একজন ও এবং ওদের আখ্যান

একজন ও এবং ওদের আখ্যান | প্রবুদ্ধ ঘোষ

প্রবুদ্ধ ঘোষ

 

এখন ফিরে যেতেই হবে। যে রেলট্র্যাক ধরে যে হাইওয়ে ধরে স্যানিটাইজারের মতো গড়িয়ে এসেছিল, সেই পথগুলো দিয়েই ফেরা। অবশ্য স্যানিটাইজার ফুরোলে খালি কৌটো ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার নিয়ম। পনেরোজন আসতে আসতে তিনজন মারা গেছিল। ট্রাকের পেটিতে তেরপলে মোড়া ছিল, তাতে বমি করে ট্রাক ভাসাল আরও দুজন। একুশ ঘণ্টা। তিনহাজার টাকা। তারপর আবার হেঁটে। নয়ডায় কমপ্লেক্স হচ্ছে। বাইশশো স্কোয়ারফিটের ফ্ল্যাট। সুইমিং পুল। রিক্রিয়েশন হল। একটা হোর্ডিং দেখেছিল, মানসিক অস্থিরতা কমাতে যোগা, ওই কমপ্লেক্সেই। বুকিং চলছিল। দুমাসের মাইনে বাকি। মে মাসে বোনাস দেবে বলেছিল। কন্ট্র্যাক্টরের তিন নম্বর মেয়ের অন্নপ্রাশন। সব ছেড়ে, দুমাসের মাইনে ছেড়ে, বোনাস ছেড়ে, দুটো প্যান্ট ছেড়ে, তাকের ভেতরে দুটো নিব ছেড়ে, রান্নার হাঁড়ি আর থালা ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল। কমপ্লেক্সের সুইমিং পুলের নিচে নীল টাইলস বসছিল তখন। পঞ্চাশ বছর আগে ওর ঠাকুর্দা সব ছেড়ে এসেছিল— এরমই হাঁড়ি-থালা-ধুতিশার্ট-কুলুঙ্গির ঠাকুর আর একটা বাজপোড়া নারকেল গাছ। ফিরতে পারেনি আর। কিন্তু, ওকে তো ফিরে যেতেই হবে। কমপ্লেক্স তৈরির কাজটা আর নেই। কন্ট্র্যাক্টর সুইচ অফ করে পালিয়েছে। এবার ওরা নজন যাচ্ছে আবার। ইন্দোরে।

সেই এক দেবতা— সর্বব্যাপী তাঁহার চক্ষু, বিশ্বময় তাঁহার মুখ— সর্বময় তাঁহার হাত এবং পা— তিনি বাহুদ্বারা স্বর্গকে সম্যকরূপে স্থাপন করিয়া, পদদ্বারা মর্ত্য-পাতাল সৃষ্টি করিয়া এক অদ্বিতীয়রূপে বিরাজ করিতেছেন। হে বিশ্বকর্মা! হে যজ্ঞভাগগ্রাহী! আপনার যে সকল উত্তম ও মধ্যম ও নিম্নবর্তী ধাম আছে, যজ্ঞের সময় তাহা আমাদিগকে বলিয়া দিন। আপনি নিজে নিজের যজ্ঞ করিয়া নিজ শরীর পুষ্ট করুন…

