মাথামোটা

খালিদা খানুম

 

চিনসুরা যখন দ্বিতীয় পক্ষের স্বামীর ঘর থেকে ফেরত এল তখন তার বিয়ের বয়স এক বছরও হয়নি। এক বছর না হলে কী হবে, সে একা ফেরত এল না। এল পেটের মধ্যে একটা ছয় মাসের ভ্রূণ সহ। যখন সে আর তার স্বামী নাজমুল এল, তখন কেউ ভাবেনি সে ফেরত এসেছে।

চিনসুরার স্বামী নাজমুল চিনসুরার সঙ্গেই এসেছিল কাজীপাড়া— যেমন মেয়ে-জামাই আসে। চিনসুরাদের বাড়িতে তার ভারী কদর! হবে নাই বা কেন? ইটভাটার মালিক, আরও কত ব্যবসা। জামাইকে দেখে শশব্যস্ত হয়ে ওঠে চিনসুরার মা। হাঁকডাক শুরু করে।

–কই রে মফি, তোর দুলাভাইকে এক বালতি পানি দে। লতুন সাবান খান আছে ঘরের তাকে, এনে দে। জামাই হাতমুখ ধোক।

মফিদুল চিনসুরার একেবারে ছোট ভাই।

মফিদুল তাড়াতাড়ি টিউবওয়েল চাপতে শুরু করে। চিনসুরার মা একশো টাকা হাতে দিয়ে মফিদুল কে বলে— পানিটা তোর দুলাভাইকে দিয়ে দৌড়ে যাস তো বাপ। একটু মিষ্টি সিঙাড়া আর কটা ফল নিয়ে আসবি।

মফিদুল দুলাভাইকে খুব শ্রদ্ধা করে। তার সামনে ঠিক নিজেকে শালাবাবু লাগে না। লাগে গুরুজন। মফিদুল সালাম দেয়। চিনসুরার মা আলমারি থেকে কাচা লুঙ্গি গেঞ্জি বের করে দেয়। বলে— হটাক এলা। একটা খবর দিয়ে আসতে পারতা।

হঠাৎ এসে পড়া জামাইয়ের আপ্যায়নে খামতি পুরণের জন্য ঘরের লাল মোরগটি ধরার চেষ্টা চালাতে থাকে চিনসুরার মা। উঠোনে খুদ ছড়াতে শুরু করে। সুর করে ডাকে— আ আ আ তি তি তি আ।

চিনসুরার বাপ মোরগটিকে জবাই করার জন্য কাঠের মধ্যে সাদা বালি ছড়িয়ে চাকুতে শান দেয়। বালিতে ঘষা লেগে চাপা আর্তনাদের মতো কিচকিচানি শব্দ করে চাকুটা। তখনই চিনসুরার স্বামী বলে— এইসব করার দরকার নেই। আমি চিনসুরাকে রেখে যাচ্ছি।

তার বলার স্বরে এমন কিছু ছিল, যার কারণে চিনসুরার বাপের চাকুটি ক্ষণিকের জন্য থেমে গিয়েছিল, মায়ের হাতের খুদের স্রোত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে তা ক্ষণিকের জন্য। বালির সঙ্গে চাকু ঘষে ঘষে কিচকিচানি শব্দ তুলতে তুলতে চিনসুরার বাপ বলল— তা সমিস্যা কি বাপ। প্রথম পোয়াতি মেয়ে বাপের বাড়িতেই আতুড় হয়। আমারই ভুল হয়েছে, আগেই খবর করা উচিত ছেল। আসলে কী বাপ, ছেলেপিলেরা কথা শুনে না আজকাল। কবে থেকে আলমকে বলছি চিনসুরাকে দেখে আসতে।

গলা খাকড়ি দিয়ে চিনসুরার স্বামী তার শ্বশুরকে থামিয়ে বলল— চিনসুরাকে আর ভাত দিতে পারব না। আপনার মেয়েকে বিয়ে করেছিলাম নরম সরম বলে। এতদিকের কাজকর্ম আমার, বাড়িতে এসে যদি গরম ভাতটুকু না পাই, তাহলে বৌয়ের দরকার কী?

