পশুহত্যার হারাকিরি ও অরণ্যের অধিকার

পশুহত্যার হারাকিরি ও অরণ্যের অধিকার -- প্রিয়ক মিত্র

প্রিয়ক মিত্র

 

পাহাড়ঘেরা জঙ্গল সুগন্ধগিরি। সুলতানবাথেরি শহরের গা ঘেঁষে। ঘন জঙ্গলের মধ্যে পাহাড়ের গায়ে লুকিয়ে পড়েছে একটা একচালা বাড়ি। সেই বাড়ির সামনের একফালি উঠোনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন ৬৩ বছর বয়সী আম্মালু। বৃদ্ধা আম্মালুকে রোজ পশ্চিমঘাট পর্বতমালার ২০০ মিটার পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে যেতে হয় জল আনতে। পথে মাঝেমধ্যেই আম্মালুকে মুখোমুখি হতে হয় কারাডি, চিতা বা আনা-র। কারা এরা? কেরলের এই প্রত্যন্ত এলাকার গ্রামবাসীদের উপভাষায় ‘কারাডি’ বলা হয় ভাল্লুককে, ‘চিতা’ হল চিতাবাঘ, এব‌ং হাতির নাম ‘আনা’। আম্মালু যখন এই বিপজ্জনক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছেন, তখনও তাঁর মুখ থেকে হাসি মুছে যায়নি একফোঁটাও। সেই হাসিমুখেই আম্মালু বলেছিলেন, ‘ওদের হাঁটাচলার রাস্তা দিয়ে তো ওরা হাঁটবেই। আমাদের যদি জল আনতে অতদূর না যেতে হত…।’

এই সহজ কথাটা আম্মালু বুঝেছিলেন। না, নব্বই শতাংশেরও বেশি স্বাক্ষরতার আলো তাকে ছোঁয়নি, দিনকয়েক আগের বন্যাতে ভেসে গিয়েছে বসতবাড়ির খানিক অংশ। ছেলে সপরিবারে থাকে সদর শহরে। স্কুলে ছুটি পড়লে নাতি-নাতনিরা তার কাছে বেড়াতে আসে। এক নাতির ছোট্ট খেলনা বাইসাইকেল পড়ে আছে সেই উঠোনেই। সেদিকে তাকিয়ে চিন্তিত আম্মালু বললেন, ‘যখন জল আনতে যাই, সেসময়টা বাচ্চারা একা থাকে। ভয় হয়!’ কেন? ‘আনা’ বা ‘কারাডি’ বাড়ি অবধি হানা দেয়? এবার বাড়ির ওপরদিকের একটা পাহাড়ি ঢাল দেখালেন আম্মালু। জানালেন, একটি হাতি বা ‘আনা’ একদিন ওই ঢাল বেয়ে নেমে এসে দাঁড়িয়েছিল বাড়ির ছাদে। তবে কোনও ক্ষতি করেনি। চলে গেছে কিছুক্ষণ পর। তাও তার ছোট্ট নাতি-নাতনিদের জন্য চিন্তা হয় আম্মালুর।

