গান্ধিহত্যা— সাভারকার ও সর্দার প্যাটেল প্রসঙ্গে

রবি ভিএস প্রসাদ

 


রবি বিশ্বেশ্বরাইয়া সারদা প্রসাদ একজন প্রযুক্তি পরামর্শদাতা এবং প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক। তাঁর মা কমলাম্মা মাদিকেরা সারদা প্রসাদ একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন, এবং পরবর্তীকালে গান্ধিহত্যা মামলায় একজন সরকারি দোভাষীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর বাবা এইচ ওয়াই সারদা প্রসাদ সাংবাদিক ছিলেন, সরকারি কর্মচারী ছিলেন এবং ছিলেন ভারতের তিন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শদাতা— ইন্দিরা গান্ধি, রাজীব গান্ধি এবং মোরারজি দেশাই। লেখকের বর্তমান নিবন্ধটির মূল তথ্যসূত্র তাঁর মা, যিনি গান্ধিহত্যা মামলার বিচারের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন পূর্বেই উল্লিখিত। নিবন্ধটি গত ৩০ জানুয়ারি, ২০২১-এ ‘দ্য প্রিন্ট’ পত্রিকায় Gwalior to Godse— Was Sardar Patel soft on Savarkar in Gandhi murder case, and if so, why শিরোনামে ছাপা হয়।

গোয়ালিয়রে অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা গডসে জ্ঞান শালা[1] প্রতিষ্ঠা করেছে। উদ্দেশ্য নাথুরাম গডসের আদর্শ প্রচার। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি হত্যায় হিন্দু মহাসভা এবং বিশেষ করে তাদের গোয়ালিয়র শাখার কী ভূমিকা ছিল, এই অবসরে তার একটা পুনর্মূল্যায়ন জরুরি।

যে ইটালিয়ান বেরেট্টা রিভলভারটি[2] দিয়ে গডসে গান্ধিকে গুলি করেছিল সেটি আসলে ছিল গোয়ালিয়রের তৎকালীন মহারাজা জিয়াজিরাও সিন্ধিয়ার সামরিক সচিব কর্নেল ভি ভি জোশির। তার এই রিভলভারটি যে কী করে একজন অস্ত্রব্যবসায়ীর হাতে গিয়ে পড়ল সে নিয়ে কোনও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত আজ পর্যন্ত হয়নি। যে পাঁচজন নাথুরাম এবং নারায়ণ আপ্তেকে রিভলভার পৌঁছে দিয়েছিল তাদের মধ্যে জগদীশ প্রসাদ গোয়ালের নাম চার্জশিটেই দেওয়া হয়নি!। জগদীশ ছিল তৎকালে গোয়ালিয়রের সবচেয়ে বড় অস্ত্রব্যবসায়ী।

এদের নেতা, হিন্দু মহাসভার গোয়ালিয়র শাখার প্রধান এবং সিন্ধিয়া রাজপরিবারের চিকিৎসক দত্তাত্রেয় সদাশিব পারচুরে[3]-কে বিচারপতি আত্ম চরণের ট্রায়াল কোর্ট যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু পরবর্তীকালে কিছু টেকনিক্যাল কারণে সে ছাড়া পেয়ে যায়। বাকি তিনজন, এরাও গোয়ালিয়র হিন্দু মহাসভার নেতা, সরকারি খাতায়কলমে নিখোঁজ।

আমার মা, স্বর্গত কমলাম্মা মাদিকেরা সারদা প্রসাদ, গান্ধিহত্যা মামলার প্রসিকিউশন টিমের সদস্য ছিলেন। তিনি বোম্বে সরকারেও কাজ করেছিলেন। বোম্বের তৎকালীন চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট অস্কার হেনরি ব্রাউন তাঁকে বিশেষ করে একজন অভিযুক্ত শঙ্কর কিস্তাইয়ার থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিস্তাইয়া দিগম্বর রামচন্দ্র ব্যাজের হয়ে কাজ করত।

