রাঙা মাটির ভুবন

অবিন সেন

 

একদিন ফাল্গুনের খাঁ খাঁ দুপুরে ফুলির হৈ হৈ ডাকে বনলতার দ্বিপ্রাহরিক ঘুম ভেঙে গেল।

ঠাকুরমা, ঠাকুরমা ওঠো ওঠো, কে এয়েচে দেখো।

বনলতা ঘুমের চটকাটা কাটিয়ে উঠে তাঁর বিরক্তি প্রকাশ করলেন,

দুর ছুঁড়ি। আমার কাঁচা ঘুমটা ভাঙিয়ে দিলি তো! কে এলো এই দুপুরবেলা?

তিনি বিছানায় উঠে বসলেন। বেশ কিছুদিন থেকে তিনি হাঁটুর ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন। এখন আর ডাক্তার বদ্যি ওষুধ পালা ভালো লাগে না। ফুলিকে ইশারায় এলোমেলো চুলটা গুটিয়ে দিতে বললেন। হাতেও বুঝি বাতে ধরেছে।

ফুলি পিছনে বসে চুলটা জড়িয়ে দিতে দিলে বলল,

এখনও তোমার কতো চুল।

এই কথা ফুলি রোজ একবার না একবার বলবেই। সত্যি বনলতার এখনও অঢেল চুল। কালোর মধ্যে অনেক রূপালি রেখা। তবু এখনও বসলে মাটিতে চুল লুটায়। ফুলির মুখে কথাটা শুনতে বনলতার ভাল লাগে। সেই এককালে, তাঁর স্বামী সোহাগ করে চুল খুলে সেই চুলে মুখ ডুবিয়ে আবৃত্তি করতেন,

‘চুল তার কবেকার বিদিশার নিশা’।

কথাটা মনে পড়লেই বনলতার মুখে যেন একটা লজ্জার স্পর্শ খেলে যায়। বুকের ভিতরে ব্যথার একটা কাঁটা জানান দেয়। আজ প্রায় আঠারো বছর মানুষটা এই ধরাধামে নেই। যে বছর একমাত্র নাতনি জন্মাল। বুড়োর সে কী আহ্লাদ। বনলতা ভাবলেন, মানুষটা নেই কিন্তু তাঁর প্রতিটি মুহূর্তে যেন জড়িয়ে আছেন মানুষটি।

ফুলি তাড়া দিল,

ও ঠাকুরমা, কতক্ষণ মানুষটা বাইরে বসে থাকবে। চলো না!

কে এলেন? তুই এতো তাড়া দিচ্ছিস কেন?

ধুর! সেই কখন থেকে ‘কে কে’ করছ। তুমি চলো তো।

ফুলি হাত ধরে বনলতাকে বিছানা থেকে টেনে নামাল। ঘর পার হলে একটা বড় দালান। সেই দালানের বাইরে বসার ঘর। বিশাল টানা বারান্দা। পুরানো দিনের জমিদার বাড়ির মতো বিশাল বাড়ি। বাড়ির সঙ্গে দুর্গাদালান। এখনও দুর্গাপুজো হয় ছোট করে। তাঁরা জমিদার ছিলেন না। কিন্তু সাতপুরুষের বনেদি বড়লোক। আশেপাশের দশ-বিশটা গাঁ-গঞ্জ জুড়ে এখনও ‘রায়’বাড়ির পরিচিতি ছড়িয়ে আছে। পুরানো সম্মানটা বজায় আছে। কিন্তু সেই সম্মান গ্রহণ করার জন্য নামগুলিই শুধু আছে, মানুষগুলো আর নেই। তাঁদের পূর্বপুরুষ বাইরে থেকে এখানে এসে বসবাস শুরু করলেও কালের অতিক্রমে এখানের মাটির সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন।

টানা বারান্দার বাইরে বিস্তৃত উঠোন। এককালে উঠোনের পাশে টেনিস কোর্ট ছিল। এখন সে দিকটা আগাছায় ভরে উঠেছে। পোর্টিকো থেকে নুড়ি বিছানো ড্রাইভওয়ে পৌঁছেছে প্রধান ফটকে। ফটকে বিশাল লোহার দরজাটা আজও অটুট আছে। বাড়ির পিছন দিকটা বাগান। বাগানের পথ পেরিয়ে গেলে বিশাল পুকুর। লোকে বলে রায়দিঘি।

বনলতা বাইরে বেরিয়ে দেখলেন। একটু অবাকই হলেন। বারান্দার এক পাশে রেলিং ধরে একটি মেয়ে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। চেহারা ছোটখাটো। পিছন থেকেই বেশ রোগা পাতলা লাগে। ঘাড়ের কাছে লালচে ছোট চুল ছাতারা পাখির বাসার মতো আলু-ঝালু হয়ে আছে। পিঠের ঢাউস ব্যাক-প্যাকটা পর্যন্ত সে নামিয়ে রাখেনি। মেয়েটি কোনও একটা পাখির ডাককে ভেংচি কেটে মুখের মধ্যে শিষ দেবার মতো শব্দ করছিল।

বনলতার বুকের ভিতরটা হঠাৎ ধক্ করে উঠল। এই অবেলায় কে এল তাঁর আঙিনায় তারুণ্যের ধ্বজা উড়িয়ে। অঙ্কুরিত একটা সম্ভাবনায় তাঁর বুকের ভিতরটা ক্ষণিকের জন্য কেঁপে উঠল।

পিছনে পায়ের শব্দ পেয়ে মেয়েটি ঘুরে দাঁড়াল। চোখমুখে উপচে পড়ছে একরাশ ফুলের মতো হাসি।

বনলতা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। তিনি কী স্বপ্ন দেখছেন? তাঁর স্বপ্ন কী সত্যি হয়ে রোদের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে? তাঁর বুকের ভিতরে হৃৎপিণ্ডটি বুঝি থেমেই যাবে। কোনও কথা বলার আগেই তিতির দৌড়ে এসে বনলতাকে জড়িয়ে ধরল। বনলতার গলার কাছে মুখ গুঁজে দিল। বনলতার দুটি হাত অসীম আবেগে তাঁকে জড়িয়ে ধরল। দীর্ঘ শ্বাস টেনে তিতিরের চুলের ভিতর থেকে শরীরের ভিতর থেকে উঠে আসা ঘ্রাণ নিয়ে নিজের বুকের ভিতরে ভরে নিলেন তিনি।

প্রাথমিক আবেগটা কাটিয়ে উঠে বনলতার চোখ যেন চারপাশে আরও কোনও পরিচিত মুখের খোঁজ করছিল। কিন্তু কাউকে না দেখতে পেয়ে ধরা ধরা গলায় বললেন,

হ্যাঁ রে তুই আমাকে চিনতে পারলি? সেই তো কত বছর আগে—দশ এগারো বছর আগে আমাকে দেখেছিস!

কী যে বলো দিদি! তোমাকে চিনতে পারবো না!

তিতির কথা বলতে শেখা থেকেই ঠাকুমাকে ‘দিদি’ বলে ডেকে এসেছে। এই ডাক তাকে কে শিখিয়েছে সে জানে না। কিন্তু দিদি ডাকতে তার বড় মিষ্টি লাগে।

তিতির মুখ তুলে তাকিয়ে ঠাকুমার গালে হাত বোলাল।

তুমি এখনও কী যে সুন্দরী আছো দিদি! ইউ আর মাই অড্রে হেপবার্ন।

নাতনির কথা তিনি গায়ে মাখেন না। নাতনির মুখের থেকে যেন চোখ সরাতে পারছেন না। মাথায় মুখে হাত বুলিয়ে বললেন,

হ্যাঁ রে! আর সব কোথায়?

তিতির যে বিস্মিত হয়েছে, এমন ভঙ্গিমায় বলল, আর সব মানে! আর কেউ নেই দিদি। আমি একাই এসেছি।

বনলতাও যারপরনাই বিস্মিত।

ওমা! সে কী রে!

কিন্তু তিনি আর কথা বাড়ালেন না। সব কথা পরেও শোনা যাবে। কোন সুদূর দেশ থেকে মেয়েটি এসেছে। এখন সে স্থির হয়ে বসুক। বিশ্রাম নিক। বনলতা প্রাণ ভরে একটু যত্ন করুন আগে। তিনি এবার মৃদু ভৎসনার স্বরে ফুলিকে বললেন,

কী রে হাঁ করে কী দেখছিস! দিদির হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে ভিতরে যা। স্নানের ব্যবস্থা দেখ।

তিতিরকে স্নানে পাঠিয়ে তিনি নিজে রান্নাঘরে গেলেন। আজকাল আর নিজে রান্না করেন না তিনি। পেরে ওঠেন না। আর কার জন্যেই বা করবেন। প্রিয়জনকে রান্না করে খাওয়ানোতেই তো সুখ। তিনি চট জলদি কিছু বানাতে বসলেন। মেয়েটা কী পছন্দ করে তিনি জানেন না। তাঁর হাতের সাদামাটা খাবার কী সে পছন্দ করবে! সেই দুধের বয়েস থেকে তিতির আমেরিকায় মানুষ হয়েছে। বাবা মায়ের সঙ্গে সে শেষবার এ দেশে এসেছিল বছর দশেক আগে। বাব্বা! তখন কী নাক উঁচু স্বভাব ছিল ওইটুকু মেয়ের! কথাটা মনে পড়তে বনলতা নিজের মনেই হেসে উঠলেন।

বনলতাকে দেখে ফুলি তো অবাক।

কী হল গো ঠাকুরমা! তুমি এমন নিজের মনে হাসছ কেন?