সাড়ে পাঁচমাস টিঁকে গেছে ঠিক। ভাবলেই আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে ও নিজেই। ভোরবেলা কোলে মার্কেট থেকে সবজি কিনে আনা। সেন্টুর সঙ্গে ভ্যানে করে বেরিয়ে পড়া। সেন্টু বেলেঘাটার সবচে বড় রং কারখানার পার্মানেন্ট ভ্যানচালক ছিল। প্যাডেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মাল দিয়ে আসত বাগুইআটি, সল্টলেক, লোহাপুল, মল্লিকবাজার। পাঁচমাস সেন্টুর প্যাডেলে সকাল আটটা থেকে একটা কমপ্লেক্সগুলো আর বেপাড়ায় বেপাড়ায় সবজি বিক্রি— খ্যাদানি খেতে খেতে, দরদামে মুখচুন হতে হতে, শেষবেলায় কোনও কাঁচা বাজারুকে ঠকানোর চাপা খুশিতে। বিকেলে আর সেন্টুকে নিত না, একাই স্যানিটাইজার সাজিয়ে বসত খালপোলের ঢালুর ওপরে ফুটপাতে। তেরপল পেতে, পঞ্চাশটা কৌটোয় স্যানিটাইজার সাজিয়ে। ‘শিপ্রা কেয়ার’ নাম, বৌয়ের নামেই দিয়েছিল, যদি পয় হয়। বৌ আর ছেলে বাড়িতে বানাত। শিপ্রারও দুটো কাজ চলে গেছিল এপ্রিলের শুরুতেই। মাসের শুরুতে ডেকে হাফ-টাকা দিয়ে বলেছিল, খবর দেব আবার! খবর আসবে না সেটা জেনেই গেছিল ওরা। স্যানিটাইজারের সঙ্গে মাস্ক। মাস্কগুলো ও কিনত নায়েকদার থেকে। গেঞ্জির কলে ঝাড়াইবাছাই মাল দিয়ে বানাত। প্রথম দুসপ্তাহ ছ টাকা করে লাভ করেছিল এক একটা মাস্কে। তারপর আর কেউ নিল না সেরম, ওই তিনটে বা চারটে বড়জোর। সন্ধেবেলা শিপ্রা কড়াই আর স্টোভ নিয়ে পাঁচুদার দোকানের পাশে বসত। ওই বলেকয়ে ম্যানেজ করেছিল, চায়ের সঙ্গে কোনও খদ্দের যদি দুটো বেগুনি বা আলুর চপ খায়! পাঁচুদার হাসিটা ও জানত ভালোই, রদ্দি মস্করাগুলো করে শিপ্রাকে তাতাতে চাইত। তবু, শিপ্রা ঠিক ম্যানেজ করে নিত। ম্যানেজ করে নিত? জুনের ভরবিকেলে শিপ্রার ঠোঁটের কোণটা কেটে গেছিল, মাথার ঠিক রাখতে পারেনি ও। পাঁচুদার নাকি ক্যাপসিকামের চপ খাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে। হাতবাক্স শালা। কিন্তু, পাঁচুদাকে চটালে শিপ্রাকে আর বসতে দেবে না দোকানের পাশে। এদিকে মাস্ক আর স্যানিটাইজারের বিক্রি প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। বসাই সার। খদ্দের কই? বেগুনি-আলুরচপ-ধনেপাতার চপ থেকে তাও পঞ্চাশ-ষাট উঠছিল। শিপ্রার ঠোঁট ফাটিয়ে দেওয়ার পরে একটা পাঁইট ঠুকেছিল। বোতলের দাম বেড়ে গেছে পঁচিশ টাকা। নিজেদের তৈরি স্যানিটাইজারের একটা কৌটো খুলে খেয়ে নেবে ভেবেছিল, কিন্তু ভেতরের মালটা যে ভেজাল তা ওর থেকে ভালো আর কেই বা জানত! মরত না, দুদিন পেট ছেড়ে দিত শুধু। তবে, টিঁকে গেছে এরম করে সাড়ে পাঁচমাস। আশ্চর্য লাগে আয়নার সামনে চুল আঁচড়াতে গিয়েও।

###

 

এই অভিশাপ শুনি ঘৃতাচী তখন/ তারে অভিশাপ দিলা হয়ে ক্ষুব্ধমন
বিশ্বকর্মা দেব তুমি নিজকৃত পাপে/ পৃথিবীতে জন্ম লহ মম অভিশাপে
স্বর্গভ্রষ্ট হয়ে তুমি মানবী-উদরে/ শিল্পকর্ম করিবেক সবার গোচরে…
বিশ্বশিল্পী ব্রহ্মা তারে করে শিক্ষাদান/ অধ্যয়ন করাইলা শাস্ত্র ও পুরাণ

