বজ্রপাতে বেড়ে চলা মৃত্যুর সংখ্যা কোন বার্তা দিচ্ছে বাংলাকে?

সহেলী দাশ

 


শিক্ষক, গবেষক

 

 

 

এই সেইদিনেরই ঘটনা, গত ৬ ও ৭ জুন ২০২১, এই দুইদিনে মোট ৩২ জন মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন আমাদের রাজ্যে, যেখানে শুধু ৭ তারিখেই মারা গেছেন ২৭ জন। এই ঘটনা কি নিছকই দুর্ঘটনা নাকি কোনও বার্তা প্রকৃতির তরফ থেকে বাংলাকে?

 

কী বলছে তথ্য?

ইন্ডিয়ান মেটেওরোলজিকাল ডিপার্টমেন্ট (আইএমডি)-এর ১৯৭৯ থেকে ২০১১ সালের তথ্যের উপর ভিত্তি করে ২০১৫-এর একটি গবেষণায়[1] দেখা গেছে, বজ্রবিদ্যুতের কারণে আকস্মিক মৃত্যুতে আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ দ্বিতীয়-শীর্ষে। যদিও ন্যাশানাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (এনসিআরবি)-র বিগত ১০ বছরের (২০১০-২০১৯) পরিসংখ্যান অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের স্থান অষ্টম এবং এই সময়সীমায় মোট ১৬৪১ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। নিচের চিত্রে (চিত্র ১) বজ্রবিদ্যুতের কারণে বার্ষিক মৃত্যুর প্রবণতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

চিত্র ১

চিত্র ১ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, বাংলায় বজ্রপাতে বার্ষিক মৃতের সংখ্যা এখনও পর্যন্ত ২০০ অতিক্রম করেনি। যেখানে সর্বাধিক মৃত্যু হয়েছে ২০১২-তে ১৮৬ জন, এবং ২০১৪ ও ২০১৮ সালে মৃতের সংখ্যা যথাক্রমে ১৮০ ও ১৭৯। বিভিন্ন পত্রিকা থেকে সংগৃহীত তথ্যে দেখা গেছে যে, ২০১০ থেকে ২০১৯— এই সময়সীমার মধ্যে সর্বোচ্চ ১০-১২ জন মানুষ এক দিনে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে সর্বাধিক ১২ জনের মৃত্যু হয় ২০১৮ সালে। যদি ধরা হয় যে দৈনিক গড়ে ১০-১২ জন করে বছরে প্রায় ১৮০ জনের মৃত্যু হচ্ছে, তাহলে বলা যায় বছরে গড়ে ১৫-১৮ দিন বজ্রপাত হচ্ছে। সুতরাং, আনুমানিক, বছরে গড়ে ১৫-১৮ দিন বজ্রপাত হলে ও ৭ জুনের মতোই প্রতিদিন গড়ে ২৭ জন মানুষ মারা গেলে, ২০২১ সালের শেষে শুধুমাত্র বজ্রপাতেই প্রায় ৪০০-৫০০ জনের মৃত্যু হবে, যা এনসিআরবি-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী এখনের তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি। আর এরই ফলস্বরূপ পশ্চিমবঙ্গ বজ্রপাতজনিত মৃত্যুতে প্রথম স্থানে উঠে আসবে। যেটা সত্যিই আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বাংলার মানুষের কাছে একটি চিন্তার বিষয়।

কিন্তু হঠাৎ কেন এত প্রকোপ বজ্রপাতের?

 

কী কারণ এর পিছনে?

বজ্রপাতের এই বর্ধিত প্রকোপের পিছনে অন্তর্নিহিত কারণটি কী— মানুষের অসচেতনতা, সরকারের গাফিলতি, না কি অন্য কিছু? বজ্রপাত কোনও নতুন ঘটনা নয় এবং তাতে যে মানুষের প্রাণের আশঙ্কা আছে তাও অজানা নয়। তাই মানুষের অসতর্কতা নিতান্তই একটি ঠুনকো ব্যাপার। তাহলে কি সরকারের গাফিলতি? তাও নয়। কারণ, সরকারের নির্দেশেই সাম্প্রতিক কালে বিদ্যুৎ পরিবহণ দফতর থেকে মানুষের মোবাইলে পৌঁছে যাচ্ছে সতর্কতার মেসেজ। তাহলে এর পিছনের অন্তর্নিহিত কারণটি কী? আবহাওয়াবিদ-দের মতে[2], ক্লাইমেট চেঞ্জই (জলবায়ুর পরিবর্তন) হল অতিরিক্ত বজ্রপাতের কারণ। এই ক্লাইমেট চেঞ্জ আসলে গ্লোবাল ওয়ার্মিং (বিশ্ব উষ্ণায়ন)-এর ফল, আর যার জন্য আমরা মানুষরাই দায়ী। পশ্চিমবঙ্গের স্টেট অ্যাকশন প্ল্যান অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (এসএপিসিসি)-এর রিপোর্ট[3] অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অ্যাগ্রো-ক্লাইমেটিক অঞ্চলের তাপমাত্রা ও বর্ষা দুইই ভিন্ন। আইএমডি-এর ১১৬ বছরের (১৯০১-২০১৬) তথ্যের উপর ভিত্তি করে একটি গবেষণায়[4] লক্ষ করা গেছে, বাংলার বেশিরভাগ জেলার বার্ষিক তাপমাত্রা (বার্ষিক গড় তাপমাত্রা, বার্ষিক গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা, বার্ষিক গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা) বৃদ্ধির প্রবণতা অঞ্চলানুযায়ী ভিন্ন। একই সঙ্গে ১৯০১-২০১২ সাল এই সময়সীমায় দেখা গেছে, দক্ষিণ-পশ্চিম বায়ু ঘটিত বর্ষার পরিমাণও বাংলার গঙ্গা উপত্যকায় ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। এই দুই, ঊর্ধ্বমুখী তাপমাত্রা ও নিম্নমুখী বর্ষার সম্মিলিত প্রভাবেই রাজ্যে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া, তথা বজ্রপাতের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