বনলতা হাসতে হাসতেই বললেন,

সে তোর জেনে কাজ নেই! তুই আলুগুলো ঝিরি ঝিরি করে কেটে ভালো করে ধুয়ে দে তো।

ফুলি কুটনো নিয়ে বসে বকবক করছিল।

ও তোমার নাতনি ঠাকুরমা? তুমি না বলতে কোন বিদেশে থাকে তোমার ছেলে-ছেলের বউ। সেখান থেকে একা একা চলে এলো? আর কেমন বাংলায় কথা বলছে।

হ্যাঁ রে আমার একমাত্র নাতনি। আমি তো হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম মরার আগে আর ওদের কারো মুখ দেখে যেতে পারব না।

বনলতার দু চোখ জলে ভরে এল।

তুই বড় বাজে কথা বলিস ফুলি। বাঙালি ঘরের মেয়ে বাংলা বলবে না! ভুলে যাবে?

বনলতা ভাবলেন কয়েকটি লুচি ভেজে দেবেন। বাড়িতে ভালো গাওয়া ঘি আছে।

ঘি চপচপে লুচি দেখে তিতির বলল,

এ কী দিয়েছ দিদি? এতো তেল?

বনলতা যেন স্নেহের ধমক দিয়ে উঠলেন,

আরে তুই খা না কয়েকটা। কিচ্ছু হবে না। এ ঘরে তৈরি শুদ্ধ গাওয়া ঘি। আর এই বয়েসে খাবি না তো কবে খাবি। না খেয়ে খেয়ে যা চেহারা তোদের যেন হাওয়াও উল্টে পড়ে যাবি।

তিতির ঝিরি ঝিরি আলু ভাজা দিয়ে লুচি মুখে দিয়েই টাগরার ভিতরে মজাদার শব্দ করল।

ডেলিসাস!

তাদের বাড়িতে বাঙালি খাবারদাবার অনেক দিনই উঠে গেছে। মা-বাবার মধ্যে যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে সে খবরও বোধহয় ঠাকুমা জানেন না। তার প্রাণাধিক প্রিয় বাবা এখন এক ইটালিয়ান মহিলার সঙ্গে থাকতে শুরু করেছে। আর মা তো আমেরিকা থেকে ব্রিটেনে চলে গেছে। খেতে খেতে সে ভাবছিল ঠাকুমাকে কী সে এই সব কথা বলবে! তিতির বোধহয় অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল। ঠাকুমা কী বলছিল সেই কথা তার কানে যায়নি।

বনলতা তাকে অন্যমনস্ক দেখে বলল,

কী ভাবছিস বল তো?

তিতির হাসল,

ভাবছিলাম, তুমি হলে পৃথিবীর সেরা সেফ।

দুষ্টু মেয়ে।

বনলতা একটু কুলের আচার দিলেন নাতনির পাতে।

এটা খেয়ে দেখ। এটা একেবারে আমার নিজস্ব। এমন তুই কোথাও পাবি না।

তিতির একটু মুখে দিয়ে দারুণ খুশি হল। সত্যি ইউনিক টেস্ট।

নাতনির কাছ থেকে সার্টিফিকেট পেয়ে বনলতার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

অদূরে ফুলি বসেছিল। একমনে তাদের দেখছিল।

তিতির ফুলিকে দেখিয়ে বলল,

ও কে দিদি? তোমার হেলপিং হ্যান্ড?

ফুলি তারই বয়সী। চিকন লকলকে শাল তরুর মতো চেহারা। তিতির লক্ষ করেছে, কালো মুখের উপরে অদ্ভুত এক সারল্য মেশানো লাবণ্য যেন থই থই হয়ে আছে।

বনলতা বলল,

ওইটুকু বললে কিছু বলা হয় না। ও আমার অভিভাবিকা।

তার মুখের কথা শেষ হল না। কথা কেড়ে নিয়ে ফুলি হিল-হিলিয়ে বলে উঠল,

অভিভাবিকা না ছাই। অভিভাবিকা হলে তো সব কথা শুনতে হয়। তুমি কী আমার কোনও কথা শোনো ঠাকুরমা।

 

 

দুই

 

 

দিনের আলো নিভলেই কেমন ঘুটঘুটে হয়ে যায় চারদিক। আকাশে চাঁদ নেই। বিকেলে ঠাকুমার যত্নে খেতে খেতেই সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। তারপরে বিছানায় একটু মাথা দিতেই ঘুম। অচেনা জায়গায় ঘুম ভাঙতে তার বুকটা প্রথমেই কেমন ছমছম করে উঠেছিল। চারদিকে কী গভীর নিস্তব্ধতা। কোথাও আলো নেই। শব্দ নেই। তার মনে হয়েছিল গভীর রাত্রি হয়ে গিয়েছে বুঝি। মোবাইলে সময়টা দেখল সে, নাহ আটটাও বাজেনি তখন। মোবাইলটা হাতে নিয়ে সে বাইরে বারান্দায় বেরিয়েছে। ঠাকুমা কোথায়?

বনলতা হাঁটুর ব্যথার জন্যে উপরে উঠতে পারেন না। তাই পুরো দোতলাটা বন্ধই থাকে। সারাদিনের দেখভালের জন্য ভিখু বাউরি আর তার বউ থাকে। তারাই মাঝে মাঝে উপরের ঘরগুলোর চাবি খুলে ঝাড়-পোঁচ করে আসে। ভিখু আর তার বউ এই বাড়িতেই থাকে। পিছনের দিকে গোটা দুই ঘর নিয়ে তারা সংসার পেতেছে। তবে, সংসার বলতে আর কী! তারা স্বামী-স্ত্রী মাত্র। সন্তানাদি হয়নি। এখন আর সে সম্ভাবনাও নেই বোধহয়। ভিখু কিছু লেখাপড়া শিখেছিল। তাই জমিজমা, বাগান, টাকাপয়সার দায়িত্ব তার উপরেই ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে আছেন বনলতা। ভিখু আর তার বউ মালতী তাদের রাঙামা’র জন্যে নিজেদের জীবনও দিয়ে দিতে পারে।

ফুলি অবশ্য সন্ধ্যার পরে বাড়ি চলে যায়। তার বাপ এসে নিয়ে যায়। এই মানুষগুলিই আজ বনলতার অবলম্বন। তা ছাড়া পাড়া প্রতিবেশী আরও অনেক অভাবী মানুষদের প্রতি বনলতার দানধ্যানের অন্ত নেই।

ফুলিকে আজ বনলতা সন্ধ্যার মুখেরই ছেড়ে দেয়নি। তার বাপকে বসিয়ে রেখেছেন তিনি,

পশু, তুই এখন বসে বসে চা-মুড়ি খা। ফুলি আমার হাতে হাতে রান্নাগুলো করে দিক।

পশুপতি একটা বড় বাটির এক বাটি মুড়ি নিয়ে রান্না ঘরের বাইরে বসে বকবক করছে। অবশ্য ভিখুও জুটেছে। অন্যদিন মালতীই সামান্য রান্নাটুকু করে নেয় সন্ধ্যার আগেই। আজ অনেক দিন পরে যেন এই বাড়িতে এমন করে রান্নার আয়োজন বসেছে।

অদূরে গ্যাসের উনুন জ্বলছে, বনলতা আগুনের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন। রান্না প্রায় হয়েই এসেছে। শুধু খাবার আগে দুটো পরোটা ভেজে দেবে মালতী। বনলতা ভাবছিলেন। তিতির তাঁকে স্পষ্ট করে কিছু বলেনি। এতো দূরে মেয়েটা একা একা এমন করে চলে এলো! হাসতে হাসতে বলেছে, ‘তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছা করছিল দিদি, কলকাতায় একটা কাজও আছে’।

বনলতা বিশ্বাস করেননি, তবু হেসে বলেছিলেন,

তাই বল, কাজটাই আসল। আমার সঙ্গে দেখা করাটা গৌণ।

তিতির আদর করে ঠাকুমার গালে একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিল,