২০১৯ সালের জানুয়ারি মাস। দক্ষিণ ভারতে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়ছি। কলেজ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কেরলের ওয়ানাড জেলায়। দশদিন ধরে আমি, বন্ধু জয়দীপ আর অরিজিৎ যত না রিপোর্টিং করেছিলাম, তার চেয়েও ঢের বেশি করে দেখেছিলাম ওখানকার মানুষকে। চিরকালের জঙ্গলপ্রেমিক আমার মন আনচান করে উঠেছে, যখন শুনেছি কাজের সূত্রে যেখানে যেখানে যাচ্ছি, সেখানে যে কোনও সময় বেরিয়ে আসতে পারে হিংস্র কোনও বন্যপ্রাণী। কোথাও হয়তো আগেরদিন বিকেলেই হাতির পাল ঘুরে গেছে এসে, কোথাও বাঘ বা চিতাবাঘ সাক্ষাৎ দিয়েছে। দিব্য রোমাঞ্চে টগবগ করছি। কোথাও নদীর মাছভাজা, কোথাও বা দুর্দান্ত পরোটা-মাংস খাচ্ছি; চোখে পড়ছে রাস্তায়-ঘাটে লাল ঝান্ডার বাড়বাড়ন্ত। যেন দশ বছর আগের পশ্চিমবঙ্গ! এমনকী, কাস্তে-হাতুড়ির ঢঙে সাজানো বাসস্ট্যান্ডও চোখে পড়ছে। মনে আছে, কোঝিকোড়ে যেদিন পৌঁছেছিলাম, সেদিন শবরীমালা নিয়ে বিজেপির ডাকা বনধ্। সব মিলিয়ে সরগরম অবস্থা! তবে এসব ছুটকো উত্তেজনাকে ছাপিয়ে দশদিন ধরে যাঁরা আমাদের মন ভরে থাকলেন, তাঁরা কেরলের মূলনিবাসী আদিবাসীরা। আমরা রাস্তার ধারে দাঁতাল হাতি দেখতে পেয়ে লাফাচ্ছি বা বাঘ দেখতে পাব— এই উত্তেজনায় থরথর করছি, আর যেসব জায়গায় যাচ্ছি, সেখানকার অধিবাসীদের বারোমাস অষ্টপ্রহর বন্যপ্রাণের সঙ্গেই সহবাস।

যেমন, আম্মালু। ১০০ বছর ধরে তার উপজাতির বসবাস সুগন্ধগিরিতে। অথচ, এখন তাঁদের ঘরবাড়ি পড়ে গেছে সংরক্ষিত অভয়ারণ্যের আওতায়। ফলে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টও কোনও ইলেকট্রিক ফেন্স দিয়ে ঘিরে দিতে পারছে না ওই কলোনি। আর এতদিনের বাস যাঁদের, তাঁদের পুনর্বাসনের বন্দোবস্ত করাও সহজ নয়।

বেগুর আদিবাসীদের কথাই ধরা যাক। ইউনেসকো-র নীলগিরি বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ-এর থলপেট্টি অভয়ারণ্যের পাশেই এই আদিবাসী কলোনি। প্রায় হাজার বছর ধরে তাঁরা থাকতেন জঙ্গলের মধ্যে, তারপর জঙ্গলের বাইরে তাঁদের বসতি স্থাপন হয়। সেখানে থাকেন বৃদ্ধা অনিতা, তাঁর ছেলে রিমিথ এব‌ং তাঁর পরিবার। রিমিথের মেয়ে স্কুলে যায়‌‌। সে লাজুক হাসি মুখে জানায়, তার প্রিয় বিষয় মালয়ালম। এই রিমিথদের কফিচাষের খেত নষ্ট করে দিয়েছে হাতি এসে। রিমিথ আমাদের নিয়ে গিয়ে দেখাল সেই নষ্ট খেতের ছবি। বৃদ্ধা পুল্লেরি সানড্রু বললেন তার গোয়াল রয়েছে, আর সেই গোয়ালের গরুর গন্ধে বাড়ির পেছনের অংশে বাঘ-ভাল্লুক-চিতাবাঘের উঁকিঝুঁকি লেগেই থাকে।

কেন বেড়া দেওয়া নেই এলাকার আশেপাশে? প্রশ্ন উঠতেই মুখ খুললেন টি এন রবি। মান্নানথাবারি ছোট টাউন, সেখানকার সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক তিনি, বললেন, এই দিকে জন্তুজানোয়ারের আসাটা আদৌ স্বাভাবিক নয়। তারা আসছে, কারণ নির্বিচারে বাঁশগাছ কাটা হচ্ছে, যা হাতির প্রধান খাবার, নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। লাগানো হচ্ছে কৃত্রিম গাছ, ইউক্যালিপটাস জাতীয়‌। ফলত অন্যান্য প্রাণীরাও বেরিয়ে আসছে জঙ্গল থেকে।

