প্রক্সি

অপরাজিতা ভট্টাচার্য

 

–গাছগুলোতে জল দিয়ে, ছাদটা ঝাঁট দিয়ে তবেই বাজারে যেও। তোমাকে তো আর সময়ে অফিসে হাজিরা দিতে হবে না। কাজদুটো করে তবেই বেরিও। আর একটু তাড়াতাড়ি নেমো ছাদ থেকে।

কথাগুলো বাবা রোজ সকালে বলবে। চাকরি করলেও যে গাছে জল দিয়ে, ছাদ ঝেঁটিয়ে বেরোনো যায়, তা বাবাকে বলতে ইচ্ছে করে না। ছেলে যে গুড ফর নাথিং তা বোঝাতেই যে বাবা রোজ সকালে কথাগুলো বলে এত্তেলা দেয়, তা বোঝার মত বুদ্ধি বাবলুর আছে।

গাছে জল দিতে সত্যিই বেশি সময় লাগে না। ওই যে পাশের বাড়ির ঠাকুমাকে তেল মালিশ করিয়ে ছাদে বসিয়ে যায় ঠাকুমার আয়া। ঠাকুমা সকালের মিঠে রোদ পোহায়। বাবলুকে দেখে ফোকলা গালে হাসে। সে সময় পাড়ার বয়েজ আর গার্লস স্কুল থেকে প্রার্থনাগান ভেসে আসে। বাবলুর মনে হয়, ঠাকুমা হাসে না। গানের তালে সূর্যমুখী ফুল হাসছে। এসবেই দেরি হয়।

–কোনওমতে বেঁচেবর্তে থাকার জন্য, করে খাওয়ার মত কিছু একটা কাজ জোটাতে পারলেই যথেষ্ট। তোমাকে নিয়ে তো কোনও উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। নিজেরটা যদি চালাতে পারো সেটাই অনেক। আমার জমানো টাকার সুদ পাবে। সে ব্যবস্থা করে রেখেছি। তোমার বোন তো বিচক্ষণ। বাড়িভাড়া দিলে সে টাকাও তোমাকেই দিতে বলেছে। বাড়ির ভাগ অবশ্য মেয়েকে আমি দেব। সেটা সে নেবে।

বাবলু ভেবে পায় না, বোনের এই পরামর্শ দেওয়ার মধ্যে কোন বিচক্ষণতা আছে। কিন্তু পাঁচ বছর বয়সে মেনিনজাইটিস হয়েছিল এবং তারপর থেকে বুদ্ধি মোটা হয়ে গেছে। কোনও প্রশ্ন করা তার সাজে না। এমনটাই জেনে এসেছে বাবলু। তবু মা যদ্দিন বেঁচেছিল, ততদিন টুকটাক প্রশ্ন করত বাবলু।

–আর্টস নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছ একবারে, এই অনেক। কলেজে আর ভর্তি হয়ে কাজ নেই। অত পড়া মনে রাখতে পারবে না। মাও তো নেই যে পিছনে লেগে থেকে নোটস মুখস্থ করাবে। বিএ পরীক্ষা উতরোবে না। মাথা কাটা যাবে আমার। লোকে কী বলবে! বাবা কলেজে ইংরেজি পড়ায়, ছেলে কলেজ ডিঙোতে পারল না। তার চেয়ে দেখি দোকান টোকানের কিছু ব্যবস্থা করা যায় কিনা। বাবার কথাগুলোর কোনও উত্তর দেয়নি বাবলু। কিন্তু কলেজে পড়ার ইচ্ছে ছিল খুব। ততটা আস্থাও ছিল না নিজের ওপর যে বাবাকে বলে— আমি ঠিক পাশ করব দেখো।

কলেজে ভর্তির টাকাটা বাবা খরচ করতে চায়নি। অথচ বোনও তো গড়পড়তা রেজাল্টই করেছে বরাবর। ইংলিশে মাস্টার্সও করেনি। বাবা চিরটাকাল অপার সম্ভবনা দেখে গেল বোনের মধ্যে। আর বাবলু ন্যালাক্যাবলা, করে খেতে পারলেই অনেক।

