আবার লকডাউনের ভ্রূকুটি: শিবঠাকুরের আপন দেশে

দেবব্রত শ্যামরায়

 



রাজনৈতিক ভাষ্যকার

 

 

 

আবার সে এসেছে ফিরিয়া। কোভিড ৩.০ এবং তার পিছু পিছু আবার একটি ঘাতক লকডাউন। যিশু দিবস থেকে শুরু করে ইংরেজি নববর্ষে মোচ্ছব পালনের লাগামছাড়া অনুমতি দিয়ে জনগণের অভ্যেস খারাপ করে, অতর্কিতে ‘আংশিক লকডাউন’ ঘোষণা করে দিলেন মাননীয় সরকার বাহাদুর। এ যেন শাসকের এক ধরনের বিকট স্যাডিস্ট ছলনা— তিন অভিযুক্তকে মুক্ত করে, হেসে হাসিয়ে, পরিস্থিতি সহজ করে দিয়ে ঠিক পরের মুহূর্তে যেমন সোল্লাসে তাদের গুলি করে মারেন গব্বর সিং।

৩ জানুয়ারি ২০২২ থেকে পশ্চিমবঙ্গবাসীর ওপর কী কী বিধিনিষেধ আরোপ করা হল, তা এক ঝলকে দেখে নেওয়া যাক।

  • স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাদান সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে৷ শুধুমাত্র ৫০ শতাংশ কর্মচারীর উপস্থিতিতে প্রশাসনিক কাজকর্ম চালু থাকবে।
  • সরকারি ও বেসরকারি সমস্ত প্রতিষ্ঠানে ৫০ শতাংশ হাজিরা সহ কাজ চালু থাকবে। কর্মীদের যতদূর সম্ভব বাড়ি থেকে কাজ করতে (work from home) উৎসাহিত করা হবে।
  • সুইমিং পুল, স্পা, জিম, বিউটি পার্লার ও সেলুন ইত্যাদি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হল।
  • বিনোদন কেন্দ্র, পার্ক, চিড়িয়াখানা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হল।
  • শপিং মল না মার্কেট কমপ্লেক্স সর্বাধিক ৫০ শতাংশ গ্রাহক সীমা নিয়ে চালু থাকবে এবং রাত দশটায় বন্ধ করে দিতে হবে।
  • রেস্তোরাঁ, পানশালায় ৫০ শতাংশ গ্রাহকের প্রবেশের অনুমতি বলবৎ হল। রাত দশটায় বন্ধ করে দিতে হবে।
  • সিনেমা হল ও থিয়েটার ৫০ শতাংশ দর্শক নিয়ে চালু থাকবে ও রাত দশটায় বন্ধ করে দিতে হবে।
  • সভা, সমিতি, সম্মেলন ইত্যাদি অনুষ্ঠানে সর্বাধিক ২০০ জন আমন্ত্রিত থাকতে পারেন, অথবা সভাগৃহের ৫০ শতাংশ আসনসংখ্যা পূর্ণ থাকতে পারে, এই দুইয়ের মধ্যে যে সংখ্যাটি কম, সেটি মেনে চলতে হবে।
  • যেকোনও সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ৫০ জনের বেশি আমন্ত্রিতের অংশগ্রহণের অনুমতি নেই।
  • বিবাহ অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য, ৫০ জনের বেশি অতিথিকে আমন্ত্রণের অনুমতি নেই।
  • শ্মশানে, কবরস্থানে বা শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে সর্বাধিক ২০ জনের লোকের অংশগ্রহণের অনুমতি রয়েছে।
  • লোকাল ট্রেন পরিষেবা বসার আসনসংখ্যার ৫০ শতাংশ যাত্রী নিয়ে চলাচল করবে ও সন্ধে সাতটার পর বন্ধ হয়ে যাবে।
  • মেট্রো চলাচল স্বাভাবিক থাকবে তবে ৫০ শতাংশ যাত্রী নিয়ে চলাচল করবে।
  • অত্যাবশকীয় সেবা ও প্রয়োজন ছাড়া রাত দশটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত যান চলাচল ও জনসমাগম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ৷
  • দুয়ারে সরকার শিবির একমাসের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হল এবং তা আবার পয়লা ফেব্রুয়ারি থেকে চালু হবে।
  • মাস্ক পরা ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।

এছাড়াও ব্রিটেন থেকে আসা সমস্ত বিমানে জারি হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। বিমানযাত্রীদের আরটিপিসিআর টেস্ট বাধ্যতামূলক। ঝুঁকিপূর্ণ দেশ থেকে বিমান অবতরণ সাময়িকভাবে বন্ধ। মুম্বই, দিল্লি থেকে কলকাতায় বিমান নামবে সপ্তাহে ২ দিন— সোমবার ও শুক্রবার।

আপাতত ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত গোটা রাজ্যে এই সমস্ত বিধিনিষেধ বলবৎ থাকবে।

 

২.