যতগুলো কলোনিতে ঘুরেছি, দেখেছি, একবারও, একবারও কিন্তু সেইসব কলোনির বাসিন্দাদের মধ্যে কেউ বলেননি পশুহত্যার কথা। কোনও রাগ, কোনও বিদ্বেষ, কোনও ঘৃণা তাঁদের বাচনভঙ্গি বা শরীরের ভাষায় ছিল না। খেত নষ্ট হয়েছে, প্রাণের ঝুঁকি আছে— না, তা সত্ত্বেও কেউ বলেননি হাতি বা বাঘ মেরে ফেলা হোক। কারণ, বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য কাকে বলে, তাঁরা বোঝেন। এবং হ্যাঁ, এইসব কলোনিতেই নতুন প্রজন্মের প্রায় সকলে স্কুলে যাচ্ছে, কলেজে যাচ্ছে। আজ্ঞে না, শিক্ষা তাঁদের বিন্দুমাত্র নির্মম করে তোলেনি। বুনো শুয়োরের আক্রমণ রুখতে সেখানে আনারসে বাজি পুরে রাখা হয়, একথা ঠিক। গতবছর কেরলে মৃত হাতিটি ভুল করে সেই আনারস খেয়েছে না কেউ খাইয়েছে, তা তদন্তসাপেক্ষ। কিন্তু আদিবাসী, মূলনিবাসীরাও পশুর আক্রমণে সর্বস্ব হারিয়েও পশুপাখিদের সঙ্গে থাকতেই চান। শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘জঙ্গলের মধ্যে ঘর ঈশ্বর গড়েন।’ তবে, ‘ঈশ্বরের নিজস্ব দেশ’-এ এই মানুষগুলো সবসময় খুব সুখে থাকতে পারেন না। পশু বা মানুষ, কেউই কিন্তু অনুপ্রবেশকারী নয় এখানে, তবে এই মানুষদের পুনর্বাসন করার সুযোগ রয়েছে।

জেনে রাখুন, ভারতবর্ষের প্রায় প্রতিটা জঙ্গল-সংলগ্ন এলাকাতেই এই লোকবসতি সংক্রান্ত সমস্যা আছে। সমস্যাটা শুধুই পশুপাখিদের নয়, সেখানকার মানুষেরও, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেখানে রয়েছে। মানুষ-পশুর সহাবস্থানের সমস্যার সমাধান করার প্রয়োজনীয়তাটা কোনও শাসকই বিশেষ বোধ করেনি। তাই গত বছর যখন বাজিবারুদভরা আনারস, যা খেতে শুয়োরের অনুপ্রবেশ আটকানোর জন্য ব্যবহৃত হয়, তা খেয়ে একটি হাতিটির মৃত্যু হল— দায় কাঁধে নিতে হল স্থানীয় কৃষকদের। মানেকা গান্ধি নিজে উদ্যোগ নিলেন, যাতে স্থানীয়দের চটজলদি গ্রেফতারি হয়।

অমিত মাসুরকরের ‘শেরনি’ অবনীর হত্যার রেফারেন্স দেওয়ার পাশাপাশি এই প্রশ্নটাও তুলে দিয়েছে। যে প্রশ্ন বহন করে এই ছবির জ্যোতির মতো চরিত্ররা। তাদের রুটিরুজির ক্ষতি হয় মানুষখেকো বাঘের হানায়, সেই তারাই আবার নিহত বাঘের শাবকদের তুলে দেয় সৎ সরকারি আমলার হাতে, যাতে তারা বাঁচতে পারে।

অথচ রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্র নয়া পরিবেশ আইনের জোরে রাজস্থানের ভরতপুরে অর্ধশতাব্দী যাবৎ আটকে থাকা একটি স্যান্ডস্টোন মাইনিং প্রকল্প ও কর্নাটকের জঙ্গলঘেঁষা একটি ম্যাঙ্গানিজ মাইনিং প্রকল্পকে সিলমোহর দিতে চলেছে পরিবেশের সঙ্গে সাযুজ্য বজায় রাখার মেকি কথা বলে, তাদের দিকে তো আঙুল ওঠে না একবারও?

Facebook Notice for EU! You need to login to view and post FB Comments!
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3779 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...