ঘৃতাচী ও বিশ্বকর্মা পরস্পরের শাপে মর্ত্যে পতিত হয়। বহু বিপত্তি পেরিয়ে তাদের নটি সন্তান হয়। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ শিল্পকার্যে মহাজ্ঞানী ও দক্ষ। কিন্তু, ভাগ্যের ফেরে দুরবস্থায় পড়ে। শিপ্রা যে দুটো বাড়ির কাজ ছেড়েছিল, পায়নি। একটা ফ্ল্যাটে বুড়ো-বুড়ি থাকত, অসুখে মারা গেছে। অন্য বাড়িটায় সেই যে বলেছিল খবর দেব আবার দরকার হলে, সেই দরকার তাদের আর হয়নি। পাঁচুদার দোকানের পাশ থেকে সরে গেছিল শিপ্রা। জুলাইয়ের শুরু। ক্যাওড়াপাড়ার মোড়ে যে নতুন ফ্ল্যাটবাড়িটা হচ্ছিল, তার সামনের ফুটপাথে। এক টাকা করে দাম বাড়িয়েছিল তেলেভাজার। মিথ্যে বলতে নেই, বিক্রি আগের থেকে বেশি। লোকের মাস্কও আলগা হচ্ছিল যে! নব্বই-একশো তাও শনি-রবিবারে আর বাদলার দিনে। ঘেঁটুর সঙ্গে রফা করতে হয়েছিল একটা, হপ্তায় দেড়শো টাকা; ওই ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে বসার ভাড়া। ঘেঁটু এ পাড়ার মস্তান। তিনবার দল বদলেছে। পাঞ্জাবি পায়জামা পরে এসি অফিসঘরে বসে। প্রোমোটারি থেকে সিন্ডিকেট বা পার্কিং স্পেস থেকে টাকা নেওয়া— ঘেঁটু অবশ্য নিজের হক বলেই মনে করে। হপ্তায় দুশো টাকা করে চেয়েছিল, শিপ্রা আর ও গিয়ে হাতেপায়ে ধরে দেড়শোতে রাজি করিয়েছে। শর্ত মানতে ওর আর খারাপ লাগে না। প্রথম দুটো চাকরি ছেড়েছিল শর্ত মানবে না বলেই। প্রথমটা এই শহরেই। বারোতলা কমপ্লেক্স তৈরি হচ্ছিল দুটো জলা বুজিয়ে। কন্ট্র্যাক্টর ওদের সেফটি-কিট দিচ্ছিল না। বলেছিল, ওসব এখানে চলে না। রোজে চল্লিশ টাকা এক্সট্রা দিচ্ছি। ওতেই হবে। ও রাজি হয়নি। এক সপ্তাহের মাথায় ছেড়ে দিয়েছিল। ঘেঁটু যখন শর্ত দিয়েছিল, যবে আবার কাজে যাবি, ছ মাস টেন পার্সেন্ট ক’রে আমায় দিবি, মেনে নিয়েছিল। ও ছোটবেলায় মায়ের কাছে গল্প শুনেছিল, যে সয়, সে রয়!, সয়ে নিয়েছিল সবই। ঘেঁটুকে মনে মনে খুব খিস্তি মারতে মারতে মুখে বলেছিল, শিববাবু, আমাদের বাড়িওয়ালা, চার মাসের ভাড়া বাকি, চাইছে, একটু দেখো না বলে, দশহাজার টাকা চারমাসে… পারব না দাদা, একটু দেখো না। ঘেঁটু ওর হাত কচলানো দেখে খুশি খুশি হেসে শিপ্রার দিকে তাকিয়েছিল। ও জানে যে, শিববাবু লোক ভালো, হাসিখুশি। গম্ভীর হয়ে টাকার কথা বলেছিল। আসলে, শিববাবুর বিজনেসও বন্ধ চার মাস। ওঁর বৌয়ের রক্তের রোগ, চিকিৎসার খরচ আছে। ভাড়ার টাকা আর ওই বিজনেস দিয়ে শিববাবুর চলে। আর, শিববাবু তো ওর মতো স্যানিটাইজার নিয়ে বা তারকের মতো পাঁউরুটি-বিস্কুট নিয়ে মোড়ের মাথায় টুল পেতে বসে পড়তে পারবে না! তাই মরিয়া হয়ে ওর কাছে বাকি ভাড়ার কথা তুলেছিল। এই তো, দিয়ে দেব। আগে কখনও বাকি রেখেছি, বলুন? ছেলেটার একটু শরীর খারাপ…

###

 