কী মতামত বাংলার মানুষের?

যে ২৭ জন মানুষ ৭ জুন তারিখে বজ্রপাতে মারা গেছেন, তাদের মধ্যে ১১ জনই হুগলির বাসিন্দা। কী মতামত হুগলির বাসিন্দাদের? হুগলি জেলার বেড়াবেড়ি (পূর্ব পাড়া) গ্রামের এক ৫৭ বছরের বাসিন্দা শ্রী মোহনলাল বাগের মতে, আগেও বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু হত, কিন্তু তা এখন এর তুলনায় অনেক কম। তাঁর মতে, আগে আকাশে মেঘ দেখে বোঝা যেত যে ঝড়-বৃষ্টি আসতে চলেছে এবং গ্রামের মাঠে-ঘাটে কাজ করা মানুষরা বাড়ি ফিরে যেতেন। কিন্তু এখন তা বুঝতে পারলেও বাড়ি যাওয়ার সময়টুকুও তারা পান না, ঝড়-বৃষ্টি-বজ্রপাত তার আগেই অকস্মাৎ শুরু হয়ে যায়। তাই যিনি যেখানে আছেন সেখানেই কোনও বড় গাছ বা অন্য কিছুর নিচে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। তাছারাও ওঁর মতে, আগের তুলনায় এখন বজ্রপাতের সময়সীমা ও সংখ্যা দুটোই বেশি। একই সঙ্গে, বিদ্যুতের তীব্রতাও হয়ত বা বেশি। তাই মৃত্যুর হারও বেশি। মোহনলালবাবু এমনও মনোভাব প্রকাশ করেছেন যে, এই সবকিছুর পিছনে রয়েছে সেই ক্লাইমেট চেঞ্জ ও সহ্যাতিরিক্ত গরম। এসবেরই বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রয়োজন আছে। তিনি মনে করেন যে, এই দুর্ঘটনার থেকে মানুষের প্রতিকারের উপায় হল আবহাওয়া দফতর থেকে বজ্রপাতের আরও নিখুঁত সময় জানানো, যাতে মানুষ সেই নির্দিষ্ট সময় নিজেদের বাড়িতেই থাকতে পারে আর যদি বাইরেও থাকে তাহলে কোনও সুরক্ষিত জায়গায় আশ্রয় নিতে পারে। একই সঙ্গে, সরকারকে আরও সচেতনতামূলক প্রচার করতে হবে। তিনি এমনটিও বলেন যে, বিদ্যুৎ পরিবহণ দফতর থেকে মোবাইলে মেসেজের মাধ্যমে সতর্কবার্তা তাঁরা আগে থেকেই পান, কিন্তু তাতে শুধুই জানানো হয় যে কোন দিন বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাঁর মতে, গ্রামের মানুষের পক্ষে গোটা দিন বাড়িতে বসে থাকা বা সবসময় মেসেজ দেখা সম্ভব হয় না। তাই তাঁরা যখন কাজে বেরান, তখনই তাঁরা বজ্রবিদ্যুতের শিকার হন।

সকল তথ্য ও মানুষের মতামত থেকে এটাই বলা যায় যে, বেড়ে চলা বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা সত্যিই বাংলার মানুষের কাছে একটি সতর্কবার্তা। তাই মানুষকে আরও সতর্ক হতে হবে, সরকারের নির্দেশ পালন করতে হবে ও তারই সঙ্গে পরিবেশ দূষণ রোধ করতে হবে। মানুষের পাশাপাশি, সরকারকেও অনেক সক্রিয় হতে হবে, জোরদারভাবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা সকলের মধ্যে প্রচার করতে হবে কঠোর পরিকল্পনার মধ্যে দিয়ে, এবং গবেষণার সম্প্রসারণের জন্য গবেষকদের অনুপ্রাণিত করতে হবে যাতে বজ্রপাতের তীব্রতা, নিখুঁত সময় ও সঙ্গে আরও নতুন তথ্য জানা যায় উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে। সবশেষে, মানুষ ও সরকার দুজনকেই নিরন্তর হাতে-হাত মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়ার লক্ষ্যে।

 

[1] Lightning fatalities over India: 1979-2011. Omvir Singh and Jagdeep Singh.
[2] West Bengal: Lightning Death Toll rises to 27, Weather Experts say rapid temperature fluctuations causing frequent lightning. Sweety Kumari. The Indian Express. June 9, 2021.
[3] State Action Plan on Climate Change 2017-20. Government of West Bengal.
[4]

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...