এমন কথার জন্য প্রস্তুতি ছিল না কারও। কী বলতে হবে ভেবে পাচ্ছিল না চিনসুরার আব্বা মা।

–আপনাদের মেয়েকে জিজ্ঞেস করে দেখেন, কুন দিন গায়ে হাত তুলিনি। ওমন ইতর স্বভাব আমার না। আমার চারটে দোকান, ইটভাটা। নামডাক আছে। কিন্তু ঘরে সুখ নাই। সকালে মুড়ি পানি খেয়ে বেরোতে হয়, দুপুরে ভাত হলে ডাল হয় না, ডাল হলে ভাত হয় না। সামনের মাসে নিকা ঠিক হয়েছে। তারা সতীন ঘরে থাকলে বিয়ে দিতে চাই না। তাই চিনসুরাকে রেখে যাচ্ছি। তালাক দিইনি। যদি মনে করেন দিয়ে দিব।

মোটাসোটা গাল, পুরুষ্টু শরীর। দশজনের কাজ একলা করার ক্ষমতা রাখে, সেলাইফোঁড়াই জানে। সাত দিনে পাঁচ হাত কাঁথা সেলাই করে চিনসুরা। কিন্তু সে কোনও কিছুই গুছিয়ে রাখতে পারে না। কুচি দিয়ে শাড়ি পড়তে পারে না। লোকজনের সামনে মাথার কাপড় পড়ে যায়, শায়া বেরিয়ে যায়। ভাত খাবার সময় খিদে পায় খুব। কুটুমবাড়িতে গেলেও হাপুসহুপুস করে ভাত মেখে খায়। দুমদাম করে পা ফেলে হাঁটে। যেখানে মুচকি হাসার কথা সেখানে দাঁত বের করে হি হি করে। আরও কত কী, যা সব মেয়ের সঙ্গে মিলে না, তাই চিনসুরাকে সবাই বলে মাথামোটা, বুদ্ধি কম।

এই অপরাধেই প্রথম স্বামী তালাক দিয়েছিল বিয়ের এক বছর পর। সেখানেও সমস্যা শুরু হয়েছিল ছয় মাস পর থেকে। নতুন বৌয়ের নাকি লাজলজ্জা নেই, শ্বশুর ভাসুর মানে না, উঁচু গলায় কথা বলে, স্বামী শ্বশুরের যত্নআত্তি করতে পারে না।

দশ হাজার টাকা জামাইয়ের বাপের হাতে দিয়ে চিনসুরার বাপ বলেছিল— আপনারা গিরস্থ মানুষ। গোলা ভরা ধান। কত কুকুর বিলাই খাচ্ছে। মেয়েটাকে খেদাই দিবেন না। একটাই মেয়ে। মানছি উর মাথায় ছিট আছে একটু।

চিনসুরার শ্বশুর বলেছিল— বেয়াই। আমি তো দেখেশুনে আনছি। বৌ-মানুষের অত বুদ্ধির দরকার হয় না। ঘরের খাবে, হেঁসেলের কাজ করবে। এই তো কাজ। কিন্তু বৌমার মোটা হুঁশ মানা যায় কিন্তু লাজশরমের বালাই নাই। নন্দাইয়ের সামনে হাঁটুর উপর কাপড় উঠিয়ে মাছ কুটতে বসে!

–শিখিয়ে পড়িয়ে নিন। গরীবের মেয়ে। ফেলে দিবেন না বেয়াই।

শেখানো পড়ানো শুরু হয়ে গিয়েছিল পরের দিন থেকেই। খেতে না দেওয়া থেকে শুরু, চড় থাপ্পড় কিল দিয়ে শেষ হত প্রতিদিনের শেখানো পড়ানো। পেটের মধ্যে দ্বিতীয় প্রাণ এই সব বুঝত না, ইটভাটার আগুনের মতো আগুন জ্বলত পেটে।

হাতেনাতে ধরা পড়ে একদিন। ছোটননদের পাকাদেখা। বাড়ি ভর্তি লোক। হাঁড়ি ভর্তি মাংস। পাঁচ কেজি মাংস থেকে এক টুকরো খেলে কেউ কিছু বুঝতে পারবে না ভেবে, কষা মাংস হাঁড়ি থেকে এক পিস তুলে রুটির গামলার বাসি রুটির মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল। সে তো মাথামোটা। লুকিয়ে রাখতে পারেনি, ধরা পড়ে গিয়েছিল তার শাশুড়ির কাছে।