যিনি বিশ্বকৰ্ম্মা, তাঁহার মন বৃহৎ, তিনি নিজে বৃহৎ, তিনি নির্মাণ করেন, ধারণ করেন, তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ, এবং সকল অবলোকন করেন; সপ্তঋষির পরবর্তী যে স্থান, তথায় তিনি একাকী আছেন, বিদ্বানগণ এইরূপ কহেন; সেই বিদ্বানগণের অভিলাষ অন্ন দ্বারা পরিপূর্ণ হয়…

জ্বর ওর এসেছিল। মে মাসের মাঝামাঝি। ঘুসঘুসে জ্বর। শিপ্রাকে খুব খিস্তি দিয়েছিল শুঁটকিতে স্বাদ হয়নি বলে। সহদেবের থেকে সস্তায় কিনেছিল বটে, কিন্তু কোনও স্বাদ পাবে না তাই বলে? দুমাস পরে মাছ কিনেছিল। মাঝে দুবার কাদা চিংড়ি। আর, দুদিন ছাঁট মাংস কিনেছিল। ওদের শালা দারুণ বিক্রি। দুশো কুড়ি টাকা কেজি! হেবি লাভ। আধঘণ্টা দোকানে কার্তিকের কাছে ঘ্যানঘ্যান করে, এতোলবেতোল কটা গল্প করে আড়াইশো গ্রাম ছাঁট পেয়েছিল। পাঁচ টাকা দাম কমিয়েছিল। সহদেবের থেকে ধারে কিনেছিল। তা, সেই শুঁটকিতে স্বাদ-গন্ধ না পেয়ে মাথা গরম হয়ে গেছিল। ঘুসঘুসে জ্বর আর কাশি। শিপ্রা বলেছিল ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে, সরকারি হাসপাতালে বিনাপয়সার টেস্ট হয়। কিন্তু, ভরসা হয়নি। পাড়ায় নকুলের কেসটা তো দেখেছিল। নকুলের রোগ ধরা পড়ার পরে ওর বাড়ির সব্বাইকে একঘরে করে দিয়েছিল। ঘেঁটু এসেছিল দলবল নিয়ে হুমকি দিতে। নকুলের অটো তখন বন্ধ, রোজগারপাতি নেই। সবজি বেচতে বেরোচ্ছিল, তাও বন্ধ করিয়ে দিল। ওর বৌকে আর মাকে খুব গালাগালি করে দুদিন বাড়ির বাইরে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিল ঘেঁটুরা। মুখার্জিবাড়িতেও নাকি ধরা পড়েছিল দুজনের। বড় নার্সিংহোমে ছিল দু হপ্তা। ওর রোগ ধরা পড়লে যদি এরম করে ধোপানাপিত বন্ধ করিয়ে দেয়? যদি শিববাবু তাড়িয়ে দেয় এসে? বরুণদা বলেছিল যে, রোগ হলেই নাকি আলাদা ঘরে চলে যেতে হয়, আলাদা বাথরুম ব্যবহার করতে হয়! ও ভয় পেয়েছিল অভির জন্যে, সবে সাড়ে আট। আড়াই হাজার টাকা ভাড়ায় একটাই ঘর, লাগোয়া রান্নাঘর আর, একটাই বাথরুম। কোথায় আলাদা করবে নিজেকে? ঘরে পাঁচটা প্যারাসিটেমল-৫০০ ছিল, অনেক আগের। সেটাই খেয়েছিল তিনদিন। অভিরও জ্বর এসেছিল, নাক দিয়ে জল ঝরছে। জুলাইয়ের একুশ তারিখ। নীলকমল ডাক্তারের থেকে ওষুধ এনেছিল।

জ্বর কত? একশো। খাবারে স্বাদ পাচ্ছে? আর, গন্ধ? হ্যাঁ, মানে বলল বিস্বাদ লাগছে, কিন্তু গন্ধ পাচ্ছে বোধহয়। টেস্ট করাতে নিয়ে যাও, বাইশশো টাকা নিচ্ছে এখন। হ্যাঁ, যাব, আপনিই একটা ওষুধ তৈরি করে দিন না, ও তো বরাবর আপনার ওষুধেই… হাওয়াটা তো ভালো নয়, বুঝলে কিনা, দেখো দুদিন এই শিশির ওষুধটা দুদাগ করে দিয়ে, তবে টেস্টটা করিয়ে নিও কিন্তু… (শেষ কথাটা নীলকমল ডাক্তারের মাস্কের মধ্যে দিয়ে কেমন গমগম করে বেরিয়েছিল)। হ্যাঁ হ্যাঁ, আসলে, ডাক্তারদা, এই স্যানিটাইজারটা রাখবেন? ঘরে বানানো। রোগীদের বলবেন যদি কেনে, আপনার কাছে কতজন আসে…