মে জুনের আগুনমুখ দুপুরগুলোতে বাবলু অনেক কিছুই ভাবে। ভাবার জন্য অবশ্য জায়গাটি খাসা। বাবালুদের বাড়ি থেকে হাঁটা পথেই মেয়েদের বড় হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল। স্কুলের পাশেই একটা দোকানঘর কিনেছে বাবলুর বাবা। পাঠ্য বই, গল্পের বই থেকে শুরু করে খাতা, পেন, পেন্সিল, স্কেল, টিফিন বক্স ওয়াটার বটলও পাওয়া যায়। সেই দোকানেই বসে বাবলু। হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারে এলিয়ে বসে থাকে। দুপুরে সচরাচর কেউ আসে না। টিনের চালের গরমও খুব। কিন্তু বাড়ি যাওয়াতে নিষেধ বাবার। বাড়িতে ঘুমিয়ে পড়লে, বিকেলে স্কুলফেরত ছাত্রীরা জিনিস পাবে না।

বর্ষাবাদলায় বা শীতের দুপুরে রেডিও শোনে বাবলু। কিন্তু গ্রীষ্মে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ফ্যানের হাওয়া গরম, বাইরে থেকেও গরমের হলকা। গান শুনতে ইচ্ছে করে না। দোকানের সামনের তেঁতুলগাছের ছায়ার কারুকাজ দোকানের মেঝেতে দেবে যায়। অবসন্ন শরীরে, বিহ্বল হয়ে আসমান-জমিন এক করে কত কী ভাবে সে।

এই যেমন খোকার কথা। ছোটবেলায় খোকার সঙ্গে তেমন ভাবসাব ছিল না। মা বারণই করত খোকার সঙ্গে মিশতে। খোকা নাকি ছোটতেই বখে গেছে। বাবলু পাড়ার বেঙ্গলি মিডিয়ামে পড়েছে। ক্লাস সেভেনে খোকা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ফেল করে বাবলুদের স্কুলে ভর্তি হয়। সেকশান আলাদা ছিল খোকার। সে সেকশানে সব ফেলু পার্টিরাই পড়ত।

–খোকা তোর চেয়ে পাক্কা দুবছরের বড়। নাইনে পড়ার কথা, পড়ত সেভেনে। তাও ফেল করল। বাড়িতে পড়াশোনার চাষ থাকা চাই। বাপ মায়ের পেটে তো বিদ্যে নেই। বড় মুদির দোকান, অঢেল বিক্রি, কাঁচা টাকা। তা দিয়ে কি আর পড়াশোনা হয়? তোর মাথা না থাকলেও রোজ পড়ানো হয় বলে, তুই বাধ্য বলে, সব সাবজেক্টে ভালোই পাশ করিস। খবরদার মিশবি না খোকার সঙ্গে। সাবধান করত বাবলুর মা।

ক্লাস নাইন থেকেই খোকার সঙ্গে কথা বলত বাবলু। মাকে জানাত না। বাবলুর দোতলার ঘর থেকে কোনাকুনি দেখা যেত খোকার ঘরের জানলা। বাবলুর একটা বেশ হিরো ওয়ারশিপ ছিল খোকার প্রতি। তখনই খোকার দশাসই চেহারা। শিস দিতে পারে, সিটি দিতে পারে, ভাসানে নাচতে পারে। ডান হাতে সোনার রিস্টলেট, গলায় সোনার চেইন। পালসার বাইক চালায়। কত খিস্তিও জানে খোকা। মেয়েদের নাঙ্গা ছবিও দেখায় বাবলুকে।

খোকার মত ডাকাবুকো, হিরো টাইপ হতে ইচ্ছে করে। বাবলুর সরু বুকের খাঁচা, নির্জীব চোখমুখ, উঁচু দাঁতের পাটি, পাতলা চুল। খোকার ভালো নাম জয়। আহা, পালসার যেন পক্ষীরাজ, রাজার কুমার যেন জয়।

এক দুপুরে খোকার ঘরে বাবলুর বারমুডা টেনে নামিয়ে দিয়েছিল খোকা। কিন্তু বাবলু অনেক ভেবে দেখেছে সে তো বাবলুর ভালোর জন্যই। খোকার কৌতূহল উদ্রেক হয়েছিল, বাবলুর সব ঠিকঠাক কাজ করে কিনা।

খোকা, বাবলুর সেবার মাধ্যমিক পরীক্ষা। জানুয়ারি মাসের শীতের দুপুরে বাবলুর খুব ভয় করছিল। বাবলুর মা শয্যাশায়ী। বাবা কলেজে, বোন স্কুলে, মায়ের কাছে আয়া। মা মরে যাবে এই ভয়ে কুঁকড়ে বাবলু খোকাদের বাড়ি যায়। খোকা ছাড়া আর কাউকে সে মায়ের জন্য মন খারাপের কথা বলত না।