ব্যাজ ছিল একজন অস্ত্রবিক্রেতা এবং হিন্দু মহাসভার সদস্য। সে পরে রাজসাক্ষী হয়।

আমি আমার অন্যান্য নিবন্ধে[4] দেখিয়েছি, আমার মা এবং প্রসিকিউশন টিমের অন্য নবীন সদস্যরা সন্দেহ করছিলেন যে হিন্দু মহাসভা এবং বিনায়ক দামোদর সাভারকরের বিরুদ্ধে মামলাটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। এবং তা করা হচ্ছে উপপ্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং বোম্বের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের নির্দেশে। সে তাঁরা মুখে যাই বলুন না কেন।[5]

আমার মা বা ডি জি তেন্ডুলকার এবং রবার্ট পেইনের সঙ্গে আলোচনা করে আমার যে ব্যক্তিগত মূল্যায়ন সেটা হল, সর্দার প্যাটেলের ওপর রণনৈতিক এবং জাতীয় স্বার্থের অনেকগুলি বিষয়ের প্রভূত চাপ ছিল। সেই কারণেই তিনি হিন্দু মহাসভার প্রত্যক্ষ জড়িত থাকার বিষয়গুলি নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করতে চাননি।

গান্ধিহত্যা মামলার সম্পূর্ণ বিচারপ্রক্রিয়া ভারত সরকার প্রকাশ করে। জাস্টিস জীবনলাল কাপুর কমিশনের রিপোর্টটিও সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয়। বর্তমান নিবন্ধটি সেগুলির ওপর ভিত্তি করেই লিখিত।

ধাঁধার টুকরোগুলি

প্রথমত, আমার মায়ের কথানুযায়ী, হায়দ্রাবাদের নিজামের বিরুদ্ধে হিন্দু মহাসভার কাজকর্মকে রণকৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন সর্দার প্যাটেল।[6] প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, নিজাম তখন রাজাকারদের দিয়ে হিন্দুদের হত্যা করাচ্ছেন। হায়দ্রাবাদে মহাসভার ভূমিকার কথা এস আর ডেট এবং এ জি নুরানি দুজনেই উল্লেখ করেছেন যথাক্রমে তাঁদের বই ‘ভানগর স্ট্রাগলস’ এবং ‘সাভারকর অ্যান্ড হিন্দুত্ব’-তে। হিন্দু মহাসভার পুনে, আহমদনগর এবং গোয়ালিয়র শাখাও হায়দ্রাবাদের হিন্দুদের সাহায্য করছিল বলে জানা যায়।[7] আমার মা বোম্বে সরকারের সিআইডি প্রধান জামশেদ নগরওয়ালার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযোগ রেখে কাজ করতেন। নগরওয়ালা আবার মোরারজি দেশাইয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন।

গোয়ালিয়রের মহারাজার আর্মি অফিসারের কাছ থেকে নাথুরাম গডসের কাছে বেরেট্টা রিভলভারটি পৌঁছনোর পেছনে মূল সহায়তা করেছিলেন এই দুই অস্ত্রব্যবসায়ী— পুনের ব্যাজ এবং গোয়ালিয়রের জগদীশ প্রসাদ গোয়াল।

দ্বিতীয়ত, রাজ-শাসিত গোয়ালিয়রের ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি তখন খুবই স্পর্শকাতর স্তরে ছিল।

মহারাজ জিয়াজিরাও সিন্ধিয়ার দাপুটে এবং জনপ্রিয় পিতৃব্য সর্দার চন্দ্রজিরাও আংরে গোয়ালিয়রে হিন্দু মহাসভার প্রতিষ্ঠা করেন।[8] ডঃ দত্তাত্রেয় সদাশিব পারচুরে দীর্ঘদিন এই শাখার নেতৃত্বে ছিল। সে একদিকে যেমন গোয়ালিয়রের রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিল, তেমন অন্যদিকে বিনায়ক দামোদর সাভারকরেরও ঘনিষ্ঠ ছিল।

গান্ধিহত্যার বিচার চলাকালে পারচুরে সহ অভিযুক্তেরা

গোয়ালিয়রে হিন্দু মহাসভার শক্তিশালী জনসমর্থন ছিল। তারা আশা করেছিল স্বাধীনতার পর তারাই সেখানে সরকার গড়বে, যার প্রধান হবে পারচুরে। কিন্তু গোয়ালিয়রের দেওয়ান এম এ শ্রীনিবাসন ছিলেন জওহরলাল নেহেরুর ঘনিষ্ঠ। তিনি কংগ্রেসি মন্ত্রীদের শপথ নেওয়ালেন। নারায়ণ আপ্তে এবং পারচুরে শ্রীনিবাসনকে হুমকি দেয় যে “তারা তাকে এবং গান্ধিকে নিকেশ করবে।” এই সবই তাঁর আত্মজীবনী ‘অফ দ্য রাজ, মহারাজাস অ্যান্ড মি’-তে লিখে গেছেন শ্রীনিবাসন।

