সতর্কতায় ঢিলে দেওয়া যাবে না কোনওমতেই

অনিকেত চ্যাটার্জি

 



চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্নাতক, সমাজকর্মী

 

 

 

কোভিড নাইন্টিন। নাইন্টিনের শেষদিকে এল, টুয়েন্টির গোটাটা কপ্ করে গিলে নিল আতঙ্ক, বিধিনিষেধ আর অপদার্থতার কন্ডিমেন্ট দিয়ে, টুয়েন্টিওয়ানে আবার একবার এল। সে কী আগমন! শহর হোক বা গ্রাম, প্রত্যেক বাড়িতে মৃত্যুভয়। মড়ক লেগে গেল, একমাসেরও কম সময়ের মধ্যে প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে হাসপাতাল-ভর্তি বা মৃত্যু ঢুকে গেল, ইস্যু হয়ে উঠল অক্সিজেন-সিলিন্ডার-বেড-ডেক্সামিথাসোন! তার আগে পর্যন্ত বলে বলে মুখ ব্যথা হয়ে গেলেও জনগণের ভ্যাক্সিনভীতি দূর করা যায়নি, এই ভয়ঙ্কর পিরিয়ডটা ভ্যাক্সিন নিয়ে সেই অনীহা-অবিশ্বাস-ইতস্ততবোধ অনেকটাই কাটিয়ে দিল। লোকজন খুঁজে খুঁজে ভ্যাক্সিন নেওয়া শুরু করলেন।

তাহলে? এই অক্টোবরের শেষে দাঁড়িয়ে কোভিড টুয়েন্টিওয়ানের অবস্থাটা কী?

আগে দেখি তথ্য। কোভিডের খবর রাখা, কেসের কাউন্ট দেখা— এটারই যদি একটা গ্রাফ করি আমরা, তাহলে হয়তো একটা সাইন কার্ভ দেখতে পাব! কোভিড শুরুর সময় রোজ দেখা হত সার্চ করে করে, তারপর বছরের শেষদিকে আর দেখা হত না, আবার সেকেন্ড ওয়েভের সময় হাঁ করে আমরা দেখলাম কেস কীভাবে ৪০ হাজার থেকে ৪ লাখের পাহাড়ে চেপে গেল।

যাইহোক। আজ ভারতে নতুন কোভিড কেসের সংখ্যা ১২৮৩০, সাতদিনের গড় ধরলে ১৩৯৭৬। আজ পশ্চিমবঙ্গে নতুন কোভিড কেস ৯৮০, সাতদিনের গড় ধরলে ৯৩৩।

অর্থাৎ কেসের সংখ্যা দেখে একটু আশ্বস্ত হওয়াই যায়। উৎসবের দিনগুলো পেরিয়ে আরও কয়েকটা দিন কেটে গেল, সতর্কবাণী এক কানে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দিয়ে জনগণ ঘুরে বেড়ালেন থুতনিতে মাস্ক রেখে, কিন্তু যেরকম আশঙ্কা করা হয়েছিল সেরকম কেস বাড়ল না।

এটার খুব সোজাসুজি একটা কারণ কিন্তু ভ্যাক্সিনেশন। ভ্যাক্সিন লোকজন নিয়েছেন, নিচ্ছেন খোঁজ করে। সরকারও মোটামুটি ভ্যাক্সিন দেওয়ার চেষ্টা করছে, তার যাবতীয় দুর্নীতি-অপদার্থতা-অবহেলাকে সঙ্গে নিয়েই।

ভারতে মোট ভ্যাক্সিন দেওয়া হয়েছে ১০৬ কোটি ১৪ লক্ষ ৪০ হাজার ৩৩৫টা ডোজ। যদিও এর মধ্যে ফার্স্ট ডোজ পেয়েছেন ৭৩ কোটি ১৬ লক্ষ ও তার থেকে অনেক কমে দাঁড়িয়ে সেকেন্ড ডোজপ্রাপ্ত নাগরিকের সংখ্যা, ৩২ কোটি ৯৮ লক্ষ।

সেকেন্ড ডোজের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে সরকারের নজর দেওয়া উচিত, দ্রুত।

লোকজনের মোটামুটি ভরসা এসেছে ভ্যাক্সিনের ওপর, ভ্যাক্সিন নিলে রোগের তীব্রতা কমে, রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কমে— এটা বুঝেছেন অনেকেই।

সরকার জনস্বাস্থ্যের প্রতি অন্ধ, কোভিড সচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগ বলতে শুধুমাত্র পোস্টার-ব্যানার-টিভি অ্যাড, মাস হেলথ এডুকেশনের কথা কেউ বলেও না কেউ শোনেও না। তারপরেও জনগণ ভ্যাক্সিনমুখী হচ্ছেন, এটা আশারই কথা।

কলকাতা শহরে বাইরে বেরোলে, মেট্রো বাসে চাপলে লোকজন মোটামুটি মাস্ক রাখছেন মুখে। জেলায় সচেতনতা আরেকটু কমের দিকে, আর গ্রামের দিকে তো করোনা বলে কোনও রোগই নেই!

