছি যে সলিল আমার দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের বন্ধু। উনিশশো বাহাত্তর সালের কথা। তখন আমরা ‘প্রস্তুতি’ নামে একটি পত্রিকা বার করছি। ‘প্রস্তুতিপর্ব’ নামটা তখনও হয়নি। তখন দীপেন্দু চক্রবর্তী মশাই আমার আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন সলিলের সঙ্গে। ‘প্রস্তুতি’, ‘প্রস্তুতিপর্ব’ ও পরবর্তীকালে ‘অন্বেষা’ নামক বিজ্ঞান পত্রিকা ও তারপরেও নানা কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে এই সুদীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে সলিলের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব অটুট ছিল। বন্ধুত্ব বাহ্যত ছিন্ন হল সলিলের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে। সলিল মানুষ হিসেবে অত্যন্ত সুভদ্র ছিল। সলিলের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কারও কথা-কাটাকাটি হয়েছে বা মনোমালিন্য হয়েছে এরকম আমি কখনও শুনিনি, দেখিওনি। সলিল সাধারণভাবে শান্ত, মৃদুভাষী, সবসময় বন্ধুদের সঙ্গে রসিকতা করে কথা বলত। কিন্তু একইসঙ্গে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানে ও মতপ্রকাশে একেবারে অবিচল। সে রাজনৈতিকভাবে যা বিশ্বাস করছে, যেটাকে ঠিক মনে করছে, সেটা শান্ত হয়ে পরিষ্কার ভাষায় ব্যক্ত করত। বরাবর। তাতে অন্য কে কী ভাবল, কে খুশি হবে, কে অখুশি হবে তা নিয়ে মোটেই পরোয়া করত না। নানা মতের, নানা ধরনের মানুষকে কাছে টেনে নেওয়ার ওর একটা আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল। যাদের সঙ্গে ওর রাজনৈতিকভাবে মতের মিল হচ্ছে না, কিন্তু মতের অমিলটা এতখানি নয় যাকে মাও সেতুংয়ের ভাষায় ‘বৈরিতামূলক দ্বন্দ্ব’ বলা চলে, যেখানে দ্বন্দ্বটা আলাপ-আলোচনার মধ্যে দিয়ে মিটিয়ে ফেলা সম্ভব, সেখানে সলিল অদ্ভুত নমনীয় হতে পারত। এমনকি মিটিয়ে নেওয়া যদি না-ও যায়, সলিল ব্যক্তিগতভাবে কারও সঙ্গে কোনও উগ্র আচরণ করেছে এমন কখনও শুনিনি। একইসঙ্গে সে কিন্তু নিজস্ব রাজনৈতিক কমিটমেন্টের জায়গায় জীবনের শেষদিন পর্যন্ত একচুলও আপস করেনি।

(বাঁদিক থেকে) সলিল বিশ্বাস, পুলক চন্দ, প্রবীর মুখার্জি, ও আশীষ লাহিড়ী। ছবিটি তুলেছেন শ্রীমতী ঋতা লাহিড়ী