তৃতীয়ত, হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল দেশভাগ-জনিত ভয়াবহতার পরে পরেই। ফলে সর্দার প্যাটেল এবং মোরারজি দেশাই একটা নতুন সাম্প্রদায়িক হানাহানি এড়াতে চেয়েছিলেন। গোবিন্দবল্লভ পন্থ এবং লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মত অনুযায়ী, প্যাটেল এবং মোরারজির ভয় ছিল সাভারকরকে গ্রেপ্তার করা হলে যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হবে তা সামলানো যাবে না। সর্দার প্যাটেল একটা কংগ্রেস মিটিং-এ বলেছিলেন বলে জানা যায়, “মুসলিমরা আমাদের বিরুদ্ধে চলেই গেছে। এবার এখন যদি সাভারকরকে গ্রেপ্তার করা হয় বা তার সাজা হয়, তবে হিন্দুরাও আমাদের বিরুদ্ধে চলে যাবে।” ল্যারি কলিন্স এবং ডোমিনিক লাপিয়েরের ‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’ এবং তুষার গান্ধির ‘লেট’স কিল গান্ধি’, এই দুটি বইতেই এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।

চতুর্থত, সর্দার প্যাটেল খুব চতুরভাবে হিন্দু মহাসভার কট্টর এবং নরমপন্থী অংশের মধ্যে একটা ফাটল ধরাতে চাইছিলেন। তাঁর আসল উদ্দেশ্য ছিল মহাসভার এই নরমপন্থী অংশটিকে কংগ্রেসে নিয়ে আসা। এ আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন, এবং এই মূল্যায়নের ভিত্তি সর্দার প্যাটেলেরই লেখাপত্র[9]

“তুমি কি পাগল?”

১৯৪৮-এর ২০ জানুয়ারি গান্ধিজির প্রাণনাশের একটা বিফল চেষ্টা হয়। আমি মায়ের কাছ থেকে শুনেছি সেই ঘটনার তদন্তে কত অসংখ্য ফাঁক থেকে গেছিল। হতে পারে, সেগুলো যদি না থাকত, তবে ৩০ জানুয়ারির ঘটনাটা ঠেকানো যেত।

মদনলাল পাহওয়া পশ্চিম পাঞ্জাবের একজন পার্টিশন-রিফিউজি। দেশভাগ সময়কার বর্বরতায় সে তার পরিবারের সবাইকে হারায়। ফলে পাহওয়ার মনে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছিল। রুইয়া কলেজের অধ্যাপক জগদীশ চন্দ্র জৈন পাহওয়াকে তাঁর বই বিক্রির কাজে নিযুক্ত করেন। জৈন লিখেছিলেন, পাহওয়া মুসলিমদের বিরুদ্ধে তার ধারাবাহিক বিষোদ্গারের সময় একবার বলেছিল যে সে আর তার বন্ধুরা গান্ধিকে হত্যা করতে চায়। সে এও বলেছিল যে, হিন্দু মহাসভার আহমদনগর শাখার প্রধান বিষ্ণু কারকারে তাকে সাভারকরের কাছে নিয়ে গেছিল, এবং সাভারকরও তাদের এই আকাঙ্খায় সম্মতি দিয়েছেন। জৈন এইসব কথাকে উন্মত্ত মস্তিষ্কের প্রলাপ ভেবে বিশেষ পাত্তা দেননি।

১৯৪৮ সালের ২০ জানুয়ারি গান্ধিকে হত্যা করার জন্য পাহওয়া বিড়লা সদনে বোম (গান-কটন স্ল্যাব) রেখে দেয়।

মদনলাল পাহওয়া

কেস ডায়েরি অনুযায়ী, জেরার সময়ে পাহওয়া প্রথমে বলে যে সে একাই এই কাজ করেছে। তারপর ২২ জানুয়ারি সে কারকারের নাম বলে, এর বলে যে অন্যদের সে চেনে না। সে বলেছিল যে তাদের মধ্যে কেউ কেউ পুনের সংবাদপত্র ‘হিন্দু রাষ্ট্রীয়’-র সঙ্গে যুক্ত এবং তারা হিন্দু মহাসভা ভবন-এ থাকে।