না গো দিদি। তোমার সঙ্গে দেখা করাটাই আসল।

কিন্তু, একটা জিনিস খটকা লেগেছে তাঁর, মেয়ে এত দূরে এল কই তার বাবা তো ফোন করে একবারও খবর নিল না। সৌম্য আজকাল মাসে এক-আধবার মায়ের খোঁজ নেয়। বনলতা বুঝে গেছেন ছেলের শিকড়ের টান আলগা হয়ে গেছে। তিনি নিজে ফোন করেছেন, কিন্তু ছেলে বড় ব্যস্ত থাকে বলে আর ফোন করে বিব্রত করেন না। মন কেমন করে তাঁর, তবু মনে মনে প্রার্থনা করেন রাত্রিদিন, ‘ওরা যেন ভালো থাকে, শান্তিতে থাকে’। বৌমাও আর ফোন করে না বহুদিন হল। শেষ কবে বৌমার ফোন পেয়েছেন, বনলতা মনে করতে পারেন না। কিন্তু আত্রেয়ী এমন ছিল না। যে কয়দিন সে এখানে ছিল, সেই কয়দিন সারাক্ষণ যেন মেয়ের মতো গলায় ঝুলে থাকত। বনলতাও প্রাণ ঢেলে ভালোবাসতেন। আজও কী বাসেন না? নিশ্চয়ই বাসেন। রাত্রিদিন এত দূর থেকে এক অদৃশ্য ভালোবাসার নিগড় তাদের নিরন্তর শুভেচ্ছা আর আশীর্বাদে ভরিয়ে রেখেছে।

বনলতা খেয়াল করেছেন, তিতিরের কাছেও কোনও ফোন আসেনি। সব ঠিক আছে তো! তাঁর মনের ভিতরে একটা অস্বস্তির কাঁটা যেন বিঁধে আছে।

তিতিরের ডাকে তিনি আবার ভাবনার ভিতর থেকে বাস্তবের মাটিতে নেমে এলেন।

রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে তিতির ডাক দিয়েছে,

দিদি, তোমারা সবাই এখানে! আর আমি তো একা একা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।

আয় বোস এখানে।

বনলতা কাছে বসালেন নাতনিকে। বনলতার বুকের ভিতরে যেন কত গল্প জমানো ছিল। এতদিন সেসব যেন হলুদ হয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপির মতো পুরানো বাক্সে বন্দী হয়ে ছিল। আজ তারা কোন আলাদীনের হাতের স্পর্শে শাপগ্রস্ত জিনের মতো বন্দীদশা কাটিয়ে বেরিয়ে এসেছে। ফুলি আর মালতীও যেন রান্না থামিয়ে সেই গল্প শুনছে অবাক বিস্ময়ে।

রাত্রে শোওয়ার মধ্যেও যে এমন মায়া থাকতে পারে তিতির আগে কখনও অনুভব করেনি। বনলতা তাকে বুকের কাছে নিয়ে শুয়েছেন। তাঁর শরীরের ভিতর থেকে, আটপৌরে শাড়ির ভিতর থেকে কী এক আশ্চর্য সুবাস উঠে আসছে। এমন সুবাস তিতিরের এ-যাবত জীবনের কাছে অচেনা। অজানা। তেমন করে গরম পড়েনি। জানালাটা আধো খোলা। মাথার উপরে মৃদু পুরানো পাখা ঘোরার শব্দ। সেই শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে বাইরে থেকে ভেসে আসা পাতার মর্মর। গল্প করতে করতে বনলতা এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। তিতিরের কিছুতেই ঘুম আসে না। সে অবাক হয়ে যাচ্ছে। তার গভীর রাত্রি পর্যন্ত ফেসবুক, চ্যাট, শুয়ে শুয়ে ট্যাবে ওয়েব সিরিজ দেখে কেটেছে এতদিন। এখানে এসে মোবাইল ফোন পর্যন্ত সে বন্ধ করে রেখেছে। যদি ইন্টারনেট পাওয়া যায়, কিন্তু স্পিড তেমন বেশি নয়। কিন্তু সেইসবের প্রতি সে কোনও আগ্রহ টের পাচ্ছে না। এ যেন এক অন্য পৃথিবী। অচেনা পৃথিবী।

কত রাত্রে ঘুম এসেছিল মনে নেই তিতিরের। অনেক বেলায় ঘুম ভাঙল তার। ঘুম থেকে উঠেই চিরদিনের অভ্যাসমতো মোবাইলটা অন করে দেখল। বাবা তাকে ফোনে না পেয়ে হ্যোয়াটসঅ্যাপ করেছে। সকালেই তার মনটা বিরক্তি আর অভিমানে ভরে উঠল।

বাবা তার এইভাবে এখানে চলে আসাটা একেবারেই ভালো চোখে দ্যাখেনি। স্পষ্ট করে লিখেছে ফিরে যেতে, অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল।

চোখেমুখে বিরক্তি নিয়ে বাইরের বারান্দায় নামতেই তার মন শান্ত হয়ে যায়। পরিষ্কার ঝকঝকে রোদে ভোরে আছে চারপাশ। প্রাচীরের বাইরের গাছটায় অজস্র লাল পলাশ ফুটে আছে। সেই আগুন লালের উপরে এসে পড়েছে হলুদ রোদ। এমন অহংকারী সকাল সে কি আগে দেখেছে! তিতির একবার বাবার সঙ্গে নেদারল্যান্ডস গিয়েছিল। দেখেছিল মাইলের পর মাইল ফুটে আছে টিউলিপ। কিন্তু প্রকৃত অহংকারী দৃশ্য বলতে পলাশ ফুলে ছেয়ে যাওয়া প্রান্তর ছাড়া আর কিছু হতে পারে না।

সকালের জলখাবারের থালা সাজিয়ে দিতে দিতে বনলতা বললেন,

তোর বাবা ফোন করেছিল। যেন খুব বিরক্ত হয়েছে। কী হয়েছে দিদিভাই? বাবার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে?

তিতিরের খাবারটা যেন হঠাৎ বিস্বাদ মনে হল। মলিন চোখে ঠাকুমার দিকে তাকিয়ে বলল,

না না দিদি। তেমন কিছু না। এমনি করে এখানে চলে আসাটা বুঝি বাবা পছন্দ করছে না।

সে হাসার চেষ্টা করে। কিন্তু তার ম্লান মুখ হাসির কোনও প্রতিফলন জানান দেয় না। সে আবার মুখ নামিয়ে খেতে থাকে।

বনলতা নাতনির মুখ দেখে বুঝতে পারেন। তিনি আর এই প্রসঙ্গে গেলেন না। তার ইচ্ছা হলে নিশ্চয়ই বলবে।

খাওয়া সেরে সে ফুলিকে ডাক দিল,

এই ফুলি চল তো, চারপাশটা একটু ঘুরে দেখা আসি।

ফুলি এক পায়ে খাড়া। চরতে পেলে সে যেন আর কিছু চায় না। খুশিতে ফেটে পড়ে সে বলল,

যাবে দিদি? চলো তোমাকে আমাদের গেরামটা ঘুরে দেখাই। তার আগে ঠাকুরমাকে বলে আসি। না হলে আমার উপরে রাগ দেখাবে।

eবাইরে রোদ খুব একটা চড়া হয়ে ওঠেনি। গরম পড়তে এখনও ঢের দেরি আছে। বসন্ত যেন প্রকৃতির চৌকাঠ ডিঙিয়ে রাঙা মাটির পথের ধুলোয় নেমে এসেছে। গ্রাম বলতে ছড়ানো-ছেটানো কিছু বাড়িঘর। দু-একটা পাকা। বাকি সব মাটির। কিন্তু কী পরিষ্কার নিকানো ঝকঝকে চারপাশ। মাটির দেওয়ালে সুদৃশ্য আলপনা। তিতির এমন দৃশ্য আগে কখনও দেখেনি। সে তার ডিজিটাল ক্যামেরায় পটাপট ছবি তুলছিল। তার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে অনর্গল বকবক করছিল ফুলি। কিছুটা সমতল পেরিয়ে তারা বন্ধুর মাঠের দিকে নামল। উঁচু আল। লাল কাঁকুরে মাটি। হলদে হয়ে আছে দু-একটা ঘাসের আঁটি। মাঠ যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকেই ঢালু জমি পাহাড়ের দিকে উঠে গেছে। অযোধ্যা পাহাড়ের রেঞ্জ। ঘন সবুজ গম্ভীর বনরাজি দাঁড়িয়ে আছে আকাশ আর মাটির সীমানায়।

