রামধনু— সপ্তম বর্ষ, দ্বিতীয় যাত্রা

স্টেশনমাস্টারের কলম

 

আমি একজন মহিলা। ছোটবেলায়, আশপাশের মানুষজনেরা (বাড়ির লোক, বন্ধুরা) আমাকে প্রায় একঘরে করে দিয়েছিল। কারণ? আমার এক বান্ধবীর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তাদের সন্দেহ হয়েছিল যে সেটা শুধুমাত্র বন্ধুত্ব হতে পারে না। তারা ভেবেই নিয়েছিল যে আমি সমকামী। আমি স্কুলের বন্ধুদের বাবা-মায়েরা তাদের বাচ্চাদের শেখাত আমার সঙ্গে না মিশতে। আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিল, আমার সঙ্গে কথাবার্তা বলাও প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল, একদম একলা হয়ে গেছিলাম। কলেজে যখন আমার প্রথম বয়ফ্রেন্ড হল, বাড়ির লোকেরা তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আমি আবার সবার কাছে গ্রহণীয় হয়ে উঠলাম। আমি নিজের ওপর কোনও লেবেল লাগাইনি এখনও, যদিও আমি জানি আমি কুইয়ার। এবং লেবেল লাগানোটা যে খুব দরকার, আমার তা-ও মনে হয় না। আমি কাকে ভালবাসব সেটা তো সম্পূর্ণভাবেই আমার ব্যাপার, তাই না? আমি কুইয়ার আন্দোলনের একজন সহমর্মী। বরাবরই ছিলাম। যেকোনও অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাটা একটা মনুষ্যোচিত কাজ। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমার যৌন প্রবণতা কী, সেটা বিচার্য হতে পারে না।

—আমাদের এক অনামী সহনাগরিক

সরকারি তথ্য (২০১২) বলছে দেশের কুইয়ার জনসংখ্যা ২.৫ মিলিয়ন। পাঠক, এখানে একবার ক্ষমা চেয়ে নিই। বারবার কুইয়ার শব্দটি ব্যবহার করতে হচ্ছে নিতান্ত নাচার হয়ে। বাংলা, এমনকি কোনও ভারতীয় ভাষাতেও আমরা এখনও পর্যন্ত এই শব্দের কোনও সম্মানজনক প্রতিশব্দ বরাদ্দ করে উঠতে পারিনি। যাই হোক, যা বলছিলাম। সরকারি তথ্যে বলে আমাদের দেশে ২.৫ মিলিয়ন মানুষ কুইয়ার। এবং কোনও ঝুঁকি না নিয়েই বলে ফেলা যায় প্রকৃত সংখ্যাটি এর চেয়ে অনেক বেশি। ওপরের উদ্ধৃতির আমাদের অনামী সহনাগরিকটির মতো প্রচুর মানুষ রয়েছেন যাঁদের যৌন-পরিচিতি আমরা জানি না। জানার দরকারও আছে কি? আমরা কি কোনও দেশের বিষমকামী জনসংখ্যা কত জানার জন্য কখনও গুগল করি?

না।

বিষয়টা একই সঙ্গে অদ্ভুত এবং হতাশাজনক। কত সহজেই না আমরা, সমাজগতভাবে, একজনের ব্যক্তিগত জীবনে অনুপ্রবেশ করে ফেলি। আরও, যদি বিষয়টি হয় সেই মানুষটির যৌনজীবন সংক্রান্ত। যদি কেউ সমাজের প্রচলিত বিধিনিয়মগুলোর সঙ্গে খাপ না খায়, তবে অনায়াসেই আমরা তাকে একটা ছাপ্পা মেরে দিই। মনে করি যে তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয়গুলি নিতান্তই বারোয়ারি। মানুষের অস্তিত্বকে অতিসরলীকৃত করে ফেলতে, যে মানুষটি প্রচলিত বিধিসম্মত নয় তাকে একমাত্রিকতায় বেঁধে ফেলতে আমরা রীতিমতো দক্ষ।