২১ জুন ১৯৪৮ সকালবেলা অধ্যাপক জৈন খবরের কাগজ পড়ে জানতে পারেন যে তাঁর কর্মচারী পাহওয়া একটি বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। জৈন তক্ষুনি সর্দার প্যাটেলকে ফোন করেন, কিন্তু পান না (প্যাটেল তখন আমেদাবাদ যাওয়ার জন্য দিল্লি থেকে বেরিয়ে গেছেন, ফলে জৈন তাঁর জন্য একটি মেসেজ দিয়ে রাখেন)। তিনি তারপরে বোম্বের প্রধানমন্ত্রী বালাসাহেব গঙ্গাধর খেরের কাছে যান। খেরই জৈনকে মোরারজি দেশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। মোরারজি কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই জৈনকে খেদিয়ে দেন, এবং অভিযোগ করেন যে তিনিও নাকি পাহওয়ার পরিকল্পনার অংশীদার ছিলেন। যাইহোক, মোরারজি পাহওয়া সম্পর্কে যা শুনেছিলেন সেগুলি সেই রাতে তিনি বোম্বে পুলিশের ডেপুটি কমিশনার জামশেদ দোরাব নগরওয়ালাকে জানান।

জৈন তাঁর তিনটি বই— ‘আই কুড নট সেভ বাপু’, ‘মার্ডার অফ মহাত্মা গান্ধি’ এবং ‘দ্য ফরগটেন মহাত্মা’-তে এগুলি লিখে গেছেন।

নগরওয়ালা সব শুনেই মোরারজির কাছে সাভারকরকে গ্রেপ্তার করার অনুমতি চান। মোরারজি খুব রাগতভাবে তা নাকচ করেন। বলেন, “তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? তুমি চাও, আমি এই গোটা রাজ্যটাকে বারুদের স্তূপের ওপর বসিয়ে দিই?” নগরওয়ালা তখন শেষমেশ মোরারজিকে নিমরাজি করিয়ে সাভারকরের ওপর নজরদারি চালানোর অনুমতি আদায় করেন। মোরারজিও নগরওয়ালার সঙ্গে কথা বলেই সর্দার প্যাটেলের সঙ্গে দেখা করতে আমেদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এ-সবই নগরওয়ালা আমার মাকে বলেছিলেন, এবং আমি এগুলি আমার ওপেন-এর নিবন্ধটিতে লিখেছি।[10]

মোরারজি দেশাই

পাহওয়ার এই বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার দু দিন পর ট্রায়াল কোর্টে সাভারকরের আইনজীবীরা মোরারজিকে জিজ্ঞেস করেন যে, কেন সাভারকরকে নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে?

মোরারজি বলেন, “সমস্ত ঘটনা কি বলব তাহলে? আমার অসুবিধা নেই। উনি [সাভারকর] কী বলছেন?”

সাভারকর তখন তার আইনজীবীদের ইশারা করে প্রশ্নটি প্রত্যাহার করে নিতে বলেন। আইনজীবী এ জি নুরানিও এই ঘটনার কথা লিখে গেছেন।[11]

মোরারজির উত্তর থেকে কি হায়দ্রাবাদে হিন্দু মহাসভার ভূমিকা সম্পর্কে কিছু জানা যেত? এটা কিন্তু বহু সূত্র থেকেই পরিষ্কার যে, সর্দার প্যাটেলের হায়দ্রাবাদ কৌশল সম্পর্কে মোরারজি সম্যক ওয়াকিবহাল ছিলেন।

বিচারপতি আত্ম চরণ প্রথমে এই প্রশ্ন প্রত্যাহার মানতে চাননি। তিনি বলেছিলেন সাভারকরের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের মামলার এটাই কেন্দ্রীয় বিষয়। তখন শুধু সাভারকরের আইনজীবীরাই নন, সরকারের পক্ষের আইনজীবীরাও এর বিরুদ্ধে বিস্তারিত সওয়াল করেন। তারপরেই এই প্রশ্নটিকে সরকারি নথি থেকে বাদ দেওয়া হয়। এ-সবই আমি মায়ের থেকে শুনেছি।

এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে যথেষ্ট ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নগরওয়ালা সেই সময় নাথুরাম এবং গোপাল গডসেকে বা আপ্তে, কারকারে এবং ব্যাজকে গ্রেপ্তার করেননি।

বিধানসভায় বালকৃষ্ণ শর্মার এক প্রশ্নের উত্তরে সর্দার প্যাটেল বলেছিলেন যে তাদের গ্রেপ্তার করা হলে মূল ষড়যন্ত্রীরা সতর্ক হয়ে যেত এবং গা-ঢাকা দিত।

রেহাইয়ের পর

গডসে ভাইয়েরা, আপ্তে এবং কারকারে তারপর ২৬ জানুয়ারি ১৯৪৮ রাতে থানেতে মিলিত হয়ে গান্ধির ওপর দ্বিতীয় হামলার পরিকল্পনা করল।

চার্জশিট থেকে জানা যায়, ২৭ জানুয়ারি নাথুরাম এবং আপ্তে প্লেনে দিল্লি যায় এবং সেখান থেকে ট্রেনে গোয়ালিয়র। গোয়ালিয়রে তারা সেই রাতটা পারচুরের সঙ্গে কাটায়। পারচুরে তার নিজস্ব অস্ত্র তাদের দিতে চায়নি। কিন্তু পারচুরের সহযোগী গঙ্গাধর দন্ডবতে তাদের বলে যে সে তাদের একটা রিভলভার জোগাড় করে দেবে। এভাবেই আগমন ঘটল কর্নেল জোশির রিভলভারের।

এই ৯ মিমি এম১৯৩৪ মডেলের বেরেট্টা রিভলভারটি প্রকৃতপক্ষে ছিল এক বরিষ্ঠ ইতালীয় সেনা অফিসারের। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ইথিওপিয়ায় ছিলেন। কর্নেল জোশির নেতৃত্বাধীন চতুর্থ গোয়ালিয়র ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট ইথিওপিয়ায় এই ইতালীয় কমান্ডারটিকে গ্রেপ্তার করে এবং তিনি আনুষ্ঠানিকভাবেই তাঁর সমস্ত অস্ত্র কর্নেল জোশিকে সমর্পণ করেন। যুদ্ধের পর কর্নেল জোশি গোয়ালিয়রের মহারাজার সামরিক সচিব নিযুক্ত হন।

কর্নেল জোশির থেকে রিভলভারটি যারা এনে নাথুরামকে ৩০০ টাকায় বিক্রি করেছিল তাদের মধ্যে ছিল আর্মস ডিলার জে পি গোয়াল এবং হিন্দু মহাসভার তিন গুরুত্বপূর্ণ নেতা গঙ্গাধর দন্ডবতে, গঙ্গাধর যাদব এবং সূর্য দেও শর্মা। তুষার গান্ধির ‘লেট’স কিল গান্ধি’ বইতে এইসব ঘটনার উল্লেখ আছে, এমনকি এগুলি চার্জশিটেও উল্লিখিত।

নাথুরাম গডসে

মায়ের থেকে শুনেছি, হায়দ্রাবাদে নিজামের বিরুদ্ধে সর্দার প্যাটেলের রণকৌশলে গোয়ালের খুবই গুরুত্ব ছিল। আর ট্রায়াল কোর্টে যে চার্জশিট পেশ করা হয় তাতে তো কর্নেল জোশির এমনকি নামটাও উল্লেখ করা হয়নি কোথাও।

চার্জশিটে দন্ডবতে, যাদব এবং শর্মাকে ফেরার বলে দেখানো হয়। আমার মায়ের কাছে যা খবর ছিল সেই অনুযায়ী যদি মহাসভা সরকার গড়ত, পারচুরে তার প্রধানমন্ত্রী হত, এবং এরা সবাই তার ক্যাবিনেট মন্ত্রী হত।