ইদানীং এই এলাকায় খুব করে বেড়েছে মানুষের হল্লা। কালো ধোঁয়া উড়িয়ে মেঠো রাস্তা দিয়ে দুলতে দুলতে যাতায়াত করছে লঝঝরে ট্রাক। ওই দিকটায় শালের জঙ্গল। কারা যেন বরাত পেয়েছে। মোটা মোটা গুঁড়ি করাত আর কুড়ুলের আঘাতে লুটিয়ে পড়ছে মাটিতে। সেই গাছ কেটে বোঝাই হচ্ছে ট্রাকে। অরণ্যের সীমানায় কালো ধোঁয়ার অভিশাপ ছড়িয়ে দিয়ে সেই ট্রাক চলে যাচ্ছে কাছের শহরে।

তিতির থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল একটু তফাতে গিয়ে। ফুলি আঙুল দেখিয়ে বলল,

জানো দিদি, ওখানে নাকি কী সব কল-কারখানা বসবে। হোটেল হবে। তাই সব গাছ কেটে নিচ্ছে তারা। এদিকে এলে আমার চোখে জল চলে আসে।

ফুলি সত্যিই ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল।

তিতিরেরও চোখ ভিজে আসে। কী এক বীভৎস দৃশ্য। মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে গাছের বিশাল শরীর পার্শ্ববর্তী গাছের অদৃশ্য হাত আঁকড়ে ধরবার ব্যর্থ চেষ্টা করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। গাছটি মাটিতে পড়ার পরে মজুরদের চিৎকার আর কুড়ুল কাটারি নিয়ে তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বার যে দৃশ্য তেমন কুৎসিত দৃশ্য আগে কখনও দেখেনি সে।

ফুলি তার ওড়নায় চোখের জল মুছে বলল,

দিদি, আর কিছুদিন পরেই এই শালের বনে মঞ্জরী আসবে।

তিতির বলল, এই ভাবে ডি-ফরেস্ট্রেশন হচ্ছে কেউ কিছু বলছে না! গভর্নমেন্ট কিছু বলছে না? এইভাবে ফরেস্ট ডেস্ট্রয় করা তো একটা ক্রাইম।

হঠাৎ পিছন থেকে হা হা একটা হাসি শুনে তারা দুজনেই চমকে উঠল। ঘাড় ফিরিয়ে দেখল, রোগা ঢ্যাঙা একটা লোক কুঁজো হয়ে একেবারে তাদের ঘাড়ের কাছে মুখ বাড়িয়ে আছে। লোকটির পরনে পাদ্রীদের মতো শাদা আলখাল্লা। তবে সেই আলখাল্লার রঙ এখন আর শাদা নেই ঠিক, ধুলোয় হলদেটে হয়ে গেছে। মনে হয় বহুদিন তাতে কাচা পড়েনি। পাথরের মতো কালো মুখে জ্বলজ্বলে লালচে দুটো চোখ। ফোকলা মুখে কথা বলতে গেলে লালা গড়িয়ে পড়ে।

লোকটিকে দেখলে ফুলির কেমন ভয় ভয় করে। সে তিতিরের গায়ে একটু চিমটি কেটে বলল,

দুখু পাদ্রী।

আঙুল দিয়ে পাহাড়ের উপরের দিকে দেখিয়ে বলল,

ওই, ওই দিকে পাহাড়ের মাথায় ওদের গেরাম। ওই যে পাহাড়ের গা বেয়ে সরু রাস্তাটা উঠে গেছে। ওখানে রেড-ক্রসের একটা আশ্রম আছে।

তিতির ঘাড় ফিরিয়ে আবার ভালো করে দেখল। দুখু পাদ্রী নিজের মনে কী যেন বিড় বিড় করে যাচ্ছে।

তারা দুজনেই দুখু পাদ্রীর কাছ থেকে কিছুটা তফাতে সরে গেল। ফুলি আবার ফিস ফিস করে বলল,

ওকে সবাই কালো সাহেব বলে খ্যাপায়। হিল-টপে যে গ্রাহাম সাহেব আছে তাকে আমরা বলি শাদা সাহেব। ওই উপরের গ্রামের সবাই খিস্টান। রেডক্রস থেকে ওদের অনেক সাহায্য করে। বড়দিনের সময়ে আমরাও যাই। মেলা বসে। সবাইকে খাবার দেয়। নতুন জামা দেয়।

তারা এবার উল্টো দিকে হাঁটা দিল। এইভাবে গাছপালা ধ্বংস হতে দেখে তিতিরের মনটা খারাপ হয়ে গেছে।

কিন্তু দুখু পাদ্রী তাদের পিছু ছাড়েনি। কী যেন হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বক বক করতে করতে সে তাদের পিছনে পিছনে আসছিল। দুখু চিরকাল এমনটা ছিল না। তারও সংসার ছিল। বউ ছিল। ছেলেমেয়ে ছিল। গাঁ ছিল বনের ধারে। সে কত কত কুড়ি বছর আগের কথা। দুখুর আর মনেও নেই। পাহাড়ের ওপারের বন থেকে মাঝে মাঝে বাঘ, লেপার্ড নেমে আসত। কিন্তু তারা মানুষকে তেমন বিরক্ত করত না। প্রাণি আর মানুষের সহাবস্থান ছিল। তারপরে এল চোরাশিকারিরা। দুখুরাই বন্য প্রাণিদের হয়ে দল গুছিয়ে প্রতিরোধ করত। কিন্তু তাদের সঙ্গে পেরে উঠবে কেন। বনের সঙ্গে তাদের গাঁয়েও আগুন লাগিয়ে দিল তারা। সারা গাঁ উজাড় হয়ে গেল। উজাড় হয়ে গেল দুখুর ভরা সংসার। লাঠির ঘা খেয়ে সে ছিটকে পড়েছিল একপাশে। তাই হয়ত বেঁচে গিয়েছিল কপাল জোরে।

এবার দুখু যেন স্পষ্ট করে বলল,

তু কে গা বটে?

সে তিতিরকে উদ্দেশ্য করে বলল।

তিতিরের হয়ে ফুলি বলল,

রায়বাড়ির নাতনি।

দুখুর চোখ দুটো কেমন যেন জ্বল জ্বল করে উঠল। তার কালো ফোকলা মুখ হাসিতে ভরে উঠল।

তুদের বাড়ি তখন কুতো কাম-কাজ কইরেচি। কুতো কাল আর গিন্নিমারে দেকিনাই বটে।

তার পরে যেন নিজের মনেই বলল,

আজ যদি কত্তাবাবা থ্যাইকত তবে কী আর এমনডা বন বাদাড় কাইড্যা ফ্যালাইতে পাইরতো!

তিতির তার দিকে ফিরে বলল,

তোমরা তো আছো। তোমারা পারো না ওদের ঠেকাতে?

দুখুর মেলা হাসি পায়। কী বলে বিটি। এখন কী আর তেমনি গতর আছে! একটা মহিষে টানা গাড়ি আসছিল। কাটা গাছের ডালপালা বোঝাই। সেই দেখে দুখু যেন রোগা শরীরটা নিয়ে তিড়িং বিড়িং করে লাফিয়ে উঠল। হাত পা নেড়ে খুব করে তাকে গাল পাড়তে লাগল। তারপরে হাতের লাঠিটা উঁচিয়ে অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল অযথা। মাথায় গামছার পাগড়ি বাঁধা মইশাল তার হাতের সরু বেতের চাবুকটা সপাং সপাং করে মহিষের পিঠে মেরে দুখুকে ভয় দেখাল। ফোঁস করে মাহিষ তার বড় বাঁকানো শিংটা নাড়ল। সে কী ভয় দুখুর। সে দু-পা পিছোতে গিয়ে উঁচু রাস্তা থেকে মাঠের দিকে প্রায় পড়েই গেল। হো হো করে হেসে উঠল মইশাল। যেন কতই রঙ্গ হয়েছে।

 

 

তিন

 

 

সন্ধ্যাবেলা ফুলি বাড়ি চলে গেলে আর তিতির ল্যাপটপ খুলে বসল। ইন্টারনেট স্লো। তবু সে কষ্ট করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ডি-ফরেস্ট্রেশনের বিরুদ্ধে কোথায় কোথায় কমপ্লেইন করা যায় সব সে সার্চ করে দেখতে লাগল। কিন্তু সে একটু হতাশই হল। এই বিষয়ে কমপ্লেইন করবার বিশেষ ব্যবস্থা নেই অনলাইনে। তবু সে পরিবেশ দপ্তর, বন দপ্তর, ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী সকলকেই ই-মেল করল। সে জানে না এই সব মেলের কোনও ফল পাওয়া যাবে কী না! তবু তিতির হাল ছাড়বে না। লড়াইটা তাকে করতেই হবে। সে ধরেই নিয়েছে এই ই-মেলে কোনও কাজ হবে না। তাই সে মনে মনে মাঠে নেমে লড়াই করবার প্রস্তুতি নিয়ে নেয়। কিন্তু একা কী এই লড়াই লড়া যাবে! অথচ দ্বিতীয় কোন মানুষকে সে পাশে পাবে? তার বিশ্বাস দিদি নিশ্চয়ই মরালি সাপোর্ট দেবে কিন্তু ফিল্ডে নেমে আন্দোলন করবার বয়স আর বনলতার নেই।