 

আমরা দেখতে পেলাম, রাজ্য সরকারের নিষেধ বিজ্ঞপ্তির সবচেয়ে প্রথম নির্দেশিকাটি ছিল শিক্ষাক্ষেত্রের প্রতি, এবং কীভাবে আক্ষরিক অর্থে আবারও চরম আঘাত হানা হয়েছে স্কুল-কলেজের পড়ুয়াদের ওপর। গত দু বছর যাবৎ রুদ্ধ শিক্ষাঙ্গন এবং শিশুমনের গঠনে ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে তার প্রভাব নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এই অতিমারি ও শিক্ষাঙ্গন নিয়ে একাধিক নিবন্ধ প্রকাশ পেয়েছে অক্টোবর ২০২১-এর প্রচ্ছদকাহিনিতে। সেই সংখ্যায় প্রকাশিত শ্রী চন্দ্রকান্ত লহরিয়া-র লেখা থেকে পাচ্ছি ইউনেস্কোর একটা হিসেব, যা বলছে, প্রতি এক মাস স্কুল বন্ধ থাকলে দু মাসের শিক্ষার ক্ষতি হয়। এই হিসেব অনুযায়ী বিগত ২২ মাস স্কুল বন্ধ থাকার অর্থ শিশুরা প্রায় ৪৪ মাস পিছিয়ে গেল। এই পিছিয়ে যাওয়ার মূল্য কীভাবে চোকাবে তারা? এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক একটি বিশ্লেষণে দেখিয়েছে যে পড়াশোনায় এক বছর বিরতির অর্থ সেই ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ উপার্জন ৯.৭ শতাংশ কমে যায়। পাশাপাশি, সারা পৃথিবীতে কোভিড সংক্রমণের ঝোঁক লক্ষ করলে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে সবচেয়ে কম সংক্রমণের শিকার হয়েছে কমবয়সিরা অর্থাৎ স্কুল-পড়ুয়ারা। তাদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা অতি নগণ্য। শিশু যদি সুস্থ-সবল হয়, তাহলে বয়সের তারতম্য অনুযায়ী তাদের সংক্রামিত হওয়ার সম্ভাবনা একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের তুলনায় ১০০ থেকে ৮০০০ ভাগ কম। সবদিক বিচার-বিবেচনা করে, ২০২০ সালের জুলাই মাসে একটি যৌথ বিবৃতিতে ইউনিসেফ এবং ইউনেস্কো বলে যে, স্কুল হচ্ছে সেই জায়গা যেখানে কোভিড সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপিত হওয়া উচিত সবার শেষে, এবং বিধিনিষেধ শিথিল পর্বে সেগুলিকেই খোলা উচিত সবার আগে। কিন্তু আমরা বঙ্গবাসীরা কী দেখলাম? সারা দেশে নানা রাজ্যে স্কুল কিছু মাস আগে থেকে সচল হলেও আমাদের রাজ্যে পড়ুয়ারা এখনও অবধি স্কুলে আসার সুযোগ পেল না। এ মাসের ৩ তারিখই কোভিড বিধি মেনে সারা রাজ্যে স্কুল খোলার দিন ধার্য হয়েছিল, অথচ পরিহাস এমনই যে ঠিক সেদিন থেকেই স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পুনরায় বন্ধ করার নির্দেশ বলবৎ হল।

অথচ বিদ্যালয়-কলেজে প্রায় সমস্ত শিক্ষকের টিকাকরণ ইতিমধ্যে সম্পন্ন। ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সিদের টিকাদানও শুরু হতে চলেছে। আগে থেকে সঠিক পরিকল্পনা করে রাখলে, কোভিড বিধি মেনেই নির্দিষ্ট সংখ্যক পড়ুয়া নিয়ে স্কুলে পঠনপাঠন সম্ভব। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা সেসব নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজনই মনে করলেন না। মাথা ঘামালেন না, দীর্ঘ দু-বছর ধরে স্কুলে আসতে না পারা, বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে পড়া বাচ্চাটির মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে। শিক্ষাঙ্গন বন্ধ থাকার সুযোগে কত ছাত্রীর বিয়ে দিয়ে দেওয়া হল, কত ছেলে পড়ার পাট চুকিয়ে দিয়ে নাম লেখালো ইটভাটায়, তা প্রতিকার ও প্রতিরোধের ন্যূনতম চেষ্টা দেখা গেল না প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে।