পারচুরেকে ৩ ফেব্রুয়ারি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, এবং ১৯৪৮-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই দিনেই পারচুরে নাথুরাম এবং আপ্তেকে বেরেট্টা রিভলভার সরবরাহ করার কথা স্বীকার করে নিয়ে গোয়ালিয়রের ম্যাজিস্ট্রেট আর বি অটলের কাছে তার জবানবন্দি দেয়। ট্রায়াল কোর্ট পারচুরেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে পাঞ্জাব হাইকোর্টে আবেদন করে সে ছাড়া পেয়ে যায়। পাঞ্জাব হাইকোর্ট বলে, প্রথমত সে ব্রিটিশ নাগরিক, এবং দ্বিতীয়ত তাকে গোয়ালিয়র থেকে দিল্লি প্রত্যর্পণের বিষয়টিও ঠিকঠাক নিয়ম মেনে হয়নি। পাঞ্জাব হাইকোর্ট এও বলেছিল যে, স্বশাসিত গোয়ালিয়র রাজ্যে ভারতীয় দণ্ডবিধি প্রয়োগ করা যায় না।

সাভারকরের দেহরক্ষী আপ্পা রামচন্দ্র কাসার এবং সেক্রেটারি গজানন বিষ্ণু দামলে-কেও নগরওয়ালা জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। তারা জানায়, এবং সেটি আরও অনেকেই লিখেছেন, ১৯৪৮-এর ১৪, ১৭ এবং ২৪ (বিস্ফোরণের পরের দিন) জানুয়ারি গডসে ভ্রাতৃদ্বয়, আপ্তে এবং কারকারে সাভারকরের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করে। পরে এরা বলে, তাদের নাকি অত্যাচার করে এসব বলিয়ে নেওয়া হয়েছে।

অ্যাডভোকেট জেনারেল চন্দর কিসান দপ্তরি-র নেতৃত্বাধীন প্রসিকিউশন টিম কিন্তু সাভারকরের সচিব এবং দেহরক্ষীকে শমন পাঠায়নি। যে কারণে জাস্টিস জীবনলাল কাপুর কমিশনও কড়া ভর্ৎসনা করে। বলে, এদের দুজনকে শমন দিয়ে তাদের বিবৃতি নথিভুক্ত করলেই সাভারকরের বিরুদ্ধে প্রমাণগুলিকে সম্পূর্ণ করা যেতে পারত।

গোঁড়া সত্যনিষ্ঠ

মা ছিলেন মনস্তত্ত্বের স্নাতক, তিনি ব্যাজ এবং কারকারের সঙ্গে একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি করে ছিলেন এবং তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছিলেন। তিনি ওদের সঙ্গে সন্ধেবেলায় লালকেল্লায় ব্যাডমিন্টন খেলতেন।

হিন্দু মহাসভার আহমেদনগরের প্রধান বিষ্ণু কারকারে ছিল সত্যের জন্য একদম গোঁড়া। সে কারও মিথ্যে বলা সহ্য করতে পারত না, এমনকি তাতে যদি তার নিজের জীবন বিপন্ন হয়— তাও।

বিচারকের প্রশ্নের উত্তরে সাভারকর বলেছিলেন, দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে তিনি ১৯৪৬ সাল থেকেই এই কোনও ষড়যন্ত্রকারীর সঙ্গেই দেখা করেননি। কারকারে আমার মাকে ফিসফিস করে বলেছিল, সাভারকর মিথ্যা কথা বলছেন। সে নিজেই অসংখ্যবার সাভারকরের সঙ্গে দেখা করেছে— নাথুরাম ও গোপাল গডসে, আপ্তে এবং পারচুরের সঙ্গেও তাই।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— ব্যাডমিন্টন খেলতে খেলতে কারকারে আমার মাকে জানায় যে, “গান্ধি, নেহেরু এবং সোহরাওয়ার্দিকে নিকেশ করতে হবে” বলে সাভারকর বলেছিলেন বলে ব্যাজ যে বিবৃতি দিয়েছে, তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য।

বিনায়ক সাভারকর

মা এই কথা প্রসিকিউশন টিমের আইনজীবীদের জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রামাণ্য নথিগুলির মধ্যে এটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

১৯৬৬-র ফেব্রুয়ারিতে সাভারকরের মৃত্যুর পর জাস্টিস জীবন লাল কাপুর কমিশন নগরওয়ালার দেওয়া সমস্ত নথিগুলি পরীক্ষা করে এবং সিদ্ধান্ত টানে— “এই খুনের চক্রান্তের জন্য একমাত্র সাভারকর এবং তাঁর গোষ্ঠীই দায়ী— সমস্ত তথ্যাদি বাকি সব সম্ভাবনাকেই নাকচ করে দিচ্ছে।”