এই করতে করতে অনেক রাত্রি হয়ে গেল। আজ সে একাই শুয়েছে। বনলতাকে বলেছে,

দিদি, আমার আজ অনেক কাজ আছে। আলো জ্বেলে কাজ করতে হবে। তোমার ঘুমের অসুবিধা হবে। আর আমার একা শুতে এতটুকু ভয় লাগবে না।

বনলতা প্রথমে নিমরাজি ছিলেন। কিন্তু নাতনি তাঁর বড় একগুঁয়ে। শেষে তিতিরের জেদের কাছে হাল ছেড়ে দিয়ে নিজের ঘরে শুতে গেছেন। সকালেই মালতীকে দিয়ে বাড়ির সবথেকে ভালো ঘরটি পরিপাটি করে সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছেন। তিতির তো আর সারাদিন ঠাকুমার ঘরে থাকতে পারবে না। তাঁর ঘরটি তো ওষুধের গন্ধে, অসুখের গন্ধে ম্লান আর বিষণ্ণ হয়ে আছে। সেই ঘরে কী আর নাতনিকে থাকতে দিতে পারেন বনলতা! সৌম্যর ঘরটিকে তাই তিতিরের জন্যে গুছিয়ে দিয়েছেন। তিতির তো সারাদিন ফুলিকে সঙ্গে নিয়ে টো টো করেছে। আর সেই অবসরে বনলতা মালতীকে নিয়ে ঘর গুছিয়েছেন। বিয়ের পরে যে কয়দিন এখানে ছিল সৌম্য আর আত্রেয়ী, এই ঘরেই থাকত। এখনও যেন এই ঘরে ঢুকলে ছেলের উপস্থিতির গন্ধটা টের পান বনলতা। তিতির ফিরলে তাকে ঘরটা দেখালেন তিনি। কত না গল্প চলে এল ঠোঁটের আগায়। কিন্তু বনলতা সেইসব বুকের গভীরে লালিত গল্পগুলিকে বুকের ভিতরেই রেখে দিলেন। এ তো তাঁর গল্প। নাতনির জন্যে বরং নতুন নতুন স্মৃতির কাহিনী প্রজাপতির মতো ডানা মেলে উড়ে বেড়াক। সেই রঙিন প্রজাপতিকেই আবার বুকে আঁকড়ে ধরে না হয় জীবনের শেষ কটা বছর কাটিয়ে দেবেন। ঘরটা তিতিরের খুব পছন্দ হয়েছে দেখে বনলতা খুব খুশি হয়েছিলেন। এমন একটা খুশির রঙে বহুকাল পরে তিনি নেয়ে উঠলেন।

বাবার ঘর শুনে তিতিরের মনের ভিতরে হয়ত তেমন কোনও আলো জ্বলে ওঠেনি। কিন্তু সে দেখেছিল এই ঘরের কথা বলতে গিয়ে ঠাকুমার চোখে মুখে যেন হাজার ভোল্টের আলো জ্বলে উঠেছিল। ঠাকুমার মুখের দিকে তাকিয়ে তিতিরও অনাবিল হেসে উঠেছিল। সে লক্ষ করেছিল দিদি যেন আয়নায় মুখে দেখবার মতো করে তার দিকে তাকিয়েছিলেন।

কত রাত হয়ে গেল কে জানে! ল্যাপটপে সময় দেখল। তখনই ফোনটা বেজে উঠল। বাবা ফোন করেছে। তিতির ফোন ধরবে কী ধরবে না এমন এক দোটানার মধ্যে পড়ে গিয়ে শেষে ফোনটা ধরল।

না সৌম্য মেয়ের সঙ্গে ঝগড়া করল না। কিন্তু তিতিরের এইভাবে চলে আসা যে সে ভালোভাবে নেয়নি সেটা বারবার বোঝাবার চেষ্টা করল। শেষে যেন আদেশের সুরে তাকে সত্বর ফিরে যেতে বলল।

ফোন কেটে গেলে তিতির ফোনটা বিছানার এক পাশে ছুঁড়ে দিল। নাহ্! তার রাগ বা দুঃখ কিছুই হচ্ছে না। বাবার কাছ থেকে এই ধরনের ব্যবহারে সে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। তিতিরের হঠাৎ মনে হল সে কেন এই ভাবে চলে এল! সে যে সোসাইটিতে মানুষ সেখানে বাবা-মা’র বিচ্ছেদ, ছেলেমেয়েদের একা একা বেড়ে ওঠা তো বড় স্বাভাবিক বিষয়। এমন ঘটনার সাক্ষী তার নিজেরই কয়েকজন বন্ধু আছে। তারা তো সেটাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়ে যে যার নিজের নিজের জীবন নিয়ে মেতে উঠেছে। তিতিরও তো প্রথমটায় তেমনই মেনে নিয়েছিল।

হঠাৎ একদিন বাড়ির পুরানো জিনস ঘাঁটছিল সে। আসলে বাবার বান্ধবী সিয়েনার থাকার জন্যে তাদের বাড়ির এক্সট্রা একটা ঘর পরিষ্কার হচ্ছিল। তখনি তিতির অ্যালবামটা খুঁজে পায়। কী অবহেলায় পড়েছিল। ছবিগুলো যেন স্মৃতির এক সোনার খনি। বাবার ছেলেবেলা। ঠাকুমার কোলে বাবা। বাবা মা। ছবি দেখতে দেখতে সে এতটাই ডুবে গিয়েছিল যে কখন সিয়েনা পাশে বসেছে সে খেয়ালই করেনি। সিয়েনা মেয়েটা ভালো। তিতিরের তার প্রতি কোনও রাগ নেই। সিয়েনার বয়সই বা কত হবে, তার থেকে হয়ত তিন চার বছরের বড়।

ঠাকুমার একটা ছবির দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে জানতে চেয়েছিল কার ছবি। অনেক দিন পরে যেন তিতির উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল। সিয়েনা তাকে শোনাল তার ছেলেবেলার গল্প। সে তার দিদিমার কাছে মানুষ হয়েছে। সে জানেই না তা তার বাবা কে! তিতিরের বুকের ভিতরে কোথা থেকে একটা আবেগ এসে গিয়েছিল যেন। সিয়েনার কী এমন ভাগ্য! পরে নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে তার হঠাৎ মনে হয়েছিল, আবেগের যে ঢেউ আর বুকের ভিতরে উচ্ছলে উঠেছিল সেটা আসলে তার ঠাকুমার প্রতি। ছেলেবেলায় দেখা বনলতার মুখটিকে সে কিছুতেই যেন তার মনের ভিতরে থেকে সরাতে পারছিল না। একদিন বাবাকে বলেছিল,

বাবা চলো না, একবার ইন্ডিয়া যাই। ঠাকুমাকে দেখে আসি!

বাবা তার কথার গুরুত্ব দেয়নি। এড়িয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু জেদি তিতির হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলল। বাবাকে না জানিয়েই।

ল্যাপটপ বন্ধ করে দেবার পরে ঝুপ করে যেন একটা নিবিড় অন্ধকার ঘরের ভিতরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তিতিরের চোখে ঘুম আসে না। তার ভাবতে অবাক লাগে, বাবা একবারও ঠাকুমার কথা জিজ্ঞাসা করল না। শিকড় উপড়ে গেলে গাছের সঙ্গে মাটির সম্পর্ক যেমন আলগা হয়ে যায় তেমনটা হয়ত মানুষের ক্ষেত্রেও ঘটে।

রাত্রে ভালো ঘুম হল না তিতিরের। ভোর না হতেই বাইরে কোকিলের ডাক। সেই ডাককে ভেংচি কেটে আরও একটা পাখি যেন বারে বারে ডেকে উঠছে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আধো ঘুমে সেই ডাক শুনল তিতির। সেও তো তিতির পাখি, সেও কি ডেকে উঠবে ভোরের পাখিদের সঙ্গে! তার বিছানায় শুয়ে শুয়েই হি হি করে হাসতে ইচ্ছা করল। ভোরের মৃদু আলোর মতো হাসতে হাসতে সে কোল বালিশ জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ আয়েস করল। আর একটু বেলা বাড়লে সে উঠল। এমন বিউটিফুল সকাল সে কতদিন দেখেনি। খালি পায়ে সে বাগানের ঘাসে নেমে এল। লাল কাঁকুরে মাটির উপরে বহুদিন বর্ষা বিরহে তৃষিত ঘাসগুলি মলিন হয়ে গিয়েছে। রুক্ষ আর কর্কশ। তবু পায়ের নিচে তাদের স্পর্শ তিতিরের আশ্চর্য লাগে।