–ধুর শালা। ব্যাটাছেলেরা কি কাঁদে? দাঁড়া দেখি আগে তুই ছেলে কিনা। বলেই এক ঝটকায় বাবলুর বারমুডা টেনে নামিয়ে দিয়েছিল খোকা।

মা বাঁচবে না এই আশঙ্কায় বেশ একটু কাঁদলে বাবলুর হালকা লাগে। যার কাছে কান্না, সেই হ্যান্ডজব করে বাবলুকে দেখিয়ে দিল, দ্যাখ রে শালা দ্যাখ। কী বেরোল। টাইমিংও হেব্বি। আমার ভয় ছিল তুই আবার… যাক গে… মন খারাপ হলে নিজেই করে নিবি। হালকা লাগবে।

দুপুরটা বাবলুকে হতভম্ব করে দিয়েছিল। খোকাকে ছাড়াতে পারেনি। জানুয়ারির দুপুরে আরও বেশি যেন শীত করছিল। তবে কিছুক্ষণের জন্য কান্না পায়নি। বাবলুর মা তখন খুব অসুস্থ, বাঁচেওনি। উচ্চমাধ্যমিকের আগেই মারা যায়। কিন্তু বাবলুর ওইভাবে হালকা হতে ইচ্ছে করেনি কখনও।

এই যে বাবলুর বাবা, বাবলুর বিয়ে ঠিক করেছে, সে আসলে বাবলুর ভবিষ্যতের কথা ভেবে তো নয়। রান্নার মাসি মাইনে বাড়াতে বলেছিল।

–রিটায়ার্ড মানুষ আমি। কত আর টানব। তুমি তো আর কোনও ভার নিতে পারবে না। তোমার বিয়ের জন্য মেয়ে দেখেছি। আমাদের গ্রামের বাড়ির কাছেই থাকে। গরীবের মেয়ে। তোমার সঙ্গে বিয়ে হলে বর্তে যাবে। তুমিও বর্তাবে। গ্রামে যেতেও হবে না। ওদের এক আত্মীয় থাকে কলকাতায়। ওখান থেকেই বিয়ে হবে। আমি কথা বলে নিয়েছি। এই দেখো ফটো। দেখতে শুনতে খারাপ না। মাধ্যমিক পাশ, নাম শুক্লা। কলকাতার জল পেটে পড়লে রং রূপ খোলতাই হবে আরও। রান্নার লোক, তোলা কাজের লোক আর রাখব না। গ্রামের মেয়ে, ঠিক পারবে সব কাজ করতে। তাছাড়া ও তো জানবে, ওর বর তেমন রোজগেরে নয়। মেয়েদের স্কুলটায় যে ঘুগনি, পাউরুটি, চা দেয় সে আর কাজ করবে না। শুক্লাকে ওখানে কাজে লাগাব ভেবে রেখেছি। দোকান আর টিফিন সাপ্লাই করে ভালোই আয় হবে। এমনি এমনি এই সম্বন্ধ দেখিনি।

ছোট থেকে আজ অবধি বাবার কোনও কথায় বাৎসল্যের স্পর্শ পায়নি বাবলু। বাবার চক্ষুশূল সে। অহেতুক ফুট কেটে বিদ্ধ করে বাবা। মেনিনজাইটিস রোগের জন্য বাবলু হয়ত অন্য অনেক কিছুর মত বিয়ের যোগ্যও নয়। এমনটিই ভাবত সে। বউকে সুখী করতে পারবে না। কিন্তু সেই সার্টিফিকেট দিয়েছিল খোকা। পাড়াটাকে ভালোবেসে বেশ কাটে তো তার। বিয়ের প্রয়োজন পড়েনি। কিন্তু বাবার প্রয়োজন মাস খরচ বাঁচানো। বাবলু আপত্তি করলেও ধোপে টিকত না।