একটি রাজকীয় পরিকল্পনা

সর্দার প্যাটেলের লেখা[12] পড়ে আমার মনে হয়েছে যে, তিনি খুব সতর্কভাবে চরমপন্থী হিন্দু রাষ্ট্র দল-কে তার ধাত্রী সংগঠন হিন্দু মহাসভার থেকে পৃথক করতে চাইছিলেন। আমার মনে হয়েছে সর্দার প্যাটেলের পরিকল্পনা ছিল— হিন্দু মহাসভা হায়দ্রাবাদ এবং অন্যান্য স্বশাসিত রাজ্যগুলিতে নিজেদের কাজ করুক প্রথমে, তারপর তিনি তার ওপরতলার নেতৃত্বকে দুর্বল করে দেবেন এবং কর্মীদের কংগ্রেসে নিয়ে আসবেন।

আমার এও মূল্যায়ন যে, ভি ডি সাভারকরই গান্ধিকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন এ সম্পর্কে নিশ্চিত[13] হওয়ার পর সর্দার প্যাটেল নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যে সাভারকরকে যেন বেনিফিট অফ ডাউট দেওয়া হয়।

বল্লভভাই প্যাটেল

১৯৪৮-এর ২৭ ফেব্রুয়ারি সর্দার প্যাটেল প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকে লেখেন:

“সমস্ত মুখ্য অভিযুক্তরাই তাদের কার্যকলাপের বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছে। … সে-সব বিবরণ থেকে এটা স্পষ্ট যে আরএসএস কোনওভাবেই এর সঙ্গে জড়িত নয়। সাভারকরের নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভার একটি উগ্র ধর্মোন্মাদ গ্রুপ এই ষড়যন্ত্র করে এবং তা কার্যকরও করে। … হ্যাঁ, এটা সত্যি যে আরএসএস এবং মহাসভার যেসব নেতারা তাঁর [গান্ধির] চিন্তাভাবনা এবং নীতির বিরোধিতা করতেন, তাঁরা তাঁর এই হত্যাকাণ্ডকে স্বাগত জানিয়েছেন। কিন্তু এর বাইরে আমার মনে হয় না, অন্তত আমাদের হাতে যা সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে তার ভিত্তিতে, আরএসএস বা হিন্দু মহাসভার আর কাউকে অভিযুক্ত করা সম্ভব বলে…”

প্রসিকিউশন টিমের মধ্যে একটা ফিসফাস শোনা যায় যে নেহেরু নাকি চেয়েছিলেন মহারাজা জিয়াজিরাও সিন্ধিয়াকে নিয়ে তদন্ত হোক।

যাই হোক, সর্দার প্যাটেল কিন্তু এই গান্ধি-হত্যাকাণ্ডে যুক্ত থাকার বিষয়ে নারায়ণ ভাস্কর খারে-কে খুবই সন্দেহ করেছিলেন। খারে হিন্দু মহাসভার আরেকজন সভাপতি এবং আলওয়ার-এর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। ‘এশিয়ান ভয়েস’-এ হরি দেশাই, ‘খারে ভার্সেস নেহেরু’-তে ইন্দিরা মহল, ‘ওয়ার’-এ কান্নন শ্রীনিবাসন সহ আরও অনেকেই বিষয়টি লিখেছেন।

সর্দার প্যাটেলের সঙ্গে খারের সম্পর্কটি জটিল। ১৯৩৭-এ খারে কেন্দ্রীয় প্রদেশ (সেন্ট্রাল প্রভিন্স) এবং বেরার-এর কংগ্রেস-প্রধান হয়েছিলেন। ১৯৩৮ সালে সর্দার প্যাটেল তাকে প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেন এবং কংগ্রেস পার্টি থেকেই বরখাস্ত করেন। খারে তারপর হিন্দু মহাসভায় যোগ দেন।