ফুলির এখন তার সঙ্গ দেবার সময় নেই। তার দেদার কাজ। তিতির একা একাই ঘুরল বাগানে। কত গাছ। কোনও গাছ সে চেনে না। ফুলি থাকলে চিনিয়ে দিত। একটা গাছ দেখল সে গতকাল। তার সমস্ত পাতা যেন আগুনের মতো লাল। ফুলি বলল, ‘কুসুম। বসন্তে যখন কচি পাতা আসে, তখন তারা লালে লাল হয়ে আসে’। বাগানের এক কোনেও একটা ছোট কুসুম গাছ সে দেখল। বাড়িতে ফিরে দেখল দিদি জলখাবার সাজিয়েছে।

দিদি তাকে যে পরিমাণে খাওয়াচ্ছে তাতে সে দু-দিনেই মুটিয়ে ফুটবল হয়ে যাবে। দিদিকে সেই কথা বলতে বনলতা বকাঝকা করে সেই কথা হেসেই উড়িয়ে দিল।

সকালের জলখাবার সেরে ফুলি আর তিতির আবার গ্রাম দেখতে বের হল। তিতির বলল,

হ্যাঁ রে ফুলি তোর কথায় তো এদিকের সবার মতো টান নেই।

ফুলি হি হি করে বলল,

ঠাকুরমার সঙ্গে কথা কয়ে কয়ে আমি তোমাদের মতো কথা শিখে গেছি। তবে আমাদের সবার সঙ্গে আমাদের ভাষায় কথা কই।

তিতির কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। দেশ কাল ভাষা সব কেমন মানুষে মানুষে নিরন্তর বিভেদের বেড়া তুলে রেখেছে। ফুলি তাই অনায়াসে বলতে পারে ‘তোমাদের’ ভাষা। শুধু ভাষার আড়াল দিয়ে সে আর ফুলি যেন একশ যোজন দূরে অবস্থান করছে। তিতির সেই ভাষার বেড়া অতিক্রম করাবার চেষ্টা করবে না। বনলতা কেন ফুলিকে শহুরে ভাষা শেখাতে গেলেন! না শেখালেই বোধহয় ভালো করতেন। সে আবার ভাবল, অরণ্য আর প্রকৃতির আশ্রয় একদিন এই বিভেদ মুছে দেবে। কিন্তু অরণ্য যে শেষ হয়ে যাচ্ছে। সভ্যতা মানুষকে সব থেকে বেশি যেটা দিয়েছে সেটা বর্বরতা। তিতির একটা ক্ষুদ্র নিশ্বাস ফেলে বলল,

জানিস ফুলি, আমি কালকে সরকারের সমস্ত ডিপার্টমেন্টে গাছ কাটা নিয়ে কমপ্লেইন ঠুকে দিয়েছি। দেখি কী হয়! এতে কাজ না হলে আমি ডিস্ট্রিক্ট অথরিটির কাছে গিয়ে কমপ্লেইন জানাবো। তোদের গ্রামের থেকে সবার সই নিয়ে দরখাস্ত জমা দেবো।

ফুলি যেন একটু ভয় পেয়েছে এমন ভঙ্গিমায় বলল,

এ তুমি কী করেছো দিদি! ওরা খুব বদমাস। ওদের পেছনে পার্টির হাত আছে। আমাদের গাঁয়ের বুড়ো পশুপতি মাহাতো এর প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু কী হল! রাতের বেলা তাদের ঘরে আগুন দিয়ে গেল গুণ্ডারা। বুড়োর নাতনি দুলুকে তুলে নিয়ে গিয়ে দু দিন আটকে রেখেছিল। শেষে যারা প্রতিবাদ করছিল সবাইকে নাকখত দিয়ে ক্ষমা চইতে হল। তবে দুলু ছাড়া পেল।

একটানে কথাগুলো বলে ফুলি এক মুহূর্ত থামল। তারপরে আবার বলল,

দুলু আমাদের সঙ্গে পড়ত। স্কুলে। কিন্তু তার পরে সে আর স্কুলে আসেনি। শুনেছি রাঁচিতে নিয়ে গিয়ে তার বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। তাকে আর আমরা দেখিনি।

তিতির অবাক হয়ে শুনছিল। কোন এক অচেনা অজানা মেয়ের জন্যে তার মন বিষাদে ভরে উঠল।

ফুলি আবার বলল,

তুমি এই সব কোরো না দিদি! ওরা তোমার পিছনেও লেগে যাবে। তুমি তো চলে যাবে। কিন্তু অত্যাচার হবে আমাদের উপরে। ঠাকুরমা শুনলে কিন্তু খুব রাগ করবে।

তিতির বুঝল, সে তো এত কিছু ভেবে দেখেনি। সে কী পিছিয়ে আসবে তবে!

তারা গাঁয়ে চলে এসেছিল। ফুলিকে দেখে তাদের বয়সী একটি মেয়ে হই হই করে উঠল।

ফুলি ডাকল,

মিতু আমরা এসে গেছি।

এই সব ফুলির আয়োজন। সে তার বন্ধুদের জড়ো করছে। তারা তিতির দিদিকে টুসুর গান শোনাবে।

ফুলিদের বড়ির দাওয়ায় বসল তিতির। কী নিকানো ঝকঝকে পরিষ্কার উঠোন। তার চারপাশে ফুলির বন্ধুরা জড়ো হয়ে বসল।

ফুলি বলল,

ধর এবার।

মিতু নামের মেয়েটি শুরু করল,

‘চল সজনী যাব তোর সঙ্গে

টুসুর গীত গাইব রঙ্গে রঙ্গে।

যথা যাবি তথা যাব চইলবো লো সঙ্গে সঙ্গে’।

তিতির তার ফোনে ভিডিও করছিল। কী সুরেলা গলা মিতুর। অন্য মেয়েরা তাকে কোরাসে সঙ্গ দিচ্ছিল।

একটার পরে একটা গান গাইল। তিতিরের মুখে গানের প্রশংসা শুনে তাদের মুখে যেন আনন্দের একরাশ আলো থইথই করছিল। সবার শেষে গাইল,

টুসু রাজার সাধের বিটি অন্য লোকে কী জানে।

কারু কথা কারু ব্যথা, কারু লাগে নয়নে।।

সংসারের কতই ভাবনা টুসু ধনের চিন্তনে

মানুষের ভালো হোক—বাসনা রয়েছে মনে।।

গান শেষ করে কিছুক্ষণ সবাই চুপ করে বসে থাকল। তিতির এমন গান কখনও শোনেনি। এ তার কাছে যেন এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা।

তারপরে তারা সবাই উঠে ওড়ানটা গাছকোমর করে বাঁধেল। এবার এদের মধ্যে ফুলি অগ্রণী।

তোমাকে এবার একটা ঝুমুর শোনাই।

কথাটা বলে সে এবার গান ধরে আর অন্য মেয়েরা কোমর দোলায়।

 

জড়া লদীর মাঝখানে হ্যে

সইতত বন্দি কইরব দুজনাই হ্যে।

 

ঝংকারে কুড়ির মাঝখানে হ্যে

সইতত বন্দি কইরব দুজনাই হ্যে।

 

বঁধুর বাড়ি-এ পাঁকে আছে বারমাস্যা বেইল রে

সেই বেইল তুইলতে গেলে বুকে মারে শেইল রে

 

কই আলি হে তর মনে কি পড়ে না হ্যে

আমার মনে থেরজ ধরে না হ্যে।

 

তিতির এমন নাচ ইউটিউবে দেখেছে। কিন্তু সামনে থেকে দেখার অনুভূতিই আলাদা। ফুলিও যে এমন গাইতে আর নাচতে পারে তা তার জানা ছিল না। কী যেন এক মাটির সুবাস সে টের পায় এদের গানে। তিতির উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। কথার মানে সে সব বুঝতে পারে না। না পারুক। সেসব ফুলি তাকে পরে বুঝিয়ে বলবে। তবে সে বুঝতে পারছে এই গান একান্তভাবেই নারীদের গান। নারী আর প্রকৃতি যেন হাত ধরাধরি করে এই গান দ্বৈতভাবে গেয়ে ওঠে। এমনি করে কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে মেয়েরাই প্রকৃতির কোলে গোড়ে তুলেছে সমাজ। তারাই পাথর সরিয়ে সরিয়ে বসতি গড়েছে, তারাই জমিতে বীজ রোপণ করেছে। তিতির খেয়াল করেছে, কী পরিশ্রম করে এখানে মেয়েরা। বরং ছেলেদের দেখেছে তারা এক জোট হয়ে আড্ডা দিচ্ছে। আর কাজ করছে মেয়েরা।

 

 

চার

 