যে মেয়েটিকে বাইকের পিছনে বসিয়ে খোকা ইদানিং উড়ছে, সে বাবলুদের পাড়ার বেঙ্গলি মিডিয়াম স্কুলেই পড়ে, ইলেভেনে। নাম জিনিয়া। বাবলুর দোকান থেকে বার কয়েক খাতা, পেন কিনেছে। বাবলুর দিকে সমীহের চোখে তাকায় জিনিয়া। এমনটি কেউ তাকায় না। জিনিয়াকে খোকা বলেছে বাবলুর কথা। জিনিয়াদের স্কুলে বাবলু অর্ডার সাপ্লাই করতে যায়। করিডরে বাবলুকে দেখে সম্ভ্রমের হাসি হেসেছে জিনিয়া। বাবলুর বোন কোনওদিন এমন হাসেনি। জিনিয়া খোকার বিপরীত। নম্র, ধীর। এদের মিলমিশ কী করে হয় সেও বাবলু ভাবে দোকানে বসে। শুক্লা কেমন হবে কে জানে! অবজ্ঞাই করবে নিশ্চয়ই বাবলুকে। বাড়িতে এসেই তো দেখবে বাবা, বোন তাকে কেমন হেয় করে।

–তুই রাজি হয়ে গেলি শালা? কত হবে তোর বয়স? চব্বিশ? তুই আমার চেয়েও ছোট। বাবা বললেই বিয়ে করতে হবে? বাপের গোলামি তো ছিলই। এবার বউয়ের গোলামিও করবি। আমাকে দেখ। এটা মস্তির টাইম। জিনিয়াকে বিয়ে করব। কিন্তু সে ঢের দেরি। এবার পুজোয় ভাবছি রিসোর্টে নিয়ে যাব। এখনও টাইম আছে, বাপকে বল পরে হবে বিয়ে। বোর হয়ে যাবি দেখিস। চাইলে তোর জন্যও একটা ডবকা মাল তুলতে পারি। তুইও যাবি রিসোর্টে। ফুর্তি কী জানলি না, বিয়ে।

বাবলুদের বাড়ির গা দিয়ে কানা, সরু একটা গলি গেছে। পাশাপাশি দুটো মানুষ যেতে পারবে না। সেই গলিতে খোকা জিনিয়াকে চুমু খেয়েছে ভর সন্ধেবেলা। দোতলার ঘর থেকে দেখেছে বাবলু। জানলা এঁটে দিয়েছে। খোকা রাজার কুমার, ভাল নাম জয়। সব পারে সে। বাবলু পারবে কোনওদিন?

শুক্লার আচরণ অপ্রত্যাশিত। বাবলু ঠিক বিশ্বাস করতে পারে না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাবলুর কী চাই, না চাই তা নিয়েই মেতে থাকে শুক্লা। বাবলু তো নিজেই ঠিক জানে না তার কী চাই। কীভাবে চাইতে হয়। এমন পরিচ্ছন্ন জামাকাপড় কোনওদিন পরেনি সে। এমন থালা সাজিয়ে খেতে কেউ দেয়নি তাকে। তার জন্য কেউ অপেক্ষা করেনি মা মারা যাওয়ার পর। বিকেলে দোকানে গিয়ে ফ্লাস্কে চা, বিস্কুট দিয়ে আসে শুক্লা। বাবলুর মনে হয় শুক্লা নিশ্চয়ই তাকে ছেড়ে চলে যাবে। বাপের বাড়ি গেলে আর ফিরবে না। কিন্তু শুক্লা বাপের বাড়ি যাওয়ার নাম করে না।

বিয়ের মাস তিনেকের মধ্যে দুর্গাপুজো এসে গেল। বিয়ের পর হনিমুন তো দূর, কোথাও যায়নি বাবলু আর শুক্লা। কাঠবেকার না হলেও বউকে নিয়ে তিন চারদিন বেড়াতে যাওয়ার মুরোদ নেই বাবলুর। বাবলুর হাতে তো একটা টাকাও থাকে না। বাবার হাতে সব। বাবা বলবেও না ঘুরতে যাওয়ার কথা। বাড়ি সামলাবে কে? শুক্লাও তো বড় সন্তুষ্ট এতেই। দুর্গাপুজোর অপেক্ষায় ছিল ওরা। চারদিন বেড়াবে দুটিতে। শহরের পুজো দেখেনি শুক্লা। পাড়ার পুজোটার রমরমা বেড়েছে। ওখানেই চারদিন খাওয়াদাওয়া, বাবার খাবার নিয়ে আসবে শুক্লা। শুক্লার একটু কাজ কমবে ভেবে বাবলুর ভালো লাগে।