নারীবাদী

সেদিন আমাদের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়, দীর্ঘদিনের সংগ্রামী কর্মী। তিনি সলিলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন। বললেন, “সলিলদার কাজের নানা দিক নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু এটা কেউই বললেন না যে সলিলদা এক বিশেষ অর্থে নারীবাদী ছিলেন।” আমরা অনেকেই নারীবাদের কথা বলি, নারীর সমান অধিকারের কথা বলি৷ আমরা কেউই নারীবিদ্বেষী নই। কিন্তু কৃষ্ণা বলছিলেন, “সলিলদাকে মেয়েদের যেকোনও প্রয়াসে পাশে পেয়েছি। আমরা নিশ্চিত ছিলাম, যে আর কাউকে যদি না-ও পাই, সলিলদা আমাদের পাশে আছেন। আমরা ‘খোঁজ’ নামে একটা পত্রিকা বের করেছিলাম, সলিলদা তাঁর সম্পাদকমণ্ডলীতে ছিলেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে এই সমাজে নারীদের সবসময় একটা বিশেষ চোখে দেখা উচিত, যেহেতু এই পুরুষশাসিত সমাজে তাঁরা স্বভাবতই কমবেশি শোষণের শিকার। এমনও হয়েছে যে আমাদের চেনাশোনার বৃত্তে কোনও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝামেলা হয়েছে, মিটমাট করার জন্য সলিলদার ডাক পড়েছে। সলিলদা সবসময় বলতেন আমাদের কিন্তু প্রাথমিকভাবে স্ত্রীর দিকটাই বেছে নিতে হবে, তারপর আমরা নিশ্চয়ই বিবেচনা করব— কে ঠিক কে ভুল। কিন্তু এই সমাজে নারীরা সাধারণভাবে নিপীড়িত সেটা আমাদের মনে রাখতেই হবে।”

 

পূর্ণাঙ্গ মানুষ

এই সমস্ত কিছু মিলিয়ে সলিল বিশ্বাস আমার দেখা একজন সম্পূর্ণ মানুষ। একজন কমপ্লিট ম্যান যদি বেছে নিতে হয়, আমি নির্দ্বিধায় সলিল বিশ্বাসকে বেছে নেব। কারণ জীবনের যতগুলো মানবিক দিক আছে সব ক্ষেত্রেই তার এক অসাধারণ ইতিবাচক গ্রহণশীলতা ছিল। রাজনীতি-সমাজনীতি সম্বন্ধে সচেতন থাকাটা, তার সংগ্রামের দিকটা, জীবনের মহা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলেও একমাত্র দিক তো নয়; জীবনের যে মধুর দিকগুলো আছে, জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলিকে উপভোগ করার জন্য, রসাস্বাদন করার জন্য একটা বিশেষ ক্ষমতা থাকা চাই, এগুলো থাকলে তবেই একজন মানুষ সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে উঠতে পারে। একবার শুধু কার্ল মার্কসের কথা ভাবুন। এই ক্ষমতা সলিলের মধ্যে শতকরা একশো ভাগ ছিল। পেইন্টিং, ফটোগ্রাফি, ফিল্ম, সঙ্গীত প্রায় সমস্ত দিকে সলিলের আগ্রহ এবং/অথবা ব্যুৎপত্তি ছিল। সাহিত্যের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, কারণ সাহিত্যই ছিল সলিলের বিষয়, সে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিল।

প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, শুধু বাংলা নয়, সলিল অসাধারণ ভালো ইংরেজি লিখত। এই কথাটা আমার নয়। এই কথাটা আমাকে বারবার বলতেন ইংরেজি সাহিত্যের বিখ্যাত স্কলার, আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় গৌরীপ্রসাদ ঘোষ মহাশয়, যিনি মাত্র এক-দেড় বছর আগে প্রয়াত হয়েছেন। তিনি এই কথাটা বারবার বলতেন যে অনেকেই ভালো ইংরেজি জানে, কিন্তু সলিলের ইংরেজিটা যেন একেবারে স্বতঃস্ফূর্ত। কখনও মনে হয় না যে ও একটা বিদেশি ভাষা শিখে তারপর লিখছে, এতই স্বচ্ছন্দে ও সহজভাবে সে ইংরেজি লিখত। ঠিক এই কারণে সলিলের বাংলা অনুবাদগুলোও এত প্রাঞ্জল ও সাবলীল হয়েছিল। অনুবাদ বলে মনেই হত না। টমাস মোরের ‘ইউটোপিয়া’ ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করার চেষ্টা সলিলের আগে আজ অবধি বোধহয় কেউই করেনি। আমি নিজে দেখেছি, ইউটোপিয়া-র সবকটা এডিশন জোগাড় করে কী অপরিসীম পরিশ্রম করে, এমনকি মূল ল্যাটিন শব্দগুলোর নির্ভুল অর্থ জেনে, যথাযথ ভাষ্যটা, বাগধারাটা ও তৈরি করছে। একইরকম পরিশ্রম করে ও টি এস এলিয়টের ‘মার্ডার ইন দ্য ক্যাথিড্রাল’ কাব্যনাটকটি বাংলা করেছিল। আমরা একসময় নিউ ইয়র্কের প্রসিদ্ধ মার্কসীয় তত্ত্বচর্চার কাগজ ‘মান্থলি রিভিউ’র নির্বাচিত লেখার অনুবাদ করে ‘বাংলা মান্থলি রিভিউ’ নামে ত্রৈমাসিক পত্রিকা বের করতাম, সলিল তার সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিল। এই পত্রিকার পাতায় সলিলের হাতে করা যে অনুবাদগুলো আছে তা এক কথায় অসামান্য৷