এই যে কদিন স্কুল হল, তাতে কতজন ছাত্রছাত্রী আর আসছে না সেই হিসেব কি কেউ করেছে? হিসেব করলে, তাদের ফেরানোর কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে? দু-বছর সময় তো পাওয়া গেল, অনলাইন-অফলাইন দুই মোডে ক্লাস চালানোর জন্য পরিকাঠামোর কী কী পরিবর্তন করা হয়েছে? এইভাবে স্কুল চালাতে গিয়ে শিক্ষক শিক্ষিকারা যেসব অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন, সে নিয়ে সরকার কোনও ব্যবস্থা নেওয়া দূরের কথা, আদৌ কোনও উদ্বেগ দেখিয়েছেন? …. তাহলে সরকারের একমাত্র কাজই হচ্ছে শুধু স্কুল বন্ধ করার কথা ঘোষণা করা, তাই তো? আমরা কি এটাই ধরে নেব?

সবশেষে একটাই সহজ প্রশ্ন, পানশালা রেস্তোরাঁ সিনেমা হল অফিস কাছারি সভা সমিতি এমনকি বিয়ের অনুষ্ঠান যদি ৫০ শতাংশ হাজিরা নিয়ে চালু থাকতে পারে, এদের মধ্যে সবচেয়ে কম সংক্রমণ-প্রবণ ক্ষেত্র, শিক্ষাঙ্গনকে সামান্যতম অজুহাতে বন্ধ করে দেওয়া কতখানি যৌক্তিক?

 

৩.

অবশ্য যৌক্তিকতা যে এই রাজ্য সরকারের কাছ থেকে আশা করা অন্যায়, তা বোঝা যায় বিধিনিষেধের তালিকায় চোখ রাখলেই। লোকাল ট্রেন তার মোট আসনসংখ্যার ৫০ শতাংশ যাত্রী নিয়ে চলাচল করবে সন্ধে সাতটা অবধি। এক্ষেত্রে যিনি বা যাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা হয় লোকাল ট্রেন কাকে বলে জানেন না, অথবা তিনি বিদেশে গিয়ে শুধুমাত্র ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস জাতীয় কোনও বিলাসবহুল ট্রেনে চড়েছেন। সিনেমা হলে, থিয়েটারে অথবা রেস্তোরাঁয় পঞ্চাশ শতাংশ দর্শক, গ্রাহকের প্রবেশ যেভাবে নিশ্চিত করা যায়, লোকাল ট্রেনের ক্ষেত্রে সেভাবে সুনিশ্চিত করা যায় কি? যেমন এই আমি যদি রোজ সকাল সাড়ে আটটায় ডাউন ট্রেন ধরে আপিস যাব বলে মফস্বলের একটি ব্যস্ত স্টেশনে গিয়ে দাঁড়াই, কে ঠিক করবে যে আমি আসন্ন পরবর্তী ট্রেনের পঞ্চাশ শতাংশ যাত্রীর মধ্যে একজন কিনা? আর কীভাবেই বা ঠিক করবে? প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে আমাকে কি অন্য একজন যাত্রীর সঙ্গে ডুয়েল লড়তে হবে, আর যে জিতবে একমাত্র তারই স্থান হবে পরের ডাউন ট্রেনটায়?

একইভাবে, সন্ধে সাতটার পরে লোকাল ট্রেন না চালানোর সিদ্ধান্ত সাধারণ বোধবুদ্ধির বাইরে। দূর মফস্বল থেকে শহরে কাজ করতে আসা যুবক-যুবতীকে সাতটার শেষ ট্রেনে বাড়ি ফিরতে হলে, কর্মস্থল ছেড়ে বেরোতে হবে ছটায়, কোনও কোনও ক্ষেত্রে পাঁচটায়। অথচ শপিং মল, পানশালা, রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে ছোটবড় দোকান-পাট, ব্যাবসার ক্ষেত্র খোলা থাকছে রাত দশটা অবধি৷ শপিং মলের যে নিরাপত্তা কর্মীটি নৈহাটি বা বনগাঁয় নিজের বাড়ি ফিরবেন মনে করে রাত আটটা বা নটায় ডিউটি শেষ করে বেরোবেন, তার জন্য তো আর কোনও লোকাল ট্রেন অপেক্ষা করে নেই। তার কী হবে? বাস তো আর দূর শহরতলির সর্বত্র পৌঁছে দেয় না। বিকল্প কী? কিচ্ছু নেই। এই সঙ্কটের ভরা বাজারে হয় কর্মীটির চাকরি যাবে, অথবা তাকে আপাতত বেতনহীন কাটাতে হবে সামনের কটি মাস, যতদিন না পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হচ্ছে।