কয়েকদিন কেটে গেল। কিন্তু না কোনও মেলের উত্তর এসেছে, না কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তিতির বুঝতে পারছে এইভাবে হবে না। আসলে কোনও প্রতিবাদই এইভাবে ঘরে বসে বসে হয় না। ফেসবুক, টুইট্যারের বিপ্লব এখানে চলে না। তার করা ট্যুইট বহুবার রি-ট্যুইট হয়েছে। এমনকি মন্ত্রীদের ট্যুইটার হ্যান্ডলে সে তার ট্যুইট ট্যাগ করেছে। কিন্তু কোনও রেসপন্স আসেনি। শুধু যে ইন্ডাস্ট্রি জমি নিয়েছে তারা লিখেছে যে তারা সমস্ত রকমের ফর্মালিটি, আর আইন কানুন মেনেই কাজ করছে। তাদের কাছে এই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় পারমিশন আছে। তিতির সার্চ করে দেখল, এই বিষয়ে কোর্টের একটা কেস এই কোম্পানি জিতেছে। সুতরাং তার এই প্রতিবাদ অরণ্যে রোদন ছাড়া আর কিছুই হচ্ছে না।

এখন সে রোজ আর ফুলিকে সঙ্গে নিয়ে বের হয় না। রাস্তাঘাট চিনে গেছে সে। সকাল থেকেই তার মন তিক্ত হয়ে আছে। গতরাতে বাবা তাকে যথেষ্ট ভৎসনা করেছে। কিন্তু সে বুঝতে পারে না, তার এখানে থাকাতে বাবার কী অসুবিধা হয়েছে। বরং সুবিধা হবারই তো কথা।

সকালে বিরক্ত মন নিয়ে আধখাওয়া করেই সে উঠে পড়ল। সে একবার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে দেখা করতে যাবে। তবে সে কোথায় যাচ্ছে বনলতাকে তা বলল না। ফুলি তার কথা শুনে দিদির কানে কিছু তুলে দেয়নি এটাই সৌভাগ্য। তার গতিবিধির বিষয়ে জানলে হয়তো তাকে বাড়ি থেকে বের হতেই দিত না। বনলতার মনোভাব সে টের পেয়েছে।

বাড়িতে তার ঠাকুরদার একটা পুরানো গাড়ি আছে। সচল। চালাবার লোকও আছে পাশে। ভিখুই চালাতে পারে। কিন্তু তিতির গাড়ি নিলো না।

কিন্তু পাবলিক বাসে উঠে তার মনে হল গাড়ি না নিয়ে কী ভুল সে করেছে। এইভাবে বাসে চড়া তার অভ্যাস নেই। কী ঠেলাঠেলি ভিড়। তার সাজপোশাক দেখেই হয়ত কন্ডাক্টর তাকে একটা বসার জায়গার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কিন্তু বসেও স্বস্তি নেই। এত ভিড়। তার গায়ের উপরে লোকজন হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছে যেন। হঠাৎ তার মনে হল তার ঢোলা শার্টের পিছনটা ধরে কেউ টানছে। ঘাড় ফিরিয়ে দেখল, একটা ছাগল তার জামার কোণাটা ধরে চিবাচ্ছে। কে ছাগলও তুলে দিয়েছে বাসে। সে কী হাসবে না করুণা করবে! তিতির বুঝে উঠতে পারে না।

কিন্তু তার এই পরিশ্রম সর্বৈব ব্যর্থ হল। ডি.এম. তাকে মোলায়েম ভাবে কিছু উপদেশ দিলেন। তার মতো মেধাবী মেয়ের এইসব করে একেবারেই সময় নষ্ট করা উচিত নয়। বরং আবার নিজের দেশে ফিরে গিয়ে পড়াশুনা করা উচিত। তিতির যে এই দেশের নাগরিকই নয় এই বিষয়ে তিনি খোঁচাই দিলেন। তা ছাড়া এই কাজটা সমস্ত নিয়ম মেনে আর সরকারের টপ লেভেল থেকে অ্যাপ্রুভাল নিয়ে হচ্ছে। খুব প্রেস্টিজিয়াস একটা প্রজেক্ট।

তিতিরের নিজেকে খুব অসহায় মনে হল। আবার রাগও হল।

ডি.এম. তো বিশ্বাসই করলেন না এতে কোনও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে কিংবা অরণ্যবাসীদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। বরং শিল্প হলে মানুষেরই ভালো। কর্মসংস্থানের ঢল নামবে।

ফেরার সময়ে সে অযোধ্যার হিল-টপ দিয়ে ফিরল। একটা গাড়ি ভাড়া করে। পরিচ্ছন্ন রাস্তা। চারপাশে গাছের সারি। গাড়ির চালক বলল,

এক সময়ে এই হিল-টপে চায়ের বাগান ছিল। এখন আর নেই। তবে রেশমের বাগান এখনও আছে বটে। দিদি দেইখবেন নাকি?

তিতির কখনও রেশমের চাষ দেখেনি।

গাড়ি থেকে নেমে পাহাড়ের ঢালের দিকে নেমে যেতে হয় কিছুটা। সেখানেই আবার কালো সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দেখল, দুখু পাদ্রী তাকে চিনতে পেরেছে। চোখের উপরে দুই হাত দূরবিনের মতো করে সে বলল,

রায়বাড়ির বিটি না?

তার হাঁ করা ফোকলা মুখ দিয়ে লালা গড়িয়ে পড়ল। হে হে করে বোকার মতো হাসল সে। যেন তাকে চিনতে পেরে কতই না আমোদ পেয়েছে।

তিতির তাকে জবাব দেবে কী না ভাবছে। তখনি সে খেয়াল করল একটি গুল্মের আড়াল থেকে শাদা ধবধবে আলখাল্লা পরা এক সাহেব বেরিয়ে এলেন। তার মাথায় বড় বড় শাদা চুল। কাঁধের কাছে এসে পড়েছে।

তিতিরের মনে হল এই বুঝি শাদা সাহেব। গ্রাহাম সাহেব।

দুখু পাদ্রী হই হই করে উঠে তিতিরের পরিচয় দিল। সাহেব একটা হাত বরাভয়ের মতো করে তুলে বিড়বিড় করে যেন বললেন,

ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।

শাদা সাহেবের বাংলায় কোনও টান নেই। পরিষ্কার কেতাবি বাংলা।

সাহেব আবার বললেন,

আমাদের আশ্রম তো তুমি ছাড়িয়ে এসেছ। আর একদিন এসো, আমাদের আশ্রমে। কত নতুন নতুন গাছ লাগিয়েছি। তুমি কি এখানেই থাকো?

তিতির বলল, কেন বলুন তো?

না তোমার চেহারায় এদিকের ছাপ নেই। তবে মনে হচ্ছে কয়েকদিন রোদে রোদে ঘুরে গায়ের আসল রঙের উপরে যেন মেঘের ছায়ার মতো একটা ছায়া পড়েছে।

তিতির তার পরিচয় দিল।

গ্রাহাম সাহেব একটু বিস্ময়ের চোখ দিয়ে যেন তার দিকে তাকালেন। তারা রেশমের বাগান থেকে ঢালু সরু রাস্তা দিয়ে উপরে উঠে আসছিল। তিতির বলল,

আপনার গাছের সাম্রাজ্য নিশ্চয়ই একদিন দেখতে যাবো। কিন্তু এদিকে পাহাড়ের ঠিক কোলের কাছে যে মাইলের পর মাইল বন কেটে ফেলা হচ্ছে! আপনারা কিছু বলছেন না!

গ্রাহাম সাহেব বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়লেন। তারপরে ততোধিক ক্লান্ত গলায় বললেন,

মা, আমরা কি চেষ্টা করিনি? কিন্তু আমাদের ক্ষমতা সীমিত। একটা কথা মনে রাখবে সীমিত শক্তি নিয়ে রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে কোনও যুদ্ধে জেতা যায় না। তাতে শুধু রক্তক্ষয় হয়। আমরা যতদিন ধরে যুদ্ধ করব ততদিনে যারা ওই বন কাটছে তাদের কাজ শেষ হয়ে যাবে। মাঝখান থেকে কিছু অসহায় মানুষের জীবন শেষ হয়ে যাবে। তুমি দুখুর দিকে তাকিয়ে দ্যাখো।

তিতির যেন এই কথা মানতে পারছে না। তর্ক করবার ভঙ্গি করে বলল,

তা বলে আমরা মুখ বুজে মেনে নেবো?