মাস্ক পরা এবং মাস্ক মুখে ঠিক পজিশনে রাখা, এই জিনিসটা রোজ দৈনন্দিন জীবনে করে যেতে হলে দুটো জিনিসের একটা লাগে। হয় কন্টিনিউয়াস অ্যাক্টিভ ইনপুট ও এফোর্ট দেওয়া, নইলে আকাশে ঘনিয়ে আসা মৃত্যুভয়। দ্বিতীয় পদ্ধতিটার মুশকিল এই, যে তার সঙ্গে অনেকটা প্যানিক, অনেকটা অহেতুক ভয় আর মিসইনফর্মেশন মিশে থাকে। তাই সবসময় প্রথমটাই বাঞ্ছনীয়, কিন্তু সেটা যাদের করার কথা, সেই সরকার কোভিডের বরাদ্দ টাকা নয়ছয় করতে বেশি উৎসুক। তাই দায় শেষমেষ এসে পৌঁছল জনগণের কাছে।

কোভিড, ভ্যাক্সিন, ওয়েভ, চিকিৎসা এসব নিয়ে কথা বলতে গেলেই কথা যথার্থভাবেই ঘুরে যায় সমাজ, শ্রেণির মধ্যে পার্থক্য, সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থার বেহাল অবস্থার দিকে।

এদিকে রাজ্য সরকার আবার সমস্ত সরকারি হাসপাতালে ‘স্বাস্থ্যসাথী’ কার্ড দেখিয়ে ভর্তির মতো গোলমেলে দিকে পা বাড়াচ্ছে, জানি না কী জন্য এরকম আত্মঘাতী পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে। যাইহোক..

শেষে কয়েকটা কথা। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের কোভিড সিসিইউ কিন্তু ভর্তি এখন, ননকোভিড সিসিইউকে তাই আবার কোভিড সিসিইউ করা হল। কাল বেরিয়েছে এই নোটিস। তার মানে কোভিড কিন্তু হয়ে যাচ্ছে, কিছু রোগী গুরুতর অসুস্থ হয়ে সিসিইউতে ভর্তিও হচ্ছেন।

কেসের সংখ্যা যতই হোক, সেই মানুষটা হতে পারেন আপনি বা আপনার বাড়ির কেউও। তাই সতর্কতায় ঢিলা দেবেন না বেশি।

বাইরে বেরোলেই মাস্ক রাখুন মুখে-নাকে, হাতে বা কবজিতে বা থুতনিতে বা পকেটে রাখলে কোভিড কিন্তু আটকানো যায় না, এটা মনে রাখবেন। ভিড় জায়গায়, পরিবহনে অবশ্যই মাস্ক পরুন, বারবার হাত দিয়ে ওঠানো নামানো করবেন না। হাঁচতে কাশতে হলে মাস্ক খুলে কাশবেন না। এটা হবে ঘরে হেলমেট পরে বসে থেকে বাইকে উঠে হ্যান্ডেলে ঝুলিয়ে রাখার মতো ব্যাপার! কথা মাস্কের মধ্যে দিয়ে ভালোই বলা যায় এবং শোনা যায়, এটাও বুঝে নিন। গোড়ায় গলদ রাখবেন না।

আর বাইরে থেকে ঘরে ফিরে হাত মুখ সাবান দিয়ে ভালো করে ধোবেন। আপাতত এটুকু করে উঠতে পারলেই যথেষ্ট হবে হয়তো।

একটু সতর্ক থাকলেই হয়তো আটকে দেওয়া যাবে থার্ড ওয়েভের জুজুকে। একটু না হয় চোখ-কান খোলা আর নাক-মুখ বন্ধ রাখি আমরা?

ভ্যাক্সিন নিয়ে নিন। সাবধানে থাকুন। সিডিসি বলছে ভ্যাক্সিন না নেওয়া লোকেদের হসপিটাল অ্যাডমিশনের পার্সেন্টেজ প্রায় ৮৩, আর ভ্যাক্সিনেটেডদের সেখানে সংখ্যাটা ৪.৫। (লেখ দ্রষ্টব্য)

সাবধানে। একটু সাবধানে। কোভিড থেকে যাবে সঙ্গী হয়ে এখন, তাকে রূদ্ররূপ ধারণ করতে দেওয়া যাবে না আর কোনওমতেই!

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...