###

 

বিশ্বকর্মা বিশ্বভুবন নির্মাণ করেন। বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, ইন্দ্রের বজ্র, কুবেরের অস্ত্র ও কার্তিকেয়র শক্তি তিনিই সৃষ্টি করেছেন। স্বর্গের দেবপুরী, কুবেরের অলকাপুরী, শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকাপুরী, জগন্নাথের বিগ্রহ, রাবণের স্বর্ণলঙ্কা, শিবের ত্রিশূল— তাঁরই সৃষ্টি। মার্কণ্ডেয় পুরাণে তিনি দেবীকে অভেদ্য কবচ প্রদান করেছিলেন।

ওর বগলের পাশে, পিঠের বাঁদিকে এখনও জ্বালা জ্বালা করে। নয়ডা থেকে ওরা হেঁটে আসার সময়ে একজায়গায় সবাইকে আটকেছিল পুলিশ। আরও কতজন ওদেরই মতো, আটকে রেখেছিল সবাইকে। পনেরো-কুড়ি জন করে সার দিয়ে বসানো হচ্ছিল। পাড়ায় পাড়ায় যেমন মশা মারার তেল দিয়ে যায় ড্রেনে, তেমনই একটা মেশিনে করে কী একটা ছড়িয়ে দিচ্ছিল গায়ে। সারা গায়ে প্লাস্টিকের জোব্বা পরা দুজন লোক। যাদের গায়ে দিচ্ছিল, তারা চিৎকার করছিল। দাঁড়িয়ে থাকা বাকিদের ডাণ্ডা দেখাচ্ছিল পুলিশ। স্যানিটাইজ হো রাহা হ্যায়, ভিরাস ফৈল না যায়ে। ওদেরও পনেরোজনের দলে বসানো হয়েছিল। দুটো মেয়ে, কোলে বাচ্চা, খুব চেঁচাচ্ছিল। মেশিন থেকে ওর গায়ে পড়তেই চিড়বিড়িয়ে জ্বলে উঠেছিল পিঠ আর বগলের পাশে। ভাগ্য ভালো, তখনই ক্যামেরা নিয়ে দামি জামাকাপড়ের কজন এসে চেঁচামেচি জুড়ে দিয়েছিল। ওর কানে এসেছিল ব্লিচিং পাউডার শব্দটা। এখনও জ্বালা জ্বালা করে। অভি হাত বুলিয়ে দেয়। অভিকে বলেনি ব্লিচিং ছড়ানোর কথা, শিপ্রা জানে কাজের জায়গায় অ্যাসিডে পুড়েছে। বুড়োকে বলেছিল শুধু সত্যিটা। বুড়োরও ওরম একটা ঘা হয়ে গেছিল। ওর বাবার জন্যে ওষুধ কিনতে বেরিয়ে কোমরে লাঠির দাগ নিয়ে ফিরেছিল। একটা উঁচু বাড়ির ছাদ থেকে রংগোলা জল ঢেলে দিয়েছিল ওর ওপরে। লকডাউন ভেঙে বেরিয়েছে, দেখো!? এই ছোটলোকগুলোই ভাইরাস ছড়াচ্ছে। বুড়ো ওষুধ কিনতে পারেনি। ও সোনার দোকানে কাজ করত, আন্ধেরিতে। বাবা অসুস্থ বলে ছুটি নিয়ে এসেছিল, মার্চের শুরুতে। সব বন্ধ হয়ে গেছিল আচমকা, ফিরতে পারেনি। বুড়োর বাবার চিকিৎসাও বন্ধ হয়ে গেছিল এনআরএস হাসপাতালে। পুরনো প্রেসক্রিপশন দেখিয়েও পুলিশের লাঠি কোমরের ওপর। পরের মাসে আন্ধেরি না ফিরলে শেষ হয়ে যাব শালা!— বুড়ো এখন মাছ নিয়ে বসে বাজারের বাইরের ফুটপাতে। ওর থেকেই লাল হয়ে যাওয়া এলিয়ে পড়া কাদা চিংড়ি কিনেছিল ও। শিপ্রা রেঁধেছিল। আড়াইদিন ওটা দিয়েই তিনজনের ভাত নেমে গেছিল! পরশু রান্নাপুজোর ইলিশ কিনতে গিয়ে ব্লিচিং পাউডার আর জ্বালা মনে পড়েছিল ওর। শিববাবু বলেছিল, আর মাত্র কয়েকটা মাস, টিঁকে থাকতে পারলেই হল!