–ধুমসি মাগী। শরীলে এত চর্বি তাও এত খিদা লাগে তোর! কাঠ তুলেই পিঠে এক বাড়ি বসিয়ে দিয়েছিল তার শাশুড়ি।

বলেছিল— ছেলে বিয়োতে পারিস যদি রাখব, না হলে বিয়ানোর পরের দিন তালাক পাবি।

ছেলে বিয়োতে পারেনি চিনসুরা। তালাক পেয়েছিল। হঠাৎ করে পায়নি। তিন মাস ধরে তালাক দিয়েছিল তার স্বামী। মোটাহুঁশ চিনসুরা তিন মাসে আর কীভাবে বদলাবে নিজেকে! কোলে কচি বাচ্চা নিয়ে বাপের বাড়ি এসেছিল সে।

নাজমুল সবকিছুই শুনে বিয়ে করেছিল চিনসুরাকে। প্রথম বিয়ের তিন বছর পার হয়ে গেছে তখন। কিস্তিতে সেলাই মেশিন কিনে পাড়ার মেয়ে-বৌদের ব্লাউজ শায়া চুড়িদার সেলাই করত। বাপের ঘরে স্বামীছাড়া বিটি থাকলে বাপের বাড়ির মাটিও ব্যাজার হয়। চিনসুরা কিন্তু খারাপ ছিল না। ধুপধাপ করে হাঁটত, খিলখিল করে হাসত, আর সেলাই মেশিন চালাত।

নাজমুলের বিয়ের বয়স গত হয়েছে অনেক দিন। কী কারণে তার যে বিয়ে করা হয়ে উঠেনি কেউ জানে না। যুবক বয়সে আরবে কাজ করতে গিয়ে পাক্কা দশ বছর পর ফিরেছিল গ্রামে। দশ বছর পর বাড়ি ফিরে নতুন ভাইপো ভাইঝিদের দেখেছিল। ছোটভাইদের ছেলেমেয়ে। সবাই ভেবেছিল ফিরবে না, কিন্তু ফিরেছিল। ফিরেই শুরু করেছিল— ইটভাটার ব্যবসা।

পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে মনে হল সংসার করা দরকার। অভিজ্ঞ মন বলল— সুন্দরী না, নরমসরম মেয়ে দরকার।

চিনসুরার সঙ্গে যখন নাজমুলের বিয়ে ফাইনাল হয়ে গেল তখন চিনসুরার বাপ মা হাতে যেন চাঁদ পেয়েছিল। ঘরে স্বামী-ছাড়ান বিটি যে কত বড় মাথাব্যথা তা তারাই জানে কেবল। চিনসুরার ছোট দুই ভাই। তার মধ্যে আলম বিয়ের লায়েক। কিন্তু সব সম্বন্ধ ভেঙে যায় চিনসুরার জন্য। সোজা করে না বললেও ব্যাঁকা করে বুঝিয়ে দেয় সবাই। আলমের সাইকেল মেরামতির দোকান। যা চলে তাতে চলে যায়। এর থেকে বেশি কিছু স্বপ্ন নেই তার, যার জন্য বিয়ে আটকে থাকবে। কিন্তু চিনসুরার জন্য আটকে যায়।

রাগে বাড়ি মাথায় করে আলম— ভাতার ধরে রাখতে পারিস না? কিসের মেয়েছেলে তুই?

চিনসুরার মা বলে— এমন করে বলিস না। তোর বড় বুন হয়।

–মা আপনি আর কথা বুলেন না। বুন যদি বুনের মতোন হয় তাহলি শ্রদ্ধাভক্তি। মেয়েছেলের শরীল পেয়েছে খালি, বাকি গরুর মগজ।

চিনসুরা সেলাই মেশিন চালায়। ঘড়ঘড় শব্দে আলমের কথা না শোনার চেষ্টা করে।

তার উপরেই তার মায়ের রাগ এসে পড়ে— বেরিয়ে যা হারামজাদি। তোর এই সেলাই মেশিনর ঘড়ঘড়ানিতে আমার মাথার রগ ছিঁড়ে যায়। সারাদিন ঘড়ঘড়। আজদাহা শরীল বুদ্ধিশুদ্ধি কিছু নেই।