সন্ধিপুজো দেখার খুব শখ শুক্লার। রাত আটটা নাগাদ এবার সন্ধিপুজো। খোকাকে তো পাওয়া যাবে না। অষ্টমীর সকালেই জিনিয়াকে নিয়ে রিসোর্টে যাওয়ার কথা। খোকা বলেছিল অষ্টমীর দিন ফোন সুইচ অফ রাখবে। বিয়ের আগে খোকার সঙ্গে কথা বলার জন্য মুখিয়ে থাকত বাবলু। এখন তেমনটা নয়। শুক্লাকে দেখেই কেটে যায় সময়।

শুক্লা বলেছিল এ মাসে তার পিরিয়ড হয়নি। হয়ত নতুন কেউ আসছে। যদিও ডাক্তার বদ্যি, পরীক্ষা কিছুই করা হয়নি। মণ্ডপের ভিড়ে মাথা ঘুরে গা-বমি ভাব হচ্ছিল। সন্ধিপুজো দেখা হল না। বাবলুর হাত ধরে বাড়ি ফিরে চোখে মুখে জল দিয়ে শুয়ে পড়ল শুক্লা। রাতের খাবার বাবলু পরে গিয়ে নিয়ে আসবে।

ঢাক বাজছে, গমগম করছে পাড়া। জানলায় গিয়ে দাঁড়ায় বাবলু। নতুন শাড়ি পরেই শুয়ে পড়েছে শুক্লা। উজ্জ্বল টিপ সিঁদুর, এলানো আঁচলে শুক্লাকে কী যে সুন্দর লাগছে। ঘুমন্ত মুখে যেন ঠাকুরের ঘামতেলের লাবণ্য। দুর্গাঠাকুরের চেয়ে কম কী! জানলায় দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে থেকে থেকে দেখছে বাবলু। বাবলুর খুব ইচ্ছে করে ঐ কানা গলিটায় খোকার মত করে শুক্লাকে চুমু দেয়। বেশ প্রেম প্রেম হবে। কিন্তু বাবলুর কম্ম নয়। তাছাড়া ওসব গার্ল ফ্রেন্ডকেই মানায়, বউকে নয়। বোকা হলেও বোঝে বাবলু। দোকানের পাশাপাশি অন্য কিছু করে রোজগার বাড়াতে হবে। তাহলে বাবাকে বলতে পারবে অন্তত ঘর মোছা, বাসন মাজার লোক রাখার কথা। এত কাজের ধকল নিতে পারবে না শুক্লা। ভাবতে ভাবতে গলিটায় তাকায় বাবলু। খোকা থাকলে হয়ত জিনিয়াকে চুমু খেত আজ গলিতে।

–প্লিজ প্লিজ প্লিজ। একটা সুযোগ দাও, একটা একটা। একবার শোনো আমার কথা। আর কোনওদিন বলব না এমন। ফোন কেটো না প্লিজ… হ্যালো হ্যালো… একটা ছায়ামূর্তি ফোনে রীতিমত কাঁদছে গলিতে। বাবলু নিচে তাকিয়ে দেখে। হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায় বাবলুর। বিয়ের আগে বহুবার নিজেকে দেখেছে গলিতে। লাল গোলাপ হাতে হাঁটু মুড়ে বসে প্রোপোজ করেছে। প্রেয়সী প্রত্যাখ্যান করে চড় মেরে চলে গেছে। গোলাপ হাতে বাবলু কাঁদছে। কত রাতে যে ভেবেছে এমন।

সন্ধিপুজো নিশ্চয়ই শুরু হয়ে গেছে। বাবা বলে, এই সময় শুভবুদ্ধি, শক্তি জাগ্রত হয়। তোমার তো বুদ্ধিই নেই। তোমার আবার জাগরণ। ছায়ামূর্তিটা দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষণ। পিছিয়ে পিছিয়ে গলির দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়ল। কাঁদছে, ভয়ানক কাঁদছে। দু হাতে চুলের মুঠি ধরে কাঁদছে। কোনওদিন এমন কথা আর বলতাম না। রিসোর্টে যাওয়ার কথা বলতাম না আর কোনওদিন। নিজের পায়ে দাঁড়াব। বাবার পয়সায় ফুটানি মারব না। তুমি বিশ্বাস করলে না। জিনিয়া… জিনিয়া…

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3695 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...