###

 

সিজুয়া পর্বতে মনসাদেবীর নগর পত্তন করেন বিশ্বকর্মা। বেহুলার অভেদ্য বাসরকক্ষে ছিদ্রও রাখেন তিনিই। তিনি সূর্যের প্রখর উজ্জ্বলতার এক-অষ্টমাংশ কর্তন করেন। তাঁরই পুত্র নল সমুদ্রবক্ষে সেতু নির্মাণ করেন। গ্রীষ্ম শেষের মেঘে বর্ষার মধ্যে দিয়ে বিশ্বকর্মাই শস্যভার রক্ষা করেন। সকল অভীষ্টপূরণকারী হে বিশ্বকর্মা, আপনাকে প্রণাম!

অভির স্কুল বন্ধ মার্চ থেকেই। ক্লাস থ্রিতে উঠেছে। বুদ্ধি আছে! ও আর শিপ্রা ঠিক করেছিল মে থেকেই বেড়াবাগানের সংশপ্তক ক্লাবে ভর্তি করে দেবে; ওরা দাবা শেখায়, মাসে পঞ্চাশ টাকা নেয়। শিপ্রা যে বাড়িটায় এখনও ঘর মোছা আর বাসন মাজার কাজ করছে, সেই বাড়িতে দাবাখেলা দেখেছিল অভি। বোসপাড়ার রকে কানাইদার কাছে দুদিন শিখেছিল, কানাইদা বলেছিল ওর বুদ্ধি আছে, খেলা হবে। স্যানিটাইজার বানাতে অভিও সাহায্য করে। ওই কৌটো ধুয়ে দেওয়া, লেবেল সেঁটে দেওয়া। শিপ্রা গয়না নিয়ে গেছিল বড় দোকানে, লোন নিতে। গয়না দিয়ে লোন নেওয়া যায়, একথা রাজার কাছে শুনেছিল। রাজা ম্যাসেজ করায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে, কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে, ফিজিও করাই। বড়লোক ক্লায়েন্ট ছিল ওর দু-চারজন। দামি গিফট দিত। মার্চের পর আর ডাকেনি ওকে। রাজা জানত যে, ছুঁলেই ভাইরাস ঢুকে যায় না, কিন্তু ক্লায়েন্টদের বিশ্বাস করাতে পারেনি। ভ্যাকসিন তৈরি হলেই সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে আগের মতো। চাপ নিস না। জুনের শেষ দিকে বলেছিল রাজা। আগস্টের প্রথমেই গয়না বন্ধক রেখে চল্লিশ হাজার টাকা নিয়েছিল। শিপ্রাও গেছিল ওই অফিসে, হাজার পঁচিশ মতো পেয়েছিল। শিববাবুকে তিনমাসের ভাড়া দিয়েছিল। সবজি আর স্যানিটাইজারের ব্যবসা যতই ছোট হোক, বেশ কিছু টাকা লেগেছিল ওখানেও। ধার মিটিয়েছিল অনেকটা। ও নিজে খুব চেষ্টা করেছিল যদি এখানে কাজ পাওয়া যায়। কিন্তু, সবখানেই তো কাজ বন্ধ। বজবজ থেকে একটা কাজের খবর এসেছিল জুলাইয়ের শেষে। ছোট কাজ। কিন্তু, যাবে কী করে? ট্রেন কই? পুরনো ডায়েরিতে লেখা নম্বরগুলো খুঁজে আগের কন্ট্র্যাক্টরদের ফোনও করেছিল। কোত্থাও কিছু হয়নি। ওরা এখন কম লোক নিয়ে কাজ করছে, লোকাল লোকেদের কাজে নিচ্ছে। শিপ্রা ও আর অভি এই পাঁচ মাসের যে কোনওদিন ভাইরাসে মরে যেতে পারত, অপমানে বিষ খেতে পারত কিংবা অন্য কোনও অঘটন। তবু কোনও এক অলৌকিক জীবনে রয়ে গেল ঠিক।