স্পষ্ট করে বলে দেওয়া যাক, বিগত দু-বছরে গোটা লকডাউন ও আনলক জুড়েই রাজ্য সরকারের রেলনীতি মফস্বল-বিরোধী। এই রেলনীতি মফস্বলে বসবাসকারী কর্মীদের ছাঁটাই করে দিয়ে শুধুমাত্র শহর কলকাতা ও তার অতিনিকটবর্তী মানুষজনকে কাজে বহাল করার জন্য মালিকপক্ষকে উৎসাহিত করছে। একই ভুল করা হয়েছিল কয়েক মাস আগে, বিগত লকডাউনে, যখন লোকাল ট্রেন বন্ধ করে সামান্য কটি স্টাফ স্পেশাল ট্রেন চালানো হচ্ছিল, ও সেসব ট্রেনে নিরুপায় নিত্যযাত্রীদের ভিড়ে তিলধারণের জায়গা ছিল না।

অথচ কাজের সময়ে বা সকালে ও সন্ধের অফিস আওয়ার্সে ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে ভিড়ের ঘনত্ব কমানো যেত। কোভিড দূরত্ববিধি কিছুটা হলেও মানা যেত তার ফলে। অন্য সময় অর্থাৎ দুপুরের দিকে ট্রেনের সংখ্যা কিছুটা কমিয়ে দিলেও তেমন সমস্যা হত না।

 

৪.

সুইমিং পুল, স্পা, সেলুন, বিউটি পার্লার, ওয়েলনেস সেন্টার ইত্যাদি ক্ষেত্রকে প্রথম সুযোগেই বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং এদের পুনরায় খোলার নির্দেশ আসে সবচেয়ে শেষে। হ্যাঁ, রূপচর্চা করা বা ওজন কমানো বা চুলের সৌন্দর্য বাড়ানো অত্যাবশকীয় পরিষেবার মধ্যে পড়ে না ঠিকই, কিন্তু যেসব অগণিত মানুষ এইসব পরিষেবাক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত, তারা মারা পড়েন এই ক্ষেত্রগুলি বন্ধ হলে। সমীক্ষা করলে জানা যাবে, এই পশ্চিমবঙ্গে কয়েক লক্ষ নারী বিউটিশিয়ানের কোর্স করেছেন বা করছেন, পার্লারে যোগ দিয়ে উপার্জনশীল হয়েছেন ও সংসারের ভার বহন করছেন৷ শুধুমাত্র পরিষেবা ক্ষেত্রগুলিই নয়, এর সঙ্গে যুক্ত আছে নানা প্রসাধন সামগ্রীর চাহিদা ও জোগান, পার্লার বা সেলুনগুলি বন্ধ হলে এই প্রসাধন সামগ্রী প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি ও তাদের শ্রমিকেরা ও একইসঙ্গে এক বিরাট সাপ্লাই চেন কর্মহীন, উপার্জনহীন হয়ে পড়ে।

কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে, কোভিড দূরত্ববিধি ও স্যানিটাইজেশন সুনিশ্চিত করে এই ক্ষেত্রগুলিকে পুরোপুরি না হলেও আংশিক সচল রাখাই যেত। রাখাও উচিত ছিল। সেদিকে সরকারের নজর পড়ল না।

 

৫.

রাজ্য সরকারের নয়া বিমাননীতি পড়ে বেশ কষ্ট করে অট্টহাস্য রোধ করতে হয়। যারা নিয়মিত বিমানে চড়েন, তাদের কাছ থেকে জেনেছি কলকাতা বিমানবন্দরে বহিরাগত যাত্রীর আরটিপিসিআর তো দূরস্থান, থার্মাল স্ক্রিনিং অবধি করা হয় না। আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য অসমের গৌহাটি বিমানবন্দর যেখানে প্রতিটি যাত্রীর কোভিড তথ্য যাচাই না করে তাকে শহরে ঢুকতে দেয় না, সেখানে কলকাতায় কোভিড পজিটিভের জন্য চির-অবারিত দ্বার৷ নিয়ম নিয়মের মতো লেখা থাকে, মানা নয় না। আর লন্ডন থেকে কলকাতায় সরাসরি বিমান অবতরণে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, যেকোনও লন্ডনের যাত্রী দিল্লি বা মুম্বইয়ে নেমে বিমান বদলে কলকাতায় আসতেই পারেন। ফলে যাত্রীকে শুধু শুধু ঘুরপথে আসতে বাধ্য না করে তার আরটিপিসিআর করলেই উচিত কাজ হত। এবং প্রথম থেকেই এই কাজটা ঠিকভাবে করা হলে শহরে কোভিড সংক্রমণ আরও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যেত।