কিন্তু, প্রিয় পাঠক, আজ এই ২০২৩-এ এসে আমরা অবশেষে এই উপলব্ধিতে পৌঁছতে চাইছি যে সমস্ত ব্যক্তিগত-ই আসলে রাজনৈতিক। আমরা চিনতে চাইছি আমাদের সমবেত ব্যর্থতাকে। কুইয়ার সম্প্রদায়ের মানুষদের বোঝার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছি আমরা, ব্যর্থ হয়েছি তাঁরা যাতে তাঁদের কণ্ঠস্বর শোনাতে পারেন তেমন একটা প্ল্যাটফর্ম দিতে। কিছুটা হলেও আমাদের উপলব্ধিতে আসছে যে আমাদের হিরণ্ময় নীরবতা আসলে আমাদের যুগ যুগ-লালিত সংস্কার এবং তাঁদের প্রতি আমাদের বিভেদকামিতাকেই সার-জল জুগিয়েছে। আমরা আমাদের এই বহুদিনের বাকি থাকা সংলাপটা শুরু করতে চাই— নতমস্তকে— কারণ এতদিন আমরা আমাদেরই কিছু সহনাগরিককে মনুষ্যেতর কোনও জীবের চোখে দেখে এসেছি।

কুইয়ার সম্প্রদায়ের প্রতিটি মানুষের সংগ্রামই বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আমাদের সিস্টেমের গোঁড়ামি এবং দমনমূলক চারিত্র্য এরকম প্রতিটি সংগ্রামের গল্পেই দৃশ্যমান। ফলে, যখন আমরা এই উপলব্ধি অর্জন করি যে প্রতিটি ব্যক্তিগতই রাজনৈতিক, তখনই এটাও বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে কুইয়ার সম্প্রদায়ের মানুষদের এই লড়াইগুলি এক-একটি আলাদা বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়, বরং সাম্য, ন্যায় এবং মানবাধিকারের লক্ষ্যে পরিচালিত বৃহত্তর সংগ্রামেরই অংশ।

প্রাইড মান্থ হল সেই অভিজ্ঞান যা আমাদের এই জরুরি কর্তব্যগুলি মনে করিয়ে দেয়। আমাদের নিজেদের ভেতরকার অন্ধকূপটার গভীরে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করে, মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় আমাদের সংস্কার, গোঁড়ামিগুলির। প্রাইড মান্থ আমাদের স্বীকার করে নিতে বলে যে আমরা আমাদেরই কিছু সহনাগরিককে ক্রমশ প্রান্তিকতার দিকে ঠেলে দিয়েছি। আমাদের ব্যক্তিগত ক্রিয়াকলাপ, সংলাপ, বিশ্বাস এই সমস্ত কিছুর রাজনৈতিক অভিমুখটিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এই প্রাইড মান্থ।

যখন কোনও ব্যক্তি-পরিচিতিকে আমরা শুধুমাত্র যৌনতা বা লিঙ্গ-পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ করে ফেলি তখন আমরা আসলে এক বিভেদকামী সংস্কৃতিরই সেবা করি। তাঁদের নিজস্ব জটিলতাগুলি আমাদের চোখে গুরুত্ব হারায়, আমরা তাঁদের স্বপ্ন, আবেগ, সমাজে তাঁদের অবদান সমস্ত কিছুকেই অবহেলা করি। তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের রাজনৈতিক মাত্রাকে অস্বীকার করে আমরা সেই স্থিতাবস্থাকে লালন করি যা তাঁদের মানবিক অধিকার এবং মনুষ্যোচিত সম্ভ্রম অস্বীকার করে।

সমাজের দমনমূলক সিস্টেমের শরিক কোনও-না-কোনওভাবে আমরাও— এই উপলব্ধি যে অস্বস্তির জন্ম দেয়, প্রাইড মান্থ আমাদের তারও মুখোমুখি দাঁড় করায়। প্রাইড মান্থ আমাদের আহ্বান জানায় নিজেদের উদাসীনতা, নীরবতা ভঙ্গ করে বেরিয়ে আসতে, নিজেদের সহনাগরিকদের প্রকৃত অর্থে সহ-নাগরিক হয়ে উঠতে। চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে আমরা সেই নীরবতার খোলস ভেঙে বেরোতে চাইছি। যেতে চাইছি সংলাপে। যে-সংলাপ গুঁড়িয়ে দেবে সংস্কারের জগদ্দল পাথরকে, পূর্ণতা পাবে প্রতিটি ব্যক্তিমানব, বৈচিত্র্যে ভরে উঠবে মানবসমাজ।

প্রিয় পাঠক, আপনাদের পাশে পাব, আমাদের বিশ্বাস।

সম্পাদকমণ্ডলীর পক্ষে,
আত্রেয়ী কর

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4557 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...