 

কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ

“পূর্ণাঙ্গ মানুষ” সলিলের কাজের আরেকটা দিক হল কম্পিউটার, যেটা সে খুব ভালো করে জানত। ভালো জানা মানে নিছক কি-বোর্ড চালানো নয়, কম্পিউটারের বিজ্ঞানটা সে বুঝত। সাউথ সিটি কলেজের যখন কম্পিউটারাইজেশন হয়, পুরো ব্যাপারটা হয়েছিল সলিলের নিজের তত্ত্বাবধানে। নিজের এক ছাত্রীকে দিয়ে কম্পিউটার সায়েন্সের ওপর বাংলায় বই লিখিয়েছিল। আমাদের মতো বহু ডিজিট্যাল-অন্‌পঢ় লোকের কম্পিউটারে বাংলা লেখার হাতেখড়ি সলিলেরই হাতে।

 

কল্পবিজ্ঞান

এছাড়াও আরেকটা বিষয় বিশেষ করে স্মরণ করার। বাংলাভাষায় কল্পবিজ্ঞানের চর্চা অনেকেই করেন। কিন্তু সেখানে বিজ্ঞানের ভাগটা কম থাকে, আর কল্পনার নামে যা থাকে তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গালগল্পে পর্যবসিত হয়। আমি সলিলের কাছে ব্যক্তিগতভাবে ঋণী এই কারণে যে সে-ই প্রথম আমাকে সত্যিকারের ও উচ্চাঙ্গের সায়েন্স ফিকশনের রস আস্বাদন করিয়েছিল। বেশ কিছু উৎকৃষ্ট সায়েন্স ফিকশনের বই পড়িয়েছিল এবং কয়েকটা অনুবাদও করিয়ে নিয়েছিল। বাংলাভাষায় উঁচুদরের বিদেশি কল্পবিজ্ঞান কাহিনির অনুবাদের ক্ষেত্রে সে নিজে একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব৷ এর কারণ তার তুখোড় বাংলা ও ইংরেজি ভাষাজ্ঞান, আর বিজ্ঞানবোধের সঙ্গে মিশেছিল তার কাব্যকল্পনা। তাই সে যখন আর্থার ক্লার্ক, আইজ্যাক অ্যাসিমভ বা রিচার্ড শেলডনের লেখা অনুবাদ করছে, তাঁদের লেখার সাহিত্যগুণ ও কল্পনার বৈচিত্র অনুবাদে আগাগোড়া বজায় থাকত। শুধু অনুবাদ নয়, সে নিজেও বাংলায় বেশ কিছু মৌলিক কল্পবিজ্ঞানের গল্প লিখেছিল, যার একটি অসামান্য সঙ্কলন সম্প্রতি মানব চক্রবর্তী তাঁর ঋতাক্ষর প্রকাশনা থেকে ‘খোয়াবওয়ালা ও আরও বারো’ নামে প্রকাশ করেছেন। এই বইয়ে কল্পবিজ্ঞান নিয়ে খুব পাণ্ডিত্যপূর্ণ একটি ভূমিকাও লিখেছিল সলিল, যা কল্পবিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহী প্রতিটি বাঙালি পাঠকের পড়া দরকার। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, গত চল্লিশ/পঞ্চাশ বছরে যাঁরা বাংলা ভাষায় কল্পবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেছেন তাদের সবচেয়ে ওপরের সারিতে নাম থাকবে সলিল বিশ্বাসের।