 

শেষ কথা

নির্দেশিকাটির সবচেয়ে বড় ত্রুটি যে সুন্দরবন থেকে দার্জিলিং, আসমুদ্রহিমাচলব্যাপী পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটির জন্য একই ওষুধ প্রয়োগ করা হল। শহর কলকাতার সমস্যা ও চন্দ্রকোণা টাউনের বাস্তবতা এক নয়। মধ্য কলকাতায় কোভিডের যা প্রাদুর্ভাব তার সঙ্গে ময়নাগুড়ি বা বিষ্ণুপুরের করোনা পরিস্থিতি তুলনীয় নয়। বিধাননগরে যতগুলি পরিবারের পক্ষে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বেসরকারি স্কুলে পাঠরত বাচ্চাকে অনলাইন ক্লাস করানো সম্ভব, জঙ্গলমহলের পরিবারগুলির কাছে তা আশা করা অন্যায়, অথচ কোভিডের প্রভাব না থাকায় বা অত্যন্ত কম থাকায় গাঁ-গেরামের বাচ্চারা দিব্যি স্কুলে যেতে পারত। একটু দূরত্ব বজায় রেখে ক্লাস করতে পারত। তা ভাবাও হল না। নবান্ন থেকে ঘোষিত নির্দেশিকায় রাজ্যের নানা অঞ্চলের অবস্থান, আর্থসামাজিক ও যোগাযোগ পরিকাঠামো ও জনঘনত্বের দিকে নজর না দিয়ে সকলের জন্য একই ব্ল্যানকেট নিদান হেঁকে দেওয়া হল। এতে মন্ত্রী-আমলাদের খাটনি কম হয় বটে কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতির কোনও সুরাহা হয় না।

রাত কার্ফুতে করোনার প্রকোপ কতটা কমে জানা নেই, তবে কাজ-ফেরতা ও রাত দশটার ডেডলাইন মিস করা খেটেখাওয়া মানুষের ওপর রাস্তায় টহলরত ঘুষখোর পুলিশের অত্যাচার যে বেড়ে যায় সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

সব মিলিয়ে সরকারি নির্দেশিকা থেকে অন্তত একটি বিষয় প্রকট, আর তা হল কোভিড প্রতিরোধে শাসকের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। তা না হলে, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে উৎসবপালনের জন্য সমস্ত নিয়ম-নিয়ন্ত্রণ আলগা করে, রাত কার্ফু তুলে নিয়ে জনগণকে মোচ্ছব পালনের জন্য এমন অবাধ ছাড় দেওয়ার অর্থ কী? সংক্রমণ রেখাচিত্র থেকে স্পষ্ট যে শহর কলকাতা ও উত্তর চব্বিশ পরগণায় গত এক-দেড় সপ্তাহে চক্রবৃদ্ধিহারে কোভিড বৃদ্ধির সঙ্গে এই উন্মাদ ভিড়ের সম্পর্ক আছে। একবার প্রশাসনিক অপদার্থতায় কোভিড উসকে দেওয়া, আবার তা রুখতে একের পর এক জনস্বার্থবিরোধী বিধিনিষেধ, অথচ আশ্চর্যজনকভাবে আসন্ন গঙ্গাসাগর মেলা বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করতে এই সরকারের কোনও উদ্যোগ নেই। এইভাবেই এক অতিরিক্ত থেকে আরেক অতিরিক্তের চূড়ায় লাফ দিয়ে বেড়াচ্ছে এই সরকারের ভুল নীতিগুলি। মোচ্ছব পেরিয়ে লকডাউন আর লকডাউন পেরিয়ে মোচ্ছব, আমরা এই রাজ্যের জনগণ দণ্ডিত হয়ে মরণের শোভা দেখে যাই। 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. অত্যন্ত জরুরি লেখা।
    ‘কোভিড ছুতোয় ‘সম্পূর্ণ প্রতিবাদহীন পরিস্থিতিতে ,লেখাপড়া – স্কুল কলেজের শিক্ষাদান ,একশো ভাগ অনগ্রধিকার প্রাপ্ত ক্ষেত্রে শেষ মেষ নাবিয়ে আনা গেছে।
    কী আনন্দ!
    আজ থেকে পাঠশালা বন্ধ

    হীরক সেনগুপ্ত

  2. খুব ভাল লেখা। এই সরকার মনে হচ্ছে শিক্ষার ব্যাপারটাই বোঝে না।

আপনার মতামত...