আজই লালন ফোন করেছিল। কাজ আছে, ইন্দোরে। সে কোথায়? দূরে আছে, মধ্যপ্র… ছাড়, তুই চিনবি না, আমাদের সঙ্গে চল। কত দেবে, কে নিয়ে যাচ্ছে এবার? সে আছে, তুই চল না, ওখানে ব্যবস্থা হয়ে যাবে ঠিক। শ্যামদাস দুমাসের মাইনে দেবে বলেছিল, বোনাস… দেবে না আর, না? ছাড়্‌, ও আর পাওয়া যাবে না, ফোন স্যুইচ অফ্‌। এটায় চল, খারাপ দেবে না, নইলে ওখানে অন্য কারও কাছে কাজ পেয়ে যাবি। ওঃ, আচ্ছা। ১৭ তারিখ বেরনো কিন্তু, হাওড়ায় দাঁড়াবি। আচ্ছা, শিপ্রা বলছিল, ভাদ্রসংক্রান্তির দিন না বেরিয়ে পরের দিন যদি… ন্যাকামি করিস না, হাওড়া, ১৭ তারিখ, ১১টা।

###

 

‘ও’-র কোনও নাম নেই। থেকেই বা কী হবে? আধার আছে, ক্ষিধে আছে। ওদের দিকে তাচ্ছিল্যের বিস্কুট, ব্লিচিং আর রুটি ছুঁড়ে দেওয়া আছে। ও-র নাম বিশ্বকর্মা দিলে গল্পটা বড্ড প্রেডিক্টেবল জোলো হয়ে যায়। আমাদের পবিত্রস্তোস্ত্র বা বাস্তবতার সঙ্গে মেলেও না। তার চেয়ে ও যাক আবার নিজের কাজে। কাজ খুঁজতে, কাজ করতে, কাজ খোয়াতে। ওর, ওদের কোনও তথ্যই রাষ্ট্র বা আমরা খুঁজে পাব না। আর, তথ্য না পাওয়া গেলে সে তো কাল্পনিক, সে তো গল্প। গল্পটা চলতেই থাকে। আমাদের স্যানিটাইজার ফুরিয়ে আসে। মাস্ক নেমে আসে নাকের নিচে, গলায়। ও তখন কোনও ট্রাক থেকে নেমেছে। মোট নজন। আকাশে ঘুড়ি উড়ছে খুব। মাধবদার ছেলে খুশিতে ডগমগ হয়ে বলেছিল, কারখানা বন্ধ তাই দূষণ কমেছে অনেক। আকাশে তাই কি এত ঘুড়ি দেখা যাচ্ছে? নকুল বলেছিল ঘুড়ি বানাচ্ছে বাড়িতে, পুজোর দিন বিক্রি হবে নিশ্চয়ই অনেক! কোথাও রান্নাপুজোর ইলিশ ভাজা হচ্ছে। আজ ভাদ্রের শেষ দিন। সূর্য আরও তেজ বাড়াচ্ছে। ও তখন হাঁটছে। গতকালের বাসি রান্না খাওয়া হয়েছে সকালে, পরের খাবার কখন ঠিক নেই। ব্যাগের মধ্যে যন্ত্রপাতি, গামছা, দু’টো জামা-প্যান্ট, তিনশো সত্তর টাকা, হিসেবের ডায়েরি। ক্ষিধের মতো জীবন। এই লৌকিক রেস্ত নিয়ে অলৌকিক জীবন নিয়ে ওরা টিঁকে থাকছে ঠিক, থাকছেই।

 

রচনাকাল- ১লা সেপ্টেম্বর, ২০২০

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3909 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...