 

ফটোগ্রাফি

সি গুহ স্মরণে কফি হাউসের তিনতলায় যে বই-চিত্র গ্যালারি যে আজ অনেকের কাছে পরিচিত, সেই গ্যালারি গড়ে ওঠার পেছনে সলিল বিশ্বাসের অবদান বোধহয় সবচেয়ে বেশি। আজ বই-চিত্র-র এই ফটোগ্রাফিক গ্যালারির প্রশংসা করে অনেকেই বলেন যে ছোট হলেও গ্যালারিটা রীতিমতো পেশাদারি মানের; এসবই হয়েছিল মূলত সলিলের পরিকল্পনায়। সলিল ছাড়া অনেকেই কাজে হাত লাগিয়েছেন, তা সত্ত্বেও এই গ্যালারি বহুল পরিমাণে সলিলেরই উৎসাহে, পরিকল্পনায় ও আনুকূল্যে গড়ে উঠেছে। তার কারণ সলিল নিজে ছিল ফটোগ্রাফির ওস্তাদ, দেশে-বিদেশে নানা জায়গায় তার নিজের তোলা ছবির প্রদর্শনী হয়েছে, সে ফটোগ্রাফির পুরনো-নতুন নানান টেকনিক জানত, একসময় নিজে ফটো ডেভেলপ করত, তার বাড়িতে নিজস্ব ডার্করুম ছিল। কম্পিউটারের মতো এতেও তার নৈপুণ্য প্রায় পেশাদারি মার্গের।

শুধু গ্যালারি নির্মাণ নয়, এই বই-চিত্র-এই নানা ধরনের প্রথাভাঙা অনুষ্ঠান উদযাপনের উদ্যোক্তা ছিল সলিল, যেমন রবীন্দ্রনাথের ভাবনা অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম-এর ছোঁয়াবিযুক্ত সর্বজনীন উৎসব উদ্‌যাপন করা, প্রথামাফিক রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন না করে রবীন্দ্রনাথের চিন্তাভাবনার চর্চা করা, তাঁর শিক্ষাগুলোকে আজকের দিনে উপযোগী করে টেনে নেওয়া— এ সবই ছিল সলিলের মস্তিষ্কপ্রসূত।

 

জীবনরসিক

জীবনরসিক সলিল একইসঙ্গে খুব খাদ্যরসিক ছিল। জীবনের রসাস্বাদনের যে কথা বলছিলাম, এটাও তার একটা দিক। সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিচার করত— এটা এই দেশের রান্না, অমুক দেশের ওই মশলাটা এই রান্নায় ব্যবহার করা হয়েছে, তমুক দেশের রান্না হলে এই মশলাটা অন্যভাবে দিত। কোনও দোকানের তেলেভাজা কিংবা ফিশ ফ্রাই বা কচুরির কী বৈশিষ্ট্য, এসব তার নখদর্পণে ছিল।

 