নাজমুল বলেছিল— আমার কিছু চাই না, কেবল নরমসরম মেয়ে দরকার।

চিনসুরার চেয়ে বোকাসোকা মেয়ে আর কেই বা হতে পারে। কোনও টাকা লাগল না পয়সা লাগল না— চিনসুরার বিয়ে হয়ে গেল। চিনসুরার বিয়েতে চিনসুরা যত না খুশি হল, তার মা-ভাই-বাপরা খুশি হল আরও বেশি। তার চেয়ে বেশি খুশি হল পাড়াপ্রতিবেশী। প্রতিদিন তারা চিনসুরাকে শ্বশুরঘর করবার পাঠ দিতে থাকল।

–শুন চিনসুরি। বাইরে ঘুরা জামাই। সোহাগ আহ্লাদ করবি ভালো করে। তোর কপাল সোনায় মোড়া যে এমন জামাই কুনো টাকাপয়সা ছাড়ায় পেয়ে গেল তোর বাপ। তোর দাদা দাদীর পূণ্যের ফল। জামাইকে বেঁধে রাখবি। লেবড়িভেবড়ি হয়ে থাকবি না, কাজল টিপ পরে সেজেগুজে থাকবি। বয়স হয়েছে জামাইয়ের তো কী! প্রথম বিয়ে। তোরও নতুন বয়স!

চিনসুরা কিছু বলত না। নতুন পাওয়া অর্ডারের ব্লাউজের ধার সেলাই করত।

আজ যখন নাজমুল তাকে রেখে যাবার কথা বলল তখনও সে কিছু বলল না। তার বেশি কথা বলার দোষ। কিন্তু আজ কোনও কথা বলতে ইচ্ছা করছে না তার। বলার মতো কিছু পাচ্ছেও না। হয়তো স্বামীর পা ধরে কান্নাকাটি করা দরকার। কিন্তু চিনসুরার নাম কি আর মাথামোটা এমনি এমনি হয়েছে। যা করা দরকার তা সে কোনও দিনই করতে পারেনি। ঘরে গিয়ে বাইরের শাড়িজামা ছাড়তে শুরু করল। মোটা শরীরে গরম লাগে বেশি। বাইরে তার বাপ কথা বলছে তার স্বামীর সঙ্গে। তার মা ফুঁপিয়ে কাঁদছে। চিনসুরা শুনছে সবই।

প্রথম পক্ষের মেয়ে টগর এসে জড়িয়ে ধরে তাকে।

–ছাড় ছাড় শাড়িখান পরতে দে। বলতে বলতে শাড়ি না পরেই তাকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করে।
–মা কী এনেছ? ব্যাগে কী আছে? নতুন আব্বাদের বাড়ি নাকি অনেক বড়? আমাকে নিয়ে যাবা ওখানে?
–তোর ল্যাগে তোর পুতুল আনছি। খেলবি? টগরকে জড়িয়ে বলে চিনসুরা।
–কই কই, দাও। টগর চৌকির উপর রাখা ব্যাগ খুঁজতে শুরু করে।

চিনসুরা টগরকে কাছে টেনে নিয়ে পেটে হাত বুলিয়ে বলে— এখানে আছে রে। ওখানে খুঁজিস কী ল্যাগে।

টগর হাঁ করে তার মাকে দেখে। তার মা কী বলে, সে কিছুই বুঝতে পারে না। ভাগ্যিস সে মাথামোটা কথার মানে জানে না, না হলে বলে উঠত— তুমি এত মাথামোটা ক্যানে!

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3604 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. বাহ্, একেবারেই অন্যরকম গল্প। মাথামোটা চিনসুরা। এমন চরিত্রের অনেক মেয়েই গ্রামগঞ্জে দেখা যায়। কিন্তু এদের নিয়েও যে গল্প লেখা যায়, এই ভাবনাটাতেই চমৎকারিত্ব আছে। চলতে থাকুক এমন লেখা।

Leave a Reply to হীরক সেনগুপ্ত Cancel reply