কে বলেছে মেনে নেবো? লড়াই আমাদের চলছে। চলতে থাকবে। তারা কত বৃক্ষ ধ্বংস করবে! আমরা তার থেকে বেশি গাছ রোপণ করে যাবো এই পাহাড়ে। পাহাড়ে।

একটু থেমে গ্রাহাম সাহেব আবার বললেন,

সারা পাহাড় জুড়ে আমরা ছড়িয়ে দেবো আমাদের এই অরণ্যের বিস্তার। এটাই আমাদের লড়াই। এই লড়াইয়ে কেউ আমাদের হারাতে পারবে না।

তিতির বিস্ময়ে গ্রাহাম সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। সে দেখল, বৃদ্ধের চোখদুটি যেন ঝলমল করে জ্বলে উঠছে।

তিতির গাড়িতে উঠেও পিছন ফিরে সেই সৌম্য বৃদ্ধকে দেখতে থাকল। যতক্ষণ দেখা গেল।

সারাদিন ঘুরাঘুরি করে ক্লান্ত হয়ে দুপুরে খাবার পরে ঘুমিয়ে পড়েছিল তিতির। ফুলি এসে দৌড়ে ঠেলাঠেলি করে ঘুম ভাঙাল।

দিদি দিদি ওঠো। ওঠো।

তিতির ধড় ফড় করে উঠে পড়েছিল। কিছু বলতে গেল। কিন্তু ফুলি ঠোটে আঙুল ঠেকিয়ে চুপ করতে বলে তাকে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে গেল। কিন্তু তারা বসার ঘরে ঢুকল না। এই জানালার পর্দার আড়াল থেকে বসার ঘরটা দেখা যায়। দেখল দুজন ষণ্ডামার্কা লোক বসে আছে। দুজনেরই পরনে শাদা পাঞ্জাবি। ভারিক্কি একটু বয়স্ক লোকটির হাতের পাঁচ আঙুলে পাঁচটি সোনার আঙটি। গায়ের রঙ পালিশ করা কাঠের মতো চকচকে কালো। মাথায় অল্প চুল। তাদের উল্টোদিকের একটি চেয়ারে টান টান হয়ে বসে আছেন বনলতা। কী কঠিন এক ব্যক্তিত্ব তাঁর বসার ভঙ্গিতে।

আঙটিপরা নেতা গোছের লোকটি বলছে,

রাঙামা আমার পেন্নাম লিবেন। আমারদের খারাপ লাইগছে বটে। কিন্তু কী কইরব। উখেনে কারখানা হইবেক বটে। আমাদের গরমেন্ট থিকা সব পাস কইরচে বটে। এখন আপনের ঘরের বিটি গেরামে ঘুইরা ঘুইরা লোকরে খ্যাপাইছে। ব্যাগড়া দিছে। এখেনে সেখেনে চিঠি পাঠাইছে।

একটু থেমে আবার বলল,

গরমেন্টের মুয় লষ্ট কইরতেছে। এমন মানী ঘরের বিটি তাই কিছু বইলতে লারি।

কথাটা শেষ না করেই সে থেমে গিয়ে মৃদু হাস। তার ইঙ্গিত পরিষ্কার। এই বাড়ির মেয়ে না হলে তারা যা করবার করেই ফেলত। সুতরাং সাবধান করতে এসেছে। না হলে জেল জরিমানা কত কিছুই অনাসৃষ্টি হতে পারে।

তারা চলে যাবার পরে বনলতা স্থির হয়ে সেখানে বসে থাকলেন কিছুক্ষণ। তাঁর ফর্সা মুখ লাল হয়ে গিয়েছে। কঠিন গালায় বললেন,

দিদিভাই এদিকে এসো। আমি জানি তুমি সব শুনেছ।

তিতির আর ফুলি গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে এলো। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। হঠাৎ ঠাস করে এক চড় মারলেন ফুলির গালে।

ততোধিক কঠিন গলায় বললেন,

সব জেনেও আগে আমায় কিছু বলিসনি কেন? দূর হয়ে যা পোড়ারমুখী।

তারপরে তিতিরের দিকে ফিরে বললেন,

তিতির, তুমি কালকেই এখান থেকে চলে যাবে। আমি ব্যবস্থা করছি। কলকাতায় গিয়ে দু-দিন আমার এক বোনের বাড়িতে থাকবে। তারপরে সেখান থেকে সোজা তোমার বাবার কাছে ফিরে যাবে। আমি সৌম্যকে এখনই ফোন করে সব ব্যবস্থা করছি। আমি ফোন করে দিচ্ছি বুনুর বাড়ি থেকে কেউ এসে তোমাকে কাল নিয়ে যাবে।

তিতির কিছু বলতে গেল। কিন্তু বনলতা তাকে থামিয়ে দিলেন। তিতির ঠাকুমার এমন কঠিন মুখ কোনওদিন কল্পনাও করতে পারেনি। সে গুটিগুটি নিজের ঘরে ফিরে এল। তার কান্না পাচ্ছে। ভীষণ কান্না পাচ্ছে। সে পাগলের মতো বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ল।

বনলতারও কী কান্না পাচ্ছে না! কিন্তু এখন নরম হলে চলবে না। বুকে পাথর চাপিয়ে তিনি কঠিন হয়ে থাকলেন। সেই ভারে তাঁর বুক যেন ভেঙে পড়ছিল। তবু নরম হওয়া চলবে না। নরম হলে তিতির বায়না করবে। যেতে চাইবে না। কিন্তু তা তো হতে দেওয়া যায় না। নাতনির গায়ে সামান্য আঁচড় লাগুক তা তিনি প্রাণ থাকতে হতে দেবেন না। ওই লোকগুলি যে কত ভয়ঙ্কর তা তিনি জানেন। এক দল যায়, এক দল আসে। ক্ষমতার বদল হয়। কিন্তু ক্ষমতার নখ-দাঁত একই রকম হিংস্র থেকে যায়।

পরদিন দুপুরবেলাই বেরিয়ে পড়ল তারা। ভিখু গাড়িতে করে পুরুলিয়া স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে আসবে। রূপসী বাংলা ট্রেনে তারা ফিরবে। যাবার সময়ে তিতির একবারও পিছন ফিরে তাকাল না। বড় অভিমানী আর জেদী মেয়ে সে। যে জেদ করে বিদেশ থেকে এমনি করে একা চলে আসতে পারে, সে সেই জেদের বশে নির্বাক ফিরেও যেতে পারে। শুধু তার উৎসুক চোখ ফুলিকে খুঁজল একবার।

বনলতা দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন। তারা যখন চোখের আড়ালে চলে গেল, তখন বনলতার দুই চোখ দিয়ে জলের ধারা নামল। এতক্ষণ ধরে যে ব্যথা বুকের ভিতরে পাহাড় হয়ে বসেছিল তারা যেন জলের ধারা হয়ে ভেঙে পড়ল এবার। এই কি শেষ দেখা!

বিকেলেও বিছানা ছেড়ে ওঠবার আর কোনও শক্তি বা ইচ্ছা অবশিষ্ট ছিল না বনলতার। ফুলিটা কোথায়? সে বেটিরও কী অভিমান হয়েছে! সহসা বনলতার উপরেও যেন একরাশ অভিমানের শুকনো পাতা ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ল। এ কী ভ্রম!

না!

খোলা জানালা দিয়ে সত্যি শুকনো পাতা আর ধুলো উড়ে আসছে।

ঝড় উঠেছে।

শেষ বসন্তের প্রথম ঝড়।

বনলতা বিছানায় উঠে বসলেন। তখনই ঝড়ের ঝাপটায় সাধের কাচের আলোর শেডটা মেঝেয় পড়ে গিয়ে ঝন ঝন করে ভাঙল। চারদিকে ছিটকে পড়ল ভাঙা কাচের টুকরো। কোথায় পা রাখবেন বনলতা! ভাঙা কাচের ভিতরে যেন তিনি বন্দী হয়ে গিয়েছেন। তিনি বিমূঢ়ের মতো বসে থাকলেন। অসহায়।

ওই বাইরে গাড়ির শব্দ। ভিখু ফিরে এলো।

হঠাৎ ঝড়ের ধাক্কায় বাইরে থেকে একটা ডাক যেন দৌড়ে ঘরে ঢুকে পড়ল।

দিদি! দিদি!

বনলতা কী ঠিক শুনছেন। না ভ্রম!

ওই তো। ওই তো।

তিনি চিৎকার করে উঠলেন।

দিদিভাই। সাবধান। চারদিকে ভাঙা কাচের টুকরো। পা কেটে যাবে।

তিতির আর শুনেছে সেই বারণ! তার পায়ের মোটা শোলের জুতো মট মট করে কাচ ভেঙে এগিয়ে গেলো।

তিতির তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরল।শুধু বলল,

দিদি আমি ফিরে এসেছি।

বনলতা ভাবলেন,

চারপাশে ভাঙা কাচের টুকরোর ফাঁদে বন্দী এক অসহায় অভিমানী মেয়েকে উদ্ধার কারতে এসেছে সেই কোনও দূর দেশের এক বনদেবী।

 

 

 

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3775 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...