প্রেমিক, স্বামী, পিতা

সলিলকে নিয়ে কথা শেষ হবে না। আমি কতটুকুই বা বললাম। সলিল অত্যন্ত প্রশস্ত অর্থে মানবিক ছিল। প্রতিটা বন্ধুর সুখে-দুঃখে সে সবসময় তাঁদের পাশে থেকেছে। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে আমরা এটা দেখে আসছি। আমাদের সমস্ত বন্ধুদের কাছে এটা ছিল এক মস্ত বড় পাওনা। বিগত কিছুদিন ধরে ওর অসুস্থতার মধ্যে দিয়ে আমরা বুঝতে পারছিলাম যে দিন ফুরিয়ে আসছে। শেষ যখন দেখা হল, তার মাত্র কিছুদিন আগে ওর স্ত্রী সবিতা, আমাদের সকলের প্রিয় “ছবি”, মারা গেছেন। সেও একজন গুণী মানুষ, সেও আমাদের বন্ধু ছিল। আমরা রাধানাথ শিকদারের বাড়ি খোঁজার জন্য চন্দননগরে যে-অভিযান চালিয়েছিলাম, ছবিও তার সঙ্গী ছিল। সলিলের তোলা অসাধারণ কিছু ফটোয় সে ইতিহাস অমর হয়ে থাকবে। ‘বাংলা মান্থলি রিভিউ’তে কিছু কিছু অনুবাদ সবিতাও করে দিয়েছিল। মৃত্যুর কিছুকাল আগে পাওলো ফ্রেইরির লেখার অনুবাদ করেছিল সবিতা।

ছবির মৃত্যুতে সলিল খুব ভেঙে পড়েছিল। যাঁরা সেদিন তাকে দেখেছেন, তাঁরা বলেছেন, সলিল হাউহাউ করে কাঁদছিল। স্ত্রী-কে স্বামীরা ভালোবাসেন, কিন্তু স্ত্রী-র সঙ্গে এই প্রকাশ্য একাত্মবোধ, প্রকৃত অর্থে এই সহধর্মিতা বাঙালি ভদ্রলোক সমাজে আমরা বড় একটা দেখতে পাই না। আমাদের সমাজে পুরুষ মানুষরা কাঁদেন না। স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রীরা কাঁদেন, স্ত্রীর মৃত্যুতে স্বামীরা কাঁদেন না। সলিলের পূর্ণাঙ্গ মানবতার জীবনদর্শনে এসব কথা ঠাঁই পায়নি। এতখানি আন্তরিক, এতখানি গভীর ছিল তার প্রতিটি অনুভব, প্রতিটি আবেগ। নিজের পুত্রকন্যার মধ্যেও সে এই আবেগটা সঞ্চার করতে পেরেছে। নিজের পুত্র, কন্যা ও পুত্রবধূকে পাশে নিয়ে সে বলত আমার দুই মেয়ে এক ছেলে। এর মধ্যে কোনও নাটুকেপনা ছিল না।

সলিলের চিকিৎসক ও বন্ধু স্থবির দাশগুপ্তও সেদিন আমাদের ওই স্মরণসভায় সলিল সম্বন্ধে ওই কথাই বলছিলেন। তিনি ডাক্তার, মানুষের মৃত্যু দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু সেহেন ডাক্তার দাশগুপ্তও সেদিন কবুল করলেন, ‘বৌদির মৃত্যু সলিলদাকে এমনভাবে ধাক্কা দিয়েছিল যে আমি ডাক্তার হয়েও তাঁর সামনে গিয়ে কী করে দাঁড়াব ভেবে পেতাম না।’

 

মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা

এ হেন সলিল নোঙর ছিঁড়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেল। এটা আমাদের অর্থাৎ ওর বন্ধুদের কাছে একটা অসহ্য দুঃখের জায়গা। সলিলের মতো মানুষকে তো আর চাইলেই পাওয়া যায় না। সেও তো একদিনে এইভাবে গড়ে ওঠেনি। অনেক উত্থানপতন ঘাতপ্রতিঘাত অনেক লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে সে গড়ে উঠেছিল। ভবিষ্যত প্রজন্মের ভাবতে ভালো লাগবে, এই ধরনের মানবিক কর্মময় একজন মানুষ চূড়ান্ত রাজনৈতিক স্বচ্ছতা নিয়ে আমাদের মধ্যে ছিল। তার রাজনীতির মূল জায়গাটা ছিল খুব পরিষ্কার— আমি এই দেশে বাস করি; এই দেশের খেটেখাওয়া মানুষ আমাকে খেতে-পরতে দেয়, অতএব সবার আগে আমার কমিটমেন্ট তাঁদের প্রতি। আমাদের জ্ঞানত এই অবস্থান থেকে সারা জীবনে তার একবারের জন্যও বিচ্যুতি ঘটেনি৷ এই স্পষ্ট, অবিচল রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং ব্যক্তিগত বহু গুণের সমাহার, এই সব মিলিয়ে সলিল বিশ্বাস ছিল একজন পরিপূর্ণ এবং ব্যতিক্রমী মানুষ। হাজার প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তার রাজনৈতিক কমিটমেন্টের কোথাও কোনও নড়চড় হয়নি। এই পরিচয়টাই সব কিছু ছাপিয়ে আমার কাছে প্রধান হয়ে থাকবে। আর যে কটা দিন বেঁচে থাকব, সলিলের মতো একজন মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বের কথা কোনও দিন ভুলতে পারব না।

ফ্রেন্ড, ফিলজফার, গাইড কথাটার মানে কী, সলিল তার জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে তা আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে গেছে। আপাদমস্তক বাঙালি এই মানুষটি স্বভাবতই ছিল বিশ্বচারী, আক্ষরিক এবং আলঙ্কারিক উভয় অর্থে। তার জীবনের একটা প্রকোষ্ঠর সঙ্গে অন্য প্রকোষ্ঠের কোনও ছেদ ছিল না। খুব কম মানুষ সম্বন্ধেই কথাটা বলা যায়।

 

সলিল বিশ্বাসের অনূদিত, রচিত ও সম্পাদিত বইপত্রের তালিকা:

  • ডলফিন আইল্যান্ড – আর্থার সি. ক্লার্ক – (উপন্যাস)- কথাশিল্প
  • আপনাকে বলছি স্যার – (শিক্ষকের উদ্দেশ্যে ইতালির বারবিয়ানা স্কুলের ছাত্রদের লেখা চিঠি)- মনফকিরা
  • বোর্হেসের দশটি গল্প- নান্দীমুখ
  • ইউটোপিয়া- স্যার টমাস মোর (ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা)- মনফকিরা
  • মার্ডার ইন দ্য ক্যাথিড্রাল- টি. এস. এলিয়ট (কাব্যনাট্য)- মনফকিরা
  • খোয়াবওয়ালা ও আরও বারো- (অনুবাদ ও মৌলিক গল্পের সংকলন)- ঋতাক্ষর
  • ইন্টারনেট- (আন্তর্জাল বিষয়ক প্রাইমার)- জে. এন. চক্রবর্তী
  • ছায়া হারলেম – (আমেরিকান কবিতার সংকলন) -পিবিএস
  • ডন কুইক্সট- মিগুয়েল সার্ভান্তিস- (কিশোর পাঠ-উপযোগী করে অনূদিত উপন্যাস)- লেখনী
  • Studies in G. B. Shaw’s Candida- ( বন্ধু উদয় ভাটিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদিত গ্রন্থ)- বুকস ওয়ে
  • ভাবনা জুড়ে চে- মার্গারেট র‍্যান্ডাল-  মনফকিরা
  • অন্তর্ঘাত ও অন্যান্য কাহিনি- (মৌলিক গল্পগ্রন্থ)-  মনফকিরা
  • মুক্তির জন্য সাংস্কৃতিক প্রয়াস – পাউলো ফ্রেইরি- (শিক্ষাবিষয়ক প্রবন্ধ)- মনফকিরা
  • সাইলাস টিমবারম্যান- হাওয়ার্ড ফাস্ট- (উপন্যাস)- পিপলস বুক সোসাইটি
  • ফ্রেইরি চর্চা: পাঁচ কথা- (পাউলো ফ্রেইরি-র শিক্ষাচিন্তা)- দীক্ষা এডুকেশন ট্রাস্ট

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3324 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...