দেশভাগের সময়ে খারে সর্দার প্যাটেলকে জানিয়েছিলেন যে ২৫ শতাংশের বেশি মুসলিম রয়েছে এমন অনেক রাজপুত রাজ্যকে পাকিস্তান অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব দিচ্ছে। ভি পি মেননের বই ‘স্টোরি অফ ইন্টিগ্রেশন অফ ইন্ডিয়ান স্টেটস’ এবং খারের আত্মজীবনী ‘মাই পলিটিকাল মেময়ারস’— দুই জায়গাতেই এর বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। কিন্তু এরপরই খারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে তিনি আলওয়ার এবং ভরতপুরে দাঙ্গা লাগানোর নির্দেশ দেন, এবং সবার মনোযোগ দক্ষিণে নিবদ্ধ হয়।

নারায়ণ ভাস্কর খারে

১৯৪৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সর্দার প্যাটেল আলওয়ারের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে খারেকে বরখাস্ত করেন এবং আলওয়ারের রাজ জয় সিং-এর সঙ্গে তাঁকে গৃহবন্দি করেন। গান্ধিহত্যায় খারের যুক্ত থাকা নিয়ে সন্দেহ এবং তার সঙ্গেই তাঁর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর অভিযোগের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ। কিন্তু তাঁদের দুজনকেই বিস্তারিত জেরা করে পুলিশ বুঝতে পারে যে গান্ধিহত্যা নিয়ে তাঁদের আদৌ কোনও আগ্রহ ছিল না। চার্জশিটে কখনওই তাঁদের নাম দেওয়া হয়নি।

প্রসিকিউশনের এবং নগরওয়ালা-র দলের অনেক তরুণ সদস্যরা খারের বিরুদ্ধে তদন্তটাকে আসলে একটা চাল মনে করেন। তাঁরা পুনে, আহমদনগর এবং গোয়ালিয়রে যেসব সূত্রগুলি পেয়েছিলেন, সেগুলি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করে যাতে অন্যত্র ব্যস্ত থাকেন সেই পরিকল্পনা করেই এই চালটি চালা হয়েছিল বলে তাঁদের সন্দেহ। নগরওয়ালা গোপাল গডসে এবং নারায়ণ আপ্তেকে গ্রেপ্তার করার আগে পর্যন্ত অনেকদিন খারেকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল।

আমার মূল্যায়ন অনুযায়ী সর্দার প্যাটেলের হিন্দু মহাসভা স্ট্র্যাটেজি সফল হয়েছিলই বলতে হবে। এর সঙ্গে সঙ্গেই গান্ধিহত্যাজনিত কারণে হিন্দু মহাসভার বিরুদ্ধে যে জনমত তৈরি হয় তিনি সেটাকে কাজে লাগিয়ে ইন্দোর, দেওয়াস এবং ধর-এর মতো হিন্দু মহাসভার শক্ত ঘাঁটিগুলিতে কংগ্রেসের প্রশাসন তৈরি করেন। গোয়ালিয়রের সঙ্গে এই জায়গাগুলি মিলেই এর পরে মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের জন্ম হয়।


[1] ‘Godse Gyan Shala’: Hindu Mahasabha opens study centre dedicated to Nathuram Godse in MP’s Gwalior. Times now News. Updated Jan 11, 2021.
[2] Trying to Reopen Gandhi’s Murder Probe is Part of an Orchestrated Campaign of Lies. Tushar A. Gandhi. The Wire. Oct 7, 2017.
[3] Scindias and the Hindu Right. Akshay Chavan. Live History India. March 16, 2020.
[4] Why Savarkar had to be saved. Ravi Visvesvaraya Sharada Prasad. Open. May 22, 2020.
[5] On Death Anniversary, 10 Savarkar Links To Mahatma’s Killing. Sudheendra Kulkarni. NDTV. Jan 30, 2020
[6] Internal Violence: The “Police Action” in Hyderabad. Sunil Purushotham. JSTOR.
[7] Bhaganagar Unarmed Movement. savarkar.org
[8] ৩ নং টিকা দ্রষ্টব্য
[9] দি কালেক্টেড ওয়ার্কস অফ সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। পি এন চোপড়া।
[10] ৪ নং টিকা দ্রষ্টব্য
[11] Savarkar and Gandhis murder. A.G. NOORANI. Frontline. Print edition : October 05, 2012
[12] Collected Works of Sardar Vallabhbhai Patel. P N Chopra. Vol. 13 & 14.
[13] How Savarkar escaped the gallows. A G Noorani. The Hindu. Updated: June